প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৮
সাইদা মুন
ছেলেগুলো যেতেই একে একে সবাই বিদায় নিয়ে যে যার মতো চলে যেতে শুরু করেছে। মেহরীনরাও মেইন রোডের দিকে এগোতেই আচমকাই থেমে গেল। ঠিক সামনেই কালো ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে তালহা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছাতার কিনারা বেয়ে টুপটাপ ঝরে পড়ছে। গায়ে সেই চেনা ফরমাল পোশাক। গায়ে গাঢ় চারকোল রঙের থ্রি-পিস স্যুট। সাদা শার্টের ওপর বাদামি টাই, তার ওপর পরিপাটি ওয়েস্টকোট, সবশেষে কোট এবং তার বুকপকেটে গুঁজে রাখা পকেট স্কয়ারটা। সবমিলিয়ে একদম জেন্টেলম্যান লুক। এক হাত পকেটে, অন্য হাতে ছাতার হাতল। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে।
গম্ভীর মুখখানা নজরে পড়তেই অপরাধীর মতো চাইল তাহিয়া মেহরীন। দুজনেই মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে একাকার। তালহার কপাল কুঁচকে উঠল। এই দৃষ্টিটুকুই যথেষ্ট ছিল। মেহরীন অপ্রস্তুত হেসে ফেলল। তাহিয়াও শুকনো হাসি দিল। এদিকে তনিমা, ফারিন আর রাফি তালহাকে দেখে একসঙ্গে সালাম দিল। উত্তর পাওয়ার আগেই তারা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সেখান থেকে সরে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যেই দুজনকে একা রেখে সবাই উধাও। দুজন এবার ভীতু পায়ে এগিয়ে গেল। তালহা তখনও চুপ, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাহিয়া কনুই দিয়ে গুতো মারল মেহরীনকে। সেও আর দেরি না করে তড়িঘড়ি বলল,
—আ..আমি-ই জোর করেছিলাম। ওর কোনো দোষ নেই।
তালহা কিছু বলল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই নীরবতাটুকু যেন রাগ দেখানোর চেয়েও ভয়ংকর জিনিস। তালহা এবার ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এল। ছাতাটা দুজনের মাথার ওপর ধরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেহরীনকে একবার দেখে নিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
—ফায়দা লুটছো?
মেহরীন চোখ বড় বড় করে চাইল,
—ক…কিসের ফায়দা?
তালহার মুখভঙ্গি আরও গম্ভীর হয়ে উঠল,
—বউ হওয়ার ফায়দা।
একটু থেমে এবার তাহিয়ার দিকে তাকাল,
—ননদের দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে দুজনই বেঁচে যাবে ভেবেছো, তাই না?
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে দুহাত নাড়িয়ে বলল,
—না না ভাইয়া, কসম। সবাই বৃষ্টিতে ভিজছিল। তাই আমরাও গেছি। প্লিজ, আজ একটা দিনই তো।
মেহরীন ঠোঁট উল্টে ফেলল। এগিয়ে গিয়ে তালহার পকেটে রাখা হাতটার কোট টেনে ধরল। মুখটা একদম নিষ্পাপ করে বলল,
—প্লিজ রাগ করবেন না। একটা দিনই তো। আজ আমাদের কলেজ লাইফের শেষ দিন। বোঝার চেষ্টা করুন না।
তালহা কিছু বলার আগেই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
—থাক না, একটা দিনই তো।
তাহসান ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে কথাটা বলল। তার কথায় তালহা আর বেশি কথা বাড়াল না,
—আচ্ছা বাসায় গিয়ে দেখছি ব্যাপারটা।
তা শুনে তাহসান যেতে যেতে তাহিয়াকে বলল,
—চল, তোকে আমি বাসায় নামিয়ে দিই।
তাহিয়া যেন এমন সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। দ্রুত পায়ে তাহসানের পিছে গেল সে। তাহসান বাইকে উঠে নিজের কোটটা খুলে তাহিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
—পরে নে।
তাহিয়াও হাসিমুখে ভাইয়ের কোটটা গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর ছাতাটা দুজনের মাথার ওপর ধরে বাইকের পেছনে উঠে বসল। কয়েক মুহূর্ত পরই বাইকটা বৃষ্টিভেজা রাস্তা ধরে মিলিয়ে গেল। চারপাশটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। এবার তালহা ধীরে ধীরে মেহরীনের দিকে ফিরল। কোনো কথা না বলে নিজের হাতে ধরা ছাতাটা মেহরীনের হাতে তুলে দিল। মেহরীন আজ্ঞাবহ মেয়ের মতো ছাতাটা ধরল। তালহা এবার নিজের কোটের বোতাম খুলতে শুরু করল। তা দেখে মেহরীনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
তালহা কোটটা খুলে তার কাঁধে জড়িয়ে দিল। তারপর একে একে হাত দুটো কোটের হাতায় ঢুকিয়ে দিল। সযত্নে কোটের সামনের অংশ ঠিক করতে করতে কপাল কুঁচকে বলল,
—ঠান্ডা লাগলে সাফার তো আমাকেই করতে হবে।
মেহরীন নিচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল। তালহা কোটের কলারটা টেনে ঠিক করে দিতে দিতে আবার বলল,
—জ্বরটা একবার আসুক।
মেহরীন মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—আপনি তো আছেন।
—আমি আছি বলেই তো বকছি।
উত্তরটা শুনে মেহরীনের হাসিটা আর চাপা রইল না। তালহা কপাল কুঁচকালো,
—এত হাসি কোথা থেকে আসে?
মেহরীন আরও একচিলতে হাসি নিয়েই উত্তর দিল,
—আপনার থেকে।
তালহা ভ্রু তুলল,
—আমার থেকে?
—হুম।
মৃদু হাসল তালহা। তার হাতটা মুঠোয় ধরে বাইকের কাছে নিয়ে গেল। মেহরীন বাইকে উঠে বসতেই সে হেলমেটটা তার মাথায় পরিয়ে দিল। গলার নিচের স্ট্র্যাপ লাগাতে মনোযোগী হল। এরইমাঝে মেহরীন কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
—বৃষ্টির মধ্যে বাইক আনলেন যে?
স্ট্র্যাপের লক ঠিক করতে করতেই তালহা বলল,
—বউকে নিয়ে একটু বৃষ্টিবিলাস করতে ইচ্ছে হলো।
কথাটা শুনতেই যেন মেহরীনের ঠোঁট ফুলে উঠল। এক হাত কোমরে রেখে বলল,
—তাহলে ভিজেছি বলে এত রাগ দেখালেন কেন?
লকটা লাগিয়ে তালহা চোখ তুলল। তারপর হেলমেটের ভেতর দিয়েই দু’গাল আলতো করে চেপে ধরে মুখটা নিজের দিকে টেনে এনে বলল,
—বোন সঙ্গে ছিল। বোনের সামনে একটু রাগ দেখাতেই হয়।
মেহরীন নাক কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। পরপরই শব্দ করে হেসে ফেলল। তার সেই প্রাণখোলা হাসি দেখে তালহাও মৃদু হেসে গাল দুটো আরও চেপে ধরল। হাসির মাঝেই মেহরীন জানতে চাইল,
—আর বউয়ের সামনে?
তালহা মুঁচকি হাসল। উত্তরে বলল,
—বউয়ের সামনে শুধু ভালোবাসা দেখাতে হয়।
মেহরীনের হাসি যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেও হাত বাড়িয়ে তালহার গাল আলতো করে টেনে আদুরে কণ্ঠে বলল,
—আই লাভ ইউ।
তালহা এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
—আই লাভ ইউ মোর মাই লাভ।
কথাটা বলেই আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল মেহরীনের কপালে। ঠিক সেই মুহূর্তেই চারপাশের নীরবতা ভেঙে ভেসে এলো টানা শিসের শব্দ। সঙ্গে সঙ্গেই হাততালির আওয়াজ।
—দুলাভাই জিতছেন!
চমকে উঠল মেহরীন। তড়িঘড়ি করে পেছনে ফিরতেই দেখল, বেশ কয়েকজন ক্লাসমেট দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠল সে। অপ্রস্তুত হয়ে কিছু একটা বলবে, ঠিক তখনই আরও কটা পরিচিত গলা ভেসে এল।
—আরে না! মেহরীন জিতছে আমাদের হাউ রোমাণ্টিক দুলাভাইকে পেয়ে।
মেহরীন সেদিকে ফিরতেই দেখল রাফি, তনিমা আর ফারিন। এবার তো লজ্জার সীমাই রইল না। তাড়াহুড়ো করে হেলমেটের গ্লাসটা নামিয়ে ফেলল। অন্তত মুখটা যেন কেউ না দেখতে পায়। তারপর রাগ দেখানোর ভান করে চিৎকার করে উঠল,
—বেয়াদব! তোরা না চলে গিয়েছিলি?
রাফি কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্দোষ মুখে বলল,
—চলে তো যাচ্ছিলাম। কিন্তু মাঝপথে দুলাভাই আমাদের আটকে দিল।
তালহা ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে নিজের দিকে আঙুল তুলে বলল,
—আমি?
—জ্বি, আপনি।
রাফি গম্ভীর মুখ করে বলল,
—আপনাকে দেখেই পা থেমে গেল। মন বলল, যা রাফি, দুলাভাইয়ের কাছ থেকে বউয়ের যত্ন নেওয়ার দুই-চারটা টিপস শিখে নে। তাই ফিরে এলাম। কিন্তু টিপস নিতে এসে তো দেখি লাইভ ডেমোই পেয়ে গেলাম।
তালহা হেসে ফেলল। তারপর ছাতাটা গুটিয়ে বাইকের সামনে রাখল। বাইকে উঠে মেহরীনকে বলল,
—ধরে বসো।
মেহরীন চুপচাপ তার কোমর জড়িয়ে ধরতেই আবার রাফি চেঁচিয়ে উঠল,
—আরে দুলাভাই। আরও দুই-একটা টিপস দিয়ে যান না।
তালহা একবার নিচের দিকে তাকাল। মেহরীনের দুটো হাত শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে আছে। সেই হাত দুটো আঁকড়ে ধরে সে মাথা তুলে রাফির দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে শান্ত একটা হাসি।
—যদি ভালোবাসার মানুষটিকে অন্য কারও সঙ্গে দেখতে না চাও, তবে তাকে এমনভাবে ভালোবাসো, যেন তার কাছে ভালোবাসা মানেই তুমি। মানুষকে জোর করে আটকে রাখা যায় না, ভালোবাসা আর সম্মানই তাকে স্বেচ্ছায় পাশে থাকতে শেখায়।
কথাগুলো বলেই তালহা বাইক স্টার্ট দিল। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল তাদের দুজন। মেহরীন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল প্রতিটি কথা। আবেশে আরও শক্ত করব জড়িয়ে ধরল তালহাকে। একদিন ছিল সে সকলের সামনে তালহার দিকে তাকাতেও সংকোচবোধ করত। আর আজ, আজ তো পুরো দুনিয়ার সামনে নিজের ভালোবাসাকে জড়িয়ে ধরতেও তার বাধা নেই। মাথাটা রাখল তার পিঠে। চোখ বন্ধ করে চেচিয়ে বলল,
—আমি মিসেস তালহা সিকদার। আমি মিসেস সিকদাররররর..
এখন সে নিমিষেই এই কথাটাও স্বীকার করতে পারে। চৌড়া হাসল। বৃষ্টির ফলে রাস্তায় তেমন একটা মানুষ নেই। তাই দুচারজনই শুনলো হয়তো তার বলা কথাগুলো। এরমধ্যে একজন তালহা। হেসে ফেলল সে। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলল,
—ইয়েস মাই ওয়াইফ, ইউ আর মিসেস তালহা সিকদার।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আবারও হেসে উঠল। রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—মানুষটা শুধু বউ না, ডায়লগও সামলাতে মাহির!
পাশ থেকে ফারিন তার মাথায় এক চাপড় মেরে বলল,
—ভাইয়া মেহরীনকে অনেক ভালোবাসে তাই না রে?
তনিমা ফারিনের কাধে হাত রেখে বলল,
—একটু বেশিই ভালোবাসে। আমার ভাইয়ার বিয়েতে দেখিসনি ছোট্ট বাচ্চার মতো আগলে আগলে রেখেছে।
ফারিন মুচকি হেসে মাথা নাড়ল,
—হুম দিন কত তাড়াতাড়ি চলে যায় রে কদিন আগেই না তোর ভাইয়ের বিয়েতে আমরা কত মজা করলাম। এখন দেখ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। তা কেমন আছে ফাইজা আপু আর আরিয়ান ভাই?
—মাশাল্লাহ অনেক সুখি। আমার ভাই যেন নিজের সুখ পেয়ে গেছে। ভাবিকে যেভাবে আগলে রাখে। সারাক্ষণ হাসি খুশি খুনশুটিটেই যাচ্ছে আমাদের পরিবার। মনেই হয়না নতুন একজন সদস্য আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে।
রাফি হেসে মাথা নাড়ল বলল,
—পুরুষ হলে তো এমনই হওয়া উচিত। আমিও আমার বউকে সবকিছু উজাড় করে ভালোবাসবো।
ফারিন তনিমা সঙ্গে সঙ্গে তার পিঠে দুঘা লাগিয়ে বলল,
—শালা এখনো গ্রেজুয়েশন ও কমপ্লিট করিসনি আবার বিয়ের চিন্তা। যা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নে।
রাফি মুখচোখ কুঁচকে ফেলল পিঠ মরাতে মরাতে বলল,
—আজব সবে এক্সাম শেষ হলো এখনো রেজাল্ট পাইলাম না, এখন কিসের ভর্তি পরীক্ষা?
তনিমা দুহাত কোমরে রেখে রাগী চোখে চাইল,
—পাশ তুই হয়ে যাবি। আমরা যেই ঠেলাঠেলি করে তোকে পড়িয়েছি। এবার যেভাবেই হোক আমাদের পাঁচটাকে একই ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে। তোর জন্য সব ব্যস্তে দিতে পারিনা। তাই আগে থেকেই তুই প্রস্তুতি শুরু করবি বুঝেছিস?
রাফি মুখ মুচড়ে বলল,
—পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে পাশ করার রেকর্ড আছে ব্রো। সো নো টেনশন।
এরমধ্যে তনিমার গাড়ি আসতেই সে রাফি ফারিন সহ উঠে পড়ল। তাদের বাড়ির পথ প্রায় একই দিকে। তাই নামিয়ে দিয়ে তনিমা যাবে নিজ বাসায়।
বাইকটা মাঝারি গতিতে নিরিবিলি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে। শহরের কোলাহল অনেক পেছনে ফেলে এসেছে তারা। চারপাশে শুধু ভেজা মাটির গন্ধ, বৃষ্টির একটানা ঝরঝর শব্দ আর দূরের গাছগুলোর মৃদু দুলে ওঠা। সড়কের দুই ধারে সারি সারি গাছ, বৃষ্টির ফোঁটায় তাদের পাতাগুলো চকচক করছে। প্রকৃতি যেন তার সবুজ রূপ ফিরে পেয়েছে। মাঝে মাঝে জমে থাকা পানির ওপর দিয়ে চাকা চলে যেতেই ছিটকে উঠছে ছোট ছোট জলকণা।
মেহরীন মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। হেলমেটের গ্লাসটা উঠিয়ে রেখেছে। ফলে শীতল বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার কপাল, গাল আর চোখের পাতায় এসে পড়ছে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল এক নির্মল হাসি। হঠাৎই সে দুই হাত দুদিকে মেলে দিল। যেন ডানা মেলে উড়তে চাওয়া এক মুক্ত পাখি সে। তালহা লুকিং মিররে তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখেই অবচেতনভাবে বাইকের গতি কিছুটা কমিয়ে দিল।
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গেই মুখ ভার করে বলল,
—স্পিড বাড়ান না, ভালো লাগছে তো।
তালহা গম্ভীর কন্ঠে বলল,
—এভাবে রিস্ক তো।
মেহরীন আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে উত্তর দিল,
—রিস্ক নেই, আপনি আছেন যে।
মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু সেই তিনটি শব্দ যেন তালহার বুকের ভেতর কোথাও নিঃশব্দে টোকা দিল। সে আছে, হ্যাঁ সে আছে। সে সবসময় থাকবে এই মেয়েটার পাশে। আজীবন থাকবে। ভাবতে ভাবতেই মুচকি হেসে বাইকটা রাস্তার এক পাশে থামিয়ে দিল।
মেহরীন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
—কী হলো থামালেন কেন?
তালহা কোনো উত্তর দিল না। এক টানে কোমরের বেল্টটা খুলে নিল। তারপর পেছনে ঘুরে মেহরীনের দিকে তাকাল। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে এক টানে মেহরীনের কোমর নিজের দিকে টেনে আনল। মুহূর্তেই দুজনের মাঝের সামান্য দূরত্বটুকুও মিলিয়ে গেল। বেল্টটা মেহরীনের কোমর ঘুরিয়ে এনে তার পেটের কাছে আটকে দিল। ফলে মেহরীন তালহার পিঠে পুরোপুরি লেপ্টে গেল। বকলেসটা ক্লিক করে আটকে যেতেই আবার ইঞ্জিন স্টার্ট করল বলল,
—এবার যত খুশি উড়ো পাখি।
মেহরীনের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে ছিল এতক্ষণ। তবে ধীরে ধীরে সেই বিস্ময় বদলে গেল অঢেল আনন্দে। দুহাতে জড়িয়ে ধরল তালহার গলা। দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করল,
—এবার যদি পড়ে যাই?
তালহা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—সুযোগ কই রাখলাম?
মেহরীনের হাসিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাইকটা আবার ছুটতে শুরু করল। এবার আর কোনো ভয় নেই। কোনো দ্বিধা নেই। মেহরীনের ইচ্ছেমতোই স্পিড বাড়াল। মেহরীন আবারও দুই হাত ছড়িয়ে দিল। এবার যেন আগের চেয়েও বেশি মুক্ত। বাতাস এসে তার হিজাব এলোমেলো করে দিচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আঙুল ছুঁয়ে নিচে ঝরে পড়ছে। আর সে চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগল সেই মুহূর্তটাকে।
মাঝে মাঝে আনন্দে চিৎকার করে উঠছে,
—এত সুন্দর একটা মুহুর্ত, এটা কি বাস্তব? আমার তো মনে হচ্ছে আমি রূপকথার জগতে আছি সিকদার সাহেব।
—চারপাশটা যেন কল্পনার মতো লাগছে। ইসস, যদি এই রাস্তাটা আর শেষই না হতো।
কথা বলতে বলতে কখন যে আবার দুহাতে তালহার গলা জড়িয়ে ধরছে, নিজেও বুঝতে পারছে না। আবার একটু পরই ছেড়ে দিয়ে বাতাস ছুঁতে চাইছে। কখনো গুনগুন করে গান ধরছে, কখনো বৃষ্টির ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছে। তার প্রতিটা ছোট্ট উচ্ছ্বাস, প্রতিটা হাসি, প্রতিটা কথা চুপচাপ উপভোগ করছে তালহা। ক্ষণে ক্ষণে মিররে বারবার দেখছে মেহরীনের হাসিমাখা মুখ। এই হাসিটা দেখার জন্যই তো এত পথ চলা। এই হাসিটা অটুট রাখার জন্যই তো তার এত আয়োজন। তালহার ঠোঁটের কোণেও হাসি ঝুলছে। প্রিয় মানুষের মুখে এমন নির্মল হাসি ফোটাতে পারাই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি।
গাড়িটা এসে থামল নদীর পাড়ে। চারপাশজুড়ে সবুজের সমারোহ। দূরে বিস্তীর্ণ নদী, তার বুকজুড়ে বৃষ্টির টুপটাপ ফোঁটা পড়ে ছোট ছোট বৃত্ত এঁকে মিলিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরে। নদীর ওপারটা কুয়াশার মতো বৃষ্টির আবছা পর্দায় ঢেকে আছে। মাঝেমধ্যে শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে দু’জনের গায়ে লাগছে। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই মেহরীন আর অপেক্ষা করল না। নেমে দৌড়ে গেল। ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে পড়ল।
তালহাও নেমে এল। নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে মেহরীনের দিকে এগিয়ে গেল। তার পাশে গিয়ে বসতেই মেহরীন নিঃশব্দে তার বাহু জড়িয়ে ধরল। এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথাটা তালহার কাঁধে রেখে দিল। বৃষ্টি তখনও ঝরছে, তবে আগের মতো নয়। মুষলধারে নামা বৃষ্টি এখন রূপ নিয়েছে নরম ঝিরিঝিরি ধারায়। মেহরীন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের নদীর দিকে। প্রকৃতির সেই অপার্থিব সৌন্দর্যে সে যেন হারিয়েই গেছে। আর তালহা?
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহরীনের দিকে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের চেয়েও তার কাছে বেশি সুন্দর লাগছে কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে বসে থাকা এই মেয়েটিকে। ভেজা মুখ, চোখের কোণে লেগে থাকা হাসি আর ঠোঁটের প্রশস্ত বাঁক, সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত কোনো শিল্পকর্ম।
বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা ছেয়ে রইল দু’জনের মাঝে। শুধু বৃষ্টির শব্দ, নদীর ঢেউ আর বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ আওয়াজ। হঠাৎ মেহরীন মুখ ফিরিয়ে তালহার দিকে তাকাল। দু’জনের চোখ এক হতেই সে মিষ্টি করে হেসে ফেলল। তালহা যেন সেই হাসির অপেক্ষাতেই ছিল। ঝুঁকে তার কপালে গভীর ভালোবাসার এক চুম্বন এঁকে দিল। এরপর এক হাত দিয়ে মেহরীনকে আরও কাছে টেনে নিজের বুকে আগলে নিল। অন্য হাতটা ভেজা ঘাসের ওপর রেখে সামান্য পেছনে হেলান দিয়ে বসল। মেহরীনও আরও আরাম করে তার বুকে হেলান দিল। দু’জনের মাঝের নীরবতাটুকু তখন ভালোবাসার ভাষায় কথা বলছিল।
কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে মেহরীন গভীর একটা শ্বাস ফেলল বলল,
—একটা গল্প শুনবেন?
তালহা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,
—হুম বলো।
মেহরীন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দূরের নদীর দিকে তাকিয়েই ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
—এক সিন্ড্রেলার গল্প। একদিন এক মায়াবতী মায়ের কোল আলো করে জন্ম নিয়েছিল ছোট্ট এক সিন্ড্রেলা। তার জন্মে আনন্দে ভরে উঠেছিল পুরো পরিবার। কিন্তু সুখ যেন তার ভাগ্যে বেশিক্ষণ সইল না। পৃথিবীর আলো দেখার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই হারিয়ে ফেলল নিজের মাকে। মায়ের শোক সহ্য করতে না পেরে কিছুদিন পর তার বাবাও পাড়ি জমালেন না-ফেরার দেশে। মুহূর্তেই এতিম হয়ে গেল ছোট্ট মেয়েটা। তার ছোট্ট পৃথিবীতে তখন আপন বলতে রইলেন শুধু একজন মানুষ, তার দাদি। দাদির স্নেহের ছায়াতেই ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল সে। কিন্তু বড় হওয়ার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। চাচা-চাচির অবহেলা, অপমান আর অত্যাচার নীরবে সহ্য করেই কাটছিল প্রতিটি দিন। তবু সিন্ড্রেলা কখনো আশা হারায়নি। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন না একদিন তার জীবনেরও সূর্য উঠবে। দাদির মুখে শোনা রূপকথার সেই রাজপুত্র একদিন ঠিকই আসবে। এসে তার সমস্ত দুঃখ, কষ্ট আর অন্ধকার দূর করে দেবে। তাকে এত ভালোবাসবে যে জীবনের সব না-পাওয়া এক মুহূর্তেই পূর্ণ হয়ে যাবে।
কথাগুলো বলে থেমে গেল মেহরীন। তালহা নিঃশব্দে তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। তার আঙুলগুলো আলতো করে মেহরীনের হাতের ওপর রেখে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—তারপর…?
—তারপর একদিন সিন্ড্রেলার জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে পড়ল। যে দাদি তার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিও একদিন তাকে ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন। দাদিই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র শক্তি, একমাত্র আপন মানুষ। সেই মানুষটিও চলে যেতেই পৃথিবীটা যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। দাদির মৃত্যুর পরই তার চাচা-চাচি যেন সাহস পেল। নিজেদের বোঝা কমাতে জোরপূর্বক এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল তারা। সেই লোকের টাকায় ধুমধাম করে বিয়ের সব আয়োজনও করল। অথচ সিন্ড্রেলার সেই বিয়েতে মত নেই। বুকের ভেতর তখন কেবলই আতঙ্ক ছিল। প্রতিটি মুহূর্তে সে অপেক্ষা করছিল তার সেই বহুল প্রতীক্ষিত রূপকথার রাজপুত্রের জন্য। বিশ্বাস করত, কেউ একজন নিশ্চয়ই আসবে তাকে এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দিতে। কিন্তু কেউ এল না। ধীরে ধীরে সময় এগোতেই তার সমস্ত আশা নিভে যেতে লাগল। মনে হলো, এভাবেই বুঝি তার জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। এমন এক পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কী হবে, যেখানে নিজের বলে কাউকে পাওয়া যাবে না? শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আর নয়, এই জীবন শেষ করে দেবে। নিজেকে শেষ করতে গিয়েছিল সে। তবে মানুষের মন বড্ড বেহায়া বাঁচতে চাইছিল বারবার। শেষ মুহূর্তে নিজের কিছু করতে না পেরে সে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।
অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মহান আল্লাহর কাছে নিজের সমস্ত কষ্ট, অভিমান আর অসহায়ত্ব উজাড় করে দিল। প্রতিটি সিজদার সঙ্গে সঙ্গে যেন বুকের ভেতর জমে থাকা ভার একটু একটু করে হালকা হচ্ছিল। দমবন্ধ করা যন্ত্রণাটাও যেন ধীরে ধীরে কমে এলো। হয়তো এটাই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জীবনের প্রথম অলৌকিক উপহার। সেই মুহূর্তেই সিন্ড্রেলা উপলব্ধি করল, ভাত যেমন নিজের হাতে না খেলে মুখে উঠে আসে না। তেমনি নিজের জীবন বদলানোর চেষ্টা সে না করলে, কেউ নিজ থেকে এমনি এমনি এসে তাকে উদ্ধার করবে না। এই উপলব্ধিই তাকে নতুন সাহস দিয়েছিল। সাহস জুগিয়ে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গেল সে। নিজের ভাগ্য বদলানোর আশায় ছুটতে লাগল অজানা এক পথের দিকে। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বহু দূরে চলে আসার পর তার মনে হলো, অবশেষে সে মুক্ত। মনে হলো, আজ বুঝি তার ভাগ্য সত্যিই বদলে গেছে। কিন্তু সে ভুল ভেবেছিল। সামনেই অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ংকর এক বিপদ, এমন এক বিপদ, যেখানে মৃত্যু যেন তার একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল বহু প্রতীক্ষিত সেই আগমন। তার রূপকথার রাজপুত্র এসে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করে নিজের রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেল। সেই দিনের পর থেকে আর কোনো দুঃখ, কোনো অন্ধকার, কোনো নিষ্ঠুরতা এখনো অব্দি সিন্ড্রেলাকে ছুতে পারেনি।
তালহা মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কথা শুনল। একবারের জন্যও তাকে থামাল না। তার চোখের গভীরতায় তখন মিশে ছিল মমতা। মেহরীনের কথা শেষ হতেই সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—সেই সিন্ড্রেলার জীবনে আর কোনোদিন দুঃখ ফিরে আসবে না। তার রাজপুত্র তাকে আজীবন এতটা ভালোবাসবে, এতটা আগলে রাখবে যে দুঃখও আর কখনো তার দুয়ারে কড়া নাড়ার সাহস পাবে না। আমার সিন্ড্রেলার ঠোঁটের হাসিটা আজীবন অমলিন থাকবে। যতদিন আমার নিঃশ্বাস চলবে, ততদিন তার চোখে একফোঁটা অশ্রুও আমি আসতে দেব না।
মেহরীন মুচকি হেসে তালহার দিকে তাকাল,
—আপনি বুঝে গেছেন আমি কার কথা বলছিলাম?
তালহা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—আমার চোখে তো সিন্ড্রেলা একজনই। তাই নামটা শুনেই চিনে ফেলেছি।
তালহার কথায় মেহরীনের ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও গাঢ় হলো। মুহূর্তের মধ্যেই সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই নির্মল হাসির শব্দে যেন চারপাশটাও প্রাণ ফিরে পেল। তালহা মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ তার হাসি দেখল। তারপর ধীরে ধীরে মুখটা ঝুঁকিয়ে মেহরীনের গালে নিজের গাল আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। খোঁচা খোঁচা দাড়ির স্পর্শে মেহরীন হালকা কেঁপে উঠল। গালজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সুড়সুড়ি অনুভূতি। পরক্ষণেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
তালহাও যেন সেই হাসির নেশায় মেতে উঠল। মেহরীন বারবার মুখটা সরিয়ে নিতে চাইছে, আর তালহা দুষ্টুমিতে তাকে আরও কাছে টেনে নিচ্ছে। কখনো আলতো করে ডান গালে গাল ছুঁইয়ে দিচ্ছে, কখনো আবার বাম গালে। ইচ্ছে করেই দাড়ির খোঁচা খোঁচা স্পর্শে তাকে আরও বেশি কাতুকুতু দিচ্ছে সে। আর মেহরীন বেচারি হাসতে হাসতে কাহিল।
—উফ! প্লিজ আর না!
হাসতে হাসতেই কথাগুলো বেরিয়ে এল মেহরীনের মুখ থেকে। হাসির চোটে তার চোখের কোণে পানি জমে গেছে। সে তালহার বুকের ওপর আলতো চাপ দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। একসময় তালহা হাতের বাধন ঢিলে করতেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল মেহরীন। উঠে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েক কদম দূরে সরে দাঁড়াতেই আচমকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সরে নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। মেহরীনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আনন্দে সে সামনের দিকে দৌড়ে গেল। দু’হাত মেলে ঘুরে দাঁড়াল বৃষ্টির মাঝখানে।
তালহা চিন্তিত গলায় বলল,
—আস্তে পড়ে যাবে তো।
মেহরীন পেছন ফিরে তাকাল। ঠোঁটজোড়া জুড়ে দুষ্টু এক হাসি। সে হাত নেড়ে তালহাকে কাছে আসার ইশারা করল,
—ধরুন আমায়…
তালহা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দু’হাত কোমরে রেখে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
—বাচ্চামো করো না, মেহরীন। পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে।
দূর থেকেই মাথা নেড়ে না-সূচক ভঙ্গি করল মেহরীন,
—সাহস থাকলে আগে আমাকে ধরে দেখান।
চ্যালেঞ্জটা শুনে তালহা ঠোঁট কামড়ে মুঁচকি হাসল। তারও চোখেমুখে দুষ্টুমির ঝিলিক নেচে উঠল। ধীর পায়ে তার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
—ধরতে পারলে?
মেহরীন ভ্রু নাচিয়ে জবাব দিল,
—ধরতে পারলে আপনি যা বলবেন, তাই করব। আর যদি না পারেন আমি…
কথাটা শেষ করার সুযোগই দিল না তালহা। আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,
—আমার ইচ্ছে পূরণ করার জন্য প্রস্তুত হও।
মেহরীন ভ্রু উচিয়ে বলল,
—এহ! এত কনফিডেন্স?
তালহার ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও গাঢ় হলো,
—একটু বেশিই।
বলেই তালহা ধীরে ধীরে দৌড়াতে লাগল। মেহরীনের দিকে ছুটে গেল। তালহাকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে মেহরীনও চমকে মুহূর্তেই প্রাণপণে দৌড় লাগাল উল্টো দিকে। চারপাশে তখন শুধু তাদের হাসির শব্দ। ভেহা সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে কখনো সোজা, কখনো আঁকাবাঁকা পথে ছুটে বেড়াচ্ছে দু’জন। মেহরীন বারবার পেছন ফিরে দেখছে, তালহা কতটা কাছে এসেছে। আর তালহা ইচ্ছে করেই যেন কখনো গতি বাড়াচ্ছে, আবার ঠিক ধরার আগমুহূর্তেই নিজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কয়েকবার তো তার হাত মেহরীনকে ছুঁয়েও গেল। ঠিক তখনই মেহরীন সাথে সাথে শরীরটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে ছুটে গেল।
মেহরীন দৌড়াচ্ছে, কিন্তু মাঝেমধ্যেই হাসতে হাসতে থেমে যাচ্ছে। আর সেই সুযোগে তালহা একেবারে কাছে চলে আসছে। কখনো তার হাত মেহরীনের কবজি ছুঁয়ে যাচ্ছে, আবার মেহরীন হঠাৎ শরীর ঘুরিয়ে ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কখনো তালহা তার ওড়নার এক কোণা ধরতে গিয়েও ইচ্ছে করেই ছেড়ে দিচ্ছে, যেন সে চায় এই খেলাটা আরও কিছুক্ষণ চলুক।
দু’জনের হাসির শব্দে চারপাশ যেন মুখর হয়ে উঠল। হাঁপাতে হাঁপাতে মেহরীনের গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। তবুও সে হার মানতে রাজি নয়। সুযোগ পেলেই আবার ছুটে যাচ্ছে অন্যদিকে। তালহা এবার দ্রুত পা বাড়াল। মুহূর্তের মধ্যে দু’জনের মাঝের দূরত্ব কমে এলো। ঠিক যখন মেহরীন ভাবল আবারও ফসকে যাবে, তখনই তালহার উষ্ণ হাত আলতো করে তার কোমর ধরে ফেলল।
—পেয়েছি!
বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল তালহার ঠোঁটে। মেহরীন হাঁপাতে হাঁপাতে হেসে উঠল। ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বলল,
—এটা একদম চিটিং।
তালহা মেহরীনকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তারপর কপালের সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি ফুটিয়ে চোখ টিপে বলল,
—জিতে গেলাম তো?
মেহরীন নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
—একদম না।
তালহা হেসে উঠল। কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎই ঝুঁকে শব্দ করে তার ঠোঁটে এক চুমু এঁকে দিল। তাকে ছেড়ে দিয়ে কয়েক কদম পেছাতে পেছাতে বলল,
—এবার আমাকে ধরে দেখাও।
কথাটা শেষ হতেই দুষ্টুমিভরা হাসি ছড়িয়ে পড়ল মেহরীনের মুখে,
—একবার হাতে পাই, তারপর দেখাচ্ছি।
বলেই সে ছুটে গেল। তালহাও আর দাঁড়িয়ে রইল না। নদীর পাড় ঘেঁষে ধীরে ধীরে দৌড়াতে শুরু করল। ভেজা ঘাস ও ভেজা মাটির ওপর দিয়ে দু’জন ছুটছে, পেছনে পড়ে থাকছে তাদের পায়ের ছাপ। মেহরীন বারবার হাত বাড়িয়ে তালহাকে ধরতে চাইছে। কখনো তার শার্টের এক কোণা ছুঁয়েও যাচ্ছে, আবার ঠিক তখনই তালহা তাকে ফাঁকি দিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। কখনো সে মেহরীনের দিকে ফিরে উল্টোই দৌড়াচ্ছে তাও মেয়েটা তালে ধরতে অক্ষম।
—এই! দাঁড়ান!
—ধরতে পারলে দাঁড়াব!
তালহার কথায় মেহরীন আরও জোরে ছুটল। এভাবেই কিছুটা দূরে গিয়ে তালহা আচমকা থেমে গেল। নদীর কিনারায় ঝুঁকে দু’হাত ভরে পানি তুলে নিল। মেহরীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক মুঠো ঠান্ডা পানি এসে পড়ল তার মুখে। চমকে উঠে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল সে। পরক্ষণেই ঠোঁট ফুলিয়ে তালহার দিকে তাকাল,
—আপনি…!
তালহা হো হো করে হেসে উঠল। মেহরীনও হার মানার পাত্রী নয়। সেও ঝটপট নিচু হয়ে দু’হাতে পানি তুলে সোজা ছুড়ে মারল তালহার দিকে। এরপর দু’জনের চোখাচোখি হতেই আবারও হেসে উঠল তারা। শুরু হয়ে গেল এক অন্যরকম যুদ্ধ। বোধহয় ভালোবাসার যুদ্ধ। একবার তালহা পানি ছুড়ে দিচ্ছে, একবার মেহরীন পাল্টা জবাব দিচ্ছে। একজন আরেকজনকে ভেজানোর চেষ্টায় নদীর কিনারা যেন হাসির কোলাহলে মুখর হয়ে উঠল। ভেজা কাপড়, এলোমেলো হাসি। দুজনই সময়টা খুব করে উপভোগ করছে। চিন্তা নেই অন্য কোনো কিছুর, মেতে আছে নিজেদের মাঝে।
এরইমাঝে তালহা এগিয়ে এসে মেহরীনের কবজিটা ধরে ফেলল। তাকে নিয়ে ছুটে গেল কিনারা থেকে কিছুটা দূরে। বিস্তৃর্ন কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে এসেই টানে তাকে নিজের বুকের কাছে এনে দাঁড় করাল। মেহরীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তালহা নিচু হয়ে দু’হাতে তার কোমর জড়িয়ে নিল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে শূন্যে তুলে নিল সে।
চমকে উঠে মেহরীন স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু’হাত বাড়িয়ে তালহার গলা জড়িয়ে ধরল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে লজ্জা আর বিস্ময় মেশানো স্বরে বলল,
—কী করছেন? নামান আমাকে কেউ দেখবে…
তালহা মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল,
—দেখুক।
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে ঘুরতে শুরু করল। প্রথমে মেহরীন কিছুটা ভয় তালহাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সেই ভয় মিলিয়ে গেল। তার জায়গা নিল একরাশ উচ্ছ্বাস। ধীরে ধীরে সে তালহার গলা থেকে এক হাত সরিয়ে দিল, তারপর আরেক হাতও। দু’হাত মেলে দিল আকাশের দিকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তার মুখ, চুল আর চোখের পাতায় এসে পড়ছে। চোখ বন্ধ করে সে অনুভব করতে লাগল বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা, বাতাসের প্রতিটি ছোঁয়া, বিশেষ করে তালহাকে। আর তালহা? সে ঘুরছিল ধীরে ধীরে, নিজের পৃথিবীটাকে দুই হাতে আগলে নিয়ে।
একসময় তালহা ধীরে ধীরে মেহরীনকে মাটিতে নামিয়ে দিল। ততক্ষণে বৃষ্টিটাও প্রায় থেমে এসেছে। আকাশের কালো মেঘের ফাঁক গলে এক চিলতে আলো উঁকি দিচ্ছে। ভেজা বাতাসে চারপাশটা আরও স্নিগ্ধ, আরও শান্ত। মেহরীন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তালহার দিকে। তার মুখজুড়ে তখনও লেগে আছে প্রাণখোলা হাসির রেশ।
বৃষ্টিতে ভিজে হিজাবটা খানিকটা সরে গিয়েছে। কপালের সামনে কয়েক গোছা চুল বেরিয়ে এসে মুখের ওপর লেপ্টে আছে। তালহা ভীষণ যত্ন নিয়ে আঙুলের ডগায় চুলগুলো সরিয়ে আবার হিজাবের ভেতরে গুঁজে দিল। আলতো করে হিজাবটাও ঠিক করে দিল। খুব মনোযোগ দিয়ে সে তা করছিল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকে পরম যত্নে আগলাচ্ছে সে। হিজাব গুছিয়ে দিয়ে সে মেহরীনের দুগাল হাতের আঁজলায় নিল। কপালে নিজের ঠোঁটের দীর্ঘ, গভীর এক ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল।
তারপর কোনো কথা না বলে আবারও তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। মেহরীনও দু’হাত তুলে তালহার পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটো নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে এলো। এই বুকেটুকুই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তালহা ধীরে ধীরে মুখটা তার কানের কাছে নিয়ে গেল। নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
—দেখতে দেখতে আমাদের আড়াইটা বছর কেটে গেল। আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাওনি তো?
কথাটা শুনতেই আচমকা মেহরীনের চোখ ভিজে উঠল। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। সে আরও শক্ত করে তালহাকে আঁকড়ে ধরল। কান্নাভেজা কণ্ঠে হেসে বলল,
—হ্যাঁ খুব খুব বিরক্ত। এতটাই বিরক্ত যে এই বিরক্তিটা আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে চাই। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
তালহার বুকটা উষ্ণ হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির এক প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল। মেহরীনকে পাঁজাকোলে তুলে নিল সে। দু’জনের চোখ এক হয়ে রইল দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত। তাদের চিন্তায় চারপাশের পৃথিবী যেন তখন আর ছিল না, ছিল শুধু দুটি হৃদস্পন্দন আর এক সমুদ্র ভালোবাসা। মেহরীনকে বাইকে বসিয়ে তালহা মৃদু হেসে তার কপালে নিজের কপাল ছুঁইয়ে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৭
—অপেক্ষার প্রহর অবশেষে শেষ হলো। এবার তোমাকে একান্ত নিজের করে পাওয়ার সময়।
একটু থেমে, চোখভরা ভালোবাসা নিয়ে আবার বলল,
—আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটাকে এবার আমার ঘরে তুলে আনার সময় এসে গেছে। এবার থেকে তোমার প্রতিটি সকাল আমার পাশে শুরু হবে, প্রতিটি রাত শেষ হবে আমার বুকে।
