Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৫৪

এই অবেলায় পর্ব ৫৪

এই অবেলায় পর্ব ৫৪
সুমনা সাথী

ঊর্মির যখন ঘুম ভাঙল, ততক্ষণে ভোরের আলো ফিকে হয়ে বেলা বেশ গড়িয়েছে। বিছানায় ঝটপট উঠে বসে চারপাশে এক নজর বোলাতেই তার চোখ আটকে গেল ঘরের এক কোণে সোফায় ঘুমিয়ে থাকা কায়েফের ওপর। দৃশ্যটা দেখেই ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি আর অস্থিরতা মোচড় দিয়ে উঠল ঊর্মির। ছেলেটা সারারাত এমন বিশ্রীভাবে সোফায় শুয়ে কাটাল! ইশ, সে নিজে কেন ওভাবে অসাড়ের মতো ঘুমাতে গেল? আর কিছুক্ষণ জেগে থাকলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত! নিজের প্রতি সামান্য বিরক্ত হয়েই ঊর্মি বিছানাটা গুছিয়ে নিতে লাগল। ঠিক তখনই দরজায় করাঘাতের শব্দ। দরজার শব্দতেই কায়েফের ঘুম ভেঙে গেল। হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে ভাঙা কণ্ঠে শুধাল,

“কে?”
ওপাশ থেকে মৌনিতার গলা ভেসে এলো, “ভাইয়া, আমি। তোমরা কি উঠে পড়েছ?”
ঊর্মিকে ঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কায়েফ নিজে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। মৌনিতা দরজার মুখে দাঁড়িয়েই গম্ভীর মুখে বলল,
“বড় চাচা তোমাদের নিচে ডাকছেন।”
কথাটা শুনেই কায়েফের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে খুব ভালো করেই আঁচ করতে পারছে, নিচে বড়সড় কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে। কাল রাতেই তো মা মাজহা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। সে যেন ঊর্মিকে অবিলম্বে ডিভোর্স দিয়ে দেয়! প্রয়োজনে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ভালো পাত্র দেখে মেয়েটার আবার ব্যবস্থা করে দেবেন। কায়েফ নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না এই মুহূর্তে তার ঠিক কী করা উচিত। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে অসুস্থ, বৃদ্ধ দাদুর আকুল মুখখানা৷ আসার আগে কায়েফের দুটো হাত ধরে বারবার অনুরোধ করেছিলেন। সে যেন কোনো পরিস্থিতিতেই ঊর্মির হাত ছেড়ে না দেয়। তাকে দেখে রাখে। কায়েফ নিজেকে সামলে নিয়ে ঊর্মির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। নিচে যেতে হবে।”
ঊর্মি মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর দুজন নিচে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হতেই দেখল পরিবারের কমবেশি সবাই সেখানে উপস্থিত। পাশাপাশি বসে আছেন আরশাদ তালুকদার ও আফতাব তালুকদার। তাঁদের ঠিক পাশেই থমথমে মুখে বসে আছেন মাজহা। কায়েফকে ঘরে ঢুকতে দেখে আরশাদ তালুকদার সামনের সোফাটা দেখিয়ে বললেন,
“বস কায়েফ।”
কায়েফ গিয়ে বসল। ঊর্মির ঢিপঢিপ করা বুক নিয়ে, একটু দূরে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আবহাওয়ার ভারিক্কি কাটিয়ে আরশাদ তালুকদার শান্ত গলায় বললেন,

“দেখো কায়েফ, তোমাদের বিয়েটা তো কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়নি। ওই ঘটনার পেছনে কার কী ভুল বা চক্রান্ত ছিল, আমরা তা জানি না। কারণ নিজ চোখে তো আর দেখিনি। তোমাকে আমরা ছেলেবেলা থেকে চিনি। তোমার ওপর আমাদের অগাধ বিশ্বাস। আমার মন বলে, তুমি কোনো অন্যায় করতেই পারো না। কিন্তু তোমার মা বলছিলেন, তোমরা যেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক থেকে বের হয়ে ডিভোর্সটা নিয়ে নাও। এতে তোমার ঘাড়ে কোনো অযাচিত বোঝা চাপুক, তা আমরা কেউ চাই না। ঊর্মির বাকি জীবনের সমস্ত দায়ভার না হয় আমরা নেব। জীবনে এর আগেও অনেক ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিয়েছি বাবা। তার পরিণতি তো আজ আমরা নিজের চোখেই দেখছি।”

আরশাদ তালুকদার যে পরোক্ষ খোঁচাটা কলরবকে মারলেন, তা সে খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারল। তবে তা গায়ে মাখল না। মুখ গম্ভীর করে নিস্পৃহভাবে বসে রইল। ঊর্মির দুটো চোখ নোনা জলে টলমল করে উঠল। তার জীবনটা এমন ভাগ্যাহত কেন? কখনোই কি তার একটা স্থায়ী ঠাঁই বা আপন ঠিকানা হবে না? তবে পরক্ষণেই নিজের মনকে নিজে ধিক্কার দিল সে। সে কি একটু বেশিই আশা করে ফেলছে না? এই ছেলেটা কোনো দায় ছাড়া তার সাথে কেন থাকবে? মনে মনে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল ঊর্মি। অনেক সহ্য করেছে সে। আর না! এবার সময় এসেছে সব বাঁধন আর অপমান থেকে নিজেকে মুক্ত করার। সে নিঃশব্দে, ধীর পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। কায়েফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সবার দিকে তাকাল। শান্ত গলায় বলল,
“আমি এই বিয়েটা ভাঙতে চাই না। আই অ্যাম স্যরি।”
কথাটা শোনামাত্র কলরব সহ ঘরে উপস্থিত প্রতিটা মানুষ বিস্ময়ে কায়েফের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। মাজহা মুহূর্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ধমকে উঠলেন,

“কায়েফ! তোর কি মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে? কাল রাতে আমি তোকে কী বুঝিয়ে বললাম? আর তুই এখন এখানে দাঁড়িয়ে সবার সামনে কী বলছিস, হ্যাঁ?!”
কলরবও খানিকটা বিস্ময় চেপে বলল, “সেটাই তো কথা, কায়েফ! যা বলবি অন্তত ভেবেচিন্তে বল।”
কায়েফ ধীরসুস্থে মাথা নেড়ে জবাব দিল, “আমি ভেবেচিন্তেই বলছি। তোমরা সবাই কেবল আমার ভবিষ্যৎ আর সম্মানের কথা ভাবছ কিন্তু একবারও কি ওই মেয়েটার কথা ভেবেছ? আজ যদি আমিও ওকে এভাবে পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ছেড়ে দিই, তবে ওর বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে? সমাজ ওকে বাঁচতে দেবে? এই পুরো নাটকে তো ওর বিন্দুমাত্র কোনো দোষ ছিল না! ছোটবেলা থেকে মেয়েটা অনবরত অবহেলা আর আঘাত সহ্য করে এসেছে। সত্যি বলতে, আমি হয়তো স্বাভাবিক অবস্থায় কখনোই বিয়ে করতাম না। কিন্তু যখন বিয়েটা হয়েই গেছে, তা যেভাবেই হোক না কেন। আমি আর তা ভাঙতে চাই না। হয়তো এটাই আল্লাহর ইচ্ছা ছিল।”

মাজহা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, “কায়েফ! তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস! তুই যদি ওই মেয়েকে মেনে নিস, আমি কিন্তু এই বাড়ি ছেড়ে চিরতরে চলে যাব! এই আমি তোকে শেষবারের মতো বলে দিলাম!”
কায়েফ চোখ দুটো বুজে শান্ত স্বরে বলল, “আম্মু, আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি। কিন্তু তুমি যদি সত্যিই চাও তোমার ছেলে সংসার করুক, তবে আমি ওই মেয়েটার সাথেই সংসার করব। নয়তো সারা জীবনে আমি আর কখনোই কোনো মেয়েকে বিয়ে করব না। আমি আজ পর্যন্ত কখনো তোমার কথার অবাধ্য হইনি। আজও হব না। তুমি হুকুম করলে আমি এখনই ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। কিন্তু তারপর আমি আর নতুন করে কোনো সম্পর্ক জড়াব না। এটাই আমার শেষ কথা।”

ছেলের সিদ্ধান্তে স্তব্ধ হয়ে গেলেন মাজহা। মুখের ভাষা হারিয়ে যেন একপলকে পাথর বনে গেলেন তিনি। কথাটা বলেই কায়েফ এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে ওখান থেকে বেরিয়ে গেল। কলরব পেছন থেকে দু-তিনবার ডাকলেও সে তা কানে তুলল না। আরশাদ তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন,
“কী করব এদের নিয়ে বলো তো? কায়েফ যখন নিজ দায়িত্বে সব মেনে নিতে রাজি, তখন আমার মনে হয় না আমাদের আর এ নিয়ে কোনো জলঘোলা করা উচিত।”
তারপর হুট করে তিনি কলরবের দিকে ফিরে চাইলেন। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে শুধালেন,
“তা কলরব, তোমার সমস্যাটা ঠিক কী, বলতে পারো? সকালে আনতাসা ফোন করেছিলেন। তুমি নাকি এখনো নিযানার দেওয়া ডিভোর্স পেপারে সই করছ না?”
কলরব মুখে চালান করা চা-টুকু গলার নিচে নামাতে গিয়ে বেশ কষ্ট পেল। কয়েক মুহূর্তের অসাড় নীরবতা বজায় রেখে নিচু স্বরে বলল,

“আমি ডিভোর্স দিতে চাই না।”
কথাটা শোনামাত্র আরশাদ তালুকদার চরম বিস্ময়ে ছেলের দিকে চেয়ে রইলেন। পাশেই থাকা কাব্য হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“আরেকবার বল তো ভাই! আমি মনে হয় ভুল শুনলাম!”
কলরব রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কি কোনো ফালতু কৌতুক বলছি যে তোর এত হাসি পাচ্ছে?”
কাব্য হাসি না থামিয়েই বলল, “আমার কাছে তো মজার কথাই মনে হলো!”
আরশাদ তালুকদার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “সবসময় সব কিছু তোমার একার ইচ্ছেমতো চলবে না, কলরব! তুমি না চাইলেই বা কী আসে যায়? নিযানা তো ঠিকই ডিভোর্স চাইছে। আর আইনত ও পারিবারিকভাবে তুমি তা মেনে নিতে বাধ্য! আজকের মধ্যেই পেপারে সই করে ওদের ওখানে পাঠিয়ে দাও।”
কলরব তড়িঘড়ি করে বলল, “নিযানাও ডিভোর্স চায় না! আমরা দুজনাই কেউ কাউকে ছাড়তে চাই না! তোমাদের সবার সমস্যাটা ঠিক কোথায়? আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না!”

আরশাদ তালুকদার তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “তোমার ফাঁকা কথায় আমি কেন বিশ্বাস করতে যাব? নিযানা যদি সত্যিই ডিভোর্স না চাইত, তবে সে এতদিন পার হয়ে যাওয়ার পরও এই বাড়িতে ফিরে আসছে না কেন?”
বাবার প্রশ্নে কলরব একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল,
“হ-হয়তো ওর সামনে পরীক্ষা, তাই হয়তো এখন আসতে পারছে না। আমি এখন আসছি। আমার অফিসে জরুরি মিটিং আছে!”
কথাটা শেষ করারও সুযোগ না দিয়ে কলরব তাড়াহুড়ো করে প্রায় একপ্রকার পালিয়েই সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। আরশাদ তালুকদার পুরো বোকা বনে গিয়ে ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হুট করে কিছু বলার সুযোগটুকু পর্যন্ত পেলেন না তিনি। এমনকি কাব্যও তাজ্জব হয়ে গেল!

ঘুম থেকে উঠে বিছানায় পাশ ফিরতেই দিয়া কিংবা দিব্য কাউকেই পাশে পেল না নবনী। অলস্য ভেঙে উঠে বিছানাটা সুন্দর করে গোছাতে শুরু করতেই ঘরে ঢুকলো দিব্য। নবনী বিছানার চাদর টান টান করতে করতেই শুধাল,
“দিয়া কোথায়?”
দিব্য আলমারির দিকে এগোতে এগোতে সহজ গলায় বলল,
“ও তো ইহান আর ইভানের সাথে খেলছে।”
“স্কুলে যাবে না আজ?”
“আজ ওদের স্কুল ছুটি।”
“ওহ।”
নবনীর কণ্ঠে উদাসীনতা। মুখটাও কেমন মলিন। দিব্য মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কাল সত্যি তোমার কী হয়েছিল বলো তো, নবনী? আমি সারারাত অনেক ভেবেও তোমার হুট করে রেগে যাওয়ার কোনো কূলকিনারা পেলাম না।”

নবনী একরাশ অভিমান ঢেলে বলল, “আপনি পাবেনও না!”
কথাটা বলেই মুখ ভার করে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলেই দিব্য চট করে তার হাতটা চেপে ধরল। ধমকের সুরেই বলল,
“বলো না, আজ কিন্তু না বললে একদম যেতে দেব না!”
নবনী ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “আপনি জেদ করছেন আমার সাথে?”
“হ্যাঁ, করছি।”
নবনী মুখ নিচু করে বিড়বিড় করল, “কাল আমি স্টেশনে নামার পর ফুচকার ভ্যানটা দেখেছিলাম…।”
দিব্য যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর এক গাল হেসে বলল,
“তোমার খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল?”
নবনী কটমট করে চেয়ে বলল, “সেটা এখন এতক্ষণে মহাশয়ের মাথায় ঢুকলো, তাই তো?”
“শিট! আমি সত্যিই কালকের তাড়াহুড়োয় খেয়াল করিনি। রিয়েলি স্যরি ম্যাডাম!”
নবনী অভিমানী মুখে অন্যদিকে নজর ফেরাল। দিব্য তার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। আদুরে মুখটার পানে চেয়ে মৃদু হেঁসে বলল,

“ঠিক আছে, আজ বিকেলে আমরা ঘুরতে বের হচ্ছি।একদম পাকা প্রমিস!”
নবনী নাক সিঁটকে বলল, “থাক, কোনো দরকার নেই।”
দিব্য ভাবলেশহীন গলায় শোনাল, “আমার বউকে নিয়ে আমি ঘুরতে যাব। তাতে তোমার কী সমস্যা, হ্যাঁ?”
“আমার কোনো সমস্যা নেই!”
“এতটুকু একটা বিষয় নিয়ে এত শত রাগ জমে ছিল মনে?”
নবনী কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বলল, “আমি একটু আম্মুর কাছে যাব ভাবছি। উনাকে এখনো খবরটা বলিনি তো। চাইছিলাম সামনাসামনি গিয়ে সুখবরটা জানাতে।”
দিব্য শান্ত মুখে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছে, যেও। তবে আমায় দুদিন সময় দিতে পারবে? অফিসের কাজগুলো গুছিয়ে নিই।”

“আপনার আবার সময় দেওয়ার কী দরকার? দিয়া আর আমিই চলে যাব!”
দিব্য সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করে বলল, “তোমাদের ছেড়ে আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না! আর এই অবস্থায় তো তোমাকে একা ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। একদম জেদ কোরো না, লক্ষ্মী বউয়ের মতো শোনো!”
নবনীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল লাজুক হাসি। ফর্সা মুখখানা তার নিমেষেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। দিব্য তার বাঁ গালে ঝটপট একটা নরম চুমু এঁকে দিয়ে আলমারির দিকে চলে গেল। তারপর তোয়ালে আর জামাকাপড় হাতে নিয়ে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল। পুরো বিষয়টাই সে করল নির্বিকার ভঙ্গিতে! নবনী আর সেখানে দাঁড়াল না। গালে হাত দিয়ে মৃদু হাসতে হাসতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় যেন ছাই হয়ে যাচ্ছে ঊর্মির। তালুকদার বাড়ির পেছনের দিকটায় বিশাল এক বাগান। যেখানে ছোট-বড় অগুনতি গাছের সমারোহ। আজ এই নির্জন বাগানের কোনো একটা গাছেই নিজের অভিশপ্ত জীবনের ইতি টানবে সে। মনে মনে এই কঠিন সিদ্ধান্তই রূপ নিয়েছে। বেশ বড়সড় একটা গাছের নিচে এসে দাঁড়াল ঊর্মি। ছলছল চোখে ওপরের শক্ত একখানা ডালের দিকে তাকাল। গা থেকে পরনের শাড়িটা আলগা করে আঁচলটা ওপরের ডালে ছুঁড়ে আটকে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই শাড়ির কোণ ডাল অব্দি পৌঁছাচ্ছ না। চরম হতাশায় আর বিরক্তিতে চোখ দুটো নোনা জলে ভরে উঠছে তার। ঠিক তখনই আচমকা এক গম্ভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে,
“আপনি ঠিক কী করার চেষ্টা করছেন, বলুন তো?”

কায়েফ এসে দাঁড়িয়েছে সবে। শাড়ি আলগা হয়ে শরীরের অর্ধেক অংশ অনাবৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা ঊর্মির পানে চোখ পড়তেই কায়েফ নিজেই থমকে জমে গেল। ঊর্মির সেদিকে হুঁশ নেই। ভয় আর অপরাধবোধে থরথর করে কাঁপছে সে। কায়েফ চট করে চোখ সরিয়ে নিয়ে কিছুটা বিরক্তি ও গাম্ভীর্য মিশিয়ে বলল,
“এই অবস্থায় গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকতেন আপনি? আপনাকে উদ্ধার করতে আসা লোকটাও বাঁচানোর কথা ভুলে কয়েক ঘণ্টা হা করে তাকিয়েই থাকত! মরার জন্য আর কোনো সহজ উপায় খুঁজে পেলেন না?”
কায়েফের দৃষ্টি অনুসরণ করতেই যেন পুরো হুঁশ ফিরল ঊর্মির। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় চট করে শাড়িটা গায়ে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠে মাটিতে বসে পড়ল সে। কায়েফ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ঊর্মির মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসল। ঊর্মি কেঁদেই চলেছে। তার কান্নার তোড়ে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হচ্ছে। কায়েফ কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করার পর আলতো করে ঊর্মির মাথাটা নিজের বুকের সাথে ঠেকিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিচু স্বরে বলল,

“এমন অদ্ভুত, উদ্ভট সব চিন্তা আপনার মাথায় কে দেয়? কেন করছেন এসব, বলুন তো? মুখে তো কিছুই বলছেন না। আমার ওপর কিসের এত রাগ আপনার?”
ঊর্মি রুদ্ধ কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি আপনার ওপর কোনো রাগ করিনি! রাগ তো আমি করেছি নিজের ওপর, নিজের এই পোড়া কপালের ওপর! বেঁচে থেকে আর কী করব বলতে পারেন? আমার জীবনটা শুরু থেকেই জটিল, অভিশপ্ত! আমার এই নষ্ট জীবনের ফাঁদে আপনাকে জড়িয়ে আপনার ভবিষ্যৎটাও আমি শেষ করে দিলাম। আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দিন! এই পৃথিবীতে আমাকে বোঝার মতো, আমার মনের কথা শোনার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। আমি আর সত্যি সহ্য করতে পারছি না!”
“আমি বুঝতে পারছি। এতটুকু বয়সে আপনাকে অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে। আপনার যদি খুব সমস্যা না হয়, তবে আমাকে সব বলতে পারেন। কথা দিচ্ছি, আপনার সব কথা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনব।”
ঊর্মি ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে অশ্রুসজল চোখে কায়েফের দিকে তাকাল। কাতর কণ্ঠে শুধাল,
“আপনি..আপনি আমাকে ছাড়ছেন কবে? আমি জানি এটা ভীষণ অন্যায় আবদার, তাও যদি একটা কথা বলি..আমার শেষ কথাটা কি রাখবেন?”
কায়েফ শান্ত চোখে বলল, “কী কথা?”

“আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে হবে না অন্তত আপনাদের বাড়ির একজন পরিচারিকা বা কাজের লোক হিসেবে থাকতে দিন! বিশ্বাস করুন, এই মুহূর্তে যদি আমি গ্রামে ফিরে যাই, তবে আমার পরিণতি এর চেয়েও ভয়াবহ হবে। আমি মরতে ভয় পাই, কিন্তু বাঁচতে ও পারবো না। এটা কেমন জীবন বলুন? আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমাদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অতীতের কোনো ছায়াও কখনো আপনার ভবিষ্যতে পড়তে দেব না!”
কথাগুলো শেষ করেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ল ঊর্মি। কায়েফ এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বুক চিরে একটা অসীম কষ্ট আর সহানুভূতি দানা বাঁধছে তার। ভীষণ ইচ্ছে করছে এই নিষ্পাপ মেয়েটার মনের সমস্ত বিষাদ নিজের হাতে ধুইয়ে দিতে। সে আরও একটু কাছে ঘেঁষে এসে বলল,
“আপনি এই বাড়িতে অবশ্যই থাকবেন। তবে কোনো কাজের লোক হিসেবে নয়, আমার একমাত্র স্ত্রী হয়েই থাকবেন।”
ঊর্মির মনে হলো সে হয়তো ভুল শুনল, কিংবা এটা কোনো স্বপ্নের জাল। যা চোখের পলকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে!

একটানা বেজে চলেছে নিযানার মোবাইল ফোনটা। ডিসপ্লেতে নামটা না দেখেই সে আঁচ করতে পারছে ওপাশে কে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ইচ্ছা করেই ফোনটা রিসিভ করতে মন চাইছে না তার। ওদিকের ছেলেটাও একগুঁয়ে, নাছোড়বান্দা! কল কেটে যাওয়ার পর মুহূর্তেই আবার রিং হচ্ছে। থামার বিন্দুমাত্র নামগন্ধ নেই। শেষমেশ আর উপায়ান্তর না দেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেই রিসিভ করে কানে ফোনটা ধরল নিযানা। তড়িঘড়ি লাইনটা পেতেই ওপাশ থেকে কলরবের তীক্ষ্ণ ও ঝাঁঝালো কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কোথায় মরেছিলি হ্যাঁ? সেখানে কী ফোনটা তোলা যায় না?”
নিযানা শুধাল, “হুট করে ফোন করেছ কেন?”
কলরব ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল, “তোর বাপের বিয়ে ঠিক করেছি! বউ পছন্দ হয় কি না, ছবি পাঠাব ভাবছি!”
নিযানা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ফাজলামি না করে কাজের কথাটা বলো তো।”
“তোর গোষ্ঠীর লোকের মূল সমস্যাটা কোথায় বল তো? আমাকে অকালে বিধবা বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে কেন সবাই?”
কথাটা শুনে নিযানা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। ঠোঁটের কোণ গলে ফোটা অপ্রতিরোধ্য হাসিটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি এখন কোথায় আছো?”
“অফিসে! মাত্রই তো দুপুরে খাওয়ার একটু ব্রেক পেলাম।”
“খুব কাজের চাপে আছো আজকাল?”
“হুম! আর কয়েকটা বছর দেখিস৷ তোর বাপের চেয়েও বড়লোক হয়ে দেখাব!”
নিযানা মৃদু হেসে বলল, “আমি পড়তে বসেছিলাম। তা এত কাজের মাঝেও ফোনটা দেওয়ার কারণটা জানাবে?”
“পড়! পড়তে পড়তে একদম শেষ হয়ে যা তুই! আমি এদিকে জ্বলন্ত জাহান্নামে যাই, তাতে তোর কী-ই বা আসে যায়? তোর মা ফোন করেছিলেন আব্বুকে। সরাসরি বললেন ডিভোর্স পেপারে সই করে দিতে! তুই কি বাড়িতে কিছুই বলিসনি? সত্যি কি তুই এখনো আমাকে ডিভোর্স দিতে চাস?”
নিযানা একটু দুষ্টুমি করে, গলায় গম্ভীর ভাব এনে বলল,

“আর নয়তো কী? তুমি আবার অন্য কিছু আশা করেছিলে নাকি?”
কথাটা শোনামাত্র ওপাশ থেকে কলরব যেন তাজ্জব হয়ে গেল! চড়া সুরে বললো,
“তুই নিজেকে ভাবিসটা কী নিযানা? আমায় ব্যবহার করা শেষ, এখন কায়দা করে ছুঁড়ে ফেলে দিবি? কী মারাত্মক আর বিপজ্জনক মেয়ে রে তুই! আমার মতো এত নিরীহ, নিষ্পাপ একটা ছেলের ইজ্জত লুট করে নিয়ে এখন একদম সাইড করে দেওয়ার ধান্দা? দাঁড়া, তোর আর তোর বাপের নামে কালই আমি ধ*র্ষণ মামলা ঠুকব!”

এই অবেলায় পর্ব ৫৩

নিযানা শব্দ করে হেসে উঠল। ওপাশ থেকে সেই মিষ্টি হাসির শব্দ কলরবের কানে পৌঁছাতেই সে এক মুহুর্ত থমকে গেল। কণ্ঠে আকুলতা মিশিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“আমায় জ্বালিয়ে খুব মজা পাচ্ছিস, তাই না? রক্তচোষা কোথাকার!”

এই অবেলায় পর্ব ৫৫