Born to be villains part 38

Born to be villains part 38
মিথুবুড়ি

এক বান্ডিল কাঁচা টাকার বিনিময়ে তাসা তার ফোনটি দশ মিনিটের জন্য এলিজাবেথের হাতে তুলে দিল। এক বান্ডিল টাকার জন্য তাসা সব করতে পারে। সব। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত কিংবা জঘন্যতম কাজটাও এক বান্ডিল টাকার বিনিময়ে তাকে দিয়ে করানো সম্ভব। টাকার নেশা তার রক্তে।নয়তো বাবার বয়সী একটা লোকের র ক্ষিতা হতে যাবে কেন সে? তা-ও তাসার মতো এমন রূপসী আর লাস্যময়ী একটা মেয়ে!

টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে তাসা ড্রা গসের মতো ঘ্রাণ টেনে নিল। এলিজাবেথ বরফশীতল দৃষ্টিতে একবার তাসার দিকে তাকাল, তারপর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে সরে পড়ল। ফোনটা কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে সে নিঃশব্দে চলে গেল ইবরাতের রুমে।
পুরো ম্যানশনটা এলিজাবেথের কাছে একটা জ্যান্ত মৃত্যুপুরী। এখানে শ্বাস নিতে গেলেও যেন দম আটকে আসে। রাজপ্রাসাদসম এই বাড়ির প্রতিটি কোনায় সিসি ক্যামেরা বসানো, এমনকি এলিজাবেথের বেডরুমেও। আর সেগুলোর কন্ট্রোল রিচার্ডের হাতের মুঠোয়। তাই নজরদারি এড়াতে বাধ্য হয়ে সে ইবরাতের রুমে আশ্রয় নেয়।
বাথরুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে এলিজাবেথ দ্রুত ডায়াল করল প্রেম এহসান নামক একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে। নম্বরটি তার মুখস্থই ছিল। ওপাশে রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। এলিজাবেথের বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তার হাতে বাঁধা সময় মাত্র বিশ মিনিট। এক মিনিট এদিক-ওদিক হওয়া মানেই বিপদ ডেকে আনা।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর অবশেষে কলটা রিসিভ হলো। এলিজাবেথ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে চেপে ধরল।

“হ্যালো, ইট’স মি।”
ওপাশ থেকে প্রেমের চেনা টিটকারিময় কণ্ঠ ভেসে এলো,”হ্যালো টু! কে গো তুমি সুন্দরী?”
“আমি এলিজাবেথ।”
“বালজাবেথ?”
“হোয়াইট রাবিশ!” ধমকে উঠল এলিজাবেথ।
প্রেম ফোনটা এক কান থেকে অন্য কানে নিয়ে কাঁধের সাথে চেপে ধরল। তারপর হাতের ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “কে আপনি? পরিচয়টা একটু ঠিকঠাক দেবেন? আমি এই মুহূর্তে যেখানে আছি, সেখানে নেটওয়ার্কের সংকট।”
এলিজাবেথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূর্বের পরিচয়ে ফিরে গেল, “ইমামা ওয়াসিম বলছি।”
ওপাশের কণ্ঠে এবার অবাক করা আমোদ খেলে গেল,
“ওহ, রাশিয়ান! এক মিনিট হোল্ড করুন, বাঙ্কার থেকে বের হয়ে নিই।”
বাঙ্কারের ভেতরের সরু সুড়ঙ্গ পথ ধরে প্রেম গভীর জঙ্গলের দিকে হাঁটতে লাগল। জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রি-হাউসের ঠিক নিচে এসে শেষ হয়েছে সেই সুড়ঙ্গ। প্রেম তরতর করে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ট্রি-হাউস থেকে একটি বই তুলে ব্যাগে পুরে নিল। তারপর ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে আবার সেই পরিত্যক্ত ফার্মহাউসের দিকে পা বাড়াল। গভীর অরণ্যে ঢাকা ধুলো আর মাকড়সার জালে ঘেরা ফার্মহাউসটি দেখে স্পষ্টতই বোঝাই যায়, বছর খানিকের ভেতর এখানে কারোর পায়ের ছাপ পড়েনি।

ফার্মহাউসে প্রবেশ করতে করতে প্রেম বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, “হ্যাঁ সুন্দরী, এবার বলুন।”
এলিজাবেথ চিবুক শক্ত করে সতর্ক গলায় বলল,”একদম ফ্লার্ট করবেন না। ভুলে যাবেন না আমার হাজবেন্ড কে! কুচি কুচি করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে।”
প্রেম মোটেও ভয় পেল না, উল্টো অট্টহাসি হেসে ব্যঙ্গ করে বলল, “আমাকে একদম শাসাতে আসবেন না! ভুলে যাবেন না আমার ওয়াইফ কে? ব্রিটিশ স্পাই! কোনো প্রমাণ ছাড়াই আপনাকে গুম করে দেবে। হাহ্!”
এলিজাবেথ হতাশ গলায় বলল, “আপনি এখনো শুধরালেন না, অফিসার প্রেম।”

“ভালো হয়ে লাভ নেই। আপনার হাজবেন্ড তো আর দ্বিতীয়বার আপনাকে আমার সাথে বিয়ে দেবে না। সো, আমি যেমন আছি, আমাকে তেমনই থাকতে দেওয়া হোক।”
“আপনার জীবনের মায়া করেই বলছি অফিসার, আমার সাথে এভাবে কথা বলবেন না। আমার লোকটা মোটেও সুবিধাজনের নয়। বিশেষ করে আমাকে নিয়ে তার জেলাসি আকাশ ছোঁয়া। কাজের কথায় আসি? আপনি এই মুহূর্তে কোথায় আছেন?”
“মেক্সিকো।”
“হানিমুন ট্রিপ নাকি?”
প্রেম খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠল,”ধ্যাৎ, ছাতার মাথা! পাখি ডিভোর্স লেটার ফেলে রেখে উড়াল দিয়েছে।”
এলিজাবেথ অবাক হলো, “মানে?”

হাঁটতে হাঁটতে প্রেমের শ্বাস ঘন হয়ে আসছিল। সে ভারী নিঃশ্বাসের সাথেই উত্তর দিল, “ওয়েস্টার্ন কালচারের মেয়ে তো। অবহেলা সহ্য করতে পারে না। রোহিতের কেসটা নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ওকে ঠিকমতো সময় দিতে পারিনি। পাখি সেটা মেনে নিতে পারেনি। তারপর আর কী! ডিভোর্স লেটারটা মুখে ছুঁড়ে দিয়ে এক উড়াল দিল!”
এলিজাবেথের মনটা খারাপ হয়ে গেল, “আই ফিল সো ব্যাড ফর ইউ।”
তবে প্রেম ভেঙে পড়ার পাত্র নয়। সে উল্টো প্রাণোচ্ছল কণ্ঠে বলল, “আরে ব্যাপার না! আগে এই কেসটা ক্লোজ করি, তারপর বউকে খোঁজার মিশনে নামব। ততদিনে ম্যাডাম তার নিজের মিশনটা শেষ করুক!”

এলিজাবেথ ক্ষণিকের জন্য একটু মৃদু হাসল। একটা মানুষের স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে, অথচ লোকটা কতটা রিল্যাক্সড। কতটা নিশ্চিত ভাবে বলছে— কাজ শেষ করে সে আবার তার বউকে খুঁজে বের করবে। কিন্তু এলিজাবেথের এই হাসি বেশিখন স্থায়ী হলো না। আচমকাই একটা কথায় তার ভাবনা থমকে গেল। হোটচ খেলো।
সে শুকনো ঢোক গিলে তটস্থ কণ্ঠে বলে উঠল,”ওয়েট, ওয়েট… কী বললেন? রোহিতের কেস? তার মানে আপনি এখনো ওই কেসের পেছনে লেগে আছেন? আই মিন… ম্যাডবিস্ট?”
প্রেমের চওড়া হাসে,”ইয়েস।”

“ওহ গড! আপনি তো আসলেই জিনিয়াস! এত কিছুর পরও হাল ছাড়েননি!”
প্রেমের চওড়া চিবুক এবার আকস্মিকভাবে গম্ভীর হয়ে গেল। সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এতদিন কেসটা প্রফেশনালি হ্যান্ডেল করেছি। কিন্তু এখন বিষয়টায় পার্সোনালি চলে গেছে । তাকে তো আমার ধরতেই হবে, নয়তো নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যাব।”
এলিজাবেথের কপালে উদ্বেগের ভাঁজ পড়ে, “কিন্তু আপনি মেক্সিকোতে কী করছেন?”
প্রেম নিঃসঙ্গ ফার্মহাউজের ভেতর পা বাড়াল। বিশাল বড় বাড়ি, অথচ কোথাও কোনো মানুষের জীবনের স্পন্দন নেই। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে সে গূঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করল,”ওই রাইটারের কথা মনে আছে?”

এলিজাবেথ চট করে জবাব দিল, “হ্যাঁ, ক্যালভিন কৌহিলো।”
প্রেম নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা ঝাঁকাল, “ইয়েস, কিং অব ডার্ক রোমান্স, ডার্ক সাইকোলজি অ্যান্ড ট্রোপস জনরা। আর তার লেখা শেষ বইটার কথা মনে আছে? যার সমাপ্তি এখনো পাঠকদের মনে আক্ষেপের সুর তোলে?”
এলিজাবেথ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “হুম, Tea amo Rozabeth।”
“ইট’স নট জাস্ট এ ফিকশনাল স্টোরি। ইট’স হিজ রিয়েল লাইফ লাভ স্টোরি… ইফ আই’ম নট রং। অ্যান্ড রোজাবেথ ইজ ইয়্যোর টুইন সিস্টার।”
ধাক্কা খেল মেয়েটা। শরীর টলে গিয়ে ঠেকল বাথরুমের দেয়ালে। বিস্ময় সামলাতে না পেরে এলিজাবেথের কণ্ঠ থেকে উচ্চশব্দ ছিটকে বের হলো, “হোয়াট!”

“ইয়েস। আর একটা দারুণ সুসংবাদ শুনবেন?”
এলিজাবেথের কণ্ঠের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। প্রেম মৃদু হেসে বলল, “ওই বইটার একটা অরিজিনাল কপি এখন আমার হাতে।”
“কী! কীভাবে সম্ভব এটা?” এলিজাবেথের মাথা ঘোরাতে লাগল।
এলিজাবেথের এমন ব্যাকুল প্রতিক্রিয়া দেখে প্রেম ঠোঁট টিপে হাসল। সে ঠিক এই ধরনের উত্তেজনার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
“আমি এই মুহূর্তে কোথায় আছি জানেন?” প্রেম শুধাল।
“কোথায়?”

“রাইটার ক্যালভিন কৌহিলো, ওরফে ক্রীশ কায়নাতের ফার্মহাউজে।”
পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যটা এবার স্পষ্ট হলো।একটু আগে প্রেম যে ট্রি-হাউজে গিয়েছিল, সেটাও ছিল ক্যালভিন কৌহিলো ওরফে ক্রিশ কায়েনাতের। গভীর অরণ্যের নির্জনতায় ঘেরা ওটাই ছিল তার কল্পনার জগত, লেখার গোপন ঠিকানা। ওই নির্জন ট্রি-হাউজে বসেই সে তার পাঠকপ্রিয় সব বই সৃষ্টি করেছিল।
ওপাশ থেকে এলিজাবেথের কণ্ঠ কাঁপে, “ক্রীশ কায়নাত? ওয়েট, সারনেমটা…”
প্রেম এলিজাবেথকে শান্ত করার জন্য অভয় দিয়ে বলল,”রিল্যাক্স! এত উত্তেজিত হবেন না। ধীরে ধীরে প্রশ্ন করুন। তার আগে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিন।”,প্রেম গুনে গুনে বলতে লাগল, “ওয়ান, টু, থ্রি… ইয়াহ, দিস ওয়ে। গুড গার্ল। এই অবস্থায় এত অস্থির হতে নেই। আই নো ইউ আর প্রেগন্যান্ট।”

কথাটা শুনে এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলল। হঠাৎ করেই তার শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। সে নিচু স্বরে বলল,”আপনি জানলেন কী করে?”
“আমি সবই জানি। অস্থির হবেন না, আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে,” প্রেম উপরের সিঁড়ির সম্মুখে দেয়ালে টানানো একটি বিশাল পেইন্টিংয়ের সামনে থাকা সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে বসল। তারপর বলল, “আপনার দেবরের সোফায় আরাম করে বসলাম। এবার আস্তে-ধীরে প্রশ্ন করুন, আমি উত্তর দিচ্ছি… বা দাঁড়ান, আমিই গুছিয়ে বলছি।”
প্রেম প্রশ্ন করল, “নিউটনের বাবার নাম কী ছিল জানেন?”
এলিজাবেথের শ্বাস-প্রশ্বাসে জড়তা, সে ভারী গলায় উত্তর দিল, “নিউটন।”
প্রেম স্পষ্ট বুঝতে পারছে এলিজাবেথের ভেতরের অস্থিরতা। তাই সে আর তাকে দ্বিধায় না রেখে নিজেই বিস্তারিত বলতে শুরু করল,

“পশ্চিমে একটা বেশ জনপ্রিয় প্রথা ছিল,বাবার নামের সাথে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখা। শুধু সন্তানের নামের শেষে যোগ করা হতো ‘জুনিয়র’। যেমন, ক্যালভিন কৌহিলোর বাবার নামও ছিল কৌহিলো। সেই ঐতিহ্য মেনেই তিনি ছেলের নাম রেখেছিলেন জুনিয়র কৌহিলো। আর ‘ক্যালভিন’ নামটা রেখেছিল তার দাদু, যাকে সে পরবর্তীতে নিজের হাতে হত্যা করে। অ্যান্ড ইয়েস, হি ডিজার্ভড ইট! যদিও তারা কেউই তার আসল বাবা বা দাদু ছিল না। হি ওয়াজ এডাপ্টেড।”
এলিজাবেথ ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু এসব আমাকে কেন বলছেন?”

এলিজাবেথের অস্থিরতা দেখে প্রেম মৃদু হাসল,”বলছি, কারণ আছে। আপনার মুখ থেকে ক্যালভিন কৌহিলোর নাম শোনার পর থেকেই তার প্রতি আমার এক অদ্ভুত কৌতূহল তৈরি হয়। আই ডোন্ট নো হোয়াই, কিন্তু কোনোভাবেই আমি সেই কৌতূহল মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। যতই কেস নিয়ে ব্যস্ত থাকি না কেন, বারবার মূল কাজ থেকে ডিসকানেকটেড হয়ে যাচ্ছিলাম। তার ওই অদ্ভুত আচরণ, হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, আর ওই অসমাপ্ত বই—সবকিছু আমাকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর কৌতূহলটাকে আর চেপে রাখিনি, সরাসরি স্টাডি শুরু করে দিই। ইন্টারনেটে এই নাম ধরে ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন পুরোনো একটা পত্রিকার খবর আমার চোখে পড়ে। ঢাকা বোর্ডে বিরল চোখের, ধবধবে সাদা রঙের একটি ছেলে পড়ত। পড়াশোনায় সে অত্যন্ত মেধাভী হলেও জন্মসূত্রে বাংলাদেশী ছিল না। তার দাদু ছিলেন একজন বাংলাদেশী। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি একটি ব্যক্তিগত রিসার্চের কাজে পরিবার ফেলে বাংলাদেশে চলে আসেন। কিন্তু ক্রিশ তার দাদাকে ছাড়া থাকতে পারত না। তাই সে-ও দাদার টানে বাংলাদেশে চলে আসে এবং এখানেই পড়াশোনা শুরু করে। তবে তার আলাদা গড়ন, ধবধবে গায়ের রঙ আর বিরল চোখের কারণে স্কুলেই সে বুলিংয়ের শিকার হতো। কিন্তু ক্রীশ ছোটবেলা থেকেই ছিল ভীষণ রকম ভয়ংকর।

একদিন বুলিং সহ্য করতে না পেরে সে এক সহপাঠীর চোখে কলম ঢুকিয়ে দেয়! তখন সে মাত্র ক্লাস নাইনে। কলমটি এমনভাবে ঢুকেছিল যে বাচ্চাটি চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারায়। ঘটনাটি তখন চারদিকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশ কিছু পত্রিকায় নিউজও হয়। আর সেই পুরোনো নিউজ থেকেই আমি এসব তথ্য পাই। যেহেতু ক্রীশের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল বেশ প্রভাবশালী, তাই বিষয়টা নিয়ে পরবর্তীতে আর বেশি জলঘোলা করা হয়নি। কিন্তু ‘ক্যালভিন কৌহিলো’ নামটা তখন এমনভাবে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সবাই নামটাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। তখন এই নামটাই আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়। তাই ক্রীশ নিজে উদ্যোগ নিয়ে তার নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘ক্রীশ কায়নাত’। হ্যাঁ, সে এতটাই অ্যাডভান্সড ছিল যে নিজের নাম নিজেই রাখে! তখন ক্লাস নাইনে এসএসসির রেজিস্ট্রেশনের সময় ইচ্ছা অনুযায়ী নাম, জন্মসাল সব বদলে ফেলার সুযোগ ছিল। তখনকার দিনে তো আর আজকের মতো এনআইডি, স্মার্টকার্ড কিংবা অনলাইন জন্মসনদের কড়াকড়ি ছিল না। যদিও ক্রীশ আবার ফিরে গিয়েছিল মেক্সিকোতে। তবুও পনেরো বছর আগে মানুষজনের কটু কথা থেকে বাঁচতে যে নাম ও পরিচয় সে চিরতরে লুকিয়ে ফেলেছিল, দীর্ঘ পনেরো বছর পর আবার সেই নামেই বিশ্বজুড়ে নিজের নতুন পরিচয় গড়ে তোলে। একটি অপ্রিয় নামকে পুরো বিশ্বের কাছে সে প্রিয় করে তোলে।

এখন আপনি বলতে পারেন—একই নাম তো অনেকেরই হতে পারে! হ্যাঁ, আই এগ্রি। কিন্তু চোখ? একই নাম আর একই রকমের চোখ, এতটাও কাকতালীয় হতে পারে না, মিস ইমামা। আমি তাদের দুজনের চোখই দেখেছি। হুবহু একই চোখ, একই তেজ, একই বিরল রঙ। ছোটবেলার সেই ক্রীশ কায়নাত বড় হয়ে নামজাদা লেখক হয়েছে ঠিকই, সে নিজের নাম-পরিচয় বদলাতে পারলেও চোখ বদলাতে পারেনি। তার অতীত ধরে রেখেছে তার সেই হ্যাজেল রঙের চোখ।”
ওপাশে গভীর নীরবতা। প্রেম বুঝতে পারল এলিজাবেথ এখনো দ্বিধার সাগরে ভাসছে। তাই সে আরও ভেঙে বোঝাতে লাগল, “আপনিই তো বলেছিলেন, সেই রাইটার হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যায়, তাই না?”
এলিজাবেথ নিচু স্বরে সায় দিল, “হুমমম।”

“ইয়েস! আর সে হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ার পর থেকেই কিন্তু আপনার সাথে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এতো ডিটেলিং-এ যাবো না, আর আপনাকেও এক্সট্রা চাপ নিতে হবে না। আমি টাইমিং মিলিয়ে দেখেছি।”
এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলল। তার মাথাটা যেন ঝিম মেরে গেছে, তবে প্রেমের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো না। সে নিঃশব্দে মাথা নেড়ে অনেকক্ষণ পর ক্ষীণ কণ্ঠে শুধাল,
“কিন্তু আপনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে বইয়ের রোজাবেথ চরিত্রটিই আমার যমজ বোন?”
প্রেম উত্তর দিল, “ধীরে ধীরে সব বলছি। নাম আর মানুষ একই, এই সন্দেহ থেকে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমার আরও শক্ত প্রমাণের প্রয়োজন ছিল। তাই আমি মেক্সিকো যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু তখন আমি অসুস্থ ছিলাম, আমার পায়ে ইনজুরি ছিল, আর কোনো ফ্লাইটও পাচ্ছিলাম না। ঠিক তখন আমাকে কে হেল্প করেছিল জানেন?”

“কে?”
“রিচার্ড কায়নাত!”
এলিজাবেথ চমকে উঠল, “হোয়াট?!”
“হি সেন্ট মি হিজ প্রাইভেট জেট!”
“সবকিছু কেমন ধোঁয়াশা লাগছে, অফিসার।”
“তাই না? আমারও প্রথম প্রথম সব ধোঁয়াশা লেগেছিল। তারপর বুঝতে পারলাম—হি ইজ পিস।আমরা যা জানি বা জানতে চাইছি, সে তা আগে থেকেই জানে। এখন শুধু নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের সবাইকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। সে নিজের চালটা আড়ালে রেখে আমাদের সবাইকে সত্যিটা খোঁজার মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। রিপিট করছি—আমরা প্লেয়ার, আর সে কোচ। দাঁড়ান, একটা ছবি পাঠাচ্ছি, দেখুন।”

প্রেম সামনের দেয়ালের ছবিটি তুলে এলিজাবেথকে পাঠিয়ে দিল। এলিজাবেথ কাঁপা কাঁপা হাতে ইমেজটি ওপেন করল। হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে গিয়েও পড়ল না। সে শক্ত করে ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে কমোডের ওপর বসে পড়ল। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে তার আর রিচার্ডের মতো অবিকল দুটি চেহারা। দেয়ালে ঝুলানো লম্বা পেইন্টিংটিতে দেখা যাচ্ছে রিচার্ড সাদৃশ্য মানুষটা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে থুতনি রেখেছে এলিজাবেথ সাদৃশ্য মেয়েটার কাঁধে। রিচার্ড আর তার চোখের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, নিজের আর ক্যানভাসের মেয়েটার মধ্যে এলিজাবেথ বিন্দুমাত্র কোনো ফারাক খুঁজে পেল না। একই চুল, একই মুখাবয়ব!

এলিজাবেথের কাঁপা কাঁপা ঠোঁট নড়ে উঠল, “টুইন ট্রাবল!”
“ইয়েস। আপনি এই রহস্যে ফেঁসে যাননি, বরং আপনি নিজেই এই রহস্যের একটা অংশ। দ্য হ্যাজেল ওয়ান ওয়াজ ট্রাইং টু ফাইন্ড হিজ লাভ অব লাইফ অ্যান্ড ডিডেন্ট কেয়ার এনিথিং। তার পরিচয় নিয়েও সে চিন্তা করবে না, ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পাওয়ার জন্য সে এতোটাই ডেস্পারেট হয়ে আছে। অ্যান্ড দ্য ব্লু ওয়ান, হি ইজ প্রটেক্টিং হিজ লাভ অ্যান্ড অ্যাট দ্য সেইম টাইম ট্রাইয়িং টু ফাইন্ড আউট অল অব দিস। ওই বোকাটা শুধু প্রেমের পেছনেই ছুটে চলেছে, সত্য-মিথ্যের তোয়াক্কা করছে না। কিন্তু রিচার্ড কায়নাত! আগাগোড়া সবকিছু খুবলে বের করার চেষ্টায় আছে। হি ইজ দ্য রিয়েল মাস্টারমাইন্ড!”

নিজের একটা জমজ বোন আছে, এ কথা জানার পর এলিজাবেথ বহুবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেছে, তাকে অনুভব করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজকের এই ছবিটা দেখার পর তার ভেতরে যে অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো, এমনটা আগে কখনো হয়নি।
বর্ণিল যন্ত্রণায় এলিজাবেথের ঠোঁট ভেঙে কান্না আসে। সে কষ্ট চেপে কেবল একটাই প্রশ্ন শুধাল, “আমার বোন কি বেঁচে আছে?”
“চান্সেস ফিফটি-ফিফটি। আমি ইতালি আসছি, বাকি কথা সামনাসামনিই হবে। আর বইটা পড়লে আশা করি সবকিছু আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
প্রেম ফোনটা কেটে দিল। এলিজাবেথ যেভাবে বসে ছিল, সেভাবেই স্তদ্ধ হয়ে হয়ে বসে রইল। দু’চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল আর বুকের ভেতর শুরু হলো প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড়। তার বোন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র ৫০ শতাংশ?

এলিজাবেথ বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখল, ইবরাত জামার নিচে পেটে বালিশ গুজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে। কৃত্রিম ফোলা পেটে বেশ মনোযোগ দিয়ে হাত বোলাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এক হাত কোমরে চেপে ধরে অন্য হাত পেটে রেখে একদম সত্যি সত্যি অন্তর্বাসিনীদের মতো ভারী শরীরে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করছে।
“ইবরাত, তুই এসব কী করছিস?”
ইবরাত পিছন ফিরে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। কোনো লজ্জাসংকোচ তো দূর, বরং নিজের কাজে আরও বেশি মন দিল সে। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল, “প্র্যাক্টিস করছি।”
“কীসের প্র্যাক্টিস?” এলিজাবেথের চোখে বিস্ময়।

ইবরাত ঝটপট পেটের ভেতর থেকে বালিশটা টেনে বের করে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর দৌড়ে গিয়ে এলিজাবেথের কাছে পৌঁছে আহ্লাদী সুরে বলল, “তোর তো বেবি হবে। বিলেত রাজা আমাকে মেনে নিলে আমারও তো একসময় হবে, তাই না? সেজন্য আগে থেকেই প্র্যাক্টিস করে রাখছি, যাতে পরে আর ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। গম্ভীর পুরুষরা খুব রোমান্টিক হয়। আমি জানি, আমার কোল উনি কোনো বছরেই খালি রাখবে না।”
কথাগুলো বলতে বলতেই ইবরাত যেন কাল্পনিক জগতে হারিয়ে গেল। দু-হাত মুঠো করে দু’গালে চেপে ধরে স্বপ্নালু চোখে বলে উঠল, “লোকটা শুধু একটা বার সুযোগ দিক। ইতালির জন্মহার বাড়িয়ে দিতে না পারলে আমার নামও ইবরাত না।”

“বস, আপনি কী করে জানলেন ব্ল্যাকহকের ওপর অ্যাটাক হতে পারে?”
ড্রাইভিং সিট থেকে ন্যাসোর প্রশ্নটা তেড়ে এলো। রিচার্ড আইপ্যাডে কিছু একটা দেখছিল। ন্যাসোর কথায় সে মুখ তুলে ফ্রন্ট মিররে তার চোখে চোখ রাখল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে রহস্যের হাসি ফুটিয়ে আওড়ালো,
“চোখ!”
পাশ থেকে কৌতূহলী লুকাস জানতে চাইল, “চোখ! মানে?”
রিচার্ড আইপ্যাড সরিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার রহস্যময় হাসিটা আরও চওড়া হলো, “মানুষ শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও দৃষ্টি লুকাতে পারে না। চোখের ভেতরেই লুকানো থাকে সমস্ত সত্য।”

রিচার্ডের এই দার্শনিক কথার গভীরতা লুকাসের মোটা মাথার একদম ওপর দিয়ে গেল। ন্যাসোও ঠিক পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারল না। সে তখনও প্রশ্নবিদ্ধ চোখে রিচার্ডের দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাদের বিভ্রান্তি দেখে রিচার্ড তুষ্ট হেসে খুলে বলতে শুরু করল,
“সেদিন সে আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না ঠিকই, কিন্তু তার শিকারি দৃষ্টি ঘুরেফিরে ঠিকই শিকারের ওপর গিয়ে পড়ছিল। ম্যানশনের প্রতিটি কোণ যে সে বারবার মেপে নিচ্ছিল আর ব্ল্যাকহকের দিকে তাকাচ্ছিল, তা আর কারও চোখে না পড়লেও আমার চোখ এড়ায়নি। ওদের প্রথম টার্গেট ছিল ব্ল্যাকহক, আর দ্বিতীয় টার্গেট ম্যানশনে প্রবেশ করা। যদিও চেষ্টার কোনো কমতি রাখে না…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই মাঝখান থেকে ন্যাসো বলে উঠল,
“কিন্তু এটা তো অসম্ভব!”
রিচার্ড গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, “জানি। সেই কারণেই সোফিয়া থাকা সত্ত্বেও রেডকে আমি এখানে রেখেছি। এই ম্যানশনের চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর একটাও হতে পারে না।”
এবার দুজনেই স্পষ্ট বুঝতে পারল, এতসব জটিলতার পরও রিচার্ড কেন এলিজাবেথকে এই ম্যানশনে রাখার সিদ্ধান্তে অটল। নিরাপত্তার দিক থেকে সত্যিই এর চেয়ে সুরক্ষিত জায়গা আর হতে পারে না। প্রথমত, সমুদ্রের বুকে একা নির্জন একটি দ্বীপ, যেখান থেকে আকাশপথে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। আর জলপথ? গোটা দ্বীপটি ড্রাগন সোলজারদের কড়া প্রহারায় ঘেরা। তা ছাড়া সেদিনের ঘটনার পর সুড়ঙ্গ পথটাও রিচার্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
ন্যাসো কিছুক্ষণ চুপ থেকে চিন্তিত গলায় বলল, “সব তো বুঝলাম বস। কিন্তু এক বনে দুই বাঘিনী! বিষয়টা কেমন হয়ে গেল না? ম্যাম কখনোই সোফিয়াকে মেনে নিতে পারবে না। আবার নিজের জিনিসের প্রতি সোফিয়া কতটা যে ভয়ংকর হতে পারে, তা তো আপনি ভালো করেই জানেন। তা ছাড়া ইদানীং সোফিয়ার আচরণটাও কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে।”

“শুধু ইদানীং?” রিচার্ড কেমন করে যেন ন্যাসোর দিকে তাকাল। ন্যাসো সেই দৃষ্টির গভীরতা মেলাতে পারল না।
রিচার্ড বলতে লাগল, “ডোন্ট ওয়ারি। এই বনে বাঘিনী একটাই। আর সে হলো আমার বাঘিনী। আর রইল বাকি ওই বিচটার কথা? লিভ ইট। হসপিটালে চলো। ব্ল্যাকহককে দেখে অফিসে যাব। সোফিয়ার বিষয়টা লাড়া স্ট্রোন সামলে নেবে। ছুটি কাটিয়ে সে কাজে ফিরছে।”
লুকাস অবাক হয়ে রিচার্ডের দিকে তাকাল, “আপনি সোফিয়ার পেছনে স্পাই লাগিয়েছেন?”
রিচার্ড মুখে জবাব না দিয়ে শুধু মাথা নাড়ল। ন্যাসো আর নিজের বিস্ময় ধরে রাখতে পারল না, সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কবে থেকে বস? তার মানে সোফিয়াকে আপনি অনেক আগে থেকেই সন্দেহ করতেন? কিন্তু কবে থেকে?”

“যেদিন সোফিয়া প্রথম এসে বলল যে সে আমাকে ভালোবাসে,সেদিন থেকেই।”
ন্যাসো আর লুকাস একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। যে সন্দেহের বীজ তাদের মনে আজ রোপিত হলো, সেই সন্দেহ তাদের বসের মনে জন্ম নিয়েছিল আরও এক বছর আগে! তারা আবারও তাদের বসের দূরদর্শিতায় মুগ্ধ না হয়ে পারল না।
কিছু মুহূর্ত কাটল নীরবতায়। অনেকক্ষণ ধরেই ন্যাসো কিছু একটা বলার জন্য উসখুস করছিল। শেষমেশ বেশিক্ষণ সেই দ্বিধা চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেলল,
“বস, ম্যামকে কি সত্যটা জানাবেন না?”
“কী জানাব?”
“দ্যাট, ইউ কিলড হার…”
ন্যাসোর বাক্য শেষ হওয়ার আগেই রিচার্ড হঠাৎ গর্জে উঠল,
“উই হ্যাভেন্ট ফাউন্ড হার ডেড বডি!”

ন্যাসো সজোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামাল। পেছনে ঘুরে রিচার্ডের দিকে তাকাতেই বসের এই নির্লিপ্ততা দেখে সে অবাক না হয়ে পারল না।
“হোয়াট! এসব কথা বলে কি আপনি নিজের অপরাধ হালকা করার চেষ্টা করছেন? ইউ শট হার! শি ফেল ফ্রম দ্য নাইন্থ ফ্লোর। নয় তলা! বুঝতে পারছেন? এত ওপর থেকে পড়ে কোনো মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। ওয়েট, ওয়েট… আপনার মাথায় নতুন কোনো প্ল্যান ঘুরছে না তো? আপনি কি সত্যিই ভাবছেন সে বেঁচে আছে…?! এই কারণেই কি সেদিন হাতের কাছে পেয়েও মারেননি ম্যাড….”

ন্যাসো তার কথা শেষ করতে পারল না। সমুদ্র-নীল চোখের রক্তলাল চাহনি তার ভেতরের সব সাহস এক নিমেষেই শুষে নিল। সে শুকনো ঢোক গিলে আবার গাড়ি স্টার্ট দিল।
এবার নিচু গলায় মুখ খুলল লুকাস, “আপনি কিন্তু চাইলেই সব সমস্যার সমাধান এক দিনেই করে দিতে পারেন। কেন করছেন না?”
এবারও রিচার্ডের উত্তর বড্ড নির্লিপ্ত, অথচ তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময় চওড়া হাসি।
“রহস্য, রহস্য খেলতে বেশ লাগছে।”
লুকাস আড়চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাল। চোখেমুখে সন্দেহ ফুটিয়ে জানতে চাইল, “তবে কি রিচার্ড কায়নাত এবার মাঠে নামবে না?”
“এবার আমি কোচ হয়ে মাঠ নিয়ন্ত্রণ করব। কাম অন লোকা, আমার এখন ছোট্ট একটা পরিবার হয়েছে। আই গট মাই ড্রিম গার্ল! কিছুদিন পর আমরা দুজন থেকে তিনজন হতে যাচ্ছি। এই সময়টা আমার ওদের পাশে থাকা উচিত। অযথা মাঠে নেমে সময় নষ্ট করতে যাব কেন? ইতিমধ্যে মাঠ খেলোয়াড়ে ভরে গেছে। ট্রাস্ট মি, দে অল আর লাইক ফায়ার!”

হসপিটালের বেডে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে নিক। ডান পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশটুকু আর নেই। সাদা ব্যান্ডেজে শক্ত করে মোড়ানো পা-টা। অথচ এমন এক ট্র্যাজেডির পরও সে ভীষণ রকমের নির্ভার। এক মনে ফোনে গেম খেলে যাচ্ছে।
পাশে বসে থাকা সুরাকার অপরাধবোধে জর্জরিত কণ্ঠে বলে, “আই’ম স্যরি, নিক। আমার জন্যই তোমার পা-টা হারাতে হলো।”
কথাটা শুনে কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে সুরাকারের দিকে তাকাল নিক। মৃদু ভ্রু কুঁচকে বলল, “কবে থেকে আমার সাথে এত ফরমালিটি দেখানো শুরু করলে?”
সুরাকারের মুখে এখন মাস্ক নেই। কাশ্মিরী আপেলের মতো টকটকে ফর্সা মুখটা বিষণ্নতায় ভেতর থেকে চুপসে গেছে। সে কণ্ঠে গভীর ভার এনে বলল, “বিষয়টা ফরমালিটির নয়, নিক। তুমি একটা পা হারিয়েছ! সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছ, বুঝতে পারছ? আর সেটাও শুধুমাত্র আমার জন্য!”
নিক গেম থেকে চোখ সরিয়ে একগাল হেসে উত্তর দিল,”এক পা হারিয়েছি তো কী হয়েছে? ভর দিয়ে হাঁটার জন্য সারাজীবন তোমার কাঁধ তো আছেই। কী, নেই?”

শরীরের এত বড় একটা অঙ্গ হারিয়ে ফেলার পরও নিকের এমন নিরঙ্কুশ বিশ্বাস আর নির্ভরতা দেখে সুরাকারের বুকটা কেঁপে উঠল। আবেগে চোখ দুটো ছলছল করে এলে সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল নিকের হাতটা। নিক চমৎকার হাসল। সুরাকারের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমার জন্য তুমিই কি কম রিস্ক নিয়েছ জীবনে? উল্টো আমার পাগলামির জন্য বারবার তোমাকে ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়েছে।”

নিকের কথায় কোনো ভুল ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ব্যাটম্যানের প্রতি তার মারাত্মক আসক্তি ছিল। সময়ের সাথে সাথে সেই আসক্তি এমন এক পর্যায় পৌঁছায় যে, সে নিজেকে সত্যি সত্যিই ব্যাটম্যান ভাবতে শুরু করে। আর সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তার রূপকথার মতো সব ছেলেমানুষি! মুখে ব্যাটম্যানের মাস্ক এঁটে উঁচু ছাদ থেকে লাফ দেওয়া, এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার চক্করে কতবার যে হাত-পা ভেঙেছে সে! এমনকি দুই ভবনের মাঝে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। আর প্রতিটা বারই তার রক্ষাকর্তা হয়ে এগিয়ে এসেছিল সুরাকার। নিকের এসব খামখেয়ালির মাশুল গুনতে গিয়ে কয়েকবার জেলেও যেতে হয়েছে, আর সুরাকারই প্রতিবার ছুটে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে এনেছে। কখনো তো তাকেও জেলে যেতে হয়েছে নিকের জন্য।

স্মৃতির অতলে ডুব দিতেই বিষাদের মেঘ কেটে গেল দুজনের। সোনালী অতীতগুলোর কথা মনে করে হসপিটালের থমথমে আবহাওয়ার মাঝেই একসঙ্গে হেসে উঠল দুই বন্ধু। দীর্ঘ দুই বছর পর সুরাকারকে এমন মুক্ত মনে হাসতে দেখল নিক। হাসলে সুরাকারের বাঁ-গালে একটা সুন্দর টোল পড়ে। এই একটা জায়গায় দু’জনের ভারি মিল! নিকের টোল পড়ে ডান-গালে, আর সুরাকারের বাঁ-গালে। অথচ ছেলেটা কত বছর যে মন খুলে হাসেনি! নিক তার সেই টোলপড়া হাসির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বলল,
“তোমার হাসিটা যে কত সুন্দর! তাও তুমি এত কম হাসো কেন?”
মুহূর্তের মধ্যেই সুরাকারের মুখের হাসি বিষাদের মেঘে ঢেকে গেল। সে একচিলতে আর্দ্র হেসে বলল, “জীবন যে আমার হাসার সব কারণ কেড়ে নিয়েছে, নিক।”
সুরাকারের বুকের ভেতর কেমন যেন শাঁসালো যন্ত্রণা চেপে বসল। সেই চাপ সরাতে সে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন করল,

“কিন্তু তুমি ধরা পড়লে কী করে?”
নিমেষেই নিকের মুখের সরল ভাবটা মিলিয়ে গেল, শক্ত হয়ে উঠল চিবুকের হাড়। বিষাক্ত ক্ষোভ আর আক্রোশে গজরাতে গজরাতে সে বলল, “শয়তানটা শেয়ালের মতো ধূর্ত… আমি যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি চালবাজ!”
নিক ফিরে গেল সেদিনের সেই রোমহর্ষক মুহূর্তে…
ন্যাসো সেদিন অত্যন্ত কৌশলে নিকের জামায় যে ডিভাইস লাগিয়ে দিয়েছিল, সেটার মাধ্যমে রিচার্ড খুব সহজেই ব্ল্যাকহকের আশেপাশে নিকের উপস্থিতি সনাক্ত করতে পারছিল। রিচার্ড আগে থেকেই জানত তার ব্ল্যাকহকের ওপর আক্রমণ হতে পারে, আর তার সেই সন্দেহ পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যখন সে ড্রাগনের গ্রুপের আশেপাশে নিকের আনাগোনা টের পায়। কারণ, ব্ল্যাকহককে শিকার বানানোর আগে দূর থেকে তাকে কয়েকদিন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা নিক। সে জানত, চাইলেই হুট করে ব্ল্যাকহকের ওপর হামলা চালানো সম্ভব ছিল না। ব্ল্যাকহক অত্যন্ত ভয়ংকর, আর রিচার্ডের পোষা প্রাণীটি তার মালিকের মতোই প্রখর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। তাই দীর্ঘ সময় নিয়ে সূক্ষ্ম একটি পরিকল্পনা সাজায় তারা।

সেদিন নিকের শিষের মোহাবিষ্ট সুরে অন্ধ হয়ে ব্ল্যাকহক তার গাড়ির পিছু পিছু উড়ে আসছিল। হঠাৎ করেই নিক একটি ভবনের সামনে কষে ব্রেক চাপল। ব্ল্যাকহক কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ওপর ছুঁড়ে মারা হলো একটি জাল। কিন্তু বোকার দল জানত না, সাধারণ জালে তাকে আটকে রাখা অসম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে তীক্ষ্ণ ঠোঁটের আঁচড়ে জাল ছিঁড়ে ফেলল ব্ল্যাকহক। নিক তাকে শিকার করতে চাইছে বুঝতে পেরে হিংস্র ভঙ্গিতে সে আক্রমণ করতে উদ্যত হতেই, নিক তার একটি ডানায় গু লি চালাল। আছড়ে নিচে পড়ল ব্ল্যাকহক। কিন্তু ক্ষান্ত না হয়ে আবারও উড়াল দেওয়ার চেষ্টা করতেই, নিক তার দ্বিতীয় ডানা লক্ষ্য করে দ্বিতীয় গু লিটি ছুড়ল। বিশাল বিশাল পালকের ভেতর দিয়ে র ক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। দুটি ডানাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্ল্যাকহক আর উঠে দাঁড়াতে পারল না।

তবুও তখনও তার চোখের আগুন নেভেনি। নিচে র ক্তা ক্ত অবস্থায় পড়ে থেকেও নিকের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে। র ক্তা ক্ত ব্ল্যাকহককে ওভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে নিকের মনে একচিলতে মায়ার উদয় হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই যখন ব্ল্যাকমাম্মাকে নৃশংসভাবে মারার দৃশ্যটি মনে পড়ে গেল,তখন তার মাথায় খু নের নেশা চেপে বসল। তার সমস্ত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ গিয়ে জমা হলো ব্ল্যাকহকের তীক্ষ্ণ, ধারালো ঠোঁট দুটোতে, যে ঠোঁট দিয়েই নির্ম মভাবে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছিল ব্ল্যাকমাম্মার দেহ।
নিক এবার রিভ লবারটি তাক করল ব্ল্যাকহকের মাথা লক্ষ্য করে। সে ট্রিগার প্রেস করতেই ঝড়ের গতিতে একটি গাড়ি এসে ব্রেক কষল তার সামনে। গুলিটি সোজা গিয়ে লাগল রিচার্ডের গাড়ির বুলেটপ্রুফ কাচে। গাড়ির ভেতর থেকে বিদ্যুতাবেগে বেরিয়ে এলো রিচার্ড। নিচে র ক্তা ক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ব্ল্যাকহককে দেখামাত্র তার সমুদ্র-নীল চোখ দুটো র ক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। রিচার্ড ছুটে গিয়ে র ক্তা ক্ত ব্ল্যাকহকের বিশাল শরীরটা বুকে তুলে নিল।

এদিকে আজই প্রথম এত কাছ থেকে রিচার্ডের মুখোমুখি হলো নিক। রিচার্ডের এই সাদৃশ্য অবয়ব তার বুকের ভেতর তীব্র কম্পন সৃষ্টি করল। তবে তারচেয়েও বেশি আতঙ্কের সঞ্চার করল এই সমুদ্র-নীল চোখের ভয়াল ও হিংস্র দৃষ্টি। এর আগে হ্যাজেল চোখের শীতল চাহনিতে বহুবার শিউরে উঠেছে নিক। সে ভাবত, ওই হ্যাজেল দৃষ্টির চেয়ে মোহাবিষ্ট, শীতল আর ক্ষুরধার বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু রিচার্ডের এই নীল চোখের হিংস্রতা তার সেই ধারণাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আতঙ্কে নিকের হাত কেঁপে উঠল, ঠাস করে খসে পড়ল রি ভল বারটা।
রিচার্ড পৈ শাচিক অবয়বে নিকের দিকে তাকাল। রণগর্জনের মতো গর্জে উঠে বলল,”এক… দুই… তিন… পালাতে পারলে বেঁচে যাবি!”,প্রতিটি সংখ্যা গণনার সাথে সাথে রিচার্ড এক কদম করে এগোতে লাগল, নিক ভয়ে পিছাতে লাগল।,”চার… পাঁচ… আর যদি একবার তোকে ধরতে পারি—গড প্রমিজ, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তুই নিজের মৃত্যু ভিক্ষা করবি। কারণ, সবার দাফনে কাফন জোটে না। কারও কারও দাফনে পরম তৃপ্তিও আসে… ছয়… সাত…”
গণনা শেষ হওয়ার আগেই নিক কোনোমতে গাড়িতে উঠে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে গিয়ার চেপে ধরল। চোখের সামনে গাড়িটিকে ঝড়ের বেগে পালিয়ে যেতে দেখে রিচার্ডের ঠোঁটে ফুটে উঠল বিভৎস হাসি।

সেদিন নিকের নাগাল পেতে রিচার্ডের লেগেছিল মাত্র সাত মিনিট! সেদিন রিচার্ডের দেহে এমন এক পৈ শাচিক উন্মাদনা ভর করেছিল যে, তার তাণ্ডবের সামনে নিকের আত্মরক্ষার সমস্ত কৌশলই ধূলিসাৎ পড়ছিল। নিককে ধরে ফেলা মাত্রই রিচার্ড প্রথমেই হ্যাঁচকা একটানে তার একটি পা শরীর থেকে উপড়ে নিয়ে মাঝরাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে। তারপর র ক্তাক্ত নিকের অপর পা-টিও একইভাবে ছিন্নভিন্ন করার জন্য রিচার্ড যখন হিংস্রভাবে হাত বাড়াল, সেঔ চরম মুহূর্তে নিকের ক্ষুরধার, ধূর্ত বুদ্ধিমত্তা তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনে। যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতেই সে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল, “ম্যাডাম… এলিজাবেথ!”
নামটি শোনামাত্র থমকে গিয়ে চমকে পেছনে তাকাল রিচার্ড। আর সেই সুযোগটিকই কাজে লাগাল নিক। নিজের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে দিয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। ভাগ্যচক্রেসেই মুহূর্তে নিচ দিয়ে সাঁ সাঁ করে যাচ্ছিল একটি চলন্ত ট্রাক। যার কারণে সেদিন অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে পালাতে পারে নিক।

“আমি ওর মুখোমুখি হয়েছিলাম।”
নিক রাগে ফুঁসছিল। কিন্তু সুরাকারের মুখ থেকে বের হওয়া এই নিরাসক্ত কথাটা শুনে সে থমকে গেল। একরাশ শিউরে ওঠা বিস্ময় নিয়ে সে তাকাল,
“হোয়াট?”
সুরাকার ধীরে মাথা নাড়ল, “তুমি হেল্প চাওয়ামাত্রই আমি তোমার লোকেশন ট্র্যাক করি। কিন্তু আমি পৌঁছানোর আগেই তুমি উপর থেকে ঝাঁপ দাও। ঠিক তখনই সে আর আমি মুখোমুখি হই। আমরা ব্রিজের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলাম, অথচ আমাদের দু’জনের দৃষ্টি এসে মিলেছিল একই বিন্দুতে।”
নিক ফ্যালফ্যাল করে সুরাকারের দিকে তাকিয়ে রইল,”তারপর?তুমি… তুমি তাকে হিপনোটাইজ করোনি?”
সুরাকার মাথা নেড়ে না বলল। তার শান্ত ভাব দেখে নিক অবাক না হয়ে পারল না। তার চোখে ততক্ষণে ঘন কুয়াশার মতো গাঢ় বিস্ময় জমে উঠেছে।
“এত কাছ থেকে পেয়েও তাকে বশ করতে পারোনি? লাইক, সিরিয়াসলি?”
সুরাকার তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল, বলল,”এখানেই আমার ব্যর্থতা। তার দৃষ্টির তীব্রতা আমাকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওই চোখে এমন সম্মোহন আছে, যাকে বশ করা অসম্ভব। বরং উল্টে সে যে কাউকেই স্থবির করে দিতে পারে, যে কারও আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। ওর ওই দৃষ্টি যেন তীরের মতো এসে আমার বুকে বিঁধে আমাকে ব্যর্থতার সিলমোহর পরিয়ে দিয়ে গেল।”
নিক থমথমে দৃষ্টিতে তখনও সুরাকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। তবে সুরাকার এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনার আড়ালেও অনেক কিছু চেপে গেল।

সে ফিরে গেল সেদিনটাতে…
ঘটনাস্থলে সুরাকার যখন পৌঁছায়, রিচার্ড সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তার মুখে লেগে ছিল র ক্ত। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ব্রিজের ওপ্রান্তের নিষ্প্রভ, স্থির দুটো চোখের ওপর তার দৃষ্টি গিয়ে থমকে গেল, যে চোখদুটো অপলক তাকিয়ে ছিল তার দিকেই। সেদিন রিচার্ড কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। মাস্কের অন্তরাল থেকে উঁকি দেওয়া হ্যাজেল রঙের চোখ দুটোর দিকে স্রেফ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ভারী, গমগমে পদক্ষেপে গাড়িতে গিয়ে বসে। তৎক্ষনাৎ সেই জায়গা ছেড়ে প্রস্থান করে।
কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ তার চোখে পড়ল ড্রাগন সোলজারদের। তারা দলবেঁধে কোথাও যাচ্ছে। একসঙ্গে প্রায় দশটি কালো জিপ তাকে অতিক্রম করে গেল। রিচার্ডের মনে তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন জাগো, এরা এত দলবেঁধে কোথায় যাচ্ছে? কোনো অঘটন ঘটলে তো তার কানে খবর আসার কথা। তাহলে কি তার আড়ালে কিছু ঘটছে? মস্তিষ্কে একটা ধাক্কা লাগতেই সে গাড়ি ঘুরিয়ে তাদের পিছু নিল।
কিছুদূর যেতেই ড্রাগন সোলজারদের জিপগুলো দেখতে পেল । রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীসদৃশ একটি সরু ড্রেনের সামনে জিপগুলো থমকে দাঁড়িয়ে আছে। পাথর বাঁধানো রাস্তার ধারে সোলজাররা একত্র হয়ে দাঁড়িয়ে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ড্রেনের পানির দিকে।
“হোয়াটস গোয়িং অন দেয়ার?”

পেছন থেকে ভেসে এল ভারী ও রাশভারী কণ্ঠ। সেই পরিচিত, গা-ছমছম করা গলার আওয়াজ শুনে গার্ডরা দ্রুত দু’পাশে সরে গিয়ে পথ তৈরি করে দিল। রিচার্ড সরাসরি গিয়ে থামল ওগ্রুর সামনে। ওগ্রু গতকালই হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ পেয়েছে। তার একটা চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই অকেজো চোখের ওপর এখন কালো ক্যাপ লাগানো। রিচার্ডের ছায়া শরীরে পড়তেই শিউরে উঠল ওগ্রু। সেদিনের ঘটনার পর থেকে রিচার্ড তার কাছে একটি
আতঙ্কের নাম।
সে নতমুখে জবাবদিহির সুর নিয়ে বলল, “ফাদারের কাছে খবর আছে, এই ছেলেটা ইন্দোনেশিয়ায় থাকাকালীন আপনার ওপর অ্যাটাক করেছিল। ফাদার নির্দেশ দিয়েছেন, ইটের জবাব ইট দিয়েই দিতে হবে।”

বলেই ওগ্রু ড্রেনের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে রিচার্ড নিরেট, কঠিন মুখে সেদিকে চোখ ফেরাল। ড্রেনের পানিতে একটি কালো গাড়ি ফেলে দেওয়া হয়েছে। গাড়িটা তখনও পুরোপুরি ডোবেনি, সানরুফটা ভেসে আছে। ওগ্রু রিচার্ডের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সোলজারদের নিয়ে তৎক্ষণাৎ স্থান ত্যাগ করল।
‘ইটের জবাব ইট দিয়ে’—কথাটা মাথায় একবার পাক খেতেই রিচার্ডের বুঝতে বাকি রইল না যে গাড়ির ভেতরে কে আটকে আছে। এরপর কী হলো, তা কেবল সৃষ্টিকর্তা জানে! মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই অদৃশ্য এক টানে শরীর সায় দিল। রিচার্ড এক মুহূর্ত না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়ল ড্রেনের পানিতে।

সাঁতরে পানির নিচে গিয়ে সে দরজার হ্যান্ডেল ধরে ডোর খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু সেগুলো ভেতর থেকে লক করা। ড্রেনের পানি পরিষ্কার হওয়ায় তলদেশের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। জানালার কাঁচ ভেদ করে চোখে পড়ল ভেতরের মানুষটাকে, তার হাত-পা শক্ত নড়াইলের দড়ি বাঁধা, সে বাঁধন মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ছটফট করছে। মাস্ক আর একঘেয়েমি পোশাকের কারণে মানুষটার পরিচয় চিহ্নিত করা না গেলেও, তার ওই ক্ষিপ্ত চোখ দু’টো দেখে রিচার্ড আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে গাড়ির রুফটপে উঠে গেল। তারপর হাতটা শক্ত করে মুঠো করে সজোরে ঘুষি বসালো সানরুফের ওপর। কিন্তু সানরুফ ভাঙা কি অতই সহজ? আবার, রিচার্ড কায়নাতের সামনে কোনো বাধা দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকাই বা কবে সহজ ছিল?

আকাশে তখন ভেসে ছিল একটি গোল চাঁদ। চাঁদের রূপালী জোছনায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল প্রতিটা ঘুষির সাথে সাথে রিচার্ডের হাতের চামড়া কেটে কীভাবে ফিনকি দিয়ে র ক্ত ঝরছিল। অবশেষে, প্রবল চূড়ান্ত এক ঘুষিতে সানরুফের কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাঁচ ভাঙতেই রিচার্ড এক টানে ভেতরের মানুষটাকে টেনে গাড়ির ভেতর থেকে বের করে আনল।
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্লান্ত, রক্তলাল দুই জোড়া চোখ। একটি চোখ লাল হয়ে আছে দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে থাকার কারণে, অন্যটি যেন কোনো এক তীব্র অজানা অনুভূতির জ্বালায়। রিচার্ড ও সুরাকার দুজনই তখন ভেজা শরীরে গাড়ির ছাদের ওপর শুয়ে আছে। ক্লান্তিতে দুটো শরীর এতটাই নিথর যে কেউ একটা টু শব্দ অব্দি করল না। কেউ কাউকে কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজনও মনে করল না। দুজনেরই আপাদমস্তক কালো পোশাকে মোড়ানো। একই উচ্চতা, একই শারীরিক গঠন, তবে পার্থক্য শুধু এটুকুই, একজনের অবয়ব স্পষ্ট আর অন্যজনের মুখ ঢাকা কালো মাস্কের অন্তরালে। কিন্তু দুজনেরই স্থির দৃষ্টি আটকে আছে খোলা আকাশের দিকে।
চারপাশের নিঝুম নীরবতা চিরে হঠাৎ ভেসে এলো রিচার্ডের অনুভূতিহীন কণ্ঠ, “তোমার গা থেকে ভাই-ভাই গন্ধ আসছে। তবে আমি এসব আবেগী কথায় ভাসতে রাজি নই। আই নিড স্ট্রং এভিডেন্স।”

সেই কণ্ঠে কোনো ব্যাকুলতা বা অনুভূতির বিন্দুমাত্র ছাপ ছিল না। তবুও ভেতর থেকে অজান্তেই শিশিরভেজা ফুলের পাপড়ির মতো কেঁপে উঠল সুরাকার। সে চমকে তাকাল রিচার্ডের দিকে। কিন্তু রিচার্ড সেই দৃষ্টিকে অদৃষ্টের মতো উপেক্ষা করে সুরাকারের মাথা থেকে একটা চুল ছিঁড়ে ওয়েস্টকোটের পকেটে পুরে এক লাফে পাড়ে উঠে গেল।
সুরাকারও ধীরে উঠে দাঁড়াল। রিচার্ডের এই অদ্ভুত আচরণ তার মাথায় ঢুকল না। দুজন এত কাছাকাছি, এতটা মুখোমুখি হওয়ার পরও মানুষটার প্রতিক্রিয়া এতটা শূন্য আর হিমশীতল কী করে হয়? সে বিস্ময়াবিষ্ট চোখে ঘাড় তুলে তাকাল, পাথরে বাঁধানো রাস্তার ধারে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটার দিকে।

“তুমি ভুল মানুষের পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করছ। শি ইজ মাইন। মাইন অ্যালোন। নেক্সট টাইম ওর ওপর যেন ছায়াও না পড়ে। যদি রক্তের সম্পর্কের কেউ হয়েও থাকো… রক্তের বাহানায় ছাড় পাবে না। রক্তের খেলায় রিচার্ড কায়নাতকে হারাতে পারবে, এমন কারও জন্ম এখনও হয়নি।”
শীতল, কিন্তু চাপা হুঁশিয়ারি মেশানো হুংকার ছুড়ে দিয়ে রিচার্ড গাড়ির দিকে পা বাড়াচ্ছিল। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো সুরাকারের কণ্, “হোয়াট ইফ শি ইজ…?”
সমুদ্রনীল চোখের বিষাক্ত এক চাহনিতে কথা শেষ করতে পারল না সুরাকার। তবে সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। রাশভারী আওয়াজে নিজের কথাটা শেষ করল, “সবশেষে যদি জানা যায় সে আমার? যদি আমি ভুল মানুষের পেছনে না ছুটে থাকি? তখন?”
রিচার্ড দু’হাত পকেটে পুরে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন তাচ্ছিল্যের হাসি, ঠোঁট গৌরব,
“আমি রিচার্ড কায়নাত—যার হিসেবে কখনো ভুল হয় না। খেলার ময়দান আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। আমি ধোঁয়াশার মধ্যে থাকি না, ধোঁয়াশা তৈরি করি। আমার কাজে ভুল হয় না। ভুল আমি জীবনে একবারই করেছিলাম… আর সেই ভুলের কারণেই তুমি এখনও জীবিত আছো, বারবার ছাড় পেয়ে যাচ্ছ। খুঁজে বের করো তাকে! আমিও চাই সে সামনে আসুক। এই অনুশোচনা থেকে বাঁচতে চাই আমি।”

“অনুশোচনা?” তার কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
“এই রহস্যের সমাধান সে নিজেই। তাকে খুঁজে বের করো। সবকিছু স্পষ্ট করার জন্য আই নিড হার। ইউ আর চেইসিং মাই গার্ল, হোয়াইল আই আম চেইসিং ইউরস।”
রিচার্ড কেমন যেন হাসল। তারপর সুরাকারের দ্বিধা ও বিভ্রান্তিতে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে কটমটে স্বরে বলে গেল, “লেট মি ক্লিয়ার ওয়ান মোর থিং… আই আম নট ইন্টারেস্টেড ইন এনিথিং। নট ইউ, নট আওয়ার ব্লাড রিলেশন, অর দ্যাট গার্ল! আই অনলি কেয়ার অ্যাবাউট হার… বাকি সব জাহান্নামে যাক! এমনকি তুমিও জাহান্নামে যাও। শুধু আমাদের মাঝখানে আসার চেষ্টা করো না।”
“হেই ব্রো! আমি তো তোমায় বলতেই ভুলে গেছি, সেদিন আমার সেলিনার সাথে দেখা হয়েছে।”
নিকের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সুরাকার ভাবনার ঘোর কাটে। সে চকিত চোখে নিকের দিকে তাকিয়ে শুধাল,

“সত্যি?”
নিকের চোখেমুখে তখন খুশির আমেজ উপচে পড়ছে। সে একগাল হেসে মাথা নেড়ে বলল, “হুম, একদম সত্যি। ও-ই তো আমাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিল।”
সুরাকারের চোখেও একপ্রকার ব্যাকুলতা ভেসে উঠল। সে অধীর আগ্রহে জানতে চাইল, “তারপর? তারপর কী বলল সেলিনা?”
“জানোই তো ও কেমন! বেশি সময় কারোর কাছেই ধরা দেয় না। শুধু চলে যাওয়ার আগে এটুকুই বলল—সে হারিয়ে গেছে, তাকে যেন হারিয়ে থাকতেই দেওয়া হয়। সে তো এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, প্রকাশ্যে এলে তো ফাঁ সির দড়িতে ঝুলতে হবে। তার চেয়ে বরং গোটা দুনিয়া জানুক, সে আর বেঁচে নেই।”

সুরাকার একটু সরু চোখে নিকের দিকে তাকিয়ে বলল,”তোমার কি মনে হয়, ওর এখনো রোজাবেথের জন্য কোনো অনুভূতি জমে আছে?”
“কাম অন ব্রো! ওইসব কোনো অনুভূতিই নয়। আই নো, সেলিনা আমাকে ভালোবাসে। তা না হলে পার্টিতে যখন একটা মেয়ে আমার গ্লাসে ওষুধ মিশিয়ে আমার সাথে ইন্টিমেট হওয়ার চেষ্টা করেছিল, সবটা জানতে পেরে সেলিনা ওকে খু-ন করত না। ভুলে যেও না, আজ আমার জন্যই ও ফাঁ সির আসামী। আর ও নিজেকে রোজাবেথের গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল ভাবে, তাই রোজাবেথের আশেপাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারত না। ওর মনের ভেতর সবসময় একটা ভয় কাজ করত ওর অনুপস্থিতিতে কেউ যদি রোজাবেথের কোনো ক্ষতি করে বসে। আর সে কারণেই তো ও জেল ভেঙে পালিয়ে এসেছিল!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল নিক। কথাগুলো শুনে সুরাকার হুট করেই ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠল,

“দেখলে তো নিক? আমার কথাই সত্যি হলো! আমার লিলি বেঁচে আছে! লিলি যেখানে, সেলিনাও ঠিক সেখানেই থাকে। সেলিনা যখন আছে, তার মানে আমার লিলিও আশেপাশেই কোথাও আছে! কী, তাই না? সেলিনা এটাই বলেছে তো?”
প্রশ্নের উত্তরের জন্যও অপেক্ষা করল না সে। নিককে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ করে দিয়ে দ্রুত মুখে মাস্ক পরে নিল, মাথার ওপর টেনে দিল হুডটা। তারপর কাঁধে গিটারটা ঝুলিয়ে হন্তদন্ত হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
নিক তার চলে যাওয়ার পথটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে আওড়ালো,
“লিলি নেই!”

তখন সে ব্যস্ততা দেখিয়ে ছুটে আসেনি, বাস্তবতা থেকে পালিয়ে এসেছিল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার ছিল না। সে সরাসরি চলে আসে হসপিটালের ছাদে। এখন সে স্টেয়ারহেড রুমের ওপর, করুগেটেড রুফিং শিটের চালের ওপর একাকী শুয়ে আছে। মাথার নিচে দু’টো হাত, পাশে পড়ে আছে বিশ্বস্ত গিটারটা। হসপিটাল থেকে যেভাবে বেরিয়ে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই আছে এখনো। সেই কখন থেকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে একা এবং নিঃসঙ্গ ছেলেটার চোখের কোণ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। কত শত অশ্রুবিন্দু ঝরে গেছে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। সুরাকার কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওই দূরের একাকী চাঁদটার দিকে।
হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে কণ্ঠগহ্বর থেকে এক নির্মম স্বীকারোক্তি বেরিয়ে আসে,

“আমি জানি, আমার লিলি নেই।”
হাত বাড়িয়ে সে ফোনটা তুলে নেয়। অন্ধকার চিরে ফোনের স্ক্রিনে জ্বলে ওঠে রিচার্ড আর এলিজাবেথের টিউলিপ বাগানের কিছু মুহুর্ত। দূর থেকে এই ছবিগুলো তুলেছিল নিক। সুরাকার একটা ছবি জুম করে, সেখানে ভেসে উঠল এলিজাবেথের কাঁধের পোড়া দাগটা, যেটাকে সে জন্মদাগ ভেবেছিল। এই একটি ছবিই সমস্ত সত্যের পর্দা এক ঝটকায় উন্মোচন করে দেয়। সত্য এটাই যে, সেদিন হসপিটালে আসলে রোজাবেথ মারা গিয়েছিল। কিন্তু চেহারার অবিশ্বাস্য মিলের কারণে হসপিটালের লোকজন ভুল করে এলিজাবেথকে মৃত ঘোষণা করেছিল।

Born to be villains part 37

সবকিছু তো এখন আয়নার মতো পরিষ্কার। সে এখন খুব ভালো করেই জানে তার রোজাবেথ আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তবুও এত কিছুর পর কেন সে এখনও এক অলীক মিথ্যার পেছনে ছুটে চলেছে? কেনই বা সে ধোঁকা জেনেও একটা মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাইছে? মানুষটা কি তবে নিজের কাছেই এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছে যে, টিকে থাকার জন্য তাকে মিথ্যার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হচ্ছে? নাকি… এই মিথ্যার ভেতরেই সে খুঁজে ফিরছে বেঁচে থাকার শেষ অনুভূতির টুকরোটুকু? নাকি……

 Born to be villainspart 39