Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৪

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৪

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৪
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

পুরো রাত আমার ঠিকমতো ঘুম না হলেও রাহাত ঠিকই আমাকে বুকে নিয়ে আরামে ঘুমিয়েছে। খুব ভোরবেলায় আমি উঠে বসে আছি। চাচ্চু যে আজ আসবে হোস্টেলে, অথচ আমি বসে আছি কক্সবাজারে। না জানি আমাকে না পেয়ে কী তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে ওখানে আজ। রাহাতের কি এটা নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই? অদ্ভুত তো ভীষণ মানুষটা! অস্থিরতায় আর টিকতে না পেরে আমি ওনাকে ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে ওঠালাম। উনি একবার চোখ খুলে, ফের আবারও আমাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলতে লাগলাম,

“ছাড়ুন আর উঠুন জলদি!”
তিনি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কয়টা বাজে?”
“জানিনা। কিন্তু আপনি উঠুন প্লিজ! আমার কথা আছে আপনার সাথে।”
“বলো আমি শুনছি।”
“এভাবে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আপনি আমার কথা শুনবেন?”
তিনি এবার আমার কপালে চুমু খেয়ে উঠে বসলেন। আমাকেও সামনে বসিয়ে বললেন,
“বলো এবার।”
আমি ভীষণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি এত রিল্যাক্স আছেন কীভাবে?”
তিনি ভ্রু কুঁচকে আরো বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“আমার কি নার্ভাস হওয়ার কথা ছিল?”
“চাচ্চু যে গতকাল রাতে কল করেছিল, আপনি কি ভুলে গেছেন?”
“না তো! কেন?”

আমার এবার ভীষণ বিরক্ত লাগছিল। এত কেন উদসীন তিনি? আমি কণ্ঠে বিরক্তি রেখেই বললাম,
“কেন মানে কী আবার? আপনি কি বুঝতে পারছেন না চাচ্চু হোস্টেলে গিয়ে আমাকে না পেলে কী কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে?”
তিনি এবার আমার হাত ধরে টেনে তার কোলে বসিয়ে, জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাচ্চা বউ নিয়ে ঝামেলার শেষ নেই। অল্প কিছু হলেই টেনশনে শেষ হয়ে যাও! আমি থাকতে তুমি এত টেনশন করছ কেন?”
“টেনশন করব না?”
“না, করবে না। আমার মাথায় প্ল্যান আছে।”
“কী প্ল্যান?”

“ছেলেদের তো হোস্টেলের ভেতরে ঢোকা নিষেধ। আব্বু এলে নিচে দাঁড়িয়েই তোমাকে কল করবে। তুমি তখন কল রিসিভ করে বলবে, তোমার মাথাব্যথা করছে সকাল থেকে। তুমি এখন এই অবস্থায় নিচে নামতে পারবে না। খাবারগুলো যেন দারোয়ানের কাছে রেখে যায়। তিনি ওপরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। আর যদি বলে যে, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে তোমাকে তাহলে বলবে রুমমেটের থেকে মেডিসিন নিয়ে খেয়েছ। দুপুরের মধ্যে না কমলে পরে ডাক্তারের কাছে যাবে।”
আমি বেশকিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার দিকে তাকালাম। তিনি বললেন,
“যা বলেছি বুঝেছ সব?”
“হু, কিন্তু প্ল্যান কি সাকসেসফুল হবে?”
“অবশ্যই হবে। শুধু তুমি ঘাবড়ে যেও না। আর আমি তো আছিই।”
“ঠিক আছে। আমরা ঢাকায় কবে ব্যাক করব?”
“এত তাড়া কীসের? আমার সঙ্গে কি থাকতে ভালো লাগছে না?”
“এমন কিছু না। আমার উলটো খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে, আমরা আবার আলাদা হয়ে যাব।”
“আলাদা হয়ে যাব বলছ কেন? দেখা হবে, কথা হবে আর…”

“আর?”
“আদর হবে।”
আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেলে সে হাসতে হাসতে বলল,
“এত সকালে যে ঘুম থেকে তুললে এখন যে আমার ক্ষুধা লেগেছে?”
“চলুন ফ্রেশ হই। সকালের ব্রেকফাস্টের সময়ও তো প্রায় হয়েই এসেছে। দেখি তো কয়টা বাজে।”
আমি হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোন নিতে গেলে তিনি আমাকে আটকে বললেন,
“এত সকাল সকাল বউ থাকতে আবার অন্য নাস্তা কী খাব? রাখো!”

সকালের নাস্তা করে আমার হোটেলের ভেতরেই হাঁটছিলাম। বাইরে বসার সুন্দর জায়গা আছে। পাশেই ছোট্ট একটা ক্যাফ আছে। কফি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম পেস্ট্রিও পাওয়া যায়। আমরা পাশাপাশি ছাতার নিচে বসলাম দুজনে। তখন প্রায় সকাল দশটা বাজে। ভালোই রোদ উঠেছে আজ। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু খাবে?”
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“উহু! মাত্রই তো নাস্তা করলাম।”
তিনি আমার হাত ধরলেন। চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তাতে কী? আবার খাবে। তোমার তো রেড ভেলভেট পেস্ট্রি খুব পছন্দ।”
আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি। তিনি আমার ব্যাপারে এতকিছু জানেন কী করে? অথচ আগে আমি তার চোখে আমার জন্য কখনো বিরক্তি, বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই দেখতাম না! বিস্ময় লুকিয়ে না রেখেই আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“আপনি কী করে জানলেন?”
তিনি এবার নড়েচড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। মুখে কিছুই বলছেন না। অথচ এদিকে উত্তরের অপেক্ষায় আমার ভেতরটা আঁকুপাঁকু করছিল। আমি তার হাত চেপে ধরে বললাম,
“হাসবেন না। উত্তর দিন।”
হালকা বাতাস হচ্ছিল তখন। মৃদু বাতাসে আমার কিছু চুল উড়ে কপালের ওপর পড়ছিল। তিনি সোজা হয়ে বসে চুলগুলোকে কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বললেন,
“তোমার বিষয়ে আমি অনেক কিছুই জানি। তোমার পছন্দ-অপছন্দ, শখ-স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ সমস্ত কিছু।”
“অথচ আমি ভাবতাম, আপনি আমাকে আগে কখনো লক্ষই করতেন না।”
তিনি হাসলেন। তার চোখে গ্লানি। তবে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ধরে রেখেই বললেন,
“তুমি আমাকে তোমার থেকে যতটা দূরে দেখতে, আমি ঠিক তোমার ততটাই নিকটে থাকতাম ছায়া হয়ে। দূরে থাকলেও তুমি আমার ছায়াতেই থাকতে সর্বদা।”

আমার কিছু বলার ভাষা নেই। আমি কেবল নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আমার অদ্ভুত রহস্যময় পাগল স্বামীটার দিকে। এতটা সুখী আর ভাগ্যবতী নিজেকে মনে হচ্ছে যে তা আমি মুখে বলে কিংবা লিখেও হয়তো শেষ করতে পারব না। আমার সেই মায়াভরা সম্মোহন কাটার পূর্বেই চাচ্চুর কল এলো। স্ক্রিনে নাম দেখে রাহাত আমাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“নার্ভাস হবে না একদম। যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছি, ঐভাবেই কথা বলো।”
আমি যে কখনো মিথ্যা কথা বলি না কিংবা বলিনি এ কথা বলব না। তবে আমার জীবনে আমি খুব কমই মিথ্যা বলেছি। আমার সেই মিথ্যায় কাউকে কখনো কষ্ট পেতে হয়নি কিংবা কারো কোনো ক্ষতিও হয়নি। খুবই ছোটোখাটো মিথ্যা সব। তবে আজ অনর্গল এতগুলো মিথ্যা কথা ও মিথ্যা অভিনয় কীভাবে করব সেটা ভেবেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। রাহাত হয়তো সেটা বুঝতে পেরেই খুব সন্তর্পণে আমার হাতটা ধরে ওর কোলের ওপর রাখল। চেয়ারটা আরেকটু কাছে এনে আমার শরীর ঘেঁষে বসে ফিসফিস করে বলল,
“লাউড স্পিকারে দাও।”

আমি কল লাউড স্পিকারে দিলাম। এরপর তার বলা কথাগুলোই তার মতো করে বললাম। যদিও কয়েকবারই আমি থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম, তবে চাচ্চু হয়তো সেটা বুঝতে পারেনি। তিনি আমার অসুস্থতা নিয়েই বেশি কনসার্ন ছিল দেখতে পেলাম। চাচ্চুর সাথে কথা বলা শেষ করেই আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম! বড়ো বড়ো শ্বাস নিয়ে বললাম,
“আরেকটু হলেই মনে হয় ধরা পড়ে যেতাম।”
“আরে না! তুমি খুব ভালো অভিনয় করেছ।”
আমি চোখ-মুখ কুঁচকে বললাম,
“আচ্ছা! তাই?”
পরক্ষণেই আঁতকে উঠে বললাম,
“অ্যাই দারোয়ান যদি চাচ্চুকে বলে দেয় যে আমি হোস্টেলে নেই?”
“বিয়ে করে তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি কি সব চলে গেছে বউ? এত বড়ো হোস্টেলে কে আছে, আর কে নেই সেসব কি দারোয়ান মনে রেখে বসে থাকবে তোমার মনে হচ্ছে? তাছাড়া তুমি উঠেছ নতুন। তোমার চেহারাটাও হয়তো মনে নেই তার। আর হ্যাঁ, তোমার রুমমেটকে মেসেজ করে বলো সে যেন খাবারগুলো নিয়ে ফ্রিজে রেখে দেয়।”

বোকার মতো প্রশ্ন যে করেছি এটা বুঝতে পেরে কী রিয়াকশন দেবো বুঝতে না পেরে অযথাই গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম। এরপর বেচারা নিজেই রাগ ভাঙানোর জন্য হাজারবার সরি বলতে বলতে মুখ ব্যথা করে ফেলেছে। ওপরে ওপরে রাগ দেখালেও মনে মনে ভীষণ স্বস্তি পাচ্ছিলাম এবং হাসছিলাম আমি।
আমাদের কক্সবাজারে শেষ সুন্দর সময়টা কাটল বাইক রাইডে ও রাতে কয়লা রেস্তোরাঁয় ফিশ বার্বিকিউ খেয়ে। স্বপ্নের মতো সুন্দর দিনগুলো যেন খুব দ্রুতই কেটে গেল। রাতে আমার এত বেশি মন খারাপ লাগছিল যে, কান্না পাচ্ছিল রীতিমতো। রাহাত এটা বুঝতে পেরে অনেকক্ষণ শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল আমায়। মুখে যে আদর করে কতগুলো চুমু খেয়েছে সেসবের হিসাবও নেই আমার কাছে। সুন্দর রাতটাও কেটে গেল সুন্দর কিছু মোমেন্ট তৈরি করে। পরেরদিন সকালের ফ্লাইটেই আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। আমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে তিনি বাড়িতে চলে গেলেন। আমার বুকটা তখন থেকেই খাঁ খাঁ করতে লাগল। মনে হচ্ছে কী যেন নেই, কী যেন নেই! বুকে ভীষণ ব্যথা করছিল। অথচ মাত্র দু মিনিটও বোধ হয় হয়নি তিনি আমাকে এখানে রেখে গেছেন। এটুকু সময়েই তাকে ছাড়া আমার ম’রে যাওয়ার মতো কষ্ট হচ্ছে। বাকি সময়, দিনগুলো আমি কাটাব কীভাবে?
সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই আমি তাকে টেক্সট করলাম,

“মিস ইউ!”
আমার যে তার প্রতি এত ভালোবাসা জন্মে যাবে আদৌ কি ভেবেছিলাম কখনো?
সত্যি বলতে রাহাত আমার জীবনে এলো হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো, বর্ষায় ফোটা প্রথম কদম ফুলের মতো, এমনভাবে এলো যে তাকে ছাড়া আমি এখন যেন ভীষণ এলোমেলো। ইচ্ছে করে সারাক্ষণ তাকে সামনে বসিয়ে দেখি। তার কথা শুনি। কিন্তু এসব নিতান্তই বাচ্চামো সব ইচ্ছে। আমি না বলা সত্ত্বেও রাহাত এসব বোঝে। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে রাতে ভিডিয়োকল করে। সবসময় যে আমরা সারাক্ষণ কথা বলি বিষয়টা ঠিক এমনও নয়। সে প্রায়ই আমাকে কলে রেখে অফিসের কাজ করে আর আমি আমার মতো পড়াশোনা করি। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আবার কখনো তাকে আড়চোখে দেখি। কখনো আবার লাজলজ্জা সব সাইডে রেখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকি। সে জিজ্ঞেস করে,

“এত কী দেখো?”
আমিও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বলি,
“আপনাকে! এত দেখি তাও কেন মন ভরে না বলুন তো?”
তিনি আমার কথা শুনে হাসেন। সেই হাসি দেখে আমিও বারবার হোঁচট খেয়ে আবার তার প্রেমে পড়ি। একটা মানুষের প্রেমে ঠিক কতবার পড়া যায়? এর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। জানতেও চাই না। আমি শুধু চাই এই মানুষটার সাথে, তার বুকে সারাজীবন থাকতে। এই এক জীবনে আমার আর সত্যিই চাওয়ার কিছু নেই। অতি আবেগে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, বুকে ব্যথা হয়, কণ্ঠ ধরে আসে। আমি কি খুব বেশিই আবেগি? নাকি তাকে ভালোবেসে এমন হয়েছি? এমন তো আমি ছিলাম না। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে বুঝি এভাবেও কাউকে ভালোবাসা যায়? যায়, অবশ্যই যায়। এই যেমন আমি ভালোবাসি তাকে।
আমি পলকহীন তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে থেকে বললাম,

“একটা কথা বলব?”
তিনি অফিসের মেইল চেক করছিলেন ল্যাপটপে। দৃষ্টি না সরিয়েই বললেন,
“বলো জান।”
“আপনাকে না ভীষণ জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে! বুকটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে হঠাৎ।”
তিনি এবার বিস্ময় নিয়ে, দুষ্টু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“উমম? কী?”
এত লজ্জা পেলাম যে আমি আর কিছু বলতেই পারলাম না। এদিকে তার এমন রিয়াকশন, এদিকে হঠাৎ করে রুমমেটের দিকে চোখ পড়তেই দেখি মেয়েটা ঠোঁট চেপে মিটমিট করে হাসছে। এবার যেন লজ্জার পারদ তরতর করে বাড়তে লাগল। কোথাও লুকাতে পারলে ভালো লাগত। এদিকে রাতে খাওয়ারও সময় হয়ে গেছে। রুমমেট খেতে যাওয়ার আগে বলল,

“খেতে আসো।”
ওর ঠোঁটে তখনো হাসি ছিল। রাহাত সময় দেখে বলল,
“খাওয়ার সময় হয়ে গেছে না? যাও খেয়ে এসো। খেয়ে এসে কল দাও।”
“ঠিক আছে। আপনি খাবেন না?”
“হ্যাঁ, মেইলগুলো চেক করেই খাব।”
“আচ্ছা, আমি তাহলে খেয়ে আসি।”
“ওকে জান। ভালোবাসি।”
আমি হেসে বললাম,
“আমিও ভালোবাসি।”
আমাদের খাওয়ার জন্য বিশাল একটা ডাইনিং আছে। সকালে, দুপুরে এবং রাতে ওখানেই সবাই সবার মতো খাওয়া-দাওয়া করে। সকালে আর দুপুরে সবাই সবার সময়মতো খেতে গেলেও রাতের খাবারটা রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই খেতে হয় সবাইকে। এরপর আর সুযোগ নেই। বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায় ভাত আমরা এখানের খেলেও তরকারি খাই বাড়ি থেকে এনে। আমি তো বেশিরভাগ সময়ে চাচিমনির রান্না করা তরকারিই খাই।
দরজা দিয়ে ডাইনিং-এ ঢুকতেই আমার রুমমেট অদিতি হাত উঁচু করে আমাকে ডাকল। আমি প্লেটে খাবার নিয়ে ওর পাশে গিয়ে বসলাম। এখন ও খুব স্বাভাবিক আছে। তাই আমারও আর অস্বস্তি লাগছিল না। আমি ভাত মাখছিলাম, অদিতি তখন পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,

“ভাইয়াকে খুব ভালোবাসো?”
আমি হকচকিয়ে গেলাম। বললাম,
“মানে?”
“আরে প্রেম যে করো তা তো আর আমার এখন অজানা নয়। সবই বুঝি। খুব তো প্রেম তোমাদের!”
আমি কথা এড়িয়ে যেতে মৃদু হাসলাম। অদিতি নিজে থেকেই বলল,
“অনেক বেশি ভালোবাসা অনেক সময় নিজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সো বি কেয়ারফুল।”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
“কপালে সুখ থাকলে সুখ হবে, আর দুঃখ থাকলে দুঃখ। অত ভেবেচিন্তে কি আর প্রেম হয়? আর না হয় ভালোবাসা! মেপে মেপে কিংবা বাউন্ডারি তৈরি করে কখনো ভালোবাসা যায় না। ভালোবাসতে হলে সবসময় উজাড় করেই ভালোবাসতে হয়।”
অদিতি আমার কথার জবাবে কিছু বলল না। শুধু একটা সুন্দর হাসি উপহার দিল। দুজনে একসাথে খাওয়া শেষ করে রুমে গেলাম। টেবিলের ওপর থেকে ফোন হাতে নিয়ে দেখি রাহাতের টেক্সট,

“খাওয়া শেষ হলে কল দিও।”
আমি বিছানায় বসে ভিডিয়ো কল দিলাম। তিনি রিসিভ করেই আমার হৃদয় ঘায়েল করা হাসিটা দিয়ে বলল,
“খাওয়া শেষ?”
“হুম, আপনি খেয়েছেন?”
তিনি এতক্ষণ ফোনটা একদম মুখের কাছে এনে রেখেছিলেন। এবার একটু দূরে সরিয়ে বললেন,
“নিচে নামো।”
বিস্ময়ে চক্ষু চড়কগাছ আমার। লাফিয়ে উঠে বললাম,
“কেন? কোথায় আপনি?”
তিনি এবার ব্যাক ক্যামেরায় আমাদের হোস্টেল দেখালেন, দারোয়ানকে দেখালেন। আমি আর কিছু বলার অপেক্ষায় ছিলাম না। দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নিচে নেমে এলাম। তিনি গ্যারেজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি কাছে গিয়ে বললাম,
“এই অসময়ে আপনি এখানে?”
তিনি তৎক্ষনাৎ কোনো জবাব না দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি স্থির হয়ে গেলাম। ভুলে গেলাম প্রশ্ন, দুনিয়া সমস্ত কিছু। শুধু মনে গেঁথে রইল একটাই নাম ‘রাহাত’। অনুভব করতে লাগলাম হৃদয় শীতল করা অনুভূতি। হঠাৎ করে দারোয়ানের কথা মাথায় আসতেই আমি ভয় পেয়ে বললাম,

“দারোয়ান দেখবে!”
“আরে দেখুক! তার পকেটে টাকা দিয়েছি। ডোন্ট ওয়্যারি।”
“কিন্তু আপনি…”
“আমি কী? আমি এসেছি আমার বউয়ের ইচ্ছে পূরণ করতে। তার ফাঁকা বুকটা পূর্ণ করতে। এবার শান্তি লাগছে না?”
আমার চোখ আবারও ভরে এলো সুখের অশ্রুতে। তিনি শার্টের পকেট থেকে একটা বেলিফুলের মালা বের করে আমার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার প্রিয়র জন্য প্রিয় ফুল।”
আমি ঝাপসা চোখে মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আপনাকে ভালোবেসে আমি বুঝি এবার ছিঁচকাদুনেও হয়ে গেলাম।”
“হও না! মন্দ কী তাতে? আমি তো আছি তোমার চোখের পানি আদর করে শুষে নেওয়ার জন্য।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৩

এই বলে তিনি সত্যি সত্যি আমার গালে লেপ্টে থাকা চোখের পানিগুলো শুষে নিলেন, চুমু দিলেন দুই চোখের ভেজা পাতায় পরম আদর মিশিয়ে। ছোট্ট বিড়ালছানাকে যেভাবে আগলে রাখা হয়, আমাকেও সেভাবে আগলে নিলেন তার প্রশ্বস্ত বুকে। মরুভূমির মতো ধু ধু করা আমার বুকটা যেন এবার সত্যি সত্যিই বর্ষার মতোন ভরা বাদলায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল তাকে কাছে পেয়ে।

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১৫