Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮ (২)
jannatul firdaus mithila

“আর সে-ই মানুষটা কে?”
কৌতুহলী রমণীর প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই পেছন থেকে ছিটকে এলো এক তীক্ষ্ণ বিষমাখা কণ্ঠ—
“তা নিয়ে তোমার মতো পুঁচকে মেয়ের এত কৌতূহল কেনো? অধীর রায়ের বিছানা দাবড়িয়ে হাঁপিয়ে গিয়ে এখানে এসে কৌতূহল মেটাচ্ছ নাকি?”
কথার এহেন আকস্মিক ও কদর্য অভিঘাতে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল মাহি। থমকাল তার চারপাশ! নাচঘরের প্রতিটি দেয়ালে যেন এখনো গুঞ্জে উঠছে ওমন তিরিক্ষি বাক্যবাণের প্রতিটি শব্দ। ত্বরিত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মাহি। হতভম্ব দৃষ্টিতে সম্মুখে চোখ ফেলতেই দেখে — দু’হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুদীপা রায়কে। মুখটা যেন প্রস্তরখন্ডের ন্যায় শক্ত তার! চোখেমুখে ক্রোধের লেলিহান স্পষ্ট। দাঁত কপাটি একে-অপরের সনে রুষ্টতায় পিষে যাচ্ছে তা বেশ টের পেলো মাহি। পলক ফেলতে না ফেলতেই সুদীপা রায়ের ঠোঁটের কোণে ফের শোভা পেল অবজ্ঞার বুলি!

“অধীর রায়কে নিয়ে তোমার এত কৌতূহল কেনো শুনি? ওর বিষয়ে প্রশ্ন করার সাহসই বা পাও কোথা থেকে?”
এহেন বাক্যবাণের পিঠে সপ্তদশীর মুখের সমস্ত কোমলতা মুহূর্তেই মুছে গেল যেন। অপমানের তীব্রতায় গালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল তার। চোয়াল চেপে ধরে ধীরলয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। পায়ের নামমাত্র গতিতে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সুদীপা রায়ের মুখোমুখি। মুহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল দু’জনের মাঝখানের দূরত্বটুকু। মাহির চোখে এবার আর বিস্ময় নেই, নেই এতক্ষণকার অপ্রস্তুত ভাবটুকুও! সেথায় বরং জমেছে একরাশ শীতল ঔদ্ধত্য।বড্ড আয়েশি ভঙ্গিতে দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে নিয়ে, সর্তক গলায় বলে উঠল,
“ সাহসটা কোথা থেকে পেলাম, তা জানার আগে আপনার বোধহয় জানা উচিত ছিল — আমাকে এমন প্রশ্ন করার অধিকারটা আপনার আছে কি না।”
ঐটুকুন একটা পুচঁকে মেয়ের মুখে এহেন ঠান্ডা মাথায় চড় মা-রার মতো প্রতুত্তরে অগ্নিমূর্তির ন্যায় গর্জে উঠলেন সুদীপা রায়। পারলেন না তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসতে!

“ অধিকার? আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমাকেই অধিকারের বুলি আওড়াচ্ছ? তোমার সাহস তো কম না পুঁচকে মেয়ে!”
ঠান্ডা মাথার মানুষ মাহি! এহেন অপমানজনক বাক্যবাণের পিঠে মৃদু হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। কন্ঠে ভারি শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে আওড়াল,
“ সাহস আমার বরাবরই বেশি! তা নাহলে এভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আপনাকে মুখ্য জবাব দিতে থোড়াই পারতাম।”
রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে গেল সুদীপা রায়ের। দাঁত খিঁচে ফের অধর নাড়াবে তার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো নিরুর অসন্তুষ্ট কন্ঠ!

“ মা! কি হচ্ছেটা কী এসব?”
তৎক্ষণাৎ থেমে গেলেন সুদীপা রায়। সপ্তদশীর ওপর থেকে প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টিজোড়া সরিয়ে, ধীরেসুস্থে তাকালেন মেয়ের দিকে। নিরু এগিয়ে আসছে। তার সুশ্রী মুখজুড়ে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ! ব্যস্ত পদক্ষেপেও যেন এক আকাশসম বিরক্তির প্রতিধ্বনি। গটগটিয়ে মাহির পাশে এসে দাঁড়িয়েই সে কঠোর স্বরে বলে উঠল,
“এভাবে কথা বলছো কেন উনার সঙ্গে?”
মুখ শক্ত সুদীপা রায়ের। মুখাবয়বে ক্রোধের দাবানল স্পষ্ট! কটমট কন্ঠে মেয়ের কথার প্রতিত্তোর না করে, উল্টো আদেশের সুরে আওড়ালেন,
“ ঘরে যা নিরু!”
“ কিন্তু মা….!”
“ আমি বলেছি ঘরে যেতে!”

সুদীপা রায়ের ধমকে ওঠা কন্ঠ! যার অভিঘাতে আঁতকে উঠে নিরু। সহসা ছলছল দৃষ্টে একমুহূর্ত তাকিয়ে রয় মায়ের পানে। সুদীপা রায়ের মাঝে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই, আছে কেবল একরাশ প্রতিহিংসার ছাপ! নিরু ব্যথিত হলো তা টের পেয়ে। ঘাড় বাকিয়ে একবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র পানে দৃষ্টিপাত করে, পরক্ষণেই ঘুঙুর পায়ে ছুটে পালালো কক্ষ ছেড়ে! অষ্টাদশীর পদধ্বনিতে ঘুঙুরের রিনিঝিনি শব্দ স্পষ্ট। রমণী কাঁদছে বিধায় গুরুমাও ছুটলেন রমণীর পিছুপিছু। অতোবড় নাচঘরে এবার কেবল মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইলো মাহি এবং সুদীপা রায়। আশ্চর্য! বোকা মানবী আজ যে ভয় পাচ্ছে না। মুখাবয়বে এক অদ্ভুত শান্ত ভাবস্রোত লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে কেমন। সুদীপা রায় মুখ খুললেন এবার। মুখাবয়ব থেকে বাঁচাকুচা ভদ্রতার প্রলেপটুকু একটানে ছিঁড়ে ফেলে গমগমে গলায় আওড়ালেন,

“ একে-তো হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ে হয়ে নিজের চাইতে দ্বিগুণ বয়সী ছেলের সঙ্গে দিব্যি রাত কাটাচ্ছো, তারওপর নষ্টামি করে অধিকারের বুলি আওড়াতে এসেছো? ছিহঃ! লজ্জা করে না তোমার?”
অপমানের তীরে বিদ্ধ হলো রমণীর কোমল হৃদয়। তার জেরে চোখের পাতা আনমনে হয়ে উঠল ভারী। সরু নাকের ডগাটা খানিক ফুলিয়ে দৃষ্টিজোড়া করল তীক্ষ্ম!গমগমে গলায় শুধালো,
“ রাত-বিরেতে অন্যের খাবারে মাতা-ল হবার ঔষধ মেশাতে, জমিদার গিন্নীর লজ্জা করে না?”
সহসাই সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে উঠল সুদীপা রায়ের। বিস্ময়ের তীব্রতায় পরক্ষণেই তার চোখদুটো ছুঁলো কপাল। হতবাক বিস্ময়ে গলা অবধি উঠে এলো কাশির ক্ষীণ খুকখুক শব্দ। রমণী তড়িঘড়ি করে নিজের বুকখানি খামচে ধরলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় দক্ষ কৌশলীর ন্যায় মৃদু হাসিতে মেতে ওঠে মাহি। দৃষ্টিযুগলে খানিক তীক্ষ্ণতা লেপ্টে, ধীর কন্ঠে শুধায়,

“ এ কি! আপনার কপাল ওমন ঘামছে কেনো? গরম লাগছে? তা বলি গরমটা কী আমার কথা শুনেই বেড়ে গেল না-কি?”
ত্বরিত চোখ পাকিয়ে তাকালেন সুদীপা রায়। দৃষ্টির তীব্রতা এমন করলেন, যেন সে-ই চোখের আগুনেই ঝলসে ছাই করে দেবেন সপ্তদশীকে। অথচ মাহি আজ অনড়। ভয়ের লেশমাত্র নেই তার চোখেমুখে। বরং ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তুলল এক চিলতে তীর্যক হাসি। তা দেখে গায়ে বোধহয় আগুন জ্বলে উঠল সুদীপা রায়ের। রাগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যে-ই না সপ্তদশীর গাল বরাবর চপেটাঘাত বসাতে উদ্যোত হবেন ওমনি রমণীর দৃঢ় হাতখানা আচানক হাতের মুঠোয় চেপে ধরে মাহি। বোকা মানবীর সে-কি ধরার কৌশল! সুদীপা রায় সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছেন এবার। মাহি’র নরম তুলতুলে হাতের মুঠোয় নিজ হাতখানা মোচড়াতে লাগলেই মাহি কেমন ব্যঙ্গাত্মক কন্ঠে বলে ওঠে —

“ ইশশশ! আপনি ঔদ্ধত্য দেখে না হেসে পারলাম না আন্টি। যে মেয়ের সামান্য ক’টা কাপড়ে অন্য কেউ ভাগ বসাতে এসেছে বলে স্বয়ং নির্দয় মাফিয়া মনস্টার সবক’টা কাপড় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে, আপনি কি-না সে-ই মেয়ের গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলেন? কি মনে হয়? এমনটা করার জন্য অধীর রায় আপনার হাতদুটো আদোও আস্ত রাখতো?”
মুহুর্তেই রাগের আগুনে ঘি পড়ল কর্তাগিন্নির। তেজ দেখিয়ে তক্ষুনি ঝটকা মে’রে ছাড়িয়ে নিলেন নিজ হাত। মাহি নিশ্চুপ! রণমুর্তি কর্তাগিন্নির সনে চোখে চোখে বারকয়েক বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়ে, পরক্ষণেই নির্বিকার ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সুদীপা রায়কে। আনমনে কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় মাহি। চশমা ছাড়া দৃষ্টিযুগল চোখা হতেই দৃশ্যমান হলো — অদূরেই দাঁড়িয়ে আছেন হিমাংশু রায়। দু’হাত কোমরের পেছনে জড়ানো তার, ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়ার সরু রেখা পেরিয়ে তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মাহির ওপর। যে-ই দৃষ্টির ভারে সপ্তদশীর বুকের ভেতরটা অজান্তেই কেঁপে উঠল খানিক। মুহূর্তের জন্য অন্তরালে ঘাবড়ে গেলেও বাইরে তার কোনোরূপ ছাপ পড়তে দিল না মাহি। উল্টো মুখের ওপর দৃঢ়তার প্রলেপ মেখে নিল আরও। সামান্য ঢোক গিলে থমকে যাওয়া পা দু’টোয় ফের গতি টানলো রমণী। ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ় দেহে সটান দাঁড়িয়ে থাকা হিমাংশু রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ কর্ণকুহরে এসে আঘাত করল হিমাংশু রায়ের গমগমে, ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠস্বর—

“ দু’দিনের একটা নামমাত্র সম্পর্কের রেশ ধরে, গলায় এতো জোর আসে কোত্থেকে?”
থমকায় মাহি! অদৃশ্য রাগে চোয়াল শক্ত করে তৎক্ষনাৎ খামচে ধরে জামার দুপাশ। উল্টোদিকে মুখ করে রেখে, দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আচানক প্রতুত্তর করে,
“ সম্পর্কটা দু’দিনের ক্ষণস্থায়ী হবে, নাকি গোটা একটা জীবনজুড়ে স্থায়ী হবে — সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল আমার রয়েছে। কেননা, মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার যে বহু আগেই তার সমগ্র জীবনের লাগামখানি আমার হাতের মুঠোয় তুলে দিয়েছে।”
তক্ষুনি ব্যঙ্গাত্মক কায়দায় গা দুলিয়ে হেসে ওঠেন হিমাংশু রায়। তার উচ্চহাসিতে সে-কি অবজ্ঞা! সম্মুখ থেকে গিন্নীও যে তাল মিলিয়েছে তার সনে। মাহি ভড়কায়। ভ্রু কুঁচকে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় হিমাংশু রায়ের পানে। জমিদার কর্তা ততক্ষণে লাগাম টেনেছে হাসির। ক্ষীণ হাসিতে সিগারেটের শেষ প্রান্তে জোরালো টান বসিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে আওড়ায়,

“ রাক্ষসের আবার জীবনের লাগাম? হাস্যকর! মেয়ে পুঁচকে হলেও কথায় যথেষ্ট তেজ আছে দেখছি। অবশ্য তেজ থাকারই কথা। রুশদী যার সাথে বেড শেয়ার করে, তার শুধু গলা নয় বরং অনেক জায়গাতেই তেজ বেড়ে যায়। তা, কথাটা ভুল না-কি?”
বাবা-র বয়সী লোকটার মুখ থেকে এহেন কুৎসিত ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য কর্ণধার হতেই ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠে মাহি’র। ত্রস্ত কুঁচকে নেয় নাকমুখ। মাথাভর্তি দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনটা কিয়ত প্রশমিত করার ব্যর্থ প্রয়াসে মত্ত সপ্তদশী। খানিকবাদে দাঁত খিঁচে আওড়ায়,
“ রাক্ষস? হাহ! ভুলে যাবেন না রায় জমিদার সাহেব, কেউ জন্ম থেকে রাক্ষস হয়ে এ পৃথিবীতে আসে না। তাকে রাক্ষস বানায় তাঁর পরিবার, পরিজন, পরিস্থিতি কিংবা সমাজ! তাছাড়া অধীর রায়-কে মাফিয়া শ্যাডো মন্সটারে রুপান্তর করার পেছনে কেউ না কেউ যে নিশ্চিত রয়েছে, তা স্পষ্ট!”
তৎক্ষনাৎ মেয়েটার মুখপানে অগ্নিদৃষ্টে তাকালেন হিমাংশু রায়। রাগের তোড়ে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মধ্যবয়স্ক! তক্ষুনি শক্ত হাতে খামচে ধরলেন মাহি’র নরম চুলের গোছা। এহেন অতর্কিত আক্রমণে হকচকায় মাহি। ভড়কানো দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হুংকার দিয়ে ওঠেন হিমাংশু রায়!

“ কি বললি? কি বললি তুই? আবার বল দেখি। দু’পয়সার একটা রাস্তার মেয়ে, আমার বাড়িতে এসে আমারই সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলার সাহস পেলি কোথায় তুই? বল কোথায় পেলি?”
চুলের ব্যথায় কড়কাচ্ছে মাহি। হিমাংশু রায়ের কথা শেষ হতে না হতেই অশ্রুসিক্ত চোখদুটো কুঁচকে নিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে,
“ আমি রাস্তার মেয়ে নই! নই আমি দু’পয়সার মেয়ে। নিজের ভালো চাইলে আমায় ছেড়ে দিন বলছি। নয়তো…!”
“ নয়তো? নয়তো কী? অধীরকে বলবি? তোর দু’দিনের নাগরকে বলবি? অথচ তোর ঐ দু’দিনের নাগরকে মানুষ থেকে রাক্ষস বানানোর সম্পূর্ণ কাজটা আমি নিজ হাতে করেছি। শুধু একদিন, দু’দিনে নয় বরং গোটা বিশটা বছর ধরে ওকে রাক্ষস বানিয়েছি আমি! যার দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে অধীর রায় আজ রুশদী কিং , তাঁর বিরুদ্ধেই কি-না অভিযোগ তুলবি তুই?”
এহেন বাক্যবাণের অভিঘাতে স্তব্ধ মাহি। দৃষ্টি হয়েছে বিস্ফোরিত! বিস্ময়াবহে ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো —

“ তারমানে… আপনি-ই?”
এতক্ষণে নিজের মিথ্যের আবরণী খোলসটা যেন একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন হিমাংশু রায়। উন্মোচিত করলেন তাঁর এতদিনের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হিংস্র সত্তাটি। শক্ত মুঠোয় সপ্তদশীর একগোছা চুল আঁকড়ে ধরে, এক ঝটকায় মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেললেন দূরে। আকস্মিক আঘাতে মুহূর্তেই ভারসাম্য হারালো মাহি। ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল অদূরের তকতকে মেঝেতে। ঘটনাপ্রবাহে রমণীর হাতদুটোর মসৃণ তালুতে ঘর্ষণ লাগলো তীব্র। ব্যথা পেলো দু-হাঁটুর শক্ত হাড়ে! তৎক্ষনাৎ হাঁটু ধরে ককিয়ে ওঠে মাহি। ধীরলয়ে সোজা হয়ে বসেই তাকালো ঘাড় বাকিয়ে। দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন হিমাংশু রায়। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় আগুন জ্বলছে তার মুখাবয়বে। দাঁত তুললো কটমট ধ্বনি! সহসা আঁতকে উঠে মাহি। ভয়ার্ত ঢোক গিলে চিৎকার করবার প্রয়াসে মত্ত হতে গেলেই সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো মধ্যবয়স্কের হিং স্র গর্জন!

“ হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি! আমি বানিয়েছি অধীরকে মনস্টার। আমি বানিয়েছি। ৬ বছরের বাচ্চা ছিলো ও। যার ওপর মায়ের হ*ত্যার মিথ্যে অপবাদ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। যার ওপর রোজ করা হয়েছে অমানবিক, পা ষ বিক নির্যাতন!”
থামলেন হিমাংশু রায়! প্রজ্জ্বলিত চোখদুটো নিষ্পলক রেখে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এলেন তিনি। শক্ত চোয়ালে আচমকা মাহি’র সম্মুখে দু’হাতের শক্তিশালী জোর প্রয়োগ করে নিজ পরনের কুর্তাটা ছিঁড়ে ফেললেন একটানে। এহেন কান্ডে হতভম্ব মাহি! ঠোঁটের ডগায় রা নেই তার। সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে আছে কেবল একরাশ বিস্ময়! ওদিকে রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকা হিমাংশু রায় ত্বরিত ডানহাতের তর্জনী ঠেকালেন নিজ ইস্পাত-দৃঢ় বাহু বরাবর। ব্যগ্র কন্ঠে আওড়ে গেল,

“ এখানটায়! ঠিক এখানটায়। রোজ, রোজ ওকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হতো! আর সারারাত ধরে ওর ওপর চালানো হতো পাষবিক নির্যাতন। ৬ বছরের বাচ্চাটাকে সপ্তাহ জুড়ে না খাইয়ে রাখতো, দিতো না একফোঁটা পানি! ঐ বাচ্চা ছেলেটার শেষমেশ ক্ষুধার কষ্টে মরণ হবার যোগাড় হলে দেয়া হতো উচ্ছিষ্ট! দু’দিন, তিনদিনের বাশি উচ্ছিষ্ট! ওর পিঠ…ওর ঘাড়, ওর উরু, সবখানে, সবখানে ধারালো ব্লে ড দিয়ে দেয়া হতো অজস্র আঁ চ ড়! তারপর ঐ কু****বাচ্চারা ওর দগদগে ক্ষততে দিনের পর দিন লেপে গিয়েছে লঙ্কার গুঁড়ো! ওর পিঠ…হ্যাঁ হ্যাঁ, ঐ ৬ বছরের ছেলেটার পিঠে, পায়ের তালুতে, এমনকি স্পর্শকাতর জায়গাতেও রোজ দেয়া হতো গরম শিকের ছেঁক! ও কাঁদত। খুব কাঁদত, তবুও ওকে….”

“ নাআআআ! না। দোহাই লাগে আপনার, থামুন থামুন! আমি… আমি আর শুনতে পারছিনা এসব।”
কাঁপছে মাহি! কাঁপছে তার ক্ষুদ্র বদন। চোখদুটো তার অনবরত ঝরাচ্ছে নিরব অশ্রু। দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে কান। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হিমাংশু রায় থামলেন না আজ। উল্টো তড়িৎ বেগে এগিয়ে এসে ফের আঁকড়ে ধরলেন সপ্তদশীর চুলের গোছা। মুহুর্তেই ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে ব্যথাতুর ধ্বনি বেরিয়ে আসে মাহি’র। ছলছল চোখজোড়া সম্মুখে তাক হতেই হিমাংশু রায় দাঁত কিড়মিড়িয়ে শুধালেন,
“ শুনবিনা কেন? অধীর রায়ের রাক্ষস হবার পেছনে থাকা ঘটনাটা শুনবিনা কেন? খুব তো প্রশ্ন করছিলি! বড়ো বড়ো বুলি আওড়াচ্ছিলি। তাহলে এখন কান চাপলি কেন?”
ডুকরে উঠে মাহি! ধীরলয়ে দু’হাত জোর করে বলে,

“ আমার সহ্য হচ্ছে না কথাগুলো!”
পৈ শা চি ক হাসির টানে ঠোঁট বাঁকালেন হিমাংশু রায়। হঠাৎ হাতের জোর বাড়িয়ে রমণীর পেলব মুখখানা তুলে ফেললেন খানিক উঁচুতে। রমণী ফের ককিয়ে ওঠে। অধর কামড়ে ব্যথাটুকু গিলে নেবার প্রয়াস চালাতেই হিমাংশু রায় মুখ এগোলেন বড্ড কাছে। চিড়বিড়িয়ে শুধালেন,
“ যাকে পুরো দুনিয়া পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চেয়েছে, তাকে মর’ণঘাট থেকে তুলে এনে বাঁচিয়েছি আমি! দীক্ষিত করেছি আমার ছায়ায়, বড়ো করেছি রাক্ষস হিসেবে। যার হৃদয়ে দয়ামায়া বলতে কিচ্ছু নেই। আছে কেবল রাগ-হিংসা, জেদ -দম্ভ আর প্রাচুর্যের অহংকার! এতে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস কিংবা অনুশোচনা নেই। অধীর রায় নিজেও চেয়েছে এ-ই জীবন। চেয়েছে নির্দয়দের রাজা হতে! চেয়েছে প্রচুর ঐশ্বর্য, ক্ষমতা, শক্তি! সে যা চেয়েছে, দীর্ঘ বিশটা বছর পর সে তার চেয়েও বেশি পেয়েছে। কঠিন হয়েছে সে। কঠিন হয়েছে তার হৃদয়! রুপান্তরিত হয়েছে এমন এক মানুষরূপী রাক্ষসে, যে কি-না রোজ কারো না কারো র ক্তে পা না ডোবালে শান্ত হয়না। যার কাছে কথার কোনো মূল্য নেই, আছে কেবল অস্ত্রের প্রলয়ঙ্কারী শব্দের মূল্য! আর তুই কি-না দু’দিনের একটা পুঁচকে মেয়ে হয়ে ঐ নির্দয় রুশদী কিংয়ের গোটা জীবনের লাগাম হাতের মুঠোয় রাখার কথা বলিস? তুই আদোও জানিস ও কতটা হিং স্র? একবার মেজাজ খিচলে তোর মতো হাজারটা পুঁচকে মেয়েকে বাতাসের সাথে উড়িয়ে দিতে ন্যানো সেকেন্ডও ভাববে না ও।”
কন্ঠনালী বরাবর চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে মাহি’র। চাইলেও পারছেনা মুখ খুলতে। কেবল ছলছল চোখজোড়া নিয়ে তাকিয়ে আছে দূর্বল মানবী। পাষন্ড হিমাংশু রায়ের মন গললো না তাতে। আচানক ঝটকা মে’রে রমণীর চুলের গোছা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বাড়ালেন কদমের দুরত্ব। হিসহিসিয়ে আওড়ালেন,

“ অধীর তোকে নিজ হাতে এ বাড়িতে এনেছে বলে তুই এখনো বেঁচে আছিস! নয়তো এতদিনে তোর পুঁচকে মেয়েকে দু-আঙুলের চাপায় পিঁপড়ার ন্যায় পিষে ফেলতাম আমি।”
বলেই শরীর ঘুরিয়ে পিছুপা হলেন হিমাংশু রায়। সঙ্গে তাল মেলালেন তার স্ত্রী। দু’জনে একসঙ্গে খানিক এগোতেই হুট করে পেছন থেকে ভেসে আসে মাহি’র ভারী কন্ঠ!
“ নিজ দীক্ষায় অধীর রায়কে রাক্ষস বানালেন ঠিকই, তবে আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন — দিনশেষে সে-ও একটা র ক্তে মাং সে গড়া মানুষ! তার হৃদয়টা যতই কনক্রিটের আস্তরণে ঢাকা থাকুক না কেনো, একদিন না একদিন ঐ কনক্রিটের দেয়ালে ভাঙন ধরবেই।”
সহসা পাদু’টোয় রুখ টানলেন হিমাংশু রায়। ঠোঁটের কোণে ফোটালেন তীর্যক বাঁকা হাসির রেশ। ঘাড় সম্পূর্ণ না ঘুরিয়েই প্রতুত্তর করলেন,
“ দেখিস আবার! ঐ দেয়ালে ভাঙন ধরাতে গিয়ে তোর মতো পুঁচকে মেয়ের জানটাই না বেরিয়ে যায়!”
দূর্বল রমণীর সুশ্রী মুখমণ্ডল জুড়ে আত্মবিশ্বাসের প্রবল ছাপ। কন্ঠে নামলো দৃঢ়তা!

“ সময়ের বিবর্তন বড্ড খারাপ জমিদার মশাই! বলা যায় না, কখন কি হয়!”
মুহুর্তেই ব্যঙ্গাত্মক কায়দায় হেসে উঠলেন হিমাংশু রায়। একহাতে পরনের ধুতির একাংশ মুঠোভরতি করে, শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ হাতি-ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল! বোকাচন্দ্র কোথাকার!”
আর দাঁড়ালেন না হিমাংশু রায়। একপ্রকার গটগটিয়ে প্রস্থান ঘটালেন নাচঘর হতে। মুহুর্তেই নিরবতার কাটাঁযুক্ত বাঁধনে আঁটকা পড়ল মাহি। দূর্বল হতে লাগলো অন্তঃকোণের দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বে। অবচেতন মনে একবার উত্থাপিত হচ্ছে গতকাল রাতে মুগ্ধের বলা সামান্যতম স্বীকারোক্তি!
“ আমিও যদি তোর এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে বসি, তাহলে তোর বাপ আর আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় রইলো?”
কথাগুলো যেন স্পষ্ট কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মাহি’র! পরপর আবারও মনে পড়ল হিমাংশু রায়ের বলা প্রতিটা কথা! দু-কানে দু’ধরনের বাক্য প্রতিধ্বনিত হতেই আচানক কানদুটোয় হাত চেপে ধরে মাহি। কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড়িয়ে বলে,

“ কোনটা সত্য? বিস্ট বলেছিল — তার মায়ের মৃ ত্যুর সঙ্গে আমার আব্বু জড়িত। এর প্রতিশোধ নিতে তিনি আমায় তুলে এনেছেন। অথচ হিমাংশু রায় বলছেন, বিস্টের ওপরে মিথ্যে আরোপ বসেছিল তার মায়ের হ ত্যার। কিন্তু কে দিয়েছিল এই মিথ্যে আরোপ? তাছাড়া গতকাল রাতে তিনি কেনো বলেছিলেন — আমার সঙ্গে কোনোপ্রকার জোর করলে তার আর আব্বুর মধ্যে পার্থক্য থাকবে না! কেনো বললেন তিনি ঐ কথাটা? আমার আব্বু উনার আম্মুর সাথে…. না না না। ক-ক-কি ভাবছি আমি? নাহ! আমার আব্বু কোনো ভুল করতে পারে না। আমার আব্বু কারোর ক্ষতি করতে পারেনা। এখানে নিশ্চয়ই কোনো ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে! আমার আব্বু… আমার আব্বু সৎ একজন মানুষ। তিনি.. এসব..!”

নিজ ভাবনায় নিমগ্ন মাহি। ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে তার শ্বাসপ্রশ্বাস। কোমল তুলতুলে অধর দু’টোর মাঝখানে সামান্য দুরত্ব টেনে টানছে অস্থির নিঃশ্বাস। তার অবচেতন মন, ডুবে আছে অন্য চিন্তায়। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে তখনো খেলছো হিমাংশু রায়ের বলা প্রতিটি কথা। মানবী অস্থির! অস্থিরতায় আনমনা দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অদূরে। মুহুর্তেই ঝাপসা চোখের দৃশ্যপটে ভেসে উঠল হিমাংশু রায়ের কথার প্রতিটি চিত্র। ঐ যে, একটি ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু। কয়েকজন মানুষ মিলে তাকে বেধড়ক মা-রধ-র করে যাচ্ছে! ছোট্ট দেহটা আঘাতে কুঁকড়ে যাচ্ছে বারবার। তবুও থামছে না লোকগুলোর নিষ্ঠুরতা। কল্পনাতেই বাহ্যিকে আঁতকে উঠে মাহি।বেভুলার মতো দু’হাতে ভর দিয়ে এগিয়ে এলো কয়েক হাত। আহত নিষ্পাপের ওমন বেহাল দশা দেখে মমতাময়ীর বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল যেন। আহত শিশুটি কাঁদছে! অশ্রুসিক্ত চোখে ছটফট করছে ভীষণ। তার ক্ষীণ কণ্ঠে বারবার একই আর্তনাদ—

“মা! মা!”
ক্ষুদ্র শব্দদুটো যেন মুহূর্তেই বিদীর্ণ করে দিল মাহির বুক। রমণী হাত উঁচাল। অদ্ভুত এক আপেক্ষিকতায় আহত কন্ঠে শুধালো,
“ মা*রবেন না। থামুন আপনারা। উনার কষ্ট হচ্ছে দেখুন! দেখুন উনি কাঁদছে।”
মানবীর আহত ডাকে বোধহয় হেলদোল হলো না কল্পিত দৃশ্যে। বরং শিশুটির কাতর আহ্বান ক্রমশ মিলিয়ে যেতে লাগল বাতাসে। মিলিয়ে যেতে লাগলো সবক’টা অপরিচিত মুখ। অথচ মাহির কানে এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ছোট্ট বাচ্চাটার মায়ের জন্য করা অসহায়, সীমাহীন আকুতিগুলো! তক্ষুনি কানের ওপর দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে মাহি। কন্ঠনালীর সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে,

“ না, আর না! আর কাঁদবেন না। আমার সহ্য হচ্ছে না এসব। আমার কষ্ট হচ্ছে। বুক ফেঁটে যাচ্ছে আমার। আমি কার কথা শুনবো? আমি কাকে বিশ্বাস করব? আমার আব্বু খারাপ — তা আমি বেঁচে থাকতে কোনোদিন বিশ্বাস করব না। অথচ বিস্টের চোখদুটো মিথ্যে বলছে না — তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার। তাহলে সত্যিটা কী?”
কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তোলবার যোগাড় মাহি’র। খানিকবাদে কোনোমতে সামলালো নিজেকে। কান্নাগুলো কন্ঠার নিকটে আঁটকে রেখে, অশ্রুসিক্ত চোখদুটো হাতের উল্টোপিঠে আলতো করে মুছলো মাহি। হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল পরক্ষণে। ভগ্ন হৃদয়ে পরিহাসের সুরে আনমনে ফের আওড়াল,
“ আন্দাজ করেছিলাম — আপনার অতীত আপনাকে মনস্টার বানাতে দায়ী। তবে আপনার অতীত যে আমার পাথুরে মনটাকে ২য়বার বিদীর্ণ করবার কৌশল চালাবে — তা কে জানতো বিস্ট? কে জানতো? আমার যে এখন বড্ড আফসোস হচ্ছে! কেনো জানলাম আপনার অতীতের একাংশ। তারওপর আবার কৌতুহলও জাগছে — আপনাকে সম্পূর্ণরূপে জানার, চেনার! আমি যে এখন বড্ড দোটানায় পড়লাম বিস্ট!”

পড়ন্ত বিকেল! উদাসী চিত্তে অন্দরমহল পেরিয়ে জমিদার বাড়ির পেছনের জঙ্গলে পা রেখেছে মাহি। বেরিয়েছে হাঁটতে! অধিক কান্নার ফলে মাথা ধরেছে তার, একটু-আধটু হাঁটতে পারলে যদি কিছুটা স্বস্তি মিলে বেচারির! এদিকটা বড্ড কোলাহলশূন্য। আশেপাশে কেউ নেই। ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছে — খানিকটা জঙ্গল পেরুলেই পদ্মবিল! রমণীর ব্যস্ত পদযুগল সে পথে অগ্রসর। বড়ো বড়ো গাছ পেরিয়ে হাঁটছে একমনে। ঠিক তখনি দূর থেকে ভেসে আসা মৃদু গোঙানির শব্দে হুট করেই থমকায় মাহি। থামায় তার পাদু’টো! ভয়ার্ত আবহে প্রস্তরখন্ডের ন্যায় স্থির হতেই কর্ণকুহরে ফের ভেসে এলো একই গোঙানির শব্দ। ত্বরিত ঘাড় বাঁকায় মাহি। সন্ধানী চোখে তাকায় এদিক-ওদিক। আশেপাশে কেউ নেই! তাহলে আওয়াজ আসছে কোত্থেকে? শঙ্কিত রমণী দৃষ্টি সরু করল এপর্যায়ে। খাঁড়া করল কান! পাদু’টো আলগোছে বাড়াতেই ফের বাতাসের তালে ভেসে এলো গোঙানির স্বর। ওমনি সন্দিগ্ধ রমণীর সন্ধানী চোখদুটো গিয়ে আছড়ে পড়ল অদূরের পরিত্যক্ত এক কুয়ার পানে। মুহুর্তেই কপাল গোছালো মাহি। আওয়াজটা কি কুয়ার কাছ থেকে ভেসে এলো? কিন্তু কুয়াটা যে পরিত্যক্ত! তার ওপরে জমে আছে কত গাছ-গাছালির শেকঁড়! সন্দিষ্ট মাহি দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।

সময়ের কাঁটা একটুখানি গড়াতেই এবার স্পষ্ট কুয়ার কাছ থেকে ভেসে এলো গোঙানির স্বর। মাহি হতভম্ব! হতবুদ্ধির ন্যায় তক্ষুনি জোরালো পায়ে এগোলো কুয়ার সম্মুখে। ধীরেসুস্থে কুয়ার একপাশ হতে অন্যপাশে নেত্র বুলাতেই ফের হতবাকতার সাগরে ডুবল মাহি। কুয়ার আশেপাশে কেউ নেই। তাহলে গোঙাচ্ছে কে? রমণীর অন্তঃকোণে হুট করেই ভয় এসে হানা দিলো। মুচড়ে উঠল বুকটা। ভয়ডরে ত্বরিত পা চালিয়ে চলে যেতে চাইলেই — এবার পরিত্যক্ত কুয়ার ভেতর থেকে ভেসে এলো সে-ই গোঙানির শব্দ! ওমনি জমে গেল মাহি। জমে গেল তার বুক। সে তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকাঁয়। শুষ্ক অধরজোড়া সিক্ত জিভ ঠেলে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে, কাঁপা কাঁপা পাদু’টো বাড়ালো কুয়ার বড্ড সন্নিকটে। কাঁপতে থাকা হাতদুটো দিয়ে কুয়ার ওপর পড়ে থাকা পুরনো গাছ-গাছালির বাকল-শেকঁড়গুলো ধীরলয়ে খানিক সরিয়ে দিতেই উম্মুক্ত হলো — বেশ পুরনো কুয়াটি! যার তলায় নোংরা পানির উপস্থিতি।

রমণী এবার কানের পিঠে হাত রাখলো। কুয়ার ওপর খানিকটা ঝুঁকে এসে ঘাড় বাকিয়ে শোনার চেষ্টা চালালো গোঙানির শব্দটা। ঠিক তখনি এক নারী কন্ঠার মৃদু গোঙানির স্বর ভেসে এলো হাওয়ার তালে তালে। ভড়কায় মাহি! আগ্রহে আর-ও কিছুটা ঝুঁকতে চাইলেই ভারসাম্য হারালো মানবী। পাদু’টো হুট করেই ভরশুন্যের ন্যায় রূপ ধরল যেন। ক্ষুদ্র বদনখানি কুয়ার পানে ঝুঁকে পড়তে চাইলেই রমণী ভয়ে কুঁচকে নিলো চোখমুখ! তবে মুহুর্তব্যয়েই একজোড়া শক্তপোক্ত হাতের বলিষ্ঠ টানে সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদন রেহাই পেলো পড়ে যাওয়া থেকে। রমণী মুখ কুঁচকায় তক্ষুনি! বলিষ্ঠ হাতের টানে তার পাদু’টো ইতোমধ্যেই ঝুলছে শূন্যে। পেঁজা তুলোর ন্যায় ছোট্ট শরীরটা আটকা পড়েছে এক বলিষ্ঠ বাঁধনে। রমণী চোখ না খুলেও বেশ চিনলো সম্মুখের মানুষটাকে। তার নাসারন্ধ্রের সরু ছিদ্রপথ দিয়ে ভকভক করে প্রবেশ করছে এক কড়া পুরুষালী মাদকীয় পারফিউমের ঘ্রাণ। যে ঘ্রাণে বরাবরের ন্যায় বিমুগ্ধ মাহি। আজ-ও তার ব্যতিক্রম নয়। রমণী ধীরলয়ে চোখ খুললো। মুহুর্তেই অস্থির নয়ন জোড়া তার অজান্তেই স্বস্তি খুঁজে পেলো সুদর্শনের দর্শনে। দৃষ্টিযুগল মুগ্ধের মুখপানে খানিক ঘুরতেই সপ্তদশীর বুকটা কেমন হুহু করে উঠল যেন। মনে পড়ে গেল — তখনকার বলা হিমাংশু রায়ের কথাগুলো। কে বলবে এই লোকটা…এই নির্দয় লোকটা তার শৈশবে এতটা যন্ত্রণা সহ্য করেছে? মাহি’র গভীর দৃষ্টি স্থির। তা দেখে সুদর্শন কেমন ভ্রু গোটালেন। চোয়ালের পেশি টানটান করে নিয়ে স্বভাবসূলভ খেঁকিয়ে বললেন,

“ এদিকে কি করছিস?”
রমণী নিরুত্তর। চেয়ে আছে একদৃষ্টে। মুগ্ধের বলা কথাটার পরিপ্রেক্ষিতে উল্টো প্রসঙ্গ ঘোরায় সে। মুগ্ধকে এক আকাশসম হতবাকতায় ডুবিয়ে আচানক হাত উঠিয়ে আনলো সুদর্শনের রুক্ষ গালের ওপর। মুহুর্তেই কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো মুগ্ধের। মেয়েটা কি করতে চাইছে? বাদামী ওষ্ঠপুট নাড়িয়ে যুবক ক’টা কটুবাক্য আওড়াতে উদ্যোত। এমন সময় রমণী কেমন অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ লোকে জিজ্ঞেস করে — অধীর রায়ের সঙ্গে একই ছাঁদের তলায় থাকার মতো অধিকার আমি কোথায় পেলাম!”
ভ্রু গোটায় মুগ্ধ! শক্ত মুখে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ প্রতিত্তোরে তুই কি বললি?”
সপ্তদশী মৃদু হাসলো! যুবককে মন ভরে দেখতে দেখতে শুধালো,
“ বললাম — যে খোদ আমার নিজস্ব মালিকানায় বন্দী, তার সঙ্গে একই ছাঁদের তলায় থাকতে, নতুন করে অধিকারের কি প্রয়োজন?”
সহসা বাঁকা হাসির রেশ টানলো মুগ্ধ। ঝুঁকিয়ে আনলো ঘাড়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেয়েটাতে তাক করে, সন্দিগ্ধ গলায় বলল,

“ আমার চড়ুই দেখছি বড় হয়ে গিয়েছে!”
রমণীর পেলব মুখখানায় প্রশান্তির ছাপ স্পষ্ট! তারচেয়েও বেশি স্পষ্ট তার কন্ঠায়!
“ উঁহু! আপনার চড়ুই নিজের মালিকানায় অধিকার খাটাতে শিখে গিয়েছে!”
মেয়েটার এরূপ বাক্য বিনিময়ে অভ্যন্তরে বেশ অবাক রূঢ় মানব। তবুও বাইরে থেকে ধরে রাখলেন নিজ চিরচেনা খোলস। রমণী ওমন গভীর চোখে তাকে দেখছে বলে, গমগমে গলায় শুধালো,
“ কি দেখছিস এভাবে?”
“ আপনাকে!”
মাহি’র ছোট্ট উত্তর! তা শুনে কপাল গোছালো মুগ্ধ। চোখেমুখে খানিক দুষ্টুমির ছাপ ফুটিয়ে বলে উঠল,

“ নতুন দেখছিস না-কি?”
মেয়ে আজ বড়ো সিরিয়াস। মাথাটা সামান্য কাত করে আওড়াল,
“ উঁহুম। নতুনভাবে দেখছি!”
সন্দিগ্ধতা বাড়ল মুগ্ধের। চোয়াল শক্ত করে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ তার কারণ?”
কথাটা শেষ হতেই মেয়েটা কেমন হুট করে অস্থির হয়ে উঠল যেন। হাসফাস করতে করতে আঙুল দেখিয়ে বলল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮

“ আমি কি আপনাকে একটু ….. জড়িয়ে ধরতে পারি বিস্ট? বেশি না মাত্র একটুখানি!”
আকাশ থেকে টপকায় মুগ্ধ! কি বলবে তার উত্তর দেবার পূর্বেই ঝড়ের বেগে মেয়েটা কেমন আছড়ে পড়ল তার বুকে। নিজ ক্ষুদ্র বদনের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে রূঢ় মানবকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। যেন ছেড়ে দিলেি পালাবে লোকটা! মুগ্ধ হতবাক। তার হতবাক কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ মাহি!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯