Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬
‎আফীফা আফনান

‎সকালের মিষ্টি ও ঝলমলে সোনালী রোদে ভেসে যাচ্ছিল বেডরুমের চারপাশ। বন্ধ জানালাই উপচে আসা সূর্যের আলো মেহুলের চোখের পাতায় এসে পড়তেই তার ঘুমের ঘোর ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করল।
‎​মেহুল একটা তৃপ্তির আড়মোড়া ভেঙে, আলসেমি কাটিয়ে এক হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা নাইটস্ট্যান্ড থেকে মোবাইল ফোনটা হাতে নিল। উদ্দেশ্য ক’টা বাজছে দেখা। কিন্তু ​স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মেহুলের চোখ দুটো যেন এক লহমায় ছানাবড়া হয়ে গেল! ঘড়ির ডিজিটাল কাঁটায় জ্বলজ্বল করছে—সকাল ৯:৩২ মিনিট!

‎​”মাই গড! এত দেরি হয়ে গেছে?!”—মেহুল মনে মনে আঁতকে উঠল।
‎​তার মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষ মুহূর্তের মধ্যে সচেতন হয়ে উঠল। কারণ আজ সকাল ১০টার মধ্যেই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনের মাঠে তার উপস্থিত থাকার কথা ! হয়তো এতোক্ষণে শহরের দূর-দূরান্ত থেকে রোগী এসে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছে, অথচ সে এখনও বিছানায় শুয়ে!

‎​মেহুল এক ঝটকায় তোশক ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু তখনই এক অদ্ভুত বাধার মুখে থমকে গেল সে! শরীরটা যেন কেমন টান খাচ্ছে!
‎​মেহুল ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে নিচের দিকে তাকাল।
‎​আর তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল! দৃশ্যটা দেখে মেহুলের চোখ জোড়া কিঞ্চিৎ ছোট হয়ে এলো। ​বিছানায় ধবধবে সাদা চাদরের ওপর পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে সেই একরত্তি রাজকন্যা। ছোট ছোট পায়ের বুড়ো আঙুল গুলো কুঁকড়ে আছে, আর অবুঝ শিশুটি ঘুমাচ্ছিল একদম মেহুলের শরীর ঘেঁষে!
‎​সবচাইতে মায়াবী দৃশ্য হলো—বাচ্চাটি ঘুমন্ত অবস্থাতেই মেহুলের সুতি জামার পাশটা নিজের খুদে খুদে নরম আঙুল দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে আছে! ঠিক যেন অবচেতন মনেও ভয় পাচ্ছে—তার জীবনের উদ্ধারকর্তা তাকে ছেড়ে কোথাও দূরে চলে যাবে না তো? সেই ভেবে।”

‎​মেহুল একদম স্থাণু হয়ে বসে রইল। সে নিজের হাত বাড়িয়ে সাবধানে, অতি মমতায় শিশুটির মুঠো থেকে নিজের জামার কাপড়ের অংশটুকু আলগা করতে চাইল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, খুদে ছানাটি ঘুমে আচ্ছন্ন থেকেও মুঠোটা ছাড়তে চাইছে না! যেন কোনো অদৃশ্য বাধন দিয়ে মেহুলকে নিজের কাছে ধরে রাখার আকুল চেষ্টা করে চলেছে সে।
‎একদিকে ​ক্যাম্পে যাওয়ার তাড়া, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ আর অন্যদিকে রক্ত সম্পর্কের বাইরে গড়ে ওঠা অচেনা এক অদ্ভুৎ টান—মেহুল যেন দুই অনুভূতির চরম টানাপোড়েনে বন্দি হয়ে রইল!

‎মেহুল স্তব্ধ হয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরম মায়ায় নিষ্পাপ বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাটির এই অবুঝ আকুতি মেহুলের পা দুটোকে যেন বিছানার সাথে এক অদৃশ্য শিকড়ে বেঁধে ফেলেছিল।
‎​কিন্তু পরক্ষণেই ঘড়ির কাঁটার তাড়া আর দায়িত্ববোধ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। মেডিকেল ক্যাম্পে শত শত মানুষ হয়তো তার অপেক্ষায় বসে আছে। মেহুল নিজের আবেগ চেপে ধরে এক শক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে নজরটা অন্য দিকে সরিয়ে নিল।
‎​সে পরম সতর্কতায়, অতি সাবধানে একের পর এক ক্ষুদ্রে আঙুলগুলো আলতো করে আলগা করে বাচ্চার মুঠো থেকে নিজের জামার অংশটা ছাড়িয়ে নিল। বাচ্চাটি যাতে কোনোভাবে জেগে না ওঠে, তাই ধীর পায়ে এক পা এক পা পিছিয়ে দ্রুত সরিয়ে এলো বিছানার কাছ থেকে।

‎​অতঃপর মেহুল আর পিছন ফিরে তাকাল না। আলমারি থেকে দ্রুত একটা পরিপাটি থ্রি-পিস বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
‎​পনেরো মিনিটের মধ্যে দ্রুততার সাথে শাওয়ার সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো মেহুল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো টেনে একটা উঁচু খোপায় বেঁধে নিল, আর হাতঘড়িটা দ্রুত হাতে পেঁচিয়ে নিল।
‎​সব কাজ শেষ করে মেহুল ব্যাগটা কাঁধে চেপে যেই না দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই বিছানার দিক থেকে এক মৃদু ক্যু-ক্যু শব্দ ভেসে এলো!

‎​মেহুল দরজার কাছেই থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। ​বিছানায় শুয়ে থাকা একরত্তি ছানাটি হাত-পা শূন্যে এলোমেলোভাবে ছুরে ছুরে ছোট্ট শরীরটা মোচড় দিচ্ছে। তার খুদে চোখ দুটো আধো-ফোটা হয়ে নড়াচড়া করছে আর মুখ দিয়ে হাত-পা নাড়ানোর সাথে সাথে মিহি মিষ্টি শব্দ বের করছে—যেন ঘুম ভেঙে উঠতে গিয়ে নিজের চার পাশে কাউকেই দেখতে না পেয়ে সংকেত ছড়াচ্ছে!
‎​মেহুল থমকে গিয়ে দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখেই বাচ্চার সেই নাড়াচাড়ার দৃশ্য দেখতে লাগল—অজানা এক টান তার পা দুটোকে আবার সেই ঘরের ভেতরেই আটকে রাখতে চাইছে!

‎কিন্তু ঠিক তখনই মেহুলের হাতব্যাগের ভেতরে থাকা ফোনটা উচ্চস্বরে বেজে উঠল।
‎​পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকাল মেহুল—হসপিটালের মেডিকেল টিমের জুনিয়র সহযোগী মরিয়মের ফোন! মেহুল দ্রুত কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল।
‎​ওপাশ থেকে মরিয়মের কিছুটা উদ্বিগ্ন ও চটপটে কণ্ঠ ভেসে এলো, “হ্যালো, ম্যাম! আপনি কোথায় আছেন? আমরা তো সবাই ইকুইপমেন্ট আর মেডিসিন কিট নিয়ে ক্যাম্পের মাঠে চলে এসেছি। রোগীদের লাইনও জমতে শুরু করেছে ম্যাম!”

‎​মেহুল তাড়াহুড়ো করে দরজার চাবিটা ব্যাগে পুরতে পুরতে বলল, “এই তো মরিয়ম, আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি। তোমরা প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন শুরু করে জিনিসপত্র সব গোছগাছ করে রাখো। আমি পৌঁছানো মাত্রই পেশেন্ট দেখা শুরু করব।”

‎​”ঠিক আছে ম্যাম, আপনি সাবধানে আসুন।”—বলেই মরিয়ম ফোনটা কেটে দিল।
‎​মেহুল ফোনটা ব্যাগে রেখে একবার শোবার ঘরের দিকে নজর বুলাল। গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা হুমা চাদর মুড়ি দিয়ে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে, আর অন্যপাশে নিশ্চিন্তে আছে সেই পুতুলটা।
‎​মেহুল ভাবল, বেচারি কাল সারারাত বাচ্চার পেছনে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি, এখন ওকে ডেকে তোলাটা একদমই ঠিক হবে না।
‎​তাই আর হুমাকে না ডেকে মেহুল দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে পেন দিয়ে খসখস করে দুটো লাইন লিখে ফেলল—
‎​”হুমা, আমি ক্যাম্পের উদ্দেশে বের হলাম। টেবিলে বেবি ফুড রেডি আছে। বাচ্চাটা জাগলে প্লিজ একটু খাইয়ে দিস। আমি পেশেন্ট দেখা শেষ করেই যত দ্রুত সম্ভব ফিরছি। এর পরে এসে বাচ্চাটাকে নিয়ে যা ভাবার ভাববো। সাবধানে থাকিস। — মেহুল।”

‎​চিরকুটটা সাবধানে ভাঁজ করে মেহুল বেডসাইড টেবিলে রাখা হুমার মোবাইলের নিচে চেপে রেখে দিল, যাতে ঘুম থেকে উঠে ফোনটা হাতে নেওয়ার সাথে সাথেই ওর নজরে পড়ে।
‎​অতঃপর আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে, মেহুল নিঃশব্দে দরজার লক টেনে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল—মাঠের দিকে ছুটে চলার তীব্র তাড়া নিয়ে!

‎​পেশাগত জীবন শুরু করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনো মেহুলের নিয়মানুবর্তিতা নিয়ে কেউ একটা আঙুল তোলার সুযোগ পায়নি। সময়ের ব্যাপারে সে সবসময়ই চরম কঠোর। কিন্তু সেই মেহুল আজ জীবনের প্রথম কোনো দায়িত্ব পালনে এসে দেরিতে পৌঁছাল!
‎​ঘড়ির কাঁটায় যেখানে সকাল ১০টার মধ্যে তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে এখন বেজে গেছে ১০টা ১৫ মিনিট! পুরো ১৫টা মিনিট লেট!
‎​রিকশা থেকে নেমে মেহুল আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাই না। অ্যাপ্রনের বোতাম আঁটতে আঁটতে দ্রুত পায়ে প্রায় দৌড়ে ক্যাম্পের অস্থায়ী তাঁবুর ভেতরে প্রবেশ করল।

‎এদিকে​ মাঠে ততক্ষণে গ্রামের দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রবীণ, নারী ও শিশুদের দীর্ঘ সারি জমে গেছে। রোদের প্রখরতা বাড়ার সাথে সাথে রোগীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছিল। মেহুলকে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট মরিয়ম ও অন্য সহকর্মীরা কিছুটা অবাক হলেও চটজলদি সোজা হয়ে দাঁড়াল।
‎​মেহুল তার হাঁপানো শ্বাস ঢেকে গম্ভীর ও পেশাদারি কণ্ঠে বলল, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্য ডিলে। সবাই নিজ নিজ টেবিলে পজিশন নাও, এখনই স্টার্ট করছি।”

‎​কথা শেষ করেই মেহুল নিজের স্টেনোস্কোপটা গলায় জড়িয়ে নিয়ে ধবধবে সাদা অ্যাপ্রনের হাতা দুটো সামান্য গুটিয়ে ডাক্তারির চেয়ারটায় আসন গ্রহণ করল।
‎​দেরিতে আসার অপরাধবোধ দূর করতেই যেন মেহুল শতগুণ বেশি মনোযোগ আর তৎপরতার সাথে কাজ শুরু করে দিল—
‎​”মরিয়ম, এক নম্বর সিরিয়ালের পেশেন্টকে ভেতরে পাঠাও।”

‎​সিরিয়াল ধরে প্রবীণ এক বৃদ্ধা ভেতরে ঢুকতেই মেহুল পরম আন্তরিকতায় তাকে বসতে দিল। বিপি স্ট্রেচার হাতে মেপে রক্তচাপ পরীক্ষা করল, বুকের ধুকপুকানি শুনল আর পরম যত্নে জিজ্ঞেস করল শারীরিক সমস্যার কথা। প্রেসক্রিপশনের পাতায় খসখস করে ওষুধ লিখে পাশে থাকা নার্সকে বুঝিয়ে দিল ফ্রি মেডিসিন কাউন্টার থেকে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির ড্রাগস আর টনিকগুলো বুঝিয়ে দিতে।
‎​এরপরেই এলো এক কোলে থাকা শিশু আর গর্ভবতী মা। কাউকে প্যালপেট করে দেখার কাজ, কাউকে ইমার্জেন্সি গ্লুকোজ আর স্যালাইন প্রোভাইড করা, আবার কোনো বাচ্চার ঠান্ডা-জ্বরের জন্য ডোজ মেপে ফাইল লিখে দেওয়া—সবকিছুই মেহুল এক অবিশ্বাস্য নিপুণতায় আর দ্রুততার সাথে পরিচালনা করতে লাগল।
‎যেন ​তার হাত চলছে যন্ত্রের মতো, মস্তিষ্ক কাজ করছে পূর্ণ পেশাদারিত্বে। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়েও, বুক টিপে ধরে স্টেনোস্কোপ কানে লাগানোর সময় মেহুলের অবচেতন মন বার বার কোথায় যেন উধাও হয়ে যাচ্ছিল!

‎​বুকের ঠিক মাঝখানটায় যেন ভেসে উঠছিল—আজ সকালে তার কোটের কলারটা আঁকড়ে ধরে রাখা এক জোড়া পুঁচকে, অবুঝ রাজকন্যার আঙুলের স্পর্শ!
‎অন্যদিকে সারাটা রাত ঢাকা-চট্টগ্রাম-রাজশাহীর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর জার্নি শেষে সালমান আর নিজের বাড়িতে ফেরেনি। শহরের অভিজাত এলাকায় তার নিজস্ব একটা আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে; সেখানে গিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য ধোঁয়া ওঠা কফি আর হালকা এক পশলা শাওয়ারের বিশ্রাম নিয়েছিল সে। কিন্তু শরীর যতটাই ক্লান্ত থাক না কেন, সালমানের মন তাকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি।
‎​কেবলমাত্র এক নজর, একলহমার জন্য নিজের ‘অপ্সরা’ মেহুলকে মন ভরে দেখবে বলে সে সাতসকালে গাড়ি ছুটিয়ে চলে এসেছিল এই ফ্রি ক্যাম্পেইনের মাঠ প্রাঙ্গণে।

‎​কালো সানগ্লাস চোখে, হাতা গোটানো গাঢ় নীল শার্টে সালমান যখন মাঠে পা রেখেছিল, তখন থেকেই স্থানীয় লোকজনের ঢল নামতে শুরু করেছে। এমপি সাহেবের দাপুটে ও পরাক্রমশালী ছেলে সালমান শাহ নেওয়াজকে সামনে পেয়ে এলাকার সাধারণ মানুষজন একে একে এগিয়ে এসে নিজেদের নানা নাগরিক সমস্যা, জমিজমার ঝামেলা আর অভিযোগের কথা জানাতে শুরু করে।
‎​সালমান বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত শান্ত ও মনোযোগের সাথে সবার কথা শুনছিল, তাদের দিকে তাকাচ্ছিল; কিন্তু তার তৃষ্ণার্ত মন আর রক্তবর্ণ চোখ দুটো পড়ে ছিল মূল তাঁবুর পর্দাটার দিকে—যেখানে মেহুল রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। কখন একটু নির্জনতা মিলবে, কখন সে পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকে নিজের কলিজার টুকরোটাকে মন ভরে একনজর দেখবে—সেই প্রতীক্ষায় যেন তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল!

‎​ঠিক এমন সময় ভিড় ঠেলে এক মধ্যবয়সী নারী সালমানের একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। আকুল কণ্ঠে বললেন, “ছোট সাহেব! আপনার কাছে বিচার চাই। আমার পোলডা ঢাকায় চাকরি করে, আর এই মাইয়াডা শহরে কলেজে পড়ে। দুদিন আগে স্টেশন থ্যাকে বাড়ি ফেরার পথে কটা বখাটে মাতাল পোলা আমার মাইয়ার সাথে জঘন্য অভদ্রতা করছে! আমার পোলা বাধা দিতে গেলে ওরে মাইরা রক্তাক্ত কইরা দিছে! আপনি এর বিচার করেন সাহেব!”

‎​ঘটনার বিবরণ শুনতেই সালমানের চিবুকের রগগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সানগ্লাসের আড়ালে থাকা চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। কিন্তু উপস্থিত জনসমক্ষে নিজেকে সামলে নিয়ে সে অত্যন্ত গম্ভীর ও দৃঢ় কণ্ঠে ওই প্রবীণ মহিলাকে আশ্বস্ত করল—
‎​”আপনি বাড়ি যান চাচী। আজ সন্ধ্যার আগেই ওই বখাটে শয়তানগুলোকে খুঁজে বের করে এমন বিচার করা হবে, যাতে জীবনে দ্বিতীয়বার কোনো মেয়ের দিকে তাকানোর সাহস তারা না পায়! এটা সালমান শাহ নেওয়াজের ওয়াদা।”

‎​কথা শেষ করেই সালমান চটজলদি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবিকে উদ্দেশ্য করে হুকুম জারি করল—
‎​”রবি! এখনই কাল রাতের স্টেশনের আশেপাশের সবকটা সিসিটিভি ফুটেজ কালেক্ট কর। কোন কোন শুয়োরের বাচ্চা ওই কাণ্ড ঘটিয়েছে, আধঘণ্টার মধ্যে তাদের আইডেন্টিফাই করে তাদের নাম-ঠিকানা আমার ফোনে চাই!”

‎​”জি ভাই !”—বলেই রবি দ্রুত মাথা নেড়ে সামান্য এগিয়ে গিয়ে ফোনে নিজের ক্রাইম নেটওয়ার্ক আর সোর্সদের নির্দেশ দিতে শুরু করল।
‎​অতঃপর সালমান মাঠের অধৈর্য জনতাকে উদ্দেশ্য করে গমগমে কণ্ঠে বলল, “আপনাদের যার যত সমস্যা বা অভিযোগ আছে, সব কাগজে লিখে আমাদের পার্টির মেইন অফিসের সামনের ড্রপবক্সে ফেলে দিয়ে আসবেন। আমি নিজে প্রতিটি কেস পার্সোনালি সলভ করব। এখন এখানে আর ভিড় বাড়াবেন না, আগে ভেতরে গিয়ে যার যার ডাক্তার দেখানোর দেখিয়ে নিন। এখানে অযথা ভিড় করে অন্যদের সমস্যার সৃষ্টি না করি আমরা। ”

‎​মহামান্য এমপি সাহেবের ছেলের এমন বিচক্ষণ ও বিনীত নির্দেশে উপস্থিত মানুষজন আশ্বস্ত হয়ে বিনয়ের সাথে একে একে সরতে শুরু করল। এদিকে ​মাঠ ফাঁকা হতেই সালমান এক সেকেন্ডও আর বিলম্ব করল না। সানগ্লাসটা খুলে শার্টের পকেটে গুঁজতে গুঁজতে সে ধ্রুব আর রবিকে পেছনে রেখে সোজা ডক্টরদের মূল তাঁবুর পর্দার দিকে পা বাড়াল—যার ওপারে বসে আছে তার সমস্ত ব্যাকুলতার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু!

‎সারাটা রাত এক ফোঁটাও ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, তার ওপর দুপুরের দিকে মাথার ওপর প্রখর রোদের তাপদাহ আর একাধারে রোগী দেখার ক্লান্তি—সব মিলিয়ে মেহুলের শরীরটা একদম নিস্তেজ হয়ে আসছিল। ঝিমুনি আর শারীরিক অবসাদে মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে।
‎​ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।
‎​মেহুল গ্লাভস পরা হাতে ফোনটা তুলে স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল হুমার মেসেজ—
‎​”মেহু, বাচ্চাটাকে আমি বাসায় একা রেখে আসতে পারলাম না রে! তাই ওকে সাথে করে আমার বুটিক হাউজে নিয়ে এসেছি। কিন্তু ও যে একনাগাড়ে কে কেঁদেই চলেছে! পেটে দুধ আছে, ডায়াপারও পরিষ্কার—তবুও কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না! আমি তো মহা বিপদে পড়লাম!”

‎​মেসেজটা পড়ে মেহুল একটা দীর্ঘ, উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। এমনিতেই তার নিজের জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা আর জটিলতার শেষ নেই, তার ওপর এই অদ্ভুতভাবে কুড়িয়ে পাওয়া একরত্তি রাজকন্যার হঠাৎ আগমন! ঘটনাগুলো কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। ভাবনায় ডুবে মেহুল কিছুক্ষণের জন্য একদম অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল, কলমের নিপটা প্রেসক্রিপশনের কাগজে আলতো করে চেপে রেখেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শূন্যের পানে।

‎​ঠিক সেই পরম মুহূর্তে—ডাক্তারি বুথের পর্দা সামনে পা রাখল সালমান শাহ নেওয়াজ!
‎​আজ প্রথমবারের মতো একদম সামনাসামনি, হাতছোঁয়া দূরত্বে মুখোমুখি হতে চলেছে মেহুল আর সালমান! দীর্ঘদিনের গোপন উন্মাদনা, অদৃশ্য পথ অনুসরণ আর হৃদয়ের গভীর তৃষ্ণার পর আজ অবশেষে মেলা বসবে দু-জোড়া চোখের রক্তমাংসের মায়াজালে!

‎​সালমান এসে দাঁড়াতেই লাইনে থাকা সাধারণ মানুষগুলো চটজলদি সরে গিয়ে তাকে সামনে যাওয়ার রাস্তা করে দিল। কারণ এই শহরের মানুষের কাছে ‘শাহ নেওয়াজ’ পরিবারের মানুষ মানেই বিরাট পাওয়ার আর সম্মানের প্রতীক! আর এমপি সাহেবের প্রতাপশালী ছেলে সালমান শাহ নেওয়াজ তো সাধারণের কাছে অন্য এক উচ্চতার জনপ্রিয় ও ভীতিপ্রদ ব্যক্তিত্ব!

‎সুযোগ পেয়ে ​সালমান কেবল ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করতে যাবে, ঠিক তখনই বাইরে বসা মেডিকেল টিমের এক তরুণ ভলেন্টিয়ার ছেলে তার হাতে ফাঁকা সিরিয়াল স্লিপ আর প্যাড নিয়ে সালমানের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল।
‎​ছেলেটি খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করল, “স… স্যার! কিছু মনে করবেন না, কিন্তু ম্যাডাম তো একদম সিরিয়াল মেপে পেশেন্ট দেখছেন। তাই বলছিলাম আপনি কি কনসাল্টেশনের জন্য স্লিপ নেবেন স্যার?”

‎​সালমান তার গ গম্ভীর, গমগমে কণ্ঠে এক সেকেন্ডের বিলম্ব না করে বলে উঠল, “হ্যাঁ, লেখো। নাম—সালমান শাহ নেওয়াজ।”
‎​ছেলেটি চমকে উঠে চটজলদি প্যাডে খসখস করে কলম চালিয়ে ‘সালমান শাহ নেওয়াজ’ নামটা লিখে স্লিপটি সালমানের দিকে বাড়িয়ে দিল। সালমান আলতো হাতে ছোঁ মেরে স্লিপটি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পর্দা ঠেলে সোজা বুথের ভেতরে পা বাড়াল—নিজের সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে থাকা সেই অপ্সরার মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য!

‎অতঃপর সালমান যখন ধীরপায়ে ডাক্তারের বুথের ভেতরে পা রাখল, তখন মেহুল মাথা নিচু করে পরম মনোযোগে প্রেসক্রিপশন প্যাডে কী যেন খসখস করে লিখছিল।
‎​গাঢ় নীল শার্টের হাতা গোটানো, ধোপদুরস্ত রাজকীয় মেজাজের সালমান শাহ নেওয়াজ সোজা গিয়ে মেহুলের ঠিক সামনের কাঠের চেয়ারটার মুখোমুখি দাঁড়াল। দীর্ঘদিনের সমস্ত আকুলতা আর তৃষ্ণার অবসান ঘটিয়ে নিজের স্বপ্নের অপ্সরাকে এত কাছ থেকে দেখার মায়ায় তার চোখ দুটো যে থমকে গেল!

‎তখনি ​পাশ থেকে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট মরিয়ম এমন দাপুটে ব্যক্তিত্বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ সমীহ করে বলল, “স্যার, প্লিজ বসুন।”
‎​সালমান ধীরপায়ে চেয়ারটায় আসন গ্রহণ করল। ভারী কাঠের চেয়ারটা সামান্য শব্দ করতেই মেহুল নতুন রোগী এসেছে বুঝতে পেরে মাথা না তুলেই পেশাদার ভঙ্গিতে ধীরহাতে বাম হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল—
‎ ​”সিরিয়াল স্লিপটা দিন।”

‎​মেহুলের সেই সুমিষ্ট, পরিশীলিত গলার আওয়াজটা সালমানের কানে যেন এক অদ্ভুত সুরের মতো বাজল। তবে তার সমস্ত নজর তখন আটকে ছিল মেহুলের সেই ক্লান্তি মাখা, স্নিগ্ধ মুখের ওপর! সারা রাতের দীর্ঘ জার্নির পর মেহুলের গালে নেমে আসা হালকা আবছা ছায়াও সালমানের কাছে পৃথিবীর সবচাইতে মায়াবী দৃশ্য বলে মনে হচ্ছিল।
‎অতঃপর ​সালমান ধীরহাতে, ভারী মায়াময় চোখে নিজের নামের স্লিপটি মেহুলের বাড়ানো হাতের তালুতে তুলে দিল।

‎​মেহুল অভ্যাসবশত স্লিপের দিকে একনজর তাকাল। ‘সালমান শাহ নেওয়াজ’ নামটা পড়েই চটজলদি রেজিস্ট্রি ফাইলে খসখস করে লিখে নিল।
‎অন্যদিকে ​আজ জীবনের প্রথমবার সালমানের মনে হলো—নিজের এই খটমটে নামটা মেহুলের ঠোঁটের স্পর্শে আর তার ফাইলের পাতায় লেখা হওয়ায় যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মায়াবী নামে রূপান্তরিত হয়ে গেছে! সালমান হৃদয়ের সমস্ত মুগ্ধতা উজাড় করে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মেহুলের দিকে…​কিন্তু ঠিক পর মুহূর্তেই!
‎​সালমানের সমস্ত রোমান্টিকতা, কল্পনার ফ্যান্টাসি আর মুগ্ধতার বেলুন এক নিমেষে সুচ ফুটে পটাশ করে ফেটে গেল!

‎​মেহুল প্রেসক্রিপশন প্যাড থেকে চোখ না তুলেই, অত্যন্ত গম্ভীর ও পেশাদারি গলায় বলে উঠল—
‎​”হুম, বলুন আঙ্কেল… আপনার সমস্যাটা কী? প্রেসার নাকি ডায়াবেটিস?”
‎​কথাটা শূন্যে ভেসে ওঠার সাথে সাথে পুরো বুথের ভেতরে যেন এক সেকেন্ডের জন্য মহাশূন্যের হীমশীতল নীরবতা নেমে এলো!
‎​”আঙ্কেল?!”
‎​সালমান শাহ নেওয়াজ—যাকে দেখে পুরো শহরের মেয়েদের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, যার এক দর্শনে পুরো রাজশাহী শহরের মানুষরা পর্যন্ত কাঁপতে থাকে—তাকে আজ এই তেইশ, চব্বিশ বছরের পুঁচকে ডাক্তার ডেকে বসল ‘আঙ্কেল’?

‎​সালমানের চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো! সে তো একবারে হতভম্ব, বাকরুদ্ধ! মুখের সমস্ত মুগ্ধতা উধাও হয়ে সেখানে জ্যান্ত কৌতুক আর শকের ছায়া নেমে এলো!
‎​এদিকে সালমানের ঠিক পেছনে থাকা চটপটে ধ্রুব মেহুলের মুখ থেকে ‘আঙ্কেল’ ডাকটা শোনামাত্রই নিজের ওপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না!
‎​”ফফফ… হিহি!”—ধ্রুব হঠাৎ ফিক করে হেসে ওঠার উপক্রম করতেই, পাশে থাকা রবির চোখ দুটো মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে উঠল!
‎​
‎সঙ্গে সঙ্গে ​রবি নিজের বিশালাকার, লোহা-মার্কা থাবা দিয়ে ঝড়ের গতিতে ধ্রুবর মুখ এমনভাবে চেপে ধরল যে ধ্রুবর গলার আধফোটা হাসি এক নিমেষেই আটকে থুতনিতে এসে জমে গেল!
‎​রবির চোখের দৃষ্টিতে কোনো কৌতুক ছিল না; সেখানে ফুটে উঠল পাথরের মতো থমথমে ও হিমশীতল এক গাম্ভীর্য। সে ধ্রুবর ঘাড় শক্ত করে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে অত্যন্ত নিচু, কিন্তু ধারালো গলায় বলল, “তোর ওই বেয়াদব হাসিটা যদি আর এক মিলিমিটারও বাইরে আসে, আমি এখানেই তোর শ্বাস বন্ধ করে দেব, ধ্রুব! তাই যদি ভালো চাস তো নিজের দাঁতগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে রাখ!”

‎​রবির সেই হিংস্র ও কঠিন রূপ দেখে ধ্রুবর ভেতরের সমস্ত হাসির ফোয়ারা মুহূর্তের মধ্যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে রবির হাতের নিচে মুখ গুঁজে কোনোমতে নিজের দমফাটা হাসি চেপে চোখ উল্টে রইল।
‎​রবি ধ্রুবর মুখটা ছেড়ে দিয়ে আবারও নিজের আগের সেই নিঃশব্দ, গম্ভীর ও শিলাখণ্ডের মতো অনুগত ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়াল—সালমানের যেকোনো এক আদেশের জন্য পরম বিশ্বস্ততায় প্রস্তুত হয়ে!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫

‎​আর অপরদিকে সামনে বসে থাকা সালমান শাহ নেওয়াজ তখনো বরফের মতো জমে গিয়ে নিজের কানেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না! সে চোখ বড় বড় করে মেহুলের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—’এই মেয়ে কি আসলেই চোখে ঝাপসা দেখে, নাকি এক নিমেষে আমার বয়স সত্তর বানিয়ে দিল?!’

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬ (২)