Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৬
মারিয়াম ফুল

মেহের নূরকে আবার জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু নূরের শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে জানে মির্জার হিংস্রতা কত ভয়ংকর হতে পারে। ড্রয়িং রুমের বাতাস ভারী হয়ে আছে। একে একে সবাই মেহেরের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। নূর জানে, এত সহজে কিছু ঠিক হওয়ার নয়। তবুও যাওয়ার আগে মেহেরের দিকে সান্ত্বনার এক ফোঁটা শুকনো বাণী ছুড়ে দিল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে মেহের, তুই চিন্তা করিস না।”

এই বলে নূরও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
মেঘলা তখনো বাড়ির বাইরে ছিল। সায়েদ ভিলায় একটু আগে বয়ে যাওয়া সেই তছনছ করা তুফানের কথা সে জানত না। লিভিং এরিয়ার মেঝেতে তখনও বসে আছে মেহের। কান্না এখন থেমে গেছে, তার চোখ দুটো এখন অনুভূতিহীন, শূন্য। মেঘলা বাড়িতে ঢুকে মেহেরকে ওভাবে মাটিতে বসে থাকতে দেখে আঁতকে উঠল। ছুটে এসে মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মেহের…. কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?মেহের পাথুরে গলায় উত্তর দিল, “সব শেষ হয়ে গেছে, মেঘলা। অন্তু আমাকে শুধু ধোঁকা দেয়নি, ও আমাকে জীবন্ত কবর দিয়ে গেছে।”
এরপর একে একে সেই বীভৎস বিকেলের সবটুকু মেঘলার কাছে উগরে দিল সে।মেহেরের মনে হলো, অন্তু হয়তো সত্যিই তাকে ধোঁকা দিয়ে কোথাও চলে গেছে।
অপরদিকে চৌধুরী নিবাসে…
রুদ্র তখন তার রুমে ফ্লাইটের জন্য তৈরি হচ্ছে। এয়ারপোর্টে যেতে হবে, নেক্সট ডিউটি। রুদ্রর মা পাশে এসে অস্থির হয়ে বোঝাচ্ছেন,

“রুদ্র, এখন যাস না। মেয়ে পক্ষ যদি দেখা করতে চায়, আমি কী বলব? উনি আসলে ভিতরে ভিতরে ভয় পাচ্ছিলেন যদি রুদ্র ফিরে না আসে। ”
রুদ্র শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “মা, একটা বিয়ের জন্য আমি আমার প্রফেশনাল কমিটমেন্ট নষ্ট করতে পারি না। আমার মেয়ে দেখার দরকার নেই। তোমাদের আর দাদার পছন্দ হলে আমি রাজি।”
মা তবুও দমে না গিয়ে বললেন, “যদি মেয়ে নিজে থেকে দেখা করতে চায়?”
রুদ্র দরজার দিকে পা বাড়িয়ে রুক্ষ গলায় জবাব দিল, “ঠিক আছে, ও যদি চায় তবে ফিরে এসে দেখা করব।”
হামজা চৌধুরী ড্রয়িং রুমে বসে বিলাপ করছেন,
“তুমি তোমার ছেলেকে অন্ধবিশ্বাস করো মা! ও যদি এখন চলে যায় আর না আসে?”
দাদি পাশে থেকে অভয় দিয়ে বললেন,

“আসবে, আমার দাদু ভাই ঠিক ফিরে আসবে।”
হামজা চৌধুরী রাগে গজগজ করে বললেন, “দোয়া করো যেন আসে, নাহলে এবার আমি ওকে দেখে নেব।”
দাদি মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলেন, “হুম, দেখে নেবে! কত দেখলাম।”
ফিরে আসা যাক সায়েদ ভিলায়…
সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না। সায়েদ ইমরান সাহেবের দেওয়া সেই ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। মেহের এখন তার বাবা-মা আর বড় ভাই মির্জার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সে অন্তু বা তার পরিচিত কাউকে ফোন করতে বাকি রাখেনি, কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নেই।
বাবা সায়েদ ইমরান ভারী গলায় বললেন,
“বিয়েটা করে ফেলো মেহের। কেউ জানবে না তোমার আগে বিয়ে হয়েছিল।”
মেহের এবার চিৎকার করে উঠল, “বাবা আমি বিবাহিত।ইসলামে বিবাহিত নারী প্রথম স্বামী জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে না…”
এতক্ষণ চুপ করে থাকা মির্জা এবার মুখ খুলল। তার কণ্ঠে বরফশীতল নিষ্ঠুরতা, “তাহলে মেরেই ফেলি আপদটাকে?”মেহেরের চোখে প্লাবন থাকলেও কণ্ঠে ছিল আগ্নেয়গিরির তেজ। সে গর্জে উঠল, “খবরদার! ও আমার বাচ্চার বাবা…”

নিস্তব্ধ ড্রয়িং রুমে বোমা ফাটল যেন। কামিনী আর সায়েদ ইমরানের চেহারা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মেহের সত্যটা গোপন রাখত চেয়েছিল,
কিন্তু গর্ভস্থ সন্তানের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সে সবটুকু হারাল। মির্জা এক বীভৎস অট্টহাসি দিয়ে উঠল,
“তোর কী মনে হয় মেহের, আমরা কিছু জানি না? সায়েদ বংশের মেয়ের ঘরের খবর আমরা রাখব না? তুই এক বছর আগে গোপনে বিয়ে করলি আর আমরা কিছুই বুঝলাম না? বাবা, বিয়ের প্রস্তুতি নিন। ”
কামিনী কয়েক কদম এগিয়ে এসে মেহেরের চোয়াল শক্ত করে ধরলেন। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলেন,
“কতদিন? কত মাস হয়েছে তোর এই নোংরামির?”

মেহের তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, মায়ের হাতের চাপ আর নিজের ভেতরের ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। তার বলতে ইচ্ছে হলো, খুব— এই বাচ্চা কোনো পাপ নয়, বরং হালাল… কিন্তু সে তখন কিছুই বলতে পারল না…সে কোনোমতে কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল, “তিন… তিন সপ্তাহ মাত্র।”
তিন সপ্তাহ! কামিনীর চোখে এক পৈশাচিক আভা খেলে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, সময় যেহেতু খুব অল্প, তাই এখনই শেষ করে দেওয়া সহজ। তিনি মির্জার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন।
কামিনী বেগম মেহেরের চুলের মুঠি ধরে তাকে হেঁচকা টানে মেঝের দিকে নামিয়ে আনলেন। হিসহিস করে বললেন, “তিন সপ্তাহের পাপ? এই ভ্রূণ পৃথিবীর আলো দেখবে না। কেউ জানবে না এই ড্রয়িং রুমে আজ কী হয়েছে।”

মেহেরের বাবা লজ্জায় সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন।একটিবার ফিরেও তাকালেন না মেহেরের দিকে… মেহের শুধু চেয়ে চেয়ে বাবার নিষ্ঠুরতা দেখেই গেল। কামিনী অ্যাবরশনের কিছু ওষুধ আনালেন।
যেহেতু প্রেগন্যান্সি একদম প্রাথমিক পর্যায়ে, তাই এটিই ছিল তাঁদের কাছে সহজ পথ। কামিনী এক হাত দিয়ে মেহেরের গাল চেপে ধরলেন, আর মির্জা তার পেশীবহুল হাত দিয়ে মেহেরের হাত-পা চেপে ধরল। মেহেরের আর্তনাদ ঘরের দেয়াল চিরে দিলেও কারও মনে দয়া জাগল না। কামিনী জোর করে মেহেরের গলায় সেই বিষাক্ত বড়িগুলো পুরে দিলেন।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৫

ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মা আর ভাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মেহেরকে একলা মৃত্যুসম যন্ত্রণায় ফেলে। মেহের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৭