Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৬৩

কাজলরেখা পর্ব ৬৩

কাজলরেখা পর্ব ৬৩
তানজিনা ইসলাম

শাবিহা জানালার পাশে বসে আছে। ঝমঝম বৃষ্টিতে, পানির ছিটা আসছে কক্ষের ভেতর। শাবিহার মুখ ভিজে যাচ্ছে। গায়ে এসে পরছে, বৃষ্টির ছটা। যার ফলে পরণের কাপড়টাও আধভেজা প্রায়। চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে। ওর বৃষ্টি তে ভিজে দুঃখ গুলো ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। ছাঁদে যেতে চাইলেও যেতে পারছে না ও। রাত বসে আছে ড্রইং রুমে। ও সিড়ি বেয়ে ছাঁদে যেতে গেলে রাতের চোখে পরবে। ও রাতের সামনে পরতে চাচ্ছে না। রাত ওর দিকে শিথিল নজরে তাকাচ্ছে। সে চোখে মায়া নেই, নেই কেনো ভাষা। আছে শুধু অবিশ্বাস, আর আস্থাহীনতা। রাতের চোখে চোখ মেলানোর ক্ষমতা ওর নেই।
বৃষ্টিতে ভিজলে হয়তো ওর কষ্টগুলো একটু হালকা হতো। দুঃখগুলো ভেসে যেতো, স্নিগ্ধ পানির সাথে। কিন্তু দুঃখ ভেসে গেলেও যে কলঙ্ক ভাসবে না। আঁধার ওর গায়ে যে কলঙ্ক লাগিয়েছে, সে কলঙ্ক যে এ জনমে ঘুচবে না। না, কলঙ্ক আঁধার লাগায়নি।

হ্যাঁ, কলঙ্কিত হয়েছিলো ও নিজের ইচ্ছায়। সেটা আঁধার কেন সবার সামনে এভাবে উপস্থাপন করলো! তা-ও ওর ভাইয়ের সামনে। ওর সেই অজানা ফিয়ন্সের নামই বা আঁধার কীভাবে জানলো! নাম্বারও পেয়ে গেলো কেমন কেমন করে যেনো। আবার ওর সেই সিক্রেটগুলো। যেগুলোর জন্য সারাজীবন শাবিহা রিগ্রেট করে এসেছে, আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারেনি সেসব আঁধার কোত্থেকে জানলো।
শাবিহার মাথা কাজ করছে না। পাগল পাগল লাগছে ওর।

রাত ওঁকে এসে ঝাড়েনি। কিচ্ছু বলেনি। শুধু নির্জীব দৃষ্টিতে চেয়েছিলো। শাবিহাও মাথা নিচু করে বসেছিলো। চোখ তুলে তাকানোর ক্ষমতা ওর ছিলো না। বাবার মতো ভাইয়ের চোখে চোখ মেলানোর রাস্তা যে ও রাখেনি। চাঁদনীর কলেজে যাওয়ার, ওর সাথে কেওয়াজ করার খবর শুনে আঁধার যে কিছু একটা করবে সেটা তো শাবিহা জানতো। ও একপ্রকার আগুন নিয়েই তো খেলতে গিয়েছিলো। ও তো জানে আঁধার কতোটা প্রতিশোধপরায়ণ। আঁধারের মনোভাব তো ও ভালো করেই জানতো। তবুও কেনো যেনো শাবিহা এই স্টেপ টা নিয়েছিলো। আঁধারের দূরে যাওয়া ও নিতে পারছিলো না। তবে আঁধার আগুন না, ও অন্ধকারই। আগুনে পুড়লে তো অন্তত ছাইটুকু অবশিষ্ট থাকে। আঁধার যে ওর ছাই টুকু অবশিষ্ট রাখলো না। ভাসিয়ে নিয়ে গেলো ওঁকে অন্ধকার অতলগহ্বরে। যেখান থেকে শাবিহা হাতড়েও বের হতে পারছে না। শাবিহার বিয়ে ভেঙে গেছে কি-না ও জানে না। জানার ইচ্ছেও নেই। ও তো এ বিয়েটা ভাঙতেই চাচ্ছিলো। তাই বলে, এভাবে নিজের কুকীর্তির বলি হয়ে না।

শাবিহা কাদেনি। একটুও না। ও যে দোষ করেছিলো, ও তো সেটা জানতো। কিন্তু রাতের জেনে যাওয়াটাই মেরে ফেলছিলো ওঁকে। কিন্তু কাদলো তটিনীর কল আসার পর। আঁধারের এক্সিডেন্টের খবর শুনে। এখনো এতো মায়া ওর ছেলেটার প্রতি, এতো! ওই ছেলেটাকে শাবিহার এখন সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করার কথা ছিলো। তবে কেনো ও ঘৃণা করতে পারছে না। পারছে না ও আঁধারের ক্ষতি চাইতে। কেনো কাঁদছে শাবিহা? আঁধারের জন্য খারাপ লাগছে তাই! শাবিহা ওঁকে ভালোবেসেছিলো, আঁধারের কোনো দোষই ওর চোখে পরতো না। আঁধার সবসময় ওর চোখে ইনোসেন্ট ছিলো। আঁধারের ইনোসেন্ট ফেসটা ওর সবচেয়ে পছন্দের ছিলো তাই। কিন্তু আঁধারের তো খারাপ লাগলো না ওর জন্য। ওই ছবিগুলো রাতকে পাঠানোে সময় একবারও ভাবলো না, শাবিহার কি মুখ থাকবে ওর বড় ভাইয়ের সামনে।অচেনা একটা ছেলের কাছে, পাঠানোর আগে ভাবলো না শাবিহার সম্মান কোথায় যাবে! আদোও ও মুখ দেখাতে পারবে কি-না। আঁধার ভাবলো না। অথচ শাবিহা ভাবতে ভাবতে কূল কিনারা পাচ্ছে না।

শাবিহা তখন মাত্রই ভার্সিটিতে উঠেছিলো। আমান, রাবিব, মাহাদী, তটিনী ওর ছোটবেলাকার বন্ধু। ভার্সিটিতেও ওরাই শাবিহার বন্ধু ছিলো। কিন্তু এমপির মেয়ে হওয়াই সবাই চাইতো ওর সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে, সুসম্পর্ক রাখতে। এভাবেই একদিন ওর রিকের সাথে দেখা হলো। তখনও আঁধার ওর জীবনে আসেনি। ও রিকের সাথে বারে যেতো, রাত করে বাড়ি ফিরতো, অ্যালকোহল খাওয়া ধরেছিলো, ড্রগস পর্যন্ত নেওয়া শুরু করেছিলো। ওর মায়ের কখনোই ওঁকে বা ওর ভাইকে নিয়ে মাথাব্যাথা ছিলো না। সে সারাজীবন টাকার উপর আয়েশ করে গেছে আর ওঁদের ছাড় দিয়ে গেছে।শাসন বা সঙ্গ কোনোটাই ও পায়নি। রিকের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর ওর আরো বন্ধু হয়েছিলো। ও ওর ছোটোবেলার বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো। ওরা কাছে ছিলো না বলে, কেও ওঁকে ঠিক ভুলটা দেখানোরও ছিলো না। শাবিহার সাথে রিকের ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। কিন্তু বন্ধুত্ব টা কখন যে ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিটস এ গড়ালো শাবিহা টেরও পায়নি। শাবিহা ওর সাথে কখনো রিলেশনে যায়নি। কিন্তু ফিজিক্যাল হয়েছিলো অনেকবার। এসব ওর বন্ধুরা জানে না। শুধু জানে রিক আর ও৷ রিকের বন্ধুরাও হয়তো কেও কেও জানে। শাবিহা বুঝতে পারে, আধারের প্রতি কেনো ওর এতো মায়া। ওই যে, ও যখন ওর জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে ছিলো আঁধার তখন এসেছিলো ওর জীবনে। ওঁকে বের করেছিলো এসে থেকে। আঁধার ওঁকে রিকের সাথে অনেকবছর কথাও বলতে দেয়নি।

উহু, আঁধার জানে না এসব। শাবিহার এসব বলার সাহস কখনও হয়নি। ও আঁধারকে চিনতো বলেই কখনো বলেনি। আঁধার এমন ছেলে না যে বলবে, তোমার অতীত আমাদের বর্তমানে কোনো প্রভাব ফেলবে না বা তুমি যেমন আমার কাছে তেমনই পছন্দের। উল্টো আঁধার এসব জানার পর,কখনও শাবিহার মুখও দেখতো না। বন্ধুত্ব রাখা তো দূর। শাবিহা জানে না, কেনো ও এসবে জড়িয়েছে। বয়সের দোষে না আসলেই ওর মনটা কলুষিত ছিলো। হয়তো ওর মনটাই নষ্ট ছিলো, যার ফলে এখনো ও রিকের সাথে বন্ধুত্ব রেখেছে।
রাত চুপচাপ বসে আছে সোফায়। ড্রইংরুমটা কিঞ্চিৎ অন্ধকার। তবে সদরদরজা খোলা থাকায় বাইরে থাকায় কিছুটা আলো আসছে।ক্ষণকাল পরপর নাক ফুলাচ্ছে ও। ওর কি যে রাগ হচ্ছে। না ওর শাবিহার উপর রাগ লাগছে না। রাগ হচ্ছে শাবিহার মায়ের উপর। একটু যদি মেয়েটার দিকে খেয়াল দিতো। একটু যদি ওর সঙ্গ দিতো, মেয়েটা এতোটা নষ্ট হতো না।একটু শাসন করলে শাবিহা এতোটা উচ্ছন্নে যেতো না। ভালোবাসায় তো অনেকেই পরে, তাই বলে ফিজিক্যাল! রাত কেঁপে উঠলো।

শাবিহার সাথে যে ছেলের বিয়ে ঠিক করেছিলো ও, সেই ছেলেটা কল করে সময় চেয়েছে ওর থেকে। এখনই ওরা কথাবার্তা এগিয়ে রাখতে চাচ্ছে না। অথচ সব কথাবার্তা আগানোই ছিলো। আননোন নাম্বার থেকে এসেছে ছবিগুলো। কে পাঠিয়েছে, রাত জানে না। রাতের ঘেন্না লাগলো, ছবিগুলো দেখতে। নিজের বোনের এমন ছবি, রাতকে দেখতে হবে ও কখনো কল্পনাও করেনি। ও গ্যালারিতে গেলো ডিলিট করতে। এসব মোবাইলে রাখলেও দম বন্ধ লাগবে ওর। ওই নাম্বারের মালিককে ও খুঁজে নেবে। আজ ওঁকে দিয়েছে, শাবিহার ফিয়ন্সে কে দিয়েছে কাল কোথায় কোথায় ছড়াবে ওর জানা নেই। মান-সম্মান যা যাওয়ার তা তো গেছেই। বাকি যা আছে, সেটুকু রক্ষা করার চেষ্টা তো করতে হবে। রাত ছবিগুলো ডিলিট করে গ্যালারি থেকে বের হতে যাবে, তার আগে ওর দৃষ্টি পরলো সিটি কলেজে পরা কিছু ছবির উপর।

রাতের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। চাঁদনীর সাথে কয়েকটা গ্রুপ ছবি ছিলো ওর। যেদিন প্রথম ও লিফলেট দিতে গিয়ে কাজল চোখের মেয়েটাকে দেখেছিলো, সেদিনের ছবি ও ডিলিট করে নি। চাঁদনী কে লিফলেট দেওয়ার ছবি গুলোও ছিলো ওর কাছে। রাত শুধু ওঁদের দু’জনের ছবি ডিলিট করে দিয়েছিলো, চাদনী বিবাহিত জানার পর।কিন্তু ওদের গ্রুপ পিকগুলো রাত ডিলিট করেনি। চাদনীর ছবি ডিলিট করে দিলেও, শুধু ওর কাজলকালো চোখ দু’টো ক্রপ করে রেখে দিয়েছে। রাতের এ ছবিটা নিয়েও মন খুতখুত করে। ইচ্ছে করে ডিলিট করে দিতে। অন্যের বউয়ের চোখের ছবি রাখার দরকার কি ওর বুঝে আসে না। কিন্তু ডিলিট করতে গেলেই ও দরকার বেদরকারের কথা ভুলে যায়। মনে হয় থাকুক। সমস্যা কি! ওর ছবি তো আর রাখেনি। দু’টো খুব দামী চোখই তো। এতে আর এমন কি!

ওর কাজলকালো চোখের দিকে তাকিয়ে রাতের দু’টো লাইন মনে পরে সবসময়,
কাজল চোখের মেয়ে
আমার দিবস কাটে বিবস হয়ে তোমার চোখে চেয়ে।
তাকাস কেন?
আকাশ কেন?
প্রেমিকার চোখে আকাশ।

কাজলরেখা পর্ব ৬২ (২)

রাত ঢোক গিলে চোখ ফেরালো।শিট ম্যান! ও পাগল হয়ে যাবে৷ অন্যের বউকে প্রেমিকা সম্বোধন করছে। এতোটা ফালতু চিন্তাভাবনা কখন থেকে হয়ে গেলো ওর। এতো ব্যাক্তিত্বহীন তো রাত ছিলো না। কাওকে মনে ধরলে বুঝি, আর ব্যাক্তিত্বের কথা মাথায় আসে না? রাতের জানা নেই।

কাজলরেখা পর্ব ৬৪