সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
—’ আমি সাঁতার জানি না, তমা। এখান থেকে লাফ দিলে জাস্ট ডুবে মরা ছাড়া আর কোনো গতি নেই আমার । ‘
তমা তখনো তিতিরের হাতের কবজি চেপে ধরেই আছে । শ্বাস ফেলছে জোরে জোরে। ভোরের আলো ফুটে বেলা হয়েছে বেশ খানিকটা। তবুও এইদিকটা এতো শুনশান কেনো বুঝতে পারা গেলো না। জেলেপট্টির ভিতর থেকে পথ খুঁজে একটা রোডে এসেছে উঠেছিলো দু’জনে। এতদূর আসার পর বোধগম্য হয়েছে, সম্ভবত সেই ঘুরে ফিরে ভুল পথেই এসেছে তারা। এদিকটা শহরের কোনো ছিটেফোঁটা নেই, সম্ভবত আরও বাইরে চলে এসেছে শহরের। তবে পায়ের গতি বাড়িয়ে ফিরে আসতে চাইলেও সম্ভব হলো না সেটা। ব্রিজের দু’পাশের রাস্তা দিয়ে একের পর এক গাড়ি এসে ভিড় করতেই, বুঝতে বাকি রইলো না, ইয়াজ মির্জার খপ্পরে আবার পরতে যাচ্ছে তারা। দু’জনেই আপাতত ঠিক মিডল পয়েন্টে আছে নির্মানধিন ব্রিজের। তিতির অসহায় হয়ে এদিক ওদিক কোনো সাধারন মানুষ খোঁজে, সাহায্যর আশায়। তবে চোখে পরে না। নদীতে অদূরে ভেসে চলা জেলে নৌকা গুলো ছাড়া আর কিচ্ছু চোখে পরছে না তাদের। তমা আশ্বাস দিলো আরেকদফা, দ্রুত গলায় বললো,
—’ আমি আছি তো। ওদের হাতে ধরা পরার থেকে বাঁচতে, আর কি কোনো পথ খোলা আছে? ‘
তিতির ঘাড় বাঁকিয়ে একটাবার তাকালো পিছন দিকে। অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার। সাঁতারের স ও জানে না সে। এই মূহুর্তে লাফ দেওয়া মানে নির্ঘাত ডুবে মরা। তবে গাড়ির দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে কয়েকজনকে বের হয়ে আসতে দেখেই রুহ কাঁপলো মেয়েটার । তমার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে কোনোমতে বলে উঠলো,
—’ তীর অবধি যেতে পারবি তো আমাকে সহ ? ‘
তমা আর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করে না। কারণ সে সময় নেই। লোকটাকে চিনতে পেরেছে দুজনেই। গতকাল রাতে যখন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, এই লোকই তিতিরের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।
এদের হাত থেকে বাঁচতে নদীতে লাফ দেওয়ার বুদ্ধি তিতিরেরই দেওয়া।
তবে ভরা বর্ষার সময় এখন। উত্তাল শীতলক্ষ্যা। প্রচুর স্রোত। নিজে নিজে একা সাঁতার কাটতে পারাই দুষ্কর। তার ওপর আরেকজনকে কাঁধে নিয়ে এই নদী পার হওয়া একপ্রকার অসম্ভবই লাগছে৷ তিতির ব্যাস্ত গলায় বললো,
—’ তুই পালিয়ে যা, তমা। আমি এদিকটা…’
তমা ধমকে উঠলো তৎক্ষনাৎ। গতরাতেই তো তাহলে পালিয়ে যেতে পারতো । সুযোগ ছিলো। যেমন করে তিতির নিশিকে লুকিয়ে ফেলেছিলো। সে তখনই মেয়েটার সাথ ছাড়েনি । আর এরকম সিংহের মুখে ফেলে সে পালিয়ে যাবে! তাই হয়।
—’ তুই পা গল। ইয়াজ মির্জার হাতে পরলে তোকে এবার আর বাঁচিয়ে রাখবে বলে মনে করিস ? সর্বনাশ ঘটাবে। যা বলেছিস সেটাই । আমি পারবো তিতির । ‘
তিতির ব্যাতিব্যাস্ত নজরে ডানে-বায়ে তাকায়। ব্রিজটা সম্ভবত এখনো গাড়ি চলার জন্য উপযুক্ত নয়। দুদিকে নেমে পায়ে হেঁটে এদিকটায় আসতে হবে। রাস্তার ওদিকটায়ও ইট, বালু, রড সবের পাহাড়। তিতির ছলছল চোখে তাকিয়ে রয়। হিং স্রতা জাগিয়ে দিয়েছে তারাই। আজকে হাতে পেলে সত্যিই আর রক্ষা নেই। এদিকে তার জন্য তমা টাও নিজের জীবন ঝুঁকিতে নিচ্ছে। এখন এই দুঃচরিত্র লোকের হাত থেকে বাঁচার আর উপায় কি! সম্মান বাঁচাতে ডুবেই মরলো না হয়।
তিতিরের কখন অনুমতি পাবে, সেই অপেক্ষা করলে আবার বন্দী হতে হবে। আর এবার নিশ্চয় ইয়াজ মির্জা একই ভুল আর দ্বিতীয় বার করবে না! লোকগুলো ব’ন্দুক তাক করে এদিকে ছুটে আসতে আসতে দুঃসাহসিক সেই কাজটি করে বসলো তমা। তিতিরের কোমড় জড়িয়ে ঝাঁপিয়ে নদীতে পরলো এই নির্মাণাধীন ব্রিজ টা থেকে। বন্দুকের গু’লি ছুটলো সঙ্গে সঙ্গে। শূন্যে ছোড়া হয়েছে। লোকগুলো সম্ভবত ভয় দেখাতে চেয়ে ছিলো মেয়ে দুটো কে। কিন্তু তারা কল্পনাও করতে পারেনি, এখান থেকে লাফ দিতে পারে মেয়েদুটো। জর্ডান ঝড়ের গতিতে ছুটে গেলো ব্রিজের কিনারায়। এই কয়েক মিনিটরের ব্যবধানে ঘটে গেলো ঘটনাটা। সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নিখোঁজ হয়েছে মেয়ে দুটো। জর্ডান ঘাড় বাঁকিয়ে নিজের লোকদের আদেশ ছুড়লো দ্রুত ব্রিজের নিচের দিকে যেতে।
—’ আপনাকে তো আর ভরসা করতে পারছি না মশাই । ডিল টা হলো আমাদের সাথে, অথচ ভাবসাবে মনে হচ্ছে, কাজ করছেন ঈশান আরশাদের জন্য । প্রবলেম কি আপনার ? ‘
তাহমিদ হালকা হাসলো রুষার দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা যথেষ্ট বিরক্ত তার ওপর, বোঝাই যাচ্ছে সেটা । থানা থেকে সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে দু’জন। রুষা তার গাড়ির ভিতর, আর তাহমিদ বাইকের ওপর। পথিমধ্যে হুটহাট দেখা হওয়া বলতে যা বোঝায়, তা নয়। পরিকল্পনা মাফিকই দেখা করছে দু’জন। একজন পুলিশের সাথে ক্রিমিনাল নিশ্চয় আয়োজন করে থানায় দেখা করতে যাবে না! তাহমিদের কন্ঠস্বরে বিনয় যেনো উপচে পরলো। হাসি হাসি মুখ করে বললো,
—’ তা কি করে হয় ম্যাডাম। ঈশান আরশাদের পর্দা ফাঁস করলেন আপনি, আর আমি আপনার সাথে থাকবনা ? এটা হয়? ‘
রুষা চোখের সানগ্লাস টা কপালে ঠেলে দিলো। অসহ্য রোদ ওঠে কয়েকটা দিন যাবৎ। তাকানোও যাচ্ছে না বাইরের দিকে। তপ্ত গলায় বললো,
—’ মুখের কথায় চিড়ে ভেজে না তাহমিদ সাহেব। এদিকে আপনার পরিকল্পনার জাল ছিঁড়ে ঈশান বেড়িয়ে গিয়েছে, ওদিকে ইয়াজের কাছ থেকে তিতির। এখন? দুই জামাই – বউ মিলে এখন বা’সর জমাক গিয়ে। ‘
—’ তাহলে? দোষ একা আমার হয় কি করে? ঈশান ছিলো আপনার বাড়িতে । আপনার কাজের মেয়ে তাকে সাহায্য করেছে বেড়িয়ে যেতে। ওদিকে তিতির ছিলো আপনার ভাইয়ের বাড়িতে। সেখানেও একই ঘটনা। আমি এর মধ্যে আসলাম কোথা থেকে। আপাদমস্তক সমস্ত পরিকল্পনা তো আপনাদের দুই ভাইবোনেরই ছিলো। তাই নয় কি? ‘
রুষা বিরক্ত মুখে চোখের সানগ্লাস টা নামিয়ে দিলো। গাড়ির কাচও তুলে দিলো। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব খেজুরে আলাপ আর ভালো লাগছে না তার। রুষার গাড়ি শব্দ করে গিয়ার তুলে প্রস্থান করতেই বাঁকা হাসলো তাহমিদ। একজন মেয়ে হয়ে ড্রা’গ সাপ্লাই করে ভাইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে। নিজেও রীতিমতো ড্রাগ এ’ডিক্ট! এতসব কাহিনি ঘটানোর পরও কি ঔদ্ধত্য! এক বিবাহিত দম্পতি কে আলাদা করে নিজের করে নিতে মরিয়া হয়ে আছে দুই ভাইবোন। দু’জনকেই রীতিমতো সাইকোপ্যাথ লাগে তাহমিদের।
ঈশানের লোকজন যতক্ষণে জেলেপাড়ার এদিকে এসে পৌছালো, তখন তিল ধারনের জায়গা নেই আর। মাছের বাজার তখন চনমনে। পুরুষ মানুষে ভর্তি এদিকটা। কেউ-ই দুটো মেয়ের সন্ধান দিতে পারলো না এই মূহুর্তে। সুতরাং তিতিরদের কোনো ধরনের খবর না পেয়ে খালি হাতেই ফিরতে হলো তাদের কে। গাড়ি ছুটিয়ে ঈশান যখন পুরান ঢাকায় নিজের সেই ডেরাতে পৌছালো, ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন বেলা সাড়ে বারোটা। গোটা টা সকাল শীতলক্ষ্যার তীর ঘেঁষে যতদূর পথ চলা যায়, নিজের লোকজন নিয়ে খুজেছে সে। গোটা শহর তোলপাড় করে ফেলেছে একপ্রকার। কোত্থাও দেখা মেলেনি মেয়ে দুটোর। ঈশান তপ্ত চোখেমুখে, দূর্বল পায়ে ভিতরে ঢুকতেই তার একজন লোক ছুটে এলো এদিকটায়। ঈশানকে দ্রুত ভিতরে আসতে ইশারা করলো।
হলঘরের মতো উঁচু একটা রুম। দৈর্ঘ্য প্রস্থে মাঝারি। তবে ওপর দিকে বেশ খোলামেলা। টেবিলের ওপর তার ল্যাপটপ টা চালু করে রাখা। সেখানে সরু চোখে তাকাতেই চোখে পরলো গম্ভীর মুখের একটা পুরুষ মানুষকে। দূর্বল শরীরটা নিয়ে আরও একটু এগিয়ে তাকাতেই পাশেই আরকজন জৌলুশপূর্ণ রমনীকেও চোখে পরলো। বাড়িটা ঈশানের চেনা। এই বাড়িতেই বিগত তিনদিন স্বইচ্ছায় বন্দি ছিলো সে। তবে আজকে বাড়ির অবস্থা অন্য রকমই লাগছে। আজকে আর ফাঁকা নয় বাড়িটা। বরং বসার ঘরের বিশাল সোফার ওপর পায়ের ওপর পা তুলে বসা রুষা আর ইয়াজ দু’জনেই। এতো কিছুর পর আজকেই প্রথম দু ভাইবোনের সাথে একসময়ে দেখা হয়ে গেলো ঈশানের। হোক সেটা ভার্চুয়াল ভাবে। তবুও দু’জনে ভাইবোন, এটা জানার পর একদিনও একসাথে দেখে নি তাদেরকে।
ঈশানের বাঁ হাতের এদিকটা তখন পুরো ব্যান্ডেজ করা। ডাস্টি গ্রিন শার্টের ওপরের দিকটা ছোপ ছোপ রক্তে ভিজে আছে। ঈশান ধীরেসু্স্থে, নাকমুখ কুঁচকে ল্যাপটপের সামনে বসা মাত্র সেই ক্ষত নজরে এলো রুষার। কপটতা রেখে ব্যাস্ত হলো ঈশানের দিকে। বাঁধ সাধলো ইয়াজ। চোখের অগ্নিদৃষ্টিতে ইশারা করলো একদম কিছু না বলতে । ঈশানের শরীরে তখন কাঁপন দিয়ে জ্বর উঠেছে। তিতির কে খুঁজতে গিশে রীতিমতো খারাপ অবস্থা তার।
—’ পাখি বড্ড উড়াউড়ি করে। না খাঁচায় বন্দী থাকবে, আর নাতো খোলা আসমানে উড়তে পারে। ননীর পুতুল বানিয়েছিস একেবারে। বুক ছাড়া আর কোত্থাও নামানো যায় না । ‘
ইয়াজের কথায় হিসহিসিয়ে উঠলো ঈশান। হাতের রি’ভলবার টা শক্ত করে চেপে রাখা। গর্জে উঠলো সে। দূর্বল শরীরেই একহন ঝুঁকে এলো স্ক্রিনের দিকে ।
—’ তিতির কোথায় ? ‘
—’ পানি তে ঝাপ দিয়েছে। ‘
ভ্রু কুঁচকে এলো ঈশানের। পানিতে ঝাপ দিয়েছে মানে! সাঁতার জানে না মেয়েটা। তবে ইয়াজের কথাটাকে হেয়ালি হিসেবেই ধরে নিলো ঈশান।। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ কোনো কিছুর ধার আমি ধারবো না, ইয়াজ মির্জা। আমার তিতির কোথায়? ‘
অসহ্য রকমের হাসি দিলো ইয়াজ । তবে হাসিটা যে নিস্প্রভ, সেটা দেখলেই বুঝতে পারা যায়। ঈশানের রাগ কে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিলো না সে।
—’ তুই আমার নাগাল পেতে আর কত অপেক্ষা করবি বল তো। ‘
—’ তুই আমার নাগালেই। ‘
—’ ছিলাম হয়তো। কাল অবধিও। যেই মূহুর্তে তোর বউ আর বোন আমার হাতে এসেছে, সেই মূহুর্তে তোর গিটের তাশ টা খোয়া গিয়েছে। স্বীকার কর সেটা । ‘
ঈশান মুখে স্বীকার না করলেও এটাই সত্য । আজকে তিতির আর তমা ইয়াজ মির্জার কবলে না পরলে, তুরুপের শেষ তাশটা সেই ফেলতো। তার ওই এক্সিডেন্ট টা সব এলোমেলো করে ফেলেছে। এই মূহুর্তে তিতির কে খুঁজে পাওয়ার থেকে জরুরি তার কাছে আর কিচ্ছু নয়।
—’ তিতির কোথায়? ‘
রুষা তখনো অসহায় চোখে তাকিয়ে ঈশানের বুকের দিকটায়। ঈশান যত জোর দিয়ে কথা বলছে, জায়গাটা ততবার ভিজে উঠছে । ইয়াজ বিতৃষ্ণা মাখা গলায় বললো,
—’ বোকা তোর বাড়ির মেয়েরা। সবকটা বোকার হদ্দ। তোর এক বোনের সাথে প্রেম করেছিলাম। তোর বউকে ভালোবাসলাম। দেখলাম সবকটাকেই। বিউটি উইদাউট ব্রেন। সবগুলো। না হলে দেখ, আমার লোকদের হাত থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাপায়। আশ্চর্য! ‘
—’ বড় ভাইয়া… ‘
দোতলার করিডর থেকে দূর্বল একটা মেয়েলি কন্ঠে চকিত স্ক্রিনের ওপরের দিকে তাকালো ঈশান। ইয়াজের ঠিক পিছন সাইড থেকে শব্দটা এসেছে। ইয়াজ বাঁকা হেসে মনিটর কাত করে ধরতেই ঈশানের চোখে পরলো বোনকে। তমা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দু’পাশে থেকে চেপে ধরে আছে দু’জন মহিলা।
—’ তমা? ‘
ইয়াজ উদাস ভঙ্গিতে তাকালো সেদিকে। ইশারা করলো ভিতরে নিয়ে যেতে। ওকে নিয়ে যেতেই ইয়াজ গমগমে গলায় বললো,
—’ এতো অশান্তির মধ্যে ভালো আর বাসবো কি করে! তোর বউ টা কে পাই নি। তবে যদি না ডুবে ম’রে, আমার হাত থেকে যাবে কোথায়। এটাকে যখন তীর থেকে পেয়েছি, তিতিরপাখিকেও পাবো। খুব জলদিই।’
ঈশানের বুঝতে বাকি রইলো না, মেয়েদুটো সত্যিই ঝাঁপ দিয়েছিলো পানি তে। তমাকে তীর থেকে পাওয়া গিয়েছে। তার মানে মেয়েটা সাঁতরে তীর অবধি আসতে পেরেছিলো। কিন্তু তিতির? জ্বরে পুড়ে যাওয়া শরীরটা কেমন বল হারালো যেনো। পিঠ টা চেয়ারে ঠেকিয়ে শ্বাস ফেললো হা করে। বলিষ্ঠ শরীরটা কাপছে। বু’কের ওঠানামা স্পষ্ট। তিতির সাঁতার জানে না। পানি তে ভয়ও পায় বড্ড। ছোট থেকেই। পানি তে নামলেও, সাথে কেউ একজন একপ্রকার আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখে ওকে। বাড়ির সুইমিংপুলে নামতেই কাঁপাকাপি করে মেয়েটা। আর এরকম উত্তাল নদীতে লাফিয়েছে! চোখ জ্বলছে তার, ঘোলা দেখছে চোখের সামনে।
নিজের অতি কনফিডেন্স আর তিতিরের এই বোকামির জন্য আজকে সম্ভবত এই অবস্থায় এসে থামতে হলো তার। না হলে আজকে বোধহয় ইয়াজ মির্জার খেল খতম করে, বাড়ি ফিরতে পারতো। সব হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। তিতির কে না পেলে এ দুনিয়ার আর কোনো যুক্তি, কোনো লাভক্ষতির হিসেবই করতে পারবে না ঈশান। সব জলে যাক! ঈশান মনিটরের ওপাশে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকা ইয়াজকে দেখে বললো,
—’ আমার কেনো মনে হচ্ছে তিতিরও তোর কাছে ? ‘
—’ তাই যদি হতো, তোর কি মনে হয় আমি এখন দেশে থাকতাম? তোর এই বোনকে একটু টে’স্ট করে, তোর বউকে নিয়ে হানিমুনে রওনা হতাম না? ‘
—’ জাস্ট শাট ইও্যর ডা’র্টি মাউথ। তিতির বা তমাকে নিয়ে একটা বাজে কথা বললে জিব টেনে ছি’ড়ে ফেলবো। ‘
—’ তোর বোন যতক্ষণ আমার কবজায়, ওই রিস্ক টা তুই নিবি না। আমি জানি। আপাতত তিতিরপাখি কে খুঁজি। তুই-ও খোঁজ। দেখ কে আগে পায়। তবে তোদের ডিভোর্স লেটারে সই সাক্ষর হয়ে গিয়েছে। তোর গো’লাগুলির সিন গুলো তোর বউকে একদম এইচডি ভার্সনে দেখিয়েছি। ও একদম একশন সিনেমার মতো এনজয় করেছে। তবে হিরো কে এক নিমেষে ভিলেন লেগেছে ওর। বড্ড নারাজ তোর ওপর। ‘
কথাগুলো কপট আক্ষেপের সুরে বলেই মুখে চুকচুক শব্দ করলো ইয়াজ।
—’ মানে? ‘
—’ আমার ভাই কে কত যত্ন করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলি, ভুলে গেলি? ‘
একপ্রকার র’ক্তশূন্যই হয়ে এলো ঈশানের মুখটা। গলা খড়খড় করছে। শুকিয়ে আসা ঠোঁটটা জিবে ভিজিয়ে নিলো। চোখ বন্ধ না করেও, ওই রাতের দৃশ্য চোখের সামনে চালচিত্রের মতো ভেসে উঠলো। রুহ কাঁপলো তার। তিতির এই ভিডিও দেখেছে মানে! এই নৃ’শংসতা ও কিভাবে নিয়েছে ? ঈশানের এই অন্ধকার দিক সম্পর্কে তো একদম কিচ্ছু জানে না মেয়েটা। হয়তো ইহজীবনে কল্পনাও করতে পারে না। সেটা নিজের সামনে দেখেছে! ঈশান কিছু বলার আগেই গর্জন করে উঠলো ইয়াজ।
—’ একই কাজ তোর সাথে আমি করতে পারতাম। তোকে মা’রতে পারতাম। কেনো মা’রিনি জানিস? তুই যেভাবে আমার ভাই কে কেড়ে নিয়েছিলি। আমিও একই ভাবে প্রতিশো’ধ নিতে চেয়েছি। তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কাড়বো আমি। তোর বোনের সাথে প্রেম, আমার বোনকে তোর সাথে প্রেম করতে দেওয়া, সবই তোর ঘরের খবর নিতে। কিন্তু শুরু থেকেই আমার সব কেড়ে এসেছিস তুই। তিতির কে আমি যখন ভালোবাসি, তুই ওর চেহারাটাও মনে রাখিসনি। অথচ আচমকা বিয়ে করে নিলি তুই? আশ্চর্য! আমার পিঠে ছু’ড়ি মারতে তুই ওস্তাদ। ‘
ব্যাঙ্গাত্মক হাসলো ঈশান। আঙুলে কপাল চেপে বললো,
—’ তুই তিতির কে পাওয়ার যোগ্য? ‘
—’ তুই-ও কি যোগ্য? আমার দু-হাত মানুষের র ক্তে মাখা । তোর নয়? তুই আমি সমান। তারপরও তুই পেলি ওকে। পেলি তো ঠিক আছে। দিনের পর দিন ভালোবাসিস না। এই নাটক করে এলি । আচমকা শুনলাম বি ছানায় নেওয়া শেষ? ‘
—’ কু ত্তার বাচ্চা, বিছানায় নিয়েছি মানে কি? ও আমার বিয়ে করা বউ। এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করার আগেও দু’বার ভাববি। ‘
—’ বউ! জোর করে পরিবার বিয়ে দিলো। দিনের পর দিন ভালোবাসিস না বলে পারি দিলি! আচমকা বা’সর সারলেই বউ হয়ে যায়৷? ‘
ঈশানের মুখ তেঁতো হয়ে এলো। মুখে একরাশ তপ্ততা এনে বললো,
—’ বা সর করায় ও আমার বউ হয় নি। বউ হয়েছে, পাগলের মতো ভালোবেসেছি, তাই বা’সর করেছি। আর আমার বউ, আমি ওর সাথে কি করবো তার কৈফিয়ত, বা ব্যাখা তোর থেকে শুনবো? ‘
—’ না শুনলে নাই । তিতির কে আমার সবভাবে চলবে। তোর ছোঁয়া আমি খুব যত্ন করে মুছে দেবো। কিন্তু তুই ? আমার ছোঁয়া তোর বউয়ের শরীরে লাগার পর, তুই কি ওকে আবার মন থেকে কাছে টানতে পারবি? পারবি? ‘
ঈশান বাঁকা হাসলো। দু-হাত হাঁটুতে ভর করে ঝুঁকে বাঁকা গলায় বললো,
—’ আমার বউ কে আমি চিনি। ঈশান আরশাদের বউ ও। এইটুকুন হেফাজত ও ঠিক করতে পারবে নিজের। মানা না মানা পরের কথা, ওই নোংরা বিষয়টা আমি বা তিতির দু’জনের কেউ-ই ঘটতে দেবো না। ছুঁয়ে দেখতে যা। দেখ তোর হাত আর জোর দেখানোর অঙ্গটা জায়গা মতো থাকে কি-না। আমি পৌছাতে দেরি করতে পারি, কিন্তু তিতির তোর ওটা কাটতে দেরি করবে না। বিশ্বাস কর, আমার বউ তো। রায়বাঘিনী একটা। একদম তৃতীয় লিঙ্গের পাবলিক বানিয়ে দেবে। ট্রাস্ট মি!’
ইয়াজের মুখটা অপমানে থমতমে হয়ে গেলো । মনে পরলো গতরাতে তিতিরও ঠিক একই ধরনের কথাই বলেছিলো। স্বামী স্ত্রীর এক ধরনের কথার ধরন। অসহ্য ঠেকলো ইয়াজের। ভিডিও কল কেটে গেলো তৎক্ষনাৎ। ল্যাপটপ টা শব্দ করে বন্ধ করে ফেললো ঈশান। যতই বাঁকা কথায় অতিষ্ঠ করে দিক, ভয়ে হৃদয় টা কুঁকড়ে আসছে তার। ইয়াজের কাছে সত্যিই যদি শুধু তমা থাকে। তাহলে তমাও কতটা রিস্কে আছে বলার অবকাশ রাখে না। আর তিতির! দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান। এই কারণে মেয়ে গুলোকে সতর্ক করে এসেছিলো, যাই হয়ে যাক না কেনো বাড়ির বাইরে বের না হতে। কে শোনে কার কথা! অবশ্য তিতির কে দোষ দিতে পারে না সে মোটেই। ওইরকম একটা অবস্থায়,টানা কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা মানসিক টানাপোড়েন এর মধ্যে এতো ভাবাভাবির সময় কোথায় ছিলো! তাছাড়া এমন তো নয় মেয়েটা একা বের হয়েছে। পরিবারের বড়দের নিয়েই বের হয়েছিলো। ভাগ্যে ছিলো এই দূর্দশা টা। ঈশানের মাথা দপদপ করে ওঠে। তিতির টা সাঁতার জানে না। তমা কে তীর থেকে পাওয়া গেলে, তিতির কোথায়!
বিশাল একটা হলরুমের মতো ঘরটা । নিয়াজ, অমিত বসা ঈশানের মুখোমুখি । ছেলেটাকে উদভ্রান্তের মতো দেখতে লাগছে। ঈশান তখন থেকে চুপ করে আছে। রক্তিম চোখজোড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে শরীরের ওপর দিয়ে কি যাচ্ছে তার । সাজিদের ফোর্স থেকে শুরু করে ঈশানের লোকজন। সবাই হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে তিতির কে। এখনো অবধি পাত্তা পাওয়া যায়নি মেয়েটার। তবে তমার ভাষ্যমতে সে নিজে জ্ঞান হারানোর আগ অবধি তিতির কে আগলেই ছিলো। নিয়াজ গমগমে কন্ঠে ঈশানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ তিতির কে না হয় খুঁজছে ওরা। তমা কে ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসার উপায় নেই? ‘
নিয়াজের প্রশ্নের তৎক্ষনাৎ কোনো উত্তর করে না ছেলেটা। মাথার সিল্কি চুলগুলো ধুলোমাখা লাগছে, উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে। দুদিনেই চোখের নিচে কালচে আভা এসে ভিড় জমিয়েছে । ঈশান দু-হাত আলগা করে গা এলিয়ে দেয় রকিং চেয়ারে। নিজের শরীরকে আর একফোঁটা ভরসা নেই। যেকোনো মূহুর্তে নিয়ন্ত্রণ হারাবে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। তবে ওদিকে ইয়াজের লোকদের থেকে শোনা তমার ভাষ্যে একটু হলেও শান্ত হয়েছে মন। তীর অবধি যখন তমা আসতে পেরেছে, তিতিরও নিশ্চয়ই সাথেই ছিলো। নিয়াজ হতাশ চোখে তাকায় বন্ধুর দিকে। গোটা একটা দিনেও একফোঁটা পানি অবধি মুখে তোলে নি ছেলেটা। সারাদিন ছুঁটে ফিরেছে পথে পথে। হাতের ক্ষতটা কি দারুণ যন্ত্রনা করছে, তা ওর ফ্যাকসে মুখ দেখলেই বলে দেওয়া যায়। তবে সেটারও চিকিৎসা করাতে নারাজ সে। এই রোদ মাথায়, অসহ্য গরমে হন্যে হয়ে কোথায় না কোথায় ছুটেছে। দোষ তাদেরও কম নয়। ঈশান বারংবার সতর্ক করে দিয়েছিলো, করা নজর রাখতে ওর বাড়ির ওপর। নজরেই ছিলো প্রতিনিয়ত। ওই সময় তিতিরের ফোন কল না ধরতে পারার কারণে এত বড় ঝামেলা ঘটে গিয়েছে। তবে সে-সব বলে এখন লাভ কি। একই সময় সব্বাই ফোনের কাছে ছিলো না এটাতে ঈশানের রাগ হওয়া স্বাভাবিক নয় কি। গোটা একটা দিন কেটে গিয়েছে, রাতও গভীর হচ্ছে ক্রমাগত।
তিতিরকে নদী থেকে পাওয়া যায়নি, কথাটা শোনা মাত্রই বজ্রপাত হলো ঈশানের মাথায় ।
গোটা একটা দিন কেটেছে এই তান্ডব বয়ে নিয়ে। ঈশানের শরীর- মন দু’টোই ক্ষান্ত দিতে বলছে এ যাত্রায় । তীব্র জ্বর, হাতের ব্যাথা, সঙ্গে তিতির কে না পাওয়ার যন্ত্রনা, মিলেমিশে বিষ লাগছে ঈশানের । আর তখনই আচমকাই নাঈম হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো ঘরের ভিতর । ছুটে এসেছে সম্ভবত, হাঁপানী রুগীর মতো হাঁপাচ্ছে, শ্বাস ফেলছে হাঁ করে! তাকে দেখা মাত্রই ঈশান তড়িৎ উঠে দাড়ালো, লম্বা কদম ফেলে এগিয়ে এলো বন্ধুর দিকে । উদভ্রান্তের মতো দৃষ্টিতে, তিতিরকে নিয়ে প্রশ্নের বহর।
নাঈম ঠোঁট কামড়ে ধাতস্থ করলো নিজেকে, সিক্ত চোখে, ভাঙা গলায় কাটকাট ভাবে বললো,
—‘ রাত সাড়ে আটটা নাগাদ নদী থেকে একটা মেয়ের ব ডি পাওয়া গিয়েছে, ঈশান । মেয়েটা মা রা গিয়েছে সকালের দিকেই । থানা থেকে পুলিশ ফোন করেছিলো, তারা শনাক্ত করতে যেতে বলছে তোকে। মেয়েটা তিতি…’
নাঈমকে ওভাবে আসতে দেখে একবুক আশা নিয়ে তাকিয়েই ছিলো তার দিকে। সে নিজেও খানিক আগেই ফিরেছে মেয়েটাকে খোজাখুজি করে। এখনও ল্যাপটপের সামনে বসে ক্রমাগত সেই কাজই করে যাচ্ছিলো। নাঈমের কথা শেষ না। তার আগেই ঈশানের মতো পুরুষমানুষও টলে উঠলো এই কথাটা শোনা মাত্রই। পায়ের তাল সামলাতে না পেরে ছেলেটার ভারি শরীরটা হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে কাঁচের টেবিল খানায় আছড়ে পরলো । চুরমার হয়ে গেলো সব । ছেলেটার রক্তিম চোখজোড়া গড়িয়ে ঝরঝর করে ঝরে গেলো মুক্তো কনার মতো জল। রক্তিম চোখের পানি এই মূহুর্তে রক্তদানা লাগলো নাঈমের কাছে। সন্ধ্যার পর থেকে একপ্রকার ভালোমন্দ মেশানো বিশ্রী একটা অনূভুতি নিয়ে তিতিরকে খুঁজে যাচ্ছিলো সে। নদীতে গোটা টা জাল ফেলে খোঁজ লাগিয়েছে অমিত। ঈশানের শরীরের নিচে ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া একগাদা কাঁচের টুকরোকেও পরোয়া করলো না ছেলেটা। নাঈমের কথাটা বোধগম্য হয়নি এমন একটা দৃষ্টি দিলো। নিয়াজ, অমিত ততক্ষণে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এসেছে ঈশানকে সরিয়ে নিতে। ঈশান ওদেরকে স্পর্শ অবধি করতে দিলো না। নাঈমের দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতো শুধিয়ে উঠলো,
—’ কি করতে হবে আমাকে? কি বললি, বুঝলাম না। ‘
নাঈম ঠোঁট টিপে সংবরণ করে নিজেকে। আধঘন্টা আগে ঈশানকে বুঝিয়ে এখানে রেখে সে গিয়েছিলো আরেকটু খোঁজ করতে। সাজিদ এরইমধ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। ভাঙা গলায় বললো,
—’ তোকে থানায় যেতে হবে একবার। ব ডি টা শনাক্ত করতে। ‘
—’ কেনো! আমি কেনো যাবো! ‘
ঈশানের কন্ঠস্বর অন্যরকম শোনালো হঠাৎই। মুখটা কঠিন হয়ে এসেছে। ভাঙা কাঁচের ওপর থেকে নির্বিকার মুখে উঠে দাঁড়ালো। আঁতকে উঠলো অমিত। পিঠের দিকটা ছিড়েখুঁড়ে গিয়েছে। গু লি লাগার জায়গা তো আবার আগাত পেয়েছেই, মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আবার এতগুলো ক্ষত! ঈশান পিঠ টান টান করে দাড়ালো। শার্ট ভেদ করে লহুকণা গড়িয়ে পরলো। সেদিকে নজরই দিলো না। আর না তো চোখেমুখের ভাবে কোনো যন্ত্রনা দেখা গেলো। নাঈম দু-হাত বারিয়ে বন্ধুর বাহু চেপে ধীর গলায় বললো,
—’ শান্ত হ । শোন, আমি বলি কি… ‘
নাঈমকে সজোরে ধাক্কাই মারলো ছেলেটা। তাল সামলাতে না পেরে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো তার। অসহায় ঠেকলো বড্ড। প্রায় তক্ষুনি আরেকদফা বাজলো নাঈমের ফোন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া গেলো গম্ভীর কন্ঠস্বর,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানকে নিয়ে আসছেন? নাকি ওনার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করবো আমরা। বুঝতেই পারছেন, সকাল থেকে পানিতে ছিলো। একপ্রকার ফুলে উঠেছে লা শ টা। বেশিক্ষণ এভাবে রাখা সম্ভব নয়। ‘
ফোনের উচ্চ আওয়াজে ঈশান শুনলো সবই। হুংকার দিয়ে কেড়ে নিলো ফোনটা। সজোরে ছুড়ে দিলো দেয়াল লক্ষ করে। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো ফোন টা। থামানো গেলো না তাকে আর। গোটা ঘর তছনছ হলো চোখের পলকেই। ছেলেটার উ ন্মাদনায় তা ন্ডব বয়ে গেলো। ভেঙেচুরে একসাড় হলো সবকিছু। অসহায় ঘরজুড়ে সবাই। ছেলেটার বাঁ পাশটা একদম ভেজা। নিয়াজ ব্যাস্ত হাতে বন্ধুকে জাপটে ধরতেই মেঝে ভর্তি কাঁচের ওপরই হাটু ভেঙে বসে পরলো ছেলেটা। দু-হাত মুখ ডলে উন্মাদের মতো আর্তনাদ করে উঠলো,
—’ যার জন্য গোটা দুনিয়ার সাথে লড়াইয়ে নামলাম । যার ভালোর জন্য নিজের অস্তিত্ব মিথ্যা করে ফেললাম, খোদা তাকেই আমার থেকে কেড়ে নিলো? ওকে বলেছিলাম, আমি মরে যাবো ওকে ছাড়া। ও কি সেটা বিশ্বাস করেনি? ওর প্রমাণ লাগবে? আমি প্রমাণ দেবো? কি করলে ও ফিরবে? ‘
ঈশানকে এমন সিচুয়েশনে আগে কেউ দেখেছে কি ? দেখেনি বোধহয়। আর্তনাদের সাথে ওই চোখের পানিগুলো! অবিশ্বাস্য ব্যাপার নয় কি? নাঈম, নিয়াজ দু’জনেই শক্ত হাতে টেনে দাড়া করায় ছেলেটাকে। ভারি শারীরটার ভার সে নিজেই রাখতে পারছে না, অন্যরা আর কিভাবে রাখবে! ঈশান ব্যাকুল হয়েছে বড্ড। অনাকাঙ্ক্ষিত ভয় গুলো আগেই তো জমা হয়ে রয়েছিলো বুকের মধ্যে, তবুও সে-সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে গোটা দিন খুঁজেছে মেয়েটাকে। কিন্তু এখন! বাধ ভেঙেছে সব। ঈশান আরেক দফা আর্তনাদ করে উঠলো ভাঙা ভাঙা গলায়,
—’ ঠিক আছে, ও না ফিরতে পারলো। আমি তো ওর কাছে যেতে পারি! ‘
বাঁধন ঝটকা দিয়ে আলগা করে ফেললো। ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেলো ঘর থেকে।
ঢাকা শহরের ব্যাস্ত রাস্তার জ্যাম হাসপাতালের মর্গে আসতে সময় লাগলো পাক্কা দেড় ঘন্টা। রাত যে হয়েছে, সেটা এতো গিজগিজে মানুষ দেখে বোঝার উপায় নেই। ঈদের ছুটি শুরু হবে। শপিং এও ডুবে আছে মানুষজন। ঈশান একপ্রকার ঘোরের মধ্যে আছে। এই অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত শরীরটা নিয়েও রীতিমতো হাওয়ার বেগে পা ফেলছে। তার অস্থির কদমের সাথে তাল মেলাতে পারছে না বাকিরা। গাড়ির মধ্যে খুব জোরজবরদস্তি করিয়ে ছেলেটার শরীরের শার্ট টা পাল্টে দিয়েছে নিয়াজ। তবে যে হারে হাত পা নাড়াচ্ছে, ছটফট করে কদম ফেলছে আবার র ক্তস্নান করে উঠলো বলে। দেওয়ান বাড়িতে এখনো কাউকে জানানো হয় নি কিছু। রিসেপশনে এসে খোঁজ নিতেই দু’জন পুলিশ কনস্টেবল এগিয়ে এলেন ওপাশ থেকে। তারাই মূলত লা শের পাহারায় ছিলেন এতক্ষণ যাবৎ। নাঈম এগিয়ে গিয়ে কথা বলতেই ইশারা করলেন মর্গের দিকে যেতে।
হাসপাতালের একদম শেষ মাথায়, যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নেই বললেই চলে, সেখানেই মর্গটা।
শুনশান এদিকটা। হাসপাতালের ভিতরের সেই ফিনাইলের ঘ্রান এদিকটায় নেই। তার বদলে ভ্যাপসা গন্ধ।কেমন দেয়ালের চুনকাম খসে পড়া। ওদিকের কোনায় হলদেটে আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে। লোহার ভারী কোলাপসিবল গেটের ওপাশে একটা প্রাচীন কাঠের দরজা, যার ওপরের ‘মর্গ’ লেখাটার রং চটে গেছে। দরজার বাইরে দুটো কাঠের বেঞ্চিতে কয়েকজন মানুষ পাথরের মতো বসে আছে। ঈশান খেয়াল করলো দম বন্ধ লাগছে তার, শ্বাস টানতে পারছে না। নিজেও একদফা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ওপরের ওই রঙ চটে যাওয়া মর্গ লেখাটার দিকে তাকিয়ে। কোথায় এসেছে সে! কাকে খুঁজতে এসেছে? তিতির কে?
মর্গের দরজাটা খুলতেই একটা হিমশীতল বাতাস গায়ে এসে লাগল ছেলেদের। ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়ে অনেক কম। হিসেব মতে বাইরের এই অসহ্য গরম কাটিয়ে, ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগা মাত্রই একটু আরাম লাগার কথা। কিন্তু সেটা হলো না। উল্টোই মনে হলো। ভিতরে শীতল বাতাস যেনো সাপের ফনা তুলে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো ঈশানকে। ঘরের মাঝখানে ছাইরঙা স্টিলের টেবিলগুলো পাতা, যার ওপর সদ্য ধুয়ে ফেলা পানির ফোঁটাগুলো চকচক করছে। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় স্টিলের ক্যাবিনেট,যেখানে সারি সারি নামহীন, পরিচয়হীন দেহ হিমায়িত করে রাখা হয়। বাতাসে এক অদ্ভুত রাসায়নিক আর ফরমালিনের কড়া গন্ধ, যা সরাসরি মাথায় গিয়ে আঘাত করে। এখানে পৃথিবীর সব কোলাহল এসে থমকে গেছে। দেয়ালের ক্লকটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আলো বলতে সিলিং থেকে ঝুলে থাকা একটা জোরালো সাদা হ্যালোজেন বাতি।
ডোম ছেলেটি ওদের ভিতরে ঢুকতে ইশারা করতেই ঈশান দু কদম এগোলোও তালে তালে। মাথা চক্কর কেটে উঠলো। হিমায়িত বাক্সগুলো ছাড়াও গোটা ঘর জুড়েই সারি সারি সাদা কাপড়ে ঢাকা মানবদেহ। মাথা চক্কর কেটে উঠলো ঈশানের। সরু হলো চোখের পাতা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এলো শীতল কামড়া থেকে।
—’ ঈশাআন…কোথায় যাচ্ছিস, ভাই। ভিতরে…’
নিয়াজের কথায় ডানে বায়ে সজোরে মাথা নাড়লো ঈশান। উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো,
—’ এখানে আমাদের কি কাজ? আমরা তো এসেছি তিতিরকে খুঁজতে! ‘
নিয়াজ ঠোঁট কামড়ে ধাতস্থ করলো নিজেকে। ছলছল করে ওঠা চোখটা পিটপিট করে বন্ধুর দিকে এগিয়ে বাহু চেপে এদিকে এগিয়ে নিয়ে আসলো।
—’ তিতিরকে খুঁজতেই তো এসেছি। ‘
ঈশান বিরক্ত মুখে তাকালো আবার ঘরটার দিকে। তারপর ওই মর্গ লেখা সাইনবোর্ডটার দিকে। বিরক্ত গলাতেই বললো,
—’ তিতির এখানে থাকবে? পাগল হয়েছিস তোরা? খুঁজতে খুঁজতে বিরক্ত হয়ে গেলে থাকুক। আমি গোটা দিন যেভাবে খুঁজেছি, এখনো খুঁজতে পারি। আমার সে ক্ষমতা আছে। তোদের লাগবে না আমার। ‘
—’ ঈশাআন… পুলিশ একটা মেয়ের ডে ড বডি শনাক্ত করেছে আজকে। পানি থেকে। ওই নদী থেকেই। যেখানে তিতির লাফ দিয়েছিলো। আমরা সেটাই শনাক্ত করতে…’
সজোরে আঘাত পরলো নাঈমের চোয়াল বরাবর। ঈশানের শক্ত হাতের আঘাতে বেঁকে গেলো ছেলেটা।
—’ আমার তিতির কে আমি এই মৃ ত মানুষের বহরের মাঝে খুঁজবো? পাগল তোরা। আমাকেও পাগল বানাচ্ছিস! ‘
ছেলেটার দীর্ঘ সময়ের অবুঝ বাক্যলাপের সাক্ষী হলো সবাই। কতক্ষণ সময় পেরোলো সেভাবে খেয়াল করলো না কেউ। তবে একপর্যায়ে স্তব্ধ হয়ে, ঘোরের মধ্যে যখন পা রাখলো মর্গের কামড়ায় তখন পাশে সাজিদও আছে। ঈশান বাক হারা ততক্ষণে। ডোমের দেখিয়ে দেওয়া একটা সাদা কাফনে মোড়ানো দেহের পাশে গিয়ে থামলো ঈশান। ডোম হাত বাড়িয়ে কাপড় সরাতে গেলেও থামিয়ে দিলো ঈশান। সাজিদের ইশারায় সরে গেলো ছেলেটা। গোটা ঘরময় নিস্তব্ধ। ভয়ংকর নিস্তব্ধ যাকে বলে। গা ছ’মছম করা পরিবেশ যাকে বলে। হাঁ করে শ্বাস ফেলে ঈশান। স্ট্রেচারের ওপরে রাখা, কাফনে মোড়ানো নারীদেহটাকে আপাদমস্তক পরখ করে একবার। ঠোঁটের কোনে এক টুকরো হাসি ফুটে ওঠে। সাদা, কালো দু’টো রঙ ঈশানের বড্ড পছন্দের। তিতির তাই মাঝেমধ্যেই তাকে পাগল করতে শাড়ি পরলে সাদা, কালো এই দু’টো রঙেরই বেশি পরতো। পোষাকের ক্ষেত্রেও তাই! তিতিরকে সাদায় দেখলে উথাল-পাতাল শুরু হয়ে যেতো তার বুকে। আজও তাই হচ্ছে। উথালপাতালই হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হাতজোড়া ঠকঠক করে কাঁপছে ঈশানের। বিরবির করে বললো,
—’ আমার সাদা পছন্দ বলে আচমকা সাদায় মুড়িয়ে ঘুমের পায়তারা জুড়লি? এটা কেমন কথা, তিতির? আমার ওপর কি বড্ড বেশি অভিমান হয়েছে ? তোর জন্য এতো লুকোচুরি। তা কি জানিস? তোকে মানসিক চাপ দেওয়া যাবে না বলে এতো নিশ্চুপ আমি। তা নয়তো কবেই বলে বসতাম সব। তোকে বুকে আগলে সবটা বলার পরিকল্পনা এঁটেছিলাম। সেদিনই সব এলোমেলো হয়ে গেলো। কেনো বের হলি বাড়ি থেকে? আমার মৃ ত্যু কবুল। তুই কেন দূরে গেলি?’
ঈশানের মনে পরলো তিতিরের বলা সেই কথাটা– ‘ আপনার আমার বিচ্ছেদের একমাত্র পথ যদি মৃ ত্যুও হয়, সেই পথেও আমিই হাঁটবো! ‘ ঈশান অসহায় হাসলো আবার।
—’ ওটা তো রাগ করে বলেছিলি, তাই না? তাহলে? আজকের এই মূহুর্ত কেনো দুঃস্বপ্ন হচ্ছে না। বল তো?
আমি তো এই কাফনে মোরা তোকে দেখতে পারবো না, মাই লাভ। ‘
নিয়াজ, নাঈম সহ উপস্থিত সবাই অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে। ঈশানের বিরবির করে বলা সব কথাই কর্ণগোচর হচ্ছে তাদের! সাজিদ বন্ধুর কাঁধে হাত রাখতেই, ঈশান নিজের হাতটা বুকের বাঁ পাশে ছোয়ালো।
—’ যে দু’হাতে তোর মুখের ওপর থেকে লাল বেনারসির দোপাট্টা তুলেছিলাম। বিয়ের রাতে, আমার বউ হওয়ার পর এই লাল কাপড়টুকু সরিয়ে তোর লাজেরাঙা মুখটায় আমার তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি বুলিয়েছিলাম। আজকে সেই মুখের ওপর থেকে এই সাদা কাফনের কাপড় সরানোর শক্তি কি আমার হবে, বল? ওই লাজরাঙা মুখের বদলে, ফ্যাকাসে রক্তশূন্য, প্রাণহীন মুখটা… আমি… আ-আমি মরে যাচ্ছি তো, তিতিইর? কষ্ট হচ্ছে আমার। তোর ঈশান ভাইয়ের আজকে ম রণ যন্ত্রনা অনূভব হচ্ছে। ‘
ঈশান সময় নিলো, আরও খানিকটা । ঝরঝর করে ঝরে যাচ্ছে চোখের পানি । বলহীন হাতখানা কাফনের কাপড় ছোঁয়াতেই কেমন একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো শরীর। শক্ত করে চেপে ধরে রইলো কাপড়ের কিছুটা অংশ। দাঁতে নি ষ্ঠুরভাবে ঠোঁট কামড়ে একটানে সরিয়ে ফেলতেই, হৃদপিণ্ড বিট করা বন্ধ করে দিলো ছেলেটার। ছিটকে সরে গেলো স্ট্রেচারের কাছ থেকে। অমিতের বুকের সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে, ধপ করে বসেই পরলো মেঝেতে। দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরলো ছেলেটা। মেঝেতে দু-হাত ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো খোদার কাছে।
—’ আল্লাহ। এই দিন আমার জীবনে আর কখনো দেবে না তুমি । কখনো না। দরকার হলে, আমার আয়ুর বদলে বাঁচিয়ে রাখবে আমার স্ত্রী কে । তবুও, এই কাফনে মোরা লা শ আমি আর সহ্য করতে পারবনা। আমি ওই নারীর ক্ষেত্রে বড্ড দূর্বল। বড্ড দূর্বল। তুমি জানো সেটা । ‘
পুলিশ কনস্টেবল টি এগিয়ে এলো সাজিদের দিকে। হাতে একগাদা কাগজপত্র। সাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হাতের উল্টো পিঠে ভেজা চোখজোড়া মুছে নিচু গলায় বললো,
—’ ইনি রেহনুমা আরশাদ তিতির নয় । আমরা চিনি না এনাকে । ‘
ঈশানকে নিয়ে বাইরে আসতেই মর্গের রেলিঙ আঁকড়ে দাড়ালো ছেলেটা। গোটা আকাশ চকচকে। তাঁরার মেলা বসেছে একদম। বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে খোদাকে স্মরণ করলো ছেলেটা।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৬ (২)
—’ ওই নারীটিকে জীবিত আমার জীবনে ফিরিয়ে না দিলে, আমি খুশিমনে আপনার কাছে যেতে প্রস্তুত খোদা। ওকে জীবিত রাখুন, সুস্থ রাখুন। আমার আয়ু ওকে দিয়ে হলেও। আর যদি একান্তই সময় ফুরিয়ে থাকে আপনার হিসাবে, তবে আমাকে সন্ধান দিন ওর। ওকে বুকে আগলে নিতে চাই শেষমুহুর্তে। একসাথে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করতে চাই। রহম করুন খোদা। মেয়েটাকে সহি সলামতে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন। ‘
