স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৭
সানজিদা আক্তার মুন্নী
নির্বাচনে তৌসিরের বিপুল বিজয়ী হয়েছে আর এতে গোটা শিকদার বাড়িতে খুশির ঢল নেমেছে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর সমর্থকরা আনন্দে আত্মহারা, চারদিকে উৎসবের ভিন্ন এক আমেজ। বিজয় উল্লাসে মত্ত হয়ে মানুষজন বড়সড় মিছিল নিয়ে বেরিয়েছে রাস্তায়, তৌসিরকে কাঁধে তুলে নাচগানের অন্ত নেই। ঢোল-করতাল, বাঁশি আর মাইকের আওয়াজে মুখরিত চারপাশ রাত জুড়ে বাজনার শব্দ, মানুষের ভিড়ে পুরো বাড়ি মেতে উঠেছে অভূতপূর্ব উচ্ছ্বাসে।
ঘড়ির কাঁটা এখন ছুঁয়েছে রাত এগারোটা। চারপাশের কোলাহল, উৎসব আর বিজয়ের রঙিন আলো থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে তৌসির একা এসে দাঁড়িয়েছে ব্যালকনির এক কোণে। একমনে সিগারেট টানছে সে, তার প্রতিটি টানে ভেতরের কোনো অজানা ভার হালকা করার নিরন্তর চেষ্টা। নির্বাচনে জেতা, মেয়র হওয়া, ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার আনন্দ তাকে মনে মনে বিন্দুমাত্র ছুঁতে পারছে না। তার মুখে বিজয়ের হাসি লেগে থাকলেও চোখের গভীরে জমে আছে ভারী অবসাদের ছায়া। সিগারেটের ধোঁয়ায় ভেতরের চাপা যন্ত্রণাকে দমানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সে বারবার। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে ভেসে উঠছে অন্ধকার আকাশের দিকে, আর সেই সাথে তার মনে হচ্ছে জীবনের যাবতীয় আশা-ভাঙন, অপ্রাপ্তি ও অব্যক্ত কষ্টও ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে শূন্যে।
ঠিক তখনই নাজহা নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় তার পেছনে। তার পায়ের শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, ঠিক বাতাসের মতোই এসে থেমেছে সে। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে সে, “আগে তো এসব টানতেন না, এখন এসব খেয়ে মনের মতো শরীরের ভেতরটা নষ্ট করার কী দরকার?”
নাজহার কথায় তৌসিরের ভাবনার ঘোর কাটে হঠাৎ। হাতের সিগারেটটা এমনিতেই শেষের দিকে চলে এসেছে, তাই সে আর নতুন করে টান দেয় না। ব্যালকনির ফুলের টবে অবশিষ্ট অংশটা নিঃশব্দে ফেলে দিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায় নাজহার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে তিক্ত হাসি, যে হাসিতে আনন্দ নেই, রয়েছে শুধুই অসহায়তার ছাপ। তারপর নিচু গলায় বলে, “মন আর ভেতর একরকম করলে ক্ষতি কী?”
এই উত্তর শুনে নাজহা তৌসিরের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। ঐ চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মাথা উঁচু করে সে তাকায় দূরের আকাশের দিকে, যেখানে চাঁদ আধো-মেঘে ঢাকা। তারপর শান্ত গলায় বলে, “আপনার ইচ্ছে। কিন্তু এই গন্ধযুক্ত শরীর নিয়ে বাচ্চাদের সামনে যাবেন না, কড়া নিষেধ দিলাম।”
তৌসির সম্ভবত এই কথার জন্যই প্রস্তুত ছিল। সে ছোট্ট করে, বাধ্য ছেলের মতো উত্তর দেয়, “আইচ্ছা যামু ন।”
এরপর কিছুক্ষণ দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলে না। নাজহা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, আর তৌসির অপলক তাকিয়ে আছে নাজহার মুখের দিকে, ঠিক এই মুহূর্তটাকে চোখের ভেতর গেঁথে নিতে চাইছে চিরকালের মতো। চাঁদের ম্লান আলোয় নাজহার মুখটা বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও তার বুকের ভেতরটা দগদগ করছে দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভে, অভিমানে ও অপ্রকাশিত যন্ত্রণায়। শেষ পর্যন্ত এই ভারী নীরবতা ভেঙে তৌসিরই প্রথম মুখ খোলে, গলায় এক অজানা কম্পন নিয়ে বলে, “একটা কথা বলার ছিল, শুনবি?”
নাজহা এবার ঘাড় ফিরিয়ে তৌসিরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। চোখে চোখ রেখে ছোট্ট করে বলে, “বলুন।”
তৌসির একটু সময় নেয়, ভেতরে ভেতরে কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করের। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী গলায় বলে, “আমি আগামী দু-একদিনের ভেতর ইন্ডিয়া যামু। আমি যদি একমাসের মধ্যে না ফিরি অথবা আমি টপকে গেছি খবর শুনস, তাহলে বাপের বাড়ি চলে যাইস। আর যদি পারস আমার বাচ্চাগুলারে নিয়ে যাইস। তুই নিবি না, লগে নেওয়ার কথাও না, তাও কইলাম। মা তো তুই, মায়া যদি থাকে ওগো প্রতি একটু তাইলে নিয়া যাইস। আর আমি যদি জিন্দা ফিরি, তাইলে তোরে মুক্ত কইরা দিমু। তবে না ফেরার সম্ভাবনাই বেশি।”
তৌসিরের প্রতিটি কথা ছুরির মতো বিঁধে যায় নাজহার বুকে, কিন্তু বাইরে থেকে সে টের পেতে দেয় না কিছুই। তার গলার স্বর অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা হয়ে যায়, ঠিক বরফের মতো জমাট বাঁধা।তার মুখের সমস্ত রক্ত সরে গিয়ে ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে ওঠে, চোয়াল কঠিন হয়ে যায়। তবু ভেতরের কাঁপুনি লুকিয়ে, নিজেকে সবটুকু দিয়ে সামলে নিয়ে, নির্লিপ্ত কণ্ঠে সে বলে, “আমি চাই আপনি মারা যান। কিন্তু আপনি মারা গেলে এদের কী হবে? এই তিনজনকে কে দেখবে? আপনি নিশ্চিত থাকুন যে আপনার কিছু হলে আমি এদের দায়িত্ব নিচ্ছি না, তাই যা করার ভেবে করুন। আপনার মৃত্যুতে আমার কিছু হবে না, ক্ষতি হবে আপনার সন্তানদের। আপনারা যেমন নালে-কূলে বড় হয়েছেন ওরাও তেমন হবে, আমি আপনার রক্তের ভার অন্তত বইতে পারব না।”
কথাগুলো শুনে তৌসির কিছুক্ষণ স্থির, নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহার চোখের গভীরে। তারপর কণ্ঠে সমস্ত অসহায়তা ঢেলে বলে, “পাষাণের মতো কথা কইতেছোত নাজহা। এরকম কথা কইছ না। আমার সন্তানগুলারে নিয়া আমার নিশ্চিততা নাই। আমার সন্তানগুলারে একটু নিজের মনে কর, একটু নিজের মনে কর।”
এইবার নাজহার ভেতরে এতদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে পড়ে হুড়মুড় করে। দাঁত চেপে, জ্বলজ্বলে চোখে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বলে ওঠে, “নিজের মনে করছি বলেই এত কষ্টে জন্ম দিয়েছি! নিজের মনে করছি বলেই নিজের কলিজা নিংড়ানো দুধ খাইয়ে, নিজের রাতের ঘুম হারাম করে ওদের বড় করছি! এর বেশি আমার আর কিছু করার নেই। আমি কে যে আমার কাছে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন? যান নিজের বিবিজানরে এসব বলেন। আমাকে তো নামে বিয়ে করেছেন, আমার আগে তো একশো বার হাঙ্গা করেছেন ঐ মহিলা কে। তাহলে ঐ মহিলার কাছে যান, নিজের বিবিজানকে গিয়ে বলুন যার কথায় ওঠেন বসেন। তাকে না বলে আমাকে কেন বলছেন?”
তৌসির নাজহার এই তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না সরাসরি। শুধু ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একটা তিক্ত হাসি, যে হাসিটার ভেতর লুকিয়ে আছে অনেক ব্যর্থতা, অনেক অপরাধবোধ আর স্বীকারোক্তি। সে খুব ভালো করেই জানে, প্রতিবাদ করার কোনো অধিকার আর তার অবশিষ্ট নেই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত, ক্লান্ত গলায় বলে, “তুই ছাড়া এদের গতি নাই তাই। কারণ তুই ওদের মা।”
এই সহজ, স্বীকারোক্তিমূলক কথাগুলো নাজহার রাগের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। ক্রোধ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় তার। চোখ দুটো জ্বলে ওঠে অঙ্গারের মতো, বুকের ভেতরটা গোঙানির মতো ফুঁসতে থাকে চাপা কান্নায়। রাগকে কোনোমতে দমাতে সে ব্যালকনির ঠান্ডা লোহার রেলিং শক্ত করে চেপে ধরে, তার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে যায় চাপের তীব্রতায়। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে ছুঁড়ে দেয় সেই কথাটা, যেটা এতদিন বুকের ভেতর গুমরে মরছিল, “আমার তালাক চাই। আমি এই বাচ্চাদের সামলাতে পারব না।”
এই কথায় তৌসিরের ভেতরের সহ্যের সীমা হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এতক্ষণের চাপা কষ্ট এবার রাগের রূপ নেয়। সে ধমকে ওঠে গমগমে গলায়, “এই মাঝরাইতে গালিটা খাইছ। ছিনাল কথাবার্তা বাদ দিয়ে যা ঘুমা গিয়া!”
কিন্তু নাজহাও আজ পিছু হটার পাত্রী নয়। সে সোজা তাকিয়ে জেদ ধরে বলে, “ঘুমাব না, এখানেই থাকব আমি।”
তৌসির কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, নাজহার সেই জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। বুঝে যায়, এই মুহূর্তে কথা দিয়ে কিছু হবে না, যুক্তি দিয়ে ওর জেদ ভাঙানো সম্ভব নয়। ভেতরে ভেতরে সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তারপর আর একটা কথাও না বাড়িয়ে, বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে, এক ঝটকায় ঝুঁকে পড়ে নাজহাকে কোলে তুলে নেয়। এতটাই আকস্মিক এই কাণ্ড যে নাজহা প্রথমে টের পর্যন্ত পায় না কী ঘটল। তারপর সোজা রুমের দিকে হাঁটা দেয় তৌসির। নাজহা চিৎকার করে না, বাচ্চাদের ঘুম ভাঙার ভয়ে গলা চড়ায় না, তবে ভেতরের তীব্র আক্রোশে খুব জোরে তৌসিরের কলার চেপে ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে নিজের নখ বসিয়ে দেয় ওর প্রশস্ত বুকে। ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা তার চলছে, শরীর মোচড়াচ্ছে, হাত ছুঁড়ছে কিন্তু তৌসিরের বাঁধন এতটাই মজবুত, তার বাহুর গাঁথুনি এতটাই কঠিন যে সেই কোলের বন্দিদশা থেকে বের হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।
রুমে ঢুকে তৌসির ধীরে-সুস্থে নাজহাকে বিছানার ওপর নামিয়ে দেয়, ঠিক ঘুমন্ত বাচ্চাদের পাশে। তারপর নিজেও কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়ে ওর পাশে, একটা হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওকে, বালিশে মাথা রাখে ক্লান্তভাবে। কিছুক্ষণ সে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত বাচ্চাগুলোর নিষ্পাপ মুখের দিকে, তাদের নরম গাল, ছোট্ট নাক, ঘুমের মধ্যে হালকা কেঁপে ওঠা ঠোঁট। নাজহা বিরক্তি নিয়ে তৌসিরের হাত নিজের শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে ঝাঁঝালো গলায় বলে, “সরান হাত।”
বলেই সে হাত বাড়িয়ে অন্যপাশ থেকে একটা বালিশ টেনে এনে বাচ্চাদের দিকে দিয়ে দেয়। কারণ সে ভালোভাবেই জানে, তৌসিরকে যতই সরিয়ে দিক না কেন সে কাছেই থাকবে, মুখে বলেও দূরে সরানো যাবে না। রাত হলেই একদিকে এই বাচ্চাদের বাপের যন্ত্রণা, অন্যদিকে বাচ্চাদের দায়িত্ব, দুই মিলিয়ে তার জীবনটা এক কঠিন টানাপোড়েনের চাদরে মোড়া। এরপর সে বাচ্চাদের দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে, ওদের ছোট্ট শরীরগুলোকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে। চোখ বুজে নিজেকে ঘুমের অতলে ঠেলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, ঘুমটাই এখন তার প্রধান আশ্রয়।
কিন্তু তৌসির থামে না। ধীরে ধীরে, অত্যন্ত সন্তর্পণে সে আবারও নাজহার টিশার্টের ভেতর হাত প্রবেশ করিয়ে দেয়। তার উষ্ণ হাতের ছোঁয়া নাজহার শীতল ত্বকে গিয়ে ঠেকে। তৌসির শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওকে বুকের সঙ্গে, ঘাড়ের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে দেয় গভীরভাবে। নাজহা এবার তৌসিরের হাত খামচে ধরে, তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “হাত সরান বলছি, আজ আমার এসব ভালো লাগছে না।”
তৌসির হাত সরায় না। এবারও না। সে চুপচাপ শুয়ে থাকে, একটুও নড়ে না, কোনো প্রতিবাদ করে না। শুধু চোখ বুজে নাজহার গায়ের চেনা ঘ্রাণটা মন ভরে টেনে নিতে থাকে বুকের গভীরে, এই সুবাসটুকু স্মৃতিতে সঞ্চয় করে রাখতে চায় বহুদিনের জন্য। আর ওর ঘাড়ের নরম চামড়ায় আঁকতে থাকে ছোট ছোট, নিঃশব্দ চুমু। এই মুহূর্তে তার কাছে এই ছোঁয়াটুকুই সবচেয়ে বড় সম্বল, ইন্ডিয়ার সেই অজানা যাত্রা, ফিরে না আসার সম্ভাবনা, সবকিছু সে এই এক মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকতে চায় প্রাণপণে। অন্যদিকে নাজহা নিজেকে কোনোরকমে সামলিয়ে চোখ বুজে নেয়, নিজেকে বোঝায় বারবার। সে জানে ভালো করেই, এখন যদি বিন্দুমাত্র সায় দেয়, একটুও নরম হয়, তাহলে তাকে সারা রাত জেগে থাকতে হবে এই মানুষটার আদরের ভারে। আর এই মুহূর্তে এসব তার একদমই ভালো লাগছে না, তীব্র ঘুমে তার চোখ দুটো জ্বলে যাচ্ছে, শরীর ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে।
রাত তখন গভীর, নিস্তব্ধতার ভারী চাদরে মোড়া গোটা পৃথিবী। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু কয়েকটা মরা তারা দূর থেকে চেয়ে আছে পলকহীন চোখে, মনে হচ্ছে তারাও ভয়ে থমকে গেছে আজকের এই অভিশপ্ত রাতের সাক্ষী হয়ে। ঘন কালো অন্ধকারের বুক চিরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে শেয়ালের বুকচেরা আর্তনাদ, দূরে কোনো এক শুকনো বটগাছের কঙ্কালসার ডালে বসে ডেকে চলেছে অশুভ এক পেঁচা। তার প্রতিটি ডাক কোনো অনাগত মৃত্যুর ঘোষণা শোনাচ্ছে। বাতাসে ভাসছে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে পোড়া লোবান আর কেমন এক আঁশটে, রক্তমাখা ঘ্রাণ। ঠিক এই মুহূর্তেই জনমানবহীন এক জরাজীর্ণ কুটিরের ভেতর শুরু হয়েছে বিবিজানের কালোজাদুর গোপন আসর।
কুটিরের ভেতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, দমবন্ধ করা এক গা ছমছমে পরিবেশ। দেয়ালের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনাধরা জল, আর মেঝের কোণে জমে থাকা কালচে শ্যাওলা নীরবে সাক্ষী হয়ে আছে কত না জানা পাপের। বাঁশের চাটাইয়ের ফাঁক গলে ঢুকে পড়া হিমশীতল বাতাসে দুলে দুলে উঠছে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা শুকনো টিকটিকির লেজ, কাকের নখ, আর কালো কাপড়ে বাঁধা বিশ্রী সব পুঁটুলি। কুটিরের চার কোণে গাঁথা রয়েছে চারটি লোহার পেরেক, প্রতিটির মাথায় বাঁধা একগোছা করে কালো চুল, কার চুল, কবেকার চুল, তা কেউ জানে না। মোমবাতির কম্পমান হলদেটে আলোয় দেয়ালে নাচছে বিভীষিকাময় সব ছায়া, মনে হয় দৃষ্টির আড়ালে থাকা কোনো সত্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে, নিঃশব্দে হেঁটে চলেছে বিবিজানের ঠিক পেছন পেছন।
মেঝের ঠিক মাঝখানে গেরুয়া আর চুন দিয়ে আঁকা এক জটিল বৃত্ত। বৃত্তের ভেতরে সাত কোণা এক তারা, তার প্রতিটি কোণে বসানো মানুষের মাথার খুলি। খুলির চোখের কোটরে জ্বলছে সরষের তেলে ভেজানো একেকটি সলতে, তাদের নীলচে শিখা দেখে মনে হয় তা এই দুনিয়ার আলো নয়। বৃত্তের চারপাশ ঘিরে ছড়িয়ে আছে সিঁদুর, কালো তিল, শুকনো কবরের মাটি এবং মৃতের কাফনের ছিন্নভিন্ন টুকরো। কোথাও কোথাও পড়ে আছে অচেনা লতাপাতা আর গাছের শিকড়, যেগুলো নাকি অমাবস্যার রাতে শ্মশানের ঠিক মাঝখানে গজায়।
বিবিজানের ঠিক সামনে থরে থরে সাজানো পাঁচটি ছাগলের কাটা মাথা। তাদের নিষ্প্রাণ চোখগুলো অপলক তাকিয়ে আছে শূন্যে, ঠোঁটের কোণ বেয়ে চুইয়ে পড়ছে কালচে রক্ত। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দলা দলা রক্তমাখা কাঁচা মাংস, যা সদ্য শেষ হওয়া কোনো নরপিশাচের ভোজসভার জানান দিচ্ছে। পাশেই মাটির এক পুরনো পাত্রে রাখা পচা সাপের বীভৎস তরকারি, যার উৎকট, নাড়ি উল্টে দেওয়া গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে কুটিরের প্রতিটি কণা বাতাস। আরেক পাশে রাখা কাঁসার এক থালায় সাজানো কাটা মুরগির ঠ্যাং, কালো ছাগলের কলিজা এবং একটি কাচের শিশিতে বন্দি কচি শিশুর নাড়ির শুকনো টুকরো। এই নাড়ি বিবিজান বহুকাল আগে কোন এক প্রসূতির কাছ থেকে ছলে বলে হাতিয়ে নিয়েছিলেন।
আর এই পৈশাচিক আয়োজনের ঠিক মাঝখানে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে এক বেওয়ারিশ মানুষের নিথর দেহ। কে সে, কোথা থেকে এলো, কেউ জানে না। জানার প্রয়োজনও নেই। কারণ, আজ এই নিথর দেহই হতে চলেছে বিবিজানের ইফ্রিত চালানের বাহন। লাশটার সারা গায়ে বিবিজান নিজ হাতে এঁকে দিয়েছেন রহস্যময় সব চিহ্ন। এর মধ্যে রয়েছে কোথাও উল্টো করে লেখা আরবি হরফ, কোথাও সাপের কুণ্ডলী পাকানো ছবি, আবার কোথাও এমন সব প্রতীক যা পৃথিবীর কোনো ভাষার অক্ষরের সঙ্গে মেলে না। লাশের কপালে ঠেকানো একটি লোহার ত্রিশূল, বুকের ঠিক মাঝখানে বসানো একটি কালো পাথরের তাবিজ। তাবিজটা মৃদু মৃদু কাঁপছে, দেখলে মনে হবে ভেতরে বন্দি হয়ে আছে কোনো ক্রুদ্ধ, ছটফটে সত্তা।
ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন বিবিজান। পরনে তার গাঢ় লাল রঙের এক ছেঁড়া কাপড়, চুল আলুথালু, কপালে লেপ্টে থাকা তাজা রক্তের ফোঁটা। গলায় ঝুলছে হাড়ের এক মালা, তাতে গাঁথা রয়েছে ঠিক তেরোটা মানুষের দাঁত। হাতে ধরা ধারালো ছুরি মোমের আলোয় ঝিলিক দিয়ে ওঠে তা, ছুরির বাঁটে খোদাই করা এক বিকট জীবের মুখ, যার চোখদুটো এই মুহূর্তে জ্বলজ্বল করছে জীবন্ত অঙ্গারের মতো। মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে নিজ হাতে ছুরি চালান তিনি, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা টাটকা রক্ত মেঝেতে আঁকা জটিল এক বৃত্তে ছিটিয়ে দিয়ে আহ্বান জানান শয়তানকে। মন্ত্রগুলো এমন কোনো ভাষায়, যা কোনো জীবিত মানুষের বোঝার সাধ্য নেই। সেই স্বর গলা দিয়ে বেরোচ্ছে না, বরং উঠে আসছে কোনো অতল কূপের গভীর থেকে।
মুহূর্তের মধ্যেই বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কুটিরের ভেতর আচমকা বইতে শুরু করে হিমশীতল এক ঝোড়ো হাওয়া, নিভু নিভু হয়ে ওঠে মোমবাতির শিখা। খুলির কোটরে জ্বলতে থাকা নীল শিখাগুলো হঠাৎ লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে, তারপর রূপ নেয় রক্তলাল রঙে। কুটিরের কাঠের বেড়া মড়মড় শব্দে কেঁপে ওঠে, ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পুঁটুলিগুলো দুলতে থাকে পাগলের মতো। এক নিরাকার অশুভ শক্তির প্রবল ঝাপটায় সেই মৃতদেহে ভর করে ভয়ংকর শয়তান ইফ্রিত। কাঠের মতো শক্ত হয়ে থাকা লাশটা হঠাৎ ধনুকের মতো বেঁকে ওঠে, চোখ দুটো উল্টে গিয়ে হয়ে যায় রক্তবর্ণ। কালো হয়ে যাওয়া জিভ বেরিয়ে আসে ঠোঁটের ফাঁক গলে, নাক-মুখ দিয়ে বেরোতে থাকে ঘন কালচে ধোঁয়া। বিকটভাবে চিৎকার করে ওঠে সে, “তুই আমাকে কেন ডাকলি? আগে আমার বলি দে, নয়তো এখনই তোর জান কবজ করব!” সেই চিৎকারে কুটিরের মাটির মেঝে পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে ওঠে, দূরে কোথাও একঝাঁক বাদুড় ডানা ঝাপটে উড়ে যায় নিশুতি আকাশের দিকে।
কিন্তু বিবিজানের চোখেমুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র চিহ্নও নেই। নির্লিপ্ত মুখে তিনি ধীরে ধীরে নিজের বিকৃত, গলে যাওয়া চেহারার দিকে ইফ্রিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চামড়া কুঁচকে ঝুলে পড়েছে হাড়ের সঙ্গে, চোখের কোল বসে গেছে গভীর গর্তে। ঠোঁটের কোণে দগদগে ঘা, মাথার তালুতে জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে চুল, বেরিয়ে পড়েছে কালচে খুলি। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠেন তিনি, “আমার চেহারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তুমি কিছু একটা করো, আমাকে আগের রূপ ফিরিয়ে দাও। এর বিনিময়ে তোমার কয়টা লাশ লাগবে, শুধু একবার বলো আমি দেব।”
ইফ্রিতের ফোঁসফোঁস শ্বাস একটু থিতিয়ে আসে। কুফরি বিদ্যায় পারদর্শী বিবিজানের দিকে তীক্ষ্ণ, রক্তবর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে খানিকক্ষণ। মৃতদেহের বুকটা ওঠানামা করে অস্বাভাবিক ছন্দে, দেখলে মনে হয় ভেতরে দুটো হৃদয় একসঙ্গে ধুকপুক করছে। তারপর ঘড়ঘড়ে, কর্কশ গলায় বলে ওঠে, “আমার চারটে বলি চাই চারটে! তাও আবার সব তাজা তরুণী। বুঝলি? এমন তরুণী, যাদের গায়ে এখনো লেগে আছে কুমারীত্বের ঘ্রাণ, যাদের রক্তে এখনো মেশেনি পাপের কালিমা।”
কোনো রকম দ্বিধা, কোনো রকম কম্পন নেই বিবিজানের কণ্ঠে। মাথা নেড়ে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান তিনি, “দেব বলি দেব। শুধু বল, আমাকে এখন কী করতে হবে।”
ইফ্রিত তখন সেই পচা সাপের তরকারির পাত্রটা কাছে টেনে নেয়। মৃতদেহের হাত দুটো নড়ে ওঠে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে, মনে হচ্ছে হাড়গুলো উল্টো দিকে বাঁকছে। না জানা কোনো স্থান থেকে এক মুঠো কিলবিলে পোকা এনে ফুঁ দিয়ে মিশিয়ে দেয় সেই বিভীষিকাময় মিশ্রণে। কালো, রক্তচোষা, লম্বা লম্বা পোকা, কারো গায়ে কাঁটা, কারো লেজে বিষাক্ত হুল। পাত্রের ভেতর সাপের পচা মাংসের সঙ্গে সেগুলো ছটফট করতে থাকে, ছাগলের চর্বির সঙ্গে মিশে তৈরি হয় এক জমাট বাঁধা, ঘন কালচে সবুজ তরল। পোকাগুলো তরকারির ভেতর জীবন্ত অবস্থাতেই মোচড় খেতে থাকে, তাদের গা থেকে বেরোতে থাকা এক ধরনের হলদেটে রস মিশে যায় সেই মিশ্রণে। ইফ্রিত পাত্রটা এগিয়ে দিয়ে গমগমে গলায় নির্দেশ দেয়, “নে, এটা পান কর। এক ফোঁটাও মাটিতে ফেলবি না, নইলে সব বৃথা।”
বিন্দুমাত্র ঘৃণা কিংবা সংকোচ নেই বিবিজানের চোখে। এটি তার কাছে অতি সাধারণ এক পানীয়। দুই হাতে পাত্রটা তুলে নিয়ে গোগ্রাসে গিলে নেন সেই পচা সাপ আর জীবন্ত পোকার বীভৎস মিশ্রণ। ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সেই ঘন সবুজ তরল, চিবুক ছুঁয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়ে গলার হাড়ের মালায়। গলা বেয়ে নেমে যায় পোকাগুলো, কিলবিল করতে করতে হারিয়ে যায় তার ভেতরের অন্ধকারে। বিবিজানের গলার ভেতর থেকে ভেসে আসে অচেনা এক গুরগুর শব্দ, মনে হয় পেটের ভেতর কেউ ফুঁসে উঠছে, নড়েচড়ে জায়গা করে নিচ্ছে।
আর ঠিক তখনই ঘটে সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ড। তার গলে পড়া চামড়া টানটান হতে শুরু করে, ঝুলে পড়া মাংস ফিরে পায় তার আগের গঠন, বসে যাওয়া চোখে ফিরে আসে সেই আগের ধারালো চাহনি। মাথার তালুতে গজিয়ে উঠতে থাকে ঘন কালো কেশ, ঠোঁটের ঘা মিলিয়ে যায় নিমেষে। বুকের চামড়ায় জেগে ওঠে যৌবনের সেই পুরনো টান, হাতের শিরাগুলো আবার ভরে ওঠে গরম রক্তে। মুহূর্তের মধ্যেই বিবিজানের নষ্ট হয়ে যাওয়া চেহারা আবার সতেজ হয়ে ওঠে, আগের রূপের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই সতেজ চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে আরো গাঢ়, আরো ভয়ংকর এক অন্ধকার। চোখের মণির গভীরে জ্বলতে থাকে ইফ্রিতের রক্তবর্ণ আভা।
কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে ইফ্রিতের দিকে ফিরে তাকান তিনি। গলার স্বরে এবার এক ধরনের কর্তৃত্ব, “তিন দিনের ভেতর তুই তোর বলি পেয়ে যাবি। এবার যা, যা এখান থেকে! তবে খেয়াল রাখিস, আমার পরিবার, আমার নাতি-নাতনি সবাই যাতে সুরক্ষিত থাকে। যদি আমার রক্তের কারো গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে, আমি তোকে এমন বন্দি করব যে হাজার বছরেও মুক্তি পাবি না।”
এক দমকা হাওয়া উঠে ইফ্রিত মিলিয়ে যায় শূন্যে। মৃতদেহের বুক থেকে বেরিয়ে আসে ঘন কালো ধোঁয়ার এক কুণ্ডলী, ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় বাইরের অন্ধকারে। লাশটা আবারও পড়ে থাকে নিথর, নিষ্প্রাণ। শুধু বুকের ওপর রাখা কালো তাবিজটা তখনো মৃদু মৃদু ধুকপুক করে প্রমাণ করছে ভেতরে বন্দি সত্তাটা এখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি। চারপাশটা এমন স্তব্ধ হয়ে আসে যে বোঝার উপায় নেই কিছুক্ষণ আগে এখানে কী ঘটে গেছে।
ধীর পায়ে বিবিজান এগিয়ে যান কোণে রাখা পুরনো, ধুলোমাখা এক আয়নার সামনে। সেই আয়নাটাও সাধারণ কোনো আয়না নয়। তেরো বছর আগে এক ভরা অমাবস্যায়, শ্মশানের ঠিক মাঝখানে বসে বিবিজান নিজ হাতে বানিয়েছিলেন এই বস্তু, তার পেছনে লেপে দিয়েছিলেন সাতজন মৃত মানুষের রক্তে ভেজানো পারদ। ফাটল ধরা কাচে নিজের ফিরে পাওয়া রূপ দেখে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক বিশ্রী, পৈশাচিক হাসি। আয়নার ভেতর থেকে তার প্রতিবিম্বও হাসে, কিন্তু সেই প্রতিবিম্বের হাসি বিবিজানের হাসির চেয়ে আধ পলক দেরিতে ফোটে, আধ পলক দেরিতে মেলায়। সেই হাসি ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিকট অট্টহাসিতে, যার প্রতিধ্বনি কুটিরের চার দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে আসতে থাকে বারবার। কুটিরের বাইরে বসে থাকা পেঁচাটাও চুপ করে যায়, শেয়ালের ডাক থেমে যায় নিমেষে, মনে হচ্ছে গোটা জঙ্গল ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে এক হাসির শব্দে।
হাসি থামতেই কিছুটা স্থির হন তিনি। চোখ বন্ধ করে গম্ভীর কণ্ঠে ডাক পাঠান আরেক জিনকে, ‘উম্মুসিবুন’। মেঝেতে আঁকা বৃত্তের কেন্দ্রে রাখা এক মুঠো কালো ছাই তুলে নিয়ে ফুঁ দেন বাতাসে, সেই ছাই বাতাসে মিলিয়ে যেতেই কুটিরের এক কোণে ঘন কুয়াশার মতো ধোঁয়া জমতে থাকে। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে আসে হালকা এক আতরের ঘ্রাণ, কিন্তু সেই ঘ্রাণের নিচে চাপা পড়ে থাকে পোড়া মাংসের বিশ্রী গন্ধ। ধোঁয়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই জিনের অস্পষ্ট অবয়ব। লম্বা, ছিপছিপে, মুখ ঢাকা কালো ঘোমটায়, চোখদুটো শুধু জ্বলছে দুটো সবুজ আগুনের ভাটার মতো। বিবিজান আদেশ দেন ঠান্ডা, নির্মম কণ্ঠে, “যাও, এখনই গিয়ে চারজন তরুণীকে ধোঁকা দিয়ে আমার কুটিরের দিকে নিয়ে এসো। এমন রূপ ধর, যাতে ওরা তোমাকে দেখলেই মুগ্ধ হয়ে পিছু নেয়। কেউ যাতে সন্দেহ করার সুযোগ পর্যন্ত না পায়।” জিনটি কোনো প্রশ্ন করে না, উত্তরও দেয় না। শুধু মাথা নত করে সম্মতি জানিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায় নিমেষেই।
বিবিজান আসলে সাধারণ কোনো ডাইনি নন। তিনি এক ভয়ংকর কুফুর, যার নাম শুনলে অন্ধকার জগতের বড় বড় সাধকও কেঁপে ওঠে। তিনি শুধু একটি-দুটি নয়, সাত-আটটি ভিন্ন প্রজাতির জিন পুষে রেখেছেন তিনি নিজের বশে। কেউ থাকে বাতাসে, কেউ পানিতে, আবার অন্য কোনোটি লুকিয়ে থাকে মাটির অতল গহ্বরে। কোনো জিন ভর করে পুরনো বটগাছের কোটরে, কোনোটি নদীর ঘোলা জলের নিচে, আবার কিছু জিন কুটিরের চালার ফাঁকফোকরে বসে চুপচাপ পাহারা দেয় বিবিজানকে। নিয়মিত বলি দিয়ে, তাজা রক্তে এদের তুষ্ট রেখে বিবিজান হাসিল করেন তার সমস্ত হীন স্বার্থ। আর বলির উষ্ণ রক্ত পান করে করে দিন দিন আরও ভয়ংকর, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে তার পোষা এই অশুভ জিনের দল।
তার কালোজাদুর ভাণ্ডারে জমা আছে এমন সব ভয়ংকর বিদ্যা, যা শুনলে যেকোনো সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। কারো ওপর বাণ মারা, কারো ঘরে সিঁদুর মাখা পুতুল পুঁতে রাখা, কারো বিছানায় গোপনে ছড়িয়ে দেওয়া কবরের মাটি, কারো খাবারে মিশিয়ে দেওয়া মৃত মানুষের নখের গুঁড়ো, এসব তার কাছে হাতের মোয়া। কেউ যদি তার পথের কাঁটা হয়, বিবিজান নিমেষেই তার নাম লিখে ফেলেন কালো কাগজে, সেই কাগজ পুঁতে দেন কোনো নবজাতকের কবরে, ব্যস, সাত দিনের ভেতর সেই মানুষটি ধুঁকতে ধুঁকতে চলে যায় না-ফেরার দেশে। কেউ যদি তাকে ভালোবাসতে না চায়, তিনি বশীকরণ করে তাকে টেনে আনেন নিজের পায়ের কাছে। কেউ যদি তার সম্পত্তির দিকে চোখ তুলে তাকায়, তার চোখ দুটোই অন্ধ করে দেন এক রাতের ভেতর।
কিন্তু এই সবকিছুর পেছনেও লুকিয়ে আছে তার এক সুদূরপ্রসারী, ভয়াবহ পরিকল্পনা। জিন পালার এই অন্ধকার সাম্রাজ্য, এই রক্তমাখা উত্তরাধিকার একদিন তিনি তুলে দেবেন একজনের হাতে। সেই একজন হলো তৌসির।
সকাল ঠিক সাতটা। দিনের ব্যস্ততা এখনো সেভাবে জমেনি। কিন্তু তৌসিরের চারদিকে সেই শান্তির লেশমাত্র ছিটেফোঁটা নেই, এখানে রীতিমতো জটলা জমে উঠেছে।রুদ্র, নুহমান আর কেরামত , এই ত্রিমূর্তি তৌসিরকে মাঝখানে ঘিরে ধরেছে। একজন তার হাত চেপে ধরে আছে, আরেকজন কাঁধে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়েছে, তৃতীয়জন সামনে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। সবার মুখে একই আবদার, একই সুর। কাকুতি-মিনতি করে তারা বারবার বলছে, “ভাই, একটা বার করতে দেও আকামটা! শুধু একটা বার দেখি ভাবির রিয়েকশনটা কী হয়!”
গত কয়েকদিন ধরেই এরা তৌসিরের পেছনে আঠার মতো লেগে আছে একটা অকল্পনীয় নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য। যেখানে সেখানে ওরা পড়ে আছে, ছাড়ার কোনো নাম নেই। ওদের মাস্টারপ্ল্যান হলো, কাউকে একজন বউ সাজিয়ে তৌসিরের সাথে বাড়িতে ঢোকানো হবে। আর তৌসির বাড়িতে গিয়ে সবাইকে বলবে যে, নাজহা তাকে একদমই পাত্তা দেয় না, তাই বাধ্য হয়ে সে দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলেছে! প্ল্যানটা শুনে প্রথমদিনই তৌসিরের চোখ কপালে উঠেছিল। তৌসির এসব পাগলামির ধারেকাছেও যেতে রাজি নয়। সে খুব ভালো করেই জানে, এই নাটক করলে নাজহা বাকি জীবন তাকে এই নিয়ে খোঁটা দেবে। এমনিতেই নাজহার চোখে তার দোষের কোনো অভাব নেই, ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত তার সবকিছুতেই ধুত্তরো পাওয়া যায়। তার ওপর নতুন করে এই খাল কেটে কুমির সে কোন দুঃখে আনতে যাবে? তৌসির ওদের কথায় কান না দিয়ে সাফ জানিয়ে দেয়, “সর বাইনচু* দরা! শালা তোরা বুঝতে পারতেছিস না, এই আকাম করলে আমার সংসারে ভিরাট আগুন লাগব!”
কিন্তু নাযেমও তাদের সাথে সেও পিছপা হওয়ার পাত্র নয়। আগুনের কথা শুনে সে আরও উৎসাহ পেয়ে। সে দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে উসকে দেওয়ার সুরে বলে, “আরে, আগুন তো লেগেই আছে! আরেকটু না হয় লাগা। শুধু বউমার রিয়েকশনটা দেখি, সে কী করে!”
এই কথা শুনে রুদ্র আর নুহমান উচ্ছ্বাসে তালি দিয়ে ওঠে, মনে হলো কোনো মহান সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তৌসিরের মাথায় হাত। ওদের এই ভয়ংকর জোরাজুরির কাছে শেষমেশ হার মানতেই হলো তৌসিরকে। এরা যে সহজে তাকে ছাড়বে না, সেটা সে বেশ বুঝতে পারছিল। পিয়ালি হাজার বার না করেও লাভ হবে না। অগত্যা শুরু হলো নাটকের প্রস্তুতি।প্রথমেই দরকার ছিল একজন উপযুক্ত বউ। মেয়েদের মতো হাইট আর বডি স্ট্রাকচার দেখে তাদেরই দলে কাজ করা একটা ছেলেকে ধরে আনা হলো। ছেলেটা প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী হতে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে পালানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রুদ্র আর নুহমান দুই পাশ থেকে ধরে ফেলেছে।
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৬
তারপর তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া একটা কালো বোরকা পরিয়ে, মুখে নেকাব লাগিয়ে বউ সাজানোর কাজ শুরু হয়ে গেল। বোরকার ভেতর থেকে শুধু দুটো চোখ বেরিয়ে আছে, আর সেই চোখদুটোয় পুরো কয়েকজোড়া প্রশ্ন। চোখের সামনে জলজ্যান্ত একটা ছেলেকে এমন কিম্ভূতকিমাকার নতুন বউ সাজতে দেখে তৌসির আর চুপ থাকতে পারল না। মহা বিরক্তিতে ওদের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, “মাদারচ* রা রে! তোদের মাথায় এসব আজব বুদ্ধি আসে কেম্নে?”
