Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ২০

অভিসৃতি পর্ব ২০

অভিসৃতি পর্ব ২০
নওরিন কবির তিশা

বিহঙ্গের পক্ষবিধুননে অতিবাহিত ক্ষণের ন্যায় দ্রুততায় কেটে গিয়েছে প্রায় একটি সপ্তাহ।দিনপঞ্জির পাতায় অক্টোবরের দেখা মিলেছে। ঘন কুহেলির আস্তরণ ইদানিং বেশ ঝঞ্ঝাটের সৃষ্টি করছে। তবুও থেমে নেই জীবন যাত্রা। পুরু চাদরের বেষ্টনীতে নিজেকে আবদ্ধ করে,দিব্যি চলছে কর্মব্যস্ত জনজীবন।
প্রতীক্ষার প্রহরের অবসান ঘটানোর প্রয়াসে সপ্তম তারিখে লাল কালির আঁচড় বসালো কায়রা। নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে এই একটা কাজ। সেপ্টেম্বরের পঁচিশে যে তারিখ গণনার সূচনা করেছিলো অক্টোবরের দুই-য়ে এসে থেমেছে তা।
ভারী চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে চেপে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল কায়রা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস রয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত ধাবমান!ডাইনিং হলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সাজেদা চৌধুরী। কায়রাকে ওভাবে তাড়াহুড়ো করে প্রাঙ্গণের দিকে পা বাড়াতে দেখে উনি স্নেহময়ী শাশুড়ির প্রথাগত গাম্ভীর্য নিয়ে ডাক দিলেন,,

“বাবুই! নাস্তা না করে কোথায় দৌড়চ্ছ?”
কায়রা থমকে দাঁড়িয়ে একটুখানি কাঁচুমাচু হেসে তোতলে বলল,
“আম্মু, আজ ক্যাম্পাসে একটা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে। একটু লেট হলেই স্যার ক্লাসে এন্ট্রি দেবেন না! তাই আজকে নাস্তাটা স্কিপ করি, প্লিজ?”
সাজেদা চৌধুরী টেবিলের ওপর গরম রুটি ও সবজি রাখা প্লেট সাজাতে সাজাতে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে বললেন,
“একদম না! খালি পেটে এই ঠান্ডায় বাইরে যাওয়া চলবে না। দুর্জয় থাকলে কি তোমায় এভাবে না খেয়ে বের হতে দিত? লক্ষী মেয়ের মতো এসো, দু-টো মুখে দিয়ে যাও!”
কথাটা বলতে বলতেই উনি পরম স্নেহে কায়রার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে চেয়ারের ওপর রাখলেন। কায়রা শাশুড়ির এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ মাতৃত্বের সান্নিধ্যে এসে আর না বলতে পারল না। চেয়ারে বসে অনুচ্ছ স্বরে বলল,

“কিন্তু আম্মু, সত্যি আমার মিস হয়ে যাবে!”
সাজেদা চৌধুরী মুচকি হেসে কায়রার পাশে বসলেন। পরম মায়ায় রুটির টুকরো ছিঁড়ে সবজি মাখিয়ে কায়রার মুখের সামনে ধরে বললেন,
“তোমার ড্রাইভার আঙ্কেলকে অলরেডি বলা আছে, ও তোমাকে ভার্সিটি গেটে ড্রপ করে আসবে। সো, ক্লাস মিসের কোনো প্যানিক নেই! নাও, মুখ খোলো তো!”
নাস্তার লোকমা মুখে পুরে ও ওষ্ঠাধরের কোণে পরম তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আম্মু, আপনি সত্যি বেস্ট! শাশুড়ি নয়, একদম আমার নিজের মায়ের মতো আদর করেন।”
সাজেদা চৌধুরী চিবুক ছুঁয়ে পরম স্নেহে কায়রার শুভ্র কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“মেয়ে বানিয়ে ঘরে এনেছি বাবুই, পর করার জন্য নয়! দুর্জয় দূরে আছে বলে ভেবো না তুমি একা। এবার তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে নাও, আর ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি তোমাকে সেফলি পৌঁছে দিতে।”
কায়রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দ্রুত নাস্তা সাঙ্গ করল।

চট্টগ্রাম বিভাগের অদূরবর্তী ছায়াবৃত সামরিক শিবিরের ব্রিফিং কক্ষে আপাতত ঘোর নৈঃশব্দ্য বিদ্যমান। স্বচ্ছ কাঁচের জানার ওপারে পাহাড়ি ঢালে কুয়াশা ভেদিয়ে রৌদ্রের দেখা মিলছে যৎ-কিঞ্চিৎ। দীর্ঘ সাত দিনের নীরব অনুসন্ধানে শত্রুর গতিবিধির বিস্তর তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। সুপ্রকাণ্ড ডিজিটাল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে রুমা ও থানচির সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলের থ্রি-ডি স্যাটেলাইট ম্যাপ।
গোলটেবিলের প্রধান আসনে আসীন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী। দুর্জয় সুদৃঢ় ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতে থাকা লেজার পয়েন্টার দিয়ে ম্যাপের লাল চিহ্নিত জোনে আলোকপাত করল । লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী প্রবল পেশাদারিত্বে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,
“মেজর দুর্জয়, বিগত সাত দিনের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট কী বলছে? শত্রুপক্ষের মুভমেন্ট কতটা ট্র্যাক করা গেছে?”
দুর্জয় সামরিক প্রথায় স্পষ্ট , ভরাট কণ্ঠে জবাব দিল,

“স্যার, আমাদের আন্ডারকভার অফিসারদের পাঠানো লাস্ট ইনপুট অনুযায়ী, লোকাল সাপ্লাই চেইনে ছদ্মবেশে থাকা মূল রিং-লিডারদের অলরেডি আইডেন্টিফাই করা গেছে। দেশের বিভিন্ন সিটিতে যে আর্মস আর এক্সপ্লোসিভস ছড়িয়ে দেওয়ার প্ল্যান ছিল, তার প্রায় ফিফটি পারসেন্ট ইনফরমেশন আমাদের হাতে। দে আর প্রিপেয়ারিং টু মুভ।”
ক্যাপ্টেন ফাহিম দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকে বলল,
“ইয়েস স্যার! নেক্সট উইকের মধ্যেই ওরা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। যদি আমরা আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাকশনে না যাই, তবে এদের গ্র্যাপ করা ইম্পসিবল হয়ে পড়বে।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান মানচিত্রটা সুক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বললেন,

“এক্সেক্টলি। আমাদের ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের সুবাদেই এতটা সাকসেস এসেছে। তবে ওদের মেইন আস্তানাটা এখনো খুব হাইলি প্রটেক্টেড। স্ট্রাইক প্ল্যান কীভাবে সেট করছ, দুর্জয়?”
দুর্জয় পয়েন্টার ঘুরিয়ে পাহাড়ের দুটি বিপরীত প্রবেশপথ দেখিয়ে ধাতব স্বরে বলল,
“স্যার, আমরা টু-ওয়ে কর্ডন অ্যান্ড সার্চ অপারেশন এক্সিকিউট করব। ক্যাপ্টেন ফাহিমের স্পেশাল ফোর্স টিম পূর্ব দিকের রিভার রুট ব্লক করবে, যেন কোনোভাবেই বর্ডার ক্রস করতে না পারে। আর আমার কম্ব্যাট ব্যাটেলিয়ন স্কোয়াড নর্থ সাইড দিয়ে ডিরেক্ট হাইডআউটে রেইড দেবে। শত্রুপক্ষ ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়ার আগেই অপারেশন ওভার!”
উপস্থিত অন্যান্য পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ দুর্জয়ের এই নিখুঁত কৌশলে সন্তুষ্ট হয়ে ইতিবাচক সায় দিলেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী দুর্জয়ের সুঠাম কাঁধে হাত রেখে পরম প্রত্যয়ে বললেন,
“এক্সেলেন্ট প্ল্যান, মেজর দুর্জয়! আগামী দু-একদিনের মধ্যেই আমরা এই সিক্রেট মিশন এক্সিকিউট করছি। কোনো লুপহোল যেন না থাকে। এভরি সিঙ্গেল টেররিস্ট মাস্ট বি ইন কাস্টডি!”
দুর্জয় স্যালুট ঠুকে বলল,
“ইয়েস স্যার! অল প্রিপারেশনস আর ডান। কোনো ভুলচুক হবে না!”

ঈষৎ শীতল পরিবেশেও ললাট জুড়ে দেখা মিলছে স্বেদকণার। ভয়ার্ত নেত্রযুগল নিবদ্ধ সম্মুখ পানে। বক্ষ পিঞ্জিরায় চলমান উন্মাদ অশ্বের অবাধ্য দৌরঝাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না কিছুতেই। বারংবার শুকনো ঢোক গিলে চলেছে তাই।
জীবভূগোল বিষয়ের অ্যাসোসিয়েট লেকচারার ডক্টর আনিসুর রহমান যে কতটা কড়া এবং নিয়মানুবর্তী সেটা গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারোরই অজ্ঞাত নয়। অথচ, সদা আনন্দ উল্লাসে তৎপর বন্ধু মহল, সেই স্যারের প্রেজেন্টেশনটিই মিস করেছে গত সপ্তাহে। ফলাফল স্বরূপ, আনিসুর হক ক্ষিপ্ত হয়ে ‌শ্রেণীকক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত করেছেন দলটিকে।
কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল ও ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের প্রকাণ্ড নম্বর ন্যস্ত গুরু-গম্ভীর এই শিক্ষকের হাতেই। সামান্য ভুল ত্রুটিতেও সাধনার সিজিপিএ প্রাপ্তির আগেই হাতছাড়া হবে। অবশেষে মরিয়া হয়ে ওরা সবাই একসাথে স্যারের চেম্বারের দুয়ার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। মেধা আলতো ধাক্কা দিয়ে কায়রাকে সামনে ঠেলে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“তুই আগে ঢুকে কথা বল, কায়রা! তোর কিউট ফেস দেখে যদি স্যারের রাগ একটু গলে!”
কায়রা ভয়ার্ত চোখে ধমকে উঠে বলল,
“মার খেয়ে আসব নাকি একা একা? সবগুলো একসাথে ঢোক!”
অবশেষে সবাই মিলে অনুমতিক্রমে, ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রবীণ প্রফেসর চশমার আড়াল থেকে অত্যন্ত কঠোর ও প্রখর দৃষ্টিতে ওদের পানে চাইলেন। টেবিলের ওপর কলমটা সশব্দে রেখে রুক্ষ গলায় বললেন,
“ইয়েস? ক্লাসে তো আসার প্রয়োজন বোধ করোনি, এখন আমার চেম্বারে কী মনে করে?”
রুশাফ জলদি পদে এগিয়ে এসে মিনতির সুর মিলিয়ে বলল,
“স্যার, রিয়্যালি এক্সট্রিমলি স্যরি! আমাদের পার্সোনাল কিছু ইমার্জেন্সির জন্য প্রেজেন্টেশনটা স্কিপ হয়ে গিয়েছিল। প্লিজ স্যার, প্র্যাকটিক্যাল মার্কস না পেলে আমাদের ফাইনাল গ্রেড একদম স্পয়েল হয়ে যাবে!”

ডক্টর আনিসুর রহমান একপেশে রূঢ় হাসলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ইউনিভার্সিটি কোনো ছেলেখেলা নয়! রেগুলারিটি আর ডিউটি ফার্স্ট।”
সবগুলো একযোগে বললো,,
“প্লিজ স্যার!”
আনিসুর রহমান তখনও নিজ সিদ্ধান্তে অটল। উপায়ান্তর না পেয়ে শেষমেষ নিহারের ইশারায় ধপ করে আনিসুর রহমানের পায়ের ধারে বসে পড়ল ওরা। আকস্মিক এমন কাণ্ডে হকচকিয়ে গেলেন লেকচাররার। একপ্রকার লাফ দিয়ে উঠলেন তিনি।
“আরে আরে! করছো কি? উঠো বলছি!”
তবে ওরাও অনড় নিজেদের অবস্থানে। ওদের একগুঁয়েমিতে শেষমেষ বিরক্ত হলো আনিসুর রহমান।
“ওকে! এই প্রথম তোমাদের জন্য নিজের বিরুদ্ধে যাচ্ছি।একটা লাস্ট চান্স দিতে পারি। তবে প্রেজেন্টেশন ক্লাসরুমে হবে না, প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডওয়ার্ক করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।”
নিহার উৎসাহিত হয়ে শুধাল,

“কী প্রজেক্ট, স্যার? আমরা সব করতে রেডি!”
প্রফেসর চশমাটা টেবিলে রেখে নিস্পৃহ কণ্ঠে শর্ত ছুঁড়লেন,
“বাস্তুতন্ত্রের ওপর স্পেশাল রিসার্চ। স্পেশালি, পার্বত্য অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের প্র্যাকটিক্যাল কেস স্টাডি। পাহাড়ি জোনে গিয়ে ডেটা কালেক্ট করবে, লোকাল বায়োডাইভার্সিটি অ্যানালাইসিস করবে এবং উইথিন আ উইক প্রপার রিপোর্ট সাবমিট করবে। ইফ ইউ অল এগ্রি, তবেই প্রেজেন্টেশনের নম্বর কনসিডার করব। আদারওয়াইজ, সি ইউ নেক্সট ইয়ার!”
কোন কিছু না ভেবেই সবগুলো একসঙ্গে বললো,,
“উই আর এগ্রিড, স্যার! আমরা এই উইকেন্ডেই বান্দরবান যাচ্ছি এবং উইথিন টাইম রিপোর্ট সাবমিট করব!”
লেকচারার গম্ভীর মুখে সায় দিয়ে বললেন,
“অলরাইট। লেটার নিয়ে ডিপার্টমেন্ট থেকে পারমিশন সাইন করিয়ে নাও। এন্ড রিমেম্বার, নো মোর প্রফেশনাল নেগলিজেন্স!”
সবগুলো সম্মতির মাথা দুলিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে বেরিয়ে এলো। অন্তত, সিজিপিএ -এর সঠিক পয়েন্ট প্রাপ্তিতে সমস্যা রইল না আর।

নৈশ নিস্তব্ধতা ধীরপদে গ্রাস করেছে চরাচর। মৃদুমন্দ পবণ স্পর্শে দোদুল্যমান পর্দা গুলো। রোজকার ন্যায়, ডাইনিংয়ে ব্যস্ত সাজেদা চৌধুরী। তবে,আজ কায়রা তাঁর পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই। আঁচলের এক প্রান্ত প্রায় মুঠোয় চেপে, অপরাধীর ন্যায় করুণ মুখে শাশুড়ির পিছু পিছু নিঃশব্দে হেঁটে বেড়াচ্ছে সে। বিষয়টি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ পর্যবেক্ষণ করছেন সাজেদা চৌধুরী। তাই শেষমেষ হাতের বাটিটা টেবিলে রেখে তিনি শুধালেন,,
“কী ব্যাপার বাবুই? কিছু বলবে আমায়?”
কায়রা থমকে গিয়ে তোতলাতে লাগল,
“ইয়ে… মানে, আম্মু… আসলে না মানে…”
সাজেদা চৌধুরী পরম স্নেহে ওর গালে হাত রেখে শুধালেন,

“কী হয়েছে সোনা? এমন ভয় পাচ্ছ কেন? খোলাসা করে বলো তো দেখি।”
কায়রা নিচু স্বরে চোখ পিটপিট করে বলল,
“আম্মু, ওই যে আজকে বলছিলাম না ক্লাসের প্রেজেন্টেশনের কথা? লেকচারার আমাদের পুরো গ্রুপকে একটা প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডওয়ার্কের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন। না করলে এবার সিজিপিএ একদম ডুবে যাবে!”
সাজেদা চৌধুরী স্মিত হাস্যে দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় কাজে মনোযোগ দিলেন,,
“আরে, এতে এত আমতা আমতা করার কী আছে? পড়াশোনার কাজ, নিশ্চয়ই যাবে! তা,কোথায় যেতে হবে শুনি?”
কায়রা ঢোক গিলে ধীর গতিতে উচ্চারণ করল,
“আম্মু… চট্টগ্রাম… মানে পাহাড়ি অঞ্চলে যেতে হবে বাস্তুতন্ত্রের ওপর রিপোর্ট বানাতে।”
‘চট্টগ্রাম’ শব্দটা কর্ণগোচর হতেই সাজেদা চৌধুরী মুহূর্তের তরে স্থবির হলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন কায়রার ওপর। উনার এমন অতর্কিত ও গম্ভীর চাহনিতে ধক করে উঠল কায়রার বক্ষপিঞ্জর। চরম ভয়ে পা পিছিয়ে নিয়ে ও মিনমিনিয়ে বলল,

“না… মানে আম্মু, আপনি যদি আপত্তি করেন, তবে আমি যাব না! সত্যি বলছি, একদম যাব না!”
কায়রার এমন ভীতসন্ত্রস্ত নিষ্পাপ মুখখানি দেখে সাজেদা চৌধুরীর কঠিন গম্ভীর মুখশ্রী নিমেষেই এক চিলতে মিষ্টি হাসিতে ভরে উঠল। উনি আলতো করে কায়রার চিবুক ছুঁয়ে হেসে উঠে বললেন,
“আমি কখন বললাম যে যাওয়া যাবে না, বোকা মেয়ে? নিজের পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে ঘরে বসে থাকবে নাকি? তা কবে রওনা দিতে হবে ?”
সাজেদা বেগমের সম্মতিতে ভয়ের মেঘ কেটে উজ্জ্বল রৌদ্রের দেখা মিলল কায়রার মুখশ্রীতে। উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে ও বলল,,
“কালকেই, আম্মু! কাল সকালেই আমাদের বেরোতে হবে!”
“কালকেই?তাহলে তো হাতে একদম সময় নেই! অনেক গোছগাছ আর প্যাকিং বাকি। এক মুহূর্তও আর দেরি করা চলবে না। তাড়াতাড়ি দু-টো ভাত মুখে দিয়ে নাও তো, আমি নিজে গিয়ে তোমার ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছি। চলো!”

চট জলদি খাবার শেষ হতেই সাজেদা চৌধুরী কায়রাকে সাথে নিয়ে ঘরে এলেন। আলমারি খুলে গরম জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র আর ট্রাভেল কিট গুছিয়ে সুটকেসে পুরতে লাগলেন তিনি। কায়রা একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিজের প্রজ্ঞাময়ী শাশুড়ির মাতৃত্বের এই অপার স্নিগ্ধ রূপটির পানে।
লগেজের জিপার বন্ধ করতে করতে সাজেদা চৌধুরী কায়রার মুখোমুখি বসে পরম স্নেহে ওর হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় তুলে ব্যাকুল কণ্ঠে আদেশের সুরে বললেন,

“শোনো বাবুই, পাহাড়ি এলাকা, আবহাওয়া এখন বেশ ঠান্ডা। নিজের খেয়াল একদম ঠিকঠাক রাখবে। আর শোনো, কোনো অবস্থাতেই ফোন অফ রাখবে না! পৌঁছানো মাত্রই আমাকে ফোন দেবে, আর দিনে অন্তত দু-বার আপডেট দেবে। ওখানে কিন্তু আমরা কেউ থাকবো না। তাই, তোমার নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব তোমারই। মনে থাকবে?”
কায়রা আবেগাপ্লুত হয়ে সাজেদা চৌধুরীর কাঁধে মাথা রেখে অনুচ্চ স্বরে বলল,
“সব মনে থাকবে, আম্মু। আপনি সত্যি ভীষণ ভালো!”
সাজেদা চৌধুরী পরম মায়ায় কায়রার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“মেয়েদের ভালোবাসতে হয় বাবুই, আগলে রাখতে হয়। এখন চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো, কাল সকালে অনেক জার্নি আছে!”

সময়ের চাকা বড্ড দ্রুত ঘুর্ণয়মান। পলকে উড়াল দিয়েছে গোটা একটি দিন। পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন আজ। বন্ধু মহল আস্তানা গেড়েছে, মেঘে ঢাকা প্রকাণ্ড পাহাড় আর গহীন অরণ্যে ঘেরা মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে। পাইন গাছের অন্তরালে ছেয়ে থাকা কুয়াশা ভেদিয়ে তীক্ষ্ণ রৌদ্র রশ্মি কটেজের সম্মুখ জানালায় এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।
দস্যিমহল প্রাতঃরাশ সেরেছে বহুক্ষণ। আজকের দিনটা বড্ড ব্যস্ততায় কাটবে ওদের—গন্তব্য শুভ্র মেঘের দেশ নীলগিরি। পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্যময় ডেটা আর স্যাম্পল কালেকশনের জন্য আজকের দিনটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। রিসোর্টের মূল ফটক অভিমুখে দন্ডায়মান ছাদখোলা এক লাল রঙের পাহাড়ি জিপ। স্নিগ্ধ চটপটে কায়রা চাদরখানা সামলে সবাইকে ত্বরা সইয়ে তাড়া দিল,
“হ্যেই গাইস! জলদি কর! সকাল সকাল না পৌঁছালে কুয়াশা কেটে রোদ উঠে যাবে, আর স্যাম্পল কালেকশনের মোস্ট ইম্পর্টেন্ট টাইমটা মিস হয়ে যাবে!”

মেধা আর রুশাফ তড়িঘড়ি ল্যাব কিট আর ক্যামেরা কাঁধে চেপে জিপে উঠে পড়ল। নিহার চালকের পাশের আসনে আসন গ্রহণ করল। তুজা ম্রিয়মাণ চোখে পাশে দাঁড়িয়েছিল ইভানের অপেক্ষায়। ইভান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে তুজার তোয়াক্কা না করে সোজা জিপের পেছনের দিকের একটি খালি সিটে গিয়ে বসল।
ইভানের এহেন অবহেলা তুজার বক্ষপিঞ্জরে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করতেই মলিন হলো হাস্যজ্জল মুখশ্রী। বিষয়টা কারো আড়ালে না থাকলেও ফ্রেন্ডশিপের এমন প্রথাগত মান-অভিমানের দোলাচলে কেউ সাধ করে হস্তক্ষেপ করল না। কায়রা ত্বরিত গতিতে তুজার হাত ধরে টেনে জিপের মাঝের আসনে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুজা, জলদি ওঠ! আমাদের অনেকটা পথ ট্রাভেল করতে হবে, লেট করলে প্রজেক্ট ডেডলাইন মিট করা টাফ হয়ে যাবে।”
তুজা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিস্তব্ধে বসে পড়ল। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও উঁচুনীচু পথ চিরে দুরন্ত গতিতে ধাবমান হলো ছাদখোলা জিপটি। হিমেল পবনের স্পর্শে উড়তে থাকা কেশগুচ্ছ সামলে পাহাড়ি অপার সৌন্দর্যে মেতে উঠল ‌তরুণ দল।

নীলাভ অম্বরে গোধূলির রক্তিম আলোর বিচ্ছুরণ। গহীন অরণ্যে ছাওয়া উপত্যকায় সাজের আধার যেন দ্রুতই ঘনিয়ে আসে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে এঁকে বেঁকে সম্মুখে ধাবমান জিপ খানি। সমগ্র দিনের ভ্রমণ আর শিক্ষা কর্মসূচি ও সমাপ্তি ঘটিয়ে পরিশ্রান্ত দেহখানি একে অন্যের উপর চাপিয়ে বাড়ি ফিরছিলো বন্ধু মহল।
হঠাৎ সম্মুখের বাঁক ঘুরতেই বিপরীত দিক হতে তীব্র গতিতে আসা এক প্রাইভেট কারের সাথে বিকট শব্দে ধাক্কা লাগল জিপটির! চালকের অসাবধানতায় জিপের সামনের অংশ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হতেই পাহাড়ি নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে শুরু হলো তুমুল বিতর্ক। গাড়ির চালক নিজের ভুল স্বীকার না করে উল্টো তড়পাচ্ছে দেখে ইভান, নিহার আর রুশাফের সঙ্গে কায়রাও জিপ থেকে নেমে চরম ক্ষোভে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ল।
আকস্মিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো সন্ধ্যাকালীন টহলে থাকা সেনাবাহিনীর দুটি সুপ্রকাণ্ড জলপাই রঙের জিপ। রাস্তায় ঝামেলা ও জ্যাম প্রত্যক্ষ করে সেনা সদস্যরা ত্বরিত গাড়ি থামাল। গাড়ি হতে চটজলদি নেমে এলেন দুজন সামরিক অফিসার। প্রখর গম্ভীর কণ্ঠে অফিসারদের একজন ওদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

“হোয়াটস গোয়িং অন হিয়ার? আপনারা মাঝরাস্তায় এভাবে ক্রিয়েট করছেন কেন? ইমিডিয়েটলি রোড ক্লিয়ার করুন!”
তপ্ত মেজাজধারী কায়রা অফিসারের একরোখা কণ্ঠে খেই হারিয়ে বললো,
“অফিসার! মিস্টেকটা অপজিট ড্রাইভারের! উনি রং সাইড দিয়ে এসে আমাদের জিপে হিট করেছেন! আপনি আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন কেন?”
অফিসারটি কায়রার তোজস্বী আচরণে বিরক্ত হয়ে কঠোর স্বরে বললেন,
“লিসেন ম্যাম! ইয়্যু আর বিহেভিং ভেরি আনসিভিলাইজড! প্রপার অথরিটির সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই ম্যানার্সটুকু আপনার জানা উচিত!”
অফিসারের এহেন রূঢ় বচনে কায়রার ক্ষোভ মুহূর্তে বৃদ্ধি পেলো সহস্রগুণ। প্রায় চেঁচিয়ে ও বললো,,
“হোয়াট? আপনি আমাকে ম্যানার্স শেখাচ্ছেন? ডু ইউ ইভেন নো হু আই অ্যাম? কার সাথে কথা বলছেন ধারণা আছে আপনার? মাই হাজব্যান্ড ইজ আ মেজর! মেজর……”
“…..কে আপনার হাজব্যান্ড, মিসেস?”

পিছন হতে ভেসে আসা বড্ড পরিচিত সু-গভীর কণ্ঠস্বরে কায়রার কথাটা থমকায় অর্ধপথেই! বাকপটুতা ভুলে চমকে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চঞ্চল আঁখিদ্বয় বিস্ময়ে প্রকাণ্ড রূপ ধারণ করে!
টহল জিপের রুদ্ধদ্বার খুলে ধীর ও অকম্পিত পদক্ষেপে নেমে আসছে মেজর দুর্জয় আহসান! কম্ব্যাট ড্রেসে ঢাকা ওর বলীয়ান সুগঠিত অবয়ব, প্রখর গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখশ্রী আর অতল কৃষ্ণচক্ষুতে অচেনা নির্লিপ্ততা। দূর হতে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলো ও, কিন্তু কায়রার উপস্থিতি ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে শেষমেশ গাড়ি হতে নামতে বাধ্য হয়েছে। কায়রা সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে অস্ফুটে বলে উঠল,

“আ… আপনি?”
দুর্জয় কায়রার দিকে একবারও সরাসরি প্রচ্ছায় দৃষ্টি না হেনে, প্রখর পেশাদারিত্বে অধীনস্থ মেয়ে অফিসারদের পানে চেয়ে অত্যন্ত শান্ত ও ভরাট কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ল
“অন্যদের ছেড়ে দিয়ে উনাকে জিপে তুলুন।”
আকস্মিক এমন আদেশে কায়রাসহ পুরো বন্ধুমহল স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল। দুর্জয়ের পরিচয় জানায় বন্ধু মহল বাগড়া দিল না তাই।সেনা সদস্যরাও স্যালুট ঠুকে কায়রাকে গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করতেই, দুর্জয় প্রচ্ছন্ন গাম্ভীর্যে নিজের জিপেরই পেছনের সিটের রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত করে দিল। অধীনস্থ অফিসাররা অবাক দৃষ্টিতে তাকালেও দুর্জয়ের ভয়ে কিছু বলার সাহস করলো না আর।

অভিসৃতি পর্ব ১৯

বিস্মিত কায়রাও লক্ষী মেয়ের মতো গুটি গুটি পায়ে জিপে গিয়ে বসলো। দুর্জয় গাড়ির দরজা আটকে সূক্ষ্ম ইশারায় যেতে নির্দেশ দিল বাকিদের। সকলে চলে যেতেই, বিষ্ময়ে এদিকে চেয়ে থাকা নিজের বোকা রমণীর পানে চেয়ে ও মনে মনে বলল,,
“দূর থেকে আমার ঘুম হারাম করে শান্তি পাননি ম্যাডাম? এতটা,কাছে চলে এলেন?তাহলে,স্পেশ্যাল ট্রিটমেন্ট তো দিতেই হচ্ছে!”

অভিসৃতি পর্ব ২১