Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৫৫

আমার আলাদিন পর্ব ৫৫

আমার আলাদিন পর্ব ৫৫
জাবিন ফোরকান

সুইমিং পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসেছে ইরাম। একপাশে রাখা জুসের গ্লাস। কোলের উপর ল্যাপটপ। নিজের কাজগুলো চেক করে দেখছে সে। নতুন কোনো কাজের অফার আসেনি। তাতে ভ্রুদ্বয়ের মাঝে কুঞ্চন সৃষ্টি হলো তার। পরপর দু দুটো অফার পেয়ে সে যারপরনাই খুশি হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত ফ্রিল্যান্সিং যে এতটাও সহজ নয়, সেটা হারে হারে টের পাওয়া যাচ্ছে। খানিকটা হতাশ হয়েই আরও কিছু কাজের স্যাম্পল তৈরি করতে লাগল সে। প্রোফাইল সাজাতে কাজে লাগবে। ঠিক এমন মুহূর্তে জুসের গ্লাসের পাশে রাখা ফোন বেজে উঠল। ইরাম কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে ফোন হাতে নিল। কলার আইডিতে ভাসছে কায়সান রুশদীর নাম। রিসিভ করল সে,

“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
ওপাশ থেকে নম্র কণ্ঠের জবাব এলো। ইরাম মুচকি হাসল,
“তো? কেমন যাচ্ছে দিনকাল জনাব? বরিশালেই আছো নাকি ঢাকায়?”
মৃদু হাসির ধ্বনি ভেসে এলো ওপাশ থেকে।
“আমার কি আর আয়েশ করার নসিব আছে? অবশ্যই ঢাকায়। আজকে ক্লাসে তোমাকে দেখলাম না। তাই ফোন করলাম। এখনো বরিশালে?”
“হুম, কুয়াকাটায়।”
এক হাতে ল্যাপটপে কাজ জারি রেখে অন্য হাতে ফোনটা স্পিকারে রাখল ইরাম। কায়সান শুধাল,
“বাহ্, বেশ তো। এনজয়িং হানিমুন?”
ইরামের খানিক লাজবোধ হলো। মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল সে,
“হুম, বাবুর সঙ্গে চলছে হানিমুন, একেবারে জম্পেশ।”
ওপাশ থেকে কায়সানের সুরেলা হাসির শব্দ ভেসে এলো। বেশ নমনীয় তার কন্ঠটা। শুনলে মনে হয়, কণ্ঠেই মধু ঝরছে।

“হতেই পারে। তোমার যে হাসবেন্ড, তার পক্ষে কোনোকিছু অসম্ভব নয়।”
“তুমি আলাদিনকে চেনো নাকি?”
“পার্সোনালি না। বেশ কয়েকবার অনলাইনে দেখেছিলাম। তবে জানতাম না ওর সঙ্গেই তোমার বিয়ে হয়েছে। আর লাস্টলি সেদিন পার্টিতে সামনা সামনি তো দেখলামই। আই বেট হি কেয়ার্স অ্যাবাউট ইউ ডিপলি।”
ইরাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কায়সানের কথাগুলো তার অন্তরকে অনুভূতির উষ্ণতায় ছেয়ে ফেলল। কেন যেন সাইবানকে নিয়ে কথা বলতে তার খানিকটা বিব্রতবোধ হলো। তাই বিষয়টা ঘুরিয়ে ফেলে বলল,
“অনেক হয়েছে। বলো তোমার কথা। সরি, আমার বোধ হয় আর দুটো দিন ক্লাস মিস যাবে।”
“ইটস ফাইন। আমরা এখনো আগের ওয়ার্কেই আছি। তাছাড়া শেষে ওয়ার্কগুলো রিপিট হবে। আমি তোমাকে প্রিভিউ দিয়ে দেব নাহয়।”
“থ্যাংকস আ লট।”
“শুধু থ্যাংকস দিলে তো চলবে না। কিছুটা হেল্পও যে করতে হবে?”
ইরাম এবার বিস্মিত হলো।
“হেল্প? বলো বলো, অবশ্যই করব যদি আমার পক্ষে সম্ভব হয়।”
কায়সান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে পরবর্তীতে জানাল,
“আসলে আমার ইউটিউব চ্যানেলের জন্য এডিটর টিমের একজন সদস্য দরকার।”
“ওহ, তো এতে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“আমি ভাবছিলাম, যদি তুমি কিছুটা টাইম দিতে পারো আরকি, তাহলে আমি তোমাকেই রিক্রুট করতাম। স্লাইড ডিজাইনের কাজ তো শিখেছ, আমি দেখেছি তোমার কাজ। একটু ঘষামাজা করলে পুরোপুরি প্রোফেশনাল হয়ে যাবে। আমার টিমের এক্সপার্টরা অনেক হাম্বেল, ওরা তোমাকে হাতে কলমে শিখিয়ে দেবে। কি বলো?”
ইরাম থমকাল। এমন প্রস্তাব হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতন। কায়সান রুশদী টেকনিক্যাল ক্ষেত্রে বড় একটা নামই বটে। তার সাথে কাজ করা গেলে ইরামের পরিচিতি হবে। তাতে হয়ত আরও নতুন নতুন কাজের অফারও আসবে। ক্ষণিকের জন্য সে স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারলনা। একটা শীতল আতঙ্ক অনুভূত হলো। এত বড় দায়িত্ব কি সে সঠিকভাবে পালন করতে পারবে?
“ইরাম?”
ফোনের বিপরীত প্রান্ত থেকে কায়সানের উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে আসতেই ইরামের চিন্তায় ছেদ পড়ল। একটি নিঃশ্বাস ফেলল সে, ফোনটা কাছে নিয়ে মৃদু গলায় বলল,
“তুমি চাইলে অলরেডি এক্সপার্ট কাউকে নিতে পারো। আমার মতন নিউবিকে কেন অফার দিচ্ছ?”
কায়সান একগাল হাসল। তার হাসিটা মসৃণ শোনাল।
“তোমার কি মনে হয়? আমি তোমাকে করুণা করছি?”
“হ্যাঁ।”

বিনা দ্বিধায় উত্তর করল ইরাম। তাতে কায়সান খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল। পরমুহূর্তে তার দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ শোনা গেল।
“ইরাম, যদি মিউচুয়ালি বন্ডেড সব মানুষের একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা করুণা বলে বিবেচিত হতো, তাহলে পৃথিবীতে বন্ধুত্ব বলে কোনো শব্দ থাকতনা। তুমি আমার বন্ধু, তাই অফকোর্স তোমাকে আমি আর পাঁচটা নতুন মানুষের থেকে বেশি বিশ্বাস করব।”
ইরাম দাঁতে ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। কায়সান বুঝতে পেরে বলে গেল,
“তুমি ঠিক বলেছ। আমি চাইলেই এক্সপার্ট কাউকে নিতে পারি। কিন্তু আমি সেটা চাচ্ছিনা। ইরাম, আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। বিয়ে হয়ে গিয়েছে, বাচ্চা আছে, সবকিছুতে পরিপূর্ণ – স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তোমার একটা শক্ত ভিত্তি তৈরির প্রচেষ্টাকে আমি সম্মান করি। আমার সবটুকু শ্রদ্ধা ইরাম নামক এক মায়ের প্রতি। তাই আমি তোমাকে সুযোগ দিতে চাচ্ছি। অলরেডি এস্ট্যাবলিশড কাউকে সুযোগ দেয়ার থেকে নতুন কাউকে একটা সুযোগ দিলে যদি তার ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে যায় তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। এটা করুণা নয়, অপারচুনিটি। আমি শুধু তোমাকে অপশন দিচ্ছি, কাজ তো আমি করব না, সেটা তোমাকেই করতে হবে। এই ফিল্ডে নিজের জায়গা বানাতে গেলে সেটাও তোমার নিজের যোগ্যতায় করতে হবে।”
কায়সানের কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনল ইরাম। মিথ্যা নয়। তাছাড়া সে এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে হুটহাট ইগোর বশে সিদ্ধান্ত নেয়াও অসমীচীন। তাই শেষমেষ একটি নিঃশ্বাস ফেলল ইরাম। কৃতজ্ঞতা পূর্ণ গলায় বলল,

“তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ জানানো যায় আমার জানা নেই, কায়সান।”
“চিল, উইম্যান। তুমি ঢাকায় ফিরে আসো, দেখা হলে বিস্তারিত আলাপ হবে।”
“হুম। থ্যাংকস অ্যাগেইন।”
“বরিশালের কি বিখ্যাত আমি জানিনা। তবে কুয়াকাটায় যেহেতু গিয়েছ, গিফট নিয়েই ফিরবে আশা করছি?”
একগাল হাসল ইরাম,
“অবশ্যই। তোমার জন্য বরিশালের সুন্দর একখানা মেয়ে নিয়ে ফিরব। আর কতকাল একলা দিনযাপন? লাইফের বেস্ট গিফট দেব তোমায়।”
“ইয়া আল্লাহ! ইরাম, বলছিলাম কি…ইয়ে…আমার না কাজ আছে। সো বায় বায়!”
ইরাম প্রত্যুত্তর করার আগেই ফোন কেটে দিল কায়সান। বিপ বিপ শব্দ শুনে ইরাম শব্দ তুলে হাসল। মাথা ঝাঁকিয়ে ফোনটা পাশে রেখে জুসের গ্লাস হাতে তুলতেই সামনের দৃশ্যটা নজরে এলো তার। ভিলার গেটটা ভেতর থেকে বন্ধ। আর সেই গেটে হেলান দিয়ে দুবাহু বুকে চেপে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। চোখেমুখে পাথুরে অভিব্যক্তি, দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা। নড়ছে না, পলকহীন তাকিয়ে আছে ইরামের দিকে। রমণী তাতে সামান্য ভড়কাল। হাত তুলে নাড়ল। তবুও সাইবানের অভিব্যক্তি বদলাল না।
“অ্যাই? কুচুপু কোথায়?”

ইরামের প্রশ্নে বিশেষ প্রতিক্রিয়া করলনা সাইবান। শুধু গেট ছেড়ে হেলেদুলে এগিয়ে আসতে লাগল। অবাক হলো ইরাম। তারা সকলে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতেই ছিল। পরে বিশ্রামের বাহানায় ইরাম সবার আগেই ফিরে এসেছিল। ইযান সাইবানের কাছেই ছিল। সাথে অনুরাগ আর সুগন্ধা মিলে নাকি আরও কিছুটা ঘুরবে। তাই ইরাম মতভেদ করেনি।
“হ্যালো? আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি, আলাদিন।”
এবারেও উত্তরহীন সাইবান। সুইমিং পুলের বিপরীত প্রান্তে থামল তার পদক্ষেপ। চারপাশে হলদেটে বাতি জ্বলছে। টলটল করছে পুলের স্বচ্ছ নীলচে পানি। সাইবান কিছুক্ষণ সেই পানির দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করে নিজের পরনের টি শার্টটা মাথার উপর দিয়ে গলিয়ে একটানে খুলে ছুঁড়ে ফেলল মাটিতে। হতবাক হয়ে গেল ইরাম। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সে স্বামীর দিকে। শুধুমাত্র থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরনে সাইবানের। শরীরের উপরাংশ পুরোপুরি উন্মুক্ত। হলদেটে বাতির ছোঁয়ায় তার পুরুষালী মাংসপেশীগুলো দারুণভাবে চোখে পড়ছে। প্রশস্ত বুক পেরিয়ে উদরে হালকা অ্যাবসের রেখা ইরামকে বিমোহিত করে ফেলল। পরক্ষণেই রমণী লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। প্রতিবাদস্বরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিল সে কিন্তু পারলনা। সাইবান ডাইভ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলের ভেতর। ছলকে উঠল পানির স্রোত। লাফিয়ে উঠে কোনমতে কোল থেকে ল্যাপটপটা সরাতে পারল ইরাম। পানির ঝাঁপটা ছুটে এসে তার সমস্ত শরীরকে সিক্ত করে ফেলল মুহূর্তেই।
“আলাদিন!”

অস্ফুট চিৎকার করে ইরাম উঠে পড়তে চাইল। কিন্তু পুলের ভেতর থেকে পা দুটো বের করার আগেই নিচ থেকে কিছু একটা টেনে ধরল তার গোড়ালি। আতঙ্কে চাপা আর্তনাদ করে বসল ইরাম। পা ঝাঁকাল। লাভ হলনা। ভীষণ শক্ত হাতের বাঁধন। অতঃপর হুট করে পানির নিচ থেকে ভেসে উঠল সাইবানের মুখখানি। ভিজে চুলগুলো কপালে আর ঘাড়ে লেপ্টে গিয়েছে। উজ্জ্বল মুখে জ্বলজ্বল করছে পানির ফোঁটা। আইব্রো পিয়ার্সিং কাঁপছে খানিক। ইরামের পা দুটো নিজের হাতে জড়িয়ে রেখেছে সে। বিহ্বল হয়ে চেয়ে রইল অর্ধাঙ্গিনী তার। সাইবান সেই দৃষ্টি লক্ষ্য করে তীর্যক হাসল। তার চোখের নিগূঢ় দৃষ্টি ইরামের সমস্ত শরীরে বেহায়াভাবে ঘুরপাক খেল। পানি ছলকে ওঠার কারণে ইরাম ভিজে গিয়েছে। পরিধানের লিনেনের জামা শরীরে লেপ্টে গিয়েছে। হালকা ভেজা চুলগুলো কাঁধের দুপাশে ঝুলছে। টপটপ করে গড়াচ্ছে পানির ফোঁটা, মুক্তার মতন। উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকে পানির ফোঁটাগুলো দেখাল অলংকারের মতন। ইরামের পায়ে অজান্তেই হাত আরো চেপে বসাল সাইবান।

“ক…কি করছ? পা ছাড়ো।”
ইরাম ধমক দেয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির গভীরতা তার কণ্ঠকে নরম করে ফেলল। সাইবান শুধু হাসল। অতঃপর ঝুঁকে ইরামের ডান পায়ের বৃদ্ধায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। শিউরে উঠল ইরাম। সজোরে টান মারল পা, কিন্তু ছাড়াতে পারলনা। উল্টো সাইবান আরও শক্ত ভাবে চেপে ধরে ধীরে ধীরে ভেজা ঠোঁট বুলিয়ে গেল তার পায়ের উপরিভাগে।
“কি সুন্দর হাসেন আপনি! একদম নূপুরের ঝংকারের মতন। কিন্তু সেই হাসি অন্য কারো কলিজা ছুঁয়ে গেলে আমাকে যে সেই কলিজা কেড়ে নিতে হবে, প্রেশিয়াস!”
ত্বকের বিপরীতে সাইবানের ফিসফিস ইরামের সমস্ত শরীরে অদ্ভুতুড়ে আবেগের তরঙ্গ খেলিয়ে দিল। অজান্তেই পায়ের আঙুলগুলো কুঁকড়ে গেল তার। সাইবান নিরেট চোখে দেখল তার প্রতিটা প্রতিক্রিয়া। আপনমনে হাসল। ধীরে ধীরে ঠোঁট ছুঁয়ে উঠে এলো ইরামের হাঁটুতে। দুহাত প্রেয়সীর কোমরে জড়িয়ে সটান কাছে টেনে নিল নিজের।
“অন্য কারো জন্য মেয়ে খুঁজতে হবে কেন? স্বামীর জন্য খুঁজুন। আছেই তো আপনার স্বামী, প্রফেশনাল হাসবেন্ড।”

ইরাম ভ্রু কুঁচকে নিচের দিকে তাকাল। একটি কাঁপা কাঁপা হাত তুলে সাইবানের ভেজা গাল ছুঁয়ে দিল। স্বামী তার তৎক্ষণাৎ মাথা ঘুরিয়ে তার হাতের তালুতে ঠোঁট ছুঁয়ে অজস্র চুমু আঁকতে লাগল। ইরামের শিরদাঁড়া বেয়ে বুঝি শিহরণ খেলে গেল। সে বলল,
“আমি একটু হাসলে দোষ। আর তুমি যে শত শত প্রেম করে বেরিয়েছ, তার বেলা?”
থমকাল সাইবান। চট করে মাথা ঘুরিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর অভিমানী মুখের দিকে তাকাল। সূক্ষ্মতর এক হাসি ছুঁয়ে গেল তার সিক্ত ঠোঁটে। নিজেকে খানিকটা টেনে তুলে মুখোমুখি হলো সে ইরামের। একটি হাত বাড়িয়ে স্ত্রীকে এতটাই কাছে টেনে নিল যে অর্ধভেজা ইরাম এবার পুরোপুরি ভিজে গেল।
“জেলাস, মাই প্রেশিয়াস?”
নাক ফুলিয়ে ইরাম জানাল,
“জেলাস? জেলাস তো তুমি। হুটহাট কারণ ছাড়াই মাথার তালু ফট করে জ্বলে ওঠে। হ্যান্ডশেক করলে সমস্যা, হাসলে সমস্যা, কথা বললে সমস্যা। কোনদিন না যেন বলো, শ্বাস নিলেও সমস্যা।”
“ইস! ওটা ক্রিঞ্জ। শ্বাস আটকে রাখলে আমি অনুমতি দিতে দিতে যদি টপকে যান? না বাবা, আমি আবার আলগা পিরিত দেখিয়ে রিস্ক নিতে পারবনা।”

ইরাম না পারতে হেসে ফেলল। আর সঙ্গে সঙ্গে সাইবান তাকে হ্যাঁচকা টানে পুলের ভেতর নামিয়ে ফেলল। স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে ভারসাম্য রক্ষা করতে বাধ্য হলো রমণী। পানি ছিটকে ভিজিয়ে ফেলল তার সমস্ত চুল। সেই ভেজা চুলের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে গেল সাইবানের আঙুল। ইরামের মুখটা নিজের কাছে টেনে তার গালে গাল ঘষে সে গভীর গলায় বলল,
“কিন্তু তাই বলে ভাববেন না আমি পজেজিভ না। বিয়ের আগেই তো বলেছি, আপনার মনের ভেতরের বন জঙ্গল, ভোম্বল সব সাফ করে ফেলব।”
“আর তোমার মনের ভেতরের বাঁশবাগানের কি হবে?”
খিলখিল করে হাসল সাইবান। ইরামকে চেপে পরিপূর্ণভাবে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল। তার ত্বকের উত্তাপ রমণীকে ছুঁয়ে যাচ্ছে দারুণভাবে। বাতাসে শীতলতার রাজত্ব থাকলেও চারিদিকে টের পাওয়া যাচ্ছে শুধু উষ্ণতা। হলদেটে বাতি টলটলে পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে মোহনীয়ভাবে। ইরাম অনুভব করল, তার শ্বাস প্রশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। নিজেকে ছাড়ানোর আর চেষ্টা সে করলনা। দুহাত অজান্তেই সাইবানের খোলা পিঠে বিচরণ করতে আরম্ভ করল। তাতে স্বামীর শরীরের হালকা কাঁপুনি স্পষ্ট টের পেল সে। পরক্ষণেই তার কানের নিচে ছুঁয়ে গেল সিক্ত কোমল ঠোঁটজোড়া, ফিসফিসিয়ে বলল,
“কুড়াল তো আপনার হাতেই। নেমে পড়ুন আর উজাড় করুন।”

ইরাম প্রত্যুত্তর করার সুযোগ পেলনা আর। সাইবানের তৃষ্ণার্ত ঠোঁটজোড়া মুহূর্তেই তার ঠোঁটের মাঝে ডুব দিল। নিজের পায়ের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল ইরাম। ভাবল, সে বুঝি পুলের ফ্লোরেই পড়ে যাবে। কিন্তু পড়লনা, উল্টো অনুভব করল তার পা দুটো পানির গভীরে ভাসছে উন্মুক্তভাবে। সাইবান তাকে কয়েক ইঞ্চি উঁচিয়ে ধরে রেখেছে। ওই অবস্থায়ই তাকে নিয়ে পুলের পানিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সাইবান। দুজনের শরীর ভাসল পানির উপরিভাগে। না পারতে চোখ মেলল ইরাম। নীলচে পানির ভেতরে দেখতে অনেক অসুবিধা হলেও সে রীতিমত জোর করেই দেখল সাইবানের মুখখানি। কি নির্মল শান্তি তাতে খচিত। সেও চোখ মেলে দেখল নিজের স্ত্রীকে। পানির বুদবুদ উঠল চারিদিকে। ফুসফুসে বাতাসের অভাব দেখা দিল। তবুও যেন কারোরই ইচ্ছা হলনা এই জাদুকরী সময়টাকে রুখতে।
অতঃপর হুট করেই ইরামের চোখের সামনে ভেসে উঠল আবদ্ধ কক্ষ। লোহার শিকল, বেডপোস্টের সঙ্গে বেঁধে রাখা হাতের কব্জিতে গাঢ় কালশিটে। কি নিদারুণ যন্ত্রণা। তীব্র চিৎকার, আহাজারি। সমস্ত শরীরে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়। খেই হারাল মন তার। সমস্ত জাদু ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ইরাম ঝটকা দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পানি থেকে উঠে পড়ল। কাশতে কাশতে পুলের পাশের রেলিং চেপে ধরল। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল, হাঁপানি রোগীর মতন। সাইবান পরপরই উঠে এলো। চটজলদি পিছন থেকে এসে ইরামকে ধরল,
“কি হয়েছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে?”

ইরাম উত্তর করলনা। সাইবানকে তাতে ভীষণ আতঙ্কিত দেখাল। পুল থেকে উঠে পড়ল সে। ইরামকে টেনে উঠিয়ে বসাল মারবেল পাথরের উপর।
“আমি আসছি।”
বলেই সে চলে যাচ্ছিল তোয়ালে আর শুকনো পোশাক নিয়ে আসতে। কিন্ত পিছন থেকে হুট করে ইরাম তার কব্জি চেপে ধরল।
“যেও না। আমার কাছে থাকো।”
সাইবান জমে গেল। পরমুহূর্তে একটি নিঃশ্বাস ফেলে নিচে বসে পড়ল। ইরামকে টেনে বসাল নিজের কোলে। আষ্টেপৃষ্টে আগলে ফেলল নিজের বুকের মাঝে। ইরাম এবার বাঁধা দিলনা। বরং পাল্টা জড়িয়ে ধরল শক্তভাবে, যেন এই পৃথিবীতে সাইবানই তার একমাত্র ভিত্তি। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললনা। সাইবান নিঃশব্দে ধরে রাখল ইরামকে। সময় দিল। পিঠে হাত বুলিয়ে গেল, কপালে, গালে ছোট ছোট স্নেহের চুমু খেল বারংবার। যদি প্রিয়তমার একটুখানি শান্তির কারণ হওয়া যায় তাতে!
দীর্ঘক্ষণ পর মুখ খুলল ইরাম। সাইবানের কাঁধে মাথা রেখে অদূরপানে ফাঁপা দৃষ্টি ফেলে সে বলল,
“তুমি কাছে এলে আমার শুধু অরণ্যর কথা মনে পড়ে।”
সাইবান বরফ হয়ে রইল। ইরাম নিজের বুকের বিপরীতে তার তীব্র হৃদস্পন্দন টের পেল। তবুও সে বলল,
“আমি একটা ভাঙাচোরা মানুষ, আলাদিন। আমি হয়ত তোমাকে সেই সুখ দিতে পারবনা যেটা তুমি ডিজার্ভ করো। বারবার আমার অতীত আমায় স্মরণ করিয়ে দেয়, কতগুলো টুকরোয় ভেঙেছি আমি। আ’ম সরি, মাই আলাদিন।”

সাইবান ইরামের কথাগুলো শুনে গেল একমনে। ইরাম আজ থেমে নেই, সে গড়গড় করে বলে গেল,
“আমি জানিনা আমাদের সুখের সময়ের দীর্ঘায়ু কত হবে। মেনে নিতে গেলেই বারবার হাজারো আতঙ্কের বাঁধা বুকের ভেতর হানা দেয়। যদি সত্যিই আমাদের সুখের সংসার হয়, তবে তার স্থায়িত্ব কতটুকু? যদি কোনোদিন তোমার মনে হয়, আমি আর যথেষ্ট নই? যদি কখনো আমাদের ভেতরকার অনুভূতি কমে যায়? যদি কখনো তোমার মনে হয়, ইযানকে তুমি আর মানতে পারছনা? যদি কখনো তোমার নিজের সন্তান দুনিয়ায় আসে, তবে তুমি আমার বাচ্চাটাকে আর সমান স্নেহের চোখে দেখতে না পারলে? যদি কোনোদিন তোমাকে আঘাত দিয়ে ফেলি? যদি…যদি! আই অ্যাম সো প্যাথেটিক! সো সেলফিশ!”
সাইবানের কাঁধে মুখ গুঁজে রইল ইরাম। শরীর কাঁপল তার আবেগের তোড়ে। অথচ সাইবান শান্ত। ইরামকে কথা শেষ করে ধাতস্থ হওয়ার সময় দিল সে। অতঃপর দুই হাতের আজলায় ইরামের মুখটা তুলে ধরল সে, নিজের চোখে চোখ মিলিয়ে নিগূঢ় কন্ঠে বলল,
“ইরাম, আমি অরণ্য নই।”

একটা গভীর বাক্য, ইরামের অন্তরে দোলা দিতে যথেষ্ট। বিয়ের প্রথম থেকেই তার হৃদয় অজান্তেই সাইবানকে ওই মানুষটার সাথে তুলনা দিয়ে এসেছে। অথচ আজ, সরাসরি এই বাক্যটা ইরামের সমস্ত সংশয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল। সাইবান ঝুঁকে এসে তার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল,
“যদি পারতাম তবে নিজেকে বিকিয়ে হলেও আপনার অতীত মুছে দিতাম। আমি জানি, আপনি কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। কারণ এই অতীত আপনার অংশ। এই অতীত ছাড়া আপনি আর আপনি থাকবেন না, না থাকবে আমার পোটলার অস্তিত্ব। তবে আমি আপনাকে কথা দিতে চাই, এই সংসার ময়দানে আমি আপনার সকল যদি – কিন্তু ঘুচিয়ে দেব। কে এলো, কে গেল, কি অতীত, কি ভবিষ্যৎ আমি জানিনা। আমি শুধু জানি বর্তমানকে। আমার বর্তমান আপনি আর পোটলা। ব্যাস, এটুকুই চাই আমার। থেকে যান আপনারা জনম জনম, একান্ত আলাদিনের হয়ে।”

ইরামের চোখে অশ্রুফোঁটা টলটল করে উঠল। সাইবান তার কপালে ঠোঁট স্পর্শ করে মৃদু কন্ঠে বলল,
“অনুভূতি কমে গেলে আমি আবার গড়ে নেব। প্রতিদিন নতুনভাবে আপনাকে কাছে চাইবার কারণ খুঁজে নেব। নতুন কেউ জীবনে আসলে শুধু আমার সুখের পরিবারটা একটুখানি বড় হবে, আর কিছু বদলাবে না। পোটলা আমার পোটলাই থাকবে। আমার মুখ বরাবর লাথি দিয়ে ঠিকই নিজের রাজত্ব কায়েম করে রাখবে, দেখে নেবেন আপনি। আর সবশেষে, আমি শুধু আপনাদের হয়েই থাকব। চড়াই উৎরাই সব পেরিয়ে ঠিকই আমি নীড়ে ফিরব। আপনার আঁচলের তলায় শান্তি খুঁজব, পোটলাকে বুকে জড়িয়ে চিন্তাহীন ঘুমাব। জগৎ যেখানে শেষ, সেখানে থেকে যাব আমি, আপনি আর আমাদের অংশ। আপনি সময় নিন, ইহকালের সমাপ্তি অব্দি আমি অপেক্ষমাণ থাকব।”
ইরাম চোখ বুঁজে ফেলল। সাইবানের কথাগুলো তার কানে সুধবর্ষণ করল বুঝি। দীর্ঘক্ষণ বাদে অবশেষে সাইবান নিজেকে ছাড়িয়ে উঠতে গেল,

“আপনি বসুন। আমি টাওয়েল আর জামা নিয়ে আসছি।”
উঠে দাঁড়াতে গেলেও সাইবান উঠতে পারলনা। হুট করে ইরামের লতানো দুহাত জড়িয়ে গেল তার কোমরে। সটান টেনে ফেলে দিল মার্বেল পাথরের উপরে। সাইবান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। নিজের বুকে ইরামের অস্তিত্ব টের পেল। হতবাক হয়ে অর্ধাঙ্গিনীকে দেখল সে। ওই টলটলে চোখের মাঝে আর কোনো সংশয় নেই। সেখানে শুধু প্রগাঢ় আবেদন। ইরাম মুখ নামিয়ে সাইবানকে দেখল। তার একটু আঙুল ছুঁয়ে গেল স্বামীর মুখমন্ডলে, পরখ করে দেখল বুঝি প্রতিটি গঠন। একটি ঢোক গিলল ইরাম, চোখে চোখ মিলিয়ে মোহনীয় কন্ঠে জানাল,
“আলাদিনকে ছাড়া এই জীবন নদীর নৌকা ইরাম একলা বাইতে পারবেনা। এখন যে ইরামেরও তার আলাদিনকে চাই, একান্ত নিজের করে।”

সাইবানের চোখজোড়া সিক্ত হয়ে উঠল, তবে অশ্রু গড়ালনা। তীব্র অনুভূতি ভাসাল সমস্ত হৃদয়। ঝুঁকে এলো ইরাম। এবার দ্বিধাহীন নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল সাইবানের কম্পিত ঠোঁটে। দুলে উঠল বুঝি গোটা জগৎ। আবারও টের পেল ইরাম, অতীতের নিকষ কালো আঁধারের অস্তিত্ব। কিন্ত এবার নিজের মনের বিরুদ্ধে লড়াই করল সে। সাইবানের হাতের আঙুলের মাঝে নিজের আঙুল জড়িয়ে ফেলল শক্তভাবে। সমর্পণ করল নিজেকে, ধীরে ধীরে, ভরসার আশ্রয়ের মাঝে। অর্ধাঙ্গিনীকে সযত্নে আগলে নিল সাইবান। নিজের বুকে জড়িয়ে করল বিনিময়। ঢেউয়ের মতন কয়েক সারি হাওয়া এসে দোলা দিয়ে গেল তাদের। তবে এবার, বাঁধার দেয়াল তুলতে পারলনা কেউ। না অতীত, না প্রকৃতি। সাইবান ইরামকে এত যত্ন নিয়ে আগলে রাখল, যেন মোমের পুতুল সে। স্বামীর আদরের ছোঁয়ায় ইরাম ক্ষণিকের জন্য ভুলেই গেল বাইরের গোটা জগৎটাকে। তার কানে শুধু বাজল মাদকীয় স্বর,
“লাভ ইউ… মাই প্রেশিয়াস।”

মসৃণ সড়ক ধরে এগিয়ে আসছে অনুরাগ। এক হাতে স্ট্রলার ঠেলছে সে, ভেতরে ঘুমন্ত ইযান। অপর হাতে সৈকত থেকে ফেরার পথে সবার জন্য কিনে আনা রাতের খাবারের প্যাকেট। তার পাশাপাশি হাঁটছে সুগন্ধা। মেয়েটাকে কিছুক্ষণ আগে একটা কুলফি কিনে দিয়েছে সে। সেটাই বেশ মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে আর ধীরগতিতে হাঁটছে। মাথা কাত করে একনজর মেয়েটাকে দেখল অনুরাগ। রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে চাঁদের আলো এসে পড়ছে মেয়েটার উপর। তার দীঘল চুলের বেণী দোল খাচ্ছে বাতাসে। অনুরাগ চোখ ফিরিয়ে নিল। অতঃপর নীরবতা ভেঙে বলে উঠল,
“তো…পড়াশোনা শেষ করে কি করার প্ল্যান?”
সুগন্ধার মাঝে ভাবান্তর হলোনা। কুলফি মুখে ঢুকিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে। হাজার তারা মিটমিট করে জ্বলছে নিভছে। কুলফি বের করে সে জানাল,
“আম্মাজান যা বলবে তাই।”
অনুরাগ খানিকটা বিস্মিত হলো।
“সামিয়া আন্টি কেন বলবে? তোমার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা নেই?”

“আম্মাজানের ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। যদি বলে চাকরি করতে, করমু। যদি বলে বিয়া বসতে, বসমু।”
হতবিহ্বল না হয়ে পারলনা অনুরাগ। অজান্তেই স্ট্রলারে তার আঙুল খানিকটা চেপে বসল।
“ওরা তোমাকে পড়ালেখা করাচ্ছে শিক্ষিত হয়ে যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারো। কিন্ত তোমার বক্তব্য শুনে হতাশ না হয়ে পারলাম না।”
অনুরাগের বক্তব্যে একটুখানি হাসল সুগন্ধা। কুলফি শেষ করে ফেলেছে সে। তবে কাঠিটা হাতেই রেখে দিল। হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“শিক্ষিত হওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ান ওইসব মুখে বলাই সহজ অনুরাগ দা। জগৎটা আমার মতন অনাথ মানুষদের জন্য ভয়ংকর। মাইয়া হইলে তো কথাই নাই। ভাবীজানরেই দেইখা লন। নিজের সামর্থ্যবান ভাই থাকা সত্ত্বেও কি কষ্টটাই না করতে হইল। আর আমি তো কোন কদু! আম্মাজান কোনোদিন নিজের মাইয়া আর আমার মধ্যে ভেদাভেদ করেনাই। বাড়ির কাজের মাইয়াকেও এত আদরে মাথায় তুইলা রাখা যায়, কেউ বিশ্বাস করবনা। নিজের সাথে না হইলে আমিই বিশ্বাস করতাম না। ওই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের উপর আমার ঋণ আছে। সেই ঋণ এক না একভাবে তো শোধ করতেই হইব।”
অনুরাগের বিস্ময় কমে এলো। মেয়েটাকে দেখতে শুনতে দুরন্ত মনে হলেও বাস্তবিক জ্ঞান নেহায়েত কম নয়। সে জিজ্ঞেস করল,

“ধরো কোনোদিন সামিয়া আন্টি তোমাকে এমন কিছু করতে বলল যা তোমার পছন্দের বিরোধী। তখন?”
সুগন্ধাকে ভাবুক দেখাল। বেশ কিছু মুহূর্ত বাদে সেই ভাবুকতা কাটিয়ে পরিহাসের অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। সে বলল,
“ওনারা আমার অভিভাবক। তাই ওনারা যা বলবে তাই করতে আমি বাধ্য। ওনারা কখনো আমার খারাপ চায়না।”
এই জবাবের পর হয়ত আর বলার কিছু থাকে না। অনুরাগও তাই বেশি কথা বাড়ালনা। ভিলার কাছে পৌঁছে গিয়েছে তারা। গেটটা একেবারে চাপানো ছিল। তারা ঢুকতেই সমস্ত উঠান ফাঁকা দেখা গেল। ভেতরেও খাঁ খাঁ শূন্যতা।
“বাবুরে আমার কাছে দেন। ফ্রেশ হইয়া আসেন, আমি খাবার বাড়তেসি। ওহ, ভাইজান আর ভাবীজান মনে হয় রুমে আছে, ওনাগো ডাক দিয়েন।”
বলে স্ট্রলার ঠেলে সাবধানে ভেতরে চলে গেল সুগন্ধা। অনুরাগও নিজের রুমে গেল। হাতমুখ ধুয়ে পোশাক বদলে হলে ফিরে আসতেই সে দেখল সুগন্ধা ইতোমধ্যে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলেছে। ইযানের স্ট্রলার একপাশে রাখা। অনুরাগ টেবিলের কাছে এগোতে এগোতে গলা চড়িয়ে ডাকল,
“কইরে? সাইবান? খেতে আয়।”

তার দরাজ কন্ঠস্বর দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। তবে এর বিপরীতে কোনো জবাব এলোনা। চেয়ার টেনে অনুরাগ বসতেই সুগন্ধা খাবার বেড়ে দিতে লাগল। এমন সময়েই পদশব্দ ভেসে এলো। উভয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসেছে সাইবান। পরিধানে টাইট ফিটিংয়ের ফুলহাতা টি শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার। কালো চুলগুলো ভেজা, কপালের চারপাশে লেপ্টে আছে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়াচ্ছে এখনো, হয়ত মাত্র গোসল সেরেছে। কাউকে কিছু না বলে একদম নিঃশব্দে এগোল সাইবান।
“কিরে? বৌদি কোথায়?”
অনুরাগ প্রশ্ন করতেই সাইবান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“পা ব্যথা করছে বললেন। তাই রুমে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তোরা এখানে খা, আমাদের খাবারটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। আর জরিনার আম্মা সকিনা, আমার ব্যাগে জায়গা হচ্ছিল না বলে তোর ব্যাগে কিছু পেইন কিলার রাখতে দিয়েছিলাম না? নিয়ে আয়।”

সুগন্ধা মাথা নেড়ে ব্যাগ থেকে ওষুধ আনতে চলে গেল। অনুরাগ খানিক সন্দিগ্ধ চোখে বন্ধুকে দেখে শেষমেষ কোনো মন্তব্য না করে নিজের খাবারে মনোযোগ দিল। সাইবান একটা প্লেটেই দুজনের সমপরিমাণ খাবার বেড়ে নিল। সুগন্ধা ওষুধ নিয়ে এসে পড়েছে ততক্ষণে। সেটা নিয়ে সাইবান এগোল। অপর হাতে অতি সাবধানে স্ট্রলার থেকে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে খাবারসমেত হেঁটে সে চলে গেল দুই তলায়। আড়াল হলো মুহূর্তেই। সে চলে যেতেই সুগন্ধা বলল,
“ভাইজানরে একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা দেখাইল মনে হয়? কাইজ্জা মাইজ্জা করলনা!”
অনুরাগ একগাল হাসল। হাত বাড়িয়ে অপর একটি চেয়ার টেনে বলল,
“খেতে বসো, সুগন্ধা।”

সুন্দর স্বপ্ন কি জিনিস ইরাম ভুলেই গিয়েছিল। দিনের পর দিন তার কেটেছে শুধু দুঃস্বপ্ন দেখে। অথচ আজ, এত চমৎকার একটি সুখের স্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরেই তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ল। স্বপ্নে ইরাম, ইযান আর সাইবান তিনজন মিলে বিদেশযাত্রা করছিল। প্লেনে উঠেই কি নাটকীয় কাজকারবার করল সাইবান! তাই দেখে ইরাম ঘুমের মাঝেও হেসে কুটিকুটি। অথচ সাধের ঘুমটা তার বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা। অদ্ভুত কিছু শব্দে তার পাতলা ঘুম ভেঙে গেল। মিটমিট করে চোখ মেলে তাকাল ইরাম। নতুন একটি সকাল হয়েছে। জানালা গলে স্বর্ণাভ রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। ঘুম থেকে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে কিছু মাথায় খেলে না। কিছুটা সময় লাগে। ইরামেরও লাগল। মাথা ঘুরিয়ে বিছানার অপর পাশটা ফাঁকা পেল। ইযান তার হাতের নাগালেই একটা কাঠের ক্রিবে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। তাদের বাচ্চা আছে বিধায় ভিলা কর্তৃপক্ষের তরফ থেকেই এই আসবাব সরবরাহ করা হয়েছে। গত রাতে একবার শুধু উঠেছিল ইযান, খাওয়ার জন্য। এছাড়া সারারাত ঘুমিয়েছে। ঘুরে বেড়িয়ে সেও হয়ত ক্লান্ত। ভাবনার মাঝেই অদ্ভুত শব্দগুলো আবারও কানে গেল ইরামের। এবার নিশ্চিত সে। বাথরুমের ভেতর থেকে আসছে। গায়ের চাদর সরিয়ে উঠে বসতে চাইল ইরাম। তৎক্ষণাৎ শরীরে ব্যথার তরঙ্গ ছড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে চোখ বুঁজে ফেলল সে। পরক্ষণেই আবার সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। চাদর সরিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে।
ইযানের কপালে চুমু দিয়ে সে এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। দরজাটা হালকা চাপানো। ইরাম আলতো কন্ঠে ডাকল,

“আলাদিন?”
জবাব এলোনা। শব্দগুলো আবার হলো। ঘুম কেটে যাওয়ায় এবার স্পষ্ট বুঝল ইরাম। বমি করার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে সকল প্রফুল্লতা গায়েব হলো তার। দরজা ঠেলে বাথরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে। যা দেখল তাতে তার সমস্ত শরীর হীম হয়ে গেল। বাথরুমের বেসিন আঁকড়ে ধরে ঝুঁকে আছে সাইবান। সমস্ত শরীর কাঁপছে তার। থেকে থেকে বমির কারণে গা গুলিয়ে উঠছে ছেলেটার। ইরাম দৌঁড়ে গেল। পিছন থেকে সাইবানের পিঠ আঁকড়ে ধরে জোর গলায় চিৎকার করে উঠল,
“অনুরাগ! সুগন্ধা!”

আমার আলাদিন পর্ব ৫৪

তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা সন্দেহ আছে বিধায় ইরাম দৌঁড়ে গিয়ে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আরেক দফায় ডাকাডাকি করে ফিরে এলো। সাইবান ততক্ষণে দূর্বল হয়ে পড়েছে। বেসিনের হাত চেপে ঝুলছে। ইরাম তাকে চেপে ধরল, মাথার চুলে আঙুল গলিয়ে শক্তভাবে ধরে রাখল যেন ঠাস করে মাথায় বাড়ি না খায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জোরালো পদশব্দ ভেসে এলো। দরজার কাছে উদয় হলো অর্ধঘুমন্ত সুগন্ধা। তাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকল অনুরাগ। অন্যদের চিন্তিত মুখের সামনে অনুরাগকে দেখাল বেশ হাস্যোজ্জ্বল। বাথরুমের ভেতরে পা রেখেই সে খেঁকিয়ে বলল,
“গেছে গেছে? প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে?”

আমার আলাদিন পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here