দুইজনাতেই পর্ব ৪০
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
দ্বিতীর চোখের পানিগুলো আবছা শুকিয়ে এসেছে। মুখটা কেমন মলিন, বিধ্বস্ত রূপ ধারণ করেছে। এমনভাবে ঘুমিয়ে আছে যেন খুব ক্লান্ত। সাক্ষ্য কিছুটা সময় মুখটার দিকে চেয়ে থেকেই শুকনো ঢোক গিলল। পরমুহূর্তে অদিতি আহমেদের দিকে চেয়ে বলল,
“ আম্মু, আমি জানি আপনাকে দেওয়া কথা আমি রাখতে পারিনি। আমি বুঝিইনি এমন কিছু হবে। বুঝিইনি এতোটা জঘন্য ভাবে কষ্টটা আমারই কোন আপন মানুষ দিতে পারবে ওকে। আমায় কি ক্ষমা করা যায় না? মাফ করবেন না? আমি এই অবস্থায় ওকে ছেড়ে যেতে চাই না প্লিজ। ”
অদিতি আহমেদ মৃদু হাসলেন। মেয়ের কাছাকাছি এসে নরম আঁচলে মুঁছে দিলেন মেয়ের চোখমুখ। পরপরই পাতলা পিনপিনে একটা কাঁথা মেয়ের গায়ে জড়িয়ে দিয়ে গলার স্বর নিচে নামিয়ে বলল,
“ আমার মেয়েটা অনেকক্ষন কেঁদেছে সাক্ষ্য। অনেকটা সময়! কাঁদতে কাঁদতে এতোটাই বিভৎস অবস্থা হয়েছে যে আমার মেয়ের মুখটা ফুলে গিয়েছে। আমি মা হয়েই সামলাতে পারছিলাম না মেয়েটাকে। আমি মা হয়ে ও আগলে নিতে পারছিলাম না। বুঝো এই কষ্টটা? অবশ্য তোমার তো মেয়ে নেই সাক্ষ্য। বুঝবে না!”
এইটুকু বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল অদিতি আহমেদ। ফের বলে উঠলেন,
“আমার মেয়েটা এতোটা সময় কেঁদে একটু ঘুমিয়েছে। ঘুমাক সাক্ষ্য। একটু ঘুমাতে দাও। আর তোমার কাছে আমার একটাই রিকুয়েস্ট, কয়েকটাদিন দ্বিতীর সামনে এসো না সাক্ষ্য। আমি তোমায় একেবারে আসতে না করছি না। কিংবা মেয়ের সংসার ভাঙতে চাইছি এমনও না। কিন্তু মা তো! আমিই তো আমার মেয়েকে বেশি চিনতে পারব তাই না? ছোটবেলা থেকে মা বাবাকে খুব ভালোবেসেছে তো। তাই এমন একটা সত্য হুট করে শুনে, তারপর তোমাদের বিয়ের বিষয়টা নিয়েও যা শুনেছে তাতে তোমরা যতোটা সময় ওর চোখের সামনে থাকবে ততোটা সময়ই ও রিয়েক্ট করবে। ঐ যে বলল?সবাইকে ঘৃণা করে? নিজেকে ঘৃণা করে? ঘৃণাই করবে। সবটুকু স্মৃতি বারবার মনে করবে তোমরা থাকলে। অনুরোধ ধরে নাও সাক্ষ্য, চলে যাও। ”
সাক্ষ্যর গলাটা এবার বোধহয় খাদে নামল। কথা আসল না কেমন যেন। বোধহয় দুঃখ, কষ্ট আর অপরাধবোধে গলা রোধ হয়ে আসল। তবুও খুব কষ্টে বলল,
“ আন্টি..”
“ ওভাবে অসহায়ের মতো ডেকো না সাক্ষ্য। মা তো! মেয়ের দিকটাই আগে ভাবব আমি। ”
“ প্লিজ আম্মু..আপনি যেমন আপনার মেয়েকে চিনেন আমিও চিনি উনাকে। আর চিনি বলেই উনাকে এই সময়ে আমি ছেড়ে যেতে পারব না আম্মু। হ্যাঁ, ভুল আমার হয়েছে। অন্যায়টাও নাহয় আমিই করলাম ধরুন। অপরাধটাও আমি আমার কাঁধে নিচ্ছি। এর জন্য আমি হাজারবার ক্ষমা চাইব, যা বলে তাই করব। কিন্তু ছেড়ে যেতে পারছি না। প্লিজ।”
” কি চাইছো তুমি? ও এই কষ্টটা থেকে না বের হোক? দেখো সাক্ষ্য পাগলামো করবে না। তোমাকে দেখলেই সবার আগে সবটা ওর মনে আসবে। কাঁদবে। আহাজারি করবে। নিজেকে কষ্ট দিবে। আমার মেয়েটাকে আমি চিনি সাক্ষ্য..”
“ তাই বলে উনাকে এই অবস্থায় একা রেখে চলে যেতে বলছেন? ”
“ বলছি। ”
সাক্ষ্য বোধহয় ঠিক এই পর্যায়ে এসে নিজেকে সর্বোচ্ছ অপরাধের অপরাধী মনে হলো। বলে না পুরুষ মানুষের সহজে কান্না আসে না? অথচ সাক্ষ্যর এখন নিজের চুল খামচে ধরে কাঁদতে মন চাইছে। এমন কেয়ারল্যাস কি করে হলো ও? চোখ বুঝে কিছুটা সময় পর চোখ মেলতেই অদিতি আহমেদ আবারও বলল,
“ বাইরে এসো সাক্ষ্য। কথার আওয়াজে ওর ঘুম ভেঙে যেতে পারে। বাইরে এসে বসো। তোমার মায়ের সাথেও কথা আছে। ”
সাক্ষ্য উঠল না। ওভাবেই বসে রইল। অদিতি আহমেদ আহমেদ অবশ্য পা বাড়ালেন। দরজার কাছটায় এসে থেমে দাঁড়ালেন উনি। পর্দার আড়ালে সাজিয়া আফরোজকে দেখে মৃদু হাসলেন উনি। বললেন,
“ সাজি, খুশি হলি এবার? এত রাতে ছুটেই বা আসতে গেলি কেন. সৌজন্যতাবোধ দেখানোর হলে কাল আসলেও তো পারতিস। ”
সাজিয়া আফরোজ বোধহয় প্রিয় বান্ধবীর কথার ধরন ঠিকই বুঝলেন। প্রশ্স ছুড়লেন নরম গলায়,
“সৌজন্যতাবোধ?”
“ সৌজন্যতাবোধ নয় সাজি? যে সত্যটা ওকে আমরা ছোটবেলা থেকে জানতে দিলাম না। সে ছোটবেলা থেকেই ওকে দেখিয়ে এলাম, আমরা একটা সুখী পরিবার। কেন দেখালাম? যাতে ও কষ্ট না পায়। যাতে ও নিজেকে ভাঙা পরিবারের সদস্য মনে না করে।এই সত্যটা অন্য পরিবারে বিয়ে হলে ও আজ নয় কাল ঠিকই জানত। আমি চাইনি ও জানুক। চাইনি। তাই তোর পরিবারে মেয়েকে বউ হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভুল হলো বল? খুব ভুল! ”
সাজিয়া আফরোজের চোখ টলমল করল। বোধহয় এক্ষুনিই গড়িয়ে পড়বে চোখ বেয়ে। বান্ধবীর পানে চেয়ে কোনভাবে কাঁপা কন্ঠে বললেন
“ অ্ দিতি…”
অদিতি আহমেদ আবারও হাসলেন। এইযে মুখশ্রীটা? টলমল চোখজোড়া? আর কাঁপা স্বর. সবেতেই তার হাসি এল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে বলল,
“ আমার মেয়েটা এই মাস দুয়েকে কয়বার কেঁদেছে খেয়াল রেখেছিলি সাজি? তোর নিজের মেয়ে হলে নিশ্চয়ই রাখতি। তোর ভাইয়ের মেয়ে হলেও রাখতি। রাখিসনি কেবল তোর ছেলের বউ বলে। তাই না সাজি? ছোটবেলা থেকে তোকে সাজি আম্মু সাজি আম্মু করত আমার মেয়েটা। আমিও কি বোকা দেখ! ভাবলাম সংসার যখন করবেই ওর আরেক আম্মুর কাছে গিয়েই করুক। মানানোর কষ্টটা আর হবে না। কিন্তু আমি যে ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম বুঝব কি করে বল? আমার মেয়েটা তোর বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই কাঁদল। কাঁদল নিজের সাংসারিক অদক্ষতার জন্য। কাঁদল ভালো রান্না না পারার জন্য। কাঁদল মাছ কাটতে না পারার জন্য। কাঁদল মাংস কাটতে না পারার জন্য। এমনকি কষ্ট করে রান্না করা খাবারটা মুখে তোলার অযোগ্য হওয়ার জন্যও কাঁদল আমার মেয়েটা। আমার মেয়েটা…আমার মেয়েটা খুব করে চেষ্টা করেছে মানিয়ে নিতে। খুব করেই! এই নিয়ে বহু কাজ ও শিখে নিয়েছে যা ও আগে করত না। আগে যা পারত না ভালো করে তাও রপ্ত করেছে। কেন? যাতে কেউ ওর দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে। কিন্তু আমার মেয়েটাও ভুল ছিল বুঝলি সাজি? ও জানেই না, শ্বশুড়বাড়ির জন্য সব করলেও শ্বশুড়বাড়ির লোক কখনো আপন হয় না। কখনো নিজের মতো করে ভালোবাসে না। ”
সাজিয়া আফরোজ বোধহয় কিছুই বলতে পারলেন না এবারে। কেঁদে ফেললেন কেমন করে। নিজের হয়ে কোনরকমে বললেন,
“ বিশ্বাস কর অদি, আমি ওকে তোদের সংসারের বিষয়টা বলিনি। কণাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে মাথায় ঠিক ছিল না অদি। তুই তো জানিস বল, বংশের একমাত্র মেয়ে বলে ওকে কতোটা ভালোবাসি আমরা। জানিস তো? হয়তো এতোটা ভালোবাসি বলেই মাথা ঠিক ছিল না তখন। ”
অদিতি আহমেদ নরম হলেন না। বরং শুধালেন,
“ এইজন্যই তো বললাম তোর নিজের মেয়ে বা ভাইয়ের মেয়ে হলে ঠিকই খোঁজ রাখতি। ঠিকই বিচলিত হতি। ঠিকই কষ্ট হতো। ঠিক যেমনটা এখন আমার হচ্ছে। তোর হয়নি কারণ তুই তো আমার মেয়েটার মা নোস। আর না তো তুই আমার মেয়েটাকে ভালোবেসেছিস সাজি। শুধু লোক দেখানো ভালোবাসা দেখিয়েছিলি। লোক দেখানো! কিন্তু আজ যদি আমার মেয়ের বদলে তোর মেয়ে অথবা ভাইয়ের মেয়ে থাকত? তুই ঠিকই চিন্তা করতি। ঠিকই বিচলিত হতি। ”
সাজিয়া আফরোজ কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
“ ভালোবাসি না আমি দ্বিতীকে? ভালোবাসি বলেই তো ছেলের বউ করে নিয়ে গেলাম। ”
“ বাসিস? বাসলে তো আমার মেয়ের কষ্টও তুই বুঝতে পারতি রে সাজি। যখন দিনের পর দিন ওকে কথা শুনতে হলো, কই? তুই তো একটা কথাও বললি না ওর হয়ে। খালাম্মাকে টু শব্দ অব্দি কখনো বলিসনি। অথচ তোর ভাইয়ের মেয়ের কষ্ট দেখে কিন্তু তুই ঠিকই প্রতিবাদ করলি সাজি। ঠিকই আমার মেয়েকে কথা শুনালি। ঠিকই বিচলিত হলি। তো? তাহলে আমার মেয়েকে ভালোবাসিস এটা কোন মুখে বলিস সাজি?”
সাজি আফরোজ আর উত্তর করলেন। অপরাধবোধ হলো। তবে সে অপরাধবোধ প্রকাশও করে উঠতে পারলেন না আর। দ্বিতীর কাছে যাওয়ার আগেই অদিতি আহমেদ বলল,
“ অনেক ভালোবাসা দেখিয়েছিস সাজি। এখন ভালো হয় এই ভালোবাসাটা না দেখালেই। আমার মেয়েটা তো বোকা। বিশ্বাস করে নিবে। পরে যখন আবার আঘাত করবি তখন আবার কষ্ট পাবে। এর চেয়ে ভালো, এ ভালোবাসাটা দেখানোর প্রয়োজন নেই। চলে যা এখন প্লিজ। হাতজোড় করছি। চলে যা এখন। আমি আমার মেয়েটাকে আগে স্বাভাবিক করি তারপর নাহয় আসিস। ”
সাজিয়া আফরোজ আর এগোতে পারলেন না। এগোলেন ও না। শুধু চেয়ে থাকলেন। অদিতি আহমেদ তখন মেয়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। কিচ্ছু খায়নি তার মেয়েটা। কিচ্ছু না। গরম গরম কিছু রান্না করে রাখলে অন্তত ঘুম থেকে উঠলে বুঝিয়ে শুনিয়ে খাওয়াবে। সাজিয়া আফরোজও দু কদম সরে বসার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আসলেই কি ছেলের বউ বলেই দ্বিতীর কষ্টটা সে দেখল না? আসলেই?
.
সাক্ষ্য সযত্নে দ্বিতীর হাতটা নিজের হাতে নিল। আঙ্গুলের ফাঁকে আঙ্গুল গলিয়ে একটু ঝুঁকল সে। তারপর একদম স্থির, শীতল একটা চুমু দিয়ে বিড়বিড় করল,
“ দ্বিতী, আমি যদি ঠিক সময়ে অনুভূতির প্রকাশ করতাম তোমার কাছে তাহলে নিশ্চয় আজ আমাকে কেউ দূরত্ব টানার কথা বলতে পারত না বলো? আ’ম সরি দ্বিতী। সাক্ষ্য সরি। হাজারটা সরি। তবুও প্লিজ বিশ্বাস করে নাও যে, সাক্ষ্য তোমাকেই ভালোবেসেছিল দ্বিতী। তোমাকেই ভালোবাসে এবং বাসবে। ”
সাক্ষ্য ফের আবারও বলল,
“ আমার থেকে প্লিজ দূরত্ব টেনো না দ্বিতী। সহ্য করতে পারব না। আমি জানি, তুমি এমনটাই করবে। তোমাকে চিনি আমি। জানি না এরপর আদৌ কখনো বিশ্বাস করবে কিনা।”
সাক্ষ্য এরপর দ্বিতীে মুখটাই দেখতে লাগল এক নজরে। চেযে চেয়ে দেখতেই কিছুটা সময় পর অদিতি আহমেদ এলেন। ধীর স্বরে বললেন,
“তোমার আব্বু কল করেছেন সাক্ষ্য। তোমার আম্মুকে নিয়ে বাসায় যাও।অনেক রাত হয়েছে। ”
“ প্লিজ আম্মু, দ্বিতীর ঘুম ভাঙা অব্দি থাকি? আমি প্রমিস করছি উনি চোখ মেলাে আগেই সরে যাব। উনাকে স্ট্রেস নেতে দেব না। প্রমিস। ”
অদিতি আহমেদ চাইলেন সাক্ষ্যর করুণ চাহনীর দিকে। হুট করে ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা। খেয়ে এসেছো? তোমার আব্বু বলল তোমরা না খেয়েই এসেছো। বাইরে এসে খেয়ে যাও। খাবার বাড়ছি আমি। ”
“ খাব না। কষ্ট করতে হবে না আপনাকে আম্মু। ”
“ তা কি করে হয়? খেয়ে যাও। মেয়ের বর আর শ্বাশুড়ি না হও তোমরা। না খাইয়ে রাখব? পরে যদি আমার মেয়েটাকে শুনতে হয় যে ওর বাবার বাড়ির লোক আদর আপ্যায়ন করতে জানে না?”
পরিচিত অদিতি আহমেদের রূপটা আজ খুব ভিন্ন। খুব! বোধহয় মেয়ের জন্যই। কথাটা সাজিয়া আফরোজের কানেও গেল। শুনল। কেন বলল তাও বুঝল। বান্ধবীর বিশ্বাসের জায়গাটা যে খুব করেই ভেঙেছেন উনি তা বুঝতে অসুবিধে হলো না তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ অদি, তোর মেয়েকে আমি এতোটাও পর হিসেবে দেখিনি অদি। এতোটা কষ্ট দিইনি। ”
“ আরো কষ্ট দিতি? উহ, তুই জানিস সাজি? কথার আঘাত খুবই জঘন্য সাজি। ভাগ্যিস তোর মেয়ে নেই। মেয়ে থাকলে বুঝতে পারতি। ”
অতঃপর দ্বিতীর ঘুম ভাঙল প্রায় মধ্যরাতে। রাত তিনটায়। সাক্ষ্য পুরোটা সময়ই ওভাবে চেয়ে ছিল দ্বিতীর দিকে। তারপর যখনই দেখল দ্বিতীর চোখ নড়ছে ঠিক তখনই উঠে দাঁড়াল ও। শেষবারের দ্বিতীর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে সে সরে গেল। যদি এক্ষুনি সাক্ষ্যকে দেখে দ্বিতী আবারও হয়তো উত্তেজিত হবে। রাগে জেদে ফুঁফিয়ে কাঁদবে। সাক্ষ্য নিজেও জানে দ্বিতী কেমন। তাই তো ভালোর জন্য সরে গেল দ্বিতী চোখ খোলার আগেই। বাইরে বেরিয়ে নিজের মাকে একবার ধীরস্বরে বলল,
“ চলো আম্মু। বাসায় যাবে। ”
পরমুহূর্তেই অদিতি আহমেদের দিকে চেয়ে বলল,
“ উনাকে বুঝিয়ে শান্ত করে কিছু খাইয়ে দিয়েন আম্মু। আর…আর একটু দেখে রাখবেন। উনার যে জেদ তাতে এক ছাড়বেন না প্লিজ। আর..”
“ আর? ”
সাক্ষ্য ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ আপনার কথা মতো আজকে চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমি কল করব। প্লিজ এইটুকুতে না করবেন না.. ”
অদিতি আহমেদ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ আচ্ছা। ”
এরপরপরই সাক্ষ্য পা বাড়াল নিজের মাকেও আসতে বলে। চোখজোড়া অসম্ভব লাল তার। এমন মনে হচ্ছে যেন নিজের অসম্ভব প্রিয় কোন বস্তুকে আজীবনের জন্য রেখে যাচ্ছে সে।। সাক্ষ্যর দমবন্ধ লাগে। অসহ্য লাগে। আর সে অসহ্যকর অনুভূতিটা নিয়েই সে দ্বিতীদের বাসা ছাড়ল।
সাক্ষ্য আধঘন্টার মধ্যে বাসায় পৌঁছালেও মন টিকল না ওর বাসায়। অস্থিরতায় ছটফট করছিল। নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে মনে হলো যেন। আচ্ছা, দ্বিতী কি তাকে ভুল বুঝবে? অবিশ্বাস করবে? দ্বিতী যদি জেদ করে আর না ফেরে? যদি এতোটা দুঃখে কখনো কিছু করে বসে? সাক্ষ্য এতো চিন্তা নিয়ে আর বসে থাকতে পারল না। বার দুয়েক কল ও দিল দ্বিতীর নাম্বারে। অথচ তোলা হলো না। বরং পরেরবার থেকে আর কলও ডুকল না। সাক্ষ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চটজলদি ফের আবার বের হওয়ার আগে নিজের ফোনে আরেকটা সিম লাগিয়ে বের হলো। অতঃপর দ্বিতীদের বাসার সামনে এসে যখন থামল গাড়িটা তখন প্রায় রাত চারটা। দ্বিতীর বেলকনিটায় আলো নেই। রুমেও আলো নেভানো। বোধহয় ঘুমিয়েছে ভেবে সাক্ষ্য কয়েক পলক ওভাবে চেয়ে থাকতেই ভ্রু কুঁচকাল যখন ছাদের দিকটায় নজর গেল। ছাদের রেলিংয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারীমূর্তিটি একদম দ্বিতীর মতোই দেখাচ্ছে। একদম দ্বিতীর আকার। সাক্ষ্য মুহূর্তেই চমকাল। দ্রুত নিজের অন্য সিমটা থেকে দ্বিতীকে কল দিতে দিতেই গাড়ি ছেড়ে নামল। একপ্রকার দৌড়েই দ্বিতীর গেইটের সামনে যেতে যেতে দ্বিতী ততক্ষনে কল তুলল। ওপাশ থেকে বলল,
“সাক্ষ্য?”
নিজের অন্য নাম্বারটা যে দ্বিতী চিনতে পেরে যাবে তা বোধহয় সাক্ষ্য বুঝেনি। আবার কল তুলেছে দেখে দ্রুত ছাদের দিকে চেয়েই ফের বলল,
“ দ্বিতী, ছাদে তুমি? স্টপ দ্বিতী…স্টপ। এক্ষুনি নামবে দ্বিতী। ছাদ ছেড়ে এক্ষুনি নামবে। আই সেইড… ”
দ্বিতী কিঞ্চিৎ হাসল বোধহয়। পরমুহূর্তেই বিষন্ন কন্ঠে বলল,
“ উহু! ভয় পাচ্ছেন সাক্ষ্য এহসান? যদি মামলা হয়ে যায় ভদ্র সভ্য সাক্ষ্য এহসান এবং তার ফেমিলির নামে তাই বুঝি গলা কাঁপছে? এতোটা অস্থিরতা দেখাচ্ছেন এই কারণে? ভয় নেই।আমি ফাঁসাব না আপনাদের সাক্ষ্য। ”
সাক্ষ্য দাঁতে দাঁতে চাপল। রাগ হচ্ছে, একই সাথে অস্থিরও লাগছে। কেন গেল সে? অদিতি আহমেদের কথা শুনে কেন যেতে গেল? এখন কিছু করে ফেললে মেয়েটা? চারতালা ছাদ থেকে লাফালে কি হবে একবার ভাবতে পারছে সে? সাক্ষ্যর চিন্তায় দমবন্ধ লাগল। অন্যদিকে দ্বিতীদের গেইটটাও অফ। বার কয়েক আঘাত করে ওপাশের লোককে ডেকেও কোন সাড়াশব্দ এল না। সাক্ষ্য আরো কয়বার নিজের হাত দিয়ে গেইটে আঘাত করল। জোরেই আওয়াজ হলো। মুখে বলল দ্বিতীকে,
“ তোমার নিজের জীবন এতোটা ঠুনকো দ্বিতী? এতোটাই? কেউ তোমায় কিছু বলল আর তুমি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাববে? নিজের মায়ের কথা ভেবেছো একবার? কতোটা লড়াই করে তোমায় জন্ম দিয়েছে, বড় করেছে জানো তুমি? সে মায়ের কাছে তোমার জীবনটা কতোটা মূল্যবান জানো তুমি?”
দ্বিতী ওভাবেই ছাদের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে নিচটা দেখল এক পলক। কেমন যান্ত্রিক রোবটের মতো করেই কানে চেপে রাখা ফোনটায় বলল,
“ হাসালেন। আপনার মনে হচ্ছে না আমার লাইফটা একদম অযথাই টিকে আছে? অযথাই! কোন ভিত্তিই নেই যে জীবনের সে জীবন রেখে লাভটা কি বলুন তো? তবে ভয় নেই আমি মরে গেলেও আপনাকে কিংবা আপনার পরিবারকে দোষারোপ করব না। কক্ষনো। এই নিয়ে ভয় পাবেন না।একটুও ভয় পাবেন না। দ্বিতী এতোটা
স্বার্থপর নয় সাক্ষ্য। ”
সাক্ষ্যর বোধহয় নিঃশ্বাস রোধ হয়ে এল। ততক্ষনে দ্বিতীদের দারোয়ানটা এসে কেচি গেইটটার তালা খুলল এক হাতে। সাক্ষ্যকে তিনি দেখেছেন। এও জানেন অদিতি আফার জামাই হন। তাইতো হাসি মুখে কিছু জিজ্ঞেস করতেই যাবেন তার আগেই সাক্ষ্য একপ্রকার ফোন কানে রেখে সিঁড়ি দিয়ে ছুটতে লাগল। একদম কুকুরের মতো ছুটতে ছুটতে সাক্ষ্য বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৩৯
“ দ্বিতী..কিছু হেরফের হলে আপনি দোষারোপ না করলেও আমি আজন্ম আপনাকে দোষারোপ করব। আজন্ম আল্লাহকে বিচার দিব। আজন্ম বলে যাব, কেউ একজন আমায় বিনাদোষে দোষী করে নিজে পালিয়েছে…”
