সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৫
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
—’ রেহনুমা আরশাদ তিতির এবং ঈশান আরশাদ দেওয়ানে ডিভোর্সের নোটিস এটা । ম্যাডাম, কাইন্ডলি যদি একটু চেক করে নিতেন । ‘
উকিল সাহেবের কথাগুলো যেনো মাথার ওপর দিয়ে গেলো সবার। আচমকা সাত-সকালে এসে এরকম ডি’ভোর্সের নোটিশ, মানে কি! ঈশানের কেসটা নিয়ে এমনিতেই বাড়ির সকলের নাজেহাল অবস্থা। এরমধ্যে একেরপর এক ঝটকা যেনো লেগেই যাচ্ছে। রাহেলা, উকিলের হাত থেকে কাগজটা নিলেন নিজের হাতে। চোখ বুলিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। স্পষ্ট লেখা আছে সব। সন্দেহর অবকাশ নেই কোনো। ঈশান- তিতিরের বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ। বাড়ির সবাই এখানেই উপস্থিত। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসা। চন্দ্রা দেওয়ানও এসে উপস্থিত হয়েছেন। সোফায় তার কোলের ওপর মাথা রেখে তিতির শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। ক’দিন হলোই মেয়েটার মনের ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে! শরীর ভেঙে পরেছে একেবারে। উকিলের উচ্চারিত বাক্যখানা কানে আসতেই, চোখেমুখে রাজ্যের বিষ্ময় এনে উঠে বসেছে সে। দূর্বল গলাতেই ডাকলো শাশুড়ী কে।
—’ কিসের কাগজ, মামনী? নিয়ে এসো তো এদিকে। ‘
—’ আমি দেখছি। দাড়া, তেমন কিছু না।’
—’ আমি এখানেই বসা, মামনী। কানে কমও শুনি না। উনি যা বলেছেন, শুনেছি আমি। নিয়ে এসো কাগজখানা। হাতে দাও আমার৷। ‘
রাহেলার নড়াচড়া চোখে পরলো না। রাইসুল দেওয়ান’রা কেউ বাড়িতে নেই। ওনারা গতকালই ঢাকা গিয়েছেন। বাড়িতে পুরুষ বলতে নয়ন একাই আপাতত। সে-ও খাবার টেবিলেই বসা। তিতির এ বারে নিজেই কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালো। বিনাবাক্যে শাশুড়ীর হাত থেকে কাগজটা টেনে নিলো নিজের দিকে।৷ মাথা ভনভন করে উঠলো তার। পায়ের ভর ধরে রাখতে পারলো না। সোফায় বসে পরলো ধপ করে। স্পর্শ হরফে লেখা সবটা। নিচে কালো কালিতে সুন্দরমতো ঈশানের সাক্ষর। তিতির থমকে তাকিয়ে থাকে সেদিকটায়। কি হচ্ছে এসব। চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিলো মেয়েটা। খুব করে চাইছে,এটা একটা দুঃস্বপ্ন হোক। চোখ খোলা মাত্র নিজেকে আবিষ্কার করুন ঈশানের বুকে, নয়তো ঈশানের মাথা চেপে ধরা থাকুক তার নিজের ছটফট করা বুকে। কিছু একটা হোক। তবে সে-সব কিছু হলো না। বাস্তবতায় এই নিষ্ঠুর রুপ সহ্য হচ্ছে না তার। নিজেকে শক্ত করে উকিলের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,
—’ এ-সব কি? ঈশান আরশাদ এই মূহুর্তে জে’লে। তার দ্বারা এখন এই আবেদন করা সম্ভব নয়। আমি নিজেও করিনি। আজকাল কোর্ট কি ঠিক করে দিচ্ছে নাকি, কার সাথে কে, কতদিন সংসার করবে? ‘
উকিল সাহেব শীতল গলায় বললেন,
— ‘ এটার আবেদন আজ-কাল তো করা হয়নি, ম্যাডাম। গত তারিখে ঈশান আরশাদ দেওয়ান এটার আবেদন করে আসে। গতকাল আমি ওনার সাথে দেখা করতে গেলে, আমাকে এটা নিয়ে আপনার কাছে আসতে বলে। ‘
তিতির রুখে দাঁড়ালো তৎক্ষনাৎ। দৃঢ় গলায় বললো,
—’ আমি বিশ্বাস করি না। ‘
—’ সেটা আপনাদের ব্যাক্তিগত বিষয়। আমার যতটুকু দায়িত্ব সেটা আমি পালন করবো। আর ঈশান আরশাদের একটা চিঠি আছে। আপনার জন্য। যদি…’
—’ এতক্ষণে বলছেন কেনো। কোথায় সেটা? ‘
তিতির বড্ড ব্যাকুল স্বরে শুধালাো কথাটা। উকিল সাহেব নিজের এট্যাসি হাতড়ে সাদা একটা খাম তিতিরের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। থরথর করে হাত কাঁপছে মেয়েটার। কাগজখানার ভাজ খুললো সে। চিঠিতে তারিখটা চোখে পরলো সবার আগে। রঙিন কালিতে তারিখটা দেওয়া। তারিখটা দেখে বুকটা মুচড়ে উঠলো তার। এটা তো সেই তারিখ! ঈশান যেদিন সব ভুলে গভীরে টেনেছিলো তাকে, আর সে! স্বামীর কাছে সমর্পণ করেছিলো নিজেকে। বিলিয়ে দিয়েছিলো নিজের নারী’ত্ব। সেদিন লেখা চিঠিটা! তা কেনো হবে। ওই কটা দিন একসাথেই তো ছিলো তারা। সাত-পাঁচ ভাবার মাঝেই চিঠিতে নজর বুলালো সে। হাতের লেখাও পরিচিতই। যদিও ঈশানের হাতের লেখা খুব চোখ বুলিয়ে দেখার মতো ঘটনা এর আগে সেরকম ঘটেনি। তিতির নিজের ঝাপ্সা হয়ে আসা চোখটস হাতের উল্টো পিঠে ডলে নিলো, কাট হয়ে আসছে গলা। পানিতে গলা ভিজিয়ে নিতে পারলে বোধহয় শান্তি পেতো। তবে সে-সবেও মন নেই তার। থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতেটা একপাশ থেকে নিশি আগলে ধরতেই, জোরে জোরে শ্বাস টেনে কাগজে দৃষ্টি তাক করলো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
“ কাগজটা যেদিন হাতে পাবি, সেদিন সম্ভবত আমি সামনে থাকবনা। এবং থাকবনা বলেই লিখতে হচ্ছে। এরপর আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না। আমি চাই না। কিছুটা খারাপ যে লাগছে না, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, বাস্তবতা ভিন্ন। কিছু কিছু মানুষের ওপর কখনো জোর চলে না, সেটা মানিস তো? তোর এতদিনে বুঝে যাওয়া উচিত আমিও তাই। ঈশান আরশাদ এর ওপর জোর খাটিয়ে কিছু করানো অসম্ভব। তবুও, জোর খেটেছে আমার ওপর। দিদার, মা’র, বাবা-র, আমাদের গোটা পরিবারের। কিসের কথা বলছি বুঝে গেছিস হয়তো। আমাদের বিয়ে টা! আমি না তো তোকে কখনো ভালোবেসেছি, না তো বাসবো। তোকে বিয়ের করার একটা বিশাল কারণ ছিলো আমার। ইয়াজ মির্জা অবধি পৌছানো। আরও যদি কারণ বলিস! তাহলে বলবো পরিবারের জোরাজোরি, তোর অহংকার সবকিছুর জন্যই। তোকে নত করার, একপ্রকার জেদ চেপে গিয়েছিলো আমার। তবে হ্যা, এটাও স্বীকার করবো– তোকে হয়তো গভীরে কাছে টানা আমার উচিত হয়নি। তোর সম্মানে আঘাত লাগছে হয়তো। বাট আই হ্যাভ নো রিগ্রেট ফর দ্যাট। বিয়ে করেছিলাম, সুতরাং আমাদের মধ্যে যা হয়েছে স্বাভাবিক। বিয়ে হয়, একসাথে থাকতে হয়, মন উঠে গেলে বিচ্ছেদ ও হয়। সেখানে তুই তো আমার মনে কখনো ছিলিই না। তুই এখন অভিযোগ করবি। করতে পারিস। তবে তোকে সে রাতে একপ্রকার জেদের বশেই কাছে টেনেছিলাম। আত্মসমর্পণ করিয়েছিলাম। আমাদের যাত্রা এ অবধিই ছিলো । লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি, সই করে দিস। আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করিস না। আমি চাই না আমাদের আর দেখা হোক। গড ব্লেসড ইউ। ‘
এটার নিচেও গোটাগোটা ইংরেজি অক্ষরে ঈশানের সাক্ষর। তারিখ সব দেওয়া। নিরবধি ঝরতে থাকা কয়েকটা পানির ফোটা এসে ঠাঁই করো নিলো হিজিবিজি লেখা কাগজটার ওপরে। ওদিকে উকিল সাহেব আরও কিছু কথা লাগাতার আউরিয়ে যাচ্ছেন। ঈশান যে আর ফিরবে না, তিতিরের সাথে দেখা করতে চায়না, নিজের দোষ স্বীকার করেছে। হাবিজাবি আরও অনেক কিছু । তবে সে-সব কিছুই প্রায় আর তিতিরের কর্ণগোচর হচ্ছে না। বাড়ির মানুষের এতো উচ্চস্বরে কথা, আহাজারি কিছুই কানে শুনতে পাচ্ছে না সে। একহাতে ডিভোর্স লেটার অন্য হাতে ঈশানের লেখা চিঠিটা মুখের সামনে ধরে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। চোখ ঘোলা হয়ে এসেছে বারংবার। কান্নার তোড়ে লেখাগুলো আর চোখেই পরছে না। তিতিরের মাথায় শুধু ঘুরছে উকিল সাহেব আর এই চিঠির দু একটা লাইন। ঈশান তাকে কখনো ভালোবাসেনি! পরিবার জোর করে বিয়ে দেওয়ায় জেদের বসে এতদিন একসাথে ছিলো, দিদার জন্য অনবরত ভালোবাসার নাটক করে গিয়েছে! এমনকি তারা যে বৃষ্টিমুখর রাতে ঘ’নিষ্ঠ হয়েছে, তার পরের দিন তাকে জ্বরের ঘোরে ফেলে রেখে ঈশান আদতে ডি ভোর্স লেটার এর আবেদন করতে গিয়েছিলো। তিতির ধীরেসুস্থে সোফার ওপর বসলো। অপলক কাগজজোড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে নিঃশব্দ আর্তনাদ করে উঠলো–
—’ রাতভর আমাকে আ’দর এঁকে, পরের দিনই ডি’ভোর্স লেটার বানিয়ে ফেললেন? শুধু দে’হের চাহিদায় কাছে এসেছিলেন? জোর করে বিয়েটা হয়েছিলো, সেই জেদে? ছিহ্, এতো ঘৃনা নিয়ে, অতোটা গভীরে কিভাবে ছুঁ’লেন আমায়? কি করে আমার এত বড় সর্বনাশ করলেন নিজের পৌ রষ্যত্ব ফলাতে। দিনের পর দিন, বি ছানায় নিয়েছেন । স্ত্রী হিসেবে তাহলে কখনো কাছে টানেননি আমাকে, রক্ষি’তা হিসেবে টেনেছেন। ‘
নিঃশব্দ আ’র্তনাদ গুলো কর্ণগোচর হলো না কারোরই। তবে ভিতরে ভিতরে মেয়েটা যে ঠিক কতটা ভেঙেচুরে গিয়েছে, এই কাগজগুলো হাতে নেওয়া মাত্র– তা বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরি হওয়ার কথা নয় কারোরই। নিশি এগিয়ে গিয়ে উকিল সাহেবের সাথে কথা বলার ফাঁকে রাহেলা এগিয়ে এলেন শাশুড়ীর দিকে। হাঁটু ভেঙে তার সামনে বসো নিচু কন্ঠে বললেন,
—’ এরপরেও আমাকে শান্ত থাকতে বলবেন, মা? চুপ থাকতে বলবেন? এটা কি পে’টে ধরেছি আমি? ওর সব কৃতকর্মের ফল আজীবন অন্যরা ভোগ করবে কেনো? ‘
বৃদ্ধার মুখ বরফ শীতল। হাত দুখানা হুইল চেয়ারের চাকার ওপর শক্ত করে চেপে রাখা। শীডল গলাতে বললো,
—’ ছেলেকে অস্বীকার করবে তাহলে? ‘
—’ ওর বাবার মতো সেটা বলতে পারিনি বলেই তো, আজকে ওর জন্য আমার মেয়েটার চোখের পানি পরছে। ‘
—’ ঈশানের সাথে কথা হয়েছে তোমার? ‘
—’ এখনো অবধি নয়।’
—’ তাহলে আগেই হতাশ হচ্ছো কেনো? ‘
—’ কথা হয়নি বলেই তো হতাশ হচ্ছি। ওর সম্পর্কে একের পর এক, যা এলিগেশন সবাই দেখাচ্ছে। শুধু তিতির বলে সে-সব সহ্য করছে। আর কেউ করবে? করতো?’
—’ আমার নাতনি কে আমি চিনি,বউমা।’
—’ আর নাতিটাকে? ওকে কতটা?’
বৃদ্ধা অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকালো ছেলের বউয়ের দিকে। একনজর তিতিরকে দেখে,তারপর বললো,
—’ তিতির কে সামলাও গিয়ে। ‘
ঝরঝর করে কেঁদে যাচ্ছে তিতির। কাগজগুলো হাতের মুঠোতে চেপে চোখ বুঁজে আছে। গতদিনের দূর্বলতা এখনো কাটেনি। তার ওপর ধাক্কা তো কমছেই না। অসহায় দৃষ্টি আরেকদফা হাতের কাগজের ওপর দিতেই কিছু একটা নজরে আটকালো তিতিরের। চোখের ভুল কিংবা মনের ভুল, এসব ভাবাভাবির মধ্যেও থমকালো। অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠলো। দৃষ্টি বুলালো ঈশানের নামের সইয়ের ওপর। হুবহু এক হাতের লেখা, এক সাক্ষর, সে-সবে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু… সময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে আচমকা বাঁকা হাসলো তিতির। ভালোমতো নজর বুলালো কাগজে। অতঃপর আচমকাই প্রশ্ন ছুড়লো উকিল সাহেব কে লক্ষ করে। শান্ত গলায় বললো,
—’ কাগজগুলো কি আজকেই সাক্ষর করে দিতে হবে? ‘
নিশির সাথে কথা বলছিলো লোকটা। তিতিরের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের কেস যেদিন কোর্টে উঠবে, তার আগে জমা দিলেই হবে। ওইদিন কাগজটা কোর্টে শো করবো।’
—’ ঠিক আছে। আপনি আজকে আসুন। আমি যোগাযোগ করবো আপনার সাথে। সোমবারের আগেই। ‘
—’ সই করে কাগজটা পাঠিয়ে দিলেই হবে ম্যাডাম। আমার ঠিকানাটা…’
হাত উঁচিয়ে লোকটাকে থামিয়ে দিলো তিতির। শান্ত গলায় বললো,
—’ সই করবো তা কখন বললাম! সিদ্ধান্ত জানাবো বলেছি। আজকে আসুন। ‘
উকিল সাহেব কে একপ্রকার অপমান করেই বিদায় করে দেওয়া হলো। না তো তাকে বসতে বলা হলো, না তো সকালের নাস্তার আপ্যায়ন।
তবে তিতিরকে নিয়ে, বাকিরা হতভম্ব। কেউ কিছু বলার আগেই, তিতিরের মুখোমুখি হলো নয়ন। মুখ অন্ধকার করে,গম্ভীর গলাতে বলে উঠলো,
—’ এতো কিছুর পরও ভেবে দেখবো বলার মানে কি, মণি? ‘
তিতির সরু চোখে তাকালো। নিশি তেঁতো গলায় বলে উঠলো,
—’ এটা কি কথা ছোট ভাইয়া! ভেবে দেখার কিছু নেই?’
—’ নাহ। ভাইয়ার কাজকর্মগুলোর দায় কেনো তিতির নেবে। এসব কি হচ্ছে। ‘
রাহেলা গম্ভীর মুখে নয়নকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ তোমাদের ভাইকে এইটুকু চিনেছো, নয়ন? ‘
নিজেকে সামলালো ছেলেটা। মুখের আদল নরম হলো।
—’ না, বড় মামনী। সেটা নয়। আগের সব ঠিক ছিলো। মানলাম, কিন্তু আজকে? ডি’ভোর্স লেটার? তাও তারিখ দেখেছো? আজকের তৈরি নয় কাগজটা। আরও আগের। এসব ভাই আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিলো। চিঠি তেও লিখেছে জোর করে বিয়েটা দেওয়ায়…’
তিতির মুখোমুখিই ছিলো। কথা শেষ করতে দিলো না। বাক্যমাঝেই আঁটকে দিলো ছেলেটাকে।
—’ নয়ন ভাই, ডি’ভোর্স লেটার টা আমার জন্য। আমাকে ভাবতে দেওয়া উচিত। নয় কি? ‘
—’ মণি, আমি তো…’
—’ আমার ভালো চান। তাই তো?’
—’ কোনো সন্দেহ আছে? ‘
—’ নাহ নেই। তবে শুনে রাখুন, আমার ভালো আপনার ভাইয়ের নামের সাথে লেখা আছে। ওনাকে ছেড়ে ভালো থাকা টা আমার আর হবে না। আগের বিষয় অন্য রকম। এখন হিসেব পাল্টেছে। বিয়ে ছেলেখেলা নয়। চাইলেই কবুল বললাম, চাইলেই বিচ্ছেদ। এমনটা হয় না। আমি এক পুরুষের স্পর্শে বিশ্বাসী। কঠিন ভাবে বিশ্বাসী। একবার নিজেকে যার কাছে বিলিয়েছি, সে বাদে আর কারোর কথা কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয় আমার। ‘
—’ নারীঘটিত বিষয়টা?’
—’ আমি বিশ্বাস করি না। আর কতবার বলবো সেটা? ‘
—’ আজকের ডি’ভোর্স লেটার আর চিঠি? ‘
—’ আমার নজরে দেখলে, হয়তো চোখে পরতো অনেক কিছুই। আমার নজরে দেখেননি। তাই চোখেও পরেনি।’
নয়ন বিরক্ত হলো বোধহয়। কেমন একটা গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ তোর নজর যে ভালোবাসায় অন্ধ হয়নি। তার কি মানে? ‘
বাঁকা হাসলো তিতির। হাতের কাগজটা ফাইলের মধ্যে গুঁজতে গুঁজতে বললো,
—’ আবেগে গা ভাসানোর মতো মেয়ে আমি কোনো যুগেই ছিলাম না, নয়ন ভাই। আমি আমার আদরের মানুষদের কাছে যেমন ন্যাকা,আহ্লাদী হতে পারি। সঠিক সময় মন শক্ত করে বিপদ সামলাতেও জানি। আর রইলো বাকি একটা ঠুনকো কাগজের কথা? এটা নিশ্চয় খোদার তরফ থেকে ওহি নয়…ওহি হলে না হয় চোখ বুজে বিশ্বাস করা যেতো, মানা যেতো। তা যেহেতু নয়। আর এই উকিলকে কি বিশ্বাস? আমি মানুষটার মুখোমুখি হতে পারলাম না এখনো, আর এই চিঠি দেখে ডি’ভোর্স লেটারে সই করে দেবো! আশ্চর্য চিন্তা আপনাদের!’
নয়ন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তিতিরের এতো কঠিন রুপ সে কক্ষনো দেখেনি। বলাবাহুল্য বাড়ির সবারও একই অবস্থা। তিতির নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে রাহেলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—’ কাল আমরা ঢাকা যাবো, মামনী। ড্রাইভার আংকেল থাকলে আমি একাই যেতে পারবো। কিন্তু তাতে তোমার ছেলে রেগে যাবে। আমার সাথে কে যাবে, সঙ্গে চলো। ঘরে গেলাম আমি এখন। ‘
—’ ম্যাডাম ডিভোর্স লেটার পেয়েছে, স্যার। ‘
কথাটা বলা মাত্রই অমিত খেয়াল করলে, কথাটা না বললেও চলতো। ছোটখাটো কামড়ার গোটা একটা দেয়াল জুড়ে ছোট্ট ছোট্ট মনিটর সেট করা। বর্তমানে জুম করা রয়েছে ঈশান আরশাদের বেডরুমটা। ফাঁকা ঘর, ফ্যান চলছে শো শো করে।। ঈশান কাট কাট স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
—’ সই করেছে? ‘
পুরাই অমূলক প্রশ্ন। ঈশান নিজেই দেখতে পারছে সই করেছে কি-না। উল্টো অমিতেরই জানার কথা নয় বিষয়টা। অমিত তবুও ক্ষেপাতে চাইলো না ঈশানকে। বিনয়ের সাথে জবাব দিলো,
—’ সেটা তো এখনো খবর পাইনি। আপনি কেনো যোগাযোগ করছেন না। ‘
ঈশান রকিং চেয়ারটায় গা এলিয়ে আরাম করে বসে। টেবিলের ওপর থেকে ‘ ট্রেজারার ‘ এর প্যাকেট থেকে বের করে একটি সিগারেট। ঠোঁটের কোনে গুঁজে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, লাইটার জ্বালায়। সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে নাকেমুখে ধোঁয়া তুলে বলে,
—’ ইউ নো দ্যা রিজন। সবসময় চাইলেই মানুষ সবকিছু করতে পারে না। দামি কিছু পেতে, সবসময় দামি কিছুই বাজি রাখতে হয়। ‘
অমিত ভ্রু কুচকালো ঈশানের হাতের সিগারেটটি দেখে। মিহি গলায় শুধালো,
—’ সিগারেট ধরলেন কেনো? বাদ দিয়েছিলেন,স্যার। ‘
ঈশান হাতের “ট্রেজারারের” দিকে একনজর দিয়ে মলিন হাসলো, তারপর মনিটরে তাদের শূন্য বেডরুমের দিকে দৃষ্টি তাক করে, কেমন একটা অসহায় কন্ঠে বললো,
—’ এই মূহুর্তে আমার, সিগারেটের রিপ্লেসমেন্ট নেই, অমিত ।কে বলতে পারে, আমি যে খেলায় নেমেছি, সামনেও থাকবে না হয়তো । তিতির ডিভোর্স লেটারে সই করে দিলে, মেয়েটা আমার থেকে চির বিদায় নেবে। কোনো কিছুর বিনিময়েও, সেই মেয়ে আর আমার হবে না। তাহলে, মায়া কাটাতে শিখতে হবে তো নাকি? ‘
অমিত হেসে উঠলো না চাইতেও। দেয়ালের মনিটরের দিকে আগ্রহভরা দৃষ্টি বুলিয়ে বললো,
—’ ডি’ভোর্স টা হবে, স্যার? ‘
—’ কাগজে না হলো, তোমার ম্যাডামের যে রাগ-জেদ। শেষে দেখা যাবে সে-ই আসল কাগজ পাঠিয়ে বসে থাকবে।’
—’ তা হবে কেনো। এই কাগজটা তো আর আপনি পাঠান নি। ম্যাডামও তো বিশ্বাস করেনি। তাহলে?’
—’ এটাই তো সমস্যা। কাজল কে ইয়াজ মির্জার হাত থেকে সেভ করে, বের করতে চাইলে কয়েকটা দিন গা ঢাকা তো দিতেই হতো আমার। তা না হলে এতো কিছু তো ঘটতেই দিতাম না আমি। ‘
—’ আপনার বাড়ির সবার নাম্বার যে ট্র্যাক করেছে ইয়াজ মির্জা, সেটা কোনোভাবে ম্যাডাম কে জানানো যায় না? আমি লোক পাঠিয়ে ব্যবাস্থা করি? ‘
মলিন হাসলো ঈশান। তার বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের ফোন, ইন্টারনেট সব বহু আগে হ্যাক করে ফেলা হয়েছে। তার বেশ খাস একজনকে ইয়াজ মির্জা আটকে রেখেছে বিগত কয়েকদিন। মেয়েটার নাম কাজল। যে কি-না কোনো একদিন সাক্ষাৎ মৃ’ত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এনেছিলো দেওয়ান সাহেব কে । ইয়াজ মির্জার মতো লোকের থেকে একটা মেয়েকে, রক্ষা করতে হলে এইটুকুন স্যাক্রিফাইস করতেই হতো ঈশান কে। নিজেকে দূর্বল প্রমান করতেই হতো প্রতিপক্ষের সামনে। নত হতেই হতো। এই কয়েক কদম না পিছিয়ে আসলে, সুযোগ মতো থাবা টা বসাবে কি করে? তাছাড়া এই মূহুর্তে আরও একটা জিনিস দরকার ছিলো। তিতিরের তাকে ভুল বোঝাটা। ইয়াজ মির্জা ধীরে ধীরে ডেস্পারেট হচ্ছে মূলত এই জেদেই। কোনো কিছুর বিনিময়েও সে তিতিরকে ঈশানের প্রতি অবিশ্বাস জন্মাতে পারছে না। ভুলটা একপ্রকার ঈশানেরও ছিলো। কোনোভাবে যদি টের পেতো ইয়াজ মির্জার এই চাল, তাহলে অবশ্যই তিতিরকে এ কিছুটা হলেও জানাতে পারতো। তবে এই মূহুর্তে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করা দেওয়ান বাড়ির দিকে।
ঈশান গম্ভীর সুরে বললো,
—’ লোক পাঠাবে কেনো, অমিত? আমাকেই পাঠাও। বউ ছাড়া এতগুলো দিন। বুঝতে পারছো? সিগারেট কি সাধে ধরলাম? ‘
অমিত বিরবির করে বলে উঠলো,
—’ আমি কি করে বুঝবো এ যন্ত্রনা? আপনার কাজ করতে করতে তো এখনো বিয়েটাই করে উঠতে পারলাম না। ‘
—’ কিছু বললে? ‘
অমিত দাঁতে জিব কাটলো। ডানে বায়ে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললো,
—’ না তো, স্যার। কিচ্ছু বলিনি। ‘
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। হাতের সিগারেটটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে লাগাতার। অমিত আহত চোখে সেদিকে তাকিয়ে রয়। এতো দামের সিগারেট, মানুষটা খাচ্ছেও না। অযথা পুড়িয়ে ছাঁই করার মানে হয়! অমিত একবুক সাহস করে বলে উঠলো,
—’ স্যার, ম্যাডাম যে মানুষ। কোনোভাবে যদি জানতে পারে, আপনি আবার সিগারেট ধরেছেন– তাহলে…
ঈশান ভ্রু কুঁচকে, ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই মিয়িয়ে গেলো অমিত। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
—’ না মানে কি বলুন তো। এমনিতেই এখন যা করছেন, সোজা ডি’ভোর্স লেটার পৌছে গিয়েছে। ম্যাডাম অবিশ্বাস না করলো, কিন্তু রাগ কতটা হয়েছে তার। ভাবতে পারেন? এর মধ্যে এতদিন পর যদি, চু’মু খেতে গিয়ে এতো কড়া সিগারেটের ঘ্রান পায়। জন্ডিস থেকে বিষয়টা সোজা ক্যান্সারে গিয়ে দাঁড়াবে। ‘
ঈশান বিরক্ত মুখে তাকায়। টেবিলের ওপর থেকে “ট্রেজারারের “ প্যাকেট টা অমিতের দিকে ছুঁড়ে দিতে দিতে বললো,
—’ এতো তেল মারছো কেনো? না-ও। সিগারেট টা চাই বললেই পারো। ‘
অমিত ক্যাচ ধরলো তৎক্ষণাৎ। এতো দামি সিগারেটের প্যাকেট আজকে প্রথম ছুঁতে পারলো। বিরবির করে বললো,
—’ তেল না স্যার। আপনি যে সিগারেট খান। এই কম্পানির ঝাড়ুদারের সমানও আমার বেতন না। আপনার হাতের ওই এক প্যাকেটের দাম যত, তা দিয়ে আমার তো গোটা জীবনের সিগারেট হয়ে যাবে।’
—’ শাট আপ। ‘
—’ ব্যাবস্থা করবো, স্যার? ‘
—’ কিসের? ‘
—’ আপনার আর ম্যাডামের দেখা করার। ‘
ঈশান মুখটা তেঁতো করে হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেললো। বিরক্ত গলায় বললো,
—’ কিভাবে? নিজের বাড়িতে জানালা গলিয়ে ঢুকবো? চোরের মতোন? ‘
অমিত দু কদম পিছিয়ে দাঁড়ালো। ঈশানের হাতের কাছে কোনো পি’স্তল বা কোনো অস্ত্র আছে কি-না, ঘাড় উচিয়ে সেটা পরখ করে বাঁকা গলায় বলে উঠলো,
—’ ক্ষতি কি, স্যার? গিয়ে যদি এহেম এহেম… মানে বা’সর টা করতে পারেন। চোর কেনো! ভিখিরি সেজে গেলেও তো আমি কোনো লস দেখি না। ‘
অমিত কথাটা বলেই হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে গেলো। হাতের সিগারেটের প্যাকেট টা পকেটে গুঁজলো। এরকম বেফাঁস কথা বলে ফেলায়, ঈশান কি আবার প্যাকেট টা কেড়ে নেবে নাকি! তবে সে-সব কিচ্ছু হলো না।।না তো ঈশান রাগলো, না তো কোনো চোটপাট করলো। উল্টো, অমিতকে অবাক করে দিয়ে বড্ড নরম হলো। শক্ত করে রাখা চোয়াল স্বাভাবিক করে বললো,
—’ ভুল বলোনি, অমিত। যাওয়া দরকার। এতদিন যেমন তেমন। আজকে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে। বউকে কাছে না পেলে শান্তি পাচ্ছি না। তার মধ্যে আরেকটা ভয় তো মনে ঢুকেই রইলো। রাগের মাথায় মেয়েটা কাগজে সই করে না ফেললে হয়। ‘
—’ স্যার, তাহলে ওটাই হোক। চলুন যাই। ভিখারি সেজে ঢুকবো। বলবো কয়েকদিনের অভুক্ত। আমি খেতে বসবো, ওদিক দিয়ে আপনি আপনার ঘরে যাবেন। বয়স্ক মানুষ সেজে যাবো যখন, খেতে তো ঘন্টাখানেক লাগবেই।
আপনার ঘন্টাখানেক এ হবে না, স্যার??? ‘
ঈশান বিরক্ত মুখে দাঁতে দাঁত পিষলো।।কি সব ছেলেমানুষী পরিকল্পনায় হ্যা হু করে যাচ্ছে। বিরস মুখে ধমকে উঠলো,
—’ এক ঘন্টায় তোমার মাথা হবে হবে, এতদিন পর যাবো। চু”মুতেই তো ঘন্টা পেরিয়ে যাবে! ‘
হা হয়ে এলো অমিতের মুখ। অবিবাহিত, চির ব্যাচেলর সে। চু’মুর সময় ঘন্টা খানেক! আশ্চর্য গলায় কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ধমক লাগালো ঈশান। হাতের ইশারায় বেড়িয়ে যেতে বললো রুম থেকে। বউয়ের শোকে কি সব বলে যাচ্ছে! অমিত মুখ চেপে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই, দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের স্ক্রিনে চোখ রাখলো ঈশান। মেয়েটা সবে ঘরে এসে ঢুকলো। হাতের ফাইল খানা একপ্রকার ছুঁড়ে দিলো একদিকে। দু’হাতে মুখটা ঢেকে গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। ঈশান ভীষন মন দিয়ে দেখে তার ব্যাক্তিগত নারীটিকে। এই কয়দিনে মেয়েটার ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে! অমিত নেহাৎ ভুল কিছু বলেনি। খুব করে কাছে দরকার মেয়েটাকে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা, বুকের এই আগুন টা নেভাতে ওই ক্রন্দনরত রমনীকে লাগবে তার। ঈশান উঠে এগিয়ে গেলো মনিটরের দিকে। হাত ছুঁয়িয়ে দিলো স্ক্রিনে। মুচকি হাসলো। ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো তিতিরের অবয়বের ওপর। আদুরে গলায় বললো,
—‘ খুব কষ্ট দিয়ে ফেললাম,তাই না? এতোটা ভালো কবে বেসে ফেললি, তিতির? আমি তো নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবান পুরুষ বলতে শুরু করেছি। গোটা দুনিয়ার সামনে বুক ফুলিয়ে বলবো, আমার মতো স্ত্রী ভাগ্য আর ক’জনেরর আছে? পারলে দেখাক কেউ! একজন স্বামীর বিরুদ্ধে ধ’র্ষনের অভিযোগ, নারী নি’র্যাতনের অভিযোগ, অন্য নারীর গর্ভে সেই স্বামীর সন্তান। সব শুনেও, প্রমান সহ দেখেও একটা বর্ণ বিশ্বাস করলি না? আজকে ডি’ভোর্স লেটার টা তো মানতে পারতি। সেটা কেনো বিশ্বাস করলি না? আমাকে গোটাটা আত্মস্থ করে ফেলেছিস তুই?
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৪ (২)
আমি আমাকে যতটা না চিনি, তার থেকে গভীরে তুই চিনেছিস, জেনেছিস। সারারাত নামাজে বসে ক্রমাগত আমার বিপদ কেটে যাওয়ার প্রার্থনা করে যাস। এতোটা ভাগ্য নিয়ে আমি দুনিয়াতে এসেছিলাম! খোদা আমার প্রতি এতোটা রহমত নাজিল করেছে! আমি এর প্রতিদান তোকে কি করে দেবো? ঠিক কতটা ভালোবাসা দিলে, তোর ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসার মূল্য দিতে পারবো? হুম?’
