অভিসৃতি পর্ব ৪
নওরিন কবির তিশা
আহসান কুঞ্জের দোতলায় মস্ত শোরগোল। ধাপে ধাপে প্রতিটি ফ্ল্যাটে মিষ্টি পৌঁছে দিয়ে সাজেদা চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরলেন,পিছু পিছু ট্রে হাতে এলো ইথিকা। সাজেদা চৌধুরী থালা থেকে একটা রসে টইটুম্বুর মিষ্টি তুলে নিয়ে সোজাসুজি এগিয়ে গেলেন ইকবাল সাহেবের দিকে। আলতো করে স্বামীর মুখে মিষ্টিটা গুঁজে দিতেই ইকবাল সাহেব ভ্রু কুঁচকে বিষম খাওয়ার উপক্রম হলেন। চশমাটা নাকের ওপর টেনে নিয়ে বললেন,,
“ব্যাপার কী, গিন্নী? ভর সন্ধ্যায় এমন জাঁকজমক মিষ্টিমুখের রহস্যটা কী?”
সাজেদা চৌধুরী শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে বেশ আত্মতৃপ্তির হাসিতে বললেন,,
“আমি আমাদের বাড়ির বড় ছেলের জন্য পাত্রী পছন্দ করে ফেলেছি।”
এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নামলো কক্ষে। ইথিকার শাশুড়ি, অর্থাৎ আতিকা বেগম এগিয়ে এসে কৌতূহলী গলায় বললেন,,
“বলো কী, বুবু! সত্যি? তা মেয়ে কেমন? আমাদের দুর্জয়ের পাশে মানাবে তো?”
সাজেদা চৌধুরী থালা থেকে আরেকটা মিষ্টি যা’কে খাইয়ে দিয়ে বললেন,,
“আমার পছন্দ কখনো খারাপ হতে পারে? যেমন চেহারা, তেমনই মিষ্টতা তার চঞ্চলতায়। একেবারে প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো একটা মেয়ে। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।”
পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকে প্রশ্ন ছুড়তে লাগল-“মেয়ের বাড়ি কোথায়, কী পড়ে, পরিবার কেমন।”তীব্র কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে ইথিকা মূল কথাগুলো বলতেই চরম আশ্চর্যান্বিত ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলে। মানে,শুধুমাত্র চোখের দেখায় পছন্দ হয়েছে আর মেয়েটার সাথে একবার কথা বলেই এমন হুলুস্থুল কাণ্ড!
এতো এতো কৌতূহল-বিস্ময়ের ভিড়েও শুধু একজনই পুরো আড্ডার রসভঙ্গ করে এক কোণে উদাসীন হয়ে সোফায় বসে ছিল-দুর্জয়। হাতে ট্যাবলয়েড পত্রিকা, মৌখিক অভিব্যক্তিতে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর খবরটি সে মাত্র পাঠ করেছে। ইকবাল সাহেব হালকা হেসে ছেলের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে বললেন,,
“সবই তো বুঝলাম, কিন্তু প্রধান আসামির অভিব্যক্তি তো বলছে সে এখনো বিচারে সায় দেয়নি!”
সাজেদা চৌধুরী দুর্জয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ বড় করে বললেন,,
“ওর অভিব্যক্তি নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি যা ঠিক করেছি, সেটাই চূড়ান্ত। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আমরা ওদের বাড়িতে কথা বলতে যাচ্ছি!”
দুর্জয় পত্রিকাটা একপাশে সরিয়ে রেখে নিচু স্বরে বলল,,
“আম্মা, তুমি কি পাত্রীর নাম-পরিচয় বা ওদের পরিবারের সম্মতি ছাড়াই এত দূর ভেবে নিলে?”
সাজেদা চৌধুরী একগাল হেসে বললেন,,
“অভিজ্ঞ চোখের দেখা, আব্বাজান! সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি শুধু শেরওয়ানির রঙটা পছন্দ করে রাখো।”
হৈমন্তিক রৌদ্ররশ্মির কোমলতা হ্রাস পেয়েছে আজ;বেশ প্রখর তার দাপট।একটানা দেড় ঘণ্টার ক্লাস নামক বন্দিত্বের সমাপ্তিতে মাথার ভেতর রৈখিক আর বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদ বন্টনের নানা সমীক্ষা ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ,পিছু ডেকে উঠল ইভান,
“দোস্ত, সুন্দরবন ট্যুরে গেলে কেমন হয়?”
আচমকা এমন প্রস্তাবে কায়রা থমকে দাঁড়াল। ততক্ষণে ওদের বন্ধুদলের বাকি সদস্যরাও গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে।সবার পক্ষ থেকে নিহার বলল,,
“আইডিয়াটা খারাপ না! বায়োজিওগ্রাফির ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য আমাদের তো এমনিতেও ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম ভিজিট করা দরকার। ট্যুর উইথ স্টাডি!”
বাড়ি চার সদস্য এক বাক্যে লাফিয়ে উঠল,
“একদম পারফেক্ট! ডান!”
কিন্তু,এত উচ্ছ্বাসের মাঝেও কায়রার মুখটা পানসুটে। আষাঢ়ে কৃষ্ণাভ মেঘ জমেছে সেথায়,ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোরা যে এত সহজে লাফাচ্ছিস, আমার বাড়িতে কী ঝামেলা হবে জানিস? ফুফুকে তোরা চিনিস না! আমাকে কিছুতেই খুলনার বাইরে যেতে দেবে না। ট্যুরের কথা শুনলেই উনি এক চান্সে রিজেক্ট মারবেন।”
ইভান একগাল হেসে বলল,
“আরে ভাই, তুই এত ভেজা বেড়াল হয়ে যাচ্ছিস কেন? তোকে কে বলেছে ফান ট্যুরের কথা বলতে? তুই সোজা বাড়িতে গিয়ে বলবি যে এটা ডিপার্টমেন্টের অফিশিয়াল ফিল্ড ট্রিপ। ১০ নম্বরের প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট আছে। সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম আর সয়েল প্রোফাইল না দেখলে নাকি বায়োজিওগ্রাফিতে ফেইল মারবি! ব্যাস, আর আটকায় কে?”
তূজা যোগ করল,
“হ্যাঁ রে কায়া! ডিপার্টমেন্ট থেকে নোটিশের মত একটা বানাইয়া তোকে দিচ্ছি, তুই ফুফুকে দেখালেই কেল্লাফতে। মার্কসের ভয় দেখালে দুনিয়ার কোনো অভিভাবক ‘না’ করতে পারে না!”
“যেমন তোরা,তেমন তোদের গু মার্কা বুদ্ধি! আমার বাপরে কি বলদ মনে হয়? ফুপি গিয়ে বলবে,‘আনোয়ার একবার খোঁজ নেতো ভাই।’ আর আমার বাপ সোজা কল লাগবে প্রিন্সিপালের কাছে!”
কায়রার এমন নিরেট কথায় মুহূর্তেই পুরো দলের উত্তেজনার বেলুনটা ফুস করে ফেটে ছিদ্র দিয়ে উচ্ছ্বাসগুলো চোরা পালান দিলো।হতাশ লোচনে তাকালো সবগুলো। ইভান ব্যথিত কণ্ঠে বলল,
“তোর বাপ আর ফুপুর গোয়েন্দাগিরির কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম কায়া! সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাও ওনাদের কাছে ফেল।”
নিহারও যুক্ত হলো দুঃখে,
“মানে সোজা কথায়, সুন্দরবনের হরিণ আর ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের স্বপ্ন এখানেই সমাপ্ত?”
“শুধু সমাপ্ত না, একবারে ভস্মীভূত!তোরা তো জানিস না, আমার ফুপুর নাম কেন ‘আয়রন লেডি’! ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিটা সেকেন্ডের হিসাব ওনাকে দিতে হয়। খুলনা থেকে একদম খুলনা ছেড়ে সুদূর সুন্দরবন পর্যন্ত যাওয়ার পারমিশন? অসম্ভব! ওনার সামনে এই প্রস্তাব রাখা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। আর ভুলক্রমে যদি বাবা প্রিন্সিপাল স্যারকে ফোন মারে, তখন তো ট্যুর তো দূরের কথা, এই সেমিস্টারে আমার বাড়ি থেকে বের হওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে!”
তূজা হতাশ কন্ঠে বলল,
“কী যে করিস না কায়া! তোদের এই কঠোর শাসনের জন্য আমাদের মতো নিরীহ বন্ধুদের জীবনটাও তছনছ হয়ে গেল। কত প্ল্যান করেছিলাম—সুন্দরবনের খাঁড়িতে ট্রলারে বসে গান শুনব, ঘুরে বেড়াব, সেলফি তুলব সব ফাহহহ করে দিলি,বা’ল!”
ইভান হতাশ ভঙ্গিতে হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়ে ঘোষণা করল,
“তাহলে ভাই ও বোন সকল, সর্বসম্মতিক্রমে আমাদের বহুপ্রতীক্ষিত ‘সুন্দরবন অ্যাডভেঞ্চার’ শুভ সমাপ্তি লাভ করল! ট্যুর ক্যান্সেল!”
সবাই মিলে একযোগে হা-হুতাশ করতে লাগল। তবে কায়রা ওদের মন খারাপ দেখে একটা শ”য়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“আহা, এত কান্নাকাটি করিস না তোরা! সুন্দরবন না হয় হলো না, কিন্তু রিকশা নিয়ে গল্লামারি ব্রিজে গিয়ে ফুচকা তো খাওয়া যায় নাকি? সেই টাকাটা কে দিবি বল?”
ইভান খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“তোর ফুপু দেবে! পারমিশন না পাওয়ার দুঃখে এখন তোকে ফুচকা খাওয়াব আমরা?”
সবাই মিলে ডিপার্টমেন্টের করিডোর পেরিয়ে ক্যাম্পাসের বটতলার দিকে এগোতে লাগল। রোদ তখন একটু ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে। বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়ার মাঝেই এক ঝাঁক চড়ুই এগিয়ে চলেছে অজানা গন্তব্যে।
সন্ধ্যার পর থেকেই অন্যান্য দিনের তুলনায় অন্যরকম পরিবেশ অনুভব করল কায়রা। বাবা আজ বাসায় আছেন। সাধারণত এই সময়ে বাড়িতে ওনার দেখা পাওয়া দুষ্কর। করিডোর দিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে ড্রয়িংরুমে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলো, সোফায় বাবা-মা আর ফুফুর সামনে বসে আছে মধ্যবয়সী এক অচেনা লোক। যদিও বর্ষণের দিন নয় তবুও বিশাল এক কালো ছাতা বগলদাবা করে দেদারসে সম্মুখে থাকা খাবারগুলো চিবিয়ে চলেছেন।
ওনার খাদ্য গ্রহণের ধরনে নাক সিঁটকায় কায়রা। এভাবে খাবার খায় নাকি কেউ? গোগ্রাসে গিলছে মনে হচ্ছে! ও ভ্রু যুগল কুঁচকে নেয় মুহূর্তেই। ফুফু আর বাবা দু’একটা কথা বলছে।তবে, দূর হতে ওনাদের ওষ্টাধর সঞ্চালন প্রতীয়মান হলেও কর্ণগোচর হচ্ছে না কিছুই। আড়ি পেতে শুনতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে শেষমেষ সেখান থেকে ফিরে গেলো কায়রা।
“দেখুন আমরা বুঝেছি,সম্বন্ধ ভালো। আমরাও চাই আমাদের পরিবারের মেয়ে ভালো কোথাও যাক। তা বলে এটা তো হতে পারে না, না? যে বড় মেয়েকে রেখে আমরা ছোট মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করব। আর রইলো বাকি ভালো সম্বন্ধের কথা? এমন হাজারটা পাবো আমরা।”
আঞ্জুমান ইয়াসিরের এমন গম্ভীর কথার প্রত্যুত্তরে কাশেম সাহেব ফিচেল হেসে, দাঁত খুঁচিয়ে বললেন,,
“ভাইবা চিনতা কন আপা, খুলনাতি আপনাগে মাইয়ের লাইগে ভালো সম্বন্ধ পাবেন ইডা সত্যি। কিন্তু, ইরাম একটা ছুয়াল হাতছাড়া করা বোকামি হবে। উগে যদি আপনাগে ছোট মাইয়েরে ভালো লাগে। তাতো,ওর কথাই কবে। বড়ডারে হয়তো দেহিনি। অথবা পছন্দ করিনি। এক্ষেত্রে আমি কি করবো, কন?”
জবাবটা এবার আনোয়ার সাহেব করলেন, “দেখুন, বুঝেছি আপনার কথা। ছেলের পরিবার ভালো, ছেলেও ভালো। তবে এটা আমার বড় মেয়ে পায়রার জন্য হলে মেনে নেওয়া যাইতো। কায়রা নিতান্তই বাচ্চা। আর তাছাড়া, বড় মেয়ের আগে ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি নই আমি।”
“কি কন ভাইজান? আপনা্গে মাইয়ে ছোট? ভার্সিটিতে পড়ে শুনলাম। ছোট হয় ক্যামনে?”
কাশেম সাহেবের এমন কথার পিঠে আঞ্জুমান ইয়াসির তীব্র বিরক্তি চেপে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন,
“লেখাপড়া করলেই মেয়ে অমনি ধামড়া হয়ে যায় না, কাশেম সাহেব! সংসারের দায়-দায়িত্ব বোঝা আর ভার্সিটির করিডোরে বই হাতে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে আসমান-জমি ফারাক আছে।”
কাশেম সাহেব পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা একবার মুছে নিয়ে খ্যানখ্যানে গলায় বললেন,
“আরে আপা, আপনে চ্যাতেন ক্যান? আমার তো খাইদায় কাজ নাই যে আপনাগে ঘাড়ে জোড় কইরা জামাই চাপামু! বুজলেন না কথা? পাত্তরপক্ষ সুশীল সমাজ, উগে চয়েস আলাদা। উরা আপনাগে ছোট মাইয়েরে পছন্দ করেছে তাই আমারে পাঠাইছে,এত প্যাঁচালের তো কিছু দেহি না!”
আনোয়ার সাহেবের কপালে চিন্তার বলিরেখা স্পষ্ট। কাশেম সাহেবের মধ্যস্থতায় আসা সম্বন্ধটা উত্তম নিঃসন্দেহে, কিন্তু বড় মেয়েকে টপকে ছোট মেয়ের জন্য পাত্রপক্ষ বাড়িতে আসবে—এটা ওনার ব্যক্তিত্বে বাঁধছে। সমস্যার জটিলতা আঁচ করতে পেরে নূরা খান আলতো এগিয়ে এসে স্বামীর পাশ ঘেঁষে নিচু স্বরে বললেন,
“একটু এদিকে আসবে? একটা কথা ছিল।”
আনোয়ার সাহেব স্ত্রীর ইশারায় উঠে পাশের ছোট স্টাডি রুমটায় গিয়ে ঢুকতেই নূরা খান দরজার পাল্লাটা সামান্য চাপিয়ে দিলেন। বেশ চিন্তিত মুখে বললেন,
“তুমি অত শক্ত হয়ে আছ কেন বল তো? কাশেম তো একদম ভুল কিছু বলেনি।”
আনোয়ার সাহেব চোখ রাঙালেন,
“মানে? তুমিও ওদের সাথে তাল মেলাচ্ছ নূরা? লোকজনে কী বলবে? বড় মেয়ে ঘরে বসিয়ে ছোটটার বিয়ে দিচ্ছি? আর কায়রাটা কত ছোট, ও সংসার কী বোঝে?”
“আহা, শোনোই না আগে!” নূরা খান স্বামীর হাতটা ধরে একটু নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “পায়রা কাল রাতেও আমাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, আপাতত দু-তিন বছর ও বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। মাস্টার্স শেষ না করে ওর নাকি কোনো প্ল্যানই নেই। আর তাছাড়া সম্বন্ধটা যখন এতই ভালো—ছেলে এত ট্যালেন্টেড। এত কম বয়সে মেজর হওয়া তো চাট্টেখানি কথা না! তার ওপর আমাদের খুলনা শহরেই বাড়ি—তখন একবার এসে দেখতে দিলে ক্ষতি কী? পছন্দ না হলে তো আর জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে না।”
স্ত্রীর কথায় যুক্তি আছে। তবুও আনোয়ার খান দ্বিধাদ্বন্ধে ভুগলেন,,
“কিন্তু পায়রার দিকটা না ভেবে ছোট বোনের…!”
“পায়রাই তো কায়রাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি লাফায়! দাঁড়াও, ওকেই ডেকে পাঠাচ্ছি, ওর মুখ থেকেই শোনো।”
নূরা খান করিডোরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে এক পরিচারিকার মাধ্যমে পায়রাকে ডেকে পাঠালেন। কিছুক্ষণ পরেই পায়রা চুলে তোয়ালে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে এসে ঢুকল। বাবা-মায়ের থমথমে মুখ দেখে ও ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“কী হয়েছে আব্বু? অত জরুরী তলব কেন?”
আনোয়ার সাহেব মেয়েকে সোফায় বসিয়ে সমস্ত বিষয়টা খুলে বললেন। কাশেম সাহেবের প্রস্তাব আর ছোট বোনকে আগে দেখতে আসার পরিকল্পনা শুনে পায়রা এক সেকেন্ডও ইতস্তত করল না। বরং সশব্দে হেসে উঠে বলল,
“আরে আব্বু! এটার জন্য তোমরা আমাকে এত সিরিয়াসলি ডাকলে? আমি তো আগেই আম্মুকে বলেছি, আমি এখন কোনো বিয়ের চক্করে নেই! আর কায়াকে যদি কোনো ভালো পরিবার পছন্দ করে, তবে তো আমাদেরই লাভ। ও বাড়িতে থাকা মানেই প্রতিদিন একটা করে বিশ্বযুদ্ধ হওয়া! ও বিদায় হলে আমি বরং শান্তিতে পড়াশোনাটা করতে পারব।”
পায়রার অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে পিতৃ-দায়িত্বের এক বিশাল বোঝা থেকে মুক্তি পেলো আনোয়ার খান। কঠোরতা শিথিল হলো কিঞ্চিত। মেয়েকে চলে যেতে দিয়ে বড় বোনকে ডেকে পাঠালেন। আঞ্জুমান ইয়াসিরকে সবটা খুলে বলতেই উনি আর আপত্তি করলেন না। আনোয়ার সাহেব আবার ড্রয়িংরুমে ফিরে এলেন। সোফায় বসে কাশেম সাহেবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বললেন,
“ঠিক আছে কাশেম সাহেব। তুমি পাত্রপক্ষকে আগামীকালই আসতে বলো। মেয়েকে না হয় পছন্দ করেছে, আমরাও দেখি পরিবার কেমন।”
কাশেম সাহেব একগাল হেসে চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন,
“হায় হায় ভাইজান! এই তো বুজদারের মত কথা কইছেন! দেখতে আসেন, আমার ওপর ভরসা রাকেন—এমন হীরা ছুয়াল হাতছাড়া করলে পস্তাবেন!”
🎶দেখো আমার এ খুশিতে ওই বাগানে ফুল ফোটে….
সেই খুশিতে সূর্যটাও মুচকি হেসে ওঠে….🎶
উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে গানটি গাইতে গাইতে এসেই বালিশের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো পায়রা। কায়রা দর্পণের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সবে চুলে চিরুনি চালনা করছিল। বোনের এমন আকস্মিক খুশির কারণ না বুঝে মুখ কুঁচকে তার দিকে চেয়ে কৌতুহলী কন্ঠে শুধালো,,
“পাগল-টাগল হয়ে গেলি নাকি? পাগলের মত গান গাইতে গাইতে এসে আমার বিছানায় শুলি কেন? ওঠ!”
পায়রা এবার উঠে,কায়রার দুই হাত ধরে গোল গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বললো,,
“আম সো হ্যাপি জানু! ভেরি-ভেরি-ভেরি হ্যাপি!”
“কেন?”
“বাড়ি থেকে আপদ বিদায় হচ্ছে।”
“মানে?”
“ঘটক এসেছে, জানিস?”
“ওইযে ধেড়ে করে বলদা মতো লোকটা? ছাগলের মত পান চিবোচ্ছিল। ও ঘটক?”
বোনের এমন উপমায় নাক সিঁটকায় পায়রা,“হ্যাঁ!”
“কিরে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল? ছেলে কি করে? নিশ্চয়ই কোন বুড়ো ধরে এনেছে! অবশ্য হিরো আলমের মতো না হলেই হচ্ছে। বয়স ম্যাটার করে না, বুঝলি?”
“আরে ধুর! আমার বিয়ে কেন হবে? বিয়ে তো তোর হচ্ছে!”
“হোয়্যাট!”
পায়রার বলা শেষ অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটায় বিস্ফোরিত নেত্রে চাইলো কায়রা। থমকে গেল এতক্ষণের উচ্ছ্বাসিত পদচারণা। বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে চেঁচালো পুনরায়,,
“মাথা খারাপ তোর? দেখ বলেছে,পায়রা আর তুই খালি শুনেছিস কায়রা। গরু কোথাকার! তোর মত ধেড়ে চামচিকা ঘরে রেখে আমারে কেন বিয়ে দেবে?”
বোনের থেকে পাওয়া উদ্ভট বিশেষণে মুখ গোঁটালো পায়রা।
“তুই কি নিজেকে ক্যাটরিনা কাইফ মনে করিস? দেখতে তো মামুনের লায়লার মতো! আর এমনিতেও, পাত্রের ছেলে নাকি তোকে পছন্দ করেছে শুনলাম। সো, আমার বিয়ের প্রসঙ্গ আসছে না সিস!”
“হ্যোয়াট দ্য!”
“কি ভাই? জানিস ছেলে কে? আর্মির মেজর। আমাকে বলছিলি না একটু আগেই, বয়স ম্যাটার না। আসলেও বয়স ম্যাটার না বোন আমার। লোকটার বয়স কত হবে? ঐ ৩৫-৪০!বাট, এটা ব্যাপার না। মানিয়ে নিস, কেমন?”
এমনিতেই বিয়েতে দ্বিমত আছে তার ওপর ছেলে সেনাবাহিনী। আবার মেজর! জিন্দেগীতে এই বিয়েতে সম্মতি দেবে না কায়রা। ও চেঁচিয়ে কিছু বলার আগেই, বড় ফুফুর ডাক পরল।তবে, ওকে না, পায়রাকে ডাকছে। পায়রাও নেচে নেচে নিচের উদ্দেশ্যে ছুটে গেলো। ও যেতেই বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল কায়রা। মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকলেও বিচারবোধে এটা স্পষ্ট বুঝলো এখন বাড়ির কাউকে কিছু বলে লাভ হবে না। বিশেষত, আঞ্জুমান ইয়াসিরের মত আছে মানে সেটাই চূড়ান্ত।
দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ল কায়রা। এমনিতেই,সেনাবাহিনী চক্ষুশূল তার। আবার সেই পেশারই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অর্থাৎ বয়স নিশ্চিত চল্লিশের কোটায়। যেখানে কায়রার নিজের বয়সই এখনো একুশ পেরোলো না।শেষমেষ, কিনা নিজের বয়সের দ্বিগুণ কাউকে বিয়ে করতে হবে! এমন চিন্তাধারায়,সহসা ভিজে এলো চঞ্চল হরিণীর ডাগর নেত্র কার্নিশ। কোনোমতে নিজেকে ধাতস্থ করেই কল লাগালো বন্ধুমহলে।
দু”তিনবার রিং হতেই গ্রুপ কলে যুক্ত হলেও পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকে। কোনরূপ ভণিতা ছাড়াই কায়রা বলল,,
“আমরা কালই সুন্দরবন যাচ্ছি। আটটার ট্রেনে খুলনা থেকে মোংলা, সেখান থেকে সোজা মোংলা ঘাটে গিয়ে ট্রলার ধরে করমজল দিয়ে যাব।গট ইট?”
আকস্মিক এমন কথায় মুখ কোঁচকালো সবগুলো। চূড়ান্ত আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে একযোগে বলল,
“অ্যাই? মাথা ঠিক আছে তো তোর? কি সব উল্টোপাল্টা বলছিস?”
কায়রা অধৈর্য হয়ে উঠলো,,“আপাতত কিচ্ছু বলার টাইম নেই! কাল সাড়ে সাতটার ভিতরে সবগুলোকে স্টেশনে দেখতে চাই আমি। ওখানেই সবটা বলবো। প্যাকিং করে রাখবে রাত্রেই। একটাকেও যেন অনুপস্থিত না দেখি।”
ব্যাস, কথা শেষ। কলটা কেটেই ফোনটা বিছানার এক কোণে ছুঁড়ে ফেলল কায়রা। বালিশের তুলতুলে নরম তুলোর মাঝে অসাড় হয়ে পড়ে রইল ফোনটা। ওর মাথা চেপে ধরেছে তীব্র য’ন্ত্র’ণা”র দলবল। তার জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত—অথচ তার নিজস্ব কোনো মতামত নেওয়ার প্রয়োজনটুকুও কেউ বোধ করল না! তার ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলো কি এতটাই নগণ্য?
অভিসৃতি পর্ব ৩
তাও যদি লোকটা সাধারণ বা স্বাভাবিক কেউ হতো, তাও না হয় মনকে একরকম বুঝ দেওয়া যেত। কোথাকার কোন মেজর-ফেজোর! বয়সের ভারে নিশ্চিত এক পা ক’ব’রে চলে গেছে। এমন একজন মানুষের সঙ্গে তার বাকি জীবনটা বাঁধতে চাইছে সবাই? অসম্ভব!এই বিয়ে কোনো অবস্থাতেই হতে পারে না।
