Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১০

অভিসৃতি পর্ব ১০

অভিসৃতি পর্ব ১০
নওরিন কবির তিশা

সূক্ষ্ম কুহেলির আস্তরণ ঠেলে পঙ্কজ-রঙা সূর্যটা এখন মধ্যগগনে। হালকা শীতল হাওয়ার দোলায় ক্যাম্পাসের সুবিশাল কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাতা ঝরে পড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। ক্লাস শেষ করে বিশাল করিডোর বেয়ে এগিয়ে চলেছে ছয়জনের বিচ্চু বাহিনী। প্রাক্তনী আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের পদচারণায় বেশ সমাগম পূর্ণ স্থানটা। তবে এই কলকাকলীর মাঝেও কায়রার চিরাচরিত চঞ্চল কণ্ঠস্বর যেন আলাদাভাবে কান ঝালাপালা করছে বন্ধু মহলের,,
“তোরা বিশ্বাস করবি না ইয়ার! ওনার ওই গম্ভীর মুখের সানগ্লাস ছাড়া লুকটা যে দেখেছে, সে আর কখনো পৃথিবীর কোনো সাধারণ পুরুষের দিকে তাকাতেই পারবে না! আই মিন, হি ইজ আ প্রপার ডিসিপ্লিন্ড চার্ম!”
অনবরত কথার তোড়ে বিরক্ত বন্ধু মহল! এসে থেকে সেই একই কথা বলে যাচ্ছে ও। বারংবার একই কথার পুনরাবৃত্তিতে কপাল চাপড়ালো রুশাফ। সবার হয়ে মেধা বিষন্ন বদনে বলল,,

“কায়া! তুই কি শপথ নিয়েছিস যে তুই আর তোর আগে ‌প্রপার ডিসিপ্লিন্ড চার্মের বিয়ের আগে আমাদের কান দুটো খোয়াবি? বিগত তিন ঘন্টা যাবৎ একটানা মেজরের রূপ বর্ণনা শুনতে শুনতে আমাদের মাথার নিউরনগুলো পর্যন্ত এখন প্যারেড করা শুরু করেছে!”
তূজা ওড়নার আঁচলটা ঠিক করতে করতে বিরক্তভরে বলল,
“আরে থাম তো মেধা! ওর প্রেমে পড়া বর তো কপালে জুটে গেছে, এখন ও তো আমাদের ওপর মানসিক অত্যাচার চালাবেই! শালী, একটু শান্ত হয়ে হাঁটা যায় না?”
““আরে ইয়ার, যে সুদর্শন তাকে তো সুন্দর বলবোই!আসলে,তোদের হিংসে হচ্ছে, বুঝলি? একদম নিখাদ হিংসে!”
নিহার এবার হাতের খাতাটা দিয়ে কায়রার মাথায় হালকা এক চাপ বসিয়ে দিল,
“হ্যাঁ, তোদের মেজরের জন্য আমাদের রাতে ঘুম আসছে না! ফালতু বকবক বন্ধ কর তো এবার।”
ঠিক তখনই ইভান চটজলদি পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
“আচ্ছা চল! ভার্সিটির সামনে নতুন ফুচকার স্টল দিয়েছে শুনলাম।চল,যাই। সকাল থেকে কিছু খাইনি।”
সকলে সমস্বরে বলল,,

“হ্যাঁ,চল।”
সবাই মিলে ক্যাফেটেরিয়া পেরিয়ে মেইন গেটের দিকে পা বাড়াতেই কায়রার মুঠোয় থাকা ফোনটা আচমকা ভাইব্রেট করে উঠল।অলস ভঙ্গিতে স্ক্রিনে চোখ রেখেই এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল ও। হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে যেন একেবারে গলায় এসে ঠেকল! অপরিচিত বা আনসেভড নম্বর নয়, কনট্যাক্ট লিস্টে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে একটি মাত্র নাম-‘মাই মেজর’।
দুরন্ত গতি মুহূর্তেই মন্থর হয়ে এলো ওর।অতি সন্তর্পণে নোটিফিকেশন বার টেনে মেসেজটা উন্মুক্ত করতেই ওষ্ঠাধরের কোণ আপনা-আপনিই লাজুক হাসিতে প্রসারিত হলো। এসেছে এক অতি সংক্ষিপ্ত বার্তা,,
“কোথায় আছেন?”
কায়রার চঞ্চল আঙুলগুলো চকিতে কীবোর্ডে ঝড় তুলল।
“এইতো ভার্সিটিতে এসেছি। আপনি?”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। কায়রা চাতক পাখির মতো স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে। পরক্ষণেই অপর পাশ থেকে উত্তর এল,

“ক্যাম্পাসের বাইরে। দ্রুত আসুন!”
চূড়ান্ত বিস্মিত কায়রা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো মুহূর্তের তরে। দূর্জয়? এখানে? মানে ওর ক্যাম্পাসের সামনে? হঠাৎ? প্রশ্নগুলোর কোনো কুলকিনারা খুঁজে না পেয়ে তড়িঘড়ি আঙুল চালালো,
“হঠাৎ? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না।
“সামনে আসুন, বলছি।”
সংক্ষিপ্ত, রাশভারী, চূড়ান্ত দ্ব্যর্থহীন কথা। কায়রার হৃদপিণ্ডে অদৃশ্য এক হাতে কে যেন সজোরে নিংড়ে ধরল। চঞ্চল হরিণীটির পা দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দিকে অগ্রসর হলো প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে।পেছন থেকে মেধা আর তূজা চেঁচিয়ে উঠল,
“কী রে কায়া? কোথায় যাচ্ছিস তুই? ফুচকার দোকান তো বাঁ দিকে!”
কায়রা ঘাড় না ঘুরিয়েই হাত নেড়ে দ্রুত কণ্ঠে বলল,

“তোরা গিয়ে ফুচকা খা, আমায় একটু ইমার্জেন্সি কাজ সামলাতে হবে! পরে কথা বলছি!”
বন্ধুমহলের কৌতূহলী দৃষ্টিকে পেছনে ফেলে কায়রা প্রায় একপ্রকার ছুটেই ক্যাম্পাসের মূল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। শহরতলীর ব্যস্ত রাজপথের মোড়ে, সুবিশাল এক বটবৃক্ষের ছায়ায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিচিত চকচকে কালো রঙের গাড়িটা। আর তার বনেটে হেলান দিয়ে দণ্ডায়মান দীর্ঘদেহী সৈনিকটি। পরণে কফি রঙা একটা ক্যাজুয়াল ফুল স্লিভ শার্ট, ট্রাউজার আর চোখে সেই কৃষ্ণাভ সানগ্লাস।
কায়রা ওড়নার আঁচল সামলে, সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে দাঁড়াল। অনাবৃত ডাগর চোখে বিপুল কৌতূহল আর একরাশ বিস্ময় ফুটিয়ে শ্লথ কণ্ঠে শুধাল,
“আ-আপনি হঠাৎ এখানে? মানে কোনো প্রবলেম?”
দুর্জয় চোখের সানগ্লাসটা একহাতে খুলে শার্টের কলারের ফাঁকে আটকে নিল।অতল গম্ভীর কৃষ্ণনেত্র দুটি নিবদ্ধ হলো কায়রার চঞ্চল মুখশ্রীর ওপর। ধীর কণ্ঠে বলল,
“সমস্যা থাকলে তবেই আসতে হবে? উইদাউট এনি রিজন আসতে পারি না?”
কায়রা ইতস্তত করে নিজের হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে বলল,

“না… মানে আসতে পারেন না তা নয়, কিন্তু এভাবে হঠাৎ… এমন করে তাই আর কি!”
দুর্জয় হাতঘড়িটার দিকে একঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিল।
“এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম,তো ভাবলাম আপনাকে একটু ড্রাইভে নিয়ে যাওয়া যাক। গাড়িতে উঠুন।”
অকস্মাৎ দূর্জয়ের এমন প্রস্তাবে ভড়কে গেলো কায়রা। স্ববিস্ময়ে বলল,,
“গাড়িতে উঠব? “কিন্তু আমার তো এখনো ফ্রেন্ডদের সাথে…”
ওকে কথা শেষ না করতে দিয়েই দুর্জয় বলল,,
“আই ডন্ট হ্যাভ অল ডে, মিস কায়রা। জাস্ট গেট ইন।”
সামরিক মেজাজে ভরপুর গম্ভীর ভরাট, সুদৃঢ় কণ্ঠস্বরের সামনে কায়রার সমস্ত চঞ্চলতা এক নিমেষে ডানা গুটিয়ে নিল। কোনো অনর্থক যুক্তি খাটানোর সাহস হলো না ওর। নিঃশব্দে অধর দংশন করে,গাড়ির শেষ সিটে গিয়ে বসতে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় বাধা প্রাপ্ত হলো দুর্জয়ের কাছ থেকে,
“পেছনে যাচ্ছেন কেন?”
কায়রা ঘুরে তাকালো। আমতা আমতা করে বলল,,

“ত-তাহলে?”
“সামনে এসে বসুন! অধিকারটার উত্তরাধিকারী আপনি।”
কায়রা ইতস্ত করছে দেখে দুর্জয় বলল,,
“ভয় পাবার কারণ নেই। আমি বাঘ কিংবা ভাল্লুক নই যে আপনাকে খেয়ে ফেলবো।”
দুর্জয়ের সংক্ষিপ্ত কথার পিঠে বহুভাষী কায়রার সমস্ত বাকপটুতা এক লহমায় হাওয়া হলো। ও একটু কাচুমাচু মুখে ওড়না গুটিয়ে নিয়ে ধীরসে গাড়ির সামনের আসনটিতে বসলো। ওর আসন গ্রহণ শেষে দুর্জয় ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালু করল। সেটি ছুটে চলল অজানা এক গন্তব্যে।
ভেতরে পিনপতন নীরবতা। তোতা পাখির মত কায়রা অনবরত বকবকে অভ্যস্ত কায়রা এই মুহূর্তে নিজের কোলের ওপর দু-হাত জড়ো করে বেশ লক্ষ্মীটি হয়ে বসে আছে। পাশে বসা গম্ভীর মানবের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস হচ্ছে না। জানালা দিয়ে বাইরের ধেয়ে যাওয়া তরুপল্লব দেখছিল ও। যদিও মনটা পড়ে আছে পাশের প্রস্তরমূর্তিসম মানবটির উপর।
দুর্জয় স্টিয়ারিংয়ে নিজের শক্ত-সামর্থ্য হাত দুটি রেখে অত্যন্ত সাবলীলভাবে ড্রাইভ করছিল। তবে অলক্ষে, ক্ষণে ক্ষণে ড্যাশবোর্ডের আয়নায় কায়রার এহেন অনভিপ্রেত নীরবতা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল ও। যে মেয়েটি শত মানুষের সামনে অবলীলায় কথা বলে, যে কাল্পনিক ‘ধেড়ে মেজর’-এর চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে পারে সে আজ পাশে বসে একদম নীরব!
পরিবেশের এই থমথমে কৃত্রিম আড়ষ্টতা ভাঙতে দুর্জয় সামনের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখেই সুদৃঢ় কণ্ঠে শুধালো,,

“মিউজিক পছন্দ করেন, মিস?”
আকস্মিক দুর্জয়ের জিজ্ঞাসু কন্ঠে বিস্মিত কায়রা চট করে ঘাড় ঘুরালো। ইতিপূর্বে কি বলা হয়েছে মনে করতে,স্মৃতির পাতা হাতরে লক্ষ্মী মেয়ের মতো মৃদু মাথা নেড়ে বলল,
“হু-হুম, করি।”
দুর্জয় ড্যাশবোর্ডের স্মুথ টাচস্ক্রিন মিউজিক প্লেয়ারের দিকে সামান্য ইশারা করে বলল,
“প্লে এনিথিং ইয়্যু লাইক। চুজ সামথিং।”
“আ-আমি।”
“আশেপাশে আর কাউকে দেখছি না!”
কায়রা একটু দ্বিধা নিয়ে হাত বাড়াল। মিউজিক প্লেয়ারটির ওপর চঞ্চল আঙুল চালিয়ে একখানা স্নিগ্ধ, ধীর লয়ের ইন্সট্রুমেন্টাল সুর প্লে করে দিল। গুমোটবদ্ধতার অবসান ঘটলো যৎ-সামান্য। তবে, পরক্ষণেই সকলে ফিরে গেল পূর্বের নিস্তব্ধতায়। দেখতে দেখতে,মিনিট দশেক অতিবাহিত হলো, অথচ পাশের গহীন অরণ্যের ন্যায় গম্ভীর মানবের ওষ্ঠাধরে কোনো বাক্যের দেখা নেই।
দুর্জয় স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে গাঢ় নীরবতার মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করছিল। কিন্তু পাশের সিটে বসা মেয়েটির অস্বাভাবিক মৌনতা ওর সুসূক্ষ্ম দৃষ্টি এড়াতে পারল না। ড্যাশবোর্ডের আয়নায় কায়রার কুঁচকে থাকা ফর্সা কপাল আর ছটফট করতে থাকা হাত দুটো দেখে দুর্জয়ের অনমনীয় ওষ্ঠাধরের কোণে অতি অলক্ষ্যে ফুটল এক চিলতে কৌতুকপ্রবণতার দেখা মিললো।
সামনের ফাঁকা রাজপথের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই দুর্জয় অনমনীয় কণ্ঠে হঠাৎ বলে উঠল,,

“এনিথিং রং, মিস?”
আকস্মিক দুর্জয়ের ভরাট কন্ঠস্বরে কায়রা আচমকা সম্বিত ফিরে পেল। ও একপলক দুর্জয়ের সুঠাম চোয়াল চেয়ে বললো,
“ন-তা তো! এভরিথিং অলরাইট!”
“তাহলে এতটা সাইলেন্ট কেন?”
“না মানে আসলে আমি ভাবছিলাম, আমি যদি মুখ খুলি, আর আপনি যদি আবার সেই মিলিটারি মেজাজে বলে ওঠেন-‘ডোন্ট টক, মিস!’ তখন তো আমার মনটাই খারাপ হয়ে যাবে!”
দুর্জয় এক মুহূর্তের জন্য অনাবৃত কৃষ্ণচোখে কায়রার চটপটে মুখের দিকে তাকাল। অতঃপর হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে নিচু স্বরে বলল,,

“আই নেভার সেড দ্যাট। কথা বলতে কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। আপনি বলতে পারেন।”
‘কথা বলতে পারেন’—এই দুটি শব্দের ছাড়পত্র যেন কায়রার জন্য বন্ধ দরজার হুড়কো খুলে দেওয়ার মতো কাজ করল! মুহূর্তের মধ্যে ওর সমস্ত আড়ষ্টতা আর ইতস্তত ভাব উধাও হয়ে গেল। ও বেশ কিছুটা ঘুরে দুর্জয়ের দিকে মুখ করে বসল। প্রফুল্ল চিত্তে, চোখ নাচিয়ে হাত নেড়ে অনর্গল বকবক শুরু করে দিল,,
“আরে বাবা! তাই বলুন! এতক্ষণ যে কী কষ্টে চেপেছিলাম, আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না! জানেন, আমি না একদম চুপ করে থাকতে পারি না। আমার বন্ধুরা তো আমাকে আস্ত রেডিও বলে! ক্লাসের টিচাররা অবধি আমাকে পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখত এইসব বেশি কথা বলার জন্য। কি করবো বলুন?কথা না বললেই, না?আমার পেট ফুলে ওঠে। দম বন্ধ হয়ে আসে। মানুষ কিভাবে যে কথা চেপে রাখে! বুঝিনা!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে তবে দম ছাড়লো কায়রা। অথচ পাশে বসা লোকটা এখনো নির্বাক, কিঞ্চিৎ কৌতুহলী হয়ে কায়রা শুধালো,,

অভিসৃতি পর্ব ৯

“আপনি মেবি অনেক কম কথা বলেন?”
দুর্জয় সম্মুখে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল,,
“হ্যাঁ।কারণ, আপনি সম্ভবত,বেশি কথা বলেন।”
কায়রা প্রস্তুত হয়ে উঠলো। মুখের উপর এমন গরম গরম জবাব আশা করে নি ও। বোকা হাস্যে ঘাড় চুলকে বললো,,
“ওই আর কি!”

অভিসৃতি পর্ব ১০ (২)