মেজর কারদার পর্ব ৪২
ফিনারা ঝুমুর
মাগরিবের সুরিলো আজানের সুমিষ্ট ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র অম্বর। সেই পবিত্র সুর এক অন্যরকম প্রশান্তির আলোড়ন ছড়ায় মানবকূলের অন্তরে। গোধূলির আলো আঁধারিতে সকলেই যখন নামাজের জন্য চটজলদি প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই একপ্রকার তীব্র তোড়জোড় আর হুড়োহুড়ির মাঝেই একখানা কালো রঙা চকচকে শেভ্রোলেট গাড়ি এসে থামে ‘ফিরোজা মঞ্জিল’-এর সুবিশাল দোড়গোড়ায়।
গাড়ির অন্দর হতে একে একে বাইরে রাজকীয় পা ফেলে পাঁচ জোড়া পা। পরম গম্ভীরতায় অন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ ঘটে তাদের। অন্দরে পা রাখতেই বিষাদগ্রস্ত নীরবতা চিরে প্রহর খুবই জোরালো ও কর্কশ কণ্ঠে হাঁক ছাড়ে,
“রহিমা খালা… ও রহিমা খালা!”
বাড়ির অন্দরের কোথাও হতে নিজের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে তড়িঘড়ি করে ছুটে আসেন এক বয়স্ক নারী। কিছুটা ভীত ও ক্ষীণ স্বরে প্রত্যুত্তর করেন,
“জি আব্বা! কি হইছে? আমারে ক্যান ডাকতাছো?”
“ওনাদের সবার দ্রুত থাকার ব্যবস্থা করে দাও।”
রহিমা নামের সেই বয়োবৃদ্ধ মহিলাকে কাজের সটান আদেশ দিয়ে এবার মুখ তুলে চাইল শীর্ষ আর নোমানের পানে। দুজনেরই সুঠাম চিবুক ও চোয়াল চরম ক্ষোভে শক্ত হয়ে আছে। প্রহর শীর্ষকে উদ্দেশ্য করে আলতো গলায় বলল,
“তোরা আগে ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।”
“ফুফা কোথায় এখন?”
একদম নিরেট ও বরফশীতল গলায় প্রশ্ন হাঁকায় শীর্ষ। নিজের ডান হাতের শক্ত ও নিরাপদ ভাঁজে শক্ত করে ধরে রেখেছে আঘাত পাওয়া মেঘকে। আর কিঞ্জাও নিশ্চুপ হয়ে ওর পাশেই অবস্থান করছে। শীর্ষর এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল প্রশ্নে প্রহর বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। বরং আগের মতোই চরম শান্ত স্বরে জানায়,
“তিনি এখন তাঁর নিজের রুমেই রয়েছেন। তোরা আগে ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হ তো দেখি! প্রথমবার আজ মেঘকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিস।”
কথাটা বলতে বলতেই প্রহর নিজের চোখ দুটি তুলে মেঘের পানে একবার তাকায়। মেয়েটার শ্যামলা আদলের সমস্ত সতেজ রক্ত যেন অলক্ষ্যে উধাও হয়ে ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছে! শূন্য ও বিষাদময় চোখে পুরো ঘরময় চোখ বোলাচ্ছে সে। থেকে থেকে একখানা দীর্ঘশ্বাস ক্ষণে ক্ষণে নির্গত হচ্ছে ওর ভাঙা বুক চিরে।
কোনো এক অজানা কারণে প্রহরের বুকখানা মুহূর্তেই মোচড় দিয়ে ওঠে! মেঘের এই করুণ আদল যেন অন্য কারোর অতি চেনা একখানা আদলকে তীব্রভাবে স্মরণ করাচ্ছে তাকে! বেশি পল প্রহরের সেই অন্তর্ভেদী চোখে প্রহর মেঘের দিকে চেয়ে থাকতে পারল না।
কথা বাড়াল না শীর্ষও। তক্ষণি মেঘকে পুনঃরায় নিজের বলিষ্ঠ কোলে তুলে নিয়ে বড় বড় পদক্ষেপে হাঁটা দেয় দোতলার সিঁড়ির পানে। মেঘও পরম ভরসায় শীর্ষর সুঠাম গলা শক্ত দু-হাতে আঁকড়ে ধরে। অজান্তেই নিজের জলছাপ জমা মুখখানা লুকিয়ে ফেলে স্বামীর চওড়া বুকের ধুকপুকানির মাঝে। পরম বেদনায় অতি চাপা ও ভাঙা স্বরে শীর্ষর কাছে জানতে চায়,
“কে আমার আসল বাবা, মেজর সাহেব? শেষমেশ কার পাপের ভয়ংকর বোঝা এভাবে আমায় বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বারবার —- এই সময়ে-অসময়ে?”
নেত্রের মিলন ঘটে দু’জনের। মেঘের ছলছল চোখের দিকে চেয়ে ওর ললাটে নিজের উষ্ণ অধর ছুঁইয়ে অতি আলতো ও ফিসফিসে গলায় জানায় শীর্ষ,
“যার পাপের কথা ভাবছ, পৃথিবীর বুকেই তার অস্তিত্ব আজও অটুট রয়েছে! সঠিক সময় এলে পরম নিয়তিই তোমায় সবটা সত্যি জানাবে… মাই ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার!”
আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সকলে অল্প-বিস্তর ভাবলেশহীন ও শূন্য দৃষ্টিতে ওদের এই নিভৃত প্রস্থান দেখে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নোমানের চোখে-মুখে কঠোরতা তখনও সমানভাবে অবলম্বিত। সে চট করে পা বাড়িয়ে বরবেশে দাঁড়িয়ে থাকা কিঞ্জার দিকে ফিরে বড্ড শীতল গলায় বলে ওঠে,
“গেস্ট রুমে যাও!”
কথাটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তা বুঝতে বিন্দুমাত্র বাকি নেই কিঞ্জার। পরিস্থিতির এই চরম মোড়ে এসে সে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত না হয়ে, স্রেফ হৃদয়ের জমানো ব্যথার ভারে ভারী হয়ে যাওয়া পা যুগল টেনে নিজের নির্ধারিত গন্তব্যের পানে হাঁটতে থাকে। তবে ভেতরে হেঁটে যেতে যেতে ওর খেয়াল হয়—এ গৃহের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি অলিন্দই যে ওর বড্ড চেনা, বড্ড জানা!
আঁধারে পুরোপুরি ডুবে রয়েছে এক সুবিশাল নিঝুম কক্ষ। সেখানে রাখা একটি কাঠের আরাম কেদারায় একদম নিশ্চল হয়ে বসে আনমনে দামি সিগারেট ফুঁকছে কেউ একজন। আবছা আলো-আঁধারিতে লোকটার অবয়বে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বয়সের ভার ও প্রবীণত্বের পূর্ণ ছায়া। গভীর ও নিগুঢ় নেত্রে কেদারায় হেলান দিয়ে সে নিস্তব্ধে উপভোগ করছে বাহিরের এই নিঃশব্দ নিশুত প্রকৃতির অদ্ভুত ব্যস্ততা।
“পারু… আমার পারু…”
লোকটার ওষ্ঠ বেয়ে বারবার কেবল ওই একই নাম জপছে অস্ফুট স্বরে। নিকোটিনের ধোঁয়া আর পুরোনো স্মৃতির চোটে লালচে ধারণ করেছে ওনার নেত্রের মণি। আচমকা ঘরের সেই গভীর নীরবতা ভেঙে অলিন্দে ভেসে আসে কারোর তিক্ষ্ণ কণ্ঠের স্বর,
“আজ আপনাকে কিন্তু শরৎচন্দ্রের দেবদাসের চেয়ে কোনো অংশে কম লাগছে না!”
কথাটার প্রতিটা বর্ণে যেন তাচ্ছিল্য উছলে পড়ছে! যেন অগোচরে ঠাট্টা করছে লোকটার এই চরম অসহায় ও নিঃসঙ্গ দশায়। লোকটার শুষ্ক অধরেও ভেসে ওঠে নিজের প্রতি এক আত্মপরিহাসের করুণ হাসি। জ্বলন্ত দামি সিগারেটখানা দুই আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরে পরম নিষ্পৃহ স্বরে বিড়বিড় করে বলেন,
“পারু হীনা দেবদাস যে বড্ড নিঃস্ব… বড্ড দেউলিয়া!”
আঁধার ফুঁড়ে ধীরলয়ে এক অবাধ্য মানবী ঘরের মাঝখানে এসে প্রকট হয়। পূর্বের মতোই সেই চরম তাচ্ছিল্যের সাথে বিষ উগরে দিয়ে জানান দেয়,
“দেবদাস… হা হা, এক আস্ত দেবদাসই তো আপনি! যে দুনিয়ার সব কিছু অর্জন করতে পারলেও শেষমেশ নিজের পারুকে নিজের করে পেতে পারেনি! ঠিক যেমনটা আপনিও কোনোদিন পারেননি। একটা নিরপরাধ নারীকে সারাজীবন নির্মমভাবে ঠকিয়ে কি অন্যজনের সহিত সুখের সংসার গড়া যায়, বলুন?”
নারীর এমন উদ্যত ও তিক্ষ্ণ প্রশ্নে বয়স্ক মানুষটি নিঃশব্দে হাসেন। বড্ড হাসেন তিনি… তবে সে হাসিতে নেই কোনো ঘৃণা, নেই কোনো না-পাওয়ার পুরোনো তীব্র বেদনা।
“কারোর দানে গড়া যে সংসার ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে… সে ছারখার হওয়া সংসার আবার নতুন করে ভাঙার কীইবা আছে, বলো?”
বয়স্ক মানুষটির এমন হেলাফেলা ও উদাসীন জবাবে নারীটি বেজায় বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়! তবে বহু কষ্টে নিজেকে ঠান্ডা রেখে দাঁতে দাঁত চেপে স্পষ্ট জানান দেয়,
“আমার দানেই আজ তোমার ওই জারজ কন্যা এখনো এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে স্বাধীন শ্বাস নিচ্ছে… এটা অন্তত ভুলে যেও না!”
“একদমই ভুল বলছ তুমি! তোমার এই অঢেল প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার পাহাড় তো আজ আমার পারুর পরম ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে গড়া! আর রইল কথা আমার আদরের কন্যার বেঁচে থাকার… তাকে বাঁচিয়ে রাখার মালিক একমাত্র ওপরওয়ালা আল্লাহ, যার উছিলা হয়ে এসেছে আমার যোগ্য জামাতা!”
কথাটা শোনামাত্রই নারীটির বিষাক্ত চোখজোড়ায় চরম কুটিলতা ভেসে ওঠে! তীব্র আক্রোশে লোকটার চওড়া চোয়াল বরাবর নিজের ধারালো নখের সজোরে আঁচড় বসিয়ে দেয় সে! মুহূর্তেই কেটে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে লোকটার মুখে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে তবুও সে একদম শব্দহীন, নিশ্চল!
তীব্র আঘাতেও বিপরীত কোনো আর্তনাদ বা প্রতিক্রিয়া না পেয়ে রাগে রমনীটি কক্ষ ত্যাগ করে চলে যায়। এবার পুরুষটির কাটা কপোল ও গাল বেয়ে একফোঁটা বাঁধভাঙা তপ্ত অশ্রুদানা গড়িয়ে পড়ে নিচে। পরম ব্যাকুলতায় আকাশে ভেসে থাকা অজস্র তারকার ভিড়ে সেজে ওঠা সুবিশাল অম্বরের দিকে চেয়ে রয় সে নিঃশব্দে…।
“তুমি এবার নিজের আঙিনায় ফিরে যাও, চন্দ্রাণু ! আমার সাথে তোমার নিয়তির পথচলা হয়তো ঠিক এতটুকুই ছিল। এবার নিজের সাজানো সংসারে মন দাও।”
মোছা. শারমিন সুলতানার এমন পাথরচাপা ও দৃঢ় বক্তব্যে প্রেমিক পুরুষের ব্যাকুল হৃদয়ে এক কালবৈশাখী ঝড় উঠে যায়! তীব্র অনুরাগে বক্ষের মাঝে সপাটে জড়িয়ে ধরে ধরে তাকে নিজের করে আটকে রাখতে চাইলেন শারমিন-কে, কিন্তু শারমিন অত্যন্ত সন্তর্পণে দু-পা পিছু হেঁটে নিজেকে আড়াল করে নিলেন। শারমিন সুলতানার দুই নেত্র তখন অশ্রুসিক্ত, কান্নার তোড়ে দম আটকে আসছে ওনার। অতিকষ্টে সেই কান্না গিলে তিনি ফের পরম মায়ায় বলেন,
“তোমার ঘরে এক পূর্ণাঙ্গ সংসার আর নিষ্পাপ সন্তান রয়েছে, সখা! আমার এই শূন্য মোহের খাতিরে ওদেরকে আর নতুন করে ঠকিও না। ফিরে যাও তুমি ওদেরই কাছে… পারলে ভালোবাসার এই পারুকে চিরতরে ভুলে যেও!”
শারমিন সুলতানার সুকোমল হাত দুটো পরম আকুলতায় আঁকড়ে ধরেন সেই পুরুষ। কণ্ঠে কোনো রাজকীয় তেজ নেই, কেবলই এক নিদারুণ মিনতি আর করুণ আহাজারি ফুটে ওঠে সেখানে! পুরুষটি অঝোর নয়নে ক্রন্দন করে পরম আর্জি জানান,
“পারু… আমার পারু! আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন যে এখন তোমার গর্ভে আসছে! আল্লাহর দোহাই লাগে পারু, আমায় অন্তত এতটা বড় আর নির্মম সাজা দিও না! আমাদের ওকে… আমার এই সন্তানকে অন্তত ধরণীর আলো দেখে ভূমিষ্ঠ হতে দাও!”
শারমিন সুলতানা অশ্রুসজল চোখে এক মুহূর্ত কেবল চাইলেন প্রিয় পুরুষের ছলছল নেত্রের পানে। তারপর আলতো করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পরম বেদনায় বিবিড় করে বললেন,
“আমাদের ভাগ্যের সময় যে এখানেই শেষ, চন্দ্রাণু। আজ তবে চলি!”
প্রায় দুই যুগ পূর্বের সেই বিষাক্ত ও বিভীষিকাময় স্মৃতি যেন আজ আবার নতুন করে বুকের ভেতর গভীর দাগ কেটে ওঠে! শ্রাবণের ধারার মতো গড়িয়ে পড়া অশ্রুসিক্ত লোচনে বৃদ্ধ মানুষটি ব্যাকুল হৃদয়ে ব্যক্ত করেন,
“আমি এক অভিশাপ! ওদের জীবনে আমার আগমন ছিলো ধ্বংসলীলার ন্যায়। আমার ললাটের অভিশাপের হেতুই সাত্তার ভাই হারিয়েছেন মেয়ের মতো বড় করে তোলা বোন পারু’কে! হারিয়েছে নিজ সন্তান ঝিলি’কে। আমি হারিয়েছি আমার প্রেয়সী পারু লতাকে।”
মেজর কারদার পর্ব ৪১
চোখের কোণে জমে থাকা কান্নার ঝাপসা আড়াল সামলাতে নিজের চশমাটা খুলে পাশে রেখে দেন তিনি। একরাশ নিদারুণ হতাশা মাখানো কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলেন—
“নিজের কন্যার চোখে নিজের প্রতি ঘৃণা দেখার চেয়ে মরণ অমৃতসম। আমার কন্যা আমায় ঘৃণা করলেও, ওর বাবা ওকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। ভালোবাসে। জন্মানোর পর হতে যাকে ছুঁতে পারিনি, তার প্রতি এক আসমান সম ভালোবাসা হৃদয়ে গাঁথা”
