Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৩

আমার আলাদিন পর্ব ৬৩

আমার আলাদিন পর্ব ৬৩
জাবিন ফোরকান

ক্লাবের পাশে পার্কিং লট। মাঝারি আকৃতির আধুনিক ডিজাইনের গ্যারাজের ভেতরটা আধো আলো আধো ছায়ায় পরিবেষ্টিত। কোনো মানুষ নেই, সকলেই ক্লাবের ভেতরে। সাইবান অরণ্যকে টেনে নিয়ে গেল সেখানে। অরণ্য যে গাড়িতে করে এসেছে সেটাও এখানে পার্ক করে রাখা আছে। কালো রঙের মার্সিডিজ। সেই গাড়ির সামনে থেমে দাঁড়াল সাইবান। অরণ্যর হাতটা ছেড়ে দিল। অতঃপর অতর্কিতে উল্টো ঘুরে মোক্ষম এক ঘুষি বসিয়ে দিল অরণ্যর চোয়ালে। হঠাৎ আক্রমণ আশা করেনি অরণ্য। ঘুষির জোরে সে ছিটকে গিয়ে ধাক্কা খেল গাড়ির দরজায়। দাঁতে লেগে ঠোঁট কে*টে গেল, মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ পেল সে। সাইবান একদম স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয়নি। দুহাতে ভেজা চুল এলোমেলো করে সে ঠোঁটে জিভ চালিয়ে অরণ্যকে দেখল। হাসল হালকা,

“কেঁদেকেটে জজ সাহেবাকে বিচার দিস। বলিস, আলাদিন আমাকে মেরেছে, ভ্যাঅ্যাঅ্যা!”
বাচ্চাদের মতন ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নার ভং ধরল সাইবান। তার এমন ব্যাঙ্গে অরণ্য অপমানিত বোধ করার থেকে বেশি বিনোদন অনুভব করল। বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা এক বিন্দু র*ক্ত মুছে নিয়ে তীর্যক হাসল।
“কাজী অফিসে বিয়ে পড়ানো হয় জানতাম। এখন দেখছি বক্সিং ম্যাচও হয়।”
“আয় তবে বক্সিং শেষে বাসর করি। মন ভরে দেখিস যা যা দেখার, চোরের মতন লুকিয়ে নজর দিতে হবে না আর।”
অরণ্য কাঁধ নাড়িয়ে ঘাড় একবার এদিক আরেকবার ওদিক করল। বুঝি মাংসপেশীর সঞ্চালন ঠিকঠাক করে নিল। তারপর প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টিতে দেখল সাইবানকে।
“তোকে দেখি না। দেখি তোর ভাগ্যকে।”
“এজন্যই তো বলি। আজকাল ভাগ্যটা এমন চ্যালচেলিয়ে চাঙ্গে উঠছে কেন! শকুনের নজর লেগেছে বলে কথা!”

এবার শব্দ করে হাসল অরণ্য। নিজের গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সাইবানকে। রগচটে, বাউন্ডুলে এবং বেপরোয়া এক অস্তিত্ব। সামান্যতম ভয় নেই, নেই পরিণতির চিন্তা। গুরুতর মুহূর্তও তার কাছে বিনোদন। এমন কাউকে আগে কখনো মোকাবেলা করেনি অরণ্য। তাই এই খেলাটা তার কাছে জমজমাট লাগছে। নিজের উপর অরণ্যর কুটিল দৃষ্টি সহ্য হলোনা সাইবানের।
“ভালোয় ভালোয় বলছি শুনে রাখ, তুই যদি ভেবে থাকিস আবার একটা সিনক্রিয়েট করে আমাকে কোর্টে ফাঁসানোর চেষ্টা করবি, তাহলে এমন সিন ক্রিয়েট করব যে হাসপাতাল থেকে কোর্টে যাওয়ার মতন অবস্থায়ই থাকবিনা। তোকে টপকে যদি আমাকে জেল খাটতে হয়, আমি হাসতে হাসতে জেলে যাব, গট ইট?”
সাইবানের চেহারায় ঝরে পড়ল তীব্র ক্রোধ এবং সতর্কবানী। অরণ্য এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। কিছু না বলে পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল। লাইটার দিয়ে ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে লম্বা এক সুখটান দিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর মাথা কাত করে সরাসরি সাইবানের চোখের দিকে তাকিয়ে শুধাল,
“তুই আমাকে এত ঘৃণা করিস কেন? বউয়ের কথায়?”

সাইবানের ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো। পাল্টা কিছু বললনা সে। অরণ্য নিজে থেকেই সিগারেট টানতে টানতে বলে গেল,
“আমি তো এসেছিলাম পুরুষ হিসাবে আরেক পুরুষের উপর দরদ দেখাতে।”
“তোর দরদ তোর কিডনিতে ভরে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব।”
“ব্রেইন ওয়াশড?”
সাইবান থামল। অরণ্য ধীরপায়ে তাকে ঘিরে তার চারিপাশে বৃত্তাকার পথে হাঁটতে লাগল। বলল,
“শুনেছিলাম তোদের জেনারেশনের ছেলেপিলেরা অনেক বুদ্ধিমান হয়। তোর বেলায় কি বুদ্ধি উল্টো পথে হেঁটেছে? নাহলে তুই- ই ভাব, তোর মতন একটা ইয়াং ছেলে এখন একটা মহিলা আর আরেক পুরুষের বাচ্চাকে নিয়ে কোর্ট কাচারিতে দৌঁড়ে জুতার তলা ক্ষয় করছে, কেন? তোর জীবনটা এমন সাদাকালো হওয়ার কথা ছিল? উঁহু, রঙে রঙে রঙিন হওয়ার কথা ছিল।”
সাইবানের দুই হাতের মুঠো শক্ত হলো।

“কি বলতে চাইছিস তুই?”
“এটাই যে, দুই পক্ষের কথা তো আদালতেও শোনে। তুই কেন এক পক্ষের কথা শুনে অবুঝ শিশুর মতন লাফাচ্ছিস? পৃথিবীর মহামানবেরা বলে গিয়েছেন, এই জাতিকে একটা মিথ্যা বিনোদন দিয়ে বসিয়ে রাখো, জাতি আর প্রশ্ন করবেনা।”
থামল অরণ্য। সিগারেট অর্ধেক ফুরিয়েছে। সেটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষতে লাগল,
“তোর মনে হয় না তোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সাইবান?”
অরণ্য বুঝি প্রথমবার সাইবানের নামটা উচ্চারণ করল। তাতে মস্তিষ্কে কেমন যেন দপদপে একটা অনুভূতি হলো। বিষাক্ত এক কন্ঠ, তাতে বিষাক্ত উচ্চারণ।
“তোকে ইরাম কি বলেছে? ও কেন আমাকে ছেড়েছে? কখনো এটা বলেছে আমি কেন ওকে ছেড়েছি?”
সাইবান শক্ত একটি ঢোক গিলল। বলার মতন শব্দ খুঁজে পেলনা। তাকে নির্বাক লক্ষ্য করে মৃদু হাসল অরণ্য। ওভারকোটের পকেটে দুহাত ভরে এগিয়ে এলো,
“শি ইয মাচ গ্রেটার প্লেয়ার দ্যান বোথ অব আস।”
একটু থেমে পরক্ষণেই অরণ্য বলল,
“দেনমোহর ব্যবসায়ী।”
সাইবান হতবিহ্বল হলো। ইচ্ছা হলো অরণ্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। চোখ বুঁজে বহু কষ্টে নিজের অন্তরকে সামলাল সে। রাগের মাথায় আর কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না। চোখ খুলে মাথা কাত করে সে তাই বিরক্তি প্রকাশ করল,

“এক্সকিউজ মি?”
অরণ্যর মাঝে বিশেষ হেলদোল নেই। সে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আমাদের বিয়ের দেনমোহরের টাকা দিয়ে কি করেছে জানিস?”
“না জানিনা। জানতেও চাইনা।”
“ঘুষ খাইয়ে ভাইকে চাকরি দিয়েছে।”
সাইবান মানা করলেও উত্তর দিল অরণ্য। যেন কানে যায়নি তার কোনোকিছু। পাল্টা শুধাল,
“তোর দেনমোহরের টাকা কত?”
”তোকে বলব কেন?”
“না বল। এটুকু বল যে এখনো দিয়ে দিসনি। নাকি আহাম্মকের মতন দিয়ে ফেলেছিস?”
সাইবান মুখ খুললেও কিছু বলতে পারলনা। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অরণ্যর দিকে। অরণ্য উত্তর বুঝে তীর্যক হাসল, বলল,
“পাখির তবে নতুন খাঁচায় উড়াল দিতে বিশেষ দেরী নেই।”
“তোকে আমি শেষ ওয়ার্নিং দিচ্ছি, এরপরেও যদি চুপ না করিস, যা হবে তার জন্য আমি দায়ী থাকবনা।”
সাইবানের সতর্কবার্তার বিপরীতে অরণ্য শুধু শব্দহীন হাসল,
“এমনটাই হয়। মানুষ সত্যের মুখোমুখি হতে ভীষণ ভয় পায়। প্রশ্ন করতে ভয় পায়। পাছে তার আঁকড়ে ধরা বিশ্বাসটুকু যদি ভেঙে যায়? তোর মাথায় যে অন্ধবিশ্বাসের পরত পড়েছে, তার বিপরীতে নিজের মাথা ঠুকে মরার ইচ্ছা আমার নেই। শুধু একটাই কথা বলব, শুনে রাখ। তোর বউ এতই সতী সাবিত্রী যে তার গর্ভের বীজটা আদৌ আমার কিনা সেই নিয়েও সন্দেহ হয়।”

কালো। অন্ধকার। সাইবান চোখের সামনে শুধু সেটাই দেখতে পেল। তার জ্বলজ্বলে নয়নাভিরাম চোখজোড়া হুট করেই কেমন ঘোলাটে হয়ে উঠল। এতক্ষণ যাবৎ যে নিয়ন্ত্রণের লাগাম টেনে ধরেছিল তার অন্তর, সেই লাগাম এক লহমায় অদৃশ্য হলো। অরণ্য একটি ঢোক গিলল। এতক্ষণ যাবৎ সামনে একজন মানুষ থাকলেও এখন ভিন্ন কেউ আছে এমনটাই মনে হচ্ছে তার। প্রতিক্রিয়া করার সময়টুকু অব্দি পাওয়া গেলনা। সাইবান তড়িৎ গতিতে এগোল, এতটা ক্ষীপ্র সেই আক্রমণ যে চোখে দেখতেও বেগ পোহাতে হলো। অরণ্য শুধু অনুভব করল, রীতিমত হাওয়ায় ভাসতে শুরু করেছে সে। তারপরই তার ভারীক্কি পুরুষালী শরীরটা আছড়ে পড়ল গাড়ির বনেটের উপর। ধাতুর বনেট মহৎ জোরে খানিক দেবে গেল। অঙ্গ প্রত্যঙ্গে তীব্র ব্যাথা টের পেল অরণ্য। বুঝতে পারল, তার শ্বাসরোধ হয়েছে। সাইবান দুই হাতে জোরালোভাবে তার গলা চে*পে ধরে রেখেছে। ছটফট করেও লাভ হলনা। নিজেকে ছাড়াতে পারলনা অরণ্য। ঝাপসা চোখে দেখল নিজের উপর ঝুঁকে থাকা হিংস্র মুখটা। এক নীরব পিশাচ যেন। ঘাড়ে এবং কপালে ফুলে উঠেছে নীলচে শিরা। দপদপ করছে হৃদস্পন্দন তীব্র ক্রোধের তাড়নায়। সাইবান নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে সম্পূর্ণ। তার কণ্ঠটাও অদ্ভুতুড়ে শোনাল,

“এত সন্দেহ নিয়ে বেঁচে আছিস কেন? জাহান্নামে যা।”
“ক্ষক…ক্বক..!”
অরণ্য কোনো কথা বলতে পারলনা। তার অবরুদ্ধ গলা বেয়ে ম্রিয়মাণ শব্দ বেরোল। সাইবান একচুল ছাড় দিলনা। হাতের জোর ক্রমশ বাড়াল। ঝুঁকে এসে অরণ্যর আতঙ্কিত চোখের মাঝে নিজের অসহনীয় দৃষ্টি মিলিয়ে বলে উঠল,
“অন্ধ? হ্যাঁ, আমি শুধু অন্ধ না, আমার ছোট্ট সুখের দুনিয়ার জন্য আমি অন্ধ রাক্ষস। এই অন্ধের সামনে আয়না দেখানোর চেষ্টা করবি না, ওই আয়না ভেঙেচুরে তোর বুকেই সিল মেরে দেব!”
সাইবানের কব্জি খামচে ধরল অরণ্য। ধারাল নখের আঁচড় পড়ল ত্বকে, লাল ঘা ফুটে উঠল। অথচ বিন্দুমাত্র টললনা সাইবান। মেঘের ঘর্ষণের ন্যায় গর্জন তুলল,
“বউ সতী সাবিত্রী না? তুই কোন ভাগাড়ের পুঃত পবিত্র? কতজনের জীবন নষ্ট করেছিস? কত জনের গায়ে কাপুরুষের মতন হাত তুলেছিস? হাড় চিবিয়ে ফেলে দিয়েছিস, সেই হাড় নিয়ে এখন এত সুড়সুড়ি লাগে কেন? পরের সুখ সহ্য হয়না? মেইল ইগোতে জ্বলে? যে তোর কপালে ঝাঁটা মেরে এক রমণী বেজায় সুখে আছে?”

অরণ্য চোখে কিছুই প্রায় দেখতে পাচ্ছে না এখন। বুকের ভেতর অক্সিজেনের প্রচন্ড অভাব। শুধু কানে সাইবানের গমগমে কন্ঠস্বর ভেসে আসছে,
“সত্যটা তোকে আমি বলি জঙ্গল মির্জা! তোর শরীরে অনেক কুরকুরানি, এক নারীতে চৈত্র মাসের কুত্তার উত্তেজনা মেটে না। তাই তুই পরনারীতে মেতেছিস। এখন কেন মেতেছিস, সেটা তো তোর দুই ইঞ্চির ব্রেইনকে জাস্টিফাই করতে হবে। এজন্য তুই অত্যাচার শুরু করলি। নিজেকে ডমিনেটিভ রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলি। কাল্পনিক খুঁত বের করে নিলি। রান্নায় লবণ কম হলে বউ পেটানো পুরুষগুলোর মতন। ওহ, তুই তো আবার সেই জেনারেশনেরই পাবলিক! নিজের তৈরি করা ধূসর দুনিয়ায় তুই নিজেই এখন বন্দী। তোর ইগোতে উষ্টা মেরে কেউ সুখে থাকছে সেটা তোর মতন স্যাডিস্টের সহ্য হবে কেন? এখন তুই চাচ্ছিস, আমার মধ্যেও সেই ইগো জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু তোকে বলে রাখি, এই সাইবান আলাদিন মাচা টি খায় ঠিকই, তবে ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। তোর ইগো তুই তোর ঝোলায় রাখ। সব নারী বেঈমান বলে গাইতে গাইতে গিলতে গিলতে রাস্তায় পড়ে ম*রে থাক। পৃথিবীর কারো কিছু যায় আসবেনা। আন্ডারস্ট্যান্ড? পরেরবার আমি হাতের কাজ শুধু কথায় শেষ করব না।”

অরণ্যকে ছেড়ে দিল সাইবান। হুট করে বাতাস গ্রহণ করতে পেরে ভীষণ জোরে কাশতে লাগল অরণ্য। গাড়ি থেকে পিছল খেয়ে মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ল। গলায় দাগ বসে গিয়েছে তার। সাইবানের লম্বাটে আঙুলের ছাপ সেখানে স্পষ্ট। নিজের হাত ঝাড়া দিয়ে সরে দাঁড়াল সাইবান। যেন ঘৃণিত বস্তু দেখছে কোনো।
“একটা কথা ঠিকই বলেছিস তুই। বীজ তোর না, আমার। ইরাম কিবরিয়া আমার, সাহরান আলাদিন আমার। দূর দূরান্তে কোনো জঙ্গলের নাম নিশানা নেই!”
এটুকুই। আর দাঁড়ালনা সাইবান। উল্টো ঘুরে হনহন করে বেরিয়ে গেল। একবারও পিছন ফিরে তাকালনা। অরণ্য নিজের স্থানেই হাঁপাতে লাগল। মাটিতে তার দুহাত মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। সমস্ত শরীর কাঁপছে। মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে বিধায় দেখা যাচ্ছেনা, এই অবস্থাতেও তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে আছে!

ভোররাত। বারান্দা থেকে আসা মৃদু আলো মায়ার জাল বিছিয়ে রেখেছে বেডরুমজুড়ে। ইরাম ঘুমে আচ্ছন্ন। আজ সাইবান বাড়িতে নেই তাই ইযান তার পাশেই ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখছিল ইরাম। সে মেঘের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হুট করে মেঘ সরে গেল তার পায়ের নিচ থেকে। তক্ষুণি সে নিচে পড়ে যেতে লাগল। এমন সময়েই নিজের কোমরে উষ্ম স্পর্শ পেয়ে ইরাম চমকে উঠল। ঘুম ভেঙে গেল এক লহমায়। কেঁপে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে পাশ ফিরতে চাইলেও পারলনা। কেউ তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে নিজের বুকের সঙ্গে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড ইরাম কিছু টের পেলনা। অতঃপর অতি চেনা সুবাসটুকু নাকে গেল তার। তৎক্ষণাৎ আতঙ্ক দূরীভুত হলো। মাথা কাত করে তাকাল ইরাম। অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমের ভেতর অতি মৃদু আভায় কাঙ্ক্ষিত মুখটা নজরে এলো।

“আলাদিন।”
ঘুম জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করল ইরাম। সাইবান হুট করে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। মাথা গুঁজে দিল অর্ধাঙ্গিনীর বুকের ভেতর। যেন শিশুটি সে, আশ্রয় খুঁজছে নমনীয়তায়। ইরামের ঘুম অনেকটা কেটে গেল। মস্তিষ্ক সতর্ক হলো। সাইবানের চুলে আঙুল চালিয়ে সে শুধাল,
“কি হয়েছে?”
“অশান্তি লাগছে। আপনার বুকে একটু ঘুমাতে দেবেন?”
প্রশ্নটায় এত মায়া, এত আবেগ যে ইরামের মন মোমের মতো গলে গেল। সাইবানকে আগলে নিল সে পরিপূর্ণভাবে। পিঠে আর মাথায় নরম হাত বোলাতে লাগল। তার ইচ্ছা হলো সাইবানকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে, শো তে গিয়ে কি এমন হয়েছে। কিন্ত এই নাজুক মুহূর্তে সেটা করতে ইচ্ছা হলনা। তাই সে ফিসফিস করল,

“সব অশান্তি কেটে যাবে। ঘুমাও তুমি।”
সাইবান বড় করে প্রশ্বাস টানল। তার বুকে আরও শক্তভাবে লেপ্টে গেল। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আমার পোটলা কোথায়?”
“আমার পাশেই ঘুমাচ্ছে।”
সাইবান ইরামের কোমরের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে ওপাশে চিৎ হয়ে ঘুমাতে থাকা ছোট্ট ইযানকে ছুঁয়ে দিল। বাচ্চাটা দুহাত মুখের কাছে মুঠো পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে। সাইবান সেই মুঠো পাকানো হাতের একটা নিজের হাতে শক্তভাবে ধরল। তার বিশাল হাতে ইযানের হাতটা ছোট্ট এক অস্তিত্বমাত্র। তবুও মনে হলো, ছোট্ট এক চারাগাছ আজ বিশাল এক বটগাছকে শক্তি যোগাচ্ছে। সম্পূর্ণ ঘটনায় ইরাম বেশ অবাক হলো। নিজের আলিঙ্গনের জোর বাড়াল। সাইবান তাকে আর ইযানকে ধরে ওভাবেই শুয়ে রইল। যেন পৃথিবীতে এই দুজন মাত্র ব্যক্তিই আছে যারা তাকে শান্তি দিতে পারে।

আমার আলাদিন পর্ব ৬২

“আপনাকে ভালোবাসি। জানেন তো? তাইনা?”
গমগমে শোনাল সাইবানের কন্ঠটা। ইরাম শক্ত একটা ঢোক গিলল।
“হুম। জানি।”
“ওকে। নিশ্চিত হচ্ছিলাম।”
এটুকুই। সাইবান আর কিছু বললনা। ইরামও চুপটি করে রইল স্বামীকে বুকে রেখে। অথচ, সাইবানের অশান্তি দূর করতে গিয়ে মাত্রই তার নিজের অশান্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। কেন এমন করছে ছেলেটা?

আমার আলাদিন পর্ব ৬৩ (২)