Home তুমি এলে বসন্ত নামে তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৩

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৩

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৩
রিমঝিম বৃষ্টি

ফারিশা হাতে টান পড়তেই দাঁড়িয়েই পড়লো। পিছন ঘুরে তাকাতেই দু’জনের দৃষ্টি মিলিত হলো। ইরাদের দৃষ্টি যেনো শীতল হয়ে আছে। সামনে এগিয়ে এসে কেবিনের দরজা আটকে দিলো তা দেখে ফারিশা স্থির গলায় বললো,
” কি করছেন টা কি আপনি? দরজা আটকাচ্ছেন কেন..?”
ইরাদ কথা বললো না সরে এসে চট করেই ফারিশাকে ঝাপটে ধরে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করলো। কিন্তু ফারিশার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলো না আর না সে ইরাদকে আঁকড়ে ধরলো। হাত দু’টো একদম শিথিল করে রাখলো। ইরাদ কী বুঝলো হয়তো না যে , অপর প্রান্তের থাকা নারীর মাঝে আজ আর সেই পাঁচ বছরের আগের মতো না আছে আবেগ, না আছে অনুভূতি সে যেনো যন্ত্রণায় আর অভাবে এক পাথরে পরিণত হয়েছে যার মাঝে শুধু শূন্যতা আর হাহাকার ছাড়া কিছুই নেই।
ইরাদ ফারিশা কে ছেড়ে দিয়ে সরে এসে মুখোমুখি দাঁড় হলো। বা হাত দিয়ে নিজের দাগ হওয়া গালের দিকে তাক করে বললো,

” এটা কীসের দাগ জিজ্ঞেস করলে না। তোমার শশুর আদর করে আজ চড় বসিয়েছে সুন্দর না বলো..?”
ফারিশা কথা বললো না। শীতল দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইলো কেবল। তা দেখে ইরাদ ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
” একজন বাবার ফিলিংস বুঝো তুমি ফারিশা। সব রাগ ফেলে একটাবার ছেলের জন্য হলেও আমাকে জানাতে পারতে। আমার ছেলেকে চায় ফারিশা..?”
ফারিশা হাত দুটো মুঠো করে ফেলে কম্পিত গলায় বললো,
” ও বাড়িতে আমি আমার ছেলেকে দিতে পারবো না? ”
” তাহলে তোমার আসতে হবে না কিন্তু আমি আমার ছেলেকে চায় মানে চায়। ওকে আমি নিয়ে যাবো..?”
ফারিশা ভেজা গলায় বললো,
” এত বছর কোথায় ছিলেন যখন নিজের সন্তান সামান্য আশ্রয়ের জন্য ফুটপাতে ঘুরপাক খাচ্ছিলো তখন কোথায় ছিলেন..?”
ইরাদ এবার সূক্ষ্ম হাসলো আর বললো,

” ফারিশা তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো তোমার জন্যই আমি দেশ ছেড়েছিলাম। সেদিন তুমি যে আচরণ করেছো, কোনো স্ত্রী যে তার স্বামীকে এমন নিচ দেখাতে পারে তা তোমায় না দেখলে জানতাম না ফারিশা…?”
ফারিশা কিছুটা দমে ফেললো নিজেকে আর মিনমিন গলায় বললো,
” আমি বলতে বাধ্য হয়েছিলাম ইরাদ…! আপনি কেনো এমন পরিবারের সাথে আমাদের পরিবার জড়ালে। আমি গরীব ছিলাম জানি তা কিন্তু আমার চাহিদা তো খুব বেশি ছিলো না শুধু একটা সুখের সংসার চেয়েছিলাম কিন্তু আপনার দাদী..?”,
এতটুকু বলে আর বললো না ফারিশা তার যেনো গলায় দলা পেকে এলো। মাথা নিচু করে রইলো চোখ দুটো যেনো ভিজে টইটম্বুর।
ফারিশা ইরাদের দিকে তাকিয়ে ফের বললো,

” সেদিন হুট করে ওমন আচরণ করলাম, আপনার মনে কি একটাবারের জন্যও প্রশ্ন জাগে নি কেনো আমি এমন করেছিলাম একটু খুটিয়েই না হয় দেখতেন কিন্তু কি করলেন আপনি পরের দিনই দেশ ছাড়লেন বাহ্। শুনন, আমি আমার ছেলের দায়িত্ব নিতে পারবো আপনাকে ভাবতে হবে না..!”,
বলেই দরজা খুলতে গেলে ইরাদ এক ঝটকায় তার হাত আঁকড়ে ফের নিজের দিকে করলো। ফারিশা তাল সামলাতে না পেরে ইরাদের বুকের ওপর গিয়ে পড়লো। দ্রুত ফারিশা সরে এসে কিছুটা রাগী গলায় বললো,
” হাত ছাড়ুন কিন্তু..! ”
ইরাদ ফারিশা ঘাড়ে হাত দিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুলটা ফারিশার গালে বুলিয়ে নিজের দিকে মুখটা তুললে ফারিশা যেনো কিছুটা শিউরে উঠলো। ইরাদ কিছুটা গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

” তুমি মানো আর না মানো। আমার বউও চায়, আমার সন্তানও চায় । আই রিপিট দু’জনকেই চায় মানে চায়। যা রাগ দেখানোর দেখাবে, যা শাস্তি দেওয়ার দিবে আমি কিচ্ছু বলবো না ট্রাস্ট মি কিন্তু আমার কাছেই থাকতে হবে তোমাকে। সো, আমার কাছে আসার জন্য প্রস্তুত হও মিসেস চৌধুরী..!”,
বলেই ইরাদ ফারিশাকে ছেড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। ফারিশা কিছুটা স্থির হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।
শরতের সন্ধ্যা নামবে বলে কি। আকাশে আজ কালো মেঘ জমেছে যেনো বৃষ্টি আসার আগাম বার্তা পাঠাচ্ছে। ইয়াশকে ডিসচার্জ দিতে ইয়াশ ইরাদের গাড়ির ওপরে বসে আছে তুবা তাকে দু’হাত দিয়ে দু’পাশ ধরে রেখেছে ছেড়ে দিলেই যদি লাভ দেয় তাই। ইয়াশ তুবার মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
” খালামনি আমলা কি এই গালিতে ( গাড়িতে) করে যাবো..?”
” হুম আমরা সবাই আজ গাড়িতে যাবো..! ”
গেইটের ভেতর থেকে ইরাদ বের হচ্ছে আর তার একটু পিছনে ফারিশা হেঁটে হেঁটে আসছে। ইরাদ এগিয়ে আসতেই তুবা সরে গেলে ইয়াশের কাছে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

” চলুন আজ গাড়ি চালায় আমরা…!”,
বলেই ভেতরে বসে পড়লো তার কোলে ইয়াশকে নিলো । পিছনের সীটে বসলো ফারিশা আর তুবা। বাইরের আকাশ দেখে ফারিশা তুবাকে আস্তে করে বললো,
” আজ না গেলেই নয়…?”
” হু আজ মাঝ রাত হলেও বাড়ি পৌছাতে হবে নয়তো বাবা খেপে যাবে আর বাড়িতেই ঢুকতে দিবে না । পরশুই তো চলে যেতাম শুধু ইয়াশের জ্বর দেখে যায় নি। ”
” এটা অনেক বল ( বড়)!”
ছেলের কথায় ইরাদ গাড়ি চালাতে চালাতে হেসে উঠলো গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে খুব স্লো ভাবে ঘুরাতে লাগলে ইয়াশ নিজের কপাল চাপড়ে বললো,
” উহু তুমি তো পালোই না। গালি ( গাড়ি) ঠেলা না দিলে চলবে না তো। আমার গালি ( গাড়ি) তো আমি ঠেলা দিয়েই চলায়…!”
ইরাদ গাড়ি চালাতে চালাতে ইয়াশের গাল টিপে বললো,

” ওটা তো ছোট গাড়ি তাই ঠেলা দিতে হয় আর এটা বড় তাই এটা ইলেকট্রিকের মাধ্যমে চলে..!”
” ইটটেটিক সেতা ( সেটা) আবার কী..?”
তুবা পিছন থেকে বলে উঠলো,
” আপনি অনেক ভালো ইংরেজি পারেন। আমি চুপ থাকলে খুশি হতাম পাকাবুড়া একটা.!”,
বলেই হেসে উঠলো তুবা সাথে পাশে থাকা ফারিশাও কিছুটা মুচকি হেসে উঠলো। ইয়াশ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে বললো,
” তুমি পঁচা হয়ে গেচো..!”
” হু তাই তো নতুন মানুষ পেলেই আমাকে ভুলে যান আপনি..!”
ইরাদ পকেট থেকে ফোন বের করে ইভানকে একটা মেসেজ দিলো তারপর রেখে দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো ।

চৌধুরী প্যালেস————-
” বলি কী এ বাড়ির মানুষের বুদ্ধি কী নেই হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। সন্ধ্যা নামতে চললো এখন অব্দি সাবাহ্ ফিরলো না তার মার কী চিন্তা নাই নাকি। তমার মা…! ও তমার মা…!”
দুই জা রাতের জন্য রান্না করছিলো রান্নাঘরে। শিউলি তমার রুমে আছে তমার আলমারি পরিষ্কার করছে দু’জন মিলে। এতগুলো মানুষ থাকে বাড়িতে দুপুরের খাবার দুপুরেই শেষ হয়ে যায় তাই রাতে আবার রান্না করতে হয়। সবাই অফিস থেকে আসে কতটা খাটাখাটুনি করে তাই একটু গরম গরম ভাত না হলে কী চলে। বাইরে থেকে শাশুড়ীর ডাক শুনে সুমানা হাত ধুতে ধুতে বললো,
” এবার মনে হচ্ছে আমার পিছে লাগবে..!”,
বলেই বাইরে চলে গেলো। সুমানা বসার রুমে যেতেই আয়েশা বললো,
” ক’টা বাজে খেয়াল আছে তোমার। ওতো বড় মেয়ে বাইরে এখনো এখনকার দিনক্ষণ কী ভালো, ফোন দিয়ে আসতে বলো তাড়াতাড়ি..! ”
সুমানা এক নজর দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকালো সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টা বাজতে চললো। আজ তো সে ফোনও নিয়ে যায় নি। সুমানা বিকেলে মেয়ের রুম কাপড়চোপড় রাখতে গিয়ে দেখেছিলো ফোন চার্জে দিয়েই চলে গেছে। সুমানা সিঁড়ির দিকে এসে জোরে ডেকে বসলো ইভানকে।

” ইভান..! এই ইভান, নিচে আয় তো বাবা একটু..!”
” ছোট মা কী হয়েছে…? “,
সুমানা পাশ ঘুরে ইভানকে দাদীর রুমের পাশ থেকে আসতে দেখে বাঁকা চোখে তাকালো। ইভান কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এগিয়ে আসলো। আয়েশা তখন সোফায় বসে বসে পানগুলো পাত্র থেকে ধুচ্ছিলো।
” একটু বাইরে গিয়ে দেখ তো সাবাহ্ আসছে না কেনো। ওর তো ৬ টার সময় ফেরার কথা..! ”
ইভান কিছুটা ভেবে সামনের দিলে যেতে যেতে বললো,
” আচ্ছা যাচ্ছি আমি…!”
” ব্যাগে কী তোর ব্যাগ রেখে যা..!”
ইভান ব্যাগ টা আরও শক্ত করে ধরে সামনে এগোতে এগোতে বললো,
” ওটা আমার খাজানা ছোট মা রেখে যাওয়া যাবে না..!”,
বলেই বেরিয়ে গেলো সুমানা এক নজর সেদিকে তাকিয়ে রান্না ঘরে ছুটলো।

” আরে দোস্ত দেখ এই এমপি টা কত সুন্দর..! ”
সাবাহ্’র কথায় তার বান্ধবী পাশে তাকালো দেওয়ালে পোস্টার লাগানো সেখানে এমপির ছবি দেওয়া। লোকটি বয়স্ক হলেও চেহারার সৌন্দর্য যেনো এখনো চোখে পড়ার মতো। সাবাহ্ পাশ ঘুরে তার বান্ধবী কে এক ধ্যানের তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,
” আচ্ছা উনি যেহুত এত সুন্দর নিশ্চয় তার ছেলেও সুন্দর হবে চল যায় আমরা এমপির বাড়ির সামনে দিয়ে..!”
লাবিবা পোস্টারের দিকে তাকিয়েই বলে উঠলো,
” হু তারপর রাত করে বাড়ি ফিরলে মাইর খাবো নে আম্মুর হাতে..!”
পিছন থেকে বাইকের হর্ণ অনবরত বাজাতে লাগলে সাবাহ্ রাগে পিছন ঘুরতেই দেখলো সাথে লাবিবাও। একজন ছেলে বাইক নিয়ে তাদের কিছুটা পাশেই থেমেছে, মাথায় হেলমেট পড়ার কারণে চেহারা দেখা দায়। সাবাহ্ লাবিবার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললো,

” দোস্ত একদম রিলস্ এর পোলাদের মতো লাগতিছে দেখ, কিন্তু বাইক টা চেনা-পরিচিত মনে হচ্ছে..! ”
ইভান হেলমেট টা এক টানে খুলে রাগী গলায় বললো,
” তা তো মনে হবেই আজ বাড়ি চল কানীর বাচ্চা কানী তোর ঠ্যাং ভাঙবো আমি। রাত হতে যাচ্ছে তোর হুস নেই..!”
সাবাহ্ ইভানকে দেখে পলকহীনভাবে ভাবে তাকিয়ে রইলো। সন্ধ্যার নিভু নিভু আলোতেও যেনো ইভানের মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ইভানের ধমক খেয়ে যেনো তার ধ্যান ভাঙলো।
” তুই উঠবি নাকি আমি ছোট মাকে ফোন দিবো..?”
সাবাহ্ তার বান্ধবী কে বাই দিয়ে তাড়াতাড়ি বাইকে উঠে বসতেই ইভান চলে গেলো বাড়ির দিকে।

আধাঘন্টা পর আলোছায়া বাড়ির সামনে এসে থামলো ইরাদের গাড়িটা। গাড়ি থামতেই ফারিশা আর তুবা বেরিয়ে এলো ব্যাগ নিয়ে। পিছনের ডোর আটকিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে লাগলো ফারিশা ইয়াশকে নেওয়ার জন্য আর হুট করেই গাড়ি স্প্রিরিটের বেগে ছুটলো সামনে দিকে। ইরাদ জানালার দিকে মুখ এগিয়ে জোরে বলে উঠলো,
” তোমরা বাড়ি যাও ওকে আমি একটু পরেই দিয়ে যাচ্ছি..? ”
ফারিশা হতভম্ব হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো স্থির হয়ে। সেকেন্ডের মাঝেই কি থেকে কী ঘটলো বুঝলো না। তুবা এগিয়ে এসে ফারিশাকে বললো,
” কী হলো ব্যাপারটা, ইয়াশকে নিয়ে চলে গেলো তো.?”
ফারিশা যেনো গাড়ির পিছনে ছোটার জন্য সেদিকে যেতে লাগলেই তুবা হাত টেনে ধরে বললো,

” কোথায় যাচ্ছিস। গাড়ির সাথে দৌড়ে তুই পারবি..? ”
” ইয়াশকে না দিয়ে গেলে ওকে আমি মেরে ফেলবো তুবা.!”,
বলেই কেঁদে উঠলো তা শুনে তুবা বললো,
” তুই শুধু শুধু চিন্তা করছিস। দিয়ে যাবে বললো তো আর ইয়াশ কী থাকার মানুষ। ইয়াশ যে বিচ্ছু মনে হয় না আধা ঘণ্টার বেশি রাখতে পারবে ওকে, চিন্তা করিস না তো..! ”
ফারিশা সেদিকেই তাকিয়ে রইলো আর বললো,
” তুবা ব্যাগগুলো তুলে আমার রুমে রেখে আয় আর তোর ব্যাগ নিয়ে নেমে আয়..!”
” আর তুই কী করবি.?”
ফারিশা উত্তর দিলো না তা দেখে তুবা আর কিছু বললো না ব্যাগগুলো নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। আর ফারিশা গাড়ি যেই পথে গেলো সেদিকেই তাকিয়ে রইলো ছলছল নয়নে।

চৌধুরী বাড়ির গেইট পেরিয়ে গাড়িটা ভেতরে যেতেই ইয়াশ ভার গলায় বললো,
” মিলাদ তুমি কোতায় ( কোথায়) নিয়ে এসেচো। আম্মু কোতায়..?”
ইরাদ গাড়ি থেকে নেমে ইয়াশকে কোলে তুলে তার মুখের দিকে তাকাতেই বুঝলো কিছুটা ভয় পেয়ে আসে। ইরাদ বাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বললো,
” তোমার আম্মুই তো বললো যে, ইয়াশকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে তাই আমার বাড়ি নিয়ে এসেছি তোমায়, একটু পরেই চলে যাবো তোমার আম্মুর কাছে আবার ঠিক আছে…! ”
ইয়াশ কথা বললো না শুধু ঘাড় কাত করে হ্যাঁ জানালো।
ইরাদ জানে এই সময় তার বাবা বাড়িতে আসবে না। তারা অনেক রাত করে আসে। ভেতরে যেতেই দেখতে পেলো তার মাকে। ইভা আর সুমানা রান্না করে সব টেবিলের ওপর এনে রাখছিলো। সোফায় ইভান বসে আছে আর পাশেই সাবাহ্ তারাও কিছুক্ষণ আগেই এসেছে । ইরাদ ভেতরে যেতেই ইয়াশ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,

” কত বল ( বড়) বালি ( বাড়ি)। এটা তোমাল বালি..?”
কোনো বাচ্চার গলার আওয়াজ পেতেই সবাই পিছন ঘুরতেই ইয়াশকে দেখতে পেলো। ইভান উঠে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
” ভাইয়া কে এটা..? ”
ইরাদ এসে সোফায় বসলো ইয়াশকে কোলে নিয়ে। ইয়াশের মুখ হাত দিয়ে বললো,
” ইট’স্ মাই লিটল হার্ট…! ”
ইভান বোঊহয় কিছুটা আন্দাজ করলো এটা ওর ছেলে কিন্তু কিছু বললো না ইরাদ তো মানা করেছিলো এসব বলতে।
” দীদা কোথায় রে..?”
ইভান আস্তে করে বললো,

” রুমে শুইয়ে আসে..!”
ইরাদ আর কিছু বললো না। ইভা এগিয়ে এসে বললো,
” কি সুন্দর বাচ্চা টা কোথায় পেলি রে ইরাদ..!”
ইভান এগিয়ে এসে ইয়াশের সামনে হাটু গেড়ে বসলো আর বললো,
” কী রে পিচ্ছু নাম কী তোর..?”
ইয়াশ এত লোক দেখে এবার ভয় পেলো কথা বললো না। সাবাহ্ পাশ থেকে এগিয়ে এসে বললো,
” এই বাবু নাম কি তোমার। তুমি চকলেট খাবে দিবো আমি এনে.?”
ইয়াশ ঘাড় ঘুরিয়ে সাবাহ্ কে দেখে এবার ঠোঁট উল্টে মুখ ঘুরিয়ে ইরাদের বুকের মাঝে মুখ গুজলো আর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো,

” আমি আম্মু যাবো মিলাদ..!”
মিলাদ নাম টা শুনতেই ইভান এবার শিওর হলো তারই ছেলে এটা। শিউলি আর তমা সবেমাত্র নামছিলো মিলাদ নাম শুনতেই তমাও এগিয়ে এলো। ইভা ইয়াশকে কাঁদতে দেখে বললো,
” আহারে মাকে নিয়ে আসতি সাথে, এখন কান্না থামাবি কী করে..? দে দেখি আমার কাছে দে..?”
ইরাদ ইয়াশকে সামনে দিকে ঘোরাতে লাগলে ইয়াশ আরও শক্ত করে ইরাদের শার্ট আঁকড়ে ধরলো তা দেখে ইভানকে বললো,
” ইভান আমার রুমে দেখ টেবিলের ওপর চকলেট বক্স আসে নিয়ে আয় তো..?”
ইভান দৌড়ে ওপরে চলে গেলো। প্রায় কয়েক মিনিট ধরে কাঁদলো সে। সবাই মিলে থামাতেই পারলো না পরে ইরাদ ইয়াশের কানের কাছে এগিয়ে এসে বললো,
” ইয়াশ বাবা কেঁদো না তাহলে তোমাকে মাছ দেখাবো না। আমাদের বাসায় কিন্তু বড় বড় মাছ আছে..?”
মাছের কথা শুনতেই ছলছল নয়নে মাথা তুলে ইরাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

” কত বল ( বড়) মাচ..?”
ইরাদ কিছুটা মুচকি হেসে বললো,
” অনেক বড়। মাছটা পানিতে ঘুরেও বেড়ায়, খাবার খায়..?”
ইয়াশ পিছন ঘুরে ইভা আর সাবাহ্ কে দেখিয়ে বললো,
” এলা ( এরা) কে..? ”
” ওটা আমার আম্মু হয় তোমার যেমন আম্মু আছে আমারও আছে..? আর ওটা আমার বোন হয়..? ”
ইয়াশ ইভার দিকে তাকিয়ে রইলো আর বললো,
” এতা মিলাদের আম্মু..?”
ইভা হেসে উঠলো আর হাত বাড়িয়ে বললো,
” তুমি কী কিছু খাবে আসো আমার কাছে..?”
” না আমি মিলাদের কাছেই থাকবো.!”
ইভান চকলেট বক্স নিয়ে এসে ইরাদের হাতে দিতেই ইরাদ তা খুলে ইয়াশের সামনে ধরতেই ইয়াশ হাত দিয়ে একটা তুলে বললো,

” খুলে দাও..!”
” এই যে মামু আমার কাছে দাও খুলে দেয়.?”
ইভানকে হাত পাততে দেখে ইয়াশ বললো,
” খেয়ে ফেলবে না তো..?”
” না আমি চকলেট খায় না দাও আমায়..?”
ইয়াশ দিতেই চকলেট টা খুলে দিলো ইভান। ইরাদ ইয়াশকে পাশেই বসিয়ে দিলো। ইয়াশ ইভানের সাথে চকলেট খেতে থাকলে ইরাদ পাশ থেকে আস্তে করে উঠে তার মাকে নিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড় হলো আর বললো,
” বাচ্চাটা কেমন বলো তো আম্মু..? ”
” ফারিশার ছেলে..!”
ইরাদ মায়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
” তুমি সব বুঝে যাও কীভাবে বলো তো আম্মু..? ”
” তুই ওদের নিয়ে আয় তো তাড়াতাড়ি আমার নাতি টা কত সুন্দর..! আহারে দেখ আমাদের চিনে না.? ”
ইরাদ ছেলের দিকে তাকিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রেখে বললো,

” আনবো আম্মু শীঘ্রই..! একটু ধৈর্য ধরো.!”
” তোমাদেল মাছ কোতায়..?”
ইভান এমন কথা শুনে মুখ টিপে হেসে উঠলো সাথে দূর হতে সাবাহ্ আর তমাও হাসলো। ইভান বললো,
” যাবে তুমি চলো যায় ওই যে পিছনেই আছে অনেক মাছ আছে..! ”
ইয়াশ এক নজর পিছনে তাকিয়ে বললো,
” হুম যাবো..!”
” তাহলে চকলেট টা শেষ করো আমি নিয়ে যাচ্ছি..! ”
ইয়াশ চকলেট খেতে খেতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলো পাশেই এক নজর ইরাদের দিকে তাকিয়ে আবারও চুপ হয়ে গেলো। হাতে থাকা চকলেট টা না খেয়েই রেখে দিতেই ইভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো আর বললো,

” শেষ খাওয়া তাহলে চলো যায়..!”
ইভান দাঁড় হয়ে ইয়াশকে কোলে নিতে গেলে ইয়াশ বললো,
” আমি হাতবো ( হাটবো)..? ”
” এই ওকে দেখে নিয়ে যাস কিছু হলে তোকে মারবো কিন্তু। তুই যা আমি আসছি..?”

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১২

ইভান আর ইয়াশ হাটতে হাটতে যেতে লাগলো। তার দাদীর ঘরের পরে একটা ছোট-খাটো ঘর আছে যেখানে কম্পিউটার আর একুরিয়াম আছে বড় সাইজের একটা। ইভান সেখানে গোল্ডেনফিস রেখেছে অনেক। সেদিকেই যেতে পথে ইয়াশ হাটতে হাটতে যাচ্ছিলো আর হুট করেই বিকট আওয়াজ হলো।
” ওরে মা রে আমার কোমর গেলো রে গেলো। ”
শাশুড়িকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে ইভা আর সুমানা এগিয়ে আসতেই দেখতে পেলো পানি পিছলে পড়েছে।

তুমি এলে বসন্ত নামে পর্ব ১৪