Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৩
নুসাইবা আরা নুরি

মেহেরাজের কন্ঠে রাগ স্পষ্ট। নাবিলা আরো কিছু বলতে যাবে এগিয়ে তখনই মেহেরাজের নজর যায় দরজার দিকে।সেখানে নিজের মা আর খালাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেগে বলে উঠে,
-নাটক দেখতে এসেছো এখানে তোমারা??
মেহেরাজের কথায় চমকে উঠে নাহিদা খাতুন সহ আছিয়া রহমান।নাহিদা খাতুন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই মেহেরাজ রেগে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-এই মেয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করার সাহস কোথায় পেলো আম্মু।বলো।
-আসলে??
-আসলে কি আম্মু।বাইরের লোক হটাৎ আমার ঘরে প্রবেশ করবে আমার কোনো প্রাইভেসি নেই।
মেহেরাজেত কথাটায় অপমানিত বোধ করলো আছিয়া রহমান।তাই মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

-আমরা কি বাইরের লোক বাবা??
-আপন মানুষ ও তো না।নয়তো আমার নামে এতো বড় মিথ্যা অপবাদ ছড়াতেন না আপ্নারা।
মেহেরাজের কথার মানে বুজতে পেরে চুপ হয়ে যায় আছিয়া রহমান।ছেলেকে রেগে যেতে দেখে নাহিদা খাতুন মেহেরাজের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
-শান্ত হ বাবু।আমি পাঠিয়েছিলাম নাবিলাকে।আমার ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দে।
-ওদের এখান থেকে যেতে বলো।
নাহিদা আছিয়া রহমানের দিকে তাকালে আরো বেশি অপমানিত হয় আছিয়া রহমান।মাথা নিচু করে বেরিতে দরজা পর্যন্ত যেতেই মেহেরাজ গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-আপনার এই টিকটক প্রতিবন্ধী মেয়ে কেও সাথে করে নিয়ে যান।
কথাটা বলে নাবিলার দিকে তাকিয়ে ধমকের কন্ঠে বলে,
-এই মেয়ে কানে কথা যায় না।নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে আছো এখোনো বের হও আমার ঘর থেকে।
মেহেরাজ আর তাকায় না।কাবার্ড থেকে জামা কাপড় বের করে নিয়ে আবারো ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।যাওয়ার আগে নাহিদা খাতুনের উদ্দেশ্য বলে যায়,
-আম্মু আমি এসে যেনো দেখি ওরা আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে নয়তো এর ফল কিন্তু ভালো হবে না।
মেহেরাজ আর না দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়।তখন নাহিদা খাতুন নাবিলার দিকে তাকাতেই চোখ ছল ছল করে নাবিলা কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।নাহিদা খাতুন দুটানায় পড়েন।একদিকে নিজের ছেলে অন্য দিকে নিজের বোন আর বোনের মেয়ে।কোনটাকে সামলাবে।নাহিদা খাতুন মেহেরাজের বিছানাটা গুছিয়ে দিতে শুরু করে হাত লাগিয়ে।

সকালে সবার আজ দেরি করে ঘুম ভেঙেছে।শরীর টা ম্যাজম্যাজ করায় আলতাফ শেখ আজ আর দোকানে যাবেন না।খাদিজা খাতুনের ও আজ চোখে ঘুম লেপ্টে আছে।বুজতে পারছে আজ হলোটা কি।তবে সকাল সকাল শেখ বাড়িতে আগমন হয়েছে তুহিনের।তুহিন এসে সব জানা সত্তেও সিয়ামের খোজ করে।তারপর সবার সাথে কথা বলতে থাকে।
আজ সকালের নাস্তা তোহা নিজে হাতে বানিয়েছে। শ্রেয়সী আজ বেলা করে ঘুমিয়েছে।সকালের খাওয়া দাওয়া শেষ করে সোফায় বসে আছে সবাই।তখন তুহিন আলতাফ শেখ এর উদ্দেশ্যে বলে,
-আঙ্কেল একটা কথা বলার ছিলো??
তুহিনের কথায় ঘুম ঘুম চোখে আলতাফ শেখ বলেন,
-হ্যাঁ বাবা বলো।
-আসলে তুশির জ্বর।তোহার জন্য কান্নাকাটি করছে তাই যদি অনুমতি দিতেন দু-একদিনের জন্য তোহাকে একটু নিয়ে যেতাম।
তুহিনের কথায় আলতাফ শেখ খাদিজা খাতুনের দিকে তাকাতেই উনি মাথা নাড়ান।তা দেখে আলতাফ শেখ বলেন,

-আচ্ছা নিয়ে জাও সমস্যা নেই।সিয়াম আসার আগে দিয়ে যেও।নয়তো বাড়িতে এসে তোহা মাকে না দেখলে বাড়ি মাথায় তুলবে।
এ যেনো মেঘ না চাইতেই জল।তুহিন মনে মনে খুশি হলো।যাক বাড়ির কেও তাহলে সিয়াম কে বলবে না।তোহা ভদ্রতার খাতিরে শ্রেয়সীকেও সাথে নিতে চাইলে শ্রেয়সী বাধা দেয় কারন আজ তার মেহেরাজের সাথে একটু বের হতে হবে।তাই শ্রেয়সী বলে,
-না ভাবি।তুমি যাও।অন্য একদিন আমি ভাইয়া তুমি গিয়ে ঘুরে আসবো।
তোহা আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শ্রেয়সী মাথা চুলকে বলে উঠলো,
-তুমি তো জানো ভাবি কতটা পড়ার চাপ।আজ আবার দুপুর দুইটাই যেতে হবে।ইমারজেন্সি না গেলে রেগে যাবে স্যার।
শ্রেয়সীর কথাটা সবাই স্বাভাবিক মনে করলেও তোহা বুজতে পারলো আসল কাহিনী।আর সে নিজেও চাচ্ছে না শ্রেয়সী যাক।কারন সে যাচ্ছে ইনভেস্টিকেশন করতে সেখানে শ্রেয়সীকে কিভাবে নিবে।তাই তোহা মাথা নাড়িয়ে বলল,

-ঠিক আছে ননদিনী।
খাদিজা খাতুনের কথায় তোহা ঘরে চলে গেলো রেডি হতে।তোহা ঘরে এসে ছোট ল্যাগেজ এ নিজের ল্যাপট্প আর কয়েকটা জামা কাপড় নিলো।তারপর বেরিয়ে পড়লো।সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এসে গাড়িতে বসতেই তোহা নিজের পরনের বোরকা খুলে ফেললো।তারপর তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এই সত্যি তুশির জ্বর??
-হুম।
-ওহ।তাও ভালো। নয়তো ছোট মানুষের নামে মিথা বলার জন্য তোর কপালে দুঃখ ছিলো!!
-তুশিদের ওখানে যাবি নাকি আমার ফ্লাটে যাবি??
-তোর ফ্লাটে চল।বিকালে গিয়ে তুশিকে দেখে আসবোক্ষন।
-আচ্ছা।
তুহিন আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো।এ বাড়ির কেও জানে না যে তুশি তাদের আপন বোন না। এদিকে তুশি ও জানে না তুশির আপন ভাই বোন না এরা।তবে তুশির বাবা মায়ের কাছে তার জন্মের আগে থেকেই বড় হয়েছে বলে ভাই বোন এর পরিচয় পেয়েছে।আর এই সত্যি হয়তো তুশি জানবেও না কখোনো।
তোহারা যেতেই আলরাফ শেখ আবারো ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।খাদিজা খাতুন ও চোখে বার বার পানি দিয়ে কাজ না হওয়ায় মোবাইলে শ্রেয়সীকে দিয়ে এলার্ম দিয়ে সুয়ে পড়েন যাতে রান্নার আগে উঠতে পারে।শ্রেয়সী বুজে না বাবা মায়ের এমন ঘুমের কারন যারা ফজরের নামাজে যেগে যায় তারা আজ এতো ঘুমাচ্ছে।কয় সে আর ভাবি তো ঠিক।তাহলে কি।বাবা মা কোনোভাবে ঘুমের ওষুধ টশুধ খেয়েছে।
আর খাবে কেন।নাকি কাল রাতে বাড়িতে কেও এসেছিলো।সে আর ভাবি উপরে ছিলো বলে ঠিক আছে আর নিচে তার বাবা মায়ের ঘরে।শ্রেয়সীর মাথায় টাকার কথা আসতেই মনে মনে বলে,

-নিশ্চয় কেও ভাই বাড়িতে নেই বলে ড়াকা চুরির জন্য এসেছিলো।ভাইয়া বাড়ি আসলেই সব খুলে বলবো।নয়তো আমাদের তো বড় কোনো বিপদ হবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ।শ্রেয়সী মনে মনে সুদ্ধান্ত নিয়ে নেই ঘুমের ঘটনা আর শব্দে ঘুম ভাঙার কথা বলে দিবে তার ভাই বাড়ি আসলে আপাতত বাবা মাকে কিছু বলবে না নয়তো চিন্তা করবে।শ্রেয়সী আর না ভেবে নিজের ঘিরে ঢুকে পড়ে।

ইরুর মন ভালো না।এখন পড়তে যাওয়ার সময় আর ফাহিমের দেখা পাওয়া যায় না।রাস্তার পাশের সেই চায়ের দোকান্টায় অন্য লোকজন দাঁড়িয়ে চা খেলেও ফর্মাল প্যান্ট এর সাথে চেক শার্ট প্রা ফাহিমকে আর দেখতে পায় না ইরু।খুব খারাপ লাগে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে।চোখ জোড়া বার বার লোকটাকে খুজে বেড়ায়।একবার যদি দেখা পেতো মাফ চেয়ে নিতো।
এই দু দিনে ইরু অনুভব করেছে আসলেই সে ফাহিম নামের লোকটাকে ভালোবাসে।সেজন্যই তো লোক্টার সাথে করা খারাপ ব্যাবহারের কথা মনে আসতেই নিজের উপর রাগ উঠে।চোখের কোনে নোনাজল এসে ভিড় করে।ইরু এই দুদিন ও রোকেয়ার হাতে মার খেয়েছে গরম পানির ছেক ও খেয়েছে তবে আর ব্যাথা লাগেনি কারন মন টা ক্ষত বিক্ষত হলে কি শরীরে ব্যাথা লাগে।ইরু কাদেনি কেন সেজন্য ও রোকেয়া তাকে পিটিয়েছে নোংরা তুলো যেভাবে রাস্তায় ফেলে পিটাই ঠিক সেভাবেই।শরীরে অনেক যায়গায় রক্ত জমাট বেধেছে।

ইরুর আর ভালো লাগছে না।লোক্টার কাছে সেদিনের ঘটনার জন্য মাফ চাইতে পারলে সব খুলে বলতে পারলে হয়তো ভালো লাগতো।বার বার আটকে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস টা ছাড়তে পারতো।লোকটা কি তাকে মাফ করবে নাকি আরো অপমান করে তাড়িয়ে দিবে।আসলেই কেনই বা অপমান করবে না ইরু কি আদেও তার যোগ্য।
ইরুর আর ভালো লাগে না।লোকটাকে ভিষন দেখতে মন চাইছে।জোরে কেদে ফেলতে ইচ্ছে করছে।চায়ের দোকানে ফাহিম ছিলনা বলে ইরু ঘরে নিজের কষ্ট কমাতে পাশের গলির রাস্তা দিয়ে এসেছে।ইরুর ভাবে হয়তো অভাগী দের কপাল সব সময় খারাপ হয়।তাই তারা কিছুর মুল্য দিতে জানেনা।বুকের ভিতর মুচড়ে উঠতেই ইরুর চোখে পানি টলমলিয়ে উঠে ইরু চোখ থেকে পানি পড়ার আগেই উড়না দিয়ে মুছে নেয় সাথে সাথে কারোর বুকের সাথে ধাক্কা খাই সে।মাথা গিয়ে ঠেকে তার বুকের মাঝ খানে।ইরু কিছু বুঝে উঠার আগেই লোকটা শক্ত করে নিজের বুকে চেলে ধরে ইরুকে।

হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে একটা কালো রঙের MT 15 মডেলের বাইক।মিডিয়াম স্পীডে চলছে বাইক টি অজানা গন্তব্যে।যতদুর চোখ যায় আজ ততদুর যাবে দুজনে।মেহেরাজ বাইকের গতি সীমিত বাড়িয়ে বলে,
-ভালো করে ধরে বসুন মিসেস।ঘাড় নয় বুক জাপ্টে ধরুন যেখানে আপনার স্থায়ী বসবাস।
মেহেরাজের হেলমেটের ভিতরে বলা কথা স্পষ্ট গুলো বুজতে না পারলো ধরে বস্তে বলার কথা শুনেছে।ঘাড় থাকে হাত নামিয়ে লজ্জায় জড়িয়ে ধরতে পারছে না শ্রেয়সী।কিভাবে ধরবে। তা দেখে মেহেরাজ হটাৎ দুজাত বাইক এর হ্যান্ডেল থেকে ছেড়ে দিয়ে হাত দুটো পিছনে করে শ্রেয়সীর হাত জোড়া নিজের বুকের সাথে রেখে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩২

-এভাবেই ধরে বসুন।লজ্জার কিছু নেই আমি আপনার অর্ধাঙ্গ।
এদিকে মেহেরাজের এমন কান্ডে অবাকের পাশাপাশি চরম ভয় পায় শ্রেয়সী।একে তো হাইওয়ে ফাকা রাস্তা তারপর ভালোই স্পীড এ চলছে বাইক।সেখানে এই লোক হাত ছেড়ে দিয়ে বাইক চালাচ্ছে।শ্রেয়সীর হেলমেটের মাঝে আতঙ্কিত কাজল কালো চোখ জোড়া দেখে মেহেরাজের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে।বাইক এর হ্যান্ডেলে হাত রেখে স্পীড আরো বাড়িয়ে দিয়ে শ্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here