অভিসৃতি পর্ব ১৮
নওরিন কবির তিশা
মধ্যরাতের প্রবল বর্ষণ শীত নামিয়েছে চরাচরে।ব্ল্যাংকেটের উষ্ণতা ছাপিয়ে স্বামীর বক্ষপটে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে ছিলো কায়রা আহসান।সহসা,আজানের সুমিষ্ট ধ্বনিতে জাগ্রত হলো উভয়ই। কায়রা আলস্যভরে আরেকটু ঘুমানোর আবদার করলেও,তা পূরণ করলো না দুর্জয়।
একপ্রকার কোলে তুলে প্রবেশ করলো ওয়াশরুমে। ওযু সেরে, নামাজ আদায় করলো একসঙ্গে। গভীর নিদ্রা ভঙ্গ হতেই পুনরায় ঘুমানোর প্রয়াস চালালো না কায়রা। অনুভব করলো বেশ ক্ষুধা পেয়েছে তার। অদ্ভুত সময়ের উদ্ভট পরিস্থিতি যাকে বলে! মেজাজ গরম হলেও উপায়ান্তর না পেয়ে শেষমেষ পা বাড়ায় কিচেনের উদ্দেশে।
ইতিমধ্যে, ভারী পাঞ্জাবিটা বদলে ক্যাজুয়াল ভি-নেক টি-শার্ট ও ট্রাউজারে সজ্জিত হয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিল দুর্জয়। কায়রাকে ওভাবে পা টিপে টিপে কক্ষের বাইরে ধাবিত হতে দেখে থমকে দাঁড়াল। সুগভীর ভ্রূ কুঞ্চন করে কায়রার পথ আটকে শুধাল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
কায়রা চোরের মতো থতমত খেয়ে গেল। লজ্জায় আরক্তিম মুখশ্রী অবনত করে তোতলে বলল,
“ইয়ে মানে… কোথাও না! জাস্ট নিচে যাচ্ছিলাম।”
দুর্জয় কায়রার থমকে যাওয়া চাহনি আর আকুল মুখমণ্ডল একপলক নিরীক্ষণ করল। গতকাল রাতে যে মেয়েটা ঘুমের তোপে একদানা খাবারও পেটে পুরতে পারেনি, তার এই অসময়ে নিচে যাওয়ার কারণ বুঝতে একমুহূর্ত বিলম্ব হলো না ওর; গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ক্ষুধা লেগেছে?”
কায়রা সীমাহীন লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে গেল! অস্ফুটে বলল,
“না… আই মিন, অল্প!”
দুর্জয় আর কথা বাড়াল না। ধীর পদে সোজা কিচেনের দিকে পা বাড়াল। কায়রাও নিরুপায় সুবোধ বালিকার মতো ওর পিছু পিছু হেঁটে এলো। কিচেনে ঢুকে দুর্জয় সুবিশাল রেফ্রিজারেটর উন্মুক্ত করল। কিন্তু কাল রাতের ভারী আইটেম ছাড়া চটজলদি খাওয়ার মতো তেমন কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না।কায়রা দুর্জয়ের ভাবান্তর দেখে জলদি ত্বরিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“আরে, রাখুন! ফ্রিজে যা আছে ওটুকুই ওভেনে গরম করে নিলেই হবে। এত ভোরে প্রবলেম করার দরকার নেই!”
দুর্জয় কায়রার কথাটিকে একপ্রকারের তোয়াক্কা না করেই ফ্রিজ থেকে তাজা কিছু সবজি আর ডিম বের করে কিচেন কাউন্টারে রাখল। কায়রার দিকে একনজর আড়চোখে চেয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“ওভারনাইট রেখে দেওয়া এত রিচ ফুড এতো সকালে খাওয়া যাবে না। আই অ্যাম মেকিং এ হেলদি ভেজিটেবল ওটস অমলেট। দ্যাটস ইট!”
খাবারের নাম শোনামাত্র কায়রার আরক্তিম মুখশ্রী নিমেষেই কুঁচকে গেল! ও অত্যন্ত করুণ ও ক্ষুণ্ন মুখে নাক শিটকে বলে উঠল,
“অ্যাঁ! ওটস উইথ ভেজিটেবলস? সিরিয়াসলি? আমি এসব একদম খাই না! প্লিজ, অন্তত এই অসময়ে আমাকে এই ক্রুয়েল টর্চারটা করবেন না, মেজর!”
দুর্জয় টি-শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটোত গুটোত মৃদু বক্র হাসল। কায়রার ছটফটানি উপেক্ষা করে প্যান চড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“নো অপশনস, মিসেস মেজর! আমার কিচেনে আনহেলদি ক্র্যাভিং টলারেট করা হয় না। সাইলেন্টলি ওয়েট করো, ফাইভ মিনিটস!”
কায়রা লোকটার এমন অটল একগুঁয়েমি দেখে একপ্রকার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! অনাহারী পেট আর লোকটার নির্দয় কাঠখোট্টা হুকুম,সব মিলিয়ে চরম বিস্ময়ে খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল ও। অতঃপর আর কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে, কিচেন কাউন্টারের একপাশের জায়গা থেকে সুদৃশ্য পাত্রগুলো সযত্নে একটু সরিয়ে নিজেই চড়ে বসলো সেখানে।
দুর্জয় কায়রার এহেন বালিকা সুলভ চপল কাণ্ড প্রত্যক্ষ করে ঈষৎ বিস্মিত নেত্রে চাইল। তবে মুখে কিছু বলল না। কায়রা কাউন্টারে আসন গেঁড়ে বসে, নিশ্চিন্তে দু-পা দুলিয়ে দুলিয়ে প্রখর কৌতুহলে দুর্জয়ের নিখুঁত রান্নার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
কাউন্টারে বসে থাকার দরুন কায়রা একদম দুর্জয়ের সমউচ্চতায় চলে এসেছে। ও অত্যন্ত কাছ থেকে নিরীক্ষণ করছে মানুষটিকে। টি-শার্টের হাতা গোটানোয় অনাবৃত হয়ে পড়া সুঠাম বাহুদ্বয়, সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট প্রথায় ছাঁটা ছোট কেশরাজি, আর গাঢ় তীক্ষ্ণ নাসিকার রেখা-সব মিলিয়ে দুর্জয়ের ব্যক্তিত্ব যেন এক অদ্ভূত চৌম্বকীয় আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। কায়রা একপ্রকার মোহাচ্ছন্ন হয়ে থমকে রইল; নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আপনি এত সুন্দর কেন মেজর? আমার ধর্মে নেশা করা হারাম, অথচ আপনার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ অবধি ঘোরে আচ্ছন্ন করে আমায়!”
কথাটি বলেই কায়রা সচকিত হলো! হায় আল্লাহ, নিজের অজান্তেই এ কী বলে ফেলল ও! নিশ্চিত এতক্ষণে দুর্জয়ের কানে পৌঁছে গেছে কায়রার অস্ফুট স্বগতোক্তি। ও চুলার আঁচ কমিয়ে, ধীরে ধীরে ঘাড় ফেরাল। অতঃপর দু-কদম এগিয়ে এসে কায়রার একেবারে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। প্রখর কৃষ্ণচক্ষুর সুগভীর দৃষ্টি কায়রার ভীত নেত্রে নিবদ্ধ করে পরম ব্যক্তিত্বপূর্ণ ভরাট কণ্ঠে বলল,
“কী বলছো?”
শুনতে পায়নি বুঝে স্বস্তি মিললেও,দুর্জয়ের এমন সান্নিধ্যে কায়রার হৃতস্পন্দনের দাপাদাপি বৃদ্ধি পেল সহস্রগুণ। কাউন্টারে বসা থাকায় দুর্জয়ের উচ্চতার সাথে ও এখন প্রায় এক সমান্তরালে। দুর্জয়ের সুগৌর কপাল হতে নেমে আসা দুই-একটি অবাধ্য অলকগুচ্ছ কায়রার হাতের খুব কাছেই ছোঁয়া যাচ্ছিল। কায়রা চোখ দুটি আনত করে, তোতলে উঠে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আ-আমি কিছু বলিনি তো! আ-আসলে বলছিলাম, আপনার হেয়ারকাটটা… আই মিন, চুলগুলো খুব সুন্দর! একবার ছুঁই?”
দুর্জয় কোনোরূপ দ্বিমত ছাড়াই কায়রার দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলো। কায়রার কম্পমান হাতের তালুটা পরম যত্নে তুলে নিয়ে নিজের মাথার ঘন রেশমি চুলের ওপর রেখে অতল মোহে আবৃত সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“ইয়্যু ডোন্ট নিড টু আস্ক ফর পারমিশন, মিসেস দুর্জয়। দিস পার্সন, অ্যান্ড এভরিথিং দ্যাট বিলংস টু হিম—সবটাই তো তোমার অধিকার।”
কায়রা কুণ্ঠাবৃত আঙুল দিয়ে আলতো করে দুর্জয়ের রেশমি কেশরাজি ছুঁয়ে দিল। মুহূর্তেই ওর সমস্ত শরীর জুড়ে এক প্রকাণ্ড সুখময় শিহরণ খেলা করে গেল। অতঃপর একমুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে কোনরূপ ভাবান্তর ছাড়াই; পরম আদরে ও প্রকাণ্ড অধিকারবোধে দুর্জয়ের চুলগুলো আঁকড়ে ধরে, তার মাঝেই চুম্বন এঁকে দিলো।
দুর্জয় চোখ মুদে পরম আবেশে গ্রহণ করলো তা। এদিকে নিজের কাণ্ড বোধগম্য হতেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে চাইল। এদিকে ওর এমন কাণ্ডে,দুর্জয় ওর কানের কাছে মুখ এনে বক্র হেসে ফিসফিস করে বলল,
“সো, নেশা কি খানিকটা কাটল, নাকি অমলেট বানানোর আগেই পুরো ফিট হয়ে যাওয়ার প্ল্যান?”
কায়রা চট করে চোখ মেলে দুর্জয়ের শার্টের ফ্রন্ট চেপে ধরল। লাজুক রক্তিম হাস্যে মুখ লুকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনি কিন্তু ভীষণ বাজে, মেজর!”
দুর্জয় গম্ভীর মুখে মৃদু হেসে কায়রার চিবুক ধরে ওপরের দিকে তুলল; অতঃপর রান্নার দিকে নজর ফিরিয়ে বলল,
“অলরাইট, নাও বি আ গুড গার্ল অ্যান্ড হ্যাভ দিস ওটস। প্রপার নিউট্রিশন না পেলে এই অলস বডি ফ্রেম নিয়ে আমার রাফ অ্যান্ড টাফ লাইফস্টাইল সামলাবে কী করে, মিসেস দুর্জয় আহসান?”
প্রবল অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও অপরপক্ষকে নিজে থেকেই কল করতে একপ্রকার বাধ্য হল পায়রা। ভ্রুযুগল কুঁচকে আসছে। তবুও ধাতস্থ করল নিজেকে, ফোনটা কানের কাছে ধরে দু তিনবার রিং হতেই অপরপক্ষ সজাগ হলো। ভেসে এলো প্রতীক্ষিত ধ্বনি,,
“হ্যালো?”
“জ্বী, পায়রা বলছিলাম!”
“নামটা সেভ করাই ছিল। কাজের কথা বলুন?”
সরাসরি এহেন গাণিতিক প্রত্যুত্তরে পায়রা ক্ষণিকের তরে থমকায়। লোকটার প্রথাগত আচরণে ওর মেজাজ খানিকটা চড়ে গেলেও, আপাতত নিজের ভাবাবেগকে সংবরণ করে সংক্ষেপে বলল,
“রিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে আপনার সাথে স্পেশালি একটু মিট করা দরকার ছিল। আইনগত কিছু পেপারসও হ্যান্ডওভার করার আছে। কখন আর কোথায় আসতে পারবেন বলুন?”
সায়মন ওপাশ থেকে ঘড়ির দিকে একনজর চাইলো,
“টুডে অ্যাট ফাইভ পিএম। খুলনার ‘রয়েল মোটেল এন্ড রেস্তোরাঁ’র কফি লাউঞ্জটা এর জন্য পারফেক্ট হবে। শান্ত পরিবেশ, কাজের কথা বলার জন্য সুইটেবল। আই হোপ দিস ওয়ার্কস ফর ইউ?”
“ওকে, থ্যাংকস। আমি টাইমলি পৌঁছে যাব।”
পায়রা বেশ বিরক্ত হয়েই দ্রুত কলটা কেটে দিতে চাইল। কিন্তু ওপার থেকে সাইমনের এক চিলতে ব্যাঙ্গাত্মক স্বর থামালো ওকে,
“বাই দ্য ওয়ে, মিস পায়রা… অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো ফিক্স হলো, কিন্তু আশা করি এবার আর মিটিংয়ে লেট করে এসে ট্রাফিকের অজুহাত দেবেন না? মাই টাইম ইজ প্রিটি প্রেশাস!”
পায়রা চোখ দুটো সরু করে উত্তর দিল,
“ডোন্ট ওরি, মিস্টার সায়মন। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলার অভ্যাস আমারও কম নয়! বাই।”
পায়রা এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে লাইন কেটে দিল। লোকটার প্রকাণ্ড আত্মঅহংকার আর মাপা ব্যক্তিত্ব যেন প্রতি পদে ওকে উসকে দেয়! তবুও রিয়ার জন্য এই তপ্ত পরিবেশেই আজ বিকেলে তাকে পা বাড়াতে হবে।
“আপনি আজই চলে যাবেন?”
ঘরের দুয়ার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কায়রার থমথমে কণ্ঠস্বরে দুর্জয় ট্রাভেল ব্যাগের চেইনটা টেনে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো। মেয়েটার ডাগর চক্ষু জুড়ো ছলছল জলকণা, যেন একমুহূর্তেই উপচে পড়বে। কিছুক্ষণ আগেই হেডকোয়ার্টার্স থেকে বিগ্রেডের ইমার্জেন্সি ব্যাক কলের নোটিশ এসেছে; বান্দরবান বর্ডারে অবিলম্বে জয়েন করতে হবে তাকে।
সমগ্র বাড়ির পরিবেশ ভারাক্রান্ত ইতিমধ্যেই।তবে কায়রার নিথর ব্যাকুলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। দুর্জয় ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কায়রার মুখোমুখি দাঁড়াল। আলতো হাতে ওর ছোট্ট পদ্ম পাতার ন্যায় মুখখানা দুহাতের আজলায় পুরে সুগভীর ভরাট কণ্ঠে বলল,
“ইয়েস,। ১১টা ১৫-এর ফ্লাইটে বের হতে হবে। ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন, সো আই হ্যাভ টু লিভ।”
কায়রা দুর্জয়ের শার্টের ফ্রন্ট চেপে ধরে মিনতির সুর ফুটিয়ে তোতলে বলল,
“আজকে না গেলেই নয়?”
দুর্জয় কায়রার বিষাদগ্রস্ত মুখশ্রী পরম যত্নে হাত দিয়ে আগলে ধরল। ধাতব গাম্ভীর্য সামলে সুকোমল আদুরে কণ্ঠে বলল,
“তুমি তো জানো, ডিউটি কামস ফার্স্ট। মিলিটারির লাইফে এই আনপ্রেডিক্টেবল মোমেন্টগুলো মেনে নিতেই হয়। বি স্ট্রং, মাই গার্ল!”
কায়রা কণ্ঠ বুজে আসা জলকান্না চেপে অস্ফুটে শুধাল,
“ফিরবেন কবে?”
দুর্জয় সুগভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গাঢ় অতল নেত্রে প্রচ্ছন্ন আক্ষেপের ছায়াপাত ঘটিয়ে শান্ত স্বরে জবাব দিল,
“আর্মির অফিশিয়াল ট্রিপের তো প্রপার কোনো অ্যানসার হয় না। সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোলে এলেই ব্যাক করব।”
কথাটা শোনামাত্র কায়রার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে চাইল। কিন্তু দুর্জয় ত্বরিত স্বহস্তে কায়রার চিবুক ছুঁয়ে সেই জলবিন্দু আটকে দিল। মৃদু ধমকের সুরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ডোন্ট ক্রাই! কাঁদবে না একদম। তোমার এই ওয়াটারওয়ার্কস কিন্তু আমার ডিপার্চার আরও কঠিন করে দিচ্ছে!”
কায়রা ওষ্ঠাধর চেপে অশ্রু সংবরণ করার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। দুর্জয় ঈষৎ মাথা নিচু করে নিজের কপালের দিকে ইশারা করলো। কায়রা নীরব সংকেত নিমেষেই অনুধাবন করে আর একমুহূর্তও ইতস্তত না করে, পরম আধিপত্যে দুর্জয়ের বুটের ওপর নিজের কোমল দু-পা তুলে দিয়ে সামান্য উঁচু হলো। অতঃপর প্রকাণ্ড গভীর ভালোবাসায় দুর্জয়ের সুগৌর কপালে নিজের ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালো দীর্ঘক্ষণ।
ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে, দুর্জয়ের প্রখর উষ্ম বুকের ওপর হাত রেখে আর্দ্র কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“নেক্সট টাইম যখন ফিরবেন, হাতে অনেকটা টাইম নিয়ে আসবেন মিস্টার প্রফেশনাল! আমি কিন্তু জমে থাকা সব আবদার আদায় করব। একটা বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় রিকশায় চড়ে পুরো শহর ঘুরে দেখার প্রমিস করতে হবে আপনাকে!”
দুর্জয় কায়রার কানের কাছে ঝুঁকে মৃদু হাস্যে নিচু কণ্ঠে বলল,
“ডিল, মিসেস আহসান! খুলনা সিটির পুরো রেইন ড্রাইভই তোমার নামে বুকড রইল। জাস্ট প্রমিস মি, তুমি নিজের খেয়াল রাখবে আর কন্টিনিউয়াসলি আমায় মিস করবে!”
কায়রা অশ্রুসিক্ত হাসিতে মাথা দোলালো। ইতিমধ্যে সাজেদা চৌধুরী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয়েছেন। ব্যাগ হাতে দুর্জয় সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো। যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দুর্জয় শেষবারের মতো কায়রার আকুল নেত্রের পানে প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ধীর পায়ে প্রাঙ্গণ পেরিয়ে গাড়ির দিকে ধাবিত হলো; কায়রার ইচ্ছা করলো ছুট্টে গিয়ে মানুষটাকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরতে। কিন্তু আফসোস! পারলো না তা!
কান্না চেপে সে পানে চেয়ে থাকার মূহুর্তেই,হঠাৎই কাঁধের ওপর পরম মমতাময় ও ভরসাযোগ্য হাতের স্পর্শ পেয়ে সচকিত হলো কায়রা। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল,অগাধ মাতৃত্বের স্নেহার্দ্র দ্যুতি পূর্ণ দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছেন সাজেদা চৌধুরী। কায়রার বিষণ্ন ও অশ্রুসিক্ত মুখখানি দুহাতের আজলায় পুরে মৃদু হেসে কোমল কণ্ঠে বললেন,
“আমাদের আহসান কুঞ্জের ছোট্ট বাবুই পাখির মুখটা এমন মেঘলা করে রাখলে কি চলে, মা? তোমায় আমি বাবুই বলি কেন জানো?কারণ, বাবুই পাখি কখনোই ভেঙে পড়ে না? ঝড়-ঝাপটা যতই আসুক, সে নিজের শক্তিতেই ভালোবাসার বাসা আগলে রাখে। দুর্জয় তো দেশের সেবায় গেছে মা, আর ওর আসল শক্তিস্থল কিন্তু তুমিই। একজন সৈনিকের স্ত্রী হওয়া সহজ কথা নয়, সেখানে চাই প্রকাণ্ড ধৈর্য আর এক সমুদ্র সাহস। বাবুই পাখির মতো ধৈর্য ধরে নিজের ঘর আর নিজের খেয়াল রাখো, দেখবে তোমার ভালোবাসার টানেই ও ঠিক সময়ে আবার তোমার নীড়ে ফিরে আসবে।”
শাশুড়ির এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সান্ত্বনাময় কথাগুলো যেন কায়রার ব্যাকুল হৃদয়ে ক্ষণিকের জন্য মলমের মতো কাজ করল। বুকের গহীনে চেপে রাখা ভারি কষ্টটা যেন এক নিমেষে অনেকাংশে হালকা হয়ে এলো। অশ্রুসিক্ত হাসিতে মাথা নেড়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল সাজেদা চৌধুরীকে ।
“এসব কোন ধরনের বাচ্চামি, তুজা?”
বিছানায় বসারত অবস্থায় তুজাকে আকস্মিক দুয়ারে দেখে একলহমায় দাঁড়িয়ে পড়ল ইভান। ওর কণ্ঠস্বরে বিস্ময়ের চেয়ে ক্ষোভের তীব্রতাই বেশি ফুটে উঠল। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পুরুষ মেসে অপরাপর তরুণের আনাগোনা নিত্যদিনের। সেখানে তুজার মতো রূপসী তরুণীর কোনোপ্রকার পূর্বসংকেত ছাড়া হুট করে চলে আসাটা ইভানের সুবিন্যস্ত মেজাজ একমুহূর্তে বিগড়ে দিল!
তুজা ব্যাগের ফিতাটা আঁকড়ে ধরে ঘরে প্রবেশ করল। ইভানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আকুল কণ্ঠে শুধাল,
“ভার্সিটিতে যাসনি কেন আজ? ইচ্ছাকৃত,কোনো ইম্পর্টেন্ট ক্লাস মিস করিস না তুই, আজ কী হলো?”
ইভান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঠান্ডা ও নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
“ভালো লাগছিল না, সো যাইনি। দ্যাটস ইট।”
তুজা ইভানের আরও সন্নিকটে এগিয়ে এলো। উদ্বেগে ব্যাকুল হয়ে ওর শুভ্র কপালে নিজের কোমল হাতটি ছুঁয়ে দিতে উদ্যত হলো,
“কেন? শরীর খারাপ? ফিভার এসেছে নাকি? মেডিসিন নিচ্ছিস না কেন? কতবার কল করলাম, একটা কলও রিসিভ করলি না!”
ইভান এক ঝটকায় তুজার হাতটি সরিয়ে দিলো,,,
“আমার কিছুই হয়নি, তুজা! ডোন্ট অ্যাক্ট সো ওভারপ্রোটেক্টিভ। তুই হঠাৎ এখানে কেন এসেছিস, সেটা বল?”
তুজা চরম ক্ষুণ্ন ও ব্যথিত মুখে বলল,
“কেন এসেছি? তুই ফোন ধরছিলি না বলে বাধ্য হয়ে আসতে হলো! মেসেজ সিন করে ফেলে রাখিস, সামনাসামনি এড়িয়ে চলিস… তুই কি সত্যি সত্যি আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপটা রাখতে চাস না?”
ইভান পিঠ ফিরিয়ে চরম উদাসীনতায় বলল,
“ধরার প্রয়োজন বোধ করিনি, তাই ধরিনি।”
সার্বক্ষণিক হাসিঠাট্টায় মজে থাকা ইভানের এই কাটা কাটা বচনে তুজার চোখের কোন ঘেঁষে তপ্ত জলকণা গড়িয়ে পড়ল। ও রুদ্ধ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“ইভান! জাস্ট স্টপ দিস সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট! কি এমন করেছিলাম আমি? ফাজলামি করতে করতে জাস্ট একটা কথা বলেছিলাম আর তাতেই, তুই এভাবে ইগনোর করে আমাকে রোজ মেন্টালি টর্চার করবি?”
ইভান ঘাড় ঘুরিয়ে শীতল প্রখর দৃষ্টি হানল,
“আই অ্যাম নট টর্চারিং ইউ, তুজা। জাস্ট ডিসটেন্স মেইনটেইন করছি। এন্ড দিস ইজ এ বয়েজ মেস, এখানে তোর এভাবে হুটহাট চলে আসাটা একদমই এক্সেপ্টেবল নয়। আদার্সরা বাজেভাবে জাজ করবে। সো প্লিজ, লিভ রাইট নাউ।”
তুজা ইভানের এমন কঠোর রূপে স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকে জমানো অভিমানের পাহাড় ভেঙে অশ্রুর ঢল নামলেও, নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ব্যাগটা কাঁধে চেপে ধরে ত্বরিত কদমে মেসের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো বাহিরে।
বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যার কুহেলিকা ঘনিয়ে আসছে খুলনার চেনা প্রাঙ্গণে। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পূর্বেই ‘রয়েল মোটেল এন্ড রেস্তোরাঁ’র সুসজ্জিত কফি লাউঞ্জে এসে পৌঁছেছে পায়রা। সুদৃশ্য কাঁচের টেবিলের বিপরীত প্রান্তের আসনটিতে ইতিমধ্যেই উপবিষ্ট সায়মন রহমান। গাঢ় নীল রঙের ফরমাল সুটে সুসজ্জিত, চোখের চশমাটা এক আঙুলে সামান্য উঁচিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ ধরে রেখেছিল ও। পায়রাকে আসতে দেখে ল্যাপটপ বন্ধ করে পরম পেশাদারিত্বে একচিলতে হাসল,
“পাংচুয়ালিটির প্রশংসা করতেই হয়, মিস পায়রা! সিট ডাউন, প্লিজ।”
পায়রা মুখোমুখি আসনে বসল। ব্যাগ থেকে ফাইল বের করে সোজা টেবিলের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“অযথা প্রশংসার প্রয়োজন নেই, মিস্টার সায়মন। কাজের কথায় আসা যাক। এগুলো রিয়াকে দেওয়া লাস্ট কল রেকর্ডিংস আর ওদের পাঠানো লিগ্যাল নোটিশের কপি। প্রফেসি অনুযায়ী আপনি নিশ্চয়ই জানেন এবার কী লিগ্যাল স্টেপ নেওয়া উচিত?”
সাইমন ফাইলটি হাতে নিয়ে প্রতিটি পাতার ওপর প্রখর পেশাদার দৃষ্টি বুলাল। অতঃপর ফাইলটি বন্ধ করে পায়রার দিকে চেয়ে বলল,,
“অ্যাভিডেন্সগুলো যথেষ্ট স্ট্রং। অপোনেন্ট পার্টি ভাবছিল মেয়েটাকে ব্ল্যাকমেইল করে কেস উইথড্র করাবে। বাট দে ডোন্ট নো, হু সায়মন রহমান ইজ! কাল সকালেই ওদের নামে নন-বেইলেবল ওয়ারেন্ট আর রেস্ট্রোনিং অর্ডার ইস্যু করাচ্ছি। নো নিড টু ওরি!”
“থ্যাংক ইউ, মিস্টার সায়মন। রিয়ার পরিবার সত্যিই খুব ট্রমাটাইজড ছিল। আশা করি এবার ওরা একটু পিস পাবে।”
সায়মন চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল। ওয়েটারকে দুটি ব্ল্যাক কফির অর্ডার দিয়ে পায়রার দিকে এক কৌতূহলী দৃষ্টি হানল,
“ইয়্যু নো ওয়াট, মিস পায়রা? বন্ধুর জন্য আপনার এই ডেডিকেশনটা সত্যি দেখার মতো। বাট নিজের প্রতিও একটু কেয়ার নেওয়া উচিত, আপনার এই গম্ভীর ফেসটা দেখলে মনে হয় দুনিয়ার সমস্ত প্রেসার একা আপনিই সামলাচ্ছেন!”
অভিসৃতি পর্ব ১৭
পায়রা চট করে চোখ তুলে চাইল। শাণিত কণ্ঠে ত্বরিত জবাব ছুঁড়লো,
“নিজের খেয়াল আমি নিজেই রাখতে পারি, মিস্টার সায়মন! আর আপনার এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরামর্শগুলো না দিলেও চলবে।”
“ওকে ম্যাম! অ্যাজ ইউ ইশ। তবে মনে রাখবেন, বিপদে-আপদে এই বলদ লোকটাই কিন্তু একমাত্র সেভিয়র হিসেবে প্রুভড হচ্ছে!”
