ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৬
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
পাশে একজন কাজী ও একজন উকিল। চারপাশের থমথমে বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার জো নেই। কাজী সাহেব সামনে ছড়ানো-ছিটানো অজস্র বন্দুকের নল দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন। কোনোমতে হড়বড়িয়ে তিনি বলে উঠলেন—
— “এখন কি বিয়ে পড়ানো শুরু করবো? মা, দেখো চারপাশের আবহাওয়া ভালো না। যখন-তখন ঝুমবৃষ্টি নামবে।”
প্রহেলিকা চোখ তুলে এক পলক পাশে বসা সুঠাম দেহি পুরুষটা দিকে তাকালো, বুঝার চেষ্টা করলো তার মনোভাব, কিন্তু বরাবরের ন্যায় এবারও অসফল হলো, তাই আর অযথা চেষ্টা করলো না। ধীরে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
মাথার চারদিকে ছড়ানো বন্দুকের নলগুলোর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে কাজী সাহেব সকল কাগজপত্রে একনজর চোখ বুলিয়ে আড়ষ্ট গলায় বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।
ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী পাত্রীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য তিনি গলা পরিষ্কার করলেন—
— “রায়পুর নিবাসী সম্মানিত খালিদ শিকদারের সুযোগ্য কন্যা প্রহেলিকা শিকদারের সহিত একই রায়পুর নিবাসী জনাব সাদমান শিকদারের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবার শিকদার প্রণয়ের সহিত দশ লক্ষ এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া উপস্থিত সকল সাক্ষীদের সম্মতিতে আপনি কী এই বিবাহে সম্মত আছেন? যদি থাকেন তাহলে আলহামদুলিল্লাহ কবুল বলুন।”
কাজী সাহেবের প্রস্তাবে কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিটি বাক্যে গা শিউরে উঠলো প্রহেলিকার। মাথার বেনারসি ঘুমটা আঙুলের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলো। কণ্ঠনালী চিরে সেই চিরাচরিত জীবনের গতি পরিবর্তনকারী শব্দটা বেরিয়ে আসতে চাইলো, কিন্তু প্রহেলিকা অনুভব করলো এই পিনপতন নীরবতার মধ্যেও তার গলা দিয়ে রা বের হচ্ছে না।
সমুদ্রের বড়ো বড়ো উত্তাল ঢেউ যেমন প্রবল উচ্ছ্বাসে সমুদ্রতটে আছড়ে পড়ে, প্রহেলিকার অন্তরের সমুদ্রেও তেমনই আবেগের এক সর্বগ্রাসী ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে।
— “বলো মা, কবুল।”
— “ক—”
ঠিক সেই মুহূর্তেই কানফাটা এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে বাকিটুকু গলায় এসে আটকে গেলো প্রহেলিকার। চকিতে সে পাশ ফিরে অন্তহীন সমুদ্রের পানে তাকালো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবারো নক্ষত্রে ঘেরা আকাশ চিরে আলোর বেগে উল্কার মতো জ্বলন্ত কিছু একটা আছড়ে পড়লো উত্তাল নীল সমুদ্রে।
চোখের পলকে আবারো বিস্ফোরণ। কয়েক হাজার মেগাটন টিএনটি সমকক্ষ এনার্জি উৎপন্ন হলো মুহূর্তেই। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের প্রভাবে যেন ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁপে উঠলো। লক্ষ্য কোটি টন পানি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছিটকে পাহাড় সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেলো।
একত্রে ঘুরতে ঘুরতে পরিণত হলো প্রলয়ংকারী বিশাল এক ঘূর্ণিতে। মাঝ সমুদ্রের প্রবল বাতাসের ধাক্কায় ঘূর্ণিটা সমুদ্র পেরিয়ে দ্রুত উপকূলের দিকে ছুটে আসতে লাগলো।
এসব অপ্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে হতভম্ব প্রহেলিকার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেলো। কী থেকে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না প্রহেলিকা। সমস্ত হিসাব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কোনো অতিপ্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর তো ছিল না, তাহলে ওগুলো কী যা সমুদ্রে পড়লো? একটা ঘটনা মস্তিষ্কে প্রসেস হওয়ার আগেই আরেকটা ধ্বংসলীলা শুরু হয়ে যাচ্ছে। উপস্থিত সকলে সম্পূর্ণ হতবাক। আতঙ্কের ঠান্ডা স্রোত পৌঁছে যাচ্ছে তাদের হাড়ের গভীরে।
ধেয়ে আসা ঘূর্ণিটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক তাকালো প্রণয়। অতঃপর পাশ ফিরে তাকালো প্রহেলিকার দ্বিধাগ্রস্ত মুখের পানে। তার কালচে লাল ওষ্ঠকোণে ফুটে উঠলো এক ভয়ানক, ক্রূর হাসি। প্রহেলিকার আরও কাছে সেঁটে বসলো প্রণয়। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা ও স্লথ গলায় ফিসফিস করে উঠলো—
— “Now your time is over. And the game is on.”
প্রণয়ের ফিসফিসানো কণ্ঠে চমকে উঠলো প্রহেলিকা। বিদ্যুৎবেগে ফিরে তাকালো প্রণয়ের নির্বিকার মুখের পানে। সমুদ্রের বুকে মরণ ঝড় উঠেছে। এমন বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে প্রণয়ের এই নির্লিপ্ততা প্রহেলিকার মনের গভীরে সন্দেহের বিষাক্ত বীজ রোপণ করে দিলো। খানিক ভড়কে গেলো প্রহেলিকা, মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো তার। আতঙ্কিত চিত্তে, তীব্র ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে সে আর্তনাদ করে উঠলো, প্রণয়কে বহু ঝাকিয়ে শুধালো—
— “এগুলো কী হচ্ছে প্রণয়? তুমি নিশ্চয় সবটা জানো, তুমি আমার সাথে ডাবল গেম খেলছো, তাই না?”
প্রাণভয়ে প্রহেলিকার চোখ-মুখ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করছে। ভ্রুকুটি করে তাকাল প্রণয়। চরম বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করে সে অবজ্ঞার সুরে বললো—
— “কী আশ্চর্য, গাঁজা ফুকেছো নাকি! আমাকে তো তুমি আটকে রেখেছো, কাল থেকে গোসল করতে পারিনি, সেখানে আমি কী করবো?”
শান্ত সমুদ্রটা ততক্ষণে প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করেছে। নিয়ন্ত্রণহীন বিশাল বিশাল জলরাশি ঝড়ের বেগে এসে আছড়ে পড়ছে উপকূলে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চারপাশের সবকিছু।
সাথে মরার উপর খাঁড়ার ঘা স্বরূপ আবহাওয়াও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। গুড়গুড় করে আকাশের দক্ষিণ কোণে কালো মেঘের দল ভারী হয়ে জমছে, কামানের গোলার মতো গর্জে উঠছে বিদ্যুৎ। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে চারপাশ।
পরিবেশের এই চরম অস্থিতিশীলতায় গার্ডদের মাঝে হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে প্রহেলিকাকে পাহারাদারগুলো যেন তাদের প্রভুভক্তি বিসর্জন দিল, যে যেদিকে পারল নিজের চামড়া বাঁচাতে ছুট লাগাল।
দিশেহারা হয়ে পড়ল প্রহেলিকা। কাজী আর উকিল তো ভয়ে ইতিমধ্যে নিজেদের প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছে। তাদের পালানোর কোনো পথ নেই। আজ বুঝি বেঘোরে মারা পড়তে হবে।
দেখতে দেখতে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে পুরো সি বিচ সম্পূর্ণ ফাঁকা। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রচণ্ড বেগে বয়ে যাওয়া বাতাসের তুমুল ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকা বা সোজা হয়ে বসা দায়। উপকূলীয় বড়ো বড়ো গাছগুলো শেকড়সহ ডান থেকে বায়ে দুলে উঠছে বারবার।
কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও সবচেয়ে ভয়ংকর ও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো— লক্ষ লক্ষ টন জলের সেই বিশাল ঘূর্ণিটা তীব্র বাতাসের ধাক্কায় দিক পরিবর্তন করে অন্য দিকে ঘুরে গেছে! অথচ এই ঘূর্ণির ভয়েই পালিয়ে গেছে সব গার্ড। ব্যাপারটা সাধারণ নয়। কেউ খুব ঠান্ডা মাথায় সূক্ষ্মভাবে, নিখুঁত হিসেবে এই চাল চেলেছে।
গার্ডদের পালিয়ে যেতে দেখে ক্রোধে ফেটে পড়ল প্রহেলিকা। অকর্মণ্যের দল সব, কাউকে লাগবে না তার! বেছে বেছে তার কপালে জুটেছে ও একদল অকর্মণ্য কাপুরুষ। দাঁতে দাঁত চেপে উগড়ে আসা রাগটুকু গিলে নিলো প্রহেলিকা। আর মাত্র কয়েক মিনিট। তারপর ভূমিকম্প আসুক বা সুনামি, সারা দুনিয়া তাবা হয়ে গেলেও তার জাস্ট কিছু যায় আসে না!
প্রহেলিকা এসবই ভাবছিল। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো হেলিকপ্টারের ব্লেডের ভারী শব্দ। সে ভেবেছিল গার্ডদের কেউ হয়তো ফিরে আসছে। কিন্তু তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে স্লাইডিং ডোর খুলে একে একে বেরিয়ে এলো কালো পোশাক পরিহিত পাঁচজন পেশাদার খুনি। সবার হাতেই অটোমেটিক একে-৪৭।
লোকগুলোকে দেখা মাত্রই আঁতকে উঠে দাঁড়াল প্রহেলিকা। এগুলো তার খুব চেনা। প্রহেলিকা পলক ফেলার আগেই মাস্ক পরিহিত বিশালদেহী লোকগুলো বুলেটের বেগে ছুটে এসে চেপে ধরল প্রণয়কে। মুহূর্তের মধ্যে কালো কাপড় দ্বারা তার চোখ শক্ত করে বেঁধে ফেললো, যাতে সামনের ঘটনার কোনো দৃশ্যই সে প্রত্যক্ষ না পায়। সামান্যতমও বাধা দিল না প্রণয়, যেন স্বেচ্ছায় সে নিজেকে সঁপে দিলো লোকগুলোর হাতে, যাদের পেশা হত্যা। তার ঠোঁটের কোণে লেগেছিল এক চমৎকার হাসি, যা চোখ এড়ালো না প্রহেলিকার। লোকগুলো প্রণয়কে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চাইলে প্রণয়ের হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল প্রহেলিকা। ওদের আটকাতে সে ঝাঁপিয়ে পড়তেই লোকগুলোর একজন পকেট থেকে রিভলবার বের করে সোজা ঠেসে ধরলো প্রহেলিকার কপালে।
ফ্যাসফ্যাসে, ঠান্ডা গলায় ভয়ানক হুমকি দিল—
— “একশো কোটির অর্ডার আছে, আমাদের কাজে বাগড়া দেওয়ার চেষ্টা করলে এখানেই ঘিলু উড়িয়ে দেবো। চল, হাঁট!”
কথা শেষ করেই প্রহেলিকার তলপেটে সজোরে এক লাথি দিলো লোকটা। ওদের বিকৃত চোখ-মুখ বলছে— এরা সাধারণ কোনো কিডন্যাপার নয়, ঠান্ডা মাথার প্রফেশনাল অ্যাসাসিন।
কিন্তু এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী প্রহেলিকা নয়। তার এত বছরের মেহনত, এতো ঝড়ের পরে পাওয়া ভালোবাসা এই সামান্য তেলাপোকার দল এভাবে কেড়ে নিয়ে যাবে— এটা সে কিছুতেই মেনে নেবে না প্রহেলিকা।
লাথি খেয়ে উল্টে পড়ল প্রহেলিকা। তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল। প্রণয়ের দিকে তাকাতেই মনোবল বেড়ে গেলো। কোমর থেকে নিজের রিভলবারটা বিদ্যুৎবেগে বের করে সোজা তাক করল প্রধান খুনির মাথা বরাবর। চোখ দুটো তার রক্তবর্ণ, চোখে অপ্রতিরোধ্য জেদ, গলার প্রতিটি শিরা ফুলে উঠেছে—
— “ওকে ছাড় বলছি, ওরে এক চুল নাড়ালে এখানেই মগজ ফুটো করে দেবো!”
কিন্তু প্রফেশনালদের সামনে দাঁড়ানো কী এতো সোজা? এখানে একটা ভুল আর দ্বিতীয়টা বুলেট। প্রহেলিকার হাত কাঁপছে উত্তেজনায়। লোকটা এক চোখ অন্ধ, কিন্তু অন্য একটা চোখই হাজারটা চোখের থেকেও বেশি শক্তিশালী।
প্রহেলিকা ট্রিগার টানার আগেই লোকটা হাঁটুর সাহায্যে দ্বিতীয়বারের মতো সজোরে আঘাত করল তার তলপেটে।
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না প্রহেলিকা। ব্যথায় মুখ বিকৃত করে কোঁকিয়ে উঠল, মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল ব্যথাতুর আর্তনাদ। চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো প্রহেলিকার।
হাত থেকে রিভলবারটা ছিটকে দূরের বালিতে গিয়ে পড়ল। আরেকটা লোক ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে প্রহেলিকার রিভলবারটা কুড়িয়ে নিজের পকেটে ভরে নিল। প্রহেলিকার চোখের সামনেই প্রণয়কে তুলে নিয়ে হেলিকপ্টার আকাশে উড়িয়ে দিল তারা।
এ দৃশ্য দেখে সর্বস্ব হারানোর বেদনায় আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল প্রহেলিকা—
— “নাহ্! আমি আবার প্রণয়কে হারিয়ে ফেলতে পারি নাহ্, প্রণয়! আমি দুনিয়া জ্বালিয়ে দেবো, শেষ করে দেবো সবকিছু।”
প্রহেলিকার সেই মরণচিৎকার মিলিয়ে গেল উত্তাল সমুদ্রের গর্ভধারিণী ঢেউয়ের মাঝে। বধূবেশে সে একা দাঁড়িয়ে রইল এই জনমানবহীন প্রলয়ক্ষেত্রে, বরাবরের মতো আজও সে সর্বহারা, শূন্য। হেলিকপ্টারের শব্দের রেশ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে মিশে গেল ঝড়ের বাতাসে।
বালির ওপর ধ্বসে পড়া পাহাড়ের মতো গুড়িয়ে পড়ল প্রহেলিকা। কিছুক্ষণের নিরবতা অতঃপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। আবার হেরে গেল সে! আগেও হেরে গিয়েছিল, এখনো হেরে গেল। আজ তো তার সমস্ত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার কথা ছিল। ভালোবাসা এত কাছ থেকেও হাতের মুঠো গলে ফস্কে গেল! এই যোজন যোজন দূরত্ব তবে কি তার আজন্মের অভিশাপ? ধরণী কাঁপিয়ে আবার চিৎকার দিয়ে উঠলো প্রহেলিকা, হুহু করে কেঁদে ওঠে বললো—
— “আল্লাহ! মন থেকে কিছু চাইলে তুমি নাকি তোমার বান্দাকে কখনো খালি হাতে ফেরাও না। তাহলে আমি কি তোমার ইবাদত করিনি? আমি কী তোমার বান্দি নাহ্? আমি কী তোমার দেওয়া ফরজ পালন করিনি? তাহলে আমার জীবনটা শূন্য কেনো? আমি জীবনে সবচেয়ে বেশি যেটা চেয়েছি, সেটাই কেন আমার কপালে জোটল না? কেন আমাকে দিলেন না?”
কান্নায় ভেঙে পড়া প্রহেলিকার কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গেল। বাতাসে ভেসে এল চেনা সেই শব্দ— আবারো হেলিকপ্টারের ব্লেডের গর্জন!
হাতের তালুতে ভেজা চোখ দুটো মুছে সে চকিতে তাকাল আকাশপানে। দূর থেকে জমাটবাঁধা কালো মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে এল দুটো কালো রঙের মিলিটারি হেলিকপ্টার। দানবীয় পাখা দুটো প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক সটান এসে থামল প্রহেলিকার ঠিক পায়ের কাছে, বালু উড়িয়ে।
প্রহেলিকা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার অবচেতন মন বলছে— এই হেলিকপ্টারের ভেতর থেকে যে নামবে, সেই তার সমস্ত চাল এক নিমিষে উল্টে দিয়েছে। তার নিখুঁত খেলাটাকে ছারখার করে দিয়েছে। এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই শরীরের সমস্ত রক্ত দপ করে মাথায় উঠে গেল প্রহেলিকার। সে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দরজার পানে।
হেলিকপ্টারের গ্লাস ডোর সশব্দে স্লাইড করে খুলে গেল। পয়েন্ট নিমোর এই লোনা সমুদ্র সৈকতে পা রাখল এক তেজস্বী রমণী। দুপুরের তপ্ত সূর্যের মতো তার রূপের জৌলুস আর আগুনের মতো দৃষ্টি।
চোখের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত রমণীকে দেখে পাথরের মূর্তির মতো ফ্রিজ হয়ে গেল প্রহেলিকা। চোখ দুটো গোল গোল করে বোকার মতো তাকিয়ে রইল সে কিছুক্ষণ।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত নারীমূর্তিটিকে স্ক্যান করল প্রহেলিকা। মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল মুহূর্তেই। সে কি অতিরিক্ত শক খেয়ে পাগল হয়ে গেছে? কিছুতেই সে হিসাব মেলছে না। সে কি ঠিক মানুষটাকেই দেখছে? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? চলন-বলন, আচরণ— কিছুই তো মেলে না!
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণী নিঃসন্দেহে তেজস্বী। আইডিয়াল ফিমেল শারীরিক গড়নে সম্পূর্ণ ফরমাল আউটফিট। গায়ে কালো শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই অব্দি চমৎকারভাবে ফোল্ড করা। ম্যাচিং ফরমাল কালো প্যান্ট। নীলাভ চোখ দুটো আপাতদৃষ্টিতে শান্ত হলেও মারাত্মক রকম বিপজ্জনক। হাঁটুর নিচ অব্দি নেমে যাওয়া লম্বা ঘন চুলগুলো উপরে তুলে নিখুঁত পনিটেল করা। মুখের সেই চিরাচরিত অবলা, ভীতু নারীসুলভ ভাবটা কোথায় যেন চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার দুই পাশে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে গোদা বিশাল স্পেশাল গার্ড।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না প্রহেলিকা। প্রথম পলকে সে ভেবেছিল হয়তো প্রিয়স্মিতা! কিন্তু ওই লম্বা চুল আর বরফের মতো চাউনি চিল্লিয়ে বলছে— এটা প্রিয়স্মিতা নয়! তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর কেউ!
— “তুই?”
প্রহেলিকার ফ্যাকাশে ঠোঁট চিরে কেবল এই একটা কথাই বের হলো, যার প্রতিটি অক্ষরে ঝরে পড়ল বিস্ময়কর কৌতূহল ও অবিশ্বাস।
— “হ্যাঁ, আমাকে তো আসতেই হতো।”
বলে প্রহেলিকার পানে আরও দু-কদম এগিয়ে গেল প্রিয়তা। তার দীপ্তিময় নীল সমুদ্র চোখে দাউদাউ করে জ্বলছে বর্ষপুরাতন ছাইচাপা এক সুপ্ত প্রতিশোধের আগুন। ক্ষোভটা বোধ হয় দশক পুরাতন।
সেই চাউনির সামান্য এক ঝলক দৃষ্টি বিনিময় প্রহেলিকার অবচেতন মনের কোনো এক কোণে অকারণেই তীব্র ভীতি অনুভূত হলো। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না!
স্বেচ্ছায় নয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রহেলিকার পা দুটো দু-কদম পিছিয়ে গেল। তার মনে হলো, শক্ত বালি বুঝি হঠাৎ চোরাবালিতে রূপ নিয়েছে এবং সে তলিয়ে যাচ্ছে অতলে…
বুক চিরে আসা ভারী ভারী নিঃশ্বাসগুলো কোনোরকমে চেপে নিজেকে ধাতস্থ করল প্রহেলিকা। নিজের ভেতরের কাঁপাকাপিকে কড়া শাসানিতে ধমকে উঠল সে—
— “হতাশায় মাথা কি একদম খারাপ হয়ে গেছে তোর? একটা সামান্য চুনোপুঁটির ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিস? তোর একটা চুলও বাঁকা করার ক্ষমতা নেই ওর! ভুলে যাস না, সি ইজ এ লুজার।”
কয়েক সেকেন্ডের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া মানসিকতাকে জোড়াতালি দিয়ে সামলে নিল প্রহেলিকা। ঠোঁটের কোণে একটা ব্যঙ্গাত্মক, কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলে সে দাম্ভিক কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল—
— “তুই আমাকে ভয় দেখাতে এসেছিস? এই প্রহেলিকা শিকদারকে? নাইস জোক!”
— “তুমি বলছো তুমি ভয় পাচ্ছো না?”
প্রিয়তার কথায় হুহু করে হেসে উঠল প্রহেলিকা।
— “আমি এই প্রহেলিকা সিকদার ভয় পাবে তোমার?”
প্রহেলিকা হাসতে হাসতে বালিতে বসে পড়েছে। কিন্তু প্রিয়তা সম্পূর্ণ নির্বিকার। সে কেবল শান্ত চোখে একটা গার্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করল। ইশারামাত্রই বালির ওপর একটা কালো ফোল্ডিং চেয়ার এনে ফেলল গার্ডটা।
ডান পায়ের ওপর বাঁ পা তুলে অত্যন্ত আরামে বসল প্রিয়তা। জংলি শিকারির মতো প্রহেলিকার শরীরের প্রত্যেকটা হাড় আর প্রতিটা জয়েন্ট সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। অথচ তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ওই বরফশীতল হাসিটা প্রহেলিকার শিরদাঁড়ায় বরফ জমিয়ে দিতে যথেষ্ট, কিন্তু সেদিকে লক্ষ্যই করলো না প্রহেলিকা।
— “ইসসসসস… আর দুটো মিনিট যদি সময় পেতাম, তাহলে আজ নিশ্চিত প্রণয় আমার হতো!”
আফসোসের সুর তুলে বিড়বিড় করল প্রহেলিকা।
— “দুটো মিনিট?”
ঠোঁট নাড়িয়ে কথাটা উচ্চারণ করতেই মৃদু হাসল প্রিয়তা। কিন্তু ঠিক পরের সেকেন্ডেই সেই হাসি বাতাসে মিলিয়ে গেল। মাধুর্যপূর্ণ মুখটা মুহূর্তেই এক পিশাচের ন্যায় বিভৎস রূপ ধারণ করল। হিংস্র কণ্ঠের ধ্বনিতে বাতাস জমে গেলো—
— “শুধু দুটো মিনিট? দুটো মিনিট কেন? দুশোটা জন্ম পেলেও আমার জিনিস আমি কাউকে নিতে দেবো না। তুই আমার প্রণয়কে কোনোদিনও পাবি না, প্রণয় কক্ষনো তোর হবে না। যা আমার, তা আমারই চিরকালের জন্য!”
এমন আচানক ভোল পরিবর্তনে মুখের হাসি উবে গেল প্রহেলিকার। সে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চারপাশটা তমসাচ্ছন্ন। সন্ধ্যা পেরিয়ে প্রকৃতিতে পুরোপুরি আঁধার নেমে এসেছে, সাগরের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এই ভৌতিক পরিবেশে প্রিয়তার এমন ক্ষ্যাপাটে কণ্ঠস্বর আরও বেশি ভারী শোনাল। কিন্তু প্রহেলিকাও কোনো অংশে কম নয়।
ক্রোধে ফেটে পড়ে কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল প্রহেলিকা—
— “সব নষ্টের গোড়া তুই! তোর জন্যই আমাকে আমার ভালোবাসা হারাতে হয়েছে। তুই আমাকে প্রণয়কে পেতে দেসনি, আমার জীবনের রাহু তুই। তোকে আমি আজ কিছুতেই ছাড়ব না!”
— “আগে তো নিজেকে বাঁচাও।”
— “মা-মানে…?”
হঠাৎ প্রহেলিকার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। বসা থেকে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল প্রিয়তা। ঝোড়ো বাতাসে তার লম্বাটে পনিটেলটা দুলে উঠল। সে হুংকার ছেড়ে ডাকল—
— “গার্ডস!”
পলক ফেলার আগেই কালো পোশাক পরিহিত লোকগুলো দুই পাশ থেকে চিলের মতো ছেঁকে ধরল প্রহেলিকাকে। মুহূর্তেই শুরু হলো ধস্তাধস্তি। প্রহেলিকার সমস্ত আত্মবিশ্বাস চোখের পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে এখানে সম্পূর্ণ একা! গার্ডগুলোর দানবীয় শক্তির সামনে তার প্রতিরোধ নেহাতই খড়কুটো।
প্রিয়তা বাঁ হাতে একটা তুড়ি বাজাতেই চারপাশে জ্বলে উঠল ফ্লাডলাইট। সেই তীব্র সফেদ রোশনীতে স্পষ্ট ফুটে উঠল প্রহেলিকার মুখের চরম আতঙ্ক। এই দৃশ্য দেখার জন্যই তো এত আয়োজন!
এক পা, দুই পা করে প্রহেলিকার সামনে এগিয়ে এল প্রিয়তা। প্রহেলিকা হতভম্ব, আশ্চর্যান্বিত। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রমণীকে সে চিনতেই পারছে না! এ কি সেই মেয়ে, যাকে সে বছরের পর বছর বোকা বানিয়ে রেখেছে? যাকে সে গুড ফর নাথিং ভাবতো?
প্রহেলিকার চোখের ভেতরের এই হর্তকর্তা প্রশ্নটা স্পষ্ট পড়ে ফেলল প্রিয়তা। তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেলো তার ঠোঁট জুড়ে। জবাবটা সে মুখেই দিলো—
— “হ্যাঁ, একদম আমিই সেই মেয়েটা, যাকে তুই দিনের পর দিন নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছিস। আমি সেই মেয়ে, যাকে ভালোবাসার অপরাধে মাকড়সার জালের মতো নোংরা ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলিস! আমিই সেই মেয়েটা, যাকে ভালোবাসার অপরাধে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সী একটা নিষ্পাপ মাসুম ছেলের জীবন, তার ভবিষ্যৎ, তার সব স্বপ্ন ছারখার করে দিয়েছিস। ভালোমতো সৎপথে বাঁচতে চাওয়া ছেলেটাকে পা ধরে টেনে অপরাধজগতের দুর্গন্ধযুক্ত গলিতে টেনে নিয়েছিস। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস, আমি সেই অভিশপ্ত নারী, যাকে ভালোবাসার খেসারত তাকে দিতে হচ্ছে তিলে তিলে। তোর মতো পিশাচরাই তাকে বাধ্য করেছিল অপরাধী হতে! আজ আমি প্রতিশোধ নেব আমার ভালোবাসার ওপর হওয়া প্রতিটা অন্যায়ের। পাই পাই করে সুদসহ বুঝিয়ে দেব অন্যায় হলে কেমন লাগে!”
বলেই হাত বাড়িয়ে দিল প্রিয়তা। ইশারামাত্রই একটা গার্ড চামড়ায় মোড়ানো ভারী একটা চাবুক তুলে দিল প্রিয়তার হাতে।
প্রিয়তার সেই জ্বলজ্বলে, খুনি চোখ দুটো দেখে ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল প্রহেলিকার শরীর। নাড়িভুঁড়ি যেন পাক দিয়ে উঠল মুহূর্তেই। চাবুকের শেষ অংশটা হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে বাতাসে একটা সপাট শব্দ তুলল প্রিয়তা।
— “অ্যাঁ… অ্যাঁহ…!”
আতঙ্কে বুকফাটা চিৎকার দিয়ে উঠল প্রহেলিকা।
প্রহেলিকার চোখ-মুখের সেই ভয় যেন প্রিয়তার প্রতিশোধপিপাসু আত্মায় ফোঁটা ফোঁটা শান্তির সুধাসম। কিন্তু এই ফোঁটা ফোঁটা শান্তিতে তার মন ভরছে না। তার পৈশাচিক সুখ চাই।
আচানক বাতাসে চাবুক ঘুরিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে প্রহেলিকার পিঠে এক ঘা বসিয়ে দিল প্রিয়তা। আক্রোশে ফেটে পড়ে সে চিৎকার করে উঠল—
— “কিন্তু আজ আমি আর সেই অসহায় নারীটি নেই, যাকে রক্ষার্থে আমার ভালোবাসা নিজের জীবনের বলিদান দিয়েছিল! আজ আমি সেই তেজস্বী নারী, যে সমাজের প্রতিটা চোখ-রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের ভালোবাসাকে ছিনিয়ে আনবে আর তোর মতো কসাইকে মৃত্যু উপহার দেবে!”
দুইবার, তিনবার, শতবার! প্রতিটা চাবুকের আঘাত আগেরটার চেয়েও বেশি নৃশংস, আরও বেশি জোরালো। প্রহেলিকার গলা ফাটানো আর্ত চিৎকারে কেঁপে কেঁপে উঠছে জনমানবহীন দ্বীপটার প্রতিটি কোণ। উঁচু উঁচু পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সেই অমানবিক চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তিনগুণ চারগুণ হয়ে। আঘাতে আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে গেল প্রহেলিকার ক্রিম রঙা মখমলে শরীর, মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল লালামিশ্রিত রক্ত।
কিন্তু সামনের প্রতিশোধ পিপাসু নারীটির কোনো ক্লান্তি নেই। সে তার সমস্ত ক্ষোভ, সমস্ত ঘৃণা উজাড় করে দিচ্ছে। প্রহেলিকার রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে প্রিয়তার শ্বেতশুভ্র শার্ট। রক্তের প্রতি যাবতীয় ভয় যেন কবেই উবে গেছে তার মন থেকে। প্রতিশোধের লেলিহান শিখায় তার পুরো শরীর তখন দাউদাউ করে জ্বলছে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাজী আর উকিল তো ভয়ে ইতিমধ্যে জ্ঞান হারানোর উপক্রম। মারতে মারতে একসময় হাঁপিয়ে উঠল প্রিয়তা।
হাতের রক্তাক্ত চাবুকটা দূরে বালিতে ছুড়ে ফেলে সে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে গেল। প্রহেলিকার খোঁপা করা চুলের মুঠি খপ করে খামচে ধরে তার মুখটা সজোরে ঠেসে ধরল ভেজা বালিতে।
বালিতে মুখ ডুবতেই দম আটকে ছটফট করতে লাগল প্রহেলিকা। সমুদ্রের লোনা জল আর কাদা তার ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ার উপক্রম। ঠিক যখন তার মনে হলো সে দম আটকে মরেই যাবে, তখন চুল ধরে তাকে এক টানে আবার ওপরে তুলে আনল প্রিয়তা।
প্রহেলিকা যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে কিছু একটা বলতে গেলেই—
ঠাস!
কানের নিচে এমন এক সজোরে চড় বসাল প্রিয়তা যে প্রহেলিকার মাথাটা ভনভন করে ঘুরে গেল।
চুলের মুঠি আরেকটু শক্ত করে খামচে ধরে সে দানবিক আক্রোশে একের পর এক চড় কষাতে লাগল—
— “এই চড়টা আমার প্রণয় ভাইকে বছরের পর বছর মানসিক অত্যাচার করার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আমাদের সাজানো সংসারটা পরিকল্পিতভাবে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আমার কাছ থেকে আমার প্রণয় ভাইকে কেড়ে নেওয়ার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আজ আমার একাত্ম ভালোবাসায় ভাগ বসানোর স্পর্ধা দেখানোর জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আমার জীবনের ছয়টা বছর নষ্ট করার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আমার জীবন ধ্বংস করার চেষ্টা করার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা আমার প্রণয় ভাইকে মানসিক যন্ত্রণা দিতে দিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ করার জন্য!”
ঠাস—
— “এই চড়টা বিগত নয় বছরের ঘটে চলা প্রত্যেকটা ঘটনার জন্য!”
প্রহেলিকা নরম গলখানি ফেটে রক্ত ঝরছে, কিন্তু প্রিয়তার হুস নেই।
— “আসলে কী বল তো? তুই যা করেছিস, তার তুলনায় এই চড়গুলো কিচ্ছু না! আমার তো ইচ্ছে করছে…”
প্রহেলিকার পুরো শরীর তখন ভেঙে চুরে চুরমার। সারা মুখে আর কাপড়ে জমাট বাঁধা রক্ত। কিন্তু এত কিছুর পরও জখম সাপের মতো ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা শয়তানি হাসি ফুটিয়ে তুলল প্রহেলিকা। ঠোঁট দিয়ে চুক চুক শব্দ তুলে বলল—
— “আমাকে মেরে ফেললেও… তুই হেরে যাবি। কারণ কাল রাতে…”
আর সহ্য হলো না প্রিয়তার। রাগের অগ্নিতে যেন ঘী পড়ল। প্রহেলিকার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে তার তলপেটে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দিল প্রিয়তা। বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনীর সাহায্যে প্রহেলিকার রক্তাক্ত চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে বরফের মতো ঠান্ডা, হিসহিসে গলায় সে ফিসফিস করে উঠল—
— “আমার কপালে কি বোকাচন্দ্র লেখা আছে? তুই কি ভেবেছিস আমি বিজনেস ম্যানেজমেন্টের স্টুডেন্ট বলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা টেকনিক্যাল কারসাজি বুঝি না? আমাকে কী তোর মতো মূর্খ গবাদি পশু পেয়েছিস? তোর পাঠানো ওই প্রত্যেকটা ছবি, প্রত্যেকটা ভিডিও যে ফেক ছিল, তা আমি প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম! তবুও ফরেনসিক টেস্ট করিয়েছি। তোর কি মনে হয় তুই আমাদের মধ্যে দ্রুত তৈরি করতে পারবি? যেদিন আমি জানতাম প্রণয় ভাই আমার নয়, সেদিনও আমি তাকে ভালোবেসেছি। আর আজ যদি সব শেষও হয়ে যেত, তবুও আমার ভালোবাসার এক চুল নড়চড় হতো না!”
মুখের সমস্ত হাসি নিভে গেল প্রহেলিকার। আঁধারে নিমজ্জিত হলো তার রক্তমাখা, ম্লান মুখখানি।
চুলের মুঠি ধরে অতর্কিতে তার গলা টিপে ধরল প্রিয়তা। অমানবিক শক্তিতে রুদ্ধ হয়ে এল প্রহেলিকার শ্বাসনালী। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখ উল্টে গেল তার। ভেজা কর্দমাক্ত বালিতে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করল সে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের হতে চাইল, কিন্তু সে আওয়াজ প্রিয়তার পাথরের মতো শক্ত মন পর্যন্ত পৌঁছালে তবে তো। প্রিয়তার আঙুলের ধারালো নখগুলো ধীরে ধীরে চামড়া বেদ করে প্রহেলিকার শ্বাসনালীর গভীরে দেবে যাচ্ছে, তখন সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে প্রিয়তা—
— “তুই আমার সাথে অনেক গেম খেলেছিস। এবার আমার পালা। চিন্তা করিস নাহ্ এত সহজে মরতে দেবো না তোকে। মরণ তোর জন্য মুক্তি আর আমি তো তোকে মুক্তি পেতে দেবো নাহ্ বেঁচে থাকবি তুই। প্রতিটা সেকেন্ডে উপলব্ধি করবি কেবল নিঃশ্বাস ফুরিয়ে যাওয়াই মৃত্যু হয়। বরং আসল মৃত্যু সেটা সেখানে প্রাণ থাকে কিন্তু জীবনের আনন্দ থাকে নাহ্। প্রতিটি সেকেন্ডে তিলে তিলে মরবি তুই! যন্ত্রণায় তড়পাতে তড়পাতে মরবি আর আমি পৈশাচিক সুখ নিয়ে তা দেখবো।”
আবারও মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে ছেড়ে দিল প্রিয়তা। মুক্তি পেতেই দু’হাতে গলা চেপে ধরে কাশতে কাশতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো প্রহেলিকা। কফের সাথে গলা চিড়ে রক্ত উঠে আসছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে দম আটকে থাকায়।
প্রিয়তা গার্ডের দিকে তাকাতেই সে ফোল্ডিং কালো চেয়ারটা এনে রাখলো প্রিয়তার সম্মুখে। চাবুক চালাতে চালাতে সে ক্লান্ত—বিশেষ করে তার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় ক্লান্তিটা একটু বেশিই জেঁকে বসেছে। পায়ে পা তুলে অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে বসল প্রিয়তা। কপালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া মুক্তোর মতো বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা মুছে সে ঠান্ডা চোখে প্রহেলিকার ছিন্নভিন্ন অবয়ব দেখতে লাগল।
বালির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে প্রহেলিকা। আরেকটু হলেই যেন প্রাণটা বেরিয়ে যেত। প্রিয়তা আয়েশ করে দেখছে প্রহেলিকার এই অবস্থা। এবার যেন তার মনে একটু শান্তি লাগছে।
গার্ডেকে আবারো গলা ছেড়ে ডাকলো প্রিয়তা। সাথে সাথেই একটা গার্ড এসে ওয়াটারমেলনের জুস ভর্তি কুল্ড গ্লাস জার এনে প্রিয়তার হাতে ধরিয়ে দিলো।
প্রিয়তা জুস ভর্তি জারের স্ট্রটা মুখে ঢুকিয়ে আরাম করে সিপ দিলো। ঠান্ডা ঠান্ডা জুস পেটে পড়তেই যেন শরীর জুড়িয়ে গেলো।
প্রিয়তা হাতের তর্জনী তুলে প্রহেলিকার পানে তাক করলো। কিছু ভাবার ভঙ্গিতে বললো—
— “তোমার জ্বালাটা কোথায় আমি বুঝতে পারি? বিয়ে করার খুব সখ তোমার তাই না বড় আপা? তাইতো আমার জামাইকে একলা পেলেই শকুনের মতো হামলে পড়ো। শরীরে খুব রস।”
কিন্তু প্রহেলিকার তরফ থেকে কোনো জবাব এলো না। তাই প্রিয়তা নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তরে মুখ দুঃখী করে ফেললো চরম হতাশা নিয়ে বললো—
— “আহারে, আর হবেই না বা কেনো? ৩২ বছরের কচি ভার্জিন কুমারী। মাথা তো নষ্ট হবেই। এখন আমি ছোট বোন হিসেবে আমার তো একটা দায়িত্ব আছে—বড়ো বোনের একটা গতি করা। কী বলো?”
প্রিয়তার কথা কর্ণকুহরে পৌঁছতেই শিউরে উঠলো প্রহেলিকা। বেহেশ করার মতো শারীরিক কিংবা মানসিক কোনো জোরই নেই গায়ে। এর মধ্যেই প্রিয়তার কণ্ঠ আবার কানে এলো—
— “উহ, তোমার জন্য এখন এই মাঝ সমুদ্রে উপযুক্ত পাত্র কোথায় পাই? যদিও তোমার যৌবন-জ্বালা অনেক। যে সে পুরুষের কর্ম নয় তোমাকে সামলানো।”
গালে হাত দিয়ে প্রিয়তা যেন গভীর ভাবনায় পড়ে গেলো। সে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে গার্ডদের ভালো মতো দেখতে লাগলো। সব কটা গার্ড ২৫-৪০-এর মধ্যে, লম্বা-চওড়া, তাগড়া। এসব পছন্দ হলো না প্রিয়তার। নাক সিটকালো।
হতাশ হতে নিলেই হটাৎ এক কোণে চোখ পড়ে গেলো প্রিয়তার ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি খেলে গেলো তৎক্ষণাৎ। ফট করে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রিয়তা। উচ্ছ্বসিত মেজাজে বললো—
— “কংগ্রাচুলেশন বড়ো আপা! তোমার জন্য রাজজুটক খুঁজে পেয়েছি।”
প্রিয়তার হাবভাব দেখে ভড়কে গেলেন সত্তরোর্ধ্ব কাজী। বেচারা লোকটা বেশ বুঝতে পারছে সে আচ্ছা গ্যাড়াকলে ফাঁসতে চলেছে। তিনি ভয় ভয় উকিলের আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করলেও কাজে দিলো না। চোখের পলকে প্রিয়তা পৌঁছে গেলো তার সামনে। প্রিয়তাকে আপদমস্তক দেখে ভয়ে চুপসে গেলেন কাজী। এই জীবনে কত শত মাইয়্যা দেখেছেন, কিন্তু এমন মাইয়্যা না বাবা, না।
প্রিয়তা সটান প্রশ্ন করলো—
— “কী কাজী সাহেব, আমার সুন্দরী রূপবতী যুবতী বড়ো বোনকে আপনার পছন্দ বিয়ে করতে চান? এমন সুন্দর বউ নিশ্চয়ই আপনার ঘরে নেই।”
প্রিয়তার পানে এক নজর তাকিয়ে বোকা বনে গেলো লোকটা মাইয়াডা বলে কী? একটা শুষ্ক ঢোক গিললো কাজী। বেকায়দায় পড়ে গিয়ে আমতা আমতা করতে লাগলেন। বউ তো একটা তার ঘরে আছেই। এরকম রণচণ্ডী না হলেও সুপারিবীজ থেতলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কাজীকে প্রশ্নের জবাব না দিতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো প্রিয়তা। গার্ডের দিকে তাকাতেই গার্ড নিজের পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে প্রিয়তার হাতে দিলো।
বন্দুক দেখেই হালুয়া টাইট কাজীর। হাঁটুর মালাই চাকি কাঁপতে লাগলো থরথর করে।
প্রিয়তা হাতের রিভলবারটা এপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে বন্দুকের মাথায় ফুঁ দিলো আলতো করে। কাজী সাথে সাথেই পায়ে পড়ে গেলো প্রিয়তার। কাকুতি-মিনতি করে বলতে লাগলো—
— “আম্মাজান, আমাকে মারবেন না। দয়া করে…”
রিভলবারের ধাতব ঠান্ডা নলটা কাজীর চোখের পাশে ঠেসে ধরলো প্রিয়তা। শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠে বললো—
— “মারবো না এক শর্তে।”
— “ক-ক-কী?”
— “বিয়ে করতে হবে। জাস্ট সে ইয়েস ওর নো।”
— “ক-কিন্তু…”
— “সে ইয়েস ওর নো!”
চেঁচিয়ে উঠলো প্রিয়তা। ধমকের সাথে এবার কাঁপতে কাঁপতে কাপড়ে চুপড়ে হয়ে গেলো কাজীর। জ্বলে কুমির ডাঙায় বাঘ—থুড়ি, ঘরে বউ আর বাইরে বাঘিনী।
— “ইউ সে ইয়েস তাহলে একটা যুবতী বউ আর ৫০ কোটি টাকা ক্যাশ। এন্ড ইউ সে নো তাহলে…”
— “রাজি! রাজি! আমি রাজি!”
বিজয়ী হাসলো প্রিয়তা।
— “দেটস গ্রেট।”
সরে গেলো প্রিয়তা। কাজী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু প্রহেলিকা ও যে কী চিজ সেটাও তো দেখা হয়ে গেছে কাজীর। আর ঘরেরটা দুটোর কথা একসঙ্গে ভাবতেই কলিজার পানি শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে বগেলো কাজীর। সে হাত তুলে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানালো—
— “জীবনটা বুঝি এভাবেই শেষ হওয়ার ছিলো, মাবুদ? আমার দ্বারা কী এমন পাপ হয়েছিল যে আমার জীবনে নারী না পাঠিয়ে আজাব পাঠিয়েছ বারবার।”
গার্ডদের ইশারা দিতেই গার্ডরা টেনে হিঁচড়ে কাজীর সামনে নিয়ে এলো প্রহেলিকাকে।
প্রিয়তার হাতে এবার আর চাবুক নেই, বরং হকিস্টিক। এই হকিস্টিকের একটা বাড়ি খেলে আর দেখতে হবে না।
প্রহেলিকার সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসলো প্রিয়তা। আঙুলের সাহায্যে হকিস্টিক ঘোরাতে ঘোরাতে বাঁকা হেসে বললো—
— “বড়ো আপা, তোমার জন্য কচি হ্যান্ডসাম নাশপাতির মতো বর খুঁজে এনেছি। একদম দীনদার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী, লাভিং, কেয়ারিং, কালা রোমান্সও ভালোই করবে—সর্বগুণসম্পন্ন প্যাকেজ। দেখো তো পছন্দ হয় কিনা।”
বুড়ো কাজীর দিকে তাকানোর রুচি হলো না প্রহেলিকার। রাগে শরীর জ্বলে গেলো। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি যুগিয়ে তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠে বললো—
— “আমার সাথে মজা করছিস। ফল কিন্তু খুব খারাপ হবে, প্রিয়। আজকের দিনটা আমি ভুলবো না।”
— “আহা, কত ভাবো আমার কথা! এই জন্যই তো তোমাকে এত ভালোবাসি। এবার ঝটপট বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাও তো দেখি। নাহলে…”
প্রিয়তার কথার ধরনের কৌতুকের আড়ালের হুমকিটা স্পষ্ট দেখতে পেলো প্রহেলিকা। কিন্তু জীবন দিয়ে দেবে, প্রণয় ব্যতীত অন্য কাউকে বিয়ে করবে না।
পাশের উকিল মিনমিন করে বললো—
— “ম্যাডাম, যদি অভয় দেন একটা কথা বলি…”
উকিলের দিকে ঘুরে তাকালো প্রিয়তা।
— “তুমিও বলবে? আচ্ছা বলো, শুনি।”
— “বলছিলাম কী ম্যাডাম, এখানে কাজীর যদি বিয়ে হয় তাহলে বিয়ে পড়াবে কে?”
— “হুম, গুড পয়েন্ট। এতো দারুণ চিন্তার বিষয়। সত্যি তো, এখানে কাজী সাহেব নিজেই যদি পাত্র হন তাহলে বিয়ে পড়াবে কে? এতো আচ্ছা মুশকিল হলো।”
— “আমার কাছে কিন্তু সমাধান আছে, ম্যাডাম!”
— “তাই নাকি? বলো বলো।”
— “আসলে ম্যাডাম…”
হাত চুলকাতে চুলকাতে আমতা-আমতা করতে লাগলো লোকটা।
প্রিয়তা গার্ডের দিকে তাকাতেই পাশের গার্ড বুকপকেট থেকে একশো ডলারের বান্ডিল বের করে প্রিয়তার হাতে দিলো।
টাকার বান্ডিলটা উকিলের দিকে ছুঁড়ে মারলো প্রিয়তা। সাথে সাথেই উকিল লোকটা গড়গড় করে বলতে লাগলো—
— “ম্যাডাম, আমি বিয়েও পড়ানো জানি। আমি রেজিস্ট্রিও করে দেবো। শরিয়া মোতাবেক বিয়েও পড়িয়ে দেবো।”
হাসলো প্রিয়তা।
— “গুড।”
— “তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস, প্রিয়।”
এবার হাতের রিভলবারটা প্রহেলিকার কপালে ঠেসে ধরলো প্রিয়তা। খুব শান্ত কণ্ঠে ধমকে বললো—
— “একদম চুপ, স্লাট শালী। তুই আমার স্বামীর সাথে শোয়ার চেষ্টা করেছিলি। তোর অনেক চুলকানি। আমার মন চাচ্ছে না তোকে বিয়ে দিতে আমার মন চাচ্ছে বারো বেটা দিয়ে তোর যৌবনের সব রস চিপে নিতে, সব জ্বালায় পানি ঢেলে দিতে। কিন্তু আমি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে এটা করতে পারি না। আবার আমাদের সাথে যা করেছিস তার জন্য মন চাচ্ছে এই সমুদ্রের পাড়ের বালিতে দাফন দিয়ে চলে যেতে। কিন্তু আমি এটাও করবো না। কারণ মরে গেলে তুই মুক্তি পেয়ে যাবি। উপলব্ধিই করতে পারবি না আমাদের সাথে কী করেছিস। তাই তোর জন্য উপযুক্ত শাস্তি—এই বুড়ো ভামের বউ হয়ে থাকা। শুতে তো পারবি, কিন্তু শান্তি পাবি না। আর এটাই তোর উপযুক্ত শাস্তি। এবার বল—বিয়ে করবি নাকি? জাস্ট দুটো বুলেট তোর মগজে ঢুকিয়ে দেবো। চুজ ওয়ান।”
প্রহেলিকা হাতের মুঠো শক্ত করে নিলো। বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকালো প্রিয়তার দিকে। মনে মনে শপথ করলো—আজকের মূল্য তোকে জীবন দিয়ে চুকাতে হবে, প্রিয়তা।
হাতের ওয়াচটার দিকে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বললো প্রিয়তা—
— “জাস্ট ফাইভ পর্যন্ত কাউন্ট করবো।
ওয়ান…
টু…
থ্রি…
ফোর…
ফাইভ…”
চোখ খিঁচে কাপড় মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে পড়লো প্রহেলিকা। যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত। প্রিয়তা চোখ ছোট ছোট করে তাকায়, বাঁকা হাসে। উচ্চস্বরে হাক ছাড়ে—
— “জ্যাকসন!”
— “ইয়েস ম্যাম।”
প্রায় সাত ফুট উচ্চতার বিশালদেহী কালো কুচকুচে ফরেনার গার্ড জ্যাকসন ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে অপেক্ষা করতে লাগল মালকিনের হুকুমের।
প্রিয়তা তর্জনী দিয়ে প্রহেলিকাকে চিহ্নিত করে বরফশীতল কণ্ঠে আদেশ দিল—
— “আমার শ্রদ্ধেয় বড়ো আপুকে তুলে সমুদ্রের মাঝে নিয়ে যাও। তারপর গুনে গুনে এক হাজার বার পানিতে চুবিয়ে ধরবে। প্রতিবার যখন দেখবে নিঃশ্বাস আটকে মরে যাওয়ার উপক্রম, তখন তুলবে। আবার ডুবাবে। এভাবে থাউজেন্ড টাইম রিপিট। গট ইট?”
— “ওকে ম্যাম।”
ধরফরিয়ে চোখ মেলে তাকাল প্রহেলিকা। তার ভয়ার্ত দৃষ্টি বিদ্ধ করল প্রিয়তার পানে। এই শরীর এত অত্যাচার সইবে কী করে? সে টু শব্দ করারও সুযোগ পেল না; জ্যাকসন খড়ের তোলার মতো তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সমুদ্রের দিকে হাঁটা ধরল।
প্রহেলিকা হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করল, কিন্তু জ্যাকসনের পাথরের মতো শরীরে তার কোনো প্রভাবই পড়ল না। অনুগত যন্ত্রের মতো সে সাগরের লোনা পানিতে প্রহেলিকার মাথাটা চুবিয়ে ধরতে লাগল।
পৈশাচিক তৃপ্তি সহকারে পুরো দৃশ্যটি উপভোগ করতে লাগল প্রিয়তা। কিন্তু শুধু দাঁড়িয়ে থাকাটা তার কাছে একটু একঘেয়ে মনে হলো। সে গার্ডের উদ্দেশ্যে হাক ছাড়লো—
— “ওয়ান পপকর্ন।”
— “ইয়েস ম্যাম।”
দুই মিনিটের মাথায় পপকর্নের ছোট্ট প্লাস্টিক বাকেট নিয়ে হাজির হলো এক গার্ড। প্রিয়তা অত্যন্ত আরাম করে পপকর্ন মুখে পুড়তে পুড়তে কোনো থিয়েটারের স্ক্রিন দেখার মতো পুরো টর্চারটা উপভোগ করতে লাগল। মাঝে মাঝে জ্যাকসনকে ইশারা দিয়ে স্পিড বাড়াতে বা কমাতে নির্দেশ দিচ্ছে।
১০০০ বার চুবানোর পর যখন প্রহেলিকার অবস্থা একেবারে তেনা তেনা, তখন প্রিয়তা হাত নাড়ল—
— “তুলে নিয়ে এসো।”
জ্যাকসন তাকে টেনে তুলে বালিতে ফেলল। প্রিয়তা সরু চোখে প্রহেলিকাকে পরখ করল। উহু, জেদ এখনো মরে নি! সে ঠান্ডা মাথায় পরবর্তী হুকুম দিল—
— “ওই সামনের অশ্বত্থ গাছে উল্টো ঝুলিয়ে শুকাতে দাও পনেরো মিনিট। গায়ের সারা রক্ত মাথায় এসে জমা হলে নামাবে।”
যেমন কথা, তেমন কাজ। কিন্তু এতকিছুর পরও প্রহেলিকার মুখ থেকে একটা গোঙানি ছাড়া কোনো আপসের সুর বের হলো না।
শেষমেশ লাস্ট পপকর্নটা মুখে পুরে দিয়ে উঠে দাঁড়াল প্রিয়তা। তার চেহারায় চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতার ছাপ—
— “আর কী করবে? ও যখন আমার প্রস্তাবে রাজী হবেই না, তখন এই সমুদ্র তটেই পুতে দাও! জঞ্জাল পরিষ্কার না করলে আমার জীবনেই আবার বিপদ আসবে।”
গার্ডরা এক মুহূর্ত দেরি করলো না; ঝটপট বালু সরিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলল। এরপর প্রহেলিকাকে আবর্জনার মতো সেই গর্তে ফেলে ওপর থেকে মাটি চাপা দিতে শুরু করল। মাটি যখন তার নাক মুখের উপরে উঠে আসছে, দম আটকে আসার সেই চরম মুহূর্তে আর টিকতে পারল না প্রহেলিকা। আর্তনাদ করে উঠল—
— “রাজি! রাজি! আমি রাজি!”
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলল প্রিয়তা। সে এগিয়ে গিয়ে প্রহেলিকার চুল ধরে টেনে তুলল গর্ত থেকে। ব্যঙ্গ করে বলল—
— “এই তো গুড গার্ল! প্রাণের মায়া বড় মায়া। তুমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়, আমি তোমাকে আমার প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসি, তুমি আমার কিডনি, লিভার, গুড়দা, ফুসফুস সব! কিন্তু প্রমাণ করার বেলায় সবাই নিজেকেই ভালোবাসে। কেউ থোড়াই না আমার প্রণয় ভাই হতে পারবে!”
এরপর প্রহেলিকাকে টেনেহিঁচড়ে আবার সেই বিয়ের আসরে বসানো হলো। উকিল ইশারা পেয়ে কাজীর দিকে তাকাল। বেচারা কাজী ঘরের বউয়ের ভয়ে ইতিমধ্যে কালিমা পড়া শুরু করে দিয়েছেন।
উকিল সাহেব কাজীর কানে বললো—
— “আপনার নাম, বাবার নাম, কোথায় থাকেন, সব বলেন মিয়া।”
কাজীর ভয়ার্ত অবস্থা বেশ মায়াই হলো উকিলের, কিন্তু কিছু বলার দুঃসাহস করলে পরে দেখা যাবে তাকেই বলির বখরা বানিয়ে দেবে। তাই চাচা আপন জান বাঁচা।
কাঁপা কাঁপা হাতে কোনোমতে রেজিস্ট্রি খাতার ফর্মালিটি শেষ করলেন কাজী। এবার বিয়ে পড়ানো শুরু হলো—
— “রায়পুর নিবাসী সম্মানিত খালিদ শিকদারের সুযোগ্য কন্যা প্রহেলিকা শিকদারের সহিত… বারইপুর নিবাসী জনাব সুরমান আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী কাশেম আলীর সহিত… দশ লক্ষ এক টাকা ধার্য করিয়া… আপনি কী এই বিবাহে সম্মত আছেন? সম্মত থাকলে আলহামদুলিল্লাহ কবুল বলুন।”
প্রহেলিকা কেবল একবার রক্তচক্ষু দিয়ে তাকাল প্রিয়তার দিকে। অতঃপর চোখ বন্ধ করে বড় একটা নিশ্বাস নিল। অতঃপর এক শ্বাসে তিনবার বলে দিল—
— “কবুল, কবুল, কবুল।”
বিজয়ী হাসল প্রিয়তা। একই নিয়মে কাজীর সাথে প্রহেলিকার বিয়ে সম্পন্ন হলো। উকিল সাহেব একটা শুকনো কাশি দিয়ে বললেন—
— “মাশাল্লাহ, আজ থেকে শরীয়ত মোতাবেক আপনারা স্বামী-স্ত্রী… আল্লাহ আমাদের নেক হায়াত দিক। সুখে শান্তিতে ভরে থাকুক আপনাদের সংসার।”
উকিলের দিকে এমন দৃষ্টি দিলো প্রহেলিকা, লোকটা কথা গলায় পেঁচিয়ে ভয়ে একদম সেঁধিয়ে গেল ভেতরে।
৩২ বছরের আটকে থাকা শুভ কাজটা অবশেষে সম্পন্ন হলো। সবাই বলুন আমিন। কৌতুক করে বললো প্রিয়তা। সকলে একত্রে উচ্চারণ করল—
— “আমিন।”
বিজয়ী হাসল প্রিয়তা। প্রহেলিকার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো—
— “তোমার নরক যাত্রা শুভ হোক মিসেস প্রহেলিকা শিকদার। উপস বিবাহিত জীবন! তোমাকে আমার পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভ কামনা। ছোট বোন হয়ে বড়ো বোনের এতো বড়ো কাজ উদ্ধার করে দিলাম। আমাকে কিন্তু মোটেও ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে ঘর কন্যা করো। আমি এতেই হ্যাপি। আজকে তাহলে আসি।”
কথার প্রত্যুত্তরে টু শব্দ করলো না প্রহেলিকা। কথা সম্পন্ন করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়তা। প্রিয়তাকে যেতে দেখে উকিল সাহেব আতকে উঠলেন—
— “ম্যাডাম আমাকে নেবেন না?”
— “ঠিক আছে আসুন।”
— “ম্যাডাম আমরা কিভাবে যাবো?”
কাজীর অসহায় কণ্ঠ।
হাসলো প্রিয়তা। এগিয়ে গিয়ে কাজীর শুকনো ঝুলে যাওয়া গালগুলো টেনে দিয়ে বললো—
— “আরে আরে দুলাভাই, ম্যাডাম ডাকেন কেনো? আমি আপনার ছোট্ট শ্যালিকা। আপনি আমাকে প্রিয় বলে ডাকবেন কেমন?”
জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলো কাজী। তুতলিয়ে বললো—
— “জ্বী অবশ্যই।”
— “দুলাভাই, আপনাদের জন্য একটা হেলিকপ্টার আমি রেখে যাচ্ছি।”
বলেই ঘুরে যেতে নিলো প্রিয়তা। দু পা এগিয়ে ফের থেমে গেলো। আবারো প্রহেলিকার কাছে এসে নরম কণ্ঠে শাসিয়ে বললো—
— “এখানে যা কিছু হয়েছে তার এক বর্ণও যদি বাহিরে যায় বা প্রণয় ভাই যদি কিছু জানতে পারে, তাহলে তোমার বিয়ের সুন্দর ফুটেজটা, হ্যাঁ হ্যাঁ এই বিয়ের ফুটেজগুলো প্রথম আলোয় হেডলাইন হবে। নিউজ চ্যানেলগুলোর হট টপিক হবে। টক অফ দা টা, উহু টক অফ দা কান্ট্রি হয়ে যাবে তোমার খবর। খবরের কাগজে বড়ো বড়ো করে হেডলাইন বের হবে। নিউজ চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ। আজকের তাজা খবর—প্রয়াত এসকে গ্রুপের বোর্ড মেম্বারদের একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস খালিদ শিকদারের সুযোগ্য কন্যা, স্বনামধন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা প্রহেলিকা শিকদারের গোপন বিয়ে, কার সাথে…”
এইটুকু বলেই শয়তানি হেসে চলে গেলো প্রিয়তা। প্রহেলিকার চোখ মুখ লাল। তবে রাগে কিংবা অপমানে নয়। প্রতিশোধের দাবানলে। রাগটা চিবিয়ে গিলে নিলো প্রহেলিকা। ক্রুর কণ্ঠে বলল—
— “আজকের দিনটা তোমার ছিলো মিসেস তনয়া শিকদার প্রিয়তা। কালকের দিনটা আমার হবে। এবার পালা তোমার হবে মিসেস তনয়া শিকদার প্রিয়তা।”
— “এটা কোন জায়গা, আমি কী জানতে পারি শুদ্ধ?”
শুদ্ধের মুখের উপর কোসন ছুঁড়ে মেরে কপট রাগ দেখিয়ে বললো প্রণয়।
— “তোকে কী বলবো, আমি নিজেই জানি না।”
শুদ্ধ ভাবলেহীন বিছনায় গা এলিয়ে পড়ে আছে আর মুখের উপর কালো কালো আঙ্গুরের থোকা ঝুলিয়ে একটা একটা করে মুখে পুড়ছে। ওর এত দায়সারা ভাব দেখে গা জ্বলে গেলো প্রণয়ের। তেড়ে এসে লাথি মারলো পিঠে।
সাথে সাথেই মুখ থুবড়ে বিছানার নিচে উল্টে পড়লো শুদ্ধ। ব্যাথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেলো। আপনাপনি দুই হাত নিচে চেপে ধরে দাঁত খিঁচিয়ে বললো—
— “শাউয়ার নাতি! আমার ভবিষ্যতের বাতি ফিউজ করে দিলো ও মম গো!”
কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে শুয়া থেকে টেনে হিঁচড়ে তুললো প্রণয়। দাঁত কটমট করে বললো—
— “আরেকটা লাথি মারলে চিরতরে অন্ধকার হয়ে যাবে। এটা কোন জায়গা, ঝটপট বল। আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে আমার জানের কাছে। না জানি কোন বিপদে আছে। ওর যদি সামান্যতম বিপদ হয়, আমি তোকে সেদ্ধ না করেই চিবিয়ে খাবো।”
— “ছিহ ‘গে’ শালা, দূরে সর আমার থেকে। তোর নিয়ত ভালো নাহ্, তুই আমাকে খেতে চাস। ছি ছি, কী সাংঘাতিক! কতো রাত তোর সাথে আমি ঘুমিয়েছি মানে…”
— “মশকরা করছিস, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি মেরে দেবো।”
— “আহা কী আনন্দের কথা! তোমার পা আছে আর আমার পা নেই? আমিও লাথি মেরে তোমার বাতি অন্ধকার করে দেবো, তুমিও ফিউজ, আমিও ফিউজ। হাম তো ডুবেঙ্গে সানাম, মাগার তুমকো সাত লেকে ডুবেঙ্গে।”
— “দেখ, আমার কিন্তু মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ও প্রেগন্যান্ট। সামান্য আঘাত ওর জন্য অনেক বড়ো হতে পারে। আমার বউ-বাচ্চার ক্ষতি হবে।”
প্রণয়ের হাত থেকে কলার ছাড়িয়ে নিল শুদ্ধ। সটান শুয়ে পড়লো বিছানায়। লম্বা হাই তুলে বললো—
— “কোনো বালই হবে না। চুপচাপ হালকা মুতে শুয়ে পড় আর তোর বউ এলে এমন ভান ধরবি যেনো এই মাত্র পৃথিবীতে ল্যান্ড করেছিস। একদম কিচ্ছু বুঝিস নাহ্। তোর মত বোকাচন্দ্র আর একটাও নেই।”
এবার মেজাজ হারালো প্রণয়। ঘরটা চারদিক থেকে বন্ধ। একটু যে বাহিরে যাকবে তার কোনো উপায় নেই।
প্রণয় পা ধরে ধরাম ধরাম করে নিচে ফেলে দিলো শুদ্ধকে। মুহূর্তেই দুজনের মধ্যে কিলাকিলি শুরু হয়ে গেলো।
দুজনে মারামারি করছিল এমন সময় দরজার হাতল ঘোরার শব্দে থেমে গেলো দুজন। ভ্রু কুচকে একে অপরের দিকে তাকালো।
মুহূর্তেই বুঝে গেলো দুজন। তড়াক করে মেঝে থেকে উঠে পড়লো। শুদ্ধর মুখের প্রাণোচ্ছল হাসিটা ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করলো। সে প্রণয়ের সামনে মিথ্যে হাসির অভিনয় করতে চায় না। তাই দরজা খুলতেই বেরিয়ে গেলো শুদ্ধ।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৫
প্রণয়ের বুকে যেনো চৈত্রের খরা লেগেছে। অকাতর নয়নজোড়া তৃষ্ণার্ত চোখে দরজার পানে তাকিয়ে আছে কাঙ্ক্ষিত মুখখানি দেখার আকাঙ্খায়।
প্রণয় দেখার সামান্যতম সময়টুকু পেলো না। পলক ঝাপটানোর পূর্বে প্রবল সুনামির ন্যায় তপ্ত বুকের পাঁজরে আঁচড়ে পড়লো তুলতুলে একখানি নরম সত্তা। আরামের তোড়ে আপনাপনি চোখ দুটো বুঝে আসে প্রণয়ের। হাত দুটো আপনাআপনি চলে যায় পিঠে, আরো শক্ত করে বুকের মাঝে পিষে ধরে ননী মাখনের দেহখানা। ঠোঁট কাঁপে। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে একটা শব্দ—
— “জান।”
