Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬০

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬০
বন্যা সিকদার

“আমি মরে গেলেও তোর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রুও ঝরবে না‚ ফুল?
​মৌ চোখের পানি এক ঝটকায় মুছে নিয়ে একবিন্দু দয়া না দেখিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দিল।
​”না। এক ফোঁটাও ঝরবে না। এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরী তোমার মতো খুনির জন্য জিন্দেগিতে এক ফোঁটা অশ্রুও ফেলবে না‚ কোনোদিনও না। ঘৃণা করি তোমাকে আমি।
রোহান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে অপলক ও বিধ্বস্ত দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে ধীরে ধীরে দু’পা পিছিয়ে গেল। নিজের মনের ভেতরের এই লোভের পরিণাম দেখে আজ নিজেরই প্রতি এক তীব্র ঘৃণা ও আফসোস জন্মাল তার মনে। যে মেয়েটাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে পাওয়ার জন্য সে এই পাপের পথ বেছে নিয়েছিল। আজ সেই মেয়েটিই তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিষের মতো তীব্র নজরে ঘৃণা করছে। সে তো চেয়েছিল কেবল মেয়েটির একটুখানি পবিত্র ভালোবাসা‚ একটু মায়ার ছোঁয়া। ভালোবাসা পাওয়া বা কাউকে আপন করে নেওয়ার রাস্তাটা যে এত বেশি কাঁটায় ভরা আর যন্ত্রণাময় হতে পারে‚ তা সে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি। ​

হঠাৎই পেছন থেকে মেয়র সাহেবের ইশারায় হুড়মুড় করে কয়েকজন বিশালকায় হিংস্র গার্ড এসে অতর্কিতে চড়াও হলো রোহানে’র ওপর। তারা কেউ বিন্দুমাত্র রাখঢাক না করে এলোপাতাড়ি ভাবে বেধড়ক মারতে শুরু করল রোহান’কে। কিন্তু আজ অদ্ভুত ব্যাপার হলো‚ শারীরিক কোনো আঘাতেই রোহানে’র ভ্রুক্ষেপ নেই। বাইরের এই পৈশাচিক মারধরের যন্ত্রণা তার বুকের ভেতরে জমে থাকা নিখাদ অনুশোচনা আর অপরাধবোধের সমুদ্রের কাছে একদম ফিকে হয়ে গেছে।
ভেতরের মানসিক দহন আর বুকফাটা আত্মিক যন্ত্রণা তাকে শারীরিক ভাবে এতটাই মৃতপ্রায় করে তুলেছে যে‚ এই আঘাত গুলো তার কাছে মোটেও গায়ে লাগছে না। ​ভাইকে এভাবে পশুর মতো মার খেতে দেখে মেহের আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে দৌড়ে এসে নিজের ভাইকে ওই নরপশুদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঝাপিয়ে পড়ল। অঝোরে চোখের জল ফেলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে গার্ড গুলোর পা জড়িয়ে ধরে প্রাণভ ভিক্ষা চাইতে লাগল।
“আমার ভাইকে মারবেন না‚ ছেড়ে দিন প্লিজ। আমার ভাই কষ্ট পাচ্ছে? কেন মারছেন এভাবে আমার ভাইকে।

​কিন্তু পাষাণ লোক গুলোর মনে এক ফোঁটাও দয়া বা মায়া নেই। তারা মেহেরে’র আকুল কান্নার কোনো তোয়াক্কা না করে উল্টো ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিল এবং টেনে-হিঁচড়ে জোর পূর্বক তাকেও ধরে আটকে রাখল। ​অথচ এই দৃশ্যে মৌ সম্পূর্ণ বিপরীত এক মূর্তি ধারণ করে দাঁড়িয়ে রইল। রোহা’নের প্রতি তার মনে যে পরিমাণ ঘৃণা‚ ক্ষোভ আর বিষ জমেছে। তা তাকে এমন এক পাথুরে ও নিষ্ঠুর মূর্তিতে পরিণত করেছে যে‚ রোহানে’র এই চরম দুরবস্থা ছটফটানি দেখেও তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ল না। সে একবিন্দু দয়া না দেখিয়ে বরফ শীতল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রোহানও অপরাধীর মতো ঝাপসা চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে রইল‚ নিজের ওপর তার এখন তীব্র ঘৃণা হচ্ছে। সে আজ বুঝতে পারছে সে যদি এই কুৎসিত‚ অবৈধ ও অপরাধের দুনিয়ায় পা না বাড়াত। তবে আজ হয়তো তার এই দুর্দিনে তার ফুল ঠিকই তার জন্য ব্যাকুল হয়ে কেঁদে উঠত‚ তাকে বাঁচানোর জন্য বুক চিতিয়ে এগিয়ে আসত। কিন্তু আজ তার সমস্ত পাপের কারণে মৌ আর একটুও এগিয়ে এল না‚ সে কেবল পাথরের মূর্তির মতো নির্বিকার হয়ে এক কোণে বসে রইল।

​ঠিক তখনই মেয়র সাহেব ঠান্ডা মাথায় মৌ এবং মেহের বাদে বাকি সমস্ত বন্দি মেয়ে গুলোকে লাইন ধরিয়ে অন্য কোনো গোপন আস্তানায় পাচারের উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়ার হুকুম দিলেন। বাকি মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে চলে যাওয়ার সময় মৌ আর মেহের কেবল অসহায় চোখে সেই দৃশ্য তাকিয়ে দেখল ​এরপর মেয়র সাহেব ধীর পায়ে হেঁটে রোহানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রোহান যখন রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে‚ তখন সেই নির্দয় মানুষটা সম্পূর্ণ পৈশাচিক উল্লাসে নিজের ভারী জুতোর সোলটা সজোরে এসে চেপে বসল রোহানে’র বুকের ওপর।
​ভাইয়ের বুকে এমন অমানবিক নির্যাতন ও জুতোর পেষণ দেখে মেহের বুকচেরা আর্তনাদ করে কেঁদে উঠল।
​“আল্লাহর দোহাই লাগে এমন নিষ্ঠুরতা করবেন না। আমার ভাইকে ছেড়ে দিন। কেন এমন অমানুষের মতো অত্যাচার করছেন আপনি? রোহান ভাইয়া ওঠো না প্লিজ‚ তোমার তো কত ক্ষমতা। তুমি এই শয়তান গুলোর সাথে ফাইট কর। কেন চুপ করে পড়ে আছো ভাইয়া? ওঠো না প্লিজ‚ রোহান ভাইয়া…আমার দিকে তাকাও।

​মেহের ভাইয়ের জন্য ছটফট করতে লাগল কিন্তু রোহান নিজের সেই বোনটার দিকেও ফিরে তাকানোর বা তাকে রক্ষা করার ন্যূনতম ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলল। সে কেবল রক্তাক্ত মুখে অপরাধীর মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সারাজীবন সে কেবল ফুলকে নিজের করে পাওয়ার অন্ধ লোভে নিজের পুরো জীবনটা বরবাদ করে দিল অথচ বিনিময়ে আজ তার এই ফুল জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে ফিরে তাকাল না। একটু দয়ার দৃষ্টি ফেলল না।
আচমকা মেয়র সাহেব পুরো শক্তি দিয়ে রোহানে”র বুকে সজোরে এক লাথি মারলেন। রোহান তীব্র ব্যথা আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে ধূলিমলিন মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু এত কিছুর পরও মৌ এক পলকের জন্য তার দিকে ফিরে তাকাল না‚ সে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। ​মেয়র সাহেব পৈশাচিক আক্রোশে রোহানে’র যন্ত্রণাকাতর বুকের ওপর নিজের পায়ের ভারী বুট চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে উঠলেন।

​“তোকে যেমন অন্ধকার জগতে টেনে এনে অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছিলাম‚ আজ ঠিক ততটা পথ ঠেলে না ফেরার দেশে পাঠাব। তুই আমার সাথে হুংকার তুলে কথা বলিস? আমার চোখে চোখ রেখে ধমক দিস? তোকে আজ এমন মর্মান্তিক ও ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুযন্ত্রণা দেব যে তুই তোর কল্পনায়ও তা আনতে পারবি না।
​মেয়র সাহেবের কড়া নির্দেশে একজন গার্ড ধারালো এক রামদা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে রোহানে’র দিকে এগিয়ে এলো। সেই চকচকে ধারালো অস্ত্রের ওপর আলোর ঝিলিক দেখে মেহের আতঙ্কে শুকনো ঢোক গিলল। সে আকুল হয়ে কান্নাকাটি আর প্রাণভিক্ষা চেয়েও লোক গুলোর মন গলাতে পারল না। ​মেয়র সাহেব নিজ হাতে সেই রামদার ধারালো ডগাটা রোহানে’র খালি বুকের ওপর আলতো করে ঠেকালেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে তখন ঝুলে আছে এক বিকৃত‚ পৈশাচিক হাসি। ​তবে আশ্চর্য বিষয় হলো‚ মৃত্যুর এত মুখোমুখি দাঁড়িয়েও রোহানে’র চোখে বিন্দু মাত্র ভয় বা আতঙ্কের ছাপ নেই। তার রক্তবর্ণ ঝাপসা দৃষ্টি এখনো এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মৌ’য়ের দিকেই সীমাবদ্ধ।

জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও মেয়েটাকে অন্তত একটা বার খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে তার…নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসা আর আকুলতার কথা উজাড় করে বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নিজের কৃত পাপের বিশাল পাহাড় পেরিয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সেই আশা পূরণ করার কোনো পথ তার নেই। সে তীব্র এক আবেশে চোখ দুটো বুজে নিল। ​
যখনই মেয়র সাহেব রামদা উঁচিয়ে রোহানে’র বুকে সজোরে কোপ বসিয়ে দিতে যাবেন‚ ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে কোথা থেকে যেন একজন এসে মেয়র সাহেবের বুকে সজোরে লাথি চালিয়ে দিল। ​লাথির তীব্র ধাক্কায় মেয়র সাহেব ছিটকে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়লেন। রোহান আচমকা চমকে উঠে চোখ মেলল। আর চোখের সামনে সেই পরিচিত মূর্তি‚ উজান’কে অক্ষত অবস্থায় সশরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোহানে’র ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত তৃপ্তির মুচকি হাসি খেলে গেল। ​রোহান মনে মনে যেন এক বিশাল মুক্তি পেল। সে মারেনি উজা’নকে। সে মুখে যতবারই উজানকে মারার হুংকার দিক না কেন‚ পরম বন্ধুর গায়ে হাত তোলার কোনো শক্তি বা ক্ষমতা কখনোই রোহানে’র ছিল না। রোহান আজ এই ভেবেই সবচেয়ে বেশি শান্তি পেল যে‚ অন্তত ‘উজানে’র খুনি’ অপবাদ দিয়ে মৌ তাকে চিরকালের জন্য অভিশাপ দেবে না!
​রোহান যন্ত্রণার মাঝেও উন্মাদে’র মতো উদগ্রীব কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚

​“উজান তুই…?? তুই ঠিক আছিস ভাই?
​রোহানে’র সেই অস্পষ্ট কথাটা যেন এক বাজপাটের মতো এসে মৌ’য়ের কানে আছড়ে পড়ল। ​কথাটা শোনা মাত্রই মৌ ঝড়ের গতিতে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাল। আর চোখের সামনে নিজ প্রফেসর সাহেব উজান চৌধুরী’কে জীবিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক লহমায় তার চোখ-মুখের সমস্ত বিষাদ মুছে গিয়ে স্বর্গের আলো ভেসে উঠল। ​মৌ আর এক সেকেন্ডও কালক্ষেপণ করল না। কোনো কিছু না ভেবে ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে উজান’কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে পরম মুগ্ধ ও আকুল সুরে ডেকে উঠল—
​“আমার প্রফেসর সাহেব…!!

​উজান পরম মমতায় ও গভীর ভালোবাসায় মৌ’কে নিজের বুকে টেনে নিয়ে নিবিড় খাঁজে আশ্রয় দিল। ঠিক তখনই কড়া সিকিউরিটি আর আধুনিক অস্ত্রসহ একঝাঁক পুলিশ বাহিনী পুরো ঘর কর্ডন করে ঘিরে ফেলল। মুহূর্তে তারা পাচারকারী দলের সকল গার্ডকে হাত উঁচিয়ে ‘হ্যান্ডসআপ’ করতে বাধ্য করল এবং চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল। ​পুরো দৃশ্য দেখে মেয়র সাহেব বাকরুদ্ধ ও চরম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি নিজে লোক পাঠিয়ে যাকে এনকাউন্টারে মেরে ফেলার কনফার্ম খবর পেয়েছিলেন‚ সেই সিআইডি সুপ্রিম লিডার উজান চৌধুরী আজ জীবন্ত তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। চোখের সামনে যেন নিজের চরম পরাজয় ও ধ্বংস স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
​এদিকে মৌ উজান’কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অঝোর ধারায় ডুকরে কেঁদে উঠল। এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমতে থাকা সমস্ত মাতম আর হাহাকার যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। মানুষটা বেঁচে আছে‚ একদম তার কাছে আছে। এই একটিমাত্র সত্যেই তার পুরো বুকটা শীতল হয়ে গেল। ​সে কান্নায় অবরুদ্ধ গলায় ফিসফিসিয়ে বলল‚

​”প্রফেসর সাহেব! কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন আপনি? আপনি জানেন না আপনার জন্য কতটা যন্ত্রণা হচ্ছিল আমার? আমার বুকের ভেতরটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল…মনে হচ্ছিল আমি মরেই যাব।
​“পিচ্চি…
​উজান এক প্রকার হাহাকার করে চিৎকার দিয়ে উঠল। মৌ তার ছলছল চোখের জল ভরা দৃষ্টি নিয়ে বরের দিকে তাকিয়ে রইল। উজান মুহূর্তেই তাকে নিজের বুকের সাথে আরও গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে। তার কপাল‚ গাল আর পুরো মুখমণ্ডল জুড়ে অজস্র চুমুর বৃষ্টিতে ভরিয়ে তুলল।
​“আমাকে ফেলে মরে যাওয়ার কথা আর কোনোদিন এই মুখে ভুলেও উচ্চারণ করবে না। তুমি হলে আমার বিড়ালের বাচ্চা…আর আমি আমার এই ছোট্ট বিড়ালের বাচ্চাটাকে ছাড়া একা একা কীভাবে বাঁচব‚ হুম? তুমিহীন এই উজান চৌধুরী যে সত্যি সত্যি অচল আর অপূর্ণ।
​মৌ চোখের পানি মুছে উজানে’র বুকে মাথা গুঁজে অনুযোগের সুরে বলল‚
​”তাহলে আপনি কেন আমাকে এভাবে একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন‚ বলুন? তখন কি আমার একটুও কষ্ট হচ্ছিল না? আপনি তো খুব ভালো করেই জানেন‚ আপনার গায়ে সামান্য আঁচ লাগলেও আমি সেটা সহ্য করতে পারি না।

“পিচ্চি প্লিজ রিল্যাক্স হও। কিছু হয়নি তো…একটু দাঁড়াও এখানে।
​কিন্তু মৌ উজানে’র কোনো বারণই শুনল না। সে ভেজা চোখ দুটি বড় বড় করে উজানে’র শরীরটার দিকে খুব ভালোভাবে নজর দিল। নজর পড়তেই তার বুকটা ধক করে উঠল। ​উজানে’র সারা শরীরে অসংখ্য ক্ষতের চিহ্ন। পরনের সাদা শার্টটা বেশ কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে‚ যেখানে লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া লালচে রক্তের দাগ। হাতের এক জায়গায় চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত জমাট বেঁধে কুৎসিত নীল বর্ণ ধারণ করে আছে। ​মৌ থরথর করে কাঁপা হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে সেই নীল হয়ে যাওয়া জায়গায় আলতো করে আঙুল বুলাতে গেল। ব্যথায় অজান্তেই কুঁকড়ে উঠল উজান। ​মৌ মারাত্মক ভয় পেয়ে গেল। সে কাঁপা ও রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল।
​”প্রফেসর সাহেব! আপনার গায়ে এত আঘাতের চিহ্ন এল কীভাবে? আপনাকে কি ওই শয়তান গুলো খুব মেরেছে?
​উজান পরম মমতায় মৌ’য়ের চোখের কোণের জলটুকু মুছে দিয়ে নরম সুর তুলে ফিসফিসিয়ে বলল‚

“এসব কিচ্ছু না‚ পিচ্চি। প্লিজ অহেতুক প্যানিক কোরো না জান…একদম ভয় পেয়ো না। সব ঠিক আছে।
​”মিথ্যা কেন বলছেন আমার কাছে? সত্যি করে বলুন না কীভাবে এত আঘাত পেয়েছেন? ওই জঘন্য কু**ত্তা গুলো আপনাকে খুব মেরেছে?
​উজান এক চিলতে শীতল ও স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে চেয়ে রইল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে এই মুহূর্তে তার অবুঝ বউটার মনের ভেতরে কী পরিমাণ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে ধীরস্থির গলায় বলতে শুরু করল।
​“হুম…অনেক মেরেছে আমাকে। সকালে নিউজ পেয়েছিলাম যে রোহান আজ কাকে যেন অ্যাটাক করে মেরে ফেলবে। তো আমি চাইনি যে রোহানে’র ভুল পদক্ষেপে কোনো নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হোক। সেই জন্য কাউকে না জানিয়ে একা একাই স্পটে গিয়েছিলাম কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি সবকিছু একটা পরিকল্পিত ট্র্যাপ। রোহান নয়‚ বরং মেয়র সাহেবের পোষা কিছু গুন্ডা আমাকে মার্ডার করার মিশন নিয়ে এসেছে।
​উজান একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আবারও বলতে লাগলো।

“ওরা সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল পিচ্চি। আমাকে ওরা টেনে-হিঁচড়ে একদম নির্জন এক জায়গায় নিয়ে যায়‚ শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে। প্রায় গ্রাম্য একটা পরিবেশ। সেখানে নিয়ে আমাকে পশুর মতো মারধর করে। এক পর্যায়ে আমি যন্ত্রণায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে ওরা ভেবে নেয় যে উজান চৌধুরী মারা গেছে। তাই অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে আমাকে রেললাইনের পাতের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে যায়।
তবে কপাল ভালো বলতে হবে। ঠিক ওই সময় কিছু কৃষক জমিতে কাজ করতে যাচ্ছিলেন। আমাকে ওভাবে মুমূর্ষু আর রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তারা দয়া করে সেখান থেকে উদ্ধার করেন। গ্রামেই এক স্থানীয় ডক্টরের মাধ্যমে আমাকে ফার্স্ট এইড আর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘণ্টা খানেক পর যখন আমার পুরোপুরি জ্ঞান ফিরল‚ তখন নিউজে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেরই মৃত্যুর খবর দেখতে পেলাম।

আমি জানতাম‚ আমার মৃত্যুর এই ভুয়া খবরটা শুনে আমার ছোট বিড়ালের বাচ্চাটা অঝোরে কাঁদবে। তার দম বন্ধ হয়ে আসবে…কিন্তু আমার কাছে তখন সত্যি কোনো উপায় ছিল না পিচ্চি। পুরো অপরাধী চক্র আর মূল লিডারকে হাতেনাতে ধরতে হলে আমাকে নিজের মৃত্যুর নাটকটা কিছু সময়ের জন্য ধরে রাখতেই হতো।
তারপর আমি কোনো ক্রমে তন্ময়ে’র সাথে কন্টাক্ট করি। কিন্তু এর মাঝেই ডাবল শক পেলাম। নিউজ এলো যে তোমাকে আর মেহের’কে কে বা কারা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। যদিও খবরটা পেয়ে আমি একটুও প্যানিক হইনি‚ কারণ আমার একটা বিশ্বাস ছিল। যেখানে রোহান আছে‚ সেখানে হাজারটা বিপদের মধ্যেও অন্তত আমার পিচ্চির গায়ে কেউ একটা আাঁচড়ও কাটতে পারবে না। শুধু একটা ডাউট ছিল‚ রোহান সত্যি জানে কি না যে তোমাদের কোথায় রাখা হয়েছে। তবে তোমার গলার সেই লকেটটার সাথে যে আমি ডাবল-সিকিউরিটি জিপিএস ট্র্যাকার কানেক্ট করে রেখেছিলাম‚ সেটাই আমাকে সরাসরি ট্রেস করে এই আস্তানায় পৌঁছে দিয়েছে।

​উজান এক নিঃশ্বাসে পুরো সত্যটা বলে থামল। ​মৌ এতক্ষণ সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে কথা গুলো শুনছিল। কিন্তু উজান শেষ করা মাত্রই মৌ’য়ের চোখের ভেতরের জমাট বাঁধা শোক মুহূর্তের মধ্যে এক বিধ্বংসী আগ্নেয় গিরির মতো ফেটে বের হলো। ​সে আচমকা উজান’কে ছেড়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে সোজা ধেয়ে গেল হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মেয়র সাহেবের দিকে। ​কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে‚ মৌ মুহূর্তের মধ্যে নিজের পা থেকে শক্ত জুতোটা খুলে নিল। তারপর ঠাসসস‚ ঠাসসস করে একের পর এক নির্দয় আঘাত বসাতে শুরু করল মেয়র সাহেবের গালে ও মুখে।
​নিজের চোখের সামনে এই মেয়েটার এমন মারাত্মক হিংস্র ও চণ্ডী রূপ দেখে মেয়র সাহেব সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও ভয়ে বরফ হয়ে গেলেন। রুমের বাকি সবাই আতঙ্কে শিউরে উঠল। ​মৌ জুতো দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে পেটাতে গর্জে উঠল—

“কুত্তার বাচ্চা তোদের লজ্জা করে না মানুষ খুন করতে? এতগুলো নিষ্পাপ মেয়ের জীবন এক লহমায় তছনছ করে দিলি‚ নিজের স্ত্রীকে নিজ হাতে খুন করলি। আর শেষমেশ আমার প্রফেসর সাহেবের গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস দেখালি? তোকে তো আজ আমি মেরেই ফেলবো।
​কথা শেষ না হতেই মৌ চোখের পলকে পাশে পড়ে থাকা একখানা ভারী লোহার রড তুলে নিল মেয়র সাহেবের মাথায় আঘাত করার জন্য। মৌ’য়ের এমন তাণ্ডব রূপ দেখে রুমের উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে এলো। ​উজান এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে পিছন থেকে মৌ’কে দুই হাতে শক্ত করে আগলে ধরল। শান্ত স্বভাবের মেয়েটার ভেতরে আজ প্রতিশোধের এমন দাবানল জ্বলছে যে উজানও একা তার গায়ের শক্তির সাথে সহজে পেরে উঠছে না। ​উজান অস্থির হয়ে মৌ’য়ের হাত দুটো চেপে ধরে আকুল স্বরে বোঝাতে লাগল।

“পিচ্চি প্লিজ এমন করো না…শান্ত হও। প্লিজ‚ থামো জান।
​”ছাড়ুন আমায় আপনি। ছাড়ুন আমাকে। ওই জানোয়ারের এত বড় সাহস কীভাবে হলো যে আপনার গায়ে হাত তোলে। আপনাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে? শুধু এই নরপশুর জন্য আমার মামণি কত যন্ত্রণায় ছটফট করল। ওকে আমি আজ নিজ হাতে মেরেই ফেলব। কিছুতেই ছাড়ব না।
​“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড‚ পিচ্চি। আইন কখনো নিজের হাতে তুলে নিতে নেই। ওর জন্য আদালতের কঠিন শাস্তিই যথেষ্ট। ছেড়ে দাও তুমি ওসব।
​”কিছুতেই ছাড়ব না আমি। এর মাথা আজ আমি এই রড দিয়ে পিটিয়ে ছাতু বানিয়েই ছাড়ব।
​উজান পাহাড়ের মতো সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় মৌ কোনো ভাবেই মেয়র সাহেবের ঘেঁষতে পারছিল না। রাগে‚ ক্ষোভে আর মেজাজ হারিয়ে মৌ শেষমেশ নিজের হাতের সেই ভারী রডটাই সজোরে ছুড়ে মারল মেয়র সাহেবের দিকে। ​ভারী রডটা সোজা গিয়ে বিকট শব্দে মেয়র সাহেবের কপালের একপাশে আছড়ে পড়ল। সাথে সাথেই চামড়া কেটে গলগল করে লালচে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল তাঁর মুখ বেয়ে। উজান এরপর পরম ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মৌ’কে খানিকটা শান্ত করল। ​এরপর উজান মৌ’কে এক হাতে নিজের বুকের খাঁজে পেঁচিয়ে রাখল। আর অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল মাটিতে লুটিয়ে থাকা রক্তাক্ত রোহানে’র দিকে।

​রোহান হাঁসফাঁস করে এক নজর উজানে’র দিকে তাকাল। ভারী ও বিষণ্ণ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে পরম বিশ্বাসের সাথে উজানে’র সেই শক্ত হাতটা আঁকড়ে ধরে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ​ঠিক সেই মুহূর্তেই রুমের ভেতর পরপর দুটি গুলির বিকট শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে উঠল। একটি গুলি রোহানে’র মাথার একপাশের চামড়া ঘেঁষে চলে গেল এবং দ্বিতীয় গুলিটা সজোরে এসে বিদ্ধ হলো তার বাম হাতের মাংসে। ​পাশে তাকাতেই দেখা গেল রক্তাক্ত মুখে পড়ে থাকা মেয়র সাহেব নিচে গড়াগড়ি দিতে দিতেই কোমর থেকে রিভলবার বের করে গুলি দুটো চালিয়েছেন।
​উজান এক লহমায় মৌ’কে নিজের শরীরের পেছনে আড়াল করে দিল এবং দ্রুত মেয়র সাহেবের দিকে এগোতে চাইল। কিন্তু উজানে’র আগেই রোহান যেন এক কালবোশেখী ঝড়ের গতিতে মেঝেতে পড়ে থাকা সেই ধারালো রামদাখানা কুড়িয়ে নিয়ে ধেয়ে গেল৷ ​হাতের গুলিতে তীব্র যন্ত্রণা হওয়া সত্ত্বেও সেদিকে রোহানে’র বিন্দুমাত্র নজর নেই‚ তার পুরো মনোযোগ এখন ওই পাষাণ মেয়র সাহেবের দিকে। পরম হিংস্রতায় সে রামদা উঁচিয়ে এক লাফে গিয়ে মেয়র সাহেবের বুকের ওপর চেপে বসল।
​উজান রোহানে’র এই মারাত্মক হিংস্রতা রুপ দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল।
“রোহান খবরদার‚ কিছু করবি না তুই। আইন ওকে উপযুক্ত শাস্তি দেবে‚ ছেড়ে দে ওকে।
​রোহান ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে উজানে’র দিকে তাকাল। তার রক্তাক্ত ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত‚ পৈশাচিক ও তাচ্ছিল্যের হাসি। সে হাসতে হাসতে বলল‚

​“উঁহু ভাই! এই দেশে আইন কখনো এই রক্তচোষা শয়তানদের আসল শাস্তি দিতে পারে না। তাছাড়া…ওকে তো আমি কোনো অবস্থাতেই জ্যান্ত বেঁচে থাকতে দেবই না। আমার ফুলের দিকে বিষাক্ত নজর দিয়েছিল এই সুয়োরের বাচ্চা আর আমি ওকে ছেড়ে দেব? তাও আবার পরম সুখে বেঁচে থাকার জন্য? আবার আমাকেও পেছন থেকে গুলি চালিয়ে মারতে চায়…সো সুইট!
​রোহান রামদা হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রুমের পুলিশ সদস্য আর সবাই ভাবল রোহান হয়তো অনুশোচনায় সরে আসবে। সে সত্যি সত্যিই দু-পা পিছিয়ে খানিকটা সরে এলো। কিন্তু হুট করেই সমগ্র রুম কাঁপিয়ে এক বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল সে।
​“রোহান তালুকদার মরতে নয়‚ মারতে ভালোবাসে। তার যে রক্ত ভীষণ পছন্দ। আই লাভ ব্লাড।
​কথাটা শেষ হতে না হতেই রোহান নিজের সমস্ত জোর দিয়ে রামদার ধারালো ফালাটা সজোরে বসিয়ে দিল মেয়র সাহেবের বুকের ঠিক মাঝখানে। একবার…দু-বার…তিনবার!

​পরপর কয়েকটা কোপ বসানোর পর‚ উন্মাদের মতো এক কোপে লোকটার গলা থেকে মাথাটা কেটে এক লহমায় আলাদা করে দিল সে। কুপিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিল শরীরের প্রতিটি রগ। তীরের মতো স্প্রে করে ছুটে আসা তাজা‚ গরম রক্তে ভিজে একাকার হয়ে গেল রোহানে’র পুরো মুখ আর জামাকাপড়। ​তার ঠোঁটে তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির পৈশাচিক হাসি৷ মনে হচ্ছে সে যেন পুরো বিশ্ব জয় করে ফেলেছে। সে গলাকাটা লাশটার দিকে ঝুঁকে এক উন্মাদের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল।
​“কীরে জানোয়ারের বাচ্চা? মারবি না আমাকে? ওঠ মার আমাকে‚ আয়। এসে মার এখন।
​কিন্তু ওপার থেকে আর কোনো উত্তর এলো না। গলা কাটা মুরগির মতো কয়েকবার ছটফট করে চিরকালের জন্য নিস্তেজ হয়ে গেল নরপশু মেয়র সাহেবের দেহ। ​রোহানে’র এই রুদ্ধশ্বাস ও ভয়ানক রূপ দেখে পুলিশ অফিসাররাও আর এক পা এগিয়ে আসার সাহস পেল না। রোহান যে সাইকোপ্যাথের মতো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে‚ তা রুমের পরিবেশেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

​মৌ আতঙ্কে শিউরে উঠে ভয়ে একদম গুটিয়ে গেল। সে উজান’কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের মুখ উজানে’র বুকের মাঝে লুকিয়ে ফেলল। এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরও আতঙ্কে পুরো চুপসে রইল।
​ঠিক তখনই দরজার দোরগোড়ায় তোলপাড় তুলে হুরমুড় করে ঘরে প্রবেশ করলো তন্ময় এবং ইফাত। রুমের ভেতরের করুণ দৃশ্য দেখেই ইফাত এক দৌড়ে গিয়ে এক কোণে জমে থাকা মেহের’কে পরম ভালোবাসায় নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এতক্ষণে যেন ইফাতে’র তপ্ত‚ অশান্ত বুকটা একটুখানি শান্ত ও শীতল হলো। সে থরথর করে কাঁপা হাতে পরম যত্নে মেহেরে’র ফর্সা গাল দুটো আঁকড়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে আওড়াল।

​“ফুলকন্যা ঠিক আছো তুমি? খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার? ওরা কি তোমার সাথে কোনো বাজে আচরণ করেছে‚ বল না লক্ষ্মটি? ওভাবে বোবার মতো চুপ করে আছো কেন?
​মেহের কম্পিত আঙুল দিয়ে রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভাই রোহানে’র দিকে ইশারা করল। ​ইফাত চোখ তুলে রোহানে’র দিকে তাকাতেই নিজের ভেতরেও একটা ঝাঁকুনি খেল। রোহানে’র পুরো শরীর রক্তে লুপলুপ করছে‚ মাথার একপাশ থেকে রক্ত গাল বেয়ে পড়ছে। ​রোহান এক হাতে রক্তাক্ত রামদা এবং অন্য হাতে কালো রিভলবারটা ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে অসংলগ্ন পায়ে এগোতে লাগল উজানে’র দিকে। কিন্তু তার বিষাদময় দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো উজানে’র বুকে লুকিয়ে থাকা মৌ’য়ের দিকে। ​সে করুণ‚ অসহায় ও আর্তস্বরে ফুঁপিয়ে উঠে বলল।
​“ফুল আমার হবি তুই? ট্রাস্ট মি‚ তুই যদি একবার শুধু আমার হয়ে যাস‚ আমি এই মুহূর্ত থেকে একদম ভালো হয়ে যাব। প্রমিস করছি সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে সারেন্ডার করব। তুই শুধু একটাবার ‘হ্যাঁ’ বল না‚ ফুল।
​মৌ উজানে’র বুকের ভেতর থেকে এক ঝটকায় মাথা তুলে তাকে পর পর দুটো থাপ্পড় বসিয়ে চরম ঘৃণায় বিকৃত মুখ নিয়ে চিৎকার করে উঠল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৫৯

​”তোমার একটুও লজ্জা করছে না এখনো এমন নোংরা কথা মুখে আনতে? সত্যি একটাবারও লজ্জা করে না তোমার? এত নোংরা আর নিকৃষ্ট কেন তুমি? এই মাথার খুলিতে একদম সোজাভাবে ঢুকিয়ে নাও‚ আমি কেবলই আমার এই প্রফেসর সাহেব উজান চৌধুরীর ছিলাম‚ আছি আর চিরকাল তাঁরই থাকব। তা ছাড়া তুমি আর যা-ই হও‚ আমার কাছে একটা খুনি ছাড়া কিচ্ছু নও‚ বুঝতে পেরেছো?
আচমকা রোহান উজানে’র কপাল বরাবর রিভেলভার….

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬১