সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
—’ দুঃখিত, ম্যাডাম। ধ র্ষন মামলার আসামীর সাথে আমরা এভাবে আপনাদের দেখা করার অনুমতি দিতে পারি না। এটা আমাদের এখতিয়ারের বাহিরে। আপনারা, আপনাদের অ্যাডভোকেটের সাথে যোগাযোগ করুন। তাছাড়া পরিবারের কেউ দেখা করার জন্য এলাউ নয়। ‘
পুলিশের সোজা-সাপটা নিষেধাজ্ঞা নিরব শুনে গেলো তিতির। গতসন্ধ্যায় ঈশানের খবর শোনামাত্রই ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গিয়েছিলো দেওয়ান বাড়ির সবাই। একপ্রকার ঝড়ের গতিতে এসে পৌঁছেছে তারা। কাক ডাকা ভোরে, পা রেখেছে ঢাকার মাটিতে। এখন অবশ্য বেলা হয়েছে বেশ খানিকটা। অফিস আদালত খুলতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের ব্যাস্ত রাস্তায়, কর্মমুখী মানুষদের ব্যাস্ততা বাড়ছে, পিলপিল করে চলতে শুরু করেছে যানবাহন গুলো। এতো সকাল সকাল পৌঁছেও, পুরান ঢাকার এদিকে আসতে চিরাচরিত জ্যামের মুখে বসে থাকতে হয়েছে পাক্কা দেড় ঘন্টা।
রাসেদ দেওয়ান চোখের ইশারা করে থামতে বললো তিতির কে। যা বলার সেই বলবে। পুলিশ কে লক্ষ্য করে বললো,
—’ আমাদের অ্যাডভোকেট আদালতের সমন নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছাবে। আমরা কি কোনো ভাবেই ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সাথে দেখা করতে পারবো না?’
—’ নাহ, স্যার। সম্ভবই না। ‘
আরও কিছুক্ষণ আলাপ আলোচনা চললো। কোনোভাবেই ব্যবাস্থা করা গেলো না। যাবে না, এটাও তারা জানতোই। তাদের পারিবারিক উকিল যিনি রাহিয়ান দেওয়ানের ক্লাসমেট, বন্ধু – তিনি এরইমধ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। বলাবাহুল্য সে-ও এই বিরক্তিকর জ্যামে আটকা পরে আছেন। বাড়ির সবাইকে নিয়ে কাছেপিঠের একটা খোলা পার্কের দিকে এগিয়ে গেলে দেওয়ান কর্তা। বাড়ির গিন্নি রা আর রিশা, রোশনি, রাফি বাদে, বাকি সবাই এসেছে। তিতির কে সামলাতে নিশি, নূরির আসতেই হতো। নয়ন এক গাঁ জ্বর নিয়েও সঙ্গে এসেছে। বারংবার বলা সত্ত্বেও বাড়িতে রেখে আসা যায় নি।
সুতির একটা সাদামাটা সালোয়ার কামিজ গায়ে জড়ানো তিতিরের। চোখমুখ একরাতের মধ্যে শুঁকিয়ে গিয়েছে। ফর্শা মুখটা কালো দেখাচ্ছে। ডাগর চোখের নিচের অংশ টা পোড়া পোড়া লাগছে। নিশি ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মেয়েটা অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে আছে। সকালের নাস্তা করা হয়নি কারোরই। নাঈম আর নিয়াজ গিয়ে খাবার কিনে নিয়ে এসেছে সবার জন্যই। সে-সবই হালকা পাতলা খেয়ে নিচ্ছে সবাই।
বাড়ির সবার থেকে খানিকটা সরে এলো তিতির। চোখেমুখে পানির ছেটা দেওয়া দরকার। গতরাতে একফোঁটাও ঘুম হয়নি। এমন অবস্থায় ঘুমাতোই বা কি করে! আজকে বেশ গরম পরবে, সকাল থেকেই রোদের তীব্রতা চোখে পরার মতো। তবে পার্কের এদিকটায় বিশাল বিশাল গাছপালার সমারোহ। বেশ শীতল আবহাওয়া। ওড়নার অংশে ভেজা মুখটা মুছে, সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পাশে নূরির অস্তিত্ব টের পেলো সে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। গতকালের পর থেকে অতি স্বাভাবিক যদি কারোর অবস্থা থাকে, সেটা হলো নূরি। বোনের হাত থেকে পানির বোতল খানা আলতো হাতে নিতে নিতে বললো,
—’ এসব কেনো হচ্ছে, বলতে পারিস? ‘
তিতির কোনো ধরনের প্রতিত্তোরই করে না। কারণ প্রশ্নের উত্তর পাবার আশায় নূরি যে কথাটা বলেনি,তা তার মুখাবয়ব দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারা যাচ্ছে। নূরি নিজের মুখে পানি দিলো। নরম গলায় বললো,
—’ আমি যদি বলি এখানে বড় ভাইয়া নেই। তুই কি বিশ্বাস করবি? ‘
—’ মানে? ‘
—’ মানে, জেলের ভিতরে বড় ভাইয়া নেই। এই কারণে পুলিশ আমাদের দেখা করতে দিচ্ছে না।’
অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। ঈশান গ্রেফতার হয়েছে, এখানেই রাখা হয়েছে তাকে। এমন খবরই তো পেয়েছিলো তারা। তাছাড়া সকাল থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কই পুলিশ তো একবারের জন্যও বললো না, ঈশান ভিতরে নেই। নূরির কথার আগামাথা বোধগম্য হচ্ছে না তার। নরম গলায় শুধালো,
—’ থাকবে না কেনো? ‘
সামান্য একটুখানা হাসলো নূরি। ওদিকে দন্ডায়মান পরিবারের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের মতো মানুষকে জে লে নেওয়া সম্ভব! বিষয়টা বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না?’
—’ কি বলছো আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। তার মতো মানুষ মানে?’
নূরি ফিরে তাকালো বোনের দিকে। মেয়েটার ফর্শা মুখটা এক্কেবারে রাঙা হয়ে আছে। আঁখিজোড়া তে রাজ্যের উদ্বেগ! হবে না-ই বা কেনো, সবার সামনে এরকম স্ট্রং দেখালেও ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে গিয়েছে পুরো।
—’ ভাই জেলে নেই, তিতির। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। আজ নেই, আর না তো এই তিনদিন ছিলো।’
—’ তাহলে? কোথায় সে!’
—’ সেটা তো আমি জানি না। তবে দু’টো বিষয় হতে পারে। ‘
—’ কি?’
—’ যদি আমাদের বিশ্বাস ভুল প্রমানিত হয়, তবে সে হেফাজতে আছে নিজের মতো। অথবা… ‘
—’ অথবা?’
তিতিরের রঙহীন মুখটা আচমকাই রঙ ফিরলো। জিজ্ঞাসু নজরে তাকাতেই নূরি বলে উঠলো,
—’ ইয়াজ মির্জার তোকে চাই আর রুষমিতা মির্জার চাই বড় ভাইয়া কে। হিসেব মেলা এখন। কোথায় থাকতে পারে সে। উহু, কথাটা কোথায় থাকতে পারে না, বলা যায় কোথায় রাখতে পারে বড় ভাইয়াকে।’‘
আশ্চর্য হলো তিতির। নূরির সাথে ইয়াজ বা রুষা কে নিয়ে কখনো আলাপ হয়নি তার সাথে। বিস্মিত গলায় বললো,
—’ ইয়াজ আর রুষমিতা মির্জা! রুষমিতা কে? ‘
—’ রুষা। ‘
রুষার ভালো নাম যে রুষমিতা এটা কি তিতির জানতো না? না-কি জেনেও খেয়াল করেনি কখনো! তবে রুষমিতা নামটা তো তার অতি পরিচিত। যদিও সে যার কথা ভাবছে তার সাথে নাতো তার কখনো দেখা হয়েছে, আর না তো দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আজকাল আর আছে। তবে সে-সব মাথা থেকে সরিয়ে হালকা গলায় শুধালো,
—’ ওদের সম্পর্ক কি?’
—’ ভাই বোন ওরা। ‘
থমকায় তিতির। নূরির দিকে গভীর দৃষ্টি তাক করে বলে,
—’ ওরা করছে এসব?’
—’ হতে পারে, যদি না ভাইয়া সত্যিই দোষি হয় ।’
—’ আর প্রমানগুলো কিভাবে, কি!’
—’ নো আইডিয়া। ‘
—’ একটা মানুষের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন সাজিয়ে গুছিয়ে, চক্রান্ত করে আসা নেহাৎ মুখের কথা নয়। বিগত তিন-সাড়ে তিন বছর যাবৎ এসব হচ্ছে। আমি ম রে গেলেও এসব প্রমান বিশ্বাস করি না। কিন্তু… ‘
—’ কিন্তু? ‘
—’ খু ন গুলো তো আর মিথ্যা নয়। কেউ একজন তো এগুলো করছেই। তাহলে যে ফাঁসাচ্ছে সে নয় তো? মানে, ইয়াজ মির্জা? ‘
নূরি একপ্রকার অনুভূতিশূন্য মুখ করেই তাকালো। তিতির কথাটা জিজ্ঞেস করেই, নূরির প্রতিত্তোরের অপেক্ষায় আছে হয়তোবা। নূরি এ যাত্রায় মৃদু হাসলো। রোদের তাপে শ্যামবরণ মুখটা বেশ অন্ধকার দেখতে লাগছে। শান্ত সুরে বললো,
—’ সে তো তুই বলতে পারবি। তোর জন্য দেওয়ানা হয়ে এতো কিছু করলো বেচারা। আর শেষে কি-না তুই ওকে রে প কেসে ফাঁসাতে চাচ্ছিস! কতটা সাফার করেছে তোর কাছ অবধি পৌছাতে! মনে প্রতিশোধ চেপে রেখে তোকে ভালোবেসে গিয়েছে। আমাকে পুতুল নাচ নাচিয়েছে, তবু তোর গায়ে একটা আঁচড় ও লাগতে দেয়নি।’
নূরির কথার সুর আজকে এই প্রথমবারের মতো বড্ড অস্বাভাবিক লাগলো। ইয়াজ মির্জার সাথে নূরির প্রেমের সংবাদ অজানা নয় তার। সেই হেতুতে এভাবে বলাটা স্বাভাবিক কি! কিন্তু কিসের প্রতিশোধ!
—’ আমি ইয়াজ মির্জা কে কখনো চোখের দেখাও দেখিনি, ছোটপু। সে কে, কেমন দেখতে, কি তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, সে-সবে আমার কোনো আগ্রহই নেই। ‘
—’ একটা হাস্যকর বিষয় বলি হ্যা? তুই খেয়াল করেছিস কি-না বিষয়টা। এইযে এতসব যা যা হচ্ছে, সবকিছুর মূল কারণ কিন্তু তুই।
তিতিরের বাচ্চা বাচ্চা মুখের আদলে পরিবর্তন হলো। আহত দৃষ্টিতে তাকালো। নূরির মুখের হাসি মিলিয়েছে ততক্ষণে, কেমন একটা রুক্ষ গলাতে বললো,
—’ বড় ভাইয়ার সাথে শত্রুতা ইয়াজের। প্র তিশোধ নিতে এসেছিলো সে বড় ভাইয়ার সাথে । কিন্তু বেচারা তোকে দেখে আটকে গেলো। তোকে দেখে এতটাই দিওয়ানা হয়ে গেলো যে- তোকে মে রে দেওয়ানদের শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হলো তার। ভিকটিম কার্ড খেলা হলো আমাকে নিয়ে । তোর জন্য একবুক প্রেম জমাতে জমাতে, আমাকে দিলো এক সমুদ্র যন্ত্রনা। আজ বড় ভাইয়া জে’লে। তোর ধারনা এ-সব ইয়াজ মির্জার পরিকল্পনার অংশ। সেটাও যদি হয়, তার কারণও তুই। তোকে পেতে এতো কাহিনী সবার। তুই সবার দূর্বলতা। তোর জন্য এতো এতো মানুষের জীবন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিস? ‘
তিতির হত-বিহবল হয়ে গিয়েছে। এতটা কঠিন কথা, নূরি এ জন্মে কখনো বলেনি তাকে। আজকে, এমন একটা মূহুর্তে, এভাবে এতগুলো কথা শুনিয়ে দেওয়ায়, সম্ভবত নিজের বোধবুদ্ধি কাজ করছে না তার। নূরি বাঁকা গলায় বললো,
— ‘ ছোট ভাইয়া তোকে ভালোবাসে, বিয়ের আগে একটা প্রেম করতি, বিয়ে করলি আরেকজনকে। আমি যাকে ভালোাবসি- সে তোকে ভালোবাসে। যে পুলিশ ভাইয়াকে এরেস্ট করেছে, সে-ও তোর জন্য পাগল। কে জানে সেই, ভাইয়ার ওপর রাগ করে এসব করছে কি-না। মোট কথা আশেপাশে এতো এতো পুরুষমানুষ কে নিয়ে খেলা করে যাচ্ছিস রীতিমতো। কেউ শান্তিতে নেই, তিতির। তোর জন্য সেটা। বুঝতে পারিস নি এখনো? না পারলে ভাব, বোঝ। ইয়াজ মির্জা স্বাভাবিক কোনো লোক নয়। এতো সহজে ছাড়বে আমাদের? আমার জীবনটা তছনছ হয়েই গিয়েছে, তোর জন্য। আমার দুই ভাইয়ের জীবনও তাই। আর কত তিতির! দেওয়ান বাড়ির বড় ছেলে শেষমেশ ধ র্ষন মামলায় জেলে। মানসম্মান কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছিস তুই। ভেবে দেখ…’
নূরি আর দাঁড়ায় না। মুখ ফিরিয়ে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করে। এগিয়ে যায় বাড়ির লোকদের দিকে। তিতির বাকরুদ্ধ, চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে যেনো। নূরি এ-সব কি বলে গেলো! তার জন্য সব হচ্ছে! তাকে পেতে সবাই এতো মরিয়া হয়ে, এ ধরনের নোং রা খেলায় নেমেছে! সবার জীবন নষ্ট হওয়ার জন্য সে দায়ী!
নূরি ফোন কানে ঠেকিয়ে ফাঁকা জায়গায় এসে দাড়ালো। ওপাশের মানুষের ভারি নিঃশ্বাস কানে আসতেই, এপাশে ওড়নায় মুখ ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। গমগমে কন্ঠস্বর শোনা গেলো ওপাশের মানুষটির।
—’ ঘটনা গুলো আমি ঘটাইনি, জান। তোমার বোনকে এটা কেনো জোর খাঁটিয়ে বললে না? ‘
ইয়াজের তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরে, এদিক থেকে ঘৃনায় নাকমুখ কুঁচকে এলো নূরির। কান্না আটকে বললো,
—’ কোন ভরসায় বলতাম সেটা?’
—’ কোন ভরসা লাগবে? আমার বে’ডে এসো তাহলে। ভরসা দেই। ‘
—’ আর কি কি করাবে তুমি আমাকে দিয়ে? আমাকে মুক্তি কেনো দিচ্ছো না? এখন তিতিরের ক্ষতি করতে আমাকে ব্যবহার করছো। আমার ছোট বোন ও। কতটা ভালোবাসি আমি ওকে আন্দাজ বছে তোমার?’
মুখে কেমন একটা চুকচুক শব্দ করলো ইয়াজ। বিশ্রী শব্দে হাসলো।
—’ আমিও তো ভালোবাসি তোমার বোনকে। তোমার আন্দাজেরও বাইরে। তোমার বোনটা বড্ড নিঃস্পাপ, জান। ভালোবাসতাম আমি, মাঝখান থেকে একবেলা একটু বেখেয়াল হলাম, আর ছক্কা মে রে বিয়ে করে নিলো ঈশান আরশাদ! এটা কি করে মানি আমি! অসম্ভব। তোমার বোন একমাত্র নারী যার জন্য, ইয়াজ মির্জা নিজের পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। তোমার ভাই ওকে গভীরে ছুঁয়েছে, জেনেও নিজের ছোঁয়ায় সেই সব মুছতে মরিয়া হচ্ছি। অন্য পুরুষের ছোঁয়া নারীও আমার মনে এখনো রাজ করছে। কতটা ভালোবাসি, ভাবতে পারো। ওকে আমার চাই, জান। ‘
নূরির বিতৃষ্ণায় পেটের ভেতর গুলিয়ে উঠলো। একে তো সারারাতের জার্নি, তার ওপর এতো এতো মানসিক চাপ। আর এই লোকের সাথে কথা বললে এমনিতেই গা গোলায় তার। তেঁতো কন্ঠে বললো,
—’ ভাইয়া কে কোথায় রেখেছো, সেটা বলো। ‘
—’ সে-সব তোমার সাথে আলাপ সম্ভব না, জান। ওটা তোমার বোনের সাথে হিসেব হবে। তোমার ভাই নিজ থেকে তোমার বোনকে ডি ভোর্স দেবে, তোমার বোনও হাসিমুখে স্বামী রেখে আমার বিছানায় আসবে। এই তো আর কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। ‘
—’ ধ র্ষন গুলো তোমার করা, ইয়াজ?’
প্রশ্নটা একপ্রকার ঝোঁকের বশেই করে ফেলেছে নূরি। ইয়াজ অবশ্য স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। অশ্লীল হেসে উঠলো। বাঁকা গলায় বললো,
—’ নাহ, জান। যা করার তোমার ভাইয়াই করেছে। ট্রাস্ট মি! প্রমান গুলো দেখোনি? সে নিজ মুখেও স্বীকার করবে, যদি তুমি তিতিরকে আমাার কাছে আনার ব্যাবস্থা না করো। মিতুর সন্তান…ওটা তো তোমার ভাইয়ের। জানতে এটা?’
মিতু! ইয়াজের বাড়ির সেই গৃহকর্মী মেয়েটা। যে অন্তঃসত্ত্বা! দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে দিচ্ছে লোকটা। মিতুকে এর মধ্যে নিয়ে আসলো, তিতির আরও সহ্য করতে পারবে না। মেয়েটা কান্নামাখা গলায় বললো,
—’ আর কিচ্ছু করবে না তুমি। তিতির স্ব-ইচ্ছায় তোমার কাছে যাবে, কথা দিলাম তো আমি।’
ফোনের ওপাশ থেকেই শব্দ করে আড়মোড়া ভাঙ্গার চনমনা শব্দ কানে এলো রমনীর। কম্পিত বুক নিয়ে অপেক্ষা করে ইয়াজের কথাগুলো শোনার জন্য। খানিক আগে তিতিরের সাথে বলা সব কথাই, ফোনের ওপাশ থেকে শুনেছে লোকটা। খানিকটা হলেও, তিতিরের বিরুদ্ধে নিজেকে বিশ্বাস যোগ্য করাতে পেরেছে কি-না কে জানে! ইয়াজ সে-সব কথাতেই গেলো না। উল্টো বললো,
—’ তোমার আদরের বড় ভাইকে জানে, প্রানে ফিরে পেতে চাও তো? তবে সেটাই যেনো হয়। তিতির আমার।’
—’ যদি তিতির নিজ থেকে কখনো তোমার না হয়?’
নূরির বিদ্রুপমাখা কথাগুলো সম্ভবত বেশ গভীরে স্পর্শ করলো ইয়াজের। করবে না-ই বা কেনো! সে নিজেও জানে সেটা।
—’ আমি একা করবো কেনো? তোমরা নিজেরাই সাহায্য করবে আমাকে। তুমি, তিতির, ঈশান, এমনকি দেওয়ান বাড়ির প্রতিটা মানুষ। নিজ হাতে তুলে দেবে তিতিরকে, আমার কাছে। সেদিন বেশি দেরি নেই তো।’
নূরি হু হু করে কেঁদে ওঠে। ঈশান জে লে নেই, সে খবর গতরাতেই সে পেয়েছে। ভাইটা তার বন্দি আছে ইয়াজ মির্জার ডেরায়। ইয়াজের শর্ত অনুযায়ী তিতিরকে পেলে, প্রানে রেহাই দেবে ঈশানকে। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে, ছোট্ট আদরের বোনটাকে এহেন বিপদের মুখে ফেলে দিতে হচ্ছে তার। তবুও মনের কোনে একটা ক্ষিন আশা, ঈশানকে ফিরিয়ে আনতে পারলে– তিতিরকেও মুক্ত করা সম্ভব ইয়াজের থেকে। খানিক আগে তিতিরের সাথে করা, তার এই দূর্ব্যাবহারে নিজের ওপরই চরম বিষাদ জন্ম নিয়েছে নূরির। আর কত! নিজের বোকামি তে হচ্ছে এসব। সে যদি আজ থেকে তিন বছর আগে ইয়াজ কে চিনতে পারতো, হয়তো আজকে তার পরিবার কে এভাবে নাচাতে পারতো না লোকটা।
—’ আপনি আমাকে সহ কোথায় যাবেন? আমি কোত্থাও যাবো না। অসম্ভব। ‘
বদ্ধ সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত গলায় কথাগুলো বলে গেলো মিতু। ঈশান হাতের পিস্তলখানা পকেটে গুঁজে বিরক্ত মুখে তাকালো তার দিকে। মেয়ে মানুষ আসলেই ন্যাকা। এই তো সকাল থেকে বাঁচান, বাঁচান করে হেদিয়ে মরছিলো, যেই মূহুর্তে সে সময় এলো, তখনই নাটকের শেষ নেই। যদিও মেয়েটাকে এক তরফা দোষ দেওয়া যায়না। ওর যা মনের অবস্থা, তাতে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। ঈশান স্বাভাবিক গলায় বললো,
—’ আমি এখান থেকে বেরিয়ে গেলে তুমি জিন্দা থাকবে বলে মনে করো?’
—’ আমাকে ইয়াজ মির্জা এতো সহজে মা রবে না, ভাইয়া। আপনি চলে যান। আমাকে সঙ্গে নিতে চাইবেন না।’
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দরজার ওদিক থেকে সরে এলো। ঘরের কোনায় কোনায় সিসিটিভি। এতক্ষণে হয়তো তার এখান থেকে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে সতর্কও হয়ে গিয়েছে ইয়াজ, রুষা। এখানে চলেও আসবে।
—’ তা হয় না, মিতু। তোমাকে এভাবে বিপদে রেখে আমি চলে যেতে পারি না। ‘
—’ আর আমি একজনের জিম্মাদারি কাঁধে তুলে নিয়েছি। সে আমাকে ছাড়া অচল। এতো এতো রাহাজানির মধ্যে সে আমার হাত ধরে ভরসা খোঁজে। আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারি না। সে মৃ ত্যুপথচারিনী জীবনের শেষ মূহুর্তে পাশে কাউকে পাবে না। হাহাকার করবে, সেটা আমি হতে দিতে পারি না।’
—’ দেখো, মিতু। আমি আমার পরিকল্পনা মতো চলবো। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাকে জেলে যেতে হলেও যাবো। হতে পারে আজ কালের মধ্যে সত্যিই এবার জেলে ঢুকতে হবে আমার। কিন্তু তোমার একটা সুরক্ষা করে না দিয়ে আমি যেতে পারি না।’
মিতু মৃদু হাসলো। ছলছল নয়নজোড়া মুছলো আলতো হাতে। পেটের ওপর হাত বুলিয়ে মিহি সুরে বললো,
—’ আপনাকে জেলের বদলে এ বাড়িতে নিয়ে এসে আমার সাথে রাখা হয়েছিলো, শুধুমাত্র আপনার বিরুদ্ধে আরও কিছু প্রমান জোগাড় করতে। পুলিশ এখন সুন্দর মতো আরেকটি অভিযোগ লিখবে আপনার নামে। কি জানেন? দিনের পর দিন, এই বাড়িতেই আমার ওপর অত্যা চার করে এসেছেন আপনি। সেই অত্যা চারের ফসল এই সন্তানটি। এবং আমি সেটা থানায় অভিযোগ ও জানাবো। আপনার নামে মিথ্যা সাক্ষীও দেবো। পুলিশ এরেস্ট করার সময় আপনি যে পালিয়ে এসে আমার সাথে এই তিনদিন ছিলেন, সেটারও সাক্ষীও আমিই দেবো। এতোকিছু জানার পরও আমাকে কেনো সঙ্গে নিতে চাইছেন? কেনো ইয়াজ মির্জার হাত থেকে বাঁচাতে চাইছেন? আমাকে মে’রে রেখে গেলেই পারেন। কারণ আমি আপনার সঙ্গে কখনো যাবো না, আর যেহেতু যাবো না– শেষমেশ আমি আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবোই। বাধ্য আমি।’
ঈশান তীক্ষ্ণ, সরু চোখে শুনে যায় মেয়েটার কথাগুলো । ঘটনা জড়িয়ে আসছে ক্রমশ। পরিকল্পনা মোতাবেক এক রাতের জন্য হলেও থানায় যেতে হবে তার, তবে তার আগে আরও কিছু ঘেটে যাওয়া বিষয়, গুছিয়ে আনতে হবে। সে যা ভাবছে সেটা তখন হবে, যখন সে সবার আড়ালে যাবে । সবাই জানবে ঈশান আরশাদ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে। ঈশান কথা বাড়ায় না আর। শুধু বলে,
—’ টেক কেয়ার । ‘
দিনের আলোর তীক্ষ্ণতার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোদের তীব্রতা। গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। ঈশানের সাথে শেষপর্যন্ত দেখা করার পারমিশন দেওয়া হয়নি কোর্ট থেকে। কোনোভাবেই ব্যবস্থা করা যায়নি পরিবার এর কারোর সাথে দেখার করার। ঈশানের এডভোকেট আমিনুল সাহেব যখন , তার সাথে দেখা করে বাইরে এলেন, তখন যোহরের আজান পরছে। অস্বাভাবিক গম্ভীর মুখ দেখেই, স্পষ্ট বলে দেওয়া যায় লাভের লাভ সেরকম কিচ্ছু হয়নি। রাইসুল দেওয়ান একপ্রকার ছুটে গেলেন বন্ধুর কাছে। শুধোলেন ছেলের কথা। আমিনুল সাহেব খুবই সন্তর্পণে আউরিয়ে গেলেন, শেখানো বুলিগুলো। জানালেন ঈশান আরশাদ জেল হাজতেই আছে। তদন্ত চলছে পুরোদমে। কেস কোর্টে ওঠার আগ অবধি পরিবার এর সাথে দেখা করার তীব্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। শুধুমাত্র সে, ঈশানের উকিল হিসেবে দেখা করতে পারবে।
বাংলা হিসেবে বর্ষাকাল চলছে। তবে গরমের পরিমাণ অনুযায়ী সেটা বোঝা দুষ্কর। ঢাকার এদিকে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। আজকে রবিবার। কেসের ডেট ফেলা হয়েছে সামনে সোমবারে। এ কদিন জেলেই কাটাতে হবে ঈশান কে। দেওয়ান পরিবার শুরুতে এখানেই থাকার পরিকল্পনা করলেও, শেষমেশ সিলেট ফিরে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাইসুল দেওয়ান আরও লোকজনের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ করে যাচ্ছে, অন্তত একটাবার ছেলের সাথে দেখা করার অনুমতির বিষয়টা নিয়ে। গোটা একটা ছন্নছাড়া, বিধ্বস্ত দিনের সমাপ্তি শেষে যখন রাতের আঁধার নেমেছে, তিতির রা ততক্ষণে ফিরে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে পরেছে। গোটা দিন শক্ত থাকলেও, এ বেলা চোখ মেলে তাকাতে পারছে না তিতির। তার পুরানো মাথার যন্ত্রনা আচমকাই আজকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঈশানের সাথে একটাবার দেখা হবে, এই আশা সম্ভবত ছিলো তার। সেটা না হওয়ায় মানসিক চাপ, বেশ ভালোমতোই জেঁকে বসেছে তাকে।
রাত পেরিয়ে সকাল, সকাল পেরিয়ে আবার সাঁঝবেলা। প্রকৃতির নিয়মে চলছে সব। ঈদের দিন ঘনিয়ে আসছে। মানুষের ব্যাস্ততা বাড়ছে একই গতিতে। দেওয়ান বাড়ির আলো আজকাল জ্বলতে চায়না। বাড়ির ছেলের এরকম দুর্দিনে কোন সুখের খোঁজে ভালো থাকতে চাইবে তারা! ওরকম একটা আদুরে মূহুর্তের পর ঈশান যে এভাবে তার থেকে দূর হয়ে যাবে কল্পনাও করতে পারে না তিতির। সেদিন যূি জানতো এরকম হতে পারে, বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতো না স্বামীকে? রাখতো তো। বসার ঘরে সবাই মিলে আলাপ আলোচনা চলছে ঈশানের কেসটা নিয়ে। কি থেকে আদতে কি ঘটলো, কোনো কিছুরই হিসেব মিলছে না তাদের। আর না তো সাজিদের সাথে এ কয়দিনে যোগাযোগ হয়েছে। সে-ও নিখোঁজ হয়েছে রীতিমতো। অনিমাও জানাতে পারছে না তার কোনো খোঁজখবর।
ধীরগতিতে চলছে সবকিছু, কাজে কর্মে মন নেই বাড়ির কারোর। কর্তারা অফিসের কাজেও মন দিতে পারছে না। বড় বড় এডভোকেটদের সাথেও যোগাযোগ করে কাজ হচ্ছে না কোনো। সদর দরজার কলিং বেজটা বাজতেই, গৃহকর্মী ছুটে গেলো দরজা খুলতে। ডাকপিয়ন এসেছে। রাহিয়ান দেওয়ান এগিয়ে গিয়ে খামখানা হাতে নিয়ে ভাইদের কাছে ফিরলেন। ঢাকা থেকে এসেছে। থানার ঠিকানা। বড় ভাইয়ের দিকে খামটা বাড়িয়ে ধরতেই, তিনি ডানে বায়ে মাথা না নাকচ করলেন। চশমা আনেননি। সুতরাং ভাইকেই পড়তে বললেন কাগজ খানা। তিতির আর নিশি পাশের ডায়নিং এ বসা। তিতিরকে জোর করে খেতে বসানো হয়েছে। মেয়েটা অবশ্য সেই থেকে নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে খাবার থালায়। তবে থানা থেকে চিঠি এসেছে শুনেই নড়েচড়ে বসলো। তিন গিন্নি ও বেরিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। রাহেলা শক্ত মুখেই তাকিয়ে রইলেন, চিঠির দিকে।
খচখচ শব্দে কয়েকটা কাগজ বের করে আনলেন খাম থেকে। চোখের চশমা খানা ঠেলে দিয়ে মন দিলেন কাগজের লেখায়। থমকালেন তিনি। কেমন একটা মলিন, অসহায় মুখে তাকালেন ভাইয়ের দিকে। রাইসুল দেওয়ান ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,
—’ পড়তে গিয়ে থেমে গেলি কেনো? কিসের কথা লিখেছে? কিসের কাগজ এগুলো!’
রাসেদ দেওয়ান পাশেই বসা ছিলো। ছোট ভাইয়ের হাত থেকে কাগজ খানা নিয়ে নিজে চোখ বুলাতেও একই রকম অভিব্যাক্তি ফুটে উঠলো,তার চোখেমুখে। বিরবির করে বললো,
—’ ঈশান আমাদের সাথে দেখা করবে না জানিয়েছে। ও চাচ্ছিলো না বলেই, আমাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ‘
ওদিক থেকে ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে তিতির। থানা, পুলিশের কথা শুনলেই মেয়েটার চোখমুখ আজকাল অন্য রকম দেখায়। রাহেলা এগিয়ে এলেন এদিকটায়। শান্ত গলায় বললেন,
—’ আর? আর কি লিখে পাঠিয়েছে মিথ্যাবাদি গুলো?’
রাসেদ দেওয়ান এর হাতে আরও কয়েকটা কাগজ। ঝুঁকে এলেন সেদিকটায়। তবে চোখের সমস্যার হেতুতে সে-ও স্পষ্ট বুঝতে পারলো না। রাসেদ খানিকটা সময় ইতস্তত করতেই, বড় ভাইয়ের ধমক খেলেন। মস্তিষ্ক ঝুঁকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—’ মিতু নামে একটি মেয়ে আজকে ঈশানের নামে মামলা করেছে। দিনের পর দিন আটকে রেখে নির্যা তন এর অভিযোগ তুলেছে। আর…’
হতভম্বতা নিয়েও ধমকে উঠলেন রাইসুল সাহেব। কথাটা শেষ না করেই বারংবার থেমে যাওয়ায় বিরক্ত হচ্ছেবন তিনি। রাসেদ সাহেব মুখ তুলে ভাগিনী কে খেয়াল করলেন। ভাতের প্লেটে হাত রেখে, মেয়েটস পাথর হয়ে বসে আছে। অনূভুতি শূন্য দৃষ্টি তার দিকেই তাক করা। অসহায় দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন তিনি। চাপা গলায় কোনোমতে বললেন,
—’ আর মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা । মেয়েটার দাবি ঈশানের সন্তানের মা হতে যাচ্ছে সে।’
ক্ষনিকের জন্য গোটা বাড়ির মানুষ সম্ভবত শ্বাস নিতেও ভুলে গেলো। সেকেন্ডের মাথায় শুধু শোনা গেলো জোরে শ্বাস টানার শব্দ। তিতিরের দিকে আতঙ্কিত হয়ে ফিরলো সবাই। রাহেলা দৌড়ে গিয়ে আগলে নিলেন পুত্রবধূকে। হাহাকার করে উঠলেন, ব্যাস্ত গলায়। কর্তারাও ছুটে গিয়েছে সেদিকে। নাক দিয়ে রক্তিম তরল গড়িয়ে পরতেই আর্তনাদ করে উঠলো নিশি।
—’ প্যানিক এটাক হচ্ছে, মা। ঘরে নিয়ে চলো ওকে। ওর আগের সেই সমস্যা টা! সর্বনাশ। ‘
নয়ন সিঁড়ির মাথাতেই ছিলো। নূরিও ছুটে এসেছে। সিঁড়ির মাথা থেকেই চিৎকার করে বললো,
—’ বড়পু, ইনজেকশন কিন্তু নেই বাড়িতে।’
নয়ন আর কিচ্ছু শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না। না তো অপেক্ষা করলো। টেবিলের ওপর থেকে বাবার গাড়ির চাবি নিয়ে ছুটলো ওষুধগুলো নিয়ে আসতে। রাহিয়ান দেওয়ান সময় নষ্ট করলেন না, ঝট করে চেয়ার থেকে তুলে এনে শুয়িয়ে দিলেন সোফার ওপর। মেয়েটা শ্বাস তো নিতে পারছেই না, না তো নোজ ব্লিডং কমেছে।
গভীর হয়েছে রাত। বাইরে ভ্যাপসা গরম পরেছে। বৃষ্টির প্রয়োজন খুব করে। ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে এলাকায়। তিতিরের ঘর থেকে সবাই খানিক আগেই নিজেদের ঘরের দিকে গিয়েছে । এখন শুধু রাহেলা আর নিশি বসে আছে। রাহেলা তেল মালিশ করছে তার মাথায়। জ্বর এসেছে মেয়েটার। নয়ন ইনজেকশন নিয়ে আসার পর, তবেই শান্ত হয়েছে মেয়েটা। জ্ঞান ছিলো না অনেকটা সময়।
মাথায় বিলি কাটতে থাকা হাতটা আচমকা কম্পিত হাতে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো তিতির। রাহেলা চমকে ওঠেন, খেয়াল করেননি তিতির এখনো জেগে।
তিতির হাতখানা বুকের মধ্যে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। ভাঙা গলায় বললো,
—’ আমি কিন্তু তোমার ছেলেকে ভুল বুঝিনি, মামনী। তোমরা এটা ভাবছো না তো, আমি তাকে ভুল বুঝে এমন অসুস্থ হয়ে পরেছি। একদম তা নয় কিন্তু… ‘
রাহেলা গর্দান ঝুকিয়ে চুমু খেলেন মেয়েটার তপ্ত ললাটে। জ্বর ভীষন। চোখের কার্নিশ গড়িয়ে অনবরত পরছে তপ্ত নোনাজল। নিশি বিছানার পাশেই বসা। ওড়নায় মুখ চাপা দিলো সে-ও।
—’ আমি জানি তো, মা। তুই ভরসা করিস আমার ছেলেকে।’
—’ শুধু ভরসা নয়, মামনী। যতটা ভরসা আমি এই আমাকে করিনা। ততটা তোমার ছেলেকে করি। ধরে বেধে বিয়ে দিলেও, শুরুর দিন থেকে আমি তাকে মনেপ্রাণে গ্রহন করেছি। তাকে আত্মস্থ করে গেছি ক্রমাগত। ঘর করি তার, তার স্পর্শ মাখি। আমি তাকে এতটা ভুল চিনতে পারি না। অসম্ভব। আমার অবচেতন মনও সেই ইঙ্গিত একবারও দেয়নি। ‘
রাহেলা নিজেও কাঁদছে। কি হচ্ছে তার ছেলেমেয়ে দুটোর সাথে। ঈশান কেনোই বা দেখা করতে অস্বীকার করেছে। মেয়েটাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছে!
—’ তাহলে? তাহলে এতো হতাশ হচ্ছিস কেনো? কিছু একটা ঘটছে, যেটা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। একটু সময় তো লাগবেই সব ঠিক হতে।’
—’ তোমার ছেলে কষ্ট পাচ্ছে তা, মামনী। এসব মিথ্যা ব্লেম কেনো! আমার জন্য সব হচ্ছে। সব আমার জন্য। আমি ওনাী জীবনে না আসলে…’
আর কথাগুলো বলতেই পারলো না মেয়েটা। শাশুড়ীর পেটে মুখ গুঁজে আর্তনাদ করে গেলো। মেয়েটার করুন চিৎকার, সামলাতে হিমশিম খেলেন তিনি। বুকে জড়িয়ে শান্তনা দিয়ে গেলেন অনবরত। ব্যাকুল হয়ে ডাকলেন খোদাকে।
ঘরজুড়ে মিষ্টি সুরে তেলওয়াতের সুমধুর ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। নিশির নামাজ পরে গিয়ে তিতিরের বিছানাতেই শুয়েছে খানিক আগে। রাহেলা আর তিতির জায়নামাজে বসা এই মূহুর্তে।
একজন পুরুষের জীবনে সবথেকে গুরত্বপূর্ণ, তিন নারী। মা, বোন, বউ…খোদার কাছে মাথা ঝুকিয়ে তাহাজ্জুদে পরে আর্তনাদ করে যাচ্ছে, সেই পুরুষের জন্য। ঈশান যদি দেখতো এই দৃশ্য খানা। নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষ মনে করতো কি? নিঃসন্দেহে করতো। অসুস্থ শরীরও টালমাটাল অবস্থা। সময় লাগছে দোয়া কালাম আউরাতেও। এই শরীর নিয়েও দীর্ঘ সময় ইবাদত করে যাচ্ছে মেয়েটা। জীবনের ভালো, মন্দ, এমন করুন পরিস্থিতিতে আর কে আছে, খোদা ছাড়া! কার কাছে সমাধান আছে? নেই, কারোর কাছে নেই।
মোনাজাত তুললো তিতির। চোখের পানি বাঁধ মানছে না তার। আচমকাই খুব শান্তি অনূভব করলো। সে যে সঠিক জায়গায় এসে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, সেটা অনূভব করলো মনেপ্রাণে। একমনে খোদাকে ডেকে গেলো ব্যাকুল স্বরে।
—’ বাবা মা কে আমি মনে করার জন্য যেটুকু স্মৃতি দরকার হয়, সেটা আপনি আমাকে কখনো দেননি খোদা। মুখের বুলি শিখে তাদের ডাকা শিখেছি সবে, তখনই কেড়ে নিয়েছো তাদের। একটা পরিবার দিয়েছেন তারপর। এতোটা ভালোবাসা দিয়েছে এরা আমাকে, কখনো কোনো আক্ষেপ নিয়ে আপনার কাছে আসতে হয়নি আমার। আজীবন শুকরিয়া আদায় করে গিয়েছি। আজকে চাইবো আপনার কাছে। ফিরিয়ে দেবেন না, খোদা। আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার? অন্তর্যামী আপনি। সহায় হন আমার। আমার স্বামী, আমার ভালোবাসা, ভরসা, আশ্রয়, আমার ইহকাল-পরকালের সঙ্গী। তাকে আপনি আমার থেকে আলাদা করবেন না । আমি আমার মৃ ত্যুর সময়টাও তার সাথে কাটাতে চাই। শেষ নিঃশ্বাস তার বুকে ত্যাগ করতে চাই। এইটুকুই চাওয়া আপনার কাছে। এই সুযোগ টা আমাকে দিন আপনি। আমার জীবনের যেটুকুন পূন্যে আছে, তার সবটুকুর বরকত দিয়ে আপনি ওনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।
আমাকে একটা সংসার দিন ওনার সাথে। সম্মান, জীবন, মরণ সবের মালিক আপনি। সসম্মানে ওনাকে ফিরিয়ে আনুন। সব বিপদ, অন্ধকার সরিয়ে দিন আমাদের জীবন থেকে। আমি সন্তান চাই খোদা। আমার পরিপূর্ণ সংসার চাই। পরকালেও তার সঙ্গ চাই। আমাকে ফেরাবেন না খোদা। ফেরাবেন না। তাকে ছাড়া মৃ ত্যু কবুল খোদা, মৃ ত্যু কবুল। যদি বাঁচিয়ে রাখেন, তবে সসম্মানে, একান্ত তার করেই বাঁচিয়ে রাখবেন। দু’জনের রুহ থেকে শুরু করে সকল অস্তিত্ব, সবেতে যেনো একান্ত আমাদের দু’জনেরই হক থাকে। এইটুকুন ফরিয়াদ জানাচ্ছি, আপনার কাছে। রহম করুন। ‘
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩ (২)
মেয়েটার তীব্র আর্তনাদ শুনলো নিশি আর রাহেলাও। চার দেয়ালের ভিতরে বারি খেয়ে যাচ্ছে সেই চিৎকার। একজন স্ত্রী তার স্বামীর জন্য ফরিয়াদ জানাচ্ছে খোদার কাছে। নিজের সবটুকু দিয়ে! ভাগ্য করে এমন একজন জীবন সঙ্গীনি পাওয়া যায়। ঈশান আরশাদ দেওয়ান নিঃসন্দেহে দুনিয়ার সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষের একজন।
