Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৫

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৫

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৫
বন্যা সিকদার

ক্লাস রুমের দরজার সামনে পৌঁছে ভেতরে পা রাখতেই‚ মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের বুকের ভেতরের আত্মাটা যেন আতঙ্কে শিউরে উঠল। ​হাত-পা একদম অবশ হয়ে এলো তার‚ চোখের সামনে পুরো দুনিয়াটা এক লহমায় যেন ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে গেল। ​বিশাল সেই ক্লাসরুমের প্রতিটি দেয়ালে উজান এবং মৌ’য়ের কিছুটা অন্তরঙ্গ ছবি।
যেখানে উজান আবেশে মৌ’য়ের কোমর আঁকড়ে ধরেছে‚ তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে রেখেছে…এমনকি মৌ নিজেও পরম বিশ্বস্ততায় উজানে’র বুকে মুখ লুকিয়ে সেই আলতো স্পর্শে সায় দিচ্ছে। সেই নিভৃত ভালোবাসার মায়াবী দৃশ্য গুলোকে আজ চরম নোংরাভাবে ফ্রেমে বন্দি করে পুরো ক্লাসরুমের দেয়ালে দেয়ালে প্রদর্শনী বানানো হয়েছে। ​ছবি গুলোর দিকে তাকিয়ে পুরো ক্লাসরুমের আলো যেন মৌ’য়ের চোখের সামনে নিভে এলো। সে ভেজা চোখে মেহেরে’র দিকে তাকাল। মেহের খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল মৌ’য়ের বুকের ভেতর এখন কী পরিমাণ নরক যন্ত্রণা আর হাহাকার বয়ে যাচ্ছে। ​মেহের আর নিজের রাগ সামলাতে না পেরে ললিতা আর জিহাদ’কে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাবে। অমনি ললিতা মুখের সামনে আঙুল উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

​“মেহের তুই একদম চুপ থাক। এই থার্ড ক্লাস‚ চরিত্রহীন মেয়েটার জন্য তুই অন্তত কোনো সাফাই গাইতে আসিস না।
​কথাটা শোনামাত্রই মেহেরে’র মাথার রগ রীতিমতো জ্বলে উঠল। সে এক সেকেন্ডও ভাবল না‚ ললিতার ফর্সা গালে ঠাস্ ঠাস্ করে সজোরে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
​ললিতা গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। মেহের’কে নিয়ে হাজারটা কথা বললেও হয়তো মেহের এতটা ক্ষিপ্ত হতো না কিন্তু আজ তারা মৌ’য়ের দিকে আঙুল তুলছে—তা-ও আবার স্বয়ং মৌ’য়ের নিজের আইনসম্মত হাসবেন্ডকে জড়িয়ে। ​মেহের বাজখাঁই মেজাজে গর্জে উঠল‚
“ললিতা নিজের লিমিট ক্রস করিস না একদম। তুই কাকে থার্ড ক্লাস বলছিস‚ জানিস? তোর কোনো ন্যূনতম আইডিয়া আছে মৌ কে? কিংবা উজান স্যারের সাথে ওর কী সম্পর্ক?
​ললিতা গালে হাত দিয়ে রাগে গজগজ করে বলল‚ “চোখের সামনে যা দেখতে পাচ্ছি সেটাই বলছি। থার্ড ক্লাস মেয়ের থার্ড ক্লাস বোন তুই। লজ্জা করে না তোদের? এত বড় কেলেঙ্কারি করে আবার আমার গায়ে হাত তুলিস?
​”হ্যাঁ‚ তুলব। একশোবার তুলব। তুই কোন সাহসে মৌ’কে নিয়ে এসব নোংরা কথা বলছিস? মৌ হলো স্বয়ং উজান স্যারের আসল….
​বাকি সত্যিটা ফাঁস করার আগেই মৌ হঠাৎ মেহেরে’র হাত চেপে ধরল। অশ্রুসিক্ত চোখে বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়িয়ে সে মেহের’কে সত্যিটা বলতে বারণ করল। কেন মৌ এখন এই চরম অপমানের মুখে দাঁড়িয়েও সত্যিটা আড়াল করতে চাইছে‚ মেহেরে’র মাথায় তা কিছুই ঢুকছিল না। ​ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে জিহাদ তীব্র বিষাক্ত কণ্ঠে বলে উঠল‚

​“মেহের তুই থাম তো। আমরা সবাই নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি মৌ উজান স্যারের কী হয় আর কী সম্পর্ক তাদের। আচ্ছা মৌ‚ তুমি এমন বিশ্রী কাজ করতে পারলে কীভাবে‚ বল তো? সামান্য কয়েকটা মার্কস আর ভালো রেজাল্টের জন্য নিজের ইজ্জত এভাবে বিলিয়ে দিলে? এতখানি নোংরা তুমি?
​“নোংরা নয় জিহাদ‚ বলো নষ্টা মেয়ে একটা। —ললিতা ক্ষিপ্ত হয়ে তাল মেলাল।
“এই নষ্টা মেয়ে কিনা আমাকে সৎ উপদেশ দিতে এসেছিল। ছিঃ মৌ‚ ছিঃ। এত জঘন্য তুই যে শেষ পর্যন্ত নিজের টিচারের সাথেই…এর জন্য নিশ্চয়ই স্যারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকাও পেয়েছিস? তোর এতই যদি টাকার দরকার ছিল‚ তবে আমায় বলতি। এভাবে স্যারের সাথে বিছানায়…ভাবতেই আমার গা ঘিনঘিন করছে।
​এদিকে ক্লাসরুমের ভিড়ের খানিকটা আড়ালে দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে পুরো নাটকটি উপভোগ করছিল শিরিন। ললিতা আর জিহাদ’কে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে উসকে দিয়ে সে নিজেই আজ এই গোপন ছবিগুলো প্রিন্ট করিয়ে এখানে টাঙানোর ব্যবস্থা করেছে। নিজের চাল সফল হতে দেখে সে আড়ালে মিটমিট করে পৈশাচিক হাসছিল। ​

আর অন্যদিকে মৌ’য়ের অবাধ্য চোখ দুটো থেকে অঝোরে তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে ফেটে যাচ্ছে কিন্তু আত্মসম্মানের ভয়ে মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারছে না সে। কতটা আনন্দ আর বুকে আশা নিয়ে আজ কলেজে এসেছিল অথচ সেই আনন্দকে বিষাদময় কান্নায় পরিণত হতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না। ​চারপাশের স্টুডেন্টরা ছি-ছি করে ফিসফিস করছে আর ললিতা-জিহাদ সবার সামনে তাকে নোংরাভাবে হেনস্তা করে চলেছে। তাদের চিল্লাচিল্লিতে আশেপাশের দু-একজন টিচারও এসে দাঁড়িয়েছেন। তারাও কুৎসিত দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। এসব অপমান আর সহ্য করতে পারছে না মৌ! ​ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে কারো এক ধারালো‚ বিষাক্ত বাক্য কানের কাছে চাবুকের মতো এসে বাজল।
​“এত নির্লজ্জ মেয়ে তুমি‚ এখন বিষ খেয়ে মরতে পারো না? এত জঘন্য অপকর্ম করেও বেহায়ার মতো মুখ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছো? আমি তোমার জায়গায় থাকলে এতক্ষণে সুইসাইড করতাম।
​কথাটা শোনা মাত্রই মৌ যেন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলল। তার অবশ হাত থেকে কলেজের ব্যাগটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। আর না…আর এক সেকেন্ডও এই নরক যন্ত্রনা সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ​সে মেহেরে’র শক্ত বাঁধন এক ঝটকায় ছাড়িয়ে একবারে অন্ধের মতো পেছনের দিকে উল্টো দৌড় দিল। ​ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজার মুখে এসে সজোরে কারো চওড়া‚ শক্ত বুকে গিয়ে আছড়ে পড়ল মৌ। ​স্পর্শটা বড্ড চেনা‚ বড্ড ভালোবাসার! ​মৌ জলভরা চোখে উপরে তাকিয়ে দেখল‚ সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং উজান। ​উজান’কে দেখা মাত্রই মৌ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই বাহু দিয়ে উজান’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে অঝোর ধারায় হু হু করে কেঁদে উঠল। মৌয়ের কান্নার বেগ যত বাড়ছিল‚ উজানে’র বুকের খাঁজটা ততটাই তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠছিল।

​উজান এক হাত দিয়ে মৌ’কে নিজের বুকের সাথে একবারে শক্ত করে আটকে রাখল। অন্য হাত দিয়ে পরম মায়ায় তার মুখটা উঁচুতে তুলতে চাইল কিন্তু চরম লজ্জা আর অপমানে মৌ উজানে’র বুক থেকে মুখ তুলল না।
​“পিচ্চি…কাঁদে না জান! শান্ত হও প্লিজ‚ তোমার প্রফেসর সাহেব চলে এসেছে তো। আর কেউ তোমাকে একটা কটু কথা বলার সাহস পাবে না। প্লিজ‚ একবার তাকাও আমার দিকে।
​কিন্তু মৌ শিউরে উঠে আরও শক্ত করে উজানে’র শার্ট আঁকড়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। লজ্জা আর অপমানের পাহাড় যেন তাকে পিষে মারছে।​ মৌ’কে এভাবে সবার সামনে স্বয়ং উজান স্যারের বুকে নির্ভয়ে লেপ্টে থাকতে দেখে ক্লাসরুম এবং করিডোরে উপস্থিত পুরো ক্যাম্পাসের স্টুডেন্ট ও টিচাররা রীীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গেল। ললিতা আর জিহাদ হা করে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। উজান স্যার নিজে মৌ’কে এত পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে আছেন‚ এমনকি নিজের থেকে এক চুলও দূরে সরতে দিচ্ছেন না। ​হঠাৎই উজান মাথা তুলল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ লাল হয়ে উঠেছে‚ যেন এক হিংস্র সিংহ নিজের সঙ্গিনীকে রক্ষার জন্য শিকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত।

কিছু সময় আগেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে মেহের চট করে উজান’কে একটা ছোট টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিল— আর তা পাওয়া মাত্রই নিজের সব কাজ ফেলে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছে উজান চৌধুরী। ​উজান নিজের সহনশীলতার শেষ সীমা হারিয়ে ফেলেছিল। সে এক হাতে মৌ’কে নিজের বুকের সাথে জাপটে রেখেই অন্য হাতে ধেয়ে গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা শিরিনে’র চুলের মুঠি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ​এক টানে শিরিন’কে টেনে এনে ললিতা আর জিহাদে’র পাশে দাঁড় করাল। ​তারপর কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিরিনে’র গালে ঠাস্ ঠাস্ করে গুনে গুনে ১০টা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ​আকস্মিক এমন পৈশাচিক আক্রমণের শিকার হয়ে শিরিন যন্ত্রণায় চোখে সর্ষে ফুল দেখল‚ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ছলছল নয়নে উজানে’র দিকে তাকাল। ​উজান থামল না। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ললিতা এবং জিহাদের গালেও ঠাস্ ঠাস্ করে গুনে গুনে ১০টি করে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। থাপ্পড়ে দুজনেরই ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।
তখন ​উপস্থিত কারো মুখ থেকে কোনো কথা বের হওয়ার আগেই‚ পুরো ক্লাস কাঁপিয়ে গর্জন তুলে হুংকার দিল উজান—

​“তাজফিয়া মৌ চৌধুরী ইজ মাই অফিশিয়াল ওয়াইফি। প্রফেসর উজান চৌধুরীর ওয়ান অ্যান্ড অনলি প্রফেশনাল মিসেস। এই উজান চৌধুরীর একমাত্র অস্তিত্ব আর ভালোবাসা হলো তাসফিয়া মৌ…শুনতে পেয়েছো তোমরা সবাই?
​উজান চৌধুরীর সেই বজ্রকণ্ঠের প্রলয়ংকরী ঘোষণা শুনে ক্লাসরুমে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের পায়ের নিচ থেকে যেন এক লহমায় মাটি সরে গেল।
​উজান আবারও রক্তচক্ষু নিয়ে চিৎকার করে উঠল‚
​“তোমাদের এত বড় স্পর্ধা আর কলিজা কীভাবে হয় যে তোমরা উজান চৌধুরীর ওয়াইফিকে এভাবে থার্ড ক্লাস আর চরিত্রহীন বলে কটূক্তি করার সাহস পাও? তোমাদের সেই অধিকারটা কে দিয়েছে? তোমাদের নোংরা মানসিকতা দেখে আমি বিস্মিত। আমার নিজের ওয়াইফ আমার কেবিনে আসবে‚ নাকি আমার বুকে মাথা রাখবে তা নিয়ে তোদের মতো সস্তা মানসিকতার স্টুডেন্ট আর টিচারদের জবাব দিতে হবে আমাকে? উজান চৌধুরীর দিন এতোটাই খারাপ এসেছে যে‚ সে তার ওয়াইফকে কখন‚ কিভাবে ভালোবাসবে সেটাও সকলকে কৈফিয়ত দিতে হবে?

​মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসরুম আর করিডোরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ​মৌ যে কোনো সাধারণ স্টুডেন্ট নয়‚ স্বয়ং প্রফেসর উজান চৌধুরীর নিজের বিবাহিত স্ত্রী। তা জানতে পেরে ললিতা‚ জিহাদসহ সেখানে উপস্থিত সবাই কাচুমাচু হয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
উজান মৌ’কে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই রাগে কিটমিট করে ললিতার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার দুই চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। সে কর্কশ কণ্ঠে ডেকে উঠল‚
​“এই ইডিয়ট মেয়ে। তাকাও আমার দিকে। তুমি কোন সাহসে‚ কোন স্পর্ধায় আমার মিসেসকে ‘নষ্টা’ বলে গালাগালি করার সাহস পেয়েছো? অ্যানসার মি। তোমার কি ন্যূনতম কোনো যোগ্যতা আছে এই উজান চৌধুরীর মিসেসের সাথে সামান্য দাঁড়িয়ে কথা বলার? আমার মিসেসের একটা ইশারায় তোমার মতো হাজারটা সার্ভেন্ট চলে আসবে। সারাজীবন তার হাতের আঙুলের ইশারায় নাচবে। আর সেই তুমি আমার মিসেসকে এভাবে সবার সামনে মেন্টালি হার্ট করেছো? এর পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ আর ভয়ংকর হতে পারে‚ তা তোমার ধারণাও নেই।
​কথাটা বলেই উজান নিজের রক্তচক্ষু ঘোরাল জিহাদে’র দিকে। ​“আর তুমি‚ জিহাদ। তুমি তো আমার মিসেসের এক নখের সমান যোগ্যতাও রাখো না। সেই তুমি আমার মিসেসকে প্রপোজ করার স্পর্ধা দেখাও? আমার মিসেসকে কি তোমার বাজারের সস্তা কোনো মেয়ে মনে হয়‚ যে রাস্তাঘাটের যেকোনো কুকুর-শেয়ালের কথায় গলে গিয়ে রাজি হয়ে যাবে? তোমাকে আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি কানে তোলোনি। এবার সেই গাফিলতি আর ঔদ্ধত্যের ফল যে কী ভীষণ হতে পারে‚ তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে…জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!
​এরপর উজান চরম ক্রুদ্ধ হয়ে সোজা শিরিনে’র সামনে গিয়ে হাজির হলো। ক্যাম্পাসের সমস্ত স্টুডেন্ট ও প্রফেসরদের সামনেই সে আবারও এক ঝটকায় শিরিনে’র চুলের মুঠি টেনে ধরে তাকে নিজের মুখোমুখি করে দাঁড় করাল।
​তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বিষাক্ত শোনালো তার কণ্ঠ।

“তোর নিজের কি একটুও লজ্জা করে না? মিনিমাম সম্মানবোধ বলতে কিচ্ছু নেই তোর মাঝে? এতখানি বেহায়া আর নির্লজ্জ কীভাবে হতে পারিস তুই? তুই খুব ভালো করেই জানিস‚ উজান চৌধুরী তার ওয়াইফি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো নারীর দিকে চোখ তুলেও তাকায় না আর সেখানে তুই একসময় ফেলে দেওয়া নোংরা থুতু তো নয়ই। তুই নাকি নিজেকে এই কলেজের টিচার দাবি করিস? অন্তত তোর তো উচিত ছিল স্টুডেন্টদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া‚ তাদের বোঝানো। কিন্তু তুই নিজে মাস্টারমাইন্ড সেজে এত বড় জঘন্য আর নোংরা কাজটা করলি? তোর মতো থার্ড ক্লাস মেয়ে ছেলে এমনই হয়।
​বলতে বলতেই উজান ক্ষোভে আবারও শিরিনে’র গালে হাত উঠাতে চাইল কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রিন্সিপাল স্যার ভিড় ঠেলে ঝড়ের গতিতে সেখানে এসে হাজির হলেন এবং তড়িঘড়ি উজানে’র উঁচানো হাতটা চেপে ধরলেন।
​”উজান থামো। কী হচ্ছে এসব ?

​উজান এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বরফশীতল গলায় বলল‚ “সরি স্যার‚ আপনার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি। এই মুহূর্তে আপনার সাথে আমি কোনো আলোচনা বা কথা বলতে চাচ্ছি না। আর আজ বিকেলের মধ্যেই আমি আমার অফিশিয়াল রেজিগনেশন লেটার আপনাকে পাঠিয়ে দেব। এই কলেজে আমি উজান চৌধুরী আর এক সেকেন্ডের জন্যও অধ্যাপনা করব না।
​প্রিন্সিপাল স্যার চোখ ছানাবড়া করে আকুল হয়ে বললেন‚ “এসব কী বলছো উজান? আমি বুঝতে পারছি মৌ’য়ের সাথে আজকে যেটা ঘটেছে সেটা চরম অন্যায় ও ভুল হয়েছে…কিন্তু তাই বলে তুমি এভাবে হঠাৎ করে প্রফেশন ছেড়ে কলেজ থেকে চলে যাবে?

​“ইয়েস স্যার। যে কলেজে আমার ওয়াইফিকে পুরো ক্যাম্পাসের সামনে এভাবে নোংরা ও জঘন্যভাবে ইনসাল্ট করা হয়‚ যেখানের টিচাররা মানসিক ভিকটিম তৈরি করে। সেখানে অন্তত উজান চৌধুরী এক মুহূর্তও থাকবে না৷ এই কলেজে আমার আসার দুটো মাত্র কারণ ছিল‚ প্রথমত আমার ওয়াইফির পড়াশোনার সুরক্ষার জন্য আর দ্বিতীয়ত আপনি নিজে রিকোয়েস্ট করেছিলেন বলে। কিন্তু আজকের এই নোংরা ঘটনার পর এই পরিবেশে কাজ করার বিন্দুমাত্র রুচি আমার আর নেই। এর থেকেও শতগুণ বেটার অফার অলরেডি আমার হাতে ছিল। তবুও আমি এই কলেজে এসেছিলাম কিন্তু এখন আপনাদের কলেজের গুটিকয়েক উগ্র টিচার আর চরিত্রহীন স্টুডেন্টদের ভুলের জন্য আজ আমাকে চলে যেতে হচ্ছে৷ আই’ম রিয়েলি রিয়েলি সরি‚ স্যার!
​কথাটা শেষ করে উজান রক্তচক্ষু নিয়ে শিরিন‚ ললিতা আর জিহাদ এই তিনজনের দিকে তাকিয়ে চরম কর্কশ কণ্ঠে আওড়াল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৪

​“আপাতত তোদের তিনজনকে এখানে ছেড়ে দিয়ে গেলাম। তবে বাকি হিসাব-নিকাশ সোজা পুলিশ স্টেশনে গিয়েই হবে।
​কথাটা বলেই উজান এবার মৌ’য়ের দিকে মনোযোগ দিল। প্রচণ্ড রাগের বশে সে ভুলেই গিয়েছিল যে মৌ এতক্ষণ ধরে তার বুকের ভেতর নিশ্চল হয়ে লুটিয়ে ছিল। ​নিচে তাকাতেই উজানে’র বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। লজ্জা‚ অপমান আর তীব্র মেন্টাল শকে মৌ আগেই তার বুকের মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়েছে। ​উজান আর এক মুহূর্তও সেখানে কালক্ষেপণ করল না। তড়িঘড়ি মৌ’কে পরম যত্নে নিজের দুই বাহুতে পাঁজা কোলে তুলে নিল। তারপর ঝড়ের গতিতে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে কলেজের মেইন গেটের দিকে ধাবিত হলো।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৬