আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৫
সাবিলা সাবি
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এলো। তারপর—হঠাৎ দরজার তালায় একটা প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।
হিয়া চমকে উঠল। সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা থেমে যাওয়ার উপক্রম করেছে। পরের মুহূর্তেই আবার একটা শব্দ করে তালাটা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
হিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণ। হিয়া তাকে আগে কখনো দেখেনি। তার মুখটাও তার পরিচিত নয়। এই মানুষটা কে, কেন এখানে এসেছে, কীভাবে তাদের বাড়িতে ঢুকেছে—কিছুই জানে না সে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেসব জানার কোনো প্রয়োজনও তার মনে হলো না। কারণ দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথায় একটাই চিন্তা এলো— আব্বু। আম্মু।
হিয়া এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তরুণটির পাশ কাটিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি পেরিয়ে সে দৌড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখার পর—হিয়া থেমে গেল। পুরো শরীরটা তার পাথর হয়ে গেল। চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ভেসে উঠল, সেটা দেখার মতো কোনো দৃশ্য ছিল না। হয়তো হিয়া কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও এমন কিছু কল্পনা করেনি।
যে ড্রয়িংরুমে কিছুক্ষণ আগেও তার বাবা বসে ছিলেন, যেখানে তার মা অতিথিদের জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছিলেন, যেখানে তাদের পরিবারের স্বাভাবিক একটা দুপুর কাটছিল সেই একই ঘরটা এখন যেন মৃ*ত্যুপুরী।
কাঁচের সেই টেবিলটা, যেটার ওপর কিছুক্ষণ আগেও খাবার সাজানো ছিল, সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। কাঁচের টুকরোগুলোর ওপর পড়ে আছে তার বাবা। ইশতিয়াক খান।
র*ক্তে ভেসে যাচ্ছে তার শরীর। তার জামাকাপড় র*ক্তে ভিজে গেছে। মুখের স্বাভাবিক দৃঢ়তা নেই। চোখ বন্ধ। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে ভাঙা কাঁচের ওপর।
আর তার ঠিক পাশেই—ফারহানা খান। মাটিতে পড়ে আছেন তিনি। পেটের কাছে কয়েকটি গুলির আঘাত। র*ক্তে ভিজে গেছে তার পোশাক। হিয়া কিছুতেই নড়তে পারল না। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল।
না। এটা সত্যি হতে পারে না।এটা তার বাড়ি নয়। এটা তার বাবা-মা নয়। এটা নিশ্চয়ই কোনো দুঃস্বপ্ন। হয়তো একটু পর সে চোখ খুলবে। তার আব্বু তাকে বকবে—
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন হিয়া?”
আম্মু হয়তো রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলবে—
“হিয়া মা, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু—কেউ কিছু বলল না। চারপাশে শুধু র*ক্ত। আর নিস্তব্ধতা। হিয়ার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— “আব্বু…?”
কোনো উত্তর নেই।
— “আম্মু…?”
তবুও কোনো উত্তর নেই। হিয়া কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ যেন তার জ্ঞান ফিরল। সে ছুটে গেল মায়ের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে এক ঝটকায় ফারহানা খানকে নিজের কোলে তুলে নিল।
“আম্মু!” তার কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো।
“আম্মু, চোখ খোলো!”
ফারহানা খান নড়লেন না। হিয়া কাঁপা হাতে মায়ের মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরল। “আম্মু… আমি হিয়া।”
তার চোখ দিয়ে তখন অবিরাম পানি পড়ছে। — “আম্মু, আমি এখানে আছি।”
কয়েক মুহূর্ত পর ফারহানা খানের চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল। হিয়া সেটা দেখে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
“আম্মু!”
ফারহানা খান খুব কষ্টে চোখ খুললেন। চোখ দুটো ঝাপসা। তবুও তিনি সামনে থাকা মুখটা চিনতে পারলেন।
“হি…য়া…” শব্দটা এত ক্ষীণ ছিল যে হিয়া প্রায় শুনতেই পেল না।
সে মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল।
“হ্যাঁ আম্মু। আমি হিয়া। আমি এখানে আছি।”
ফারহানা খান কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু ব্যথায় তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। হিয়া মায়ের মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কিছু হবে না আম্মু। কিছু হবে না। আমরা হাসপাতালে যাব। ডাক্তার আসবে। তুমি ঠিক হয়ে যাবে।”
সে নিজেই জানত এই কথাগুলোর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও সে বলতে লাগল। কারণ সত্যিটা মেনে নেওয়ার মতো শক্তি তখনও তার হয়নি।
ফারহানা খান খুব কষ্টে চোখ মেলে চারপাশে তাকালেন।তারপর হঠাৎ তার চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। তিনি খুব আস্তে করে বললেন, “অয়ন…”
হিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল। ফারহানা খান আবার বললেন, “অয়ন… কোথায়?”
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ খুলল। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে জানে অয়নকে সে নিজেই নিরাপদে বাইরে বের করে দিয়েছে। কিন্তু তার মায়ের কাছে সেই কথাটা বলার মতো সময়ও এখন নেই।
হিয়া শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগল। ফারহানা খান মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু বুঝে গেলেন। তার চোখের কোণে একটা অশ্রুবিন্দু জমে উঠল। খুব কষ্টে তিনি বললেন, “অয়ন… বেঁচে আছে তো?”
হিয়া এবার মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে মাথা নাড়ল।কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। ফারহানা খান মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
তারপর খুব আস্তে করে বললেন, “ওকে… বাঁচাস…”
হিয়ার বুক ফেটে গেল। “আম্মু…!”
সে মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো “আম্মু তুমি নিজেও বাঁচবে। তুমি আমাদের ছেড়ে যেতে পারো না।”
কিন্তু ফারহানা খানের চোখের দৃষ্টি তখন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। হিয়া বুঝতে পারছিল না। সে বারবার মায়ের গাল চাপড়ে বলছিল, “আম্মু, চোখ খোলো।”
কিন্তু আর কোনো উত্তর নেই। তারপর একরাশ নীরবতা।
“আম্মু!” হিয়ার কণ্ঠ এবার চিৎকারে পরিণত হলো। সে মায়ের মুখ নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল।
“মা…”
আর কোনো সাড়া নেই তার মায়ের।
“মা, কথা বলো..মা… মা… মা…!”
ফারহানা খানের মাথাটা ধীরে ধীরে হিয়ার কোলে একপাশে হেলে পড়ল। হিয়া স্থির হয়ে গেল। তারপর কয়েক সেকেন্ড মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।সে অপেক্ষা করলো এই বুঝি মা আবার চোখ খুলবে। এই বুঝি বলবে “কাঁদছিস কেন, পাগলি?”
কিন্তু আর কিছুই হলো না। হিয়ার বুক থেকে একটা অসহায় আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
“আম্মুউউউ!”
তার কান্নার শব্দ পুরো ড্রয়িংরুম কাঁপিয়ে দিল। কিন্তু সেই কান্নার উত্তর দেওয়ার মতো মানুষটা আর নেই।
ঠিক তখনই পাশ থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। হিয়া থেমে গেল। তার চোখ চলে গেল বাবার দিকে। ইশতিয়াক খানের এক হাত সামান্য নড়েছে। হিয়া মাকে সেখানেই রেখে ছুটে গেল বাবার কাছে।
“আব্বু!”
সে বাবার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। “আব্বু, চোখ খোলো।”
ইশতিয়াক খানের চোখ বন্ধ। কোনো উত্তর নেই। হিয়া তার হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আব্বু, আমি হিয়া।” তার গলা ভেঙে আসছিল। “দেখো আব্বু… আমি এখানে।”
কিছুক্ষণ পর ইশতিয়াক খানের আঙুল আবার সামান্য নড়ল। হিয়া বাবার হাত আরও শক্ত করে ধরে ফেলল।
“আব্বু!”
কিন্তু ইশতিয়াক খান চোখ খুলতে পারলেন না। তার শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে কথা বলার শক্তিটুকুও আর নেই।
হিয়া মরিয়া হয়ে বলল, “আব্বু, তুমি কথা বলো। আমাকে কিছু একটা বলো।”
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বাবার হাত নিজের গালে চেপে ধরল।
“আমাকে বকা দাও আব্বু… তুমি আমাকে বকা দাও।”
কণ্ঠ ভেঙে গেল হিয়ার। “শুধু একবার চোখ খোলো।”
কিন্তু ইশতিয়াক খান আর চোখ খুললেন না। হিয়ার চোখের সামনে ধীরে ধীরে তার বাবার শরীরও নিস্তেজ হয়ে গেল।
হিয়া কয়েক সেকেন্ড বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বুঝতে পারল সে একই দিনে দুজন মানুষকে হারিয়েছে। তার মা। তার বাবা। যে মানুষ দুজনকে ঘিরেই ছিল তার পুরো পৃথিবী। হিয়া বাবার হাতটা নিজের বুকে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বাড়িটা ছিল তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা—সেই বাড়িতেই আজ তার পৃথিবীটা শেষ হয়ে গেল।
আর সে তখনও জানত না, তার জন্য আরও বড় আঘাত অপেক্ষা করছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই তরুণের কণ্ঠ ভেসে এল—“বাবা!”
আসাদ খান ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তরুণটি দ্রুত এসে বলল, “ওই রুমে আর কেউ নেই। শুধু ও বেরিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে অয়ন পালিয়ে গেছে।”
হিয়া ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তরুণটির দিকে তাকাতেই তার চোখে পরিচিতির কোনো ছাপ না থাকলেও কথাগুলো শুনে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। এই লোকটাই আসাদ খানের ছেলে। আয়মান।
আসাদ খান সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল “কী বলছিস?”
তার মুখের কঠোরতা মুহূর্তেই বদলে গেল। “এখনই খুঁজে আন ওকে!”
আয়মান মাথা নাড়ল। আসাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,“ও পালিয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমরা সবাই ফেঁসে যাব।”
আয়মান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে গেল। হিয়া তখনও তার বাবা মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার চোখের পানি যেন হঠাৎ শুকিয়ে গেছে। শুধু বুকের ভেতর জ্বলছিল আগুন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশে রাখা একটি ভারী ফুলদানির দিকে। পরের মুহূর্তেই—হিয়া ফুলদানিটা তুলে সজোরে আসাদ খানের মাথায় আঘাত করল। আসাদ খান টলতে টলতে এক পা পিছিয়ে গেল। তার মাথা ফেটে র/ক্ত বেরিয়ে এলো। হিয়া আবার আঘাত করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দুইজন লোক পেছন থেকে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।
“ছাড়!” হিয়া পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল।
“ছাড় আমাকে!” সে পা ছুড়তে লাগল, হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। “তোকে আমি শেষ করে ফেলব!” তার চোখে তখন আর কোনো ভয় নেই। শুধু প্রতিশোধের আগুন। “জানোয়ার! তোকে আমি ছাড়ব না!”
আসাদ খান নিজের কপালের র/ক্ত হাত দিয়ে মুছে ধীরে ধীরে হেসে উঠল।ঠিক তখনই বাইরের দরজা আবার খুলে গেল। আয়মান ফিরে এসেছে। আর তার সঙ্গে—অয়ন।
হিয়ার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। “অন্তর!”
কিন্তু অয়ন দাঁড়িয়ে নেই। সে অজ্ঞান। আয়মান তাকে ধরে নিয়ে এসেছে। হিয়ার মাথার ওপরে একটা বজ্রপাত ঘটলো। সে বুঝতেই পারেনি বাড়ির চারপাশে আসাদ খানের লোকজন আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল। অয়ন যতই দৌড়াক, তাদের চোখ এড়িয়ে বের হওয়ার সুযোগ তার ছিল না।
হিয়া প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল “অন্তর!” তারপর লোকগুলোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠল। “আমার ভাইকে ছেড়ে দে!ওর কী দোষ?ও এখনো ছোট!”
হিয়ার গলা কেঁপে উঠল। “ও এই পৃথিবীটাই ঠিকমতো চেনে না!” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,“আমার ভাইকে যেতে দাও!”
আয়মান অয়নকে মাটিতে ফেলে না দিয়ে ধরে রেখেই বাবার দিকে তাকাল “বাবা, ওকে কী করব?”
আসাদ খান একবার অয়নের দিকে তাকাল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল—“গুলি করে দে।”
আয়মান ভ্রু তুলে হাসলো আরঅয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, “নো, বাবা। এতটুকু একটা পুঁচকের জন্য একটা বুলেট খরচ করবে?”
তার ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটল। “হাতপা বেঁধে পাশের লেকে ফেলে দিই। কী বলো?”
আসাদ খান কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাসল। “গ্রেট, মাই ডিয়ার সান।”
হিয়ার বুক কেঁপে উঠল। সে এবার আসাদ খানের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল— “প্লিজ!”
আসাদ কোনো উত্তর দিল না। হিয়া আরও মরিয়া হয়ে বলল,“দয়া করে আমার ভাইকে ছেড়ে দিন! আমাকে মেরে ফেলুন।”
হিয়ার কণ্ঠটা ভেঙে আসছিলো। “আমি বেঁচে থাকলে হয়তো সব বলে দেব। কিন্তু আমার ভাই কিছুই জানে না!”
একবার অয়নের দিকে তাকাল তারপর পুনরায় বললো
“ও এখনো কিছু বোঝে না। ও কারও বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতেও পারবে না!
হিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ওকে ছেড়ে দিন। আমাকে মেরে ফেলুন… প্লিজ।”
আসাদ খান মাথা নাড়ল। “সরি।”
তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র মায়া ছিল না। “এই রিস্ক আমি নিতে পারব না।”
সে ধীরে ধীরে হিয়ার সামনে এগিয়ে এল। “শোন।”
তার কণ্ঠ এবার আরও ঠান্ডা। “তোদের আজকের এই পরিণতির জন্য তোর বাপ নিজেই দায়ী।”
হিয়া স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। আসাদ খান বলতে লাগল “আমি ওকে অফার করেছিলাম। আমার সাম্রাজ্যের একটা বিশাল অংশ ওর নামে লিখে দিতাম।সারাজীবন তুই আর তোর ভাই আরাম আয়েশে কাটাতে পারতিস। আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমি যা করব, সেগুলো ও ধামাচাপা দেবে।”
আসাদ খান ঠান্ডা হেসে বলল,“আমি ওর আপন ভাই।”
আমারই রক্ত।”
তার চোখে এবার ঘৃণা ফুটে উঠল। “কিন্তু ও বলল, ও মরে গেলেও সিআইডির সঙ্গে বেইমানি করবে না।”
হিয়া চুপ করে শুনছিল। আসাদ খান বলেই যাচ্ছিলো
“বরং ও আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছে। আমাকে হুমকি দিয়েছে, আমি যদি এই জগত থেকে সরে না দাঁড়াই, তাহলে সবকিছু নিউজে ফাঁস করে দেবে আর আমাকে অ্যারেস্ট করাবে।”
আসাদ হেসে উঠল। “ও শালা এবার বুঝল এই দুনিয়ায় এত সৎ থাকলে কী হয়।”
হিয়া কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে আসাদ খানের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো অশ্রুতে ভিজে থাকলেও সেই চোখের গভীরে তখনও আগুন জ্বলছে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই কে ভেবেছিস নিজেকে? আমাদের মেরে তুই বেঁচে যাবি?”
হিয়ার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু সেখানে ভয়ের চেয়ে ঘৃণাই বেশি ছিল। “আইনের চোখে ফাঁকি দেওয়া যায় না। আইন তোকে শাস্তি দেবেই। পুরো সিআইডি টিম জানে আমার বাবা কী করছিল। আমার বাবার এই পরিণতির জন্য তোকে কঠোর শাস্তি পেতেই হবে।”
কথাগুলো শুনে আসাদ খান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হিয়ার দিকে এমনভাবে তাকাল, মনে হলো তার কথাগুলো শুনে সে ভীষণ মজা পেয়েছে।
“আইন?” আসাদ খান ধীরে ধীরে হিয়ার দিকে এগিয়ে এল। “তুই এখনো আইন নিয়ে কথা বলছিস?”
তারপর পকেট থেকে কয়েকটা কাগজ বের করে হিয়ার চোখের সামনে ধরল। “এই দেখ।”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে কাগজগুলোর দিকে তাকাল। আসাদ একটা কাগজ আলাদা করে সামনে ধরে বললো
“এই পেপারে তোর বাবার সাইন আছে।”
হিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আসাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “কিসের সাইন জানিস?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। আসাদ নিজেই বলল, “তোদের সবার মৃত্যুর জন্য যে তোর বাবাই দায়ী সেটারই সাইন।”
হিয়ার চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে চেঁচিয়ে বলে উঠলো “মিথ্যা…” তার ঠোঁট কাঁপল। তুই মিথ্যা বলছিস।”
আসাদ কাগজটা নাড়িয়ে হেসে বলল, “এখানে স্পষ্ট লেখা আছে, তোর বাবা নিজের ইচ্ছায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।”
আসাদ এবার আরও নিচু স্বরে বলল, “আর জানিস, শেষ মুহূর্তে তোর বাবা কী করেছিল?”
সে একটু থেমে আবার বলতে লাগলো “তোকে আর তোর ভাইকে বাঁচানোর জন্য এই কাগজে সাইন করে দিয়েছিল।”
হিয়ার চোখের পাতা কাঁপতে লাগল। তার মাথার ভেতর কিছুই ঢুকছিল না। যে বাবা সারাজীবন তাকে সত্য আর আইনের পথে চলতে শিখিয়েছে—সেই বাবার নামেই এখন এমন মিথ্যা অপবাদের কাগজ!
আসাদ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “বোকা ভাই আমার! এত এত অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সিআইডি টিমের কাছ থেকে। বেস্ট অফিসার ছিলো!”
তার হাসি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল “কিন্তু কাল নিউজে কী বের হবে জানিস?”
সে হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “সিআইডি অফিসার ইশতিয়াক খান আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নিজের পরিবারসহ কুখ্যাত স/ন্ত্রাসীদের হাতে নিহত।”
হিয়ার বুকটা ধক করে উঠল।
আসাদ হেসে বলল,“হাহ! তাহলে বল তো, আমাদের ধরবে কে?”
আসাদ খান কাগজগুলো নিজের হাতে গুছিয়ে নিতে নিতে বলল “তোর বাবা যখন নিজেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তখন তার মৃ/ত্যুর জন্য কেউ মাথা ঘামাবে না।সবাই ভাববে, ওর এই পরিণতি প্রাপ্য ছিল।”
হিয়া পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আসাদ এবার কাগজগুলোর দিকে তাকাল, তার চোখে হিংস্র হাসি ফুটে উঠলো।
“আর তোর বাপ এত প্রমাণ জোগাড় করেছিলো না?”
সেই সব ফাইল এখন আমার হাতে।”
সে নিজের হাতটা সামনে তুলে তারপর বললো “যে হাত দিয়ে তোর বাপ আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছিল…”
এক মুহূর্ত থেমে সে বলল,“সেই হাতেই আমি আগে গু/লি করেছি।”
হিয়ার মুখের সমস্ত রং মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।
সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার বাবা নেই। তার মা নেই। তার সামনে তার ছোট ভাই মৃ/ত্যুর মুখে। আর এখন জানতে পারছে—তার বাবার সততা, তার বাবার পরিচয়, তার বাবার সংগ্রাম সবকিছুই মিথ্যা প্রমাণ করার মতো প্রমাণ আসাদ খানের হাতে। এত অল্প বয়সে এত বড় একটা আঘাত তার মনটা একেবারে ভেঙে চুরমার করে দিল। ঠিক তখনই পাশে অয়নের শরীরটা সামান্য নড়ে উঠল। হিয়া চমকে তাকাল।
“অন্তর!”
হিয়া আবার প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। দুজন লোক তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। হিয়া হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে চিৎকার করে উঠল,
“আমার ভাইকে ছেড়ে দে!”
কিন্তু কেউ তাকে ছাড়ল না। সে আরও জোরে ছটফট করতে লাগল। একসময় ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল হিয়া।
তবুও লোক দুটো তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। হিয়া মাটিতে শুয়েই অয়নের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“অন্তর…!”
তারপর আসাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আমার ভাইকে ছেড়ে দে! ওর কী অপরাধ?”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল। “ও তো এখনো শিশু! ও কিছুই জানে না!”
কিন্তু আসাদ খানের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।হিয়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারল আজ হয়তো সে তার ভাইকেও বাঁচাতে পারবে না। তার চোখ চলে গেল বাবা-মায়ের নিথর দেহের দিকে।চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দিও…”
তার গলা কেঁপে উঠল। “আমি পারলাম না…”
সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো “আমি আমার ভাইকে বাঁচাতে পারলাম না।”
তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল, “আব্বু… আম্মু… আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
হিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। “আমি সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকব…”
কয়েক মুহূর্ত পর তার কণ্ঠ আরও ভেঙে গেল। “আমি বাঁচতে চাই না।”
সে মাথা তুলে আসাদ খানের দিকে তাকাল। চোখে তখন অদ্ভুত শূন্যতা। “আমাকে মুক্তি দে।”
একটু থেমে সে বলল, “মেরে ফেল আমাকে।”
আসাদ খান ইশারা করতেই একজন লোক অস্ত্র বের করল। হিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে আর বাধা দিল না। আর ঠিক তখনই—ঘরের প্রধান দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। সবাই থেমে গেল। দরজার সামনে একজন গম্ভীর পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। আলো-আঁধারিতে তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু তার কণ্ঠটা শোনা গেল। ভারী, শীতল আর কর্তৃত্বপূর্ণ একটা কন্ঠ।
“ওয়েট।”
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল। সামনের মানুষটার দিকে তাকাতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। লোকটা ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে এল। তার দৃষ্টি সরাসরি হিয়ার ওপর স্থির। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
— “এত তাড়াতাড়ি ওকে মেরে ফেললে কী হয়?”
আসাদ খান তার দিকে তাকিয়ে রইলো। পুরুষটা আরও এক পা এগিয়ে এল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
“ওটা আমার জিনিস।”
হিয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। লোকটা এবার স্পষ্ট গলায় বলল, “ওকে আমি এখনই মরতে দেব না।”
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতার পর সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা বলল “ওর বাপ আমাকে চড় মেরেছিলো আমি নাকি ওর মেয়ের পায়েরও যোগ্য নই, এবার মরে গিয়ে ওপরে বসেই দেখুক ওর মেয়ের জন্য আমি কতটা যোগ্ কর কোথায়। তাই আগে ওকে আমার বিছানায় চাই।”
হিয়ার মুখ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল।তার চোখে এবার যে আতঙ্ক ফুটে উঠল তা মৃত্যুর আতঙ্কের চেয়েও ভয়ংকর।
বর্তমান।।
আস্তানার ভেতরটা এখন অস্বাভাবিক নীরব। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে চিৎকার, ধস্তাধস্তি আর আতঙ্কে চারপাশ কেঁপে উঠছিল, সেখানে এখন শুধু নিস্তব্ধতা। মেঝের ওপর ছড়িয়ে আছে আসাদ খানের দেহের র/ক্ত। সেই র/ক্তের ওপরই পড়ে আছে হিয়া। তার পুরো শরীর র/ক্তে ভিজে গেছে। চুল এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে। কপাল, গাল, ঠোঁট, গলা সবখানেই র/ক্তের ছোপ।
কিন্তু হিয়া নড়ছে না। শুধু চুপচাপ শুয়ে আছে। তার চোখ দুটো খোলা, অথচ সেই চোখে কোনো কান্না নেই। কোনো ভয় নেই। কোনো অনুভূতিও নেই। হিয়ার পাশেই পড়ে আছে আসাদ খানের ক্ষতবিক্ষত নিস্তেজ শরীরটা। শরীর নিস্তেজ তবুও পুরোপুরি নিস্তব্ধ নয় বুকটা খুব সামান্য ওঠানামা করছে। এখনো অল্প একটু প্রাণ বেঁচে আছে তার।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ইভানা। তাকে ইতিমধ্যে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ইভানা কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিচু গলায় ডাকল,
— “মিস্ট্রেস…”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
ইভানা আবার বলল,“মিস্ট্রেস, এখন কী করবো?”
কয়েক মুহূর্ত পর হিয়ার চোখের পাতা সামান্য নড়ল। সে খুব ধীরে মাথাটা ঘুরিয়ে শূন্য চোখে ইভানার দিকে তাকাল। হিয়া শান্ত গলায় বলল, “তুই চলে যা।”
ইভানা থমকে গেল। “কিন্তু মিস্ট্রেস—”
“বলেছি, চলে যা। কণ্ঠটা খুব জোরালো নয়। তবুও সেই কণ্ঠে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে ইভানা আর কথা বাড়াতে পারল না। হিয়া ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করল। রক্তে ভেজা হাত দিয়ে মেঝেতে ভর দিল। তারপর নিজের শরীরের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত নিজের রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব শান্তভাবে বলল,
“আমাকে ওর র/ক্ত দিয়ে গোসল করতে দে।”
ইভানা চুপ করে রইল। হিয়া আবার বলল,
“যা করার… আমি করবো।”
ইভানা বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে হিয়াকে থামানো যাবে না। তবুও সে যাওয়ার আগে একবার আসাদ খানের দিকে তাকাল। তারপর আবার হিয়ার দিকে।
“মিস্ট্রেস… আপনি নিশ্চিত?”
হিয়া এবার কোনো উত্তর দিল না। শুধু আসাদ খানের দিকে একবার তাকাল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,“তুই যা, ইভানা।”
ইভানা আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে সে সেখান থেকে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আস্তানার সেই বিশাল ঘরে এখন হিয়া আর আসাদ খান ছাড়া আর কেউ নেই।হিয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের রক্তমাখা মুখে হাত বুলিয়ে নিল। চোখ দুটো আবার গিয়ে থামল আসাদ খানের নিস্তেজ শরীরের ওপর। তার চোখে তখনও কোনো অশ্রু নেই। শুধু রয়েছে স্থিরতা।
ইভানার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হিয়া আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা কান্নাটা হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। রক্তে ভেজা মেঝের ওপরই হিয়া গড়িয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার চুল, মুখ, শরীর সবকিছু রক্তে ভেজা। অথচ সেই রক্তের মধ্যেই যেন আজ সাত বছরের পুরোনো একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি লেখা হয়ে গেছে। হিয়া কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বলল,“সাত বছর…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “পুরো সাত বছর ধরে অপেক্ষা করেছি…”
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল রক্তের সঙ্গে মিশে। “একটা একটা দিন… একটা একটা রাত… শুধু এই দিনের জন্য।”
সে চোখ মুছে ধীরে ধীরে আসাদ খানের দিকে তাকাল।
জানোয়ারটা এখনো সামান্য প্রাণ নিয়ে পড়ে আছে।হিয়ার চোখে তখন কান্নার পাশাপাশি শীতলতা।
“প্রথম শত্রু…”
সে থামল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“শেষ।”
হিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে আবার মেঝেতে মুখ গুঁজে কয়েক মুহূর্ত কাঁদল। এই কান্না দুর্বলতার নয়। এটা সাত বছরের জমে থাকা প্রতিশোধের পর মুক্ত হয়ে যাওয়া কান্না।
তারপর ধীরে ধীরে হিয়া উঠে বসল। রক্তমাখা মুখটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। চোখের পানি মুছে ফেলল। তার চোখে আবার সেই পুরোনো আগুন জ্বলে উঠল। যে আগুন সাত বছর আগে জন্মেছিল। হিয়া ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গেল। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল আসাদ খানের ওপর। “তোর হিসাব মিটেছে।”
তারপর ঠোঁটের কোণে একফোঁটা কঠিন হাসি ফুটে উঠল।
“এবার…”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “আয়মান।”
নামটা উচ্চারণ করতেই তার চোখের দৃষ্টি আরও ধারালো হয়ে উঠল। “ওকে শেষ করতে আমার এতটা কাঠখড় পোড়াতে হবে না।”
হিয়া রক্তমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মুঠো শক্ত করল। সাত বছর ধরে সে প্রতিশোধের জন্য অপেক্ষা করেছে। আজ সেই প্রতিশোধের প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। কারণ অতীতের সেই অসহায় হিয়া অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আজকের হিয়া হচ্ছে ভাইপার। আর ভাইপারের কাছে কোনো শত্রুর জন্য দ্বিতীয় সুযোগ বলে কিছু নেই।
হিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর আসাদ খানের শরীরটার কাছে গিয়ে নিচু হলো। দু’হাত দিয়ে শরীরটা ধরে টেনে তুলতে চেষ্টা করল। ভারী শরীরটা মেঝেতে ঘষটে এগোতে লাগল। হিয়া একবারও থামল না। রক্তমাখা মেঝে পেরিয়ে সে আসাদ খানকে টেনে নিয়ে গেল আস্তানার পেছনের জঙ্গলের দিকে। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে চারপাশের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এল। কিছুদূর যেতেই গাছপালার আড়াল থেকে ভেসে এল পানির শব্দ।
সামনেই সেই খাল। কালো, গভীর পানির সেই খালটায় অজস্র কুমির ঘুরে বেড়ায় আর এগুলো সবটাই হিয়ার নিজস্ব কুমির। হিয়া খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাল। পানির ওপর কয়েকটা কুমিরের চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে।
হিয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আসাদ খানের শরীরটার দিকে শেষবারের মতো তাকাল।
“সাত বছর ধরে যে হিসাবটা বয়ে বেড়িয়েছি…”
তার কণ্ঠ ছিল একেবারে ঠান্ডা। “আজ সেটা শেষ।”
হিয়া শরীরটা টেনে খালের একেবারে কিনারায় নিয়ে গেল।
তারপর কোনো দ্বিধা না করে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিল। ছপাৎ করে শব্দ হলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য পানির ওপর ঢেউ উঠল। তারপর অন্ধকার পানির নিচ থেকে একের পর এক কুমির এগিয়ে এল। হিয়া নির্বিকার চোখে দৃশ্যটা দেখল। তার মুখে কোনো বিজয়ের হাসি নেই। শুধু দীর্ঘ সাত বছরের প্রতিশোধ শেষ করার পর এক ধরনের শূন্যতা।
কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। পেছনে তাকাল না। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুধু একবার খুব নিচু স্বরে বলল “বিদায়, আসাদ খান।” তারপর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল ভাইপার।
এদিকে দুবাই। রাত তখন অনেক গভীর। শহরের ঝলমলে আলোয় ঘেরা বিশাল পেন্টহাউসের এক কোণে বসে ছিল দানিয়েল। তার সামনে ল্যাপটপ খোলা। চারপাশে নীরবতা।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল। দানিয়েল স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে সংক্ষিপ্ত একটা রিপোর্ট এলো।
“বস… মিশন শেষ।”
দানিয়েলের চোখ সরু হয়ে গেল। “আর হিয়া?”
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“মিস্ট্রেস নিরাপদে আছেন। তিনি টাউন হাউসে ফিরে গেছেন।”
দানিয়েলের মুখের পেশিগুলো এতক্ষণে সামান্য শিথিল হলো। সে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
“আর আসাদ খান?”
ওপাশ থেকে এবার আরও নিচু গলায় উত্তর এলো,
“আসাদ খানের অধ্যায়ও শেষ, বস।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে আটকে থাকা একটা ভার অবশেষে নেমে গেল।
“গুড।” একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতর ছিল স্বস্তি।
দানিয়েল আবার ল্যাপটপের দিকে তাকাল। তার চোখে এবার অন্যরকম একটা হিসাব। আসাদ শেষ। কিন্তু এই গল্প এখানেই শেষ নয়।কারণ পরের দিন—সারা দেশ জানতে চলেছে আসাদ খান কিভাবে মারা গেলো।
লন্ডন শহর!
অনেকটা রাত হয়ে গেছে। হায়াস ম্যানসনের চারপাশ তখন নিস্তব্ধ। বাড়ির অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। বিশাল ড্রয়িংরুমে শুধু কয়েকটি মৃদু আলো জ্বলছে। সোফায় একা বসে ছিল লিওন। তার হাতে কয়েকটি ফাইল। চোখ স্থির হয়ে আছে সেগুলোর ওপর। কিন্তু তার মুখের কঠোরতা বলছিল, সে শুধু কোনো সাধারণ রিপোর্ট পড়ছে না কোনো একটা বিষয় তার সন্দেহের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
ঠিক তখনই মূল দরজা খোলার শব্দ হলো। রুদ্রনীল ভেতরে ঢুকল। সম্ভবত কোনো কাজ শেষ করেই ফিরেছে। ক্লান্ত মুখে কোটটা খুলতে খুলতে সে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। লিওনকে দেখে এক মুহূর্ত থামল, তারপর কোনো ভনিতা না করে সোফায় গিয়ে বসল। রুদ্রনীল কিছু বলার আগেই লিওন ফাইলটা বন্ধ করল। তারপর সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“আসাদ খানের আন্ডারওয়ার্ল্ডের চালানগুলোর কাগজপত্রে আপনার বর্তমান কোম্পানির নাম কেন আছে ব্রো?”
রুদ্রনীলের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
কিন্তু লিওন থামল না। “আর একটা প্রশ্ন। সাত বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সঙ্গে আপনি কি কোনোভাবে জড়িত ছিলেন?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। রুদ্রনীল ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “লিওনার্দো, তুমি কি আমাকে জেরা করছ?”
লিওনার্দোর চোখের দৃষ্টি একটুও নড়ল না “আপনার কী মনে হয়, একজন CID অফিসার মাঝরাতে আপনার সঙ্গে বসে প্র্যাংক করবে?”
রুদ্রনীলের হাসিটা এবার কিছুটা মিলিয়ে গেল। সে গম্ভীর হয়ে বলল,“লিওনার্দো, তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ? ভুলে যেও না, আমি তোমার বোনের স্বামী।”
লিওন ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ এবার আরও ঠান্ডা।
“সরি।”
এক মুহূর্ত থেমে সে স্পষ্ট করে বলল, “এই মুহূর্তে আপনার সামনে বসে থাকা মানুষটা আপনার শ্যালক লিওনার্দো নয়।”
রুদ্রনীল চুপ করে তাকিয়ে রইল।
“আপনার সামনে বসে থাকা মানুষটা সিআইডি অফিসার লিওনার্দো হায়াস।”
লিওনের চোখে তখন পেশাগত কঠোরতা।
“আর একজন CID অফিসার হিসেবে আমি একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জেরা করছি। কোনো বোনজামাইকে নয়।”
লিওন টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে ইঙ্গিত করে বললো। “আমার কাছে অন্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। সেটা যদি আমার নিজের পরিবারের কেউও হয়, তবুও নেই।”
রুদ্রনীল কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে এবার শান্ত গলায় বলল,
“দেখো লিওনার্দো, ওই কোম্পানিতে আমি খুব সম্প্রতি জয়েন করেছি। কোম্পানিটা আগে আমার বাবার ছিল। আর বাবা যাঁর কাছ থেকে কোম্পানিটা কিনেছিলেন, তিনিও মারা গেছেন।”
সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো “হয়তো সেই লোকই এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সত্যি বলতে, আমার জানা নেই।”
লিওন নীরবে শুনছিল। রুদ্রনীল এবার একটু বিরক্তির সুরে বলল, “আমি সারাদিন কোম্পানির কাজ সামলাতে পারি না। কোম্পানির বেশিরভাগ কাজ ম্যানেজমেন্টই দেখে। তার ওপর আমি সারাদিন তোমার বোনকেই সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। কোম্পানির প্রতিটা কাগজপত্র ঘেঁটে দেখার মতো সময় আমার নেই।”
লিওন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। ফাইলটা হাতে তুলে নিয়ে তারপর ধীর গলায় বলল, “সমস্যা নেই। যদি তদন্তে আপনার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে এ নিয়ে আমি আপনাকে আর প্রশ্ন করব না।”
রুদ্রনীল কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু লিওন সিঁড়ির দিকে এগিয়েও কিছুটা থামল। তারপর পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল, “তবে একটা কথা মনে রাখবেন।”
রুদ্রনীল তার দিকে তাকাল।
“এই তদন্তে যদি আর একবারও আপনার নাম আসে, তখন আপনাকে আবার আমার মুখোমুখি হতে হবে।”
লিওনের কণ্ঠস্বরে কোনো হুমকি ছিল না। ছিল কেবল একজন সিআইডি অফিসারের নিরপেক্ষ সতর্কতা।
“তখন আপনি আমার বোনের স্বামী এই পরিচয়টা আপনার কোনো কাজে আসবে না।”
কথাটা বলে লিওন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে সোজা ড্রয়িংরুম থেকে সিড়ি বেয়ে উঠে গেল। লিওনের পদধ্বনি মিলিয়ে যেতেই রুদ্রনীলের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর নিচু স্বরে নিজেকেই বলল, “পিঁপিলিকার পাখা গজায়… মরিবার তরে।”
তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।কিন্তু এবার সেই হাসির আড়ালে অন্য কোনো হিসাব লুকিয়ে ছিল।
পরের দিন সকাল হতেই পুরো শহরজুড়ে একটাই খবর ছড়িয়ে পড়লো।
টেলিভিশনের প্রতিটি নিউজ চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে ভেসে উঠছে একই নাম—“আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম প্রভাবশালী নাম আসাদ খান মৃ/ত!”
একটি নিউজ চ্যানেলের পর্দায় আসাদ খানের পুরোনো ছবি ভেসে উঠল। ছবির নিচে লাল অক্ষরে লেখা—BREAKING NEWS
সাংবাদিকের কণ্ঠে একের পর এক তথ্য উঠে আসতে লাগল
“গতরাতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশের কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আসাদ খানের। দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক পাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও এতদিন পর্যন্ত তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।”
পর্দায় একের পর এক ফুটেজ দেখানো হতে লাগল—আসাদ খানের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, তার বিলাসবহুল বাড়ি, গোপন গোডাউন এবং পুলিশের পুরোনো তদন্তের কিছু ছবি।
সাংবাদিক আবার বলল,“তদন্তে উঠে এসেছে, দেশের বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আসাদ খানের অপরাধ সাম্রাজ্য। তার বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য জমা হচ্ছিল।”
কিছুক্ষণ পর পর্দায় ভেসে উঠল আরও একটি শিরোনাম—“তবে কে হ*ত্যা করল আসাদ খানকে?”
সাংবাদিকের কণ্ঠ এবার আরও গম্ভীর। “সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এখনো পর্যন্ত আসাদ খানের মরদেহ উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ রক্তের নমুনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করেছে। সেই আলামত অনুসরণ করতে গিয়ে তদন্তকারীরা জঙ্গলের ভেতর একটি দুর্গম খালের কাছে পৌঁছেছেন।”
পর্দায় দেখানো হলো ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালো পানির একটি খাল।
সাংবাদিক বলল,“স্থানীয় সূত্র এবং তদন্তকারীদের ধারণা, ওই খালেই ম*রদেহ ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। খালটিতে প্রচুর কুমির থাকায় সেখানে ম*রদেহের কোনো অংশ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এরপরই নিউজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সামনে এলো।
“এই হ*ত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘ভাইপার’ নামটি আবারও উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে।”
“দেশের অপরাধজগতের অন্যতম রহস্যময় নারী অপরাধী হিসেবে পরিচিত ভাইপারকে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন হ*ত্যাকাণ্ড, প্রতিশোধমূলক হামলা এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত আসাদ খানের হ*ত্যাকাণ্ডে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পুলিশের হাতে নেই।”
সাংবাদিক থামল। তারপর পুনরায় বলল,
“পুলিশের আরেকটি বড় লক্ষ্য এখন আসাদ খানের ছেলে—আয়মান খান।”
পর্দায় আয়মানের একটি পুরোনো ছবি ভেসে উঠল।
“আয়মান খান বর্তমানে নিখোঁজ। তদন্তকারীরা তাকে খুঁজছেন। পুলিশের ধারণা, বাবার অপরাধ সাম্রাজ্য এবং সাম্প্রতিক হ*ত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার কাছে থাকতে পারে।”
অন্যদিকে—একটি অন্ধকার ঘরে বসে আয়মান নিঃশব্দে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আসাদ খান মৃ/ত। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় লা/শ নেই। আয়মান চোখ সরাতে পারল না পর্দা থেকে। জঙ্গলের সেই খালের দৃশ্য দেখেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে একটাই শব্দ বের হলো—“ভাইপার…”
সে জানত। এটা কোনো সাধারণ হ/ত্যাকাণ্ড নয়। আসাদ খানকে যে মেরেছে, সে তাকে শুধু হ/ত্যা করেনি তার অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিয়েছে।
আয়মান চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ে গেল বাবার শেষ কয়েকটি কথা। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে টেলিভিশনের দিকে তাকাল। পুলিশ এখনো ঠিকভাবে জানে না হত্যাকারী কে। কিন্তু আয়মান জানে—ভাইপার তার বাবার পেছনে ছিল।
আর যদি সত্যিই ভাইপারই এটা করে থাকে…তাহলে পরবর্তী টার্গেট কে হবে? তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে—ভাইপার কোনো শ/ত্রুকে অর্ধেক কাজ করে ছেড়ে দেয় না। আর এবার পুলিশের সন্দেহের তালিকার শীর্ষে যে নামটি উঠে এসেছে—সেটাও তারই। ভাইপার।
আসাদ খানের মৃ/ত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তের পরিধি বেড়ে গেল। এবার শুধু লন্ডনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়—পুরো ইন্টারপোল তদন্তে নেমে পড়েছে। আসাদ খানের আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, তার অবৈধ ব্যবসা, অস্ত্রের চালান, অর্থের উৎস এবং তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে একযোগে তদন্ত শুরু হলো।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলো একজনকে—
আয়মান খান।
দেশের সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথে নজরদারি বাড়ানো হলো। কিন্তু আয়মান জানত, তাকে খুঁজতে পুলিশ প্রথমেই বিমানবন্দরগুলোতে যাবে। তাই সে বিমানপথ বেছে নিল না।
গভীর রাতে শহর ছেড়ে একটি কালো গাড়ি থেমস নদীর তীরের দিকে এগিয়ে চলল। গাড়ির ভেতরে বসে আয়মান পুরো সময়টুকু চুপ করে ছিল। তার মুখে কোনো উৎকণ্ঠা নেই। সে আগে থেকেই সবকিছু ঠিক করে রেখেছে। গাড়ি থামতেই সামনে দেখা গেল বিশাল একটি জাহাজ।
থেমস নদীর কালো পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজটি দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এটা কোনো সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ নয়। জাহাজের ডেকে সশস্ত্র লোকজন অবস্থান করছিল। ভেতরে ছিল অস্ত্রের মজুত, যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং নিরাপত্তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। বহুদিন ধরে আসাদ খানের লোকজন এই জলপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন অবৈধ চালান পরিচালনা করত। আয়মান গাড়ি থেকে নেমে সোজা জাহাজে উঠে গেল। তার সঙ্গে থাকা লোকজনও একে একে উঠে পড়ল। একজন এগিয়ে এসে বলল,
“স্যার, সব প্রস্তুত।”
আয়মান চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেউ পিছু নিয়েছে?”
“না, স্যার।”
“পুলিশ?”
“কাউকে দেখা যায়নি।”
আয়মান মাথা নাড়ল।
“তাহলে রওনা দাও।”
কয়েক মুহূর্ত পর জাহাজের ইঞ্জিন চালু হলো। ভারী শব্দে কেঁপে উঠল পুরো জাহাজ। ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে থেমস নদীর গভীর অংশের দিকে এগিয়ে গেল সেটি। তীরের আলো পেছনে পড়ে রইল। আয়মান ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থেমস নদীর কালো পানিরদিকে তাকিয়ে রইল। তার চারপাশে ছিল তার বিশ্বস্ত লোকজন।
অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশ তখনও আয়মানকে খুঁজছে। বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি চলছে। সীমান্তে তল্লাশি চলছে। ইন্টারপোলের কাছে তার তথ্য পাঠানো হচ্ছে।
কেউ জানে না—আয়মান ইতোমধ্যেই নদীপথে লন্ডনের সীমানা ছাড়ার পথে। জাহাজটি অন্ধকার থেমস নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলল। আয়মান শেষবারের মতো পেছনে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“এবার আমাকে খুঁজে দেখো।”
তার ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটল। “ভাইপার… এবার খেলাটা আমার।”
ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে থেমস নদীর বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকার কেটে আকাশে ফিকে আলো ফুটতে শুরু করেছে। আয়মান তখনও জাহাজের ডেকেই দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ দূরে নদীর ওপর তার চোখ আটকে গেল। একটি স্পিডবোট। সোজা তাদের জাহাজের দিকে ছুটে আসছে।
আয়মান চোখ সরু করে তাকাল। স্পিডবোটটা যত এগিয়ে আসছিল, ততই তার ভেতরে থাকা মানুষগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
প্রথমে একজন। তারপর আরেকজন।
তারপর—আয়মানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
ইভানা।
তার পাশে মার্ক।
জ্যাক।
আর স্পিডবোটের সামনে—ভাইপার।
আয়মানের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। “ওরা এখানে কীভাবে এলো?”
তার পাশে থাকা একজন লোক তাকিয়ে বলল,“স্যার, ওরা আমাদের পিছু নিয়েছে!”
আয়মান আর কোনো কথা বলল না। কোমর থেকে পিস্তল বের করে স্পিডবোটের দিকে তাক করল।
প্রথম গু/লি ছুটে গেল। স্পিডবোটের পাশের পানিতে গিয়ে পড়ল। আয়মান আবার গু/লি করল। কিন্তু স্পিডবোটের গতি কমল না। বরং আরও দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল।
“ওটাকে থামাও!” আয়মান চিৎকার করল।
জাহাজের কয়েকজন লোকও অস্ত্র হাতে ডেকের দিকে ছুটে এল। তারা গু/লি চালাতে শুরু করল। কিন্তু মার্ক তখন স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রেখেছে। সে ছিল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
গু/লির শব্দে তার হাত কাঁপল না। এক মুহূর্ত ডানদিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে স্পিডবোটটাকে পাশ কাটিয়ে দিল।
এক ঝাঁক পানি ছিটকে উঠল। গু/লিগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পানিতে পড়তে লাগল।
জ্যাক পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,“আর কতক্ষণ?”
মার্ক চোখ না সরিয়েই বলল,“আর কয়েক সেকেন্ড।”
ইভানা অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আর স্পিডবোটের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়া।
তার চোখ সরাসরি আয়মানের দিকে। দুই পক্ষের দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে। আয়মান আবার পিস্তল তুলল। ঠিক তখনই মার্ক স্পিডবোটটাকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দিল যে আয়মানের গুলি আবারও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।
মার্ক ঠান্ডা গলায় বলল,“আমাকে গু/লি করে থামানো এত সহজ নয়।”
স্পিডবোট এবার জাহাজের একেবারে কাছে। হিয়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার চোখে কোনো ভয় নেই। শুধু কঠিন দৃষ্টি। আয়মানের মুখে এবার প্রথমবারের মতো উত্তেজনা দেখা গেল।সে বুঝে গেল—লন্ডন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথটা এত সহজ হবে না।
ইভানা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে স্পিডবোটের সামনের অংশে রাখা ভারী রাইফেলটা তুলে নিল। আয়মানের লোকজন তখন জাহাজের ডেকজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইভানা নিশানা করে বুলেট ছুঁড়তেই একজন সশস্ত্র লোক মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তারপর একের পর এক বুলেট ছুটতে লাগল। ইভানার নিশানা ছিল নিখুঁত। জাহাজের ডেকে থাকা লোকগুলো পাল্টা গু/লি চালানোর চেষ্টা করলেও ইভানা এক মুহূর্তের জন্যও তাদের সুযোগ দিল না। মার্ক স্পিডবোটটাকে জাহাজের গা ঘেঁষে নিয়ে এল।
“এখন!”
মার্ক চিৎকার করতেই প্রথমে জ্যাক লাফ দিয়ে জাহাজের ডেকে উঠে পড়ল। তারপর ইভানা। সবশেষে হিয়া।
স্পিডবোট থেকে জাহাজের ডেকে পা রাখতেই চারপাশে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। জ্যাক একসঙ্গে দুজনকে সামলাতে শুরু করল।ইভানা অস্ত্রের আঘাতে একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাবু করছে।
আর হিয়া সে তো থামার জন্য আসেনি। যে লোকই তার সামনে আসছে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।
জাহাজের একপাশে তখনও লড়াই চলছে। কিন্তু আয়মান বুঝে গেছে—এই লড়াই সে জিততে পারবে না।
সে ধীরে ধীরে পেছাতে পেছাতে জাহাজের অন্য প্রান্তে চলে গেল। সেখানে একটি ছোট বোট বাঁধা ছিল। আয়মান দ্রুত দড়ি খুলতে শুরু করল।
“আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে।”
সে বোটটা পানিতে নামিয়ে ফেলল।ঠিক যখন নিচে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে— পেছন থেকে একটি হাত এসে তার কলার চেপে ধরল। আয়মান ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই হিয়া তাকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল।
ঠাস করে একটি ঘুষি সরাসরি পড়লো তার মুখে। আয়মান টলে গেল। হিয়া আবার তার কলার ধরে টেনে কাছে আনল।
আরেকটি আঘাত। আয়মান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“কেন করছো এসব, ভাইপার?”
হিয়া তার কলার আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
আয়মান দাঁত চেপে বলল,“আমার বাবাকে মেরে ফেলেছিস! এবার আমাকে কেন আটকাচ্ছিস?”
হিয়ার চোখ দুটো ঠান্ডা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“এত সহজে আজরাইলের হাত থেকে পালিয়ে জান বাঁচানো যায় কখনো দেখেছিস?”
আয়মান কিছু বলল না। হিয়া তার মুখের আরও কাছে গিয়ে বলল, “আমার নাকের ডগা দিয়ে পালাবি?”
তার ঠোঁটে সামান্য বাঁকা হাসি ফুটল। “আমাকে চিনিসইনি তুই।”
ঠিক তখনই—হিয়ার কানে থাকা কমিউনিকেশন ডিভাইসে একটি ক্ষীণ সিগন্যাল এলো।
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। সে মাথা ঘুরিয়ে মার্কের দিকে তাকাল। তারপর হাতের ইশারায় তাকে ডাকল। মার্ক কাছে আসতেই হিয়া নিচু স্বরে বলল,
“তোমরা চলে যাও এখনই।”
মার্ক এক মুহূর্ত আয়মানের দিকে তাকাল তারপর জিজ্ঞেস করলো “কেনো?”
হিয়া আয়মানের দিকে তাকিয়ে বলল,“আমি একাই ওকে সামলাতে পারবো।”
জ্যাক তখনও শেষ কয়েকজনকে কাবু করছে।ইভানা অস্ত্র নামিয়ে চারপাশে তাকাল।
হিয়া আবার বলল, “CID-এর সিগন্যাল।”
মার্কের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। “ওরা আসছে?”
হিয়া মাথা নাড়ল।“কয়েক মিনিটের মধ্যে।”
এবার আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।তিনজন দ্রুত জাহাজের অন্য পাশে চলে গেল। সেখানে আরেকটি ছোট বোট প্রস্তুত ছিল। এক এক করে ইভানা, জ্যাক এবং মার্ক বোটে উঠে পড়ল। বোটের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। মার্ক স্টিয়ারিং ধরল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোটটা জাহাজ থেকে দূরে সরে গেল।
আয়মান তখনও হিয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে রাগের সঙ্গে এবার প্রশ্নও জমেছে। সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আমাকে মারতে চাইছ কেন?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। আয়মান আবার বলল,
“আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি?”
একটু থেমে সে বলল, “বরং এতদিন তো আমি তোমার সাপোর্টেই ছিলাম। তোমার পাশে ছিলাম। তাহলে আমার সঙ্গে এমন করছ কেন?”
হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই।শুধু জমে থাকা সাত বছরের প্রতিশোধ।
সে শান্ত গলায় বলল, “তুই জানতে চাস আমি তোকে কেন মারতে চাই?”
আয়মান তাকিয়ে রইল। হিয়া তার একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “যেভাবে তুই আমার ভাইকে হাত-পা বেঁধে লেকের পানিতে ফেলে দিয়েছিলি…”
কথাটা শুনতেই আয়মানের মুখের ভাব বদলে গেল।
হিয়া বলল,“তোকে ঠিক সেভাবেই কষ্ট দেব আমি।”
আয়মানের চোখ বড় হয়ে গেল।তার মুখ থেকে অস্ফুটভাবে বেরিয়ে এল “ভাই…?”
সে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,“তুমি… তুমি কে?”
হিয়া এবার তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। “তোর যম।”
আয়মান কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।
হিয়া ধীরে ধীরে বলল,“শুনে রাখ।”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।“আমি সেই হিয়া…”
আয়মানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
“যাকে তুই আর তোর বাবা মিলে নরকের যন্ত্রণা দিয়েছিস সারাজীবনের জন্য ।”
আয়মানের মুখ থেকে এবার আর কোনো শব্দ বের হলো না। হিয়া বলতে লাগলো “সাত বছর ধরে তুই ভেবেছিস হিয়া মরে গেছে।”
এক মুহূর্ত থেমে সে বলল, “ভুল ভেবেছিলি।”
তার চোখে এবার আগুন জ্বলে উঠল। “আমি মরিনি, আয়মান।আমি বেঁচে ছিলাম। শুধু একটা দিনের অপেক্ষায়…”
হিয়া তার দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা বলল,“যেদিন তোর সামনে দাঁড়িয়ে তোকে তোর সবকিছুর হিসাব বুঝিয়ে দেব।”
আয়মান যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার ঠোঁট কাঁপল।“হিয়া…?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।শুধু স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।আর সেই মুহূর্তে আয়মান প্রথমবার বুঝল—সে এতদিন যাকে ভাইপার ভেবে প্রেমে পড়েছে, সে আর কেউ নয়।
তার চাচাতো বোনহিয়া। যে মেয়েটাকে সাত বছর ধরে সে মৃত ভেবেছিল।আর আজ—সেই মেয়েটাই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার যম হয়ে।
হিয়া আয়মানের হাত দুটো শক্ত করে বাঁধল। হিয়ার শক্তি আর ক্ষমতার কাছে আয়মান টিকতে পারেনি। তারপর হিয়া আয়মানের পা দুটোও দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। আয়মান এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল।
“হিয়া, তুই কী করতে যাচ্ছিস?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে আয়মানকে টেনে জাহাজের পেছনের দিকে নিয়ে গেল। মোটা দড়ির এক প্রান্ত আয়মানের শরীরের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধল, আর অন্য প্রান্ত বেঁধে দিল জাহাজের পেছনের শক্ত রেলিংয়ের সঙ্গে। আয়মানের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“না… হিয়া, এটা করিস না!”
হিয়া তার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,“কেন?”
একটু থেমে বলল,“ভয় লাগছে?”
আয়মান কিছু বলতে পারল না। হিয়া ধীরে ধীরে বলল,
“সাত বছর আগে আমার ভাই যখন পানির মধ্যে পড়ে বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, তখন তো তোর এতটুকু মায়া লাগেনি।”
আয়মান মরিয়া হয়ে মাথা নাড়ল।“হিয়া, প্লিজ!”
হিয়া পেছনে সরে গেল। “আজ শুধু বুঝবি—ভয় কাকে বলে।”
জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠল। পরের মুহূর্তে জাহাজ চলতে শুরু করল। আয়মানের শরীর সরাসরি পানিতে টেনে নামল। সে কিছু বোঝার আগেই পানির স্রোত তাকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে গেল।এক মুহূর্তে তার মুখ পানির নিচে ডুবে গেল। সে প্রাণপণে মাথা তুলতে চেষ্টা করল।
কিন্তু হাত-পা বাঁধা। জাহাজ যত দ্রুত সামনে এগোতে লাগল, পানির টানও তত তীব্র হয়ে উঠল।আয়মানের মুখ আবার পানির নিচে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর সে মরিয়া হয়ে মাথা তুলে চিৎকার করল—“বাঁচাও!”
কিন্তু তার চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই আবার পানির ঢেউ এসে তার মুখ ঢেকে দিল।সে দম নেওয়ার জন্য মাথা তুলল।
“বাঁচাও…!”
আবার পানির নিচে। আবার টেনে নিয়ে যাওয়া। আবার শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা।
“হিয়া!” কণ্ঠটা এবার ভেঙে গেছে।
“প্লিজ… আমাকে বাঁচাও!”
জাহাজ থামল না। হিয়া জাহাজের পেছনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখনও সেই একই কঠিন দৃষ্টি।
আয়মান আবার মাথা তুলল।তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“হিয়া… আমি ভুল করেছি… প্লিজ!”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে বলল,
“আমিও তোকে সেদিন অনেক অনুরোধ করেছিলাম—আমার ভাইকে ছেড়ে দিতে।”
তার চোখ দুটো আরও কঠিন হয়ে উঠল। “তুই শুনিসনি।”
জাহাজ নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলল।
আর আয়মান—জাহাজের পেছনে বাঁধা অবস্থায় পানির স্রোতের সঙ্গে টেনে-হিঁচড়ে যেতে লাগল।
একবার মাথা পানির ওপরে উঠছে—পরক্ষণেই আবার ডুবে যাচ্ছে।
প্রতিবারই তার মুখ থেকে একই আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে—“বাঁচাও…!” কিন্তু নদীর বিশাল বুক সেই চিৎকার গিলে নিচ্ছে।
দূর থেকে হঠাৎ হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে এলো।
প্রথমে ক্ষীণ। তারপর ধীরে ধীরে শব্দটা তীব্র হয়ে উঠল। আকাশের দিকে তাকাতেই হিয়া দেখতে পেল—একটি নয়, একাধিক হেলিকপ্টার জাহাজটিকে ঘিরে ফেলেছে। নিচে নদীর বুক চিরে এগিয়ে আসছে কয়েকটি স্পিডবোট। পুরো এলাকাটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘিরে ফেলেছে CID।
একটি হেলিকপ্টার থেকে মাইকের মাধ্যমে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো “ভাইপার! তোমার জাহাজ সম্পূর্ণভাবে ঘেরাও করা হয়েছে। অস্ত্র নামিয়ে আত্মসমর্পণ করো।”
আরেকবার ঘোষণা হলো—“ভাইপার, এটাই শেষ সতর্কবার্তা। আত্মসমর্পণ করো।”
হিয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর চোখ গেল পানির দিকে। আয়মান তখনও বাঁচার চেষ্টায় ছটফট করে যাচ্ছে। হিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“তুই লাকি।” একটু থেমে সে বলল,“বেশি কষ্ট না পেয়েই মরতে হচ্ছে।”
হিয়ার চোখে কোনো আবেগ ছিল না। সে আয়মানের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,“গুডবাই।”
তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে যোগ করল, “তোর বাপের কাছে তোকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
পরপর কয়েকটি গু/লির শব্দে নদীর নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে দড়িটা ছেড়ে দিল। আয়মানের দেহ পানির স্রোতের মধ্যে তলিয়ে গেল। হিয়া আর পেছনে তাকাল না।
এখন পুরো জাহাজে সে একা।কিন্তু একা মানেই অসহায় নয়। জাহাজে যে পরিমাণ অস্ত্র আর বিস্ফোরক রয়েছে, সেটা সিআইডি আগেই জানে। তাই স্পিডবোটগুলো যতই কাছে আসতে লাগল, হিয়া মুহূর্তের মধ্যে একটি ভারী অস্ত্র তুলে নিল।
প্রথম স্পিডবোটের সামনে আঘাত লাগতেই সেটি ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে গেল। আরেকটি বোট এগিয়ে এলো। হিয়া এবার সেটার দিকে নিশানা করল। বোটটিও কাত হয়ে বিশাল নদীতে উল্টে গেল। একটার পর একটা স্পিডবোট জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছিল। আর হিয়া একাই তাদের প্রতিহত করে চলেছে।
কিন্তু এবার আকাশের দিকে তাকাতেই তার হাত থেমে গেল। হেলিকপ্টারগুলো অনেকটা কাছে চলে এসেছে। হিয়ার হাতে তখন পিস্তল। তারপর সে একটি স্নাইপার তুলে নিল।
টার্গেট করার জন্য স্কোপে চোখ রাখল। একটি হেলিকপ্টার তার নিশানায় এলো।হিয়ার আঙুল ট্রিগারের ওপর স্থির হয়ে গেল।
কিন্তু সে গু/লি করল না। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি মুখ—লিওন তার দিলবার তার একমাত্র বাজপাখি।
হিয়া জানে না কোন হেলিকপ্টারে সে আছে। যদি ওই হেলিকপ্টারেই লিওন থাকে? তার হাত ধীরে ধীরে নেমে গেল। “না…”
সে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে উঠল। আবার অন্য একটি হেলিকপ্টারের দিকে তাক করল।কিন্তু এবারও ট্রিগারে চাপ দিতে পারল না। তার বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।
একদিকে ভাইপার। যে কখনো শত্রুর সামনে থামে না।
অন্যদিকে সে হিয়া। যে তার লিওনকে নিজের হাতে আঘাত করতে পারবে না।
হেলিকপ্টার থেকে আবার ঘোষণা এলো—“ভাইপার! শেষবারের মতো বলছি অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করো!”
হিয়া স্নাইপারটা নামিয়ে ফেলল। তার চোখ তখনও আকাশের প্রতিটি হেলিকপ্টার খুঁজে বেড়াচ্ছে। একটাই প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছে—“আমার লিওন কোনটায়?”
আর এই প্রথমবার ভাইপার গু/লি ছোড়ার আগে ভয় পাচ্ছে। নিজের জন্য নয়। নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে ভুল করে হারিয়ে ফেলার ভয়ে।
এদিকে জাহাজটা থামার কোনো নামই নিচ্ছে না। একটার পর একটা স্পিডবোট জাহাজের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, আর হিয়া দূর থেকেই সেগুলো লক্ষ্য করে গু/লি ছুড়ছে। তার চোখে তখন একটাই সংকল্প সিআইডির হাতে ধরা পড়ার আগেই তাকে এখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে।
ঠিক তখনই—লিওনের চোখে পড়ল, একটি স্পিডবোট প্রায় জাহাজের গা ঘেঁষে চলে এসেছে। পরের মুহূর্তেই হিয়ার ছোড়া গুষলিতে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাত হয়ে পানিতে উল্টে গেল।
“লিওন! না!”
হেলিকপ্টারের ভেতর থেকে টিমের সদস্যরা চিৎকার করে উঠল। কিন্তু লিওন তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে হেলিকপ্টারটি তখনও পুরোপুরি নিচে নামেনি। তবু সে এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা দিয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“স্যার!”
পেছন থেকে কয়েকজন তাকে থামানোর চেষ্টা করল।
“লিওন, এটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ!”
কিন্তু কোনো কথাই তাকে থামাতে পারল না।তার লক্ষ্য একটাই—ভাইপার।
সে পানিতে পড়ে দ্রুত সাঁতরে উল্টে যাওয়া স্পিডবোটের কাছে পৌঁছাল। সেখান থেকে আবার সাঁতরে জাহাজের গায়ে উঠে পড়তেই সিআইডির অন্য সদস্যরাও একে একে জাহাজে প্রবেশ করতে সুযোগ পূলো।
এরপর কেউ সামনের ডেক তল্লাশি করছে। কেউ নিচের ডেক। কেউ কেবিনগুলো। কেউ অস্ত্রাগার।
কিন্তু—হিয়া কোথাও নেই।
লিওন চারপাশে চোখ বুলাল। কয়েক মুহূর্ত আগেও হিয়া যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল, সেখানে এখন কেউ নেই। তার চোখ ধীরে ধীরে জাহাজের ভেতরের দিকে গেল।
“সবাই ওপরে খুঁজছে… তাহলে সে কোথায় গেল?”
অন্যদিকে হিয়া ততক্ষণে জাহাজের একেবারে নিচের ডেকে পৌঁছে গেছে। উপরের ডেক থেকে সিআইডির লোকজনের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হিয়া জানে, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা নিচেও চলে আসবে।
সে দ্রুত ইঞ্জিন রুমের পাশের অন্ধকার অংশে এগিয়ে গেল। তারপর মেঝের একপাশে হাত রাখতেই আঙুলে ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শ পেল। একটা ভারী ঢাকনা। সাধারণ চোখে দেখলে মনে হবে জাহাজের কাঠামোরই অংশ। কিন্তু হিয়া জানে, এই ধরনের বড় জাহাজে জরুরি পরিস্থিতির জন্য গোপন রক্ষণাবেক্ষণ পথ রাখা থাকে। সে দ্রুত ঢাকনার লক খুলে ফেলল।
ঢাকনাটা উঠে যেতেই নিচ থেকে ঠান্ডা পানির গন্ধ তার মুখে এসে লাগল।নিচে সরাসরি গভীর বিশাল থেমস নদির পানি।
জাহাজের তলা থেকে বের হওয়ার একটি সরু পথ। হিয়া কয়েক সেকেন্ড পানির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করল। এই পথটা বিপজ্জনক। কিন্তু হিয়ার জন্য অসম্ভব নয়। সাঁতার তার কাছে শুধু একটা দক্ষতা নয়—এটা তার প্রশিক্ষণের অংশ।
ছোটবেলা থেকেই সে সাঁতারে অসাধারণ দক্ষ। প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি পানির নিচে দীর্ঘ সময় শ্বাস ধরে রাখা, অন্ধকার পানিতে দিক নির্ণয় করা এবং সীমিত বাতাসে দ্রুত সাঁতার কাটার প্রশিক্ষণও সে নিয়েছে এই সাত বছরে।
আজ সেই প্রশিক্ষণই তাকে বাঁচাবে।হিয়া একবার গভীর শ্বাস নিল। তারপর কোনো দ্বিধা ছাড়াই পানিতে ঝাঁপ দিল। ঠান্ডা পানি মুহূর্তেই তার পুরো শরীর গ্রাস করল। সে সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের নিচের কাঠামোর আড়াল ধরে পানির নিচে এগিয়ে যেতে লাগল। উপরে তখন সিআইডির লোকজনের দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু পানির নিচে সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। হিয়া জানে, এখন ওপরে উঠলে ধরা পড়বে। তাই সে পানির নিচ দিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।
একটু দূরে গাছপালার কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে।জাহাজটি নদীর এমন একটি অংশের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তীর ঘেঁষে ঘন জঙ্গল।ওটাই তার গন্তব্য।আরও কিছুটা…আরও একটু…তার ফুসফুসে জমে থাকা বাতাস কমে আসছে। তবু তার প্রশিক্ষিত শরীর তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখল। সে আতঙ্কিত হলো না। শ্বাস নেওয়ার তীব্র তাগিদকে নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
হিয়া একবার পেছনে তাকাল। একটু দূরেই বিশাল জাহাজটা এখনও ছুটে চলছে। জাহাজের চারপাশে সিআইডির স্পিডবোট আর হেলিকপ্টার।
কেউ জানে না—তাদের চোখের সামনে থাকা জাহাজ থেকে ভাইপার ইতিমধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
কিন্তু—জাহাজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লিওনের চোখ হঠাৎ থেমে গেল পানির দিকে। সে নিচের স্রোত লক্ষ্য করল।
তার প্রশিক্ষিত চোখ কিছু একটা ধরে ফেলেছে।জাহাজের পেছনে পানির স্রোত স্বাভাবিক নয়। লিওনের চোখ সরু হয়ে এল। “হিয়া পানির পথ দিয়ে পালিয়েছে গেছে…”
কথাটা নিজের মনেই বলল সে। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না জলরোধী গগলসটা পড়েই করে লিওন পানিতে ঝাঁপ দিল।
অন্যদিকে, হিয়া তখনও থেমসের ঠান্ডা পানির নিচ দিয়ে নদীর তীরের ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পানির নিচে দৃষ্টিসীমা খুব বেশি নয়। তবু হিয়া প্রস্তুত হয়েই নেমেছে। চোখে তার জলরোধী লুকিং গ্লাস, যা পানির নিচে দৃষ্টিটাকে অনেকটাই পরিষ্কার করে রেখেছে।
সে জানে, ওপরে উঠলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রশিক্ষিত সাঁতারুর মতো নিজের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে পানির নিচ দিয়েই এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু—হঠাৎ তার চোখের সামনে দূরে একটা ছায়ামূর্তি ভেসে উঠল। হিয়া থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। হিয়ার চোখ সরু হয়ে গেল। তারপর পানির নিচের আবছা আলোয় মুখটা স্পষ্ট হতেই—লিওন!
হিয়ার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড পানির নিচে স্থির হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ কোনো শব্দ করতে পারছে না। শুধু চারপাশে থেমসের স্রোত আর পানির নিচে ভেসে থাকা ক্ষীণ আলো।
হিয়া বুঝে গেল—শিকারী তাকে খুঁজে পেয়েছে। আর লিওনও বুঝল—শিকার তার চোখের সামনে। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল।লিওন এক মুহূর্ত দেরি না করে তার পিছু নিল।
কিন্তু দুজনের কেউই তখন জানত না কয়েক মুহূর্ত পরেই এই ধাওয়া সম্পূর্ণ অন্য এক পরিস্থিতিতে গিয়ে দাঁড়াবে।
পানির নিচে হঠাৎ লিওনের পা কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গেল। অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে সে বুঝতে পারল থেমসের তলদেশে পড়ে থাকা একটি পুরোনো ডুবে যাওয়া বার্জের ভাঙা লোহার কাঠামোর সঙ্গে মোটা, শ্যাওলাধরা মুরিং রোপ পেঁচিয়ে আছে। সাঁতরে যাওয়ার সময় তার পা সেই দড়ির ফাঁসে ঢুকে শক্তভাবে আটকে গেছে।
সে পা ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু দড়িটা আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে গেল। লিওন পকেট থেকে ছুরিটা বের করল।এক হাতে দড়ি ধরে অন্য হাতে ছুরি চালাতে শুরু করল।
একবার, দুবার।কিন্তু পানির নিচে হাতের নড়াচড়া ধীর হয়ে আসছে। তার ফুসফুসে জমে থাকা বাতাসও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে হিয়া অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিল।
হঠাৎ তার ভেতরে একটা অস্বস্তি হলো। সে থেমে গেল।
পেছনে তাকাল।কেউ নেই।তবু কেন যেন মনে হলো—কিছু একটা ঠিক নেই।
হিয়া ফিরে সাঁতরে এল। আর একটু কাছে আসতেই পানির নিচে আটকে থাকা লিওনকে দেখতে পেল। তার চোখে তখন শ্বাসের জন্য মরিয়া লড়াই।
হিয়ার বুক কেঁপে উঠল। এই মানুষটাই তাকে ধরতে এসেছে। তবুও তাকে এভাবে মরতে দেখে হিয়া চলে যেতে পারবেনা কারন এই মানুষটার জীবনের মূল্য তার নিজের জীবনের চেয়েও, বেশি তার একমাত্র প্রান তার দিলবার।
হিয়া দ্রুত লিওনের কাছে পৌঁছে তার হাত থেকে ছু*রিটা নিয়ে নিল। দড়িটা কাটার জন্য হাত বাড়াতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে গেল লিওনের মুখে। পানির নিচের নীলচে আলোয় লিওনকে স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। ভেজা চুল কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে আছে, চোখের সামনে স্বচ্ছ গগলস, আর সেই কঠিন মুখেও এখন শ্বাস ধরে রাখার অসহায়তা।
হিয়া কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল। এমন মুহূর্তেও লোকটাকে এত সুন্দর লাগতে পারে? তার নিজেরই অবাক লাগল। কিন্তু পরের মুহূর্তে সেই বিস্ময়টা বদলে গেল অদ্ভুত মোহে। দড়িটা কাটার কথা মাথায় থাকলেও হিয়া নিজেকে আর সামলাতে পারল না।
সে লিওনের মুখ দুহাতে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। পানির নীল অন্ধকারে দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল তারপর হিয়া হঠাৎই তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। একটা ক্ষণস্থায়ী, আকাঙ্ক্ষায় ভরা চুম্বন। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা দুষ্টু মোহটুকু হিয়া মাত্র এক মুহূর্তে মিটিয়ে নিতে চাইল।
লিওনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।আর হিয়া নিজেও বুঝতে পারল এই মুহূর্তে সে আসলে কোনো ক্রিমিনাল নয়।সে শুধু এমন একজন নারী, যে পানির নিচেও এই মানুষটার সৌন্দর্যের কাছে নিজের সংযম হারিয়ে ফেলেছে।
পরক্ষণেই হিয়া নিজেকে সামলে নিল। ছুরিটা শক্ত করে ধরল। এবার দড়িটা কাটতেই হবে।তারপর সর্বশক্তি দিয়ে দড়ির ওপর আঘাত করল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বার—দড়ি ছিঁড়ে গেল। লিওনের পা মুক্ত হয়ে গেল। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ওপরে উঠতে শুরু করল। কিন্তু দুজনেরই তখন বাতাস প্রায় শেষ। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তারা একসঙ্গে পানির ওপর মাথা তুলল। দুজনেই গভীরভাবে বাতাস নিতে লাগল।
দুজনেই একসঙ্গে পানির ওপর উঠে এল। হিয়া জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। ভেজা চুলগুলো কপাল আর গালের পাশে লেপ্টে আছে। লিওনেরও অবস্থাও একই শ্বাস ভারী, চুল থেকে টুপটাপ করে পানি ঝরছে। ঠিক সেই মুহূর্তে সকালের সূর্যের আলো মেঘের আড়াল ভেদ করে তাদের ওপর এসে পড়ল।
থেমসের ঘোলাটে পানির ওপর সেই আলো ঝিলমিল করছে। চারপাশে নদীর ঢেউ, দুজনের ভেজা শরীর থেকে ঝরে পড়া পানির ফোঁটা আর দূরে ভেসে আসা হেলিকপ্টারের শব্দ—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য অদ্ভুত সুন্দর হয়ে উঠল।
ওপর থেকে অন্য কেউ দেখলে হয়তো ভাবত—এরা কোনো অপরাধী আর সিআইডি অফিসার নয়। মনে হতো, কোনো প্রেমিক প্রেমিকা নদীর বুকে একসঙ্গে জলবিলাসে মত্ত।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। হিয়া পালানোর জন্য সামান্য নড়তেই লিওনের পেছন থেকে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরল। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু লিওন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তার দুই হাত একসঙ্গে পেছনে নিয়ে দ্রুত হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল।
হ্যান্ডকাফের ধাতব শব্দে হিয়ার পালানোর শেষ আশাটুকুও যেন থেমে গেল। লিওন তার কবজির ওপর হাত রেখে হিয়ার একেবারে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিচু হয়ে হিয়ার কানের কাছে মুখ এনে শান্ত, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল,
“ধরা পড়েছো তুমি আমার কাছে। এখন আর পালানোর কোনো পথ নেই, হর্নি ফক্স।”
হিয়া স্থির হয়ে গেল। এই নামে লিওন তাকে ডাকবে সে কল্পনাও করেনি। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লিওনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। চোখে বিস্ময়।
আর লিওনের ঠোঁটের কোণে তখন খুব সামান্য এক টুকরো বিজয়ী হাসি। হিয়া কিছু বলার আগেই চারপাশে একে একে সিআইডির সদস্যরা এসে পৌঁছাল। দুই পাশ থেকে স্পিডবোটগুলো তাদের ঘিরে ফেলেছে। কয়েকজন অফিসার পানিতে নেমে সতর্ক অবস্থানে দাঁড়াল, আর বাকিরা অস্ত্র তাক করে চারদিকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
“স্যার! টার্গেট সিকিউরড!”
একজন অফিসার চিৎকার করে জানাল।
লিওন তখনও হিয়ার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। তার এক হাত হিয়ার হ্যান্ডকাফের ওপর রাখা। যেন সামান্য সুযোগ পেলেও এই নারীটি আবার পানির স্রোতের মতো ফসকে যেতে পারে—সেই সম্ভাবনাটুকুও সে রাখতে চায় না।
হিয়া চারপাশে তাকাল। সামনে সিআইডি। দুই পাশে স্পিডবোট। ওপরে হেলিকপ্টার। আর পেছনে লিওন।
এবার সত্যিই পালানোর কোনো পথ নেই।
একজন অফিসার এগিয়ে এসে বলল,
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৪
“স্যার, এতক্ষণ ধরে পুরো টিম যাকে খুঁজছিল, শেষ পর্যন্ত আপনি একাই তাকে ধরে ফেললেন!”
লিওন হিয়ার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল, “ওকে চোখের আড়ালও করা যাবেনা এক মুহুর্ত। যতক্ষণ না হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাচ্ছি, ওর দায়িত্ব আমার।”
