দুইজনাতেই পর্ব ৪৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“আমার সত্যিই অনেকদিন পর অনেক ভালো ঘুম হয়েছে মিসেস এহসান। আপনার কিন্তু দুটো চুমু অবশ্যই প্রাপ্য।”
দ্বিতী চাইল। সাক্ষ্যর মুখে ফুটে উঠেছে হাসি৷ ঠোঁট বাঁকানো৷ দ্বিতী উত্তর না করেই নজর সরাল। অতঃপর উঠে বসতে নিতেই সাক্ষ্য আচমকাই হাত টেনে ধরল। দ্বিতীর দিকে ঝুঁকে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“এমন ইগ্নোর করেন কেন? বলেছি না আপনার ইগ্নোর হজম করতে পারি না আমি। বদহজম হয়। ”
দ্বিতী কপাল কুঁচকে নিল। ঠান্ডা সরে বলল,
“ইগ্নোর করছি না। আমার শরীর মেঝমেঝ করছে সাক্ষ্য। ওয়াশরুমে যাব। ছাড়ুন। ”
“এমন নির্লিপ্ত আচরণ আমার সাথে কেন দ্বিতী? আমাকে আপনার এই নির্লিপ আচরণ পোড়ায়। ”
“ আপনার সাথে না৷ আমি সংসারী হওয়ার চেষ্টা করছি। উড়নচন্ডী স্বভাবের হয়ে তো সংসার করা যাবে না। স্বামীর ঘর করাও যাবে না। বাচ্চা মানুষ করাও যাবে না। আগে আমায় ম্যাচিউরড মেয়েদের মতো হতে হবে। তারপর কোমড়ে আঁচল গুঁজে সংসার ধরতে হবে। ”
”লাগবে না সংসার ধরা। আগে স্বামীকে ধরুন মজবুত হাতে। স্বামী ফসকে গেলে বাচ্চা তো দূর সংসারও পাবেন না। ”
“ ফসকে যেতে কি নিষেৎ করা হয়েছে? আমি তো আপনাকে সরাসরিই বলেছি ফসকে যেতে চাইলে আমি বাঁধা দিব না। বরং নিজেই আয়োজন করে আরো দ্বিগুণ আনন্দে উপভোগ করব। ”
“ কেন করবেন? ”
দ্বিতী শীতল স্বরে চেয়ে জানাল,
”মানুষের বিয়েতে আনন্দিত হওয়া উচিত তাই। প্রথমবার নাহয় অনিচ্ছা দেখিয়ে বিয়েটা করেছিলাম দ্বিতীয়বার হেসেখেলে করবেন। যাতে দ্বিতীয় বউয়ের মনে তার অবস্থান সম্পর্কব শঙ্কা না তৈরি হয়। ”
সাক্ষ্য চেয়ে থাকল। তারপর আচমকায় দ্বিতীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দূরত্ব গুঁছিয়ে বলল,
“কয়বার বলব অনিচ্ছাতে বিয়ে করিনি? কয়বার বললে বিশ্বাস হবে যে ভালোবেসেই তোমাকে বিয়ে করেছি। শুধু নিজের অহংবোধ বজায় রাখতে স্বীকার করিনি। আর এখন এতবার স্বীকার করেও বিশ্বাস করছো না দ্বিতী। ঐটুতু দ্বিতী.. ঐটুকু মেয়েটা আজ কেমন বড়বড় ভাব দেখাচ্ছে। কে বলেছে এত বড়বড় ভাব দেখাতে?”
দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে। উত্তর দিল,
“ সাক্ষ্য..সরুন। ওয়াশরুমে যাব আমি… ”
সাক্ষ্য এবারে সরতে নিল। কিন্তু সরতে নিয়েও আবার একইভাবে ঝুঁকে দ্বিতীর কপাল থেকে চুল সরাল। অতঃপে নিজের ওষ্ঠদ্বয় দ্বিতীর কপালে বার দয়েক ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“হে আল্লাহ, আমার এবং আম্মুর বান্ধবীর মেয়ের সম্পর্কটা আগের মতো করে দাও। আমিনননন!”
শেষের শব্দটা একটু টেনেই বলল সাক্ষ্য। দ্বিতী কেবল ফ্যালফ্যাল করে চাইল। অতঃপর সাক্ষ্যর আরো একটা ওষ্ঠ স্পর্শ বসিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ দ্বিতী? আমিন বলো। ”
দ্বিতী বলতে নিয়েও থেমে গেল। সাক্ষ্য তখন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“দ্বিতী? আর কতোটা অপেক্ষা করব? কতোটা অপেক্ষা করলে আমার হৃদয়ে সুখ নামবে? কতোটা অপেক্ষা করলে তুমি আমাকে আর ইগ্নোর করবে না? বলো..কতোটা অপেক্ষা করলে তুমব আমায় আগের মতোই ভালোবাসবে? ”
দ্বিতী চাইতে পারল না সাক্ষ্যর মুখের দিকে। শুধু বলল,
“ আমার আর অল্প কিছু কাজ শেখা বাকি আছে। সব কম্প্লিট হয়ে নিলেইএকসাথে সংসার শুরু করব। ”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। দ্বিতীর চোখে চোখ ফেলে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” লাগবে না সংসার করা৷ আমি সংসার করতে চাই না। শুধু চাই তুমি আগের মতোই আমাতেই মেতে থাকো। আজকাল তো তোমার মস্তিষ্ক আমায় পৃথিবীতে আছি বলেই হয়তো গোণায় ধরে না..”
দ্বিতী উত্তর দিল না৷ সাক্ষ্য উত্তর না পেয়েই আবার তাকায়। বলে,
“ কাজ শেখা লাগবে না তোমার। আমি শিখে নিব ইউটিউব দেখে। প্রমিজ, আমাদের বাচ্চা হলেও বাচ্চা পালার দায়িত্ব আমি নিব৷ কাঁথা পরিষ্কার করাটাও নাহয় শিখে নিব৷ তোমার কাজ শুধু আমাকে ভালোবাসা ওকে? আর কিচ্ছু নয়। ”
“তুমি তুমি করছেন হঠাৎ। ”
“ ছোট থেকে তো তুমি তুমিই বলি, বলতাম। শুধু বিয়ের পর ওয়াইফ হিসেবে রেসপ্যাক্ট দিয়েছিলাম। কিন্তু সে রেসপ্যাক্টের মর্যাদাই বা দিচ্ছেন কোথায়? ”
“ কি অমর্যাদা করেছি আপনাকে? ”
সাক্ষ্যর নজর এবার আহতদের ন্যায়ই ঠেকল। যেন ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। আহত স্বরে বলল
” প্লিজ দ্বিতী.. সত্যি বলছি। আমার তোমার সাথে কথা না হলে ছটফট ছটফট লাগে।বুকের ভেতর অস্থিরতা বয়ে। তোমাকে না দেখলে, না অবজার্ভ করলে কেমন শূণ্য শূণ্য লাগে। বিশ্বাস করো, তোমাকে অবজার্ভ করেও যখন দেখি তুমি আমার দিকে একটাবারও ফিরে তাকাও না তখন নিজেকে কি ভীষণ অসহায় লাগে। এতোটা অবহেলা আমায় না করলে কি হয় না দ্বিতী? হয় না? আমরা একসাথে না থাকি, কিন্তু সম্পর্কটা আগের মতো হোক প্লিজ দ্বিতী। আগের মতোই আমায় একটুখানি ভালোবাসো। ”
দ্বিতী চাইল। কয়েক পলক চেয়ে থেকে হুট করে বলল,
“ আচ্ছা। এবার সরুন, ওয়াশরুমে যাব। ”
সাক্ষ্য মিনমিনে চোখে চাইল। উত্তরের আশায় ছিল সে। অথচ মনের মতো উত্তর না পেয়ে আশাহত নজরে চাইতেই দ্বিতী আবারও বলল,
”কি আশ্চর্য! ওয়াশরুমে যাব না আমি? নাকি এখানেই রেখে দিবেন সারাদিন? ”
সাক্ষ্য এবারে সরে গেল। বেচারার মুখ নিরাশ। চাহনিতে হতাশা। উঠে বসেই পাশ থেকে নিজের শার্টটা নিয়ে গায়ে জড়াতে নিয়েই ঘামের গন্ধে মুখ কুঁচকে নিল। এতোটা তাড়াহুড়োতে আসা হলো যে পোশাকও আনা হয়নি। আবার ছুটোছুটির কারণে ঘেমেছিলও বেশ। সাক্ষ্য মিনমিনে চোখেই চাইল। অতঃপর উপায় না পেরে একবার কিয়ানকেই কল দিল। জানাল আশপাশে কোথাও থেকে হলেও যাতে এক সেট জামাকাপড় কিনে আনতে।
দ্বিতী ওয়াশরুম ছেড়ে বের হয়েই জামাকাপড় নিল। একটা গোসল দিবে। তারপর খেতে বের হবে। কতোটা সময় না খেয়ে আছেে।খিদে পেয়েছে তো। তাই জামাকাপড় নিয়েই যেতে যেতে সাক্ষ্য বলল,
“দ্বিতী, আম্মু কল দিয়েছিল। এখন কথা বলে যাও। ”
দ্বিতী চেয়েই ভ্রু কুঁচকে বলল,”আমার আম্মু? ”
“হু। ”
দ্বিতী চোখ ছোটছোট করে চাইল। আম্মুকেও বলা হয়ে গেছে। এই সাক্ষ্যকেই বা কে বলেছিল সে যে এখানে আছে? কপালে ভাজ ফেলে বলল,
“ আপনাকে কে বলেছিল এখানে আসতে সাক্ষ্য? কে জানিয়েছিল আমি এখানে আছি? কিয়ান, খেয়া, নাকি মিহু? সাদাত বলবে না অবশ্য। ”
“ যেই বলুক। বলা তো উচিত ছিল। নাকি চাচ্ছিলেন সবাই চিন্তা করে মরে যাক। ”
“ চিন্তা? কে করবে?”
সাক্ষ্যর এবার রাগ হলো। দৃঢ়, টানটান স্বরে বলল,
“ এই নাকি আপনি ম্যাচিউরড হওয়া শিখছেন দ্বিতী। আপনার কি মনে হয়? আপনাকে কেউই ভালোবাসে না? কেউই আপনার জন্য চিন্তা করে না? নিজেকে এতেটা মূল্যহীন ভাবেন কি করে? যে আম্মু আব্বু ছোট থেকে এত চিন্তা করেছে আপনার জন্য সে আম্মু আব্বু আজ একটা সত্য জেনেছেন বলে আর চিন্তা করবে না? দিনশেষে তো আপনি তাদের সন্তানই৷ তাই না? চিন্তা করবে না কেন বলুন? আপনারও বুঝা উচিত যে, তাদের বয়স হচ্ছে। সেপারেশনে ছিল মানেই তারা আপনাকে কম ভালোবাসে এমন না। ”
“ বলেনি কেন আমায় ছোট থেকে? কেন বলেনি? কেন জানায়নি যে ওরা আমার জন্য বাধ্য হয়ে সংসার সংসার দেখাচ্ছে? আমায় এতগুলো বছর মিথ্যে বলার তো প্রয়োজন ছিল না। ছিল? অথচ তারা আমায় কিছু জানায়নি। বাইরের একজন আসায় আঙ্গুল দিয়ে জানাল যে আমার বাবা মায়ের সংসারটা ভাঙা। তারা একসাথে থাকে না। ”
সাক্ষ্যর হাতেই ফোন ছিল। আর ফোনের অপর প্রান্তেই ছিল অদিতি আহমেদ। এতোটা সময় দ্বিতীর কথা গুলো শুনে থমকালেন উনি। অতঃপর ছোটশ্বাস ফেললেন। সাক্ষ্য এবারে চুপ করতে বলল দ্বিতীকে। ফোন এগিয়ে বলল,
”কলে আছে আম্মু, কথা বলো। ”
দ্বিতী ফোন নিল। অতঃপর স্ক্রিনে চাইতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল,
”আম্মু? অনেক অভিযোগ না আম্মুর জন্য? তাই বলে না বলে অতদূর চলে যাবি? চিন্তা হয় না? এভাবে লুকিয়ে গিয়ে যেতে হয় অতদূর? ”
দ্বিতী কিছু বলল না। কিছুটা সময় পর অভিমান নিয়ে বলল,
“ তোমরাও তো লুকিয়েছিলে আম্মু। আমিও একটু দেখলাম সবাইকে ছেড়ে প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়া যায় কিনা৷ ”
অদিতি আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর কিছুই বললেন না। বলতে পারলেন না। শুধু মুখ থমথমে করে কল রাখলেন। অতঃপর অনেকটা সময়, অনেকটা সময় ভেবে তিনি হুট করেই সাদিকুর রহমানকে সামনে পেয়েই হুট করে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“সাদিক? আমরা কি সত্যিই আবার সংসারটা নিয়ে ভাবতে পারি না সাদিক? তুমি না চাইতে আমি ফিরি? আমি সব ভুলে যাই? চাইতে না সাদিক? এইশেষ বয়সে যদি আমরা সব ভুলে সত্যিই সংসার নিয়ে ভাবি সাদিক? ”
সাদিকুর রহমান শুধু নিষ্প্রভ চাহনিতেই চাইলেন। উত্তর করার সাহস হলো না৷ করলেনও না উনি উত্তর। অপরদিকে যে অদিতি আহমেদ
স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে
এতগুলো বছর নিজের আত্মসম্মান
নিয়ে বেঁচে থেকে কখনো স্বামীর
সংসারে ফিরে গেল না সে অদিতি আহমেদও মেয়ের কথা ভেবে সংসার জোড়া দিতে চাইলেন। মেয়ের এই অসহায়ত্ব, অভিযোগ, অভিমান থেকেই উনি এই প্রস্তাবটা রাখলেন।বললেন,
“আমরা কি আবার সংসার করতে
পারি সাদিক? আবার ভাবতে পারি
আমাদের ঘর নিয়ে, পরিবার নিয়ে?
বলো পারিনা?”
এবারেও একই নিরবতাই। উত্তর এল না। এল না সাদিকুর রহমানের উত্তর।
দ্বিতী বের হলো একটু পর। ভেজা চুল তোয়ালেতে জড়ানো। পরনে খুব সাদামাটা হালকা গোলাপি আর সাদা সংমিশ্রনে ফতুয়া আর স্কার্ট৷ গলায় ওড়না জড়ানো। দ্বিতী বের হয়েও দেখল সাক্ষ্য ওভাবেই খালি গায়ে বসে আছে। দ্বিতী বের হতেই কেমন চোখে চেয়ে আছে যেন। দ্বিতী কপালে ভাজ ফেলে। বলে,
“শার্ট পরলে কি শরীরে এলার্জি হবে? নাকি রেশ উঠবে? খালি গায়ে থেকে কি উপকার পাচ্ছেন? ”
” বহু উপকার। এই যে হাওয়া বাতাস লাগছে৷ খালি গা রেখে বউয়ের নজর কাড়ার চেষ্টা করছি এসবই উপকার। ”
“শার্ট পরুন। খেতে যাব। খিদে পায়নি আপনার? ”
“পেয়েছে। ”
“ তাহলে? ”
সাক্ষ্য উত্তর করল না। দ্বিতী দুয়েকবার ভ্রু কুঁচকে চাইতেই দরজায় আওয়াজ হলো। অতঃপর সাক্ষ্য উঠে দরজা খুলতে ওপাশ থেকে দেখা গেল কিয়ানকে। কিয়ানের হাতে দু দুটো শপিং ব্যাগ। রুমের দরজা প্রথমে খুলল সাক্ষ্য। পরনে ঐ ঘামের গন্ধময় শার্টটা জড়িয়ে দরজা খুলতেই কিয়ান একবার উঁকি দিতেই দেখা গেল দ্বিতী তার দিকেই চেয়ে আছে। কিয়ান মেকি হাসল। পরমুহূর্তেই মনে মনে বলল,
“ বেয়াদব! চুপিচুপি ভার্সিটির স্যার বিয়ে করে এখন আমায় চাকরের মতো খাটাচ্ছে। বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসেনি, মনে হয় হানিমুনে এসেছে। ”
দ্বিতী ঐ নজরের উত্তর না বুঝলেও কিয়ান যখন ওসব দিয়ে চলে যেতে নিল ঠিক তখনই সাক্ষ্যকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কিয়ান বলেছে আপনাকে? কিয়ানই বলেছে আমি যে এখানে আছি? ও ছাড়া আর কেউ বলবে না শিউর। ”
সাক্ষ্য উত্তর করে না। শুধু ফোঁস করে শ্বাস ফেলর জানায়,
“বললেই বা কি। বিয়ে করা বউয়ের খোঁজখবরও নিতে পারব না এমন অধম নাকি আমি? ”
দ্বিতী কিছুই বলল না। শুধু কপট রাগ নিয়ে চাইল একবার দরজার দিকে। আজ তো কিয়ানকে দেখে নিবেই!
অতঃপর একটু পর সাক্ষ্যও গোসল সারল। পোশাক পরে বাইরে গিয়ে নাস্তা সারার বদলে দুপুরের খাবারই খেল। তার একটু পরই দ্বিতীকে দেখা গেল কিয়ানের উপর রাগ দেখাতে। দুয়েকবার কিয়ানের উপর রাগ ঝেড়েও এবারে কিয়ানের পিছুই ছুটল। সাক্ষ্য চেয়ে দেখল ছুটন্ত রূপটা৷ সবার সাথেই স্বাভাবিক। সবার সাথেই। স্বাভাবিক না শুধু তার সাথে। বিড়বিড় করল,
“ ওর পিছুপিছু ঠিকই ছুটছে, রাগ দেখাচ্ছে। অথচ আমায় দেখে এমন একটা ভাব করে যেন কতকাল আমায় হৃদয়ভরে সম্মান করেছে৷ যেন কোনদিন আমার সাথে ঝগড়াই করেনি৷ গুড গুড৷ ভালোই! ”
দ্বিতীরা দুপুরে রওনা দেওয়ার কথা থাকলেএ রওনা দিল বিকালের একটু আগে। তবে সে সাক্ষ্যর সাথে আর বাকিরা বাকিদের মতো। অতঃপর যখন শহরে এসে পৌঁছাল তখন আশপাশ জুড়ে ঝড়ে হাওয়া। যেন একটু পরই বৃষ্টি নামবে। সাক্ষ্য চাইল। বাস থেকে নেমে পড়ে দ্বিতীর হাত ধরে দাঁড়াতেই দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে নিল। বলল,
“ হাত ধরলেন কেন? আমায় বাসায় ফিরতে হবে সাক্ষ্য৷ অনেক দেরি হয়েছে। ”
”ফিরবেন তো বাসায়। ”
“আমাকে মিহু নামিয়ে দিবে। ওর সাথে চলে যাব। একটু পর ওর বাবা গাড়ি নিয়ে আসবে। ”
সাক্ষ্যর মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। ঘড়িতে সময় দেখে বলল,
” বর থাকতে বন্ধুর গাড়িতে কেন যেতে হবে মিসেস এহসান? একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছেন না?”
“আপনাকে কষ্ট করে আবার আমার বাসায় দিয়ে আসতে হবে না। বরং নিজ বাসায় ফিরে একটা ঘুম দেন। ”
“ আমি আপনি এক বাসাতেই ফিরব এখন। আমাদের বাসায়, ওকে? আর কোথাও পা বাড়াবাড়ি হবে না।আমি আম্মু আব্বুকে অলরেডি বলে দিয়েছি। এখন আপনি না গেলে কষ্ট পাবে। ”
দ্বিতী প্রশ্ন ছুড়ে,
”আপনাদের বাসায়? ”
“ ওটা আপনারও বাসা। ”
দ্বিতীর এবার মেজাজ খারাপ হলো। মানে কি? কল করে ওদের বলার কি প্রয়োজন ছিল? দ্বিতী কি এখনই বলেছে ফিরে যাবে? দ্বিতীর এখনো কত কাজ শেখা বাকি। কপট রাগ দেখিয়ে সে বলল,
“ দেখুন সাক্ষ্য, আমি অবশ্যই ফিরব। তবে সব কাজ শিখে।বললাম না একটা পরিপূর্ণ সংসার করব৷ সংসারের ঘরণী হবো? তার আগে আমার কিছু সময় প্রয়োজন। নিজের মতো বাঁচা প্রয়োজন বুঝেছেন? ”
” সংসারের ঘরণী অলরেডি হয়ে গেছেন। কারণ আপনি অলরেডিই আপনার বরের মন অর্জন করেছেন দ্বিতী। আর কিছু? ’
দ্বিতী এবার শক্ত কন্ঠে বলল,
“ ঘরণী এভাবে হয় না। ঘর সামলাতে হয়, বাচ্চা সামলাতে হয়, ঘরের মানুষদের খেয়াল নিতে হয়,সবশেষে সব কাজ পারতে হয়। ”
”ঘরণী হতে হলে বরের সেবাযত্নও করতে হয়। জানেন না?”
দ্বিতী ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। বলল
” আমায় আর কয়েকটাদিন নিজের মতো বাঁচতে দিন ওকে? আর অল্প কয়েকটাদিন। আমি তো এখনো জিন্স প্যান্টই ধুতে পারি না। সেবাযত্ন না করতে পারলে তখন আঙ্গুল উঠাবেন সেকেন্ডেই। পিঠা বানাতে পারি না। ভাতের মাড় ফেলতে পারি না। রান্নায় লবন আন্দাজ করে দিতে পারি না৷ মরিচ বেশ হয়ে যায়। ”
” এসব আবার কি কাজ? আমি শিখে নিব নাহয়। আপনার চিন্তা করতে হবে না। ”
দ্বিতী এবার শক্তস্বরে বলল
“হবে। আমি চাই না কেউ বলুন ঘরের কাজ বউ না পেরে তার বরের হাতে করাচ্ছে। আমি নিজের কোন খুঁত রাখব না। সুতারাং আমি এখন আপনার সাথে ফিরছি না। আরো কয়েকটাদিন অপেক্ষা করুন ওকে?আমার আরেকটু নিজের সাথে বোঝাপড়া বাকি। আরেকটু নিজের মতো বাঁচা বাকি। আশা করি বাঁধা হবেন না তাতে? ”
সাক্ষ্য এবারে আর উত্তর করল না। ওর নিজেরও মনের ভেতর অভিযোগ জমল। ভালোবাসলে অতো খুঁত-নিখুঁতের কি আছে? দ্বিতী কেন বুঝছে না যে সে নিখুঁত দ্বিতীকে চায় না।বলল,
” হবো বাঁধা। কি করবেন? ”
”সমস্যা কি আপনার? বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরতে গিয়েছি। সেখানেও গিয়েছেন। কিছু বলেছি? তো আর কয়েকটাদিন আমার মন শান্ত হওয়া অব্দি অপেক্ষা করলে কি হবে? ”
সাক্ষ্য উত্তর করে না। তবে দ্বিতীর সাথেও কথা বাড়ায় না। শুধু মুখ টানটান করে পা বাড়িয়ে রাস্তার ওপাশটায় গাড়ি খুঁজতে যেতেই দ্বিতী পেছন থেকেও দুইবার ডাক দিল। সাক্ষ্য চাইল না। গাড়ি ভাড়া করতেই এপাশে ব্যস্ত হলো। অতঃপর তার ঠিক একটুখানি পরই আচমকাই চোখে পড়ল রাস্তার ওপাশ অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু। দৃষ্টিটা থমকাল, যখন এই রাতের আঁধারেও মেইন রোডের চওড়া রাস্তাটায় একটা ভারী যানবাহন এসে ধাক্কা দিয়ে গেল দ্বিতীকে। মুহূর্তেই আঁছড়ে পরল নরম মেয়েলি শরীররটা। একটা আচমকা আঘাতে মুহূর্তেই রক্তাক্ত, লালাভ হয়ে মেয়েটার শরীর ছিটকে পড়ল রাস্তার খসখসে জমিনে৷ ছটফট করল শরীরটা। বোধহয় তীব্র যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করল। চোখ খুলে রাখা দায় হলো যেন মেয়েটার। প্রথম দুই সেকেন্ড তীব্র যাতনায় শরীরটা ছটফট করে উঠলেও ঠিক দুই সেকেন্ডের মধ্যেই শরীরটা নিভে এল কেমন। স্থির, নিথর হয়ে পড়ে রইল নিষ্ঠুর এক পরিণতি দিয়ে।
দুইজনাতেই পর্ব ৪৬
অপরদিকে সাক্ষ্য প্রায় পাগলের মতোই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল দ্বিতীর রক্তাক্ত, নিথর শরীরটা। টকটকে লাল চোখ বেয়ে মুহূর্তেই গড়াল চোখের নোনা পানি। বড্ড অভিযোগ
নিয়ে শুধাল সে,
“নিজের মতো বাঁচার কথা বলে আমাকে চিরতরে ছেড়ে চলে যাওয়ারই প্ল্যান করছিলেন তবে দ্বিতী? এই আপনার নিজের প্রতি ভালোবাসা? দ্বিতী..এই দ্বিতী..”
