Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৮

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৮

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৮
সাদিয়া সাদু

দিগন্ত দৃঢ় পায়ে সোফায় গিয়ে বসল। মুখে বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই। বরং তার চোখেমুখে কঠিন দৃঢ়তা, যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা কোনো হিসাব আজ এসে চুকিয়ে দিয়েছে।
সামনের দিকে দাঁড়িয়ে জহুরা খান।
কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। তাঁর চোখের সামনে এতদিনের সাজানো পরিকল্পনাটা যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যে বিয়েকে কেন্দ্র করে তিনি এত আয়োজন করেছিলেন, যে সিদ্ধান্তকে নিজের কর্তৃত্বে চূড়ান্ত বলে ধরে নিয়েছিলেন—দিগন্ত সবার সামনে সেই সিদ্ধান্তকেই প্রত্যাখ্যান করে দিল।
জহুরার সমস্ত ষড়যন্ত্রে যেন এক বালতি পানি ঢেলে দিল দিগন্ত।
জহুরার মুখ ক্রোধে শক্ত হয়ে উঠল।

— ‘ দিগন্ত! ‘
দিগন্ত চুপচাপ পায়ের উপর চাপ তুলে নাড়াচাড়া করছে । চোখেমুখে গাম্ভীর্য, তার পাশেই জিসা বসে কান্না করছে । তাকে শান্ত করার জন্য নাসিমা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে । তাদের মাথার উপর নাসিরউদ্দিন আর দীনা দাঁড়িয়ে। দুইজন দাঁড়িয়ে আছে ,‌দীনা বেগমের ঠোঁটের কোনে লেগে আছে একটু খানি হাসির ঝিলিক । তাদের পিছনে ঘিরে রেখেছে শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, তারা সবাই যেনো এক নাটকের দৃশ্য দেখছে ।
_’ তুমি আমাকে এইভাবে সবার সামনে অপমান করতে পারো না দিগন্ত। তোমার এতো টুকু শরীরটা আমি , এই আমি জহুরা গড়ে তুলেছি আর তুমি আমার উপর কথা বলছো , এতো সাহস কে দিয়েছে তোমায় ? ‘

_’ আমি অনেক কিছুই করতে পারি যা আপনার ধারণার বাহিরে , কিন্তু আমি আবার খুবই নম্র , ভদ্র ছেলে নয়তো এইখানে অনেক কিছুই আজ ঘটে যেত । ‘
জহুরা রাগের দিকবেদিক হারিয়ে বড় বড় পা ফেলে দিগন্তে নিকট এগিয়ে যায় , চামড়া কুঁচকে যাওয়া হাতটা উচিত থাপ্পড় মারতে গেলে , দিগন্ত তার শক্তপোক্ত খসখসে হাতের চেপে ধরে । মূহুর্তেই হলরুমে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় । নানান মানুষ নানা রকম কথা বলতে শুরু করে । সেই পরিস্থিতি সামলাতে নাসিরুদ্দিন এগিয়ে আসে । ছেলেকে ধমকে উঠে তাৎক্ষণিক।
_’এইটা কেমন বেয়াদবি দিগন্ত।‌ তোমার গুরুজনের সাথে বেয়াদবি করছো ? এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমায় ? ‘
দিগন্ত জ্বলন্ত আগুনের ন্যায় ধারালো চাহনি নিক্ষেপ করে বাবার দিকে , ধূসর রঙের চোখটা মূহূর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করে ।
ততক্ষণে জহুরার হাত ছেড়ে দেয় দিগন্ত। ধপধবে সাদা হাতটা মুহুর্তেই র*ক্ত জমাট বেঁধে যায় ।

_’তুমি আজ যা করলে তার কড়ায়গণ্ডায় হিসাব চুকাতে হবে তোমায় দিগন্ত খান ।
আজ আমি জহুরা খান এই জনসম্মুখে সবার সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে এই বাড়ি এবং খানদের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করলাম , কালকের ভেতর তুমি আইনি নোটিশ পেয়ে যাবে । ‘
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দীনা কপাল টানটান করে ফেলল ।‌ নাসিরউদ্দিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । মায়ের আদেশ অমান্য করার মতো ছেলে সে নয় । দিগন্ত একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল । সোফা ছেঁড়ে সটান দাড়িয়ে পড়ল । দৃঢ় পায়ে জহুরা খানের মুখোমুখি দাঁড়ায় । জহুরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় , দিগন্ত তার তাকানো দেখে ঠোঁট দুইটা আরেকটু বাঁকিয়ে হাত দুটো পটেকে পুড়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধারাল গলায় বলল।‌

_’ আমি দিগন্ত যদি চাই তাহলে এইখান থেকে কেউ আমাকে বের করতে পারবে না , কিন্তু এসবের দুই টাকা দাম আমার কাছে নেই । ইতালি আমি হাজার কোটি টাকার প্রোপার্টি ফেলে এসেছি , এই এই তো সামান্য ১২শো কোটি । ভোগ করছেন আর কয়েকটা দিন করেন , কিভাবে নিতে হয় তা আমি জানি । আপনার এই বা*লের অহংকার যদি আমি মাটির সাথে পিষে ফেলতে না পাড়ি তাহলে আমি এক বাপের না । ‘
জহুরা গলার স্বর কিছু টা নামিয়ে আনলো তাৎক্ষণিক । দিগন্তের কথা যেনো সে শুনলোই না , সেও সামান্য হাসলো , নীচু গলায় বলল ।
_’আমার রাস্তায় যে আসবে আমি পিষে ফেলতে দুইবার ভাববো না । সে যদি স্বয়ং তুমিও হও তাও না । ‘

দিগন্ত এইবার ঠোঁট দুইটা প্রসারিত করে হাসল ‌। আশপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল । প্রায় শতাধিক মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে । সকলের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ দুইটাই স্থির হলো নাসিরউদ্দিন এর দিকে , কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । তার সহজ-সরল বাপটাকে কতবা যে ঠকাচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই । দিগন্ত চোখ ঘুরিয়ে সামনে দাঁড়ানো দাদির দিকে তাকিয়ে একটু ঘাড়টা সামনে নিয়ে যায় । অত্যান্ত নিচু স্বরে বলল ।
_’আমার পরিবারের দিকে তাকালে চোখ উপড়ে ফেলার ক্ষমতা রাখি আমি । আমি নাসিরুদ্দিন খান না , দিগন্ত খান। আমার সাথে লাগবেন ? বুড়ো বয়সে জামাইয়ের ক্রেভিংস উঠলে আমি দায়ী নই। ‘

জহুরা কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করল , দিগন্ত একটু খানি হাসলো । ঝকঝকে সাদা দাঁত গুলো মেলে হাসল একটু । জহুরা আর এক মূহুর্ত দাঁড়াল না , বড় বড় পা ফেলে হলরুম ম ত্যাগ করল । দিগন্ত ও বাহিরের দিকে পা বাড়াল । দীনা বেগম দৌড়ে আসলো ছেলের পিছু ।
_’ রাত করে কোই যাস ? ‘.
ততক্ষণে দিগন্ত মেইন দরজা পেরিয়ে বাহিরে পা রাখল । মায়ের আগমন টের পেয়ে পিছু ফিরে চাইল ।
দীনাও ছেলের দিকে এগিয়ে আসলো ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে । দিগন্ত মায়ের চাহনি উপেক্ষা করতে পারেনি । সে একটু নরম গলায় বলল ।‌
_’ আমি জারুলা আর দিয়াকে কিশোরগঞ্জ রেখে আসছি ওইখানেই যায় । মেয়েটাকে না দেখলে অশান্তি লাগে । ‘

_’ আমিও যাবো কাল , আমার নাতনিটাকে এখনো দেখতে পারলাম না । ‘
চোখ দুইটা নামিয়ে ফেলল দীনা ।
দিগন্ত একটু কাছে এসে দাঁড়াল ।
ঠিক অমনি দুতলার পর্দাটা একটু নড়ে উঠল।
_’ ভুলেও এখন নানা বাড়ি যাওয়ার নাম নিবে না মা , কালবৈশাখী নেমে আসবে আমার মেয়ের উপর। তুমি শুধু তোমাদের দুইজনের উপর খেয়াল রাখবে । ‘
দিগন্ত চটপটিয়ে কথাটা শেষ করে দরজার সামনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পড়ল ।
গেইটের সামনে আসতেই ফুল দিয়ে সাজানো গোলাকৃতির ব্যানারে দিগন্ত আর জিসার নাম লিখে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে দিগন্ত শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে লা*থি ভেঙ্গে বেরিয়ে যায় । ‘

রাত ৮টা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট , খান বাড়ি সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ , বিশাল হলরুমটাই পিন পতন নীরবতা ‌। একটা গুরুগম্ভীর শ্মশান মনে হচ্ছে , চালদিকে ফুল ছিঁড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । একটু আগে জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে । ‌জহুরা সে যে রুমে কিল দিয়েছে এখনো বছর হয়নি । জিসা আর নাসিমা দুইজন একসাথে রওনা দেয় উপরে । দরজায় কড়া নাড়ার প্রয়োজন হয়নি দরজার। তার আগেই দরজা খোলে বেরিয়ে আসে জহুরা । দুইজনকে একসাথে দেখে জহুরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় ।

_’ তোমরা?’
অমনি জিসা ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না জুড়ে দেয় । জহুরা যেনো হতভম্ব হয়ে যায় । নাসিমাও মেয়ের এমন ব্যবহারে হতভম্ব, হকচকিয়ে যায় দুইজনই।
_’ আমারা এখন কি করবে আম্মু? দিগন্ত তো জিসাকে বিয়ে করতে না করে দিলো ।‌’
জহুরা নির্বাক কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি , তার ঘুমের প্রয়োজন তাই এখন এসব নিয়ে কথা বলতে আগ্ৰহ নেই তার ‌ । মেয়ে আর নাতনিকে রুমে পাঠিয়ে দেয় , যা করার কাল করবে।

রাত ১১টা দিগন্ত ,শহরের ব্যস্ততা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। চারপাশে নেমে এসেছে গভীর রাতের নীরবতা। দিনের কোলাহল পেছনে ফেলে দিগন্ত গাড়ি নিয়ে কিশোরগঞ্জের হাওরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সামনে দীর্ঘ পথ, অথচ তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই। বরং মনের ভেতর অস্থিরতা—জারুল আর দিয়াকে একবার নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত যেন তার শান্তি নেই।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন সে হাওরের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন রাত আরও গভীর। চারপাশ অন্ধকার, দূরে কোথাও দু-একটি বাড়ির আলো ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।
দিগন্ত গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হাত তুলে দরজায় দুবার টোকা দিল।
ভেতর থেকে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ এল না।
আবার টোকা দিতেই ভেতর থেকে ঘুমঘুম কণ্ঠ ভেসে এলো—

— কে?
দিগন্ত নিচু গলায় বলল,
— আমি।
ভেতরে নড়াচড়ার শব্দ হলো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। জারুল দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে গভীর ঘুমে ছিল। চোখ দুটো ঘুমে ভারী, চুল এলোমেলো হয়ে কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। পরনের জামাটাও করে কুঁচকানো, বুকে ওড়না নেই । মুখে ঘুম ভাঙার সেই স্বাভাবিক অস্পষ্টতা।
দরজা খুলে দিগন্তকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জারুল কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে শুকনো ঢোঁক গিলল ।
জারুল ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই আওড়াল

— তুমি এতো রাতে ? ‘
দিগন্তের চোখ তখন শুধু তাকে দেখতে ব্যস্ত , কি স্নিগ্ধ লাগছে , ক্লান্ত, ঘুমজড়ানো মুখটা দেখে তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা খানিকটা কমে গেল। দিগন্ত মৃদু স্বরে বলল,
— ঘুমাচ্ছিলে?
জারুল ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ… এইমাত্র ঘুমিয়েছিলাম।
দিগন্ত আর কিছু বলল না। জারুল কে উপেক্ষা করে দরজা মাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করল । দিয়া বিছানাল মাঝখান ঘুমোচ্ছে ।
দিগন্ত ভারী কাঁধটা নামিয়ে মেয়ের কপালে শব্দ করে চুমু খেয়ে নিম্ন স্বরে বলল ।‌
_’ খেয়েছো রাতে ? মেয়ে খেয়েছে ? ‘
_’হুমমম ‘
দিগন্ত এইবার ঘাড় ঘুরিয়ে জারুল এর দিকে তাকাল । জিহ্বা দিয়ে ওষ্ঠপট ভিজিয়ে একটা শুকনো ঢোঁক গিলল চোখ শুধু গলার নীচ থেকে কোমড় পর্যন্ত ঘুরাফেরা করছে । জারুল দিগন্তের চাহনি পরখ করে মিনমিনে আওড়ালো ।

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৭

_’ লুইচ্চা একটা ।‌’
দিগন্ত কথা খানা শুনে ফেলল । সে আবারো একি ভাবে তাকিয়ে আস্তে করে গেয়ে উঠল
‘ আমি নষ্ট মনে , নষ্ট চোখে দেখি তোমিকে,
মন আমার কি চাই বোঝায় কেমনে ….. ‘
_’মন তো খালি লুচ্চামি খোঁজে’
জারুল আর এক মূহুর্তও দাঁড়াল না উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ল । দিগন্ত সেই দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসল । ‘

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৯