তাকদীর পর্ব ১৭ (২)
নিরুর কল্পনারাজ্য
হসপিটালে এসে প্রথম স্ত্রী এবং তার হাসব্যান্ডকে দেখে তব্দা খেলো ফারিশ। পুরুষটির কোলে তার মেয়ে।
ফারিশ নামক ২৫ বর্ষীয়া পুরুষটির বক্ষস্থল আচমকা পরিণত হলো অশ্বতে। হেমলকের তীব্রবিষক্রিয়ায় বিদ্ধ হয়ে এলো তার হৃদপিণ্ড। বোধ হলো–কেও যেনো অতি তীব্রতায় খুঁকলে ধরে আছে তা। ফারিশ তুবার কথা সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হসপিটালে থাকা এক বন্ধুর কাছে এসেছিলো। আচমকা এখানে যে তার আয়রা এবং আমিরাকে চক্ষুগোচর হবে তা ঘূনাক্ষরেও টের পায়নি পুরুষটি। সহসাই তার পা থমকে গেলো। কুঞ্চিত হলো ঘন ভ্রু’জোড়া। হসপিটালের রিসিপশনের সম্মুখ হতে আয়রা এবং জুনায়েদ করিডোর হয়ে কোথাও যাচ্ছে হয়তো। ফারিশের হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো মুহূর্তেই। ধূসর বর্ণের চক্ষুদ্বয়ে তীব্র বেদনা এবং জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ন্যায় উত্তাপে ফুটে উঠলো তার। ফলস্বরূপ–ধূসর বর্ণের মণিদুটোর আশপাশের সফেদ অংশ রক্তিম বর্ণ ধারণ হলো। পুরুষটির কিছু একটা হলো!
মস্তিষ্ক মেনে নিতে অক্ষম হলো তার প্রাক্তন স্ত্রী এবং সন্তান এইমূহর্তে অন্যের মালিকানায় আবদ্ধ। সেই জের ধরেই আগালো তার পা’দুটো। সময়ের পরিক্রমায় বড্ড অস্থির ভঙ্গিতেই পৌঁছে গেলো জুনায়েদ এবং আয়রার সম্মুখে। আয়রা এবং জুনায়েদ সবেই তিনতলায় আমিরাকে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলো। অথচ মুহূর্তেই এহেন এক পুরুষের বাধায় থমকে গেলো দু’জনার পা। এমন সময়ে ফারিশ যে তার চোখের সম্মুখে এসে উপস্থিত হবে তা আয়রার কল্পনাতীত ছিলো। এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত এক পুরুষকে দেখা মাত্র তার চক্ষুদ্বয় ধারণ করলো বৃহদাকার। পরিবর্তন হলো মুখমণ্ডল। জুনায়েদের স্বভাবসুলভ গম্ভীর আদল সহসাই পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তর হলো পাথরের ন্যায় কঠিন বস্তুতে। তীক্ষ্ণ থুতনি হয়ে উঠলো আরও তীক্ষ্ণ। অদৃশ্য কোনো কারণবশতই তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি।
আয়রার কোমল হাতদুটো মুঠো হয়ে এলো। নত হলো তার দৃষ্টি। ফারিশ উপস্থিত হওয়া মাত্রই তার দৃষ্টিদুটো জুনায়েদ নামক লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠদেহের পুরুষটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে উপনীত হলো সেই পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির রমণীটির ওপর। একদৃষ্টে সে মোহনীয়তায় চেয়ে রইলো তার। জুনায়েদের দৃষ্টিগোচর হলো তা। চোখদুটো ছোট ছোট হয়ে এলো। মূহুর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফিরে তাকালো সে। কুঁচকানো ভ্রুদ্বয় মূহুর্তেই হলো টানটান। শীতল হলো বক্ষস্থল। তার ধারণা মোতাবেক আয়রার ফারিশের পানে তাকিয়ে থাকার কথা থাকলেও এইক্ষণে সেই ঘটনা মোটেই ঘটছে। আয়রার দৃষ্টি সম্পূর্ণটাই মেঝেতে। জুনায়েদ অদ্ভুতভাবেই প্রশান্তি অনুভব করলো। অতঃপর তার দৃষ্টি ঘুরে গেলো ফারিশের পানে। ফের তার আদলে ভর করলো চিরচারিত গাম্ভীর্যতা। জুনায়েদ নিজের ঘাড় সামান্য বাঁকা করে এক ভ্রু উঁচালো। পরপরই দু’কদম এগিয়ে গিয়ে আড়াল করলো স্বীয় স্ত্রী; অর্ধাঙ্গিনী এবং জীবনসঙ্গিনীকে। অত্যন্ত গম্ভীর এবং কঠিন স্বরে শুধালো,
— চোখ নিচে, জুনিয়র!
একসময়কার প্রিয়তমাকে মনের কুঠুরি পরিপূর্ণ করে দেখায় ব্যস্ত ফারিশ বাধা পেয়ে অত্যন্ত বিরক্ত হলো। চোখ উঁচিয়ে ওপরের নজর রাখতেই জুনায়েদের শক্ত চাহুনি উপস্থাপিত হলো। দু’জন পুরুষের অত্যন্ত কঠোর দৃষ্টি উভয়ের মধ্যকার ক্রোধকে ক্রমশ উপনীত করছে লাভাতে। ঝরে পড়লেই যেনো মূহর্তেই ধ্বংস হবে ধরণী। ফারিশ দমে গেলোনা। তাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে ফের ঘাড় কাধ করে মুখ খুললো অত্যন্ত নরম স্বরে,
— কেমন আছো আয়রা?
উঁহু! আয়রার তরফ থেকে মোটেই কোনো উত্তর এলোনা। জুনায়েদ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ফের নিজের বুক সমান স্ত্রীর পানে তাকালো। বোঝার চেষ্টা করলো–তার মনের অবস্থা। তবু, ঠাহর হলোনা কিছুই। পরপরই সে আরও খানিকটা আড়াল করে দাঁড়ালো রমণীকে। বক্র হেসে ফের বললো,
— গ্রেইট, জুনিয়রের দাপুটে হৃদয়ের তারিফ করতে হয়।
ফারিশ এবার নিজের ধূসর বর্ণের চোখদুটো রাখে নীল বর্ণের মণি দুটোয়। অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে বললো,
— আপনার সাথে কথা বলছিনা মিস্টার শাহরিয়ার!
হাসলো জুনায়েদ। নিজেকে শান্ত রাখার অবরুদ্ধ চেষ্টা তার মনে। সে চায়না আয়রার সম্মুখে কোনো হাঙ্গামা হোক। পুরুষটি বিদ্রুপের সহিত আওড়ালো,
— জুনিয়রের বুঝি আজ হাত-পা ভেঙে হসপিটালে ভর্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগেছে?
জুনায়েদের কোলে থাকা ছোট্ট সত্তা আমিরা খানিকটা নড়ে-চড়ে উঠলো। পেঁচিয়ে ধরলো পুরুষটির গ্রীবাদেশ। ফারিশের নজরে এলো তার অংশকে, রক্তকে। ছটফট করে উঠলো পিতৃসত্তা মুহূর্তেই। এক ফোঁটা স্পর্শ করার ইচ্ছেয় গন্ডদেশ শুকিয়ে কাঠ হলো। চাতক পাখির ন্যায় চোখদুটো অত্যন্ত অসহায় হয়ে এলো। মেয়েটা কেমন নেতিয়ে আছে। নিশ্চয় জ্বর উঠেছে? মেয়েটা জ্বরের সময় ফারিশের কোলে পড়ে থাকতো সারাটাক্ষণ। ফারিশ অস্থির হয়ে উঠলো, একদন্ড ছোঁয়ার আশা নিয়ে পা এগোলো। বাম হাতখানা এগিয়ে নিয়ে গেলো সম্মুখে। মূহুর্তেই জুনায়েদের বলিষ্ঠ হাতের বাধন গাঢ় হতে গাঢ়তর হলো। আমিরাকে নিজের সহিত চেপে ধরলো আরও একটু। শরীর পিঁছিয়ে নিলো সে অনায়াসেই। অতঃপর এবার প্রথমবারের মতো তার ধৈর্য্যের বাধ ভঙ্গুর হলো তার। শাসিয়ে উঠলো সে,
— ডোন্ট ট্রাই টু টাচ হার।
ফারিশের চোয়াল শক্ত হলো। বললো,
— আমি ওর জন্মদাতা, আই হ্যাভ দ্যা রাইট।
জুনায়েদের কাছে তা যেনো কোনো কৌতুক শোনালো। স্ত্রীকে ঠকানোর পূর্বে এ’কথা কী পুরুষটির মস্তিষ্কে ছিলোনা? সে এবার অধৈর্য্য হলো। কন্ঠে তার তীব্র তেজ,
— হু? হোয়াট?
— মিস্টার শাহরিয়ার, আমার ওকে কাছে পাওয়ার পূর্ণাঙ্গ হক রয়েছে। আমার মেয়ে ও, আমার অংশ।
জুনায়েদের নিকট এই কথাগুলো বড্ড তিক্ত শোনালো। আমিরা যদি একবার জেগে ওঠে কেলেঙ্কারি হবে। সে বিরোধ করলো এই কথখানার,
— স্টে আওয়ে ফ্রম মাই প্রিন্সেস, শি ইজ মাই বার্বিডল।
ফারিশ দমবার পাত্র নয়। তার কন্ঠ এপর্যায়ে একদম নরম হয়ে এলো। বড্ড অসহায় শোনালো তার কন্ঠ,
— আয়..রা, মেয়েটাকে একবার ছুঁতে দাও। এতোটা নিষ্ঠুর আচরণ করোনা।
নিরুত্তর আয়রা। জুনায়েদের মস্তিষ্ক এবার ধপ করেই গরম হয়ে গেলো। চাপাস্বরে ফুঁটে উঠলো ক্রোধ। দাঁত পিষে সে অল্প গর্জনের সহিত সাবধানী বাণী ছুঁড়লো,
— টেইক হার নেইম ওয়ান্স আগেইন এন্ড আই উইল ব্রেক ইচ এন্ড এভ্রি ইঞ্চ অব ইয়্যুর গডড্যাম বডি, ইয়্যু মাদারফাকার!!
[গল্পের স্বার্থে স্ল্যাং ওয়ার্ডস ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই গল্পের মেইল লিডের পরিবর্তন দেখাতে এটি জরুরি। কেও এসব না শেখার অনুরোধ রইলো।]
— একশোবার নিবো, ও আমার বাচ্চার মা!
জুনায়েদ চোখদুটো বুজলো। নিঃশ্বাস এ পর্যায়ে তার তীব্র হতে তীব্রতর হলো। নিয়ন্ত্রণ হারাতে আরম্ভ করলো তার মস্তিষ্ক। আঁখিজোড়া অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আমিরাকে একহাতে আকঁড়ে ধরে সে এবার বলিষ্ঠ ডান হাতের তর্জনী উঁচালো। সেই হস্তের ফর্সা চামড়ার আস্তরণ পেরিয়ে নীলরঙা রগদ্বয় ভাসমান। পেশিগুলো ফুলেছে। সে কড়া ভাষায় আওড়ালো,
— আরেকবার তুই ওকে নিজের বলে দাবি কর, সোয়্যার টু গড–❝আই উইল মেইক ইয়্যুর হুল লাইফ লুক এন্ড ফিল লাইক হেল ইন দিজ ফাকিং এন্টায়ার ওয়ার্ল্ড।❞
ফারিশের বুকটা মূহুর্তেই বিতৃষ্ণায় ভরে গেলো। নিজের বলে দাবী করতে পারবেনা মানে? নিজের নয় আয়রা তার? নয় নিজের? যার সাথে তার কিশোর বয়স কেটেছে সে তার নিজের নয়? ফারিশ তীব্র আক্রোশে আওড়ালো,
— কাবিননামায় সাক্ষর করলেই স্বামী-স্ত্রী হওয়া যায়না মিস্টার শাহরিয়ার। আপনারা জাস্ট নামের হাজব্যান্ড ওয়াইফ। খুব ভালো করেই জানি আমি আয়রাকে।
এই পর্যায়ে ধৈর্য্যের বাধ হু হু করে ভেঙে গেলো। সমুদ্রের তীব্র ঘূর্ণি আচমকা তীরে এসে আঁচড়ে পড়ার ন্যায় জুনায়েদ হামলে পড়লো ফারিশের ওপর। ডানহাত গিয়ে সোজা থামলো তার কলারে। হিংস্র হলো তার আদল। একহাতে ফারিশের গলার কাছের শার্টখানা টেনে ধরে কন্ঠ খাদে নামিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
— শি ইজ ‘মাইন’। বউ হয় আমার। আন্ডারস্ট্যান্ড? ইয়্যু ব্লাডি পিচ অব আ শিট। জুনায়েদ শাহরিয়ারের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয় কী করে তোর? চোখ উপড়ে কুত্তাকে খাওয়াবো বাস্টার্ড।
হিসহিসিয়ে কথাখানা বলতে বলতে পুরুষটির হাত ইতোমধ্যেই ফারিশের শার্টের কলার ছাড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। জোরেসোরে এক ঘুষি বসানোর পূর্বেই পেছন দিক হতে কেও তার শার্টের কোণা খামচে টেনে ধরলো। ক্রোধান্বিত জুনায়েদ জুনায়েদের মস্তিষ্ক এতোটা দুষ্কর পরিস্থিতির মাঝেও পেছনে থাকা রমণীটিকে মোটেই অবহেলা করলোনা। ঘাড় ঘোরালো। তখন তার চক্ষুযুগলের অবস্থা ছিলো করুণ। আয়রা জুনায়েদের হাত ছাড়িয়ে এবারে টেনে ধরলো পুরুষটির পেশিবহুল বাহু যে বাহুতে আমিরা আবদ্ধ। ক্রমাগত মাথা নাড়িয়ে সে ‘না’ বোঝাচ্ছে। জুনায়েদের কুঞ্চিত ভ্রু’যুগল বিরক্তিতে বেশ খানিকটা কুঁচকে উঠলো। মানতে ইচ্ছে করলোনা এই নিষেধ। সহসাই অপর হাতটি থেমে গেলো সম্মুখে অবস্থিত পুরুষটির মুখমণ্ডলের নক্ষত্র বাংলাদেয়ের মানচিতগে পরিবর্তন করার পূর্বে। সুযোগ পেলো আয়রা। মূহুর্তেই অপরপাশটায় গিয়ে চেপে ধরলো সেই হাতখানা। ফারিশের পানে না তাকিয়ে জুনায়েদের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। চোখদুটোতে তখন সদমান্য অসহায়ত্ববোধ। জুনায়েদ কিছু বলার পূর্বেই আয়রা জুনায়েদের শক্তপোক্স পেশিবহুল ক্রোধে ভরপুর হাত খানা নিজের নরম তুলতুলে কোমল হস্ত দুটোর মাঝে আঁকড়ে ধরলো। অতঃপর সেই হাতখানা বাম হাতের মুঠোয় পুরে অতি নিম্ন এবং দৃঢ় স্বরে আওড়ালো,
— আল্লাহর ওয়াস্তে, এখানে কোনো ঝামেলা করবেন না!
ব্যস! জুনায়েদ দমে গেলো। সদা-সর্বদা নাক উঁচু করে রাখা পুরুষ জুনায়েদের পাহাড়সম ইগো এবং অঢেল ক্রোধ মূহুর্তেই গলে জল হয়ে এলো। কেঁপে উঠলো বক্ষপিঞ্জর। অকস্মাৎ আয়রার স্পর্শে নীল আসমানসম গভীর চাহুনিতে ধরা দিলো একরাশ বিস্ময়তা। শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল নিমিষেই নরম হয়ে এলো। মসৃণ কপালের ভাঁজগুলো অদৃশ্য হয়ে সমান হলো মূহুর্তেই। সেই স্পর্শিত হস্তখনাার পানে তার নজর গিয়ে ঠেকলো। আয়রার হাত তার তুলনায় বড্ড ছোট। অথচ সেই হাতের সামান্য এক স্পর্শ জুনায়েদের সর্বাঙ্গ দুনিয়া নাড়িয়ে দিতে সক্ষম; সক্ষম জুনায়েদের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় সেই স্পর্শের তীব্রতা পৌঁছে দিয়ে নিঃশ্বাস থমকে দিতে। আয়রা জুনায়েদের মতামতের জন্য অপেক্ষা করলোনা। এখানে থাকলে এখন ঝামেলা হতে পারে। সে দ্রুতই জুনায়েদের বামহাতখানা নিয়ে দ্রুত আগাতে আরম্ভ করলো। ইতোমধ্যেই কেও কেও তাদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। জুনায়েদ কোনো ঘোরের মধ্যে বুঝি? পৃথিবীতে সে নেই! জুনায়েদের নজরদুটো তখনও তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে চেয়ে সেই লিলিপুটের দিকে। জুনায়েদ মালিকের মালিকানায় আবদ্ধ কোনো বিশ্বস্ত পোষা প্রাণীর ন্যায় আয়রার পিছু পিছু যেতে আরম্ভ করলো। যেনো সে সত্যিই আয়রাকে অনেকটুকু মেনে চলে। অপরপাশে আয়রার সেই ছোঁয়ার মাঝের অধিকারবোধটুকু জুনায়েদের শ্বাস থমকে দেয়। মনে মনে মস্তিষ্ক প্রতিটি নিউরনে কেবল একটি মাত্র কথা ছড়িয়ে দেয়,
— ক্লাবিং করা এই জুনায়েদের গায়ে যেখানে শত শত মেয়ের স্পর্শ লেগে; সেখানে এই রমণীর সামান্যতম স্পর্শে জুনায়েদ শাহরিয়ার বশ্যতা স্বীকার করেছে। রুখে দিয়েছে তার নিঃশ্বাস। থমকে দিয়েছে তার হৃদয়। কাঁপিয়ে তুলিয়েছে তার দাপুটে শরীর; হার মানিয়েছে তার পাহারসম ইগো এবং রাগ!
যে রমণী জুনায়েদ শাহরিয়ার–দ্যা গ্রেইট বেপরোয়া পুরুষটির রাগ সংবরণ করেছে, সে মেয়েটা কী বোঝে জুনায়েদের জীবনে ঠিক কতটা তার অবস্থান? ধারণা রাখে, মেয়েটা জুনায়েদের দুনিয়া ইতোমধ্যে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে?
উঁহু! মোটেই রাখেনা। জুনায়েদ অপলক চেয়ে রইলো। তবু, ফের একবার যাওয়ার হতবিহ্বল হয়ে ক্রোধের আগুনে জ্বলতে থাকা পুরুষটির পেছনে হিংস্রাত্মক বুলি আওড়াতে থামলো না,
— শি ইজ মাই ওয়াইফ, ওয়াইফ অব যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়া! রিমেম্বার।
অপরপাশে ফারিশ সম্পূর্ণ হতবাক। বিস্মিত। আয়রা তার দিকে ফিরেও চায়নি? না…না…না…এটা কিছুতেই হতে পারেনা। আয়রা কী করে এতো সহজে তাকে ভুলতে পারে? না, পারেনা। কিছুতেই পারেনা। ফারিশের মস্তিষ্ক ক্রমাগত বদ্ধ উন্মাদের পরিণত হতে আরম্ভ করলো। তার নজর নিবিষ্ট রইলো সেই দু’জনের ওপর। একটুও সরলো না তা। চোখদুটো টকটকে লাল। এতোটাই যে—কারও সম্মুখে এলেই ভয় পাবে। ফারিশের কাঠিন্যতায় ছেয়ে থাকা আদলে মূহুর্তেই ধরা দিলো অসহায়ত্ব। নড়তে পারলোনা সেই স্থান হতে। জমে রইলো বরফের ন্যায়। জুনায়েদ এবং আয়রাকে একত্রে দেখে হঠাৎ করেই তার পুরনো এক সুখকর স্মৃতির কথা মনে পড়লো। যেখানে সে এবং আয়রা একত্রে জায়ানামাজ বিছিয়ে নামাজ শেষে কথোপকথনে নিমগ্ন হয়েছিলো। আয়রা নামাজ শেষে স্বীয় স্বামীর কোলে মাথা রাখতে রাখতে পরম মমতা এবং যত্নে শুধিয়েছিলো,
— আমরা বৃদ্ধ বয়স অব্দি একসাথে থাকবো তো ফারিশ? আমাদের মেয়েকে বড় করবো আমরা একসাথে তাইনা?
আর ফারিশ সযত্নে স্ত্রীর হিজাবে ঘেরা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রত্যুত্তর করেছিলো এই বলে যে,
অবশ্যই, আমার মহারাণী, আমরা চিরসুখী হবো। একসাথে প্রতিটি সূর্যোদ্বয় এবং সূর্যাস্ত দেখবো। শেষসময় অব্দি আল্লাহর ইবাদত ও আমরা এভাবেই; একত্রেই করবো, আমার একান্ত অলকানন্দা!
আর আজ? কী হলো সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞার? কোথায় গেলো সেই সময়গুলো? আজ তার স্থান অন্যকারো দখলে। আয়রা স্পর্শ করছে অন্য এক পুরুষকে যে হাত কেবল তাকে ছোঁয়ার অধিকার রাখতো। অথচ সময়ের বহমনাতায় আজ সম্পূর্ণ ঘটনা পাল্টে গেলো। আয়রার জীবনে আজ কেবলই সে একজন পরপুরুষ ব্যতীত কিছু নয়। কিছুই নয়! ভঙ্গুর কন্ঠে ফারিশ নিজমনেই বিড়বিড় করলো,
— আ…আমার যে মন পুড়ছে অলকানন্দা। আমার কেনো যেনো খুব করে কষ্ট অনুভব হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে। বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে। আমার মেয়েটাকে প্রচণ্ড ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে; একটাবার ‘আব্বু’ ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কতদিন আমায় আগলে নেয়না, কথা বলেনা। আমি কী ভুল করে ফেললাম আল্লাহ? আমার বাচ্চাটা…ওকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকবো?
তার আকুল স্বরের মিনতি কী আল্লাহতায়ালার কাছে পৌঁছুবার? বিবেচনা করা হয়, মানুষের মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙার মাঝে কোনো তফাত রয়। সেখানে ফারিশ যে-কিনা একজন বাইজির জন্য নিজের মেয়েকে ত্যাগ করেছে। স্ত্রীকে দিনের পরদিন যাতনায় রেখেছে। অনুভব করিয়েছে স্বীয় স্বামী অন্য নারীর কাছে গেলে কেমন হয়। আর আজ, সেই একই অনুভূতি আল্লাহতায়ালা ফারিশের ওপর প্রদান করেছেন। আল্লাহতায়ালা সকল হিসেব রাখেন; তা আরও একবার প্রমাণিত হয় এর মাধ্যমেই। কারও কদর করতে না জানলে আল্লাহ তাকে তার নসিব থেকে তুলো নেন। আর সেখানে আয়রা ছিলো ফারিশের হেদায়েত। পবিত্র এক নির্ভেজাল সত্তা। আজ ফারিশও একই যন্ত্রণায় ভুগছে যে যন্ত্রণা আয়রা ঠিক দেড় বছর ধরে ভুগেছে। ফারিশের আজ প্রথমবারের মতো অনুভব হলো, পশ্ন জাগলো মনে,
তাকদীর পর্ব ১৭
—’ আচ্ছা, যেদিন আয়রা প্রথমবার তার পরকীয়ার কথা জানতে পেরেছিলো; জানতে পেরেছিলো তার পতিতালয়ে গমনের কথা–সেদিন আয়রা ঠিক কেমন অনুভব করেছিলো?
