Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭ (২)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭ (২)
লিজা মনি

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কেটে যাচ্ছে অনেক গুলো দিন। সবাই সবার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এনি বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে নিজের বাবা – মায়ের কবর জিয়ারত করে আসে। ইরানের ঝমকালো আয়োজন শেষ করে তারা পুনরায় আমেরিকায় ব্যাক করে। নাজলীর শরীর আগের থেকে কিছুটা নাজুক হয়ে পড়ে। ডেলিভারির আর মাত্র এক মাস সময় আছে। চিন্তায় আরিশ একদম পাগল – প্রায় হয়ে আছে। এক আবহাওয়া থেকে অন্য আবহাওয়ার মধ্যে যাতায়াত করাতে বাচ্চাদের ঠান্ডা লেগে যায়। টানা ছয়দিন জ্বরে পার করে ছোট্ট শরীর দুইটা। এই ছয়দিন যেন গ্যাংস্টার বস উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলো। সামান্য জ্বরে হসপিটালের সব ডাক্তার একত্রিত করে ফেলে। নিকের পাগলামো দেখে ডাক্তার তারা শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, চিকিৎসা করাবে আর কখন! এনি ভেতরে ভয়ে থাকলেও নিকের পাগলামো দেখে শেষ দিকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলো। বাচ্চা মানুষ, সামান্য জ্বর – ঠান্ডা লাগবে স্বাভাবিক। তার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া চাইতে হয়। এমন পাগলামো করলে কি অসুস্থতা কমে যাবে? নিকের মানসিক দিক ভেবে আবার নিজেকে সংযম করে রাখে। নিস্ব: এক ব্যক্তি সবাইকে হারিয়ে এদেরকে ধরেই বেঁচে আছে। সামান্য কিছু হলে এমন উন্মাদ হওয়াটা অন্যদের কাছে অতিরিক্ত মনে হলেও এনির কাছে পরিস্কার।

রাতের অন্ধকারে ধীর গতিতে শাঁ – শাঁ করে গাড়ি চলছে। ড্রাইভিং সিটে বসে গ্যাংস্টার বস এক হাতে গাড়ি চালাচ্ছে অন্য হাতে মেয়েকে সামলাচ্ছে । এরিক মায়ের কোলে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এনিও সিটে হেলান দিয়ে ছেলেকে ঝাপ্টে ধরে ঘুমে বুদ হয়ে আছে। স্ত্রী – ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে ভ্রুঁ নাচায়। নীর বার – বার হাত নাড়াচ্ছে গাড়ির স্ট্রিয়ারিং ধরার জন্য। নিক আটকে দিচ্ছে প্রতিবার। এইটা মোটেও সহ্য হচ্ছে না আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট কন্যার। প্রথম দুই – একটা শব্দ করলেও শেষ বার ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে। মেয়ের কান্না শুনে এনি ঘুমের মধ্যে ধরফরিয়ে উঠে। নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে গাড়িটা একটা পাশে দাড় করায়। নীর রাগে হাত – পা ছুঁড়ে যাচ্ছে। এনি ঘুম – ঘুম চোখে তাকিয়ে বলে,

” কাঁদছে কেনো?
নিক মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে উত্তর দেয়,
” তোমার মেয়ে গাড়ি চালাবে। আমি চালাতে দিচ্ছি না তাই?
” কিহহহ!
এনি কপাল কুচকে তাকায় নীরের লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে। ধূসর চোখ দুইটার মধ্যে পানি টুইটুম্বুর। নিক বুকের সাথে মিশিয়ে নিচ্ছে কিন্তু সে রেগে ছটফট করছে সরে আসার জন্য। নিক টিস্যু পেপার বের করে মেয়ের চোখের পানি মুছে চুলগুলো গুলো ঠিক করে দিয়ে বলে,
” হোয়াই আর ইউ ক্রাইং, মাই প্রিন্সেস?
নীর ক্লান্ত হয়ে পাপার কোলের মধ্যে মাথা রেখে ফুঁপাচ্ছে। আর নিক অধৈর্য হয়ে এইটা – সেটা বলে যাচ্ছে। এনি গালে হাত দিয়ে একইভাবে তাকিয়ে আছে বাপ- মেয়ের দিকে। এনিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিক ভ্রুঁ নাচায়,

” তাকিয়ে আছো কেনো?
” দেখছিলাম।
” হুয়াট?
” দেখছিলাম এক মনস্টার কতটা পালটে গিয়েছে সন্তান স্পর্শে। এত ভালোবাসা দেওয়ার কারন?
” তারা আমার পৃথিবী।
” উহম …. আই.. ইউউ… !
আবার ও কেঁদে উঠে সামান্য। নীরের কান্না দেখে নিক বেপোরোয়া হয়ে পড়ে। কোনো কিছু না ভেবে মেয়েকে স্টিয়ারিং এর উপরে বসিয়ে দেয়। মুহূর্তেই গ্যাংস্টার বস কন্যার চোখ খুশিতে চিকচিক করে উঠে। ঠোঁটের কোনো হাসি ফুটে উঠতে দেখে নিক হতভম্ভ হয়ে যায়। তবে গম্ভীর মুখে এই হতভম্ভ ভাবটা প্রকাশিত হয় না। এনি নিজের হাসিটা চেপে রাখতে না পেরে হেসে ফেলে শব্দ করে। নিক ভ্রুঁ কুচকায়,
” হাসছো কেনো?
এনি ছেলেকে ঠিকভাবে নিয়ে বলে,

” দেখছিলাম, সারাজীবন সবাই নাকে – চুবানি খাওয়ানো গ্যাংস্টার বসকে কিভাবে তার কন্যা নাকে – চুবানো খাওয়াচ্ছে। কে যেন বলত আমি আমার মর্জি মাফিক চলি। কারোর কথার ধারধারি না।
কথাটা বলে এনি মুখ চেপে হাসে। নিক বাঁকা হেসে ঝুঁকে পড়ে প্রেয়সীর দিকে। ভরকে যায় রমণী। নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে ছোট্ট করে বলে,
” মেয়ের জেদে একজন বাবা হেরেছে, গ্যাংস্টার বস নয়।
এনি শীতল চোখে তাকিয়ে থাকে। ভেতর থেকে চলে আসে প্রশান্তির এক দীর্ঘ – শ্বাস। শাড়ি পড়ে থাকতে ভীষণ ভোগান্তি হচ্ছে। জীবনের ফার্স্ট টাইম আজ শাড়ি পড়েছে। নিক কোথা থেকে এসে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বললো সন্ধ্যায় রেডি হয়ে থাকতে। এনি অবাক হয়ে ব্যাগ খুলে দেখে একটা শাড়ী। ইন্ডিয়াতে সে অনেকবার দেখেছে এই পোশাক। কিন্তু কিভাবে পড়বে তার বুঝে আসছে না। গুগল দেখে বহুবার চেষ্টার ফল হিসেবে অনেক কষ্টে কোনোরকম পড়েছে। চোখে কাজল পড়া তার জন্য নিষদ্ধ। তাই নিকের ভয়ে কাজল টুকুও পড়ে নি। আজকাল চুল খোলা রেখে চলা তার জন্য যুদ্ধের সমান। বাচ্চারা চুল ধরে টানাটানি শুরু করে দেয়। সোনালি লম্বা চুলগুলো খোঁপা করে রেখেছে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক! এক ভুবনমোহিনী সুন্দরীর জন্য এই সাজটা যথেষ্ট নয় কি?
আকস্মিক এনির মন বিষন্ন হয়ে পড়ে। এত কষ্ট করে শাড়ি পড়লো অথচ লোকটা ঠিকভাবে তাকালো না পর্যন্ত! সামান্য একটু প্রশংসা তো ডিজার্ব করি। নিক আবার ও মেয়েকে সামলে ড্রাইভিং-এ মনযোগ দেয়। নিকের নির্লিপ্ততা এনিকে ভেতর থেকে পুড়াচ্ছে। আহত গলায় বলে,

” আমি কি কোনো ভুল করেছি?
” এমন কেনো মনে হলো?
” আপনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন না! একবারের জন্যও ঠিকভাবে তাকিয়ে দেখেন নি।
আকস্মিক আবার ও গাড়ির ব্রেক কষে গ্যাংস্টার বস। ডান ভ্রুঁ কুচকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এনির দিকে। এনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।
” তাকাও ব্লাডরোজ।
এনি ত্যারামি করে অন্য পাশে তাকিয়ে আছে। পাশ দিয়ে অনেক গাড়ি ছুঁটে চলছে একাধারে। জানালার দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাহিরে অনেক সুন্দর – সুন্দর ছেলে আছে। ওদের দেখলে আমার লাভ আছে। তাকাতে…..
এনির কথা থেমে যায়। ঘাড়ে চাপ অনুভব করে ছটফটিয়ে উঠে। নিক আকস্মিক ঘাড়টা চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। নিকের চোখে – মুখ দেখে এনি শুকনো ঢোক গিলে। নিক চোয়াল শক্ত করে বলে,

” বান্দির বাচ্চা, কলিজা টেনে নিয়ে আসব। আমাকে রেখে কোন পুরুষের দিকে তাকাচ্ছিস তুই? সেই চোখ উগ্রে ফেলে দিব। যে চোখ আমাকে রেখে অন্য পুরুষের দিকে যায় সেই চোখ ও থাকার প্রয়োজন নেই।
নিকের শক্ত হাতের বাঁধনে এনি ব্যাথা পাচ্ছে প্রচুর। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
” জেলাসি? হুহহ!
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে এনি বুঝার আগেই শক্ত করে কামড় বসিয়ে দেয় ঠোঁটে। এমন আক্রমনে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে।
” তোমার ভাবনার থেকেও বেশি। তোমার ক্ষেত্রে আমি পৃথিবীর সব থেকে হিংসুটে ব্যাক্তি বেবিগার্ল!
এনির আর্তনাদে এরিকের ঘুম ভেঙে যায়। ছেলের কন্ঠস্বর শুনে এনিকে ছেড়ে দেয়। এনি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ঘাড়টা আরেকটু হলে মচকে যেত। ঠোঁটে হাত দিয়ে দেখলো রক্ত আসে নি। তবে ফুলে উঠেছে কিছুটা।
” আপনি অতিরিক্ত পাষাণ নিক । আরেকটু হলে ব্লাড বের হয়ে যেত।
নিক আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো আসলেই অনেকটা ফুলে উঠেছে। তবে কোনো বাক্য ব্যয় করলো না৷ এই ধ্বংসকারীর দিকে পুনরায় তাকানোর ক্ষমতা নেই তার। নিকের চুপ থাকাতে এনি কিছুটা ক্ষেঁপে যায়। যে প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিলো না সেটা করে বসে,

” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
‘ আমি যেখানে যাচ্ছি।
” আমি জাহান্নামে যাব না।
নিক গম্ভীর হাসলো,
” আমার গন্তব্যই তোমার গন্তব্য।
” জাহান্নামে যখন নিয়ে যাচ্ছেন তখন এইভাবে সাজিয়ে নেওয়ার কি মানে?
” দেখব বলে।
এনি খানিকটা লজ্জা পেয়ে ঠোঁট ভেজায়।
মুহূর্তে মুখ ভেংচি কেটে বলে,
” কত যে দেখছেন সেটা দেখতেই পারছি।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে গভীর গলায় বলে,
” ব্যাক সিটে যাওয়ার এত তাড়া!
এনি ভরকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” মানে?
নিক পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। কেঁপে উঠে রমণী এই গভীর চাহনিতে। নিক বাঁকা হেসে বলে,
” খুব সিম্পল! এই মুহূর্তে তাকালে নিজের কন্ট্রোলের বাহিরে চলে যাব। গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব না বেবিগার্ল। কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললে তখন বাচ্চাদের সামলাবে কে?
এনি সাথে – সাথে লজ্জায় চোখ সরিয়ে ফেলে। পাতলা শাড়িটা দিয়েই ভালোভাবে শরীর ঢাকার চেষ্টা করে।
” নাভির নিচের তিলটা দেখা যাচ্ছে। বক্ষভাঁজ…….
” চুউউউউউপ করুন, নির্লজ্জ লোক!

অতীতের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি ভেসে উঠতেই স্থির হয়ে গেল এনির চারপাশ। তার চোখের সামনে আজ দাঁড়িয়ে আছে ‘ব্লেক ভাইপার মেনশন’—যেখানে একসময় তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, সইতে হয়েছিল অগুনতি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।
​বাড়িটির বিশাল, পাষাণ সদরের দিকে তাকাতেই আচমকা দুই কদম পিছিয়ে যায় সে । ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, ফেলে আসা সেই অন্ধকার অতীত কেমন অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে তাকে। রুদ্ধ করে দিচ্ছে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। এনি চায় সব কিছু ভুলে যেতে। প্রতিটা নির্মম আঘাত, প্রতিটা নির্মম অত্যাচারের চিহ্ন সে মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। নিজেকে সামলাতে চোখ-মুখ শক্ত করে চেপে ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।

​বোকা রমণী বুঝতেই পারলো না তার ছটফটানি কেউ গভীরভাবে দেখছে। নিক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল এনিকে। গ্যাংস্টার বসের সেই বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ চোখকে ফাঁকি দেওয়া কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। ঠোঁট কামড়ালো গ্যাংস্টার বস।
​মেনশনের প্রবেশদ্বারের সামনে পৌঁছাতেই অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অধিরাজ চটজলদি ভারী দরজাটা খুলে দেয়। নিকের কোলে সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে এরিক।এনির কাঁধে মাথা নুইয়ে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে ছোট্ট নীর। নিক বড়- বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। প্রথমবারের মত শাড়ি পড়েছে। ছেলে, শাড়ি সামলে ঠিকভাবে হাটতে পারছে না মেয়েটা। তার উপর ভেতরটা আতঙ্কে কাঁপছে। অতীতের প্রতিটা বিষাক্ত অধ্যায় এক – এক করে মনের ভেতরে হানা দিচ্ছে। বড়- বড় শ্বাস টেনে ঠোঁট ভেজায়। সব ভুলে যাবে সে, সব!
নিক অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। নিকের প্রতি অভিমান হলো অনেক। সে হাটতে পারছে না আর লোকটা একটু তাকালোও না। এক হাতে শাড়ির কুচি ধরে অন্য হাতে এরিককে সামলে নিয়ে বড়-বড় পা ফেলে এগিয়ে যায়। হিল পড়ার কারনে আর ও বেশি মসিবতে পড়েছে। এনি ভাঙ্গা গলায় উচ্চ স্বরে ডেকে বলে,

” এইভাবে একা ফেলে চলে গেলেন!
নিক ঘাড় ঘুরিয়ে স্বভাব সুলভ ভ্রুঁ কুচকায়। এনির হাটার স্টাইল দেখে আবার ফিরে আসে তার কাছে। অধিরাজকে ইশারা দিয়ে বলে,
” এরিককে কোলে নে।
অধিরাজ তাই করলো। নীর অধিরাজকে দেখলে ভয় পায় প্রচুর। কোলে গেলেই গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠে। এতে অধিরাজ প্রচুর অসহায় হয়ে পড়ে। নিক মেয়েকে এনির কোলে দিয়ে আচমকা মা – মেয়ে সহ পাঁজা কোলে তুলে নেয়। এনি ঘাবড়ে যায় প্রচুর। মিহি সুরে বলে,
” কি করছেন কি এরিকের পাপা, নামান আমাকে। সবাই দেখছে।
” দেখুক, নিজের বউ -বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়েছি অন্যের বউ-বাচ্চাকে নয়।
এনি এইভাবেই মুখ লুকিয়ে রাখে স্বামির বুকে। নীর ড্যাব-ড্যাব করে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।
রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই এনি ভয়ে শিউরে উঠে। পুরো রুম বিদঘুটে অন্ধকার। শুধু অনুভব করছে তাকে একটা নরম আসনে বসিয়ে দিয়েছে। নিক সরে যেতে চাইলে এনি খামছে ধরে তার ব্লেজার।

” ক.. কোথায় যাচ্ছেন আমাদের রেখে? যাবেন না। চারদিকে অন্ধকার, কেমন ভয় করছে।
নিকের ফিসফিসানি স্বর ‘ ওয়েলকাম ব্যাক টু দ্য ডার্ক সাইড ফর দ্য সেকেন্ড টাইম, বেইবি।
এনির শরীর শিরশির করে উঠে,
” আ.. আপনার কন্ঠস্বর এমন শুনাচ্ছেন কেনো? আমি এখানে আসতে চাই না । আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন প্লিজ।
নিক শব্দ করে হাসলো। জ্বলে উঠলো লাইট। আলোকিত হয়ে পড়লো চারপাশ। এনির পছন্দের রং নীল, নিকের পছন্দের রং লাল- কালোতে সজানো হলো পুরো দেয়াল। এনির খুব করে মনে আছে পুরো দেয়াল কালো ছিলো। দেয়ালে ছিলো ভয়ানক কিছু প্রতিচ্ছবি, যা অন্ধকারে শিকারীর মত জ্বলজ্বল করত। আজ যেন পুরো রুম অপরিচিত লাগছে। দেয়াল জুড়ে কোনো ভয়ানক প্রতিচ্ছবি নেই। আছে শুধু তাদের ভালোবাসার স্মৃতি। বাচ্চাদের ছবি, প্রেগনেন্সি টাইমের আট মাসের উঁচু পেট নিয়ে রাগী ভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকা ছবি , নিক- এনির অসংখ্য ছবি।
এনি স্তব্দ হয়ে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে ডান পাশের দেয়ালে তাকায়। কয়েকবছর আগের ছবি দেখে মুহূর্তে থমকে যায়। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক হাস্যজ্জ্বল ছবি। এনি আলতো হাতে ছুঁয়ে পর – পর তাকায় নিকের দিকে। শুকনো ঢোক গিলে বলে,

” এ.. এই ছবি কোথায় পেয়েছেন? অনেক বছর আগের আমি আপনার কাছে কিভাবে পৌঁছালাম? আজ অন্তত রহস্য রাখবেন না। দয়া করুন!
নিক শিনা টান- টান করে দাঁড়ায়। গম্ভীর আওয়াজ তুলে বলে,
” হোয়াই ডু ইউ কিপ ফরগেটিং এগেইন অ্যান্ড এগেইন, বেবি গার্ল? রহস্য কিছুই রাখিনি। বরং তুমি আমার কথা ধরতে পারো না। আমি আগেও বলেছি তোমার – আমার প্রথম সাক্ষ্যাৎ সমুদ্রের পাড়ে হয়েছে। চারপাশে ঢেউয়ের উত্তাল গর্জন আর পাশে ছিলে তুমি। ঠিক সেদিন থমকে গিয়েছিলাম তোমার হাসিতে। বেপোরোয়া করে তুলেছিলে এক আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্টকে।
এনি আবার ও তাকায় ছবিটার দিকে। নিকের চোখে-চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করে,
” আমি দেখেছিলাম আপনাকে?
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির চুলগুলো কানের নিচে গুঁজে দেয়,

” ইউ ডোন্ট গেট টু সি দ্য গ্যাংস্টার বস দ্যাট ইজিলি, বেবি গার্ল। আমি কাউকে ধরা না দিলে সে আমাকে কখনোই খুঁজে পাবে না। আমি সমুদ্রের পাড়ে গিয়েছিলাম ছদ্মবেশে শত্রুকে ধরার জন্য। ভুলে দেখলেও চেনার উপাই নেই।
এনির মস্তিষ্ক শূণ্য পড়ে,
” ওই কাটা মাথা আর কলিজা তাহলে আপনি পাঠাতেন? আজ লাস্ট বার বলুন?
” ইয়েস ওয়াইফি।
” নিরপরাধ মানুষ গুলোকে মেরেছেন।
নিকের চোখ-মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায়। এনির ধনুকের মত বাঁকানো কোমড়টা চেপে ধরে বলে,
” ওরা তোমার দিকে বিশ্রিভাবে তাকাত। অ্যান্ড দ্যাটস বিয়ন্ড মাই টলারেন্স।

এনি মৃদু হেসে প্রতিটা ছবির দিকে পুনরায় তাকায়। এখানে তিন – চার বছরের অসংখ্য স্মৃতি আছে। নিভ্রিতার হাস্যজ্জল মুখটা দেখে কেঁদে উঠে। হৃদয়টা যেন টেনে – হিঁচড়ে নিয়ে আসছে কেউ। নিকের শান্ত ইশারায় এনির কান্না থেমে যায়। নিজেকে সামলে নেয় মুহূর্তেই। ফোর্স করে প্রথম বিয়ের ছবি, দ্বিতীয় বিয়ের ছবি, ঘোড়া নিয়ে মরুভূমিতে চড়ার ছবি, নিকের কোলে বাচ্চাদের ছবি, এনির কিছু সিঙ্গেল ছবি। যেন দেয়াল নয় কোনো এক জ্যান্ত আ্যলবাম। এনি মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠে। নিক এক টানে খুলে দেয় খোঁপা করা চুলগুলো। সেখানে নাক ডুবিয়ে ক্লান্ত গলায় বলে,
” সারপ্রাইজ কিভাবে দিতে হয় আমি জানি না। আমার থেকে একটা সংসার চেয়েছিলে তুমি। আমাদের ছোট্ট একটা সংসার আছে এই রুমে। এইটা কি সারপ্রাইজের মধ্যে পড়ে? খুশি হয়েছো তুমি?
এনির চোখে পানি টুইটুম্বুর। শীতল গলায় বলে,

” আমার লাইফের বেস্ট সারপ্রাইজ গিফট এইটা। আমার খুশির অনুভুতিগুলো আপনাকে দেখাতে পারছি না। একবার অনুভব করে নিন, একবার শুধু। আমি কি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাগ্যবতী?
” ভাগ্যবতী কাদের বলে?
নিক ভ্রুঁ কুচকে প্রশ্ন করলো। এনি নিকের গলায় কামড় বসিয়ে বলে,
” আমাকে বলে।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে এনির দিকে ঝুঁকে বলে,
” আই সি, তুমি ভাগ্যবতী? এখনও স্বামীকে সামলাতো পারো না। জ্ঞান হারিয়ে ফেলো। আগে সামলাতে শিখো এরপর ভগ্যবতী তকমা লাগিও বেবিগার্ল।
নিকের লাগামহীন কথায় এনি কটমট চোখে তাকায়। নিক পুনরায় একটা ডিভানে বসে পড়ে। হাত দিয়ে ইশারা করা এনিকে বসার জন্য। এনি নিকের মুখোমুখি হয়ে বসে। হুট করে নিকের চেহারা চেইঞ্জ হয়ে যায়। সেই আগের ভয়ংকর ভাব চলে আসে। যেটাকে এনি প্রচুর ভয় পায়। নিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে এনির দিকে। আকস্মিক নিকের পরিবর্তনে এনি শিউরে উঠে। নিজেকে ঠিক করে বলে,

” ক.. কি দেখছেন?
” তাকাও আমার দিকে।
এনি চট করে তাকায় এনির গম্ভীর আদেশে। নিক গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চোখে – চোখ রাখে,
” মানিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ করছো আমার সাথে বেবিগার্ল?
এনি থমকে যায়। তিরতির করে কেঁপে উঠে তার সর্বাঙ্গ। শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” ভালোবাসি আপনাকে।

” কিন্তু ক্ষমা করো নি! এই চোখে আজও আগ্নেয়গিরি ভেসে উঠে। অতীত মুছার যুদ্ধ করছো নিজের সাথে প্রতিনিয়ত। আমার শান্ত ব্যবহার দেখে ট্রমাতে চলে যাচ্ছো। ভাবছো আমার মত এমন সাইকোপ্যাথ কিভাবে এত দ্রুত ঠিক হয়ে গেলো? যে সামান্য রুম থেকে বের হতে দিত না সে কেনো আচমকা পুরো পৃথিবী ঘুরাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলো? সামান্য জিনিসে যে হিংসায় জ্বলে – পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যেত সে কিভাবে তোমাকে এতটা যত্নে আগলে রেখেছে! এই মেনশনে এসে তোমার প্রতিটা অতীত মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আমার করা অত্যাচার গুলো.. প্রশ্ন করবে না দুই বছর আগে থেকেই তোমাকে চেনার পরও কেনো এত দুর্ব্যবহার করেছি? কেনো এত বার রক্তাক্ত করেছি? প্রশ্ন করবে না? প্রশ্ন করো আমাকে এই মুহূর্তে এন্ড ইউল ডু ইট ভেরি কুইকলি।
এনি শক্ত করে চেপে ধরে ডিভানের অংশ। গলা ভিজিয়ে আওড়ায়,

” এমন করছেন কেনো?
” প্রশ্ন করো বেবিগার্ল। এই জনমে নিক জেভরান কাউকে কৈফিয়ত দেয় না। তোমাকে দিব…
নিকের কথাগুলো খুব শান্ত। নিরব পরিবেশে এনির গা ছমছম করছে। ঢোক গিলে বলে,
” ভুলে গিয়েছি সব অতীত। আমি বর্তমান নিয়ে বাঁচতে চাই নিক। কেনো সেই পৃষ্ঠাগুলো খুলতে চাইছেন?
নিক দাঁড়িয়ে যায়। এনির থুতনিতে ধরে বলে,
” তাহলে কেনো আজ এখানে আসার পর তোমার মনে আতঙ্ক বিরাজ করছিলো? কেনো আমি থাকার পরও তুমি ভয় পাচ্ছিলে? অতীত যদি ভুলে গিয়ে থাকো তবে ভয়ে কাঁপছিলে কেনো মেনশনে পা রাখার পর?
এনি অসহায় চোখে তাকায় নিকের লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে। কন্ঠ কেঁপে উঠে তার,
” এত আয়োজন করে কেনো পুড়াচ্ছেন আমাকে? কষ্ট হচ্ছে আমার।
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। কপাল ঘেঁষে বলে,

” কষ্ট হচ্ছে তোমার? যখন অনুভব করি আমাকে তুমি ভয় পাও তখন ঠিক কতটা কষ্ট হয় অনুভব করো ব্লাডরোজ। আমি তোমাকে ভালোবাসি না। ইভেন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বলব এইসব ফাঁকিং ভালোবাসা আমার চাই না। কিন্তু তকে ছাড়া আমার ঠিক চলে না।
থামে গ্যাংস্টার বস। ব্লেজার খুলে রাখে একপাশে। শার্টের বোতাম খুলতে না পেরে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে। উন্মুক্ত বুকে এনির হাতটা শক্ত ভাবে চেপে ধরে বলে,

” এখানে একটা হার্ট আছে বেবিগার্ল। যেটা প্রতিমুহূর্তে তোমার জন্য কম্পিত হয়। অত্যাচার করেছি প্রচুর তোমাকে। চাবুক দিয়ে মেরেছি, জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে হাটতে বলেছি, খুনের বিকৃত দৃশ্য দেখিয়ে মানসিক যন্ত্রনা দিয়েছি, জীবন্ত মাটিতে পুঁতে রেখেছি বহু আঘাত করেছি। আমি আঘাত করেছি তাই ভয় পাও আজও আমাকে। কিন্তু কেনো আঘাত করেছি সেটা জানবে না? আমার অতীত তুমি জানো। আমার জন্মদাত্রীকে খুন করেছি সেই কাহিনী ও জানো। মনস্টার হয়ে উঠার গল্পও তুমি জানো। কিন্তু এইটা কি জানো, তোমাকে পাওয়ার পর দুনিয়া ভুলে গিয়েছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম নিজেকে। যখন তুমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে তখন নিজের মধ্যে থাকতাম না, মরার কথা বললে ভেতরের পিশাচটা জেগে উঠত। তোমাকে আঘাত করলে তিন গুণ ব্যাথা আমার শরীরে লাগত কিন্তু পৈশাচিক আনন্দ পেতাম খুব। প্রধান কারন ছিলো তোমার চোখে আমার জন্য আকাশ সমান ঘৃণা। একটা জানোয়ারের থেকে কিভাবে ভালো ব্যবহার আশা করো ব্লাডরোজ? আমি খারাপ, ট্রাস্ট মি বেইবি আমি দুনিয়ার সব থেকে খারাপ একজন ব্যক্তি।আর এই খারাপ ব্যক্তিটা তর প্রতি বাজেভাবে আসক্ত। একদিন বলেছিলাম, আমাকে আগলে নিলে সব সুখ এনে দিব। প্রতিটা কথা শুনব। আমি সম্পূর্ণ মরিচীকা জেনেও কেনো এত ভালোবাসলে ব্লাডরোজ?
এনির চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নিকের গালে হাত রেখে বলে,

‘ আমি আর এখন আপনাকে ভয় পাই না নিক। ভালোবাসি আপনাকে। আপনি যদি মরিচীকা হয়ে থাকেন তবে আমি হব পুরো গল্পের বাস্তবতা। আমি কি আপনাকে আগলে নিতে পেরেছি ?
‘ আমার ব্যবহারে কি মনে হয়?
” মনে হচ্ছে পুরো আপনিটাকে আমার দখলে নিয়ে এসেছি। ভালোবাসলে এত যত্ন করবেন জানলে প্রথম দিন এই আপনার প্রেমে পড়ে যেতাম। আমি আপনার নিখুত মুখের প্রেমে পড়েছি সেটা ভুল। প্রেমে পড়েছি আপনার এলোমেলো চুলে, ঠোঁটের উপরে থাকা গাঢ় তিলে, ভয়ানক রক্তিম ধূসর চোখ দুইটাতে, হাসলে চোখের কোণে পড়া ভাঁজে,আমার দিকে তাকিয়ে থাকা এই মায়াবী দৃষ্টিতে।
নিক মনযোগ দিয়ে এনির কথা শুনলো। চট করে তাকিয়ে বলে,
” রাতে ঘাম জড়িয়ে যে আদরগুলো দেই সেগুলোর প্রেমে পড়ো নি?
এনি থতমত খেয়ে যায়। লজ্জাগ রক্তিম হয়ে পড়ে রমণী। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে এক টানে খুলে ফেলে ব্লাউজের ফিতে। এনি হকচকিয়ে উঠে নিকের দিকে তাকায়,

“ক… কি করছেন? এই মাত্র তো ঠিক ছিলেন।
নিক সম্পূর্ণ ভাড় ছেড়ে দেয় এনির উপরে। গলায় নাক ঘেঁষে বলে,
” মনে হয়ে গিয়েছে আবার। বিগত তিন ঘন্টা ধরে নিজেকে কন্ট্রোলে রাখছি। ট্রাস্ট মি ব্লাড রোজ আর পারছি না। বাকি কথা পরে বলব।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” আপনি তো নিয়ে এসেছেন সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। এই রুমটা উপহার দিতে!
নিক একটা খাম এনির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,
” দিয়ে ফেলেছি সব। আর এই খামে ইয়াতিম খানার দলিল। নিভ্রিতার নামে খুলা হয়েছে।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” আপনি ইয়াতিম খানা খুলে দিয়েছেন? বাচ্চাদের ভক্ষক হুট করে রক্ষক হয়ে উঠার কারন?
” তুমি চেয়েছিলে তাই।
এনি ভাবনার জগতে হারিয়ে যায়। হুশ ফিরে আসে নিজেকে অনাবৃত হতে দেখে। ধীরে – ধীরে পাতলা শাড়িটা সরে আসে বুকের উপর থেকে। স্পর্শ গভীর হতেই এনি শুষ্ক গিলে বলে,
” বা.. চ্চারা কাঁদবে!
” উহুম! অধিরাজ সামলাচ্ছে। সহজ হও ব্লাডরোজ!

নাজলী রুমের ভেতরেই এক পাশ থেকে অন্য পাশে হেটে যাচ্ছে। অনেক্ষণ বসে থাকার ফলে পা ফুলে গিয়েছে অনেকটা। আরিশ চিন্তিত গলায় বলে,
” ডাক্তারের কাছে যাবে?
নাজলী বিরক্তিকর চোখে তাকায় আরিশের দিকে। এই নিয়ে বিশবার বলেছে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। পায়ে পানি আসা নরমাল কিন্তু এই ব্যক্তিকে কে বুঝাবে?
” আপনি পাগলামো ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না?
” করতে আর দিলে কই?আট মাস ধরে উপোষ করে আসি।
নাজলী কপাল কুচকে বলে,
” কিহহ! আট মাস ধরে না খেয়ে আছেন? একটু আগেও তো খেয়েছেন আমার সামনে।
আরিশ বিছানা থেকে নেমে বলে,
” খাওয়ার মধ্যে তফাৎ করতে শিখো জান। বউ আর খাদ্যদ্রব্য দুইটা আলাদা জিনিস।
নাজলী থতমত খেয়ে যায়। লজ্জায় দৃষ্টি ঘুরায় চারপাশে। দাঁত চেপে বলে,
” নির্লজ্জ! যৌবনে ঠাডা পড়বে দেখে নিয়েন।
আরিশ হেসে বলে,

” আমার সব যৌবন তো তোমাকেই দান করে দিয়েছি ওয়াইফি। নতুন করে আবার কোন যৌবন আসবে? সব তো তুমিই নিয়ে নিয়েছো।
” আরিশ……
নাজলী দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে। আরিশ চুল ঠিক করে বলে,
” রাগ করছো কেনো জান? সব সময় সত্য বলা নৈতিক স্বভাব। আমার মত ভদ্র ছেলের সব লুট করে নিয়েছো। জীবনে কোনোদিন মেয়েদের দিকে তাকায় নি। ভাগ্যিস ভার্জিনিটি নিতে পারো না। নয়ত সমাজে মুখ দেখাতাম কি করে?
নাজলী চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” সমাজে মুখ দেখিয়ে চলেন, জানতাম না তো!
” মুখ না দেখাই তবে চোখ তো দেখা যায়। হুডির চোখ দৃশ্যমান থাকে।
” আপনি ভার্জিন?
” ইয়েস ওয়াইফি.।
নাজলী ঠোঁট দিয়ে গ্রিবাদেশ নাড়ায়। কোমরে এক হাত রেখে বলে,

” আমিও সেটাই ভাবছিলাম, আপনি তো পিউর ভার্জিন। জীবনে কোনোদিন একটা মেয়ের দিকেও তাকান নি। ইভেন আমরা যে এক রুমে আছি এরপরও আমার সামান্য হাত অব্দি স্পর্শ করেন নি। মাঝে – মাঝে ভেবে পাই না মানুষ এতটা ভদ্র কিভাবে হয়। এত ভদ্রতার মাঝেও আমি যেন কিভাবে প্রেগনেন্ট হয়ে যাই। ছোট কালে গল্প শুনতাম বাচ্চা নাকি আল্লাহ দিয়ে যায় রাতে। আমার ও মনে হয় আল্লাহ এমনিই দিয়ে গিয়েছে। বাচ্চাটা তো একান্ত আমার। তাই ভাবছিলাম বাচ্চা নিয়ে পাশের রুমে শিফট হয়ে যাব। আপনার মত এত ভদ্র মানুষের সাথে থাকলে ব্যাপারটা কেমন যেন দেখায়।
আরিশ হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকে৷
” কেমন দেখায়?
” খুবই জঘন্য! তাই অন্য রুমে শিফট হয়ে যাব।
” অন্য রুমে শিফট করবে মানে?
নাজলী একদম খাপছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
” আমার বাচ্চা নিয়ে শিফট হব আরকি।
আরিশ চোয়াল পিষে বলে,
” কখন থেকে আমার – আমার করছো কেনো? আমাদের হবে!
নাজলী অবাক করা ফেইস নিয়ে বলে,

” এমা, আমাদের কিভাবে হবে? বাচ্চাটা তো আল্লাহ আমাকে দিয়েছে আপনাকে নয়।
আরিশ কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,
” আমার মাধ্যমেই তোমার কাছে গিয়েছে। তাই আমার – আমার করা বন্ধ করে। মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে।
নাজলী বাঁকা হেসে আরিশের দিকে এগিয়ে যায়। ঠোঁট উল্টে বলে,
” আপনার মাধ্যমে দিয়েছে কিভাবে?
নাজলীর এমন প্রশ্নে আরিশ প্রথমবারের মত ভরকে যায়। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” যেভাবে দেওয়ার সেভাবে।
” কিন্তু আপনি তো পিউর ভার্জিন। এই মাত্র দাবি করলেন উঁচু গলায়। তাহলে কিভাবে কি? সাইন্স তো ভুল প্রমানিত করছেন আরিশ!
আরিশ ছোট – ছোট চোখ করে তাকায়। হালকা হেসে নাজলীর হাত চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। উঁচু পেটে চুমু খেয়ে বলে,
” মে মাই চাইল্ড ইনহেরিট ইয়োর নেচার। যাতে শক্তিতে না পারলেও ঝগড়া করে উপরে থাকতে পারে।

নাভিদের জীবন তীব্র সংকটমুহূর্তে উপনীত। মৃত্যুচিন্তার নিবিড় ছায়ায় আচ্ছন্ন তার প্রতিটি মুহূর্ত। এক নিরবচ্ছিন্ন ভাবনাস্রোত তাকে মানসিক বিপর্যয়ের চরম শিখরে ঠেলে দিয়েছে। চিকিৎসকদের গভীর আশঙ্কা—এরূপ তীব্র মনোদৈহিক অস্থিরতা যেকোনো মুহূর্তে তাকে মস্তিষ্কের প্রাণঘাতি ব্রেইন স্ট্রোকের দিকে ধাবিত করতে পারে। তার শারীরিক ক্ষয় আর বেঁচে থাকার স্পৃহাহীনতা নির্দেশ করে যে, এই জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
​বিগত আট মাস যাবৎ চিকিৎসালয়ের নির্মম শুভ্রতায় সে বন্দি। নিক এসেছিলো কিন্তু মুখোমুখি হয় নি একবারের জন্য ও। আরিশ সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে যাচ্ছে কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। রোগীর দিক দিয়ে কোনো রেসপন্স নেই। ইরান থেকে এসে রিদ্ধিমা নাভিদের সাথে দেখা করতে এসেছিলো। পুনরায় আর ঘরে যাওয়া হয় নি। অনমনীয় অশ্রুপাতকে সঙ্গী করে হসপিটালের চত্বরেই কাটায় দিনরাত্রি গৃহপ্রত্যাবর্তনে তার তীব্র অনিচ্ছা।

​সবাই সব কিছু জানে কিন্তু এনি এখনও কিছু জানো নে। রয়ে গেছে এক গভীর ও সুচতুর অজ্ঞতায়। তার কাছে সত্যকে বিকৃত করে তুলে ধরা হয়েছে—নাভিদ নাকি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে পুনর্বার ইরান অভিমুখে যাত্রা করেছে, এক নতুন সূচনার প্রত্যাশায়। কী অসীম বিড়ম্বনা! সেই সরলমনা নারী আজও অনুধাবন করতে পারল না যে, তার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার যে দুর্বহ যাতনা, তাই এক পুরুষকে ধীরে ধীরে মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত প্রাণীতে রূপান্তরিত করেছে। মাসের পর মাস হাসপাতালের বিষণ্ণ শয্যায় বিদীর্ণ হচ্ছে তার আত্মা।
​প্রেমের চরম মূল্য চুকিয়ে এক পুরুষ আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও দেউলিয়া। অথচ অন্য প্রান্তে নারী মশগুল নিজ স্বামীর নিবিড় স্পর্শের মাদকতায়।
নাভিদের মুখে অক্সিজেন মাস্ক। রিদ্ধিমা নাভিদের বুকে মাথা রেখে আলতো ভাবে। দিন – রাত কাঁদার ফলে গলা ভেঙে গিয়েছে। নাভিদের খোলা বুকে চুমু খেয়ে বলে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭ 

” এক নারী আপনার ধ্বংস করেছে। আরেক নারী যে আপনার অপেক্ষায় বসে আছে সেই দিকে তাকিয়ে দেখুন না একবার। বিশ্বাস করুন নাভিদ, আমাকে ভালোবাসতে হবে না। শুধু চাই আমার মৃত্যুর সময় যাতে উচ্চারিত হয় ‘ আপনার স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেছে’ এতটুকু সম্পর্ক শুধু চাই। একটু দয়া করুন না আমার উপর। একটু ভিক্ষে দিন।
আমি জানি, আপনার মুখে ভালোবাসি শব্দটা শুনা মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর। তবুও মৃত্যুর আগে অব্দি ভালোবাসি শব্দটা শুনার জন্য রুহটা আটকে থাকবে কয়েকশত বছর। ( সংগৃহিত)

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৮