Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬২

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬২

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬২
বন্যা সিকদার

“কাঁদছিস কেন পাগলি? তুই-ই তো একটু আগে নিজের মুখে বললি না। তোর জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যেতে? তাই তো আজ চিরকালের জন্য মুক্তি দিলাম তোকে। তুই অনেক সুখে থাকবি‚ বুঝলি? অনেক খুশি থাক এবার একদম কাঁদবি না আমার জন্য। রোহান তো তোদের দুজনের ভালোবাসার পথের কাঁটা ছিল। এই পাপিষ্ঠ পুরুষ রোহান তালুকদার আজ নিজ হাতে তোকে সেই কাঁটা থেকে চিরকালের মতো মুক্তি দিয়ে গেল।
“আমি চাইনি এমনটা। প্রফেসর সাহেব ভাইয়াকে হসপিটালে নিয়ে চলুন। ভাইয়া তুমি কোথাও যাবে না। আমি যেতে দেবো না তোমায়।

মৌ’য়ের এমন আকুল কান্নাকাটি আর অনুনয়-বিনয় শুনে রক্তে ভেজা ঠোঁট দুটো বাঁকিয়ে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল রোহান। যে মেয়েটার জীবনে একটু আশ্রয় আর অনুভূতির জন্য সে বছরের পর বছর নিজের ভেতরের সব শখ বিসর্জন দিল‚ আজ সেই মেয়েটিই কপাল চাপড়ে তার জন্য প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। অথচ রোহান তো খুব ভালো করেই জানে‚ এই ফুলকে নিজের করে না পাওয়ার তিল তিল যন্ত্রণার চেয়ে নিজের বুকের ভেতর বুলেটের ফালা ঢুকিয়ে চিরদিনের জন্য শান্ত হওয়া অনেক সহজ। ​রোহানে’র গরম ও লালচে রক্তে মৌ’য়ের পুরো হাত ও ওড়নার আঁচল মাখামাখি হয়ে গেছে। তার হাত দুটি থরথর করে কাঁপছে‚ চোখের কোণ বেয়ে অবিন্যস্ত ভাবে জলের ফোঁটা ঝরে পড়ছে রোহানে’র গালে। ​শুধু মৌ বা মেহের নয়‚ আজ উজান চৌধুরীর চোখ দুটোও শ্রাবণের জলের মতো ছলছল করে উঠল। সে তো চেয়েছিল নিজের বন্ধুটাকে এই অন্ধকারের নরক থেকে টেনে বের করে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে‚ এক সাথে আবার পথ চলতে…কিন্তু ছেলেটা যে তার ফুলকে পাবে না বলে এত বড় পৈশাচিক ও আত্মঘাতী মুক্তির পথ বেছে নেবে‚ তা উজান স্বপ্নেও ভাবেনি। ​উজান হাঁটু মুড়ে রোহানে’র পাশে বসে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। সে কান্নায় রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল।

​“এটা তুই কেন করলি‚ রোহান?? তোকে একটু আগেই তো বললাম‚ তোর ফুলকে আজ থেকেই তোর করে দেব। তবুও কেন এমন পাগলামি করতে গেলি? একটাবারও নিজের বোনটার কথা‚ আমাদের কারও কথা ভাবলি না তুই?
​রোহান থরথর করে কাঁপা‚ রক্তমাখা হাতটা অনেক কষ্টে উঁচিয়ে উজানে’র গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। ঝাপসা চোখ দুটো উজানে’র ওপর স্থির রেখে এক বিষাদময় প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
​“তুই খুশি হসনি‚ উজান? আমি তো তোদের দুজনের ভালোবাসার পথ থেকে‚ তোদের জীবন থেকে চিরকালের মতো অনেক দূরে হারিয়ে যাচ্ছি…তবে আজ তুই কেন কাঁদছিস‚ ভাই?? একটু হাস না‚ তোর মুখের ওই চিরচেনা তৃপ্তির হাসিটা যে আজ শেষবারের মতো দেখতে ইচ্ছে করছে আমার।
​উজান আর কিছু বলার মতো ন্যূনতম মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর হাজারটা আগ্নেয় গিরির দহন একসাথে ফেটে বের হতে চাইছে। জীবনের কঠিন থেকে কঠিনতম বিপদেও যে উজান চৌধুরী কোনোদিন এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি‚ আজ নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে চোখের সামনে না ফেরার দেশে চলে যেতে দেখে তার বুকের কলিজাটা যেন ছিঁড়ে ছাতু হয়ে যাচ্ছে। ​হঠাৎই উজান নিজেকে সামলে নিয়ে উন্মাদের মতো চিৎকার দিয়ে উঠল।

​“তন্ময়‚ গাড়ি বের কর ফাস্ট। এক সেকেন্ড ওয়েট করবি না‚ জলদি গাড়ি স্টার্ট দে। রোহানকে এখনই হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।
​তন্ময় আর উজান দুজনেই ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে রোহান’কে কোলে তুলে নিতে চাইল। কিন্তু রোহান নিজের রক্ত ভেজা হাত দুটো দিয়ে দুপাশ থেকে উজান আর তন্ময়ে’র হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আটকে দিল। ​সে অত্যন্ত বিষণ্ণ ও কম্পিত কণ্ঠে ফুঁপিয়ে উঠে বলল‚

​“কোথাও যেতে হবে না তোদের। আমি বাঁচার জন্য নিজ কপালে বন্দুক ঠেকায়ে ট্রিগার চাপিনি। এমনিতেও হসপিটালের আইসিইউ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই এই রোহান তালুকদার তোদের ছেড়ে অনেক অনেক দূরে চলে যাবে…জীবনের এই শেষ মুহূর্ত গুলো অন্তত একটুখানি তোদের সাথে কাটাতে দে ভাই উজান…তুই আমার এই অবুঝ ফুলকে কান্না থামাতে বল না? ও তো একটু আগেই কত ঘৃণা নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল‚ আমার লাশ দেখেও নাকি ও জীবনে এক ফোঁটাও অশ্রু ফেলবে না। তবে আজ এখন কেন এই পাপিষ্ঠ‚ নিচ পুরুষের জন্য নিজের মহামূল্যবান চোখ দুটো জলে ভাসাচ্ছে সে‚ বলতো?
রোহানে’র প্রতিটি কথা মৌয়ে’র বুকের ভেতর যেন ধারালো ছুরির মতো গিয়ে বিঁধল। তার কান্নার বেগ বহুগুণ বেড়ে গেল। সে আজ চিৎকার দিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। রোহান তার ফুল’কে এভাবে নিজের জন্য ছটফট করে কাঁদতে দেখে রক্তমাখা ঠোঁটে মুচকি হাসল। তার ভাবনা সত্যিই পুরো ভুল ছিল‚ মেয়েটা তাকে ঘৃণা করলেও তার জন্য এই মায়ার কান্না মিথ্যা নয়। মৌ কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলল। সে অবরুদ্ধ কণ্ঠে আকুতি করল।

​”রোহান ভাইয়া‚ প্লিজ এমন করো না। তোমাকে আমরা কেউ হারাতে চাই না‚ প্লিজ চোখ খোলো।
​রোহান আর মৌ’য়ের দিকে তাকাল না‚ সে অনেক কষ্টে নিজের ঝাপসা দৃষ্টি উজানে’র দিকে ফেরাল। অতি কষ্টে শ্বাস টেনে ফিসফিসিয়ে বলল‚
​“উজান…আমার ফুল’কে সারাজীবন ভালোবেসে আগলে রাখিস ভাই। কখনো এক ফোঁটা চোখের জল ফেলতে দিস না আমার এই অবুঝ ফুলটাকে…খুব ভালোবাসি তোকে‚ ফুল!
​মৌ সহ্য করতে না পেরে ব্যাকুল হয়ে উজানে’র দিকে ঘুরে বলল—
“প্রফেসর সাহেব। নিয়ে চলুন না রোহান ভাইয়াকে হসপিটালে? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে‚ কেন বুঝতে পারছেন না আপনি?

​রোহান তার নিভে আসা শক্তির অবশিষ্টাংশ দিয়ে নিজের রক্তে মাখামাখি হাতটা বাড়িয়ে মৌ’য়ের কাঁপা হাতটা জড়িয়ে ধরল। নিজের রক্তভেজা ঠোঁট দুটো মৌ’য়ের হাতের ভাঁজে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। শেষ বারের মতো নিজের ভালোবাসার পরশটুকু এঁকে দিল সে। আর কোনোদিন এই মায়াবী মেয়েটাকে দু-চোখ ভরে দেখতে পারবে না সে‚ আর কোনোদিন ‘ফুল’ বলে ডাকতে পারবে না। জীবন প্রদীপের শেষ আলোটুকু নিভে আসার আগেই সে পরম আবেশে চোখ দুটো চিরকালের জন্য বুজে নিল। বিষাদময় কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে শেষ বারের মতো আওড়াল…
“কবুল‚ কবুল‚ কবুল। আমার না হওয়া ফুল’কে তিন কবুল। ভালোবাসার কবুল। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসেও রোহান তালুকদার শুধু তোকেই ভালোবাসে‚ ফুল। বিদায়‚ আমার না হওয়া মহারানী।
​মৌ দিশেহারা ও অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রোহানে’র যন্ত্রণাদগ্ধ কণ্ঠ থেকে এবার পরম শান্ত এক সুর ভেসে এলো—

​“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…!!
​কালেমা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রোহানে’র চোখ থেকে দু-ফোঁটা গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ে মৌ’য়ের কোলে মিশে গেল। আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই মৌ’য়ের কোলেই শান্ত ভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল রোহান তালুকদার। ​আর কোনো শব্দ এলো না তার থেকে‚ আর কোনো স্পন্দন রইল না সেই বুকটায়। ​মৌ চিৎকার দিয়ে উঠল।
​”রোহান ভাইয়া প্লিজ ফিরে এসো‚ এভাবে কোথায় চলে যাচ্ছ আমাকে ছেড়ে? ভাইয়া!
​পুরো রুম জুড়ে তখন স্বজন হারানোর এক করুণ কান্নার রোল পড়ে গেল। ঠিক তখনই বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের বিকট শব্দ পাওয়া গেল। প্যারামেডিকসরা দ্রুত রুমে ঢুকে রক্তে ভেসে যাওয়া রোহানে’র নিথর দেহখানা একটা স্ট্রেচারে তুলে নিতে চাইল। মৌ উন্মাদের মতো রোহান’কে আঁকড়ে ধরে রইল‚ ছাড়তে চাইল না তাকে। কিন্তু নিদারুণ সত্যকে ধরে রাখার আর কোনো উপায় ছিল না। উজান পরম মমতায় মৌ’কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে সামলে নিল‚ ভালোবাসায় নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রাখল তাকে। ​রোহানে’র নিথর দেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। মৌ আর উজানও তার সাথে অ্যাম্বুলেন্সে উঠল। পুরোটা পথ মৌ রোহানে’র লাশের পাশে বসে রইল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটার ধমনীতে উত্তপ্ত রক্ত প্রবহমান ছিল‚ যার নাম ছিল রোহান তালুকদার—সে এখন নিথর লাশ। ছেলেটা আজ সব অভিমান মিটিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের কাছেই চলে গেল‚ আর কোনোদিন ফিরে আসবে না কোনো দাবি নিয়ে।
​মৌ রক্তে মাখা রোহানে’র বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“আমাকে লাল শাড়ি পড়িয়ে ঘরে তুলতে পারলে বলে নিজেই সাদা কাফনে জরিয়ে গেলে। এতো অভিমান আমার উপর।
​উজান মৌ’য়ের এই বুকভাঙা আকুতি শুনে একদম স্তব্ধ হয়ে রইল। মেয়েটা আজ যে মানসিক ধাক্কা পেয়েছে‚ তাতে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা উজানে’র জানা নেই। সে নীরব দর্শক হয়ে কেবল মৌ’কে কাঁদতেই দিল‚ যেন চোখের জলের সাথে তার ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। ​প্রায় ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছাল চৌধুরী বাড়িতে। খবর পেয়ে গ্রাম থেকে ইতিমধ্যেই এসে পৌঁছেছে মৌ’য়ের পুরো পরিবার। ​মেঝেতে শায়িত রোহানে’র নিথর লাশের সামনে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন মৌ’য়ের বাবা। তিনি বারবার ছেলেটার চরণ ধরে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলেন। বিষাদ আর অনুশোচনায় আজ তিনি চরম অনুতপ্ত। সেদিন যদি তিনি রোহান’কে ওই মিথ্যা আশাটা না দিতেন‚ তবে হয়তো আজ এত রক্তক্ষরণ হতো না। এই তরতাজা প্রাণটা এভাবে অকালে ঝরে যেত না। ​এক নিমেষেই হারিয়ে গেল একটা তাজা প্রাণ।

যে ছেলেটা এত গুলো বছর পর দেশে ফিরেছিল নিজের ভালোবাসার ‘ফুল’কে রাজরানীর মতো বউ করে ঘরে তুলবে বলে। নিয়তি আজ তাকে এক নতুন, চিরশান্তির ঠিকানায় টেনে নিয়ে গেল।
রোহানে’র লাশের সামনে বিষাদময় স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে ছিল উজান। হঠাৎই তার নজর গেল রোহানে’র রক্তাক্ত গলার দিকে‚ সেখানে ঝুলছিল একটি লকেট। উজান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে অতি সতর্কতায় লকেটটি খুলে নিল। লকেটের ছোট ঢাকনাটা খুলতেই উজানে’র চোখ দুটো থমকে গেল। পরম স্নেহে আঁকা ছোট্ট‚ অবুঝ মৌ’য়ের হাস্যোজ্জ্বল একখানা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি শোভা পাচ্ছে সেখানে। মুহূর্তের জন্য উজানে’র বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিজের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে অতি গোপনে লকেটটি নিজের পকেটে গুঁজে রেখে দিল। ​

এরপর মৌ’য়ের ইচ্ছেতে রোহান’কে চৌধুরী বাড়ির ওই সুবিশাল বাগানের একপাশে দাফন করা হবে। যে মানুষটা বেঁচে থাকতে কোনো ভালোবাসার মূল্য পেল না‚ অন্ততঃ চিরনিদ্রায় শায়িত থাকা অবস্থায় মৌ তাকে পরম মমতায় যত্ন করতে চায়‚ রোজ নিজের হাতে পরিচর্যা করতে চায় তার কবরের।
​রোহান’কে শেষ গোসল করানোর ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু কাফনের কাপড় পরানোর সময় উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। রোহানে’র চওড়া বুকের বাম পাশে কোনো জলন্ত ধাতব পদার্থ দিয়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে “মৌ” বুকের চামড়া পুড়িয়ে ভালোবাসার এই চরম পাগলামি দেখে সবার কপালেই চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এই অপরাধী ছেলেটা তার অবুঝ ‘ফুল’কে ঠিক কতটা বিকার গ্রস্তের মতো ভালোবেসেছিল‚তা ভেবে সবাই ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। ​অতঃপর শেষ বারের মতো মৌ’কে দেখানোর জন্য রোহানে’র নিথর দেহখানা বাড়ির উঠানে আনা হলো। কিন্তু ধবধবে সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো রোহানে’র মুখখানা দেখা মাত্রই মৌ যন্ত্রণায় কয়েক বার জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল। বাস্তবতার এই রূঢ় আঘাত সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। রোহান’কে বিদায় জানাতে শেষমেশ কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। ​মেহেরে’র বুকে মুখ গুঁজে জ্ঞানহীন অবস্থায় পড়ে রইল মৌ। আর মেহের ডুকরে ডুকরে কেঁদে চলেছে। সামান্য এক ভুল আর একতরফা ভালোবাসার চরম মাশুল হিসেবে এত অল্প বয়সে একটা তরতাজা প্রাণ ঝরে গেল। চিরকালের জন্য না ফেরার দেশে হারিয়ে গেল রোহান তালুকদার নামের ছেলেটি।

গভীর রাত। ​নিঝুম অন্ধকারে পুরো চৌধুরী বাড়ি নিস্তব্ধতায় তলিয়ে গেছে। মৌ একা নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে বাগানের এক কোণে রোহানে’র কবরের দিকে তাকিয়ে আছে। চারিদিক থেকে শো-শো করে ঠাণ্ডা বাতাস এসে আঁচড়ে পড়ছে তার চেহারায়‚ অবিন্যস্ত চুল গুলো বাতাসে উড়ছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না‚ এতগুলো বছর ধরে ভাই বলে ডাকা লোকটা‚ তাকে পাওয়ার জন্য পাগলামি করা রোহান আজ ধূলিমলিন মাটির নিচে একা শুয়ে আছে!
​হঠাৎই মৌ’য়ের খুব কাছে কারো পরিচিত উষ্ণ উপস্থিতি টের পাওয়া গেল। মৌ ঘাড় বাকিয়ে না তাকিয়েও বুঝতে পারল পেছনে উজান এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও সে নির্জীব‚ স্থির দৃষ্টিতেই কবরের দিকে তাকিয়ে রইল। ​উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে মৌ’কে ওই ঠাণ্ডা বাতাসে কাঁদতে দিল না। হুট করেই সে ঝড়ের বেগে মৌ’কে নিজের দু-বাহুতে তুলে নিয়ে সোজা রুমের ভেতরে চলে এলো। মৌ কোনো প্রতিবাদ করার সুযোগ পেল না‚ আর আজ প্রতিবাদ করার মতো শক্তিও তার অবশিষ্ট ছিল না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এক ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটার শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ​উজান পরম মমতায় মৌ’কে নিয়ে নরম বিছানায় বসিয়ে দিল। এরপর রুমের সমস্ত লাইট নিভিয়ে দিয়ে মৌ’কে পরম ভালোবাসায় নিজের বুকের খাঁজে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আলতো হাতে তার মাথায় বুলাতে লাগল। মৌ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না‚ বরের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে অঝোর ধারায় কেঁদে উঠে ভিজিয়ে দিতে লাগল উজানে’র টি শার্ট। উজান তাকে এক ফোঁটাও বারণ করল না‚ নীরবে সব সয়ে নিল। ​মৌ আকুল হয়ে কান্নায় অবরুদ্ধ গলায় নিজেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

​”প্রফেসর সাহেব…রোহান ভাইকে আমিই নিজ হাতে মেরে ফেললাম‚ তাই না? ভাইয়ার এই মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। আমার মতো তো ভাইয়া এত তাড়াতাড়ি এত দূরে চলে গেল।
​উজান অন্ধকারেই শীতল‚ গভীর দৃষ্টিতে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরম মায়ায় মৌ’য়ের চোখের জল মুছে দিয়ে তার কপালে নিজের ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া আঁকল। ফিসফিস করে বলল‚
​“উঁহু পিচ্চি। তুমি একদম ভুল ভাবছ। তুমি কোনো ভাবেই রোহান’কে মারোনি।
​”তাহলে কেন এভাবে হুট করে চলে গেল সে? আমার কারণেই তো ও জীবনের এত বড় বড় অপরাধগুলো করল‚ আমার জন্যই তো শেষ হয়ে গেল।
​উজান খুব শান্ত গলায় বউকে বোঝাতে শুরু করল।
“সেটাও নয়‚ পিচ্চি। রোহান’কে এখন এই পৃথিবীর চেয়ে ওপরের ওই দুনিয়ায় ওর বাবা-মায়ের বেশি প্রয়োজন ছিল‚ তাই সে সেখানে চলে গিয়েছে। জন্ম আর মৃত্যুর সমস্ত হিসাব আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই লিখে রাখেন। আমরা মানুষ হিসেবে কেবল মাঝখান থেকে অহেতুক নিজেদের দোষী ভেবে কষ্ট পাই।
​কিন্তু মৌ’য়ের ছটফট করা ব্যাকুল বুক কিছুতেই শান্ত হতে চাইল না। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল‚
“সব মিথ্যা কথা। রোহান ভাইয়া শুধু আমার জন্য‚ আমাকে না পাওয়ার আক্ষেপে তিল তিল করে শেষ হয়ে হারিয়ে গেল। আমাকে একবার অন্তত মন খুলে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও দিল না…কত শত অভিযোগ ছিল তার আমার প্রতি।

​“এসব কিচ্ছু না‚ পিচ্চি। প্লিজ মনকে শান্ত করো।
উজান নরম স্বরে আকুতি জানাল। ​কিন্তু মৌ কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিল না। বারবার নিজেকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ধিক্কার দিচ্ছিল। উজান বুঝতে পারল‚ এই মুহূর্তে মেয়েটার মানসিক বিশ্রামের ভীষণ প্রয়োজন কিন্তু এই অস্বাভাবিক অবস্থায় কোনো ভাবেই সে নিজে থেকে ঘুমাতে পারবে না। ​উজান আলতো করে মৌ’কে পাশে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এক গ্লাস পানির সাথে ঘুমের মেডিসিন ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে এলো। মৌ প্রথমে বিষাদে পানি খেতে না চাইলেও উজান কড়া হয়ে তাকে বাধ্য করল পুরোটা খেতে। ​পানিটুকু খাওয়ার পর উজান আবারো মৌ’কে পরম যত্নে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। ধীর গতিতে তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল সে। ওষুধের প্রভাবে কিছু সময় যেতে না যেতেই মৌ ধীরে ধীরে গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬১

​উজান অন্ধকারে এক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত অবুঝ বউটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এখন না হয় ওষুধ খাইয়ে মেয়েটাকে কিছুটা সময়ের জন্য শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে দিল কিন্তু কাল সকালে যখন সূর্য উঠবে‚ তখন কী হবে? মেয়েটা কি সত্যি আর কখনো নিজের স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে ফিরে আসতে পারবে? নাকি আজীবন এই অপরাধবোধের বোঝা বয়ে নিজেকেই রোহানে’র খুনি ভেবে তিল তিল করে শেষ করবে? ​আর কিছু ভেবে উঠতে পারছে না উজান। রোহান’কে চিরদিনের জন্য হারানোর পর আজ মৌ’য়ের মানসিক অবস্থা দেখে উজানে’র নিজের বুকটাও এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল। তবুও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকেই যে সবকিছু শক্ত হাতে সামলাতে হবে।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬৩