প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৭
বন্যা সিকদার
রোহানে’র মুখ থেকে এমন স্বীকারোক্তি শুনে মৌ’য়ের বুকের রক্ত যেন এক লহমায় হিম হয়ে গেল। সে ছানাবড়া চোখে তোতলাতে তোতলাতে বলল‚
“র র র রোহান ভাইয়া তুমি খুন করেছো ওদের?
কথাটা পুরো রেস্টুরেন্টে ছড়িয়ে পড়ার আগেই উজান তড়িঘড়ি মৌ’য়ের মুখ নিজের এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওয়েটার তাদের অর্ডার করা কফি আর আইসক্রিম ট্রেতে করে দিয়ে নীরবে চলে গেল। ওয়েটার আড়াল হতেই উজান মৌ’য়ের কানের কাছে নিচু গলায় বলল‚ “পিচ্চি একদম মুখ বন্ধ রাখো। আমি কথা বলছি তো।
মৌ উজানে’র কথা মতো চুপ হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু তার দু-চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় গরম জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। রোহান নামের এই ছেলেটা ভেতর থেকে যে এতটাই পৈশাচিক‚ হিংস্র আর বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে তা মৌ’য়ের কল্পনারও বাইরে ছিল। সামন্য আক্রোশের কারণে তিনটা জলজ্যান্ত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে কীভাবে লোকটা আবার বুক ফুলিয়ে টেবিলে বসে কফি অর্ডার করছে। এমনকি স্বাভাবিক ভাবে রয়েছে।
উজান এবার বেজায় চটে গেল। রোহানে’র এই অতি-স্বাভাবিক আর নির্বিকার ব্যবহার সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল‚
“রোহান তুই আজ যে অপরাধটা করেছিস। সেটার জন্য তোকে কঠিন শাস্তি পেতেই হবে‚ তুই জানিস তো? তোর বলা প্রতিটি কথা আর খুনের স্বীকারোক্তি আমি অলরেডি ফোনে রেকর্ড করে রেখেছি।
উজানে’র হুমকি শুনে রোহান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে ঠাণ্ডা মাথায় কফিতে একটা চুমুক দিয়ে ফিসফিস করে বলল‚
“তুই তো আইনের লোক‚ ভাই। সিআইডি অফিসার হয়ে তুই আমাকে ছাড় দিবি আর শাস্তি দিবি না‚ এমনটা আবার হয় নাকি? আমি খুব ভালো করেই জানতাম তুই শুরু থেকেই আমার সব কথা রেকর্ড করবি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস উজান…এই রোহান তালুকদার নিজে থেকে ধরা দিতে না চাইলে তোদের পুরো ডিপার্টমেন্টের কারও সাধ্য নেই আমাকে ছুঁয়েও দেখার।
“আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করছিস তুই? —উজান দুই জোড়া ভ্রু কুঁচকে হিংস্র গলায় জিজ্ঞেস করল।
“উঁহু‚ একেবারেই না। যেটা খাঁটি সত্যি‚ সেটাই বলছি।
—রোহান শান্ত গলায় হাত ছড়িয়ে দিল।
“বাই দ্য ওয়ে‚ তোদের দুজনকে এই অসময়ে এখানে ডেকে আনার আসল কারণটা এবার বলি তাহলে?
“রোহান ভাই আমার। প্লিজ আমার কথাটা শোনো। নিজের ভুলটা স্বীকার করে পুলিশ আর আইনির কাছে আত্মসমর্পণ কর। ট্রাস্ট মি‚ আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব তোকে আবারও একটা স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনার। আমি সত্যি চাই না তোর আর কোনো ক্ষতি হোক।
রোহান একদম স্থির ও শান্ত ভঙ্গিতে মৌ’য়ের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল।। “ভুল স্বীকার করে পুলিশের কাছে ধরা দিলে তুই তোর বউকে দিবি আমায়?
কথাটা শেষ হতে না হতেই উজান নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিংহের মতো গর্জন তুলে টেবিল ডিঙিয়ে রোহানে’র শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। “জানোয়ারের কী বললি তুই?
হঠাৎ উজানে’র এমন উগ্র আক্রমণে রেস্টুরেন্টের চারপাশের মানুষজন আর ওয়েটাররা অদ্ভুত ও আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকাতেই উজান নিজেকে খানিকটা সামলে নিল। সে রোহানে’র কলার ছেড়ে দিয়ে ধপাস করে চেয়ারে বসে নিচু কিন্তু বিষাক্ত স্বরে কটমট করে আওড়াল‚ “তোর নিজের বোন হয় পিচ্চি। আর তুই বোন সমতুল্য একটা মেয়ের দিকে নজর দিয়ে এসব নোংরা কথা বলিস? তোর নিজের একটুও লজ্জা করে না‚ রোহান?
“সরি ইয়ার! রোহান তালুকদারের ডিকশনারিতে লজ্জা‚ ভয় বা নীতিশাস্ত্র বলে কিচ্ছু কখনো ছিল না৷ যাক গে সেসব ফালতু কথা…তোদের দুজনকে যে জরুরি কাজের জন্য ডেকেছি‚ সেটা আগে শোন।
উজান মারাত্মক রাগান্বিত হলো। রোহানে’র প্রতিটা কথা তার কান আর মেজাজে সহ্যসীমার বাইরে গিয়ে বিষ ছড়াচ্ছিল। রোহান যদি তার বেস্ট ফ্রেন্ড না হতো‚ তবে হয়তো আজ নিজের হাতেই ওর জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলত সে। উজান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে মৌ’য়ের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রোহান চট করে থামিয়ে দিল।
“আরে দোস্ত শুনে তো যা আমি ঠিক কী বলতে চাইছি?
“নো‚ নেভার। তোর কোনো জঘন্য অজুহাত শুনতে আমরা একদম নারাজ। রেডি থাকিস রোহান‚ খুব শিগগিরই আমাদের এবার পুলিশ স্টেশনের লক-আপে দেখা হবে।
হঠাৎই রোহান হাত বাড়িয়ে উজানে’র হাত টেনে ধরে তাকে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল। উজান চরম বিরক্ত হলেও পরিস্থিতি দেখতে বাধ্য হয়ে শান্ত রইল। তখন রোহান একদম নিচু স্বরে থমথমে গলায় বলল‚ “তোকে আর কষ্ট করে পুলিশ নিয়ে আমার পেছনে দৌড়াতে হবে না‚ উজান। প্রোপার টাইম এলে আমি এমনিতেই তোদের সুন্দর লাইফ থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাব। বাই দ্য ওয়ে…ফুল‚ তুই আজও বুঝতে পারলি না এই রোহান তালুকদার তোকে ঠিক কতটা নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে?
মৌ দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষোভে হিসহিসিয়ে আওড়াল‚ “মানুষ খুন করে বা রক্ত ঝরিয়ে কখনো নিজের ভালোবাসার পবিত্রতা প্রমাণ হয় না‚ রোহান তালুকদার। এটা ভালোবাসা নয়‚ চরম মানসিক অসুস্থতা।
রোহান কিছু সময় পাগলের মতো একা একাই খিলখিল করে হেসে উঠল। অতঃপর মৌ’য়ের দিকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে নিচু স্বরে আওড়াল‚ “শোন ফুল আগামী দু’তিন দিন তুই আর মেহের এক সেকেন্ডের জন্যও ভুল করে এই চৌধুরী বাড়ির বাইরে পা ফেলবি না। কেন বের হবি না‚ তার কোনো ডিটেইলস বা ব্যাখ্যা এখন তোকে আমি দিতে পারব না। এই কয়টা দিন চুপচাপ রুমের ভেতর বন্দি থাকবি‚ বুঝতে পেরেছিস?
মৌ এক চুলও দমে না গিয়ে রোহানে’র চোখের সামনে নিজের তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল‚
“তাসফিয়া মৌ চৌধুরী কখনো কারো হুকুম মেনে চলে না। সে কেবল নিজের হুকুম মেনে চলে।
কথাটা বলেই মৌ নিজেই এবার শক্ত করে উজানে’র হাত টেনে ধরে তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো। আর সেখানে টেবিলে একা নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল রোহান। উজান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মৌ’কে বাইকে বসিয়ে সোজা চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু বাসায় এসে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দুজনেই একদম স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের চৌধুরী বাড়ির আলো ঝলমলে ড্রয়িংরুমে আগে থেকেই বেশ কয়েকজন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ অফিসার গম্ভীর মুখে বসে আছেন। হঠাৎ বাড়িতে পুলিশ কেন এসেছে? উজান সিআইডি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও পুরো বিষয়টা এক লহমায় বুঝে উঠতে পারল না। সে কৌতুহল ও চিন্তিত মুখে এগোতে চাইল তবে মৌ ভয়ে উজানে’র হাতটা পেছন থেকে শক্ত করে চেপে ধরে টেনে রাখল। মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা অজানা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। কারণ আজ পর্যন্ত চৌধুরী বাড়ির চৌকাঠে কখনো কোনো কারণে পুলিশের পা পড়েনি। তবে আজ মাঝরাতে কেন এভাবে পুলিশ এলো? এই ভেবেই মৌ’য়ের গা হিম হয়ে এলো!
উজান মৌ’কে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বললেও মৌ ভয়ে আরও গুটিয়ে গেল। পরিস্থিতি বুঝে মেহের দ্রুত এগিয়ে এসে মৌ’কে নিজের কাছে টেনে নিল। উজান ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সেই পুলিশ অফিসারের দিকে এগিয়ে গেল। উজান’কে কাছে আসতে দেখেই তারা সসম্মানে উঠে দাঁড়াল। উজান একদম স্বাভাবিক গলায় আওড়াল‚
“অফিসার আপনারা এই মাঝরাতে এখানে?
পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন‚ “আসলে স্যার এত রাতে আপনাদের ডিসটার্ব করার কোনো ইচ্ছেই আমাদের ছিল না। তবে বুঝতেই তো পারছেন আমরা আইনের লোক‚ ডিউটির খাতিরে আসতে হলো। প্লিজ স্যার‚ কিছু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।
উজান তীক্ষ্ণ চোখে অফিসারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল। “অফিসার আপনারা কি আমাকে এই কেসে সন্দেহ করছেন?
”নো স্যার। তবে তদন্তের স্বার্থে আপনাকে যেতেই হবে‚ প্লিজ স্যার চলুন।
উজান আর কথা না বাড়িয়ে এই গভীর রাতেই তাদের সাথে বের হয়ে গেল। মৌ ভেতর থেকে ব্যাকুল হয়ে পেছনে দৌড়ে এসে ডেকে উঠলেও উজান থামল না। বরং দরজার কাছ থেকে বরফশীতল কণ্ঠে আওড়াল‚ “পিচ্চি ডোন্ট ওরি! জাস্ট ওয়েট‚ আমি খুব শিগগিরই ফিরে আসছি।
তারা চলে যেতেই চৌধুরী পরিবারের বাকি সদস্যরা অবাক চোখে ইফাতে’র দিকে তাকাল। ইফাত সবার প্রশ্নসূচক দৃষ্টির মানে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল। আরিফুল চৌধুরী একটু সামনে এগিয়ে এসে ইফাতে’র দিকে গম্ভীর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। “ইফাত অফিসাররা উজান’কে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছিল কেন? আর কেনই বা এত মাঝরাতে ওকে এভাবে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো?
ইফাত আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে পরিবারের সবার সামনে উজানে’র সিআইডি এজেন্ট হওয়ার সমস্ত গোপন সত্য তুলে ধরল। আরিফুল চৌধুরী কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে শুনে গেলেন। নিজের ছেলে দেশের এত বড় একজন সিআইডি অফিসার অথচ তারা ঘুণাক্ষরেও এতদিন তা জানতে পারেননি। তবে জানার পর বাবার বুকটা এক অদেখা গর্বে ভরে উঠল। ছেলে-মেয়ের এমন বিশাল উন্নতিতে যেকোনো মা-বাবাই গর্বিত হন‚ উজানে’র মা-বাবাও আজ আনন্দ ও গর্ববোধ করলেন। এরপর ইফাত আর রুমে বসে না থেকে সোজা উজানে’র পিছু পিছু থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিল‚ ভাইকে এমন বিপদের সময়ে একা যেতে দিল না সে। আর মেহের আকুল মৌ’কে সান্ত্বনা দিয়ে নিজের রুমে নিয়ে গেল।
রাত যখন প্রায় শেষ প্রহর। তখন উজান আর ইফাত অক্ষত অবস্থায় বাসায় ফিরে এলো। উজান সিঁড়ি বেয়ে সোজা ইফাতে’র রুমের দিকে গেল‚ কারণ মৌ সেখানেই ছিল। মেহেরে’র পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা মৌ’কে আলতো করে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে আবার নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল উজান। বিছানায় মৌ’কে পরম যত্নে শুইয়ে দিয়ে সে ফ্রেশ হতে চলে গেল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর শাওয়ার শেষ করে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হলো উজান। অতঃপর বিছানায় শুয়ে মৌ’কে গভীর ভালোবাসায় নিজের বুকের ভেতর টেনে জড়িয় ধরল। ঠিক তখনই মৌ’য়ের ঘুমটা হালকা ভেঙে গেল। সে চোখ মেলেই উজানে’র ঠান্ডা বুকে হাত রেখে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
”প্রফেসর সাহেব আপনি কখন এলেন? পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে আপনাকে? সবাই কি জেনে গেছে যে রোহান ভাইয়া ওই তিনজনকে মেরে ফেলেছে?
উজান নিজের দুটো ঠান্ডা হাত দিয়ে মৌ’য়ের ফর্সা গাল দুটো পরম আদরে চেপে ধরল। তারপর তার গোলাপী ঠোঁটের কোণে গভীর এক চুমু এঁকে দিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“ভয় পেয়ো না পিচ্চি‚ কিচ্ছু হয়নি। গতকাল ক্যাম্পাসে শিরিন’দের সাথে আমি একটু রুক্ষ বিহেভিয়ার করেছিলাম বলে ওদের পরিবার প্রতিশোধ নিতে আমার বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা এলিগেশন দিয়েছিল। তবে সেটা তদন্তে একদম ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ গতকাল রাতে ঘটনার সময় আমি যে তোমার সাথে বাসাতেই ছিলাম‚ তার স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ পেয়েছে। আর অন্য এক জায়গার সিসিটিভি ফুটেজে রোহান’কে সরাসরি ওই তিনজনকে মারতে দেখা গেছে। তাই পুলিশ এখন আসল অপরাধী রোহান’কেই অলরেডি হন্যে হয়ে খুঁজছে। এবার আর কোনো প্রশ্ন করো না তো জান…ভীষণ মাথা যন্ত্রণা করছে। একটু ঘুমানো প্রয়োজন। আজ ঘুমাতে দাও‚ তোমায় কালকে একটু বেশি করে ভালোবেসে পুষিয়ে দেব…কেমন?
উানের কথা শুনে মৌ চরম লজ্জা পেয়ে গেল। এত আশঙ্কাজনক মুহূর্তেও লোকটার মাথায় এসব রোমান্টিক চিন্তা কীভাবে আসে? মৌ’কে চুপ থাকতে দেখে উজান চোখ ছোট ছোট করে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলে উঠল।
“আমার বউজান মনে হয় কাল পর্যন্ত ওয়েট করতে চাইছে না। আজ এখনই আমার ভালোবাসা চাইছে…তাই তো? ওকে ফাইন। উজান চৌধুরী অলওয়েজ স্ট্রং। চলো‚ এখনই মিশন শুরু করি তাহলে?
মৌ লজ্জায় লাল হয়ে রাগে উজানে’র চওড়া বুকে দুটো আলতো কিল বসিয়ে দিল। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে নিজে আধশোয়া অবস্থায় বসে উজানে’র মাথাটা পরম মমতায় নিজের কোলে তুলে নিল। বরের চুলে আলতো করে আঙুল চালিয়ে বিলি কাটতে লাগল। উজান এক চিলতে তৃপ্তির মুচকি হেসে বউয়ের কোলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।
ঠিক দুদিন পর। ভোর হতে না হতেই উজান তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে শুরু করেছে। এত সকালে উজান’কে এমন লুকে রেডি হতে দেখে মৌ খানিকটা অবাকই হচ্ছে। তবুও বাধ্য মেয়ের মতো সে একে একে উজানে’র ঘড়ি‚ বেল্ট আর প্রয়োজনীয় সব জিনিস এগিয়ে দিতে লাগল। উজানে’র ওয়ালেটটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে মৌ প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
”প্রফেসর সাহেব‚ এত সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছেন আপনি?
“একটা জরুরি মিশন আছে পিচ্চি! —উজান দ্রুত শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল।
”তাই বলে এত ভোরে? এটলিস্ট ব্রেকফাস্টটা তো করে যাবেন।
মৌ হাতের ঘড়িটা উজানে’র কবজিতে পরিয়ে দিতে দিতে আবদার করল। উজান ঘড়ি পরা হাতেই মৌ’য়ের কোমরটা চট করে কাছে টেনে নিয়ে দুষ্টুমি সুরে বলল‚ “ভোরেই তো স্পেশাল আর মিষ্টি কিছু খেলাম জান। সো এখন আর না খেলেও দিব্যি চলে যাবে। টেনশন নিও না‚ মিশন শেষ করে বাসায় ফিরে আবারও কন্টিনিউ করব…পাক্কা প্রমিজ!
কথাটা শুনে মৌ উজানে’র দিকে কড়া রক্তিম দৃষ্টিতে তাকাল। উজান বউয়ের লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে পরম ভালোবাসায় তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। “জান‚ আসি এখন। তোমার যত রাগ-অভিমান‚ সব বাসায় ফিরে এসে সহ্য করব কেমন?
মৌ তাকে বারণ করারও সুযোগ পেল না। ততক্ষণে উজান দরজার দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল। কিন্তু আজ মৌ’য়ের মনটা কেমন যেন অচেনা এক ভারে চেপে বসছে। কেন এমন একটা অশুভ অনুভূতি হচ্ছে‚ তা সে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা বারবার অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠছে। হঠাৎই দরজার কাছে পৌঁছে উজান হুট করে মেঝের সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে চাইল। তবে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল সে। মৌ এক বুক আতঙ্ক নিয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে উজান’কে শক্ত করে ধরে ফেলল। উজান মৌ’য়ের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসল।
“রিল্যাক্স জান! কিচ্ছু হয়নি আমার‚ সামান্য হোঁচট লেগেছে মাত্র। ভয় পেয়ো না‚ আমি আসছি।
”একটু বসে যান না প্লিজ। —মৌ উজানে’র হাত ধরে আকুল হয়ে বলল।
“কেন‚ কী হলো? —উজান দুই জোড়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
”দাদি বলতেন কোনো ভালো কাজের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর মুখে হোঁচট খেলে নাকি একটু থমকে বসে গিয়ে তারপর বের হতে হয়। আপনি প্লিজ অন্তত দুটো মিনিট বসুন।
“পিচ্চি একদম টাইম নেই হাতে। অপারেশনের টিম অলরেডি ওয়েট করছে।
”জাস্ট দু মিনিট বসতেও আপনার এত প্রবলেম হবে?
মৌ কেঁদে ফেলার উপক্রম হলো। উজান মৌ’য়ের থরথর করে কাঁপা চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরম মায়ায় বলল।
“আমার মিষ্টি বউটা…প্লিজ মন খারাপ করো না তো। সত্যি এক সেকেন্ডও টাইম নেই হাতে। তাছাড়া আমার এই পিচ্চি বউটার দোয়া আর ভালোবাসা সাথে থাকতে আমার কিচ্ছু হতে পারে না। আসি আমি‚ একদম সাবধানে থাকবে কিন্তু! খবরদার‚ বাসা থেকে এক পা-ও বের হবে না। যা যা লাগবে ইফাত এনে দেবে। আর সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করে নিও।
কথা গুলো বলেই এক প্রকার হন্তদন্ত হয়ে দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল উজান। সে চলে যেতেই মৌ দরজা ধরে এক দীর্ঘ ও তপ্ত শ্বাস ফেলল। মনটা কেন জানি ক্রমাগত ধুকপুক ধুকপুক করেই চলেছে। কিছুতেই শান্ত হতে চাইছে না তার ব্যাকুল হৃদয়।
উজান চলে যাওয়ার পর থেকেই মৌ ছাদের এক কোণে মনমরা হয়ে বসেছিল। অজানা এক আশঙ্কায় বুকটা ক্রমাগত তোলপাড় করছিল। ভেতরটা ভীষণ অস্থির লাগছিল তার। এভাবেই দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল কিন্তু মনের বিষাদ এতটুকুও কমল না। অবশেষে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে মৌ ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে নেমে আসতে লাগল। ড্রয়িং রুমে তখন চৌধুরী বাড়ির প্রায় সদস্য উপস্থিত। টিভিতে কড়া নিউজ চলছে‚ আর সবাই থমথমে মুখে সোফায় বসে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। মৌ সিঁড়ির মাঝপথে আসতেই হঠাৎ টিভিতে একটা ব্রেকিং নিউজের বাজখাঁই আওয়াজ শুনে তার পা দুটো সেখানেই যেন পাথরের মতো জমে গেল। টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে হাসিমুখের উজান চৌধুরীর এক বিশাল ছবি। আর নিচে লাল অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে খবরের হেডলাইন। খবরের সংবাদ পাঠিকা গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন‚
অতঃপর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছে সিক্রেট সিআইডি এজেন্টের সুপ্রিম লিডার উজান চৌধুরী…!!
কথাটা এক প্রলয়ংকরী বাজপাটের মতো এসে আছড়ে পড়ল মৌ’য়ের কানে। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের সব আলো যেন নিভে গেল তার চোখের সামনে। ড্রয়িং রুমে বসে থাকা আরিফুল চৌধুরীসহ পরিবারের সবাই এক লহমায় আর্তনাদ করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মৌ সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে থাকা আর ধরে রাখতে পারল না। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠতেই খামচে ধরা সিঁড়ির রেলিং থেকে তার হাত ফসকে গেল। ধপাস করে গড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে পড়ে গেল মৌ। পড়ে যাওয়ার সেই তীব্র শারীরিক যন্ত্রণাকে তোয়াক্কা না করে বুকচেরা আর্তনাদ আর কান্না ফেটে বের হলো মৌ’য়ের গলা দিয়ে।
”মামনি আমার প্রফেসর সাহেব আর নেই। আমি কিভাবে বাঁচবো তাকে ছাড়া…!!
মৌ’য়ের সেই আত্ম চিৎকারের শব্দ শুনে কিচেন রুম থেকে ছুটে এলেন শাশুড়ি মৌসুমি চৌধুরী আর মেহের। মৌ’কে সিঁড়ির নিচে পড়ে থাকতে দেখে মেহের পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই টিভিতে আবারও নিউজের সেই একই বীভৎস বাক্যটি রিপিট করা হলো। সংবাদটির সত্যতা নিশ্চিত হতেই মৌসুমি চৌধুরী দুই হাতে বুক চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৬
নিজের ছেলের মৃত্যুর খবর এভাবে নিউজের পর্দায় দেখতে হবে‚ তা যে কোনো মায়ের কল্পনারও অতীত ছিল। মৌ নিজের পুরো শরীর ছেড়ে দিয়ে মেহের’কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল।
”মেহু আমার প্রফেসর সাহেব সত্যিই আর নেই। সত্যি সত্যি আমাদের সবাইকে একা করে চলে গেল সে? মামণি দেখো‚ তোমার ছেলে আজ সত্যিই আমাকে এই বিশাল পৃথিবীতে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল।
