অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৫
রুপা
আর্য পুষ্পকে রুমে নিয়ে এসে ভিতর থেকে দরজা লক করে দেয়। পুষ্প ভেবেছিল, রুমে যেহেতু এসেছে এবার ছেড়ে দেবে; কিন্তু পুষ্পর ভাবনা অনুযায়ী কিছুই হলো না। আর্য পুষ্পকে দাঁড় করিয়ে হাত-পা চেক করতে লাগল কোথাও লেগেছে কিনা দেখার জন্য। কোনো ক্ষত না দেখে এবার অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল—
– ফ্লাওয়ার, কোথাও চোট পেয়েছো? লেগেছে কোথাও?
পুষ্প অবাক হয়ে যায়, এরকম অশান্ত-অস্থির আর্যকে সে কোনোদিন দেখেনি। তার জন্য এতটা অস্থির কবে থেকে হওয়া শুরু করলেন সরকার সাহেব? পুষ্পকে চুপ করে থাকতে দেখে আর্য এবার আকুল স্বরে সুধালো—
– “হোয়াই ডোন্ট ইউ টক টু মি, ফ্লাওয়ার? স্পিক আপ প্লিজ, কথা বলো আমার সাথে!
বলতে বলতে তুসকের আরামদায়ক সোফায় বসে পড়ল আর্য। তারপর এক টানে পুষ্পকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিয়ে আরও শক্ত করে সাপের মতো পেঁচিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। রমণীর নাজুক শরীর যেন পিষে ফেলতে চাইছে, পিষে যাওয়ার উপক্রম হয়ও। রমণী ছাড়া পাওয়ার আশায় মোচড়ামুচড়ি শুরু করে। এতে আর্যর বিরক্ত হয়, আর্য এবার কোনো সতর্কতা ছাড়াই পুষ্পর গলায় মুখ গুঁজে দিল। সাথে সাথে পুষ্প স্থির হয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হীম স্রোত নেমে গেল। আর্যর গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে রমণীর স্পর্শকাতর চামড়ায়, রমণী হাঁসফাঁস করে উঠল। এরকম কেন করছেন সরকার সাহেব? কিছুই বুঝতে পারছে না পুষ্প।
আর্যর ছোঁয়ায় ঈষৎ কেঁপে কেঁপে উঠছে পুষ্প, আর্য ব্যাপারটে টের পায়। কিছু বলে না, সে যেন কোনো ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। মিষ্টি মেয়েলি ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রের ভিতরে প্রবেশ করছে স্নায়ুতে। আর্য আরও গভীরভাবে নাক ডুবিয়ে দিয়ে নিজের ভিতর টেনে নিচ্ছে সেই ঘ্রাণ। আর্য পুষ্পকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে নিজের বুকের সাথে, যেন একটু আলগা হলেই আবারও হারিয়ে যাবে তার ফ্লাওয়ার। আর্য এবার রমণীর কানের কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে কানের লতিতে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ায়। আর্যর এরকম অতর্কিত ছোঁয়া পেয়ে রমণীর অবস্থা বেশ শোচনীয় হয়ে পড়ছে। যার কাছ থেকে সবসময় অপমান, অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, কটু বাক্য শুনে এসেছে, হঠাৎ তার এরকম আচরণ অদ্ভুত লাগছে। লাগারই কথা। পুষ্প নিজের শরীরের জোর খাটিয়ে উঠতে চাইল, তবে উঠতে ব্যর্থ হলো। হবে নাই বা কেন? আর্যর শক্তির সাথে পেরে ওঠার সেই শক্তি কি আছে? আর্যর শক্তির কাছে পুষ্পর শক্তি পিঁপড়ার সমান।
পুষ্পর মোচড়ামুচড়ির মাঝে সে বলে উঠল—
– ছাড়ুন আমাকে!
কথাটা শুনে আর্য ছাড়ার বদলে হাতের বাঁধন আরও কিছুটা শক্ত করে জবাবে শান্ত কণ্ঠে বলল—
– এইটা ছাড়া অন্য কিছু বলো, এই জীবনে সেটা সম্ভব না!
আর্যর কথা শুনে পুষ্পর মাঝে ভাবাবেগ দেখা গেল না, সেও শান্তভাবে বলল—
– জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই!
আর্য অদ্ভুতভাবে হাসল, তবে সেই হাসি রমণীর অগোচরেই রয়ে গেল—
– এটা স্রেফ একটা কথার কথা, ফ্লাওয়ার। তুমি যেটা শুনেছো, টিচার যেটা শিখিয়েছে সেটাই জানো; তবে জীবনে অনেক কিছু আছে যেটা অসম্ভব। তার মধ্যে একটা হচ্ছে আমার পক্ষে তোমাকে ছেড়ে থাকা, অসম্ভব।
আর্যর কথা শুনে রমণীর কী হলো কে জানে, সে আজকে চুপ করে রইল না বরং শান্তভাবে উত্তর দিল—
– আপনি আমাকে ধরেছেন কবে যে ছাড়ার প্রশ্ন আসছে? আমি শুরু থেকেই আপনার ছিলাম না, তাই ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। আপনি শুরু থেকে কোনোদিন চাননি এই সম্পর্ক, সবসময় আমাকে দোষ দিয়ে এসেছেন অথচ আমি আমার দোষ কী ছিল সেটা ও জানতাম না। আপনি সবসময় আমার থেকে, এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চেয়েছেন। চিন্তা করবেন না, আপনি খুব শীঘ্রই মুক্তি পেতে চলেছেন। ফুফুমনি ডিভোর্স পেপার রেডি করিয়েছেন, আপনি সাইন করলেই হয়ে যাবে।
এতক্ষণ ধরে পুষ্পর কথা মন দিয়ে শুনছিল আর্য, কিন্তু ডিভোর্সের কথা শুনে মুখের আদলে পরিবর্তন আসতে শুরু করে, চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। এতক্ষণ ধরে আবেগভাসানো চোখের নরম দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, রাগ যেন ধপধপ করে মাথায় চড়ে বসল। পুষ্পর গলা থেকে মুখ তুলে পুষ্পর মুখের দিকে তাকায় আর্য। অবাক হয়, পুষ্পর মুখে কোনো অনুভূতি নেই, খারাপ লাগার রেশমাত্র নেই, একদম শান্ত-নির্বিকারভাবে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা দেখে আর্য দুই হাতে পুষ্পর মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে পুষ্পর চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বলল—
– “আমি সাইন করলেই হয়ে যাবে মানে কী? তুমি সাইন করেছো ডিভোর্স পেপারে?”
পুষ্প কোনো জবাব দিল না, একদম চুপ করে রইল। সে ডিভোর্স পেপার চোখেও দেখেনি, সাইন কীভাবে করবে; কিন্তু সেটা বলল না, নির্বিকারভাবে বসে রইল। যেটাতে আর্যর রাগের পারদ থরথর করে বাড়তে লাগল। এই মেয়ে চুপ করে আছে মানে সাইন করেছে! নাহ, না, তার রেগে গেলে চলবে না, তাকে শান্ত থাকতে হবে। এই রাগের জন্যই সে সব হারাতে বসেছে। আর্য নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করে এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “ফ্লাওয়ার, এই প্রথম, এই শেষবারের মতো বলছি, তুমি দ্বিতীয়বার ডিভোর্স পেপার ছুঁয়েও দেখবে না। আম্মু ভাবছেন ওই ঠুনকো একটা কাগজ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করবে? কোনোদিন না!”
আর্য এবার সরাসরি পুষ্পর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত কিন্তু নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—
– “আচ্ছা ফ্লাওয়ার, সত্যি তুমি চাও আমার থেকে আলাদা হতে?”
পুষ্প শুরু থেকেই কোনোদিন ডিভোর্স চায়নি, কারণ তার মনে গেঁথে আছে ছোটবেলায় বলা দাদির একটা কথা—বিয়ে একবারই হয়, মেয়েদের বিয়ের পর স্বামী হচ্ছে মেয়েদের সব। তাই সেও দাদির সেই কথা মন থেকে মানে, সে সংসার করতে চায়, বিচ্ছেদ নয়। কিন্তু ফুফুমনি তাকে দুদিনে অনেক বুঝিয়েছেন—বিয়ে মানে শুধু বন্দিত্ব নয়, একজন কষ্ট দেবে আর দ্বিতীয় জন শুধু সহ্য করবে। হ্যাঁ, আগের যুগের কথা অনুযায়ী বিয়ে একবারই হয়, কিন্তু সেই বিয়েটা সুখের হতে হবে। একজন রান্না করবে আর একজন খাবে, একজন অপমান করলে তা নীরবে সহ্য করা সংসার নয়। সংসার হবে এমন, যেখানে বিশ্বাস, ভরসা, সম্মান সবচেয়ে জরুরি, ভালোবাসা থাকবে—সব মিলিয়ে সংসার হয়। তাই তিনি চান, ওনার ছেলের মধ্যে সবগুলো গুণ আছে কিনা যাচাই করতে। শুধু আর্যর মধ্যে গুণ থাকলে হবে না, পুষ্পকেও আর্যর দিকটা ভাবতে হবে। আর্য কে বুঝতে হবে! পুষ্প যেমন ওনার মেয়ের মতো, আর্যও ওনার ছেলে, তাদের দুজনকেই উনি ভালোবাসেন। একজনের দিকে ভেবে আরেকজনকে আমি কষ্ট দিতে চান না তিনি। উনি চান, আর্য আর পুষ্প দুজনেই একে অপরের সাথে যেন খুশি থাকে, একে অপরের খেয়াল রাখে। উনি না থাকলেও যেন উনি এটা ভেবে খুশি হতে পারেন, পুষ্পর জন্য আর্য আছে এবং আর্যর জন্য পুষ্প আছে। সবকিছু ভেবে আর্যকে একটু যাচাই করতে চান শেহনাজ সরকার।
পুষ্পও বারণ করেনি, তার কিশোরী অবুঝ মনও হয়তো কোথাও জানতে চায় সরকার সাহেব তাকে ভালোবাসে নাকি, আদতে কি সরকার সাহেবের মনে তার জায়গা আছে? নাকি শুধু বাধ্য হয়ে তার সাথে ভালো ব্যবহার করছে? তার যেমন বিচ্ছেদের কথা ভাবলে কষ্ট হয়, সরকার সাহেবেরও কি হয়? সব ভেবে পুষ্প সাহস সঞ্চয় করে বলল—
– “চাইবো না কেন? আপনি তো শুরু থেকে…”
– “এই একদম চুপ! বলতে দিয়েছি বলে যা ইচ্ছে বলার অনুমতি দিইনি তোমাকে! কী বললে, আলাদা হতে চাও? পারবে না আলাদা হতে। আমি হতে দেবো না তোমাকে।”
রমণীর কথা শেষ হওয়ার আগেই ধমকে উঠল আর্য। আর্যর ধমক শুনে এতক্ষণ সঞ্চয় করা সাহস যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। মুখ জোড়ে হানা দিল তীব্র ভীতি পুষ্প এবার ভীত চোখে তাকাল আর্যর দিকে। আর্য হঠাৎ পুষ্পর দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল—
– “ফ্লাওয়ার, আমি কি খুব খারাপ?”
পুষ্প কোনো জবাব দিল না। পুষ্পকে নিরুত্তর দেখে আর্য এবার গম্ভীর হয়ে নিজেই বলল—
– “খারাপ হলেও তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে! তোমার কাছে দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। নিজে থেকে থাকলে ভালো, নাহলে কীভাবে রাখতে হয়, আমার খুব ভালো জানা আছে!”
স্নিগ্ধ চলে যেতে চাইলেও যেতে দেওয়া হয়নি তাকে। শেহনাজ সরকার আর আমজাদ সরকার দুজনে জোর করেন, সাথে আছে রেশমার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল—সবকিছু মিলিয়ে স্নিগ্ধর আর যাওয়া হয়নি! পুষ্পর চিন্তায় সরকার বাড়ির কারোর খাওয়া হয়নি। এখন পুষ্পকে ফিরে পেয়ে জেনিফার সরকার আর রেশমা মিলে তাড়াহুড়ো করে সবার জন্য রান্না করে। এখন কাজের মেয়ের সাহায্যে সেগুলো টেবিলে সাজাচ্ছেন।
একে একে সবাই টেবিলে এসে বসে, শুধু আসে না আর্য আর পুষ্প দুজনে। শেহনাজ সরকার ব্যাপারটা খেয়াল করে কাজের মেয়েকে গিয়ে ডেকে আনতে বলে; কিন্তু ডেকে আসার অনেকক্ষণ পরেও তারা দুজন আসার দেখা নেই। শেহনাজ সরকার এতে আর্যর ওপর বিরক্ত হয়—দুজনের কেউই কিছু খায়নি, এখন খেতে আসা উচিত ছিল না।
উনি এবার নিজেই যান আর্যর রুমে, যদিও উনি জানেন ছেলে-বউদের রুমে নক করা ভালো দেখায় না, তাই তো কাজের মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ খেতে যায়নি তাই নিজে এসেছেন; না খেয়ে থাকলে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়বে, আর্যও কিছু খায়নি। তাই উনি দরজা নক করে আর্যকে ডাকেন, কিন্তু দরজা খোলে না। ডাকার কিছুক্ষণ পরে আর্য এসে দরজা খুলে দেয়, হাতে চিরুনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেহনাজ সরকার আর্যর হাতে চিরুনি দেখে অবাক হন, কিন্তু কিছু না বলে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
– “খাবার খেতে ডেকেছি, আসছ না কেন? তুমি খাচ্ছো না, মেয়েটাকে না খেয়ে রাখছ কেন? কাল থেকে কিছু খেয়েছে কি না কে জানে!”
মায়ের কথায় কিছু বলল না আর্য। আসলেই তো, তার ফ্লাওয়ার কিছু খেয়েছে কি না কে জানে! কিন্তু সে তো খাবার জন্যই নিয়ে যাচ্ছিল তার ফ্লাওয়ারকে, কিন্তু মেয়েটার চুল বাঁধতে গিয়ে চুল পেঁচিয়ে জট পেকে গেছে, তাই তো যেতে পারেনি। শেহনাজ সরকার আর্যকে চুপ থাকতে দেখে আর হাতে চিরুনি দেখে নিজেই রুমে ঢুকতে ঢুকতে পুষ্পকে ডাক দিলেন। ভেতরে ঢুকে অবাক হলেন শেহনাজ সরকার—পুষ্প ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে, ঘন দীগল কালো লম্বা চুলগুলো খোলা ছেড়ে দেওয়া। চুলগুলো লম্বা হওয়ার দরুন একপাশের চুল সাদা টাইলস ছুঁয়েছে। চমকানোর বিষয় হলো, আরেক পাশের চুলগুলো জট পেকে পাখির বাসার মতো হয়ে আছে এবং পুষ্প মুখ কালো করে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে, যেন চোখ দিয়ে বলছে—ফুফুমনি, তোমার ছেলের হাত থেকে আমার চুলগুলো বাঁচাও! পুষ্পর মুখ ফুলানো দেখে শেহনাজ সরকারের বড্ড হাসি পাচ্ছে, কিন্তু উনি জোর করে নিজের মুখটা গম্ভীর রাখার চেষ্টা করে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
– “একি পুষ্প! তোর চুলের এই অবস্থা কে করেছে?”
উনি এবার মুখটা আরও গম্ভীর করে আর্যর দিকে ফিরে তাকালেন। আর্যর হাতের চিরুনির দিকে তাকিয়ে বললেন—
– “তুমি পুষ্পর চুলের এই অবস্থা করেছো?”
আর্য নির্বিকারভাবে বলল—
– “হ্যাঁ, তুমি বলছ না আমি তোমার মেয়ের খেয়াল রাখি? তাই খেয়াল রাখছি!”
শেহনাজ সরকার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
– “তোমাকে খেয়াল রাখতে বলেছিলাম বলে তুমি মেয়েটার চুলের এই অবস্থা করবে? তুমি জানো চুলগুলো ওর কত শখের? আর খেয়াল রাখতে বলেছিলাম আগে, এখন তোমার থেকে সেই আশা ছেড়ে দিয়েছি আমি! তোমাকে আর কিছুই করতে হবে না!”
উনি এবার আর্যর হাত থেকে চিরুনিটা নিয়ে নিজে পুষ্পর চুলের জট আস্তে আস্তে ছাড়াতে লাগলেন। উনি আর্যকে কড়া গলার হুশিয়ারি দিলেন—
– “আজ থেকে তুমি ওর আশেপাশেও আসবে না। ওকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছি একটা সুন্দর জীবন দিতে—”
– “তো আমি কি অসুন্দর জীবন দেবো নাকি তোমার মেয়েকে?”
শেহনাজ সরকারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আর্য বলে উঠল! এবার শেহনাজ সরকারও একই ভাবে বললেন—
– “দেখেছি, এখনও দেখছি কেমন সুন্দর জীবন দিয়েছো আর দেবে!”
মা যে তার চুল আঁচড়াতে না পারা নিয়ে ইনডাইরেক্টলি খুঁটা দিলো, তা আর্যর বুঝতে অসুবিধা হলো না। পুষ্প গোসল শেষে বারান্দায় কাপড় মেলে দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল মুছছিল, এমন সময় আর্যও গোসল সেরে বেরিয়ে আসে। পুষ্পকে মাথা মুছতে দেখে সে নিজে এগিয়ে আসে এবং হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে নিজের চুল শুকিয়ে পুষ্পর চুলও শুকিয়ে দেয়। যদিও পুষ্প বারবার বারণ করেছিল, কিন্তু রমণীর কোনো বারণ না শুনেই সে চুল শুকিয়ে দেয়। এর মধ্যে খেতে ডাকতে আসে কাজের মেয়ে। আর্য পুষ্পকে নিয়ে নিচে যেতে চাইলে পুষ্প চিরুনি নিয়ে মাথা আঁচড়ানো শুরু করে। সেটা দেখে আর্য রমণীর হাত থেকে চিরুনি নিয়ে নিজে আঁচড়াতে শুরু করে। পুষ্প অনেকবার বারণ করে বলে যে সে পারবে না, কিন্তু আর্য তো আর্য—গাড় ত্যাড়া! সে পারবে এবং তার ফ্লাওয়ারের চুল নিজে আঁচড়াবে। সেই আঁচড়ানোর চক্করেই পুষ্পর লম্বা চুলগুলো পাখির বাসার মতো হয়ে যায়। এর মধ্যেই সেখানে আসেন শেহনাজ সরকার।
আর্য এবার এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত থেকে চিরুনি নিতে চেয়ে বলল—
– “দাও, তোমাকে আঁচড়াতে হবে না। চুল আঁচড়ে দেওয়ার সাথে বউকে সুন্দর জীবন দেওয়ার কী সম্পর্ক? যদি সম্পর্ক থাকে, তবে এদিকে দাও, আমি আঁচড়ে দিতে পারব আমার বউয়ের চুল। তুমি কী মনে করেছো, আম্মু? আমি চুল আঁচড়াতে পারব না? এই আব্রাহাম আর্য সরকার সব পারে!”
– “সব পারে! সে জন্যই তো আজ আমার মেয়ের চুলের এই অবস্থা হয়েছে। আর বললে না চুল আঁচড়ানো নিয়ে সুন্দর জীবন দেওয়ার কী সম্পর্ক? তাহলে শোনো, একটা মেয়েকে সুন্দর জীবন দিতে গেলে টাকার আগে লাগবে অগাধ যত্ন। সুন্দর জীবন দিতে চাইলে তার ছোট থেকে ছোট বিষয়গুলোর খেয়াল রাখতে হবে। যে এখনো একটা মেয়েকে সুন্দর জীবন দিতে কী লাগে সেটাই জানে না, সে দেবে সুন্দর জীবন!”
শেষের কথাটা বলে তাচ্ছিল্য করে হাসলেন তিনি। আর্য এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে মায়ের হাত থেকে চিরুনি নিতে চাইল, কিন্তু শেহনাজ সরকার দিলেন না। তবুও আর্য হাল ছাড়তে নারাজ, সে চিরুনি টেনে ধরে বলল—
– “আম্মু, কোনো প্রয়োজন নেই তোমার আমার বউয়ের চুল আঁচড়ানোর। একটা কথা নিয়ে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিলে! আমিও তোমাকে দেখিয়ে দেবো আমি বউকে কত সুন্দর জীবন দিতে পারি।”
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৪
– “তার জন্য তোমাকে আমি সুযোগ দিলে তো!”
এদিকে মা-ছেলের এই তর্কাতর্কির মাঝে পুষ্প বেচারি ফেসে গেছে! পেটে খিদে চোটে ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি করছে, আর মা-ছেলে দুজনে ঝগড়া করছে তার মাথা আঁচড়ানো নিয়ে। কে জানে, তাদের এই মা-ছেলের যুদ্ধের মাঝে বেচারিকে কোন বিপদে পড়তে হয়!
