বাবুই পাখির সুখী নীড় শেষ পর্ব
ইশরাত জাহান
কেটে গেলো দুইমাস।আজ শুক্রবার।শোভা পপকর্ন খাচ্ছে আর কার্টুন দেখছে।কানিজ ফাতেমা ইসলামিক কার্টুন।ভালো লাগে শোভার কাছে।পপকর্ন ভেজে দিলো দর্শন।এখন দর্শন সবজি কুটছে।রান্না করবে এখন।ছুটির দিনে দর্শন নিজে রান্না করে।শোভার বিশ্রাম থাকে।এমনকি বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় দুজনে একসাথে আড্ডা দেয়।শোভাকে শাড়ি পরতে হয়।দর্শনের ভালো লাগে শোভাকে শাড়ি পরতে দেখলে।এখনও শাড়ি পরে আছে শোভা।মিষ্টি রঙের শাড়ি।চুলে ঢিলা করে বিনুনি।সযত্নে করেছে বিনুনি দর্শন।শোভাকে আগলে রাখতে সবকিছু উজাড় করে দেয় দর্শন।শোভা নিজেও দর্শনের মনের মত চলে।তাই তো দর্শনের রানি হয়ে আছে।
শোভা একবার দর্শনের দিকে ফিরলো।জিজ্ঞাসা করে,“আমি সাহায্য করবো কি?”
“করতেই পারো।”
শোভা এগিয়ে এসে বলে,“কি করতে হবে আমাকে?”
“কিস মি।”
শোভা মুখ বেঁকিয়ে বলে,“একটাকে সাহায্য বলে?”
“অফকোর্স এটা আমার অনেক বড় হেল্প।”
শোভা দিলো দর্শনের ওষ্ঠ বরাবর চুম্বন।দর্শন খুশি হয়ে শোভার কপালে চুমু দিয়ে রান্নার কাজে চলে যায়।শোভা পিছন পিছন এসে রান্না করা দেখে আর বলে,“চুমুতেই হেল্প হয়েগেলো?”
“বাকি হেল্প রান্নার পরে করলেও চলবে।”
শোভা টমেটো নিয়ে দর্শনের মুখে পুড়ে দেয়।লজ্জায় বলে,“মুখে শুধু দুষ্টু কথা।”
টমেটোতে কামড় দিয়ে বাকি অংশ বাইরে রেখে দর্শন বলে,“ইউ নো হোয়া?ইউর কিস ইজ মাই ওয়ার্ল্ড বেস্ট গিফট প্লাস হেল্প।”
“হুমমম!”
“হুমমম।তোমার দেওয়া একটা চুমুই যথেষ্ট আমার ক্লান্তি দূর করতে।”
শোভা টমেটো নিয়ে নিজে খেতে শুরু করে আর বলে,“আপনি রান্না করুন।আমি যাই কার্টুন দেখি।”
“আমাকেও দেখতে পারেন ম্যাডাম।”
“এটা তো আমার জাতীয় কাজ।”
বলেই আবারও চুমু দেয় দর্শনের গালে।দর্শন একগাল হাসি দিয়ে শোভার নাকে মেয়োনিজ লাগিয়ে দেয়।শোভাও দিলো।দুজনে এভাবেই খুনসুটি করতে থাকে।
দিজা এখন যশোরে।বিয়ের পর ও যশোরেই থাকে।তুহিন এসে দেখা করে যায় ছুটির দিনগুলোতে।এখনও একসাথে সংসার শুরু হয়নি।সংসার বলতে তুহিন এসে এসে থেকে যায়।যতদিন না দিজাকে আনুষ্ঠানিক উঠিয়ে নিচ্ছে দিজা যাবে না।তাহলে অনুষ্ঠানে নতুন বউ নতুন বউ অনুভূতি আসবে না নাকি।এখন তুহিন ও দিজা দুজনেই বিছানার উপর বুট হয়ে আছে।দুই জোড়া পা উপরদিকে।হাত ধরে আছে একজন আরেকজনের।একসাথে ইংলিশ মুভি দেখছে।মুভি শেষ হতেই কিসিং সিন চলে।এমন অবস্থায় তুহিন নিজেও দিজাকে কিস করতে নিলে দিজা বলে,“আপনি অধৈর্য হয়ে পড়ছেন মিস্টার মাহমুদ।”
“স্বামী তো আমি তোমার।এখনও তোমার সংস্পর্শে যেতে পারলাম না।অধৈর্য হব না?”
“আর তো মাত্র এক সপ্তাহ।এরপরের শুক্রবার আপনি বর সেজে এসে আমাকে নিয়ে যাবেন।তখনই সব হবে।”
“তোমার ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছি আমি।”
“আচ্ছা কি খাবেন বলুন?”
“আমার বউকে খাবো।”
“ছিঃ!কি বাজে কথা।আপনি না শিক্ষক মানুষ।”
“শোনো মেয়ে,ভার্সিটিতে আমি তোমার শিক্ষক হলেও বাড়িতে আমি তোমার বর।বরেদের মুখ থেকে বাজে কথা বেশি বেশি শুনতে হয়।তবেই না আমার প্রতি বর বর ফিল আসবে।”
“বেশ বেশ শুনবো নাহয়।তো বলুন কি রান্না করবো আমি আপনার জন্য?”
“এখন রান্না করবে মানে তো আমাকে একা রেখে রান্নাঘরে যাবে।তাই তোমাকে কিছুই রান্না করতে হবে না।”
“ঢং!আমাকে নিয়ে সংসার পাতলে তখন তো আমাকেই রান্না করতে হবে আপনাকে একা রেখে।”
“একদমই না।তুমি রান্না করতে গেলে আমি থাকবো তোমার পাশে।তোমার সাথে দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটিতে মেতে থাকব।”
“বাব্বাহ!এত প্লান?”
“অনেক প্লান আছে আমার শুধু সংসার শুরু করাটাই বাকি।”
দিজা এবার সোজা হয়ে বসে।তুহিন শুধু কাত হলো।মাথায় একহাত ভর দিয়ে আছে। দিজাকে দেখছে মনভরে।দিজা হাত টানটান করে আড়মোড়া দিতেই তুহিনের দিকে চোখ গেলে বলে,“এভাবে তাকাবেন না।”
“কেন?”
“আপনার চাহনিতে দুষ্টু চাওয়া দেখতে পাই আমি।”
“আমার সামনে শাড়ির আঁচল ঠিক রাখতে পারছো না আর আমি দুষ্টু চাহনি দিলেই দোষ?”
নিজের দিকে তাকাতেই দিজা অবাক। আঁচল পরে আছে।দ্রুত আঁচল ঠিক করে তুহিনের দিকে চেয়ে বলে,“দেখে নিলেন?”
“সুযোগ করে দিলে দেখব না?”
চোখ খিচে বন্ধ করে দিজা বাচ্ছামি করে বলে,“ভালো হচ্ছে না কিন্ত।”
“আরে দেখলেও বা কী?তোমার ইচ্ছামত সব হবে।অনুষ্ঠানের পরই বাসর রাত।”
দিজা বিজয়ের হাসি দেয়।তুহিন নিজেও হেসে বলে,“পাগলী একটা।”
দুপুরের খাওয়া শেষে বাড়িতে কথা বলছে শোভা।শামীম, মিতু ও মৌলি আছে।ওরাও ঘুরতে গেছে।চারপাশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে শোভাকে।শোভা মৌলির লাফালাফি দেখে হেসে বলে,“সাবধানে সোনা।পড়ে যাবে তো।”
মৌলি শোনবার মেয়ে না।ও তো আনন্দে লাফালাফি করছে।মিতু হেসে দিয়ে বলে,“তোমাদের কি খবর?”
“এই তো চলছে।”
“আর কত একা থাকবে?এবার একটা বাচ্চা নেও।অত বড় আর বাড়িতে একা থাকতে হবে না।”
দর্শন পাশেই ল্যাপটপে কাজ করছে।এটা মিতু ভাবী জানেনা।শোভা একবার দর্শনকে দেখে ক্যামেরা ব্যাক করে আবারও নিজের দিকে করে।মিতু ভাবী লজ্জা পেয়ে চুপ করে।শামীম তাড়াহুড়ো দিয়ে বলে,“আচ্ছা বোন রাখি।পরে কথা হবে।”
কল কাটতেই শোভা এদিক ওদিক তাকিয়ে গুটিসুটি দিয়ে বিছানায় বসে থাকলো।শোভার ঢিলে বিনুনির অর্ধকে অংশ বিছানায় পড়ে আছে।দর্শন ল্যাপটপ বন্ধ করে শোভার পাশে ঘেঁষে বসে বলে,“আমাদের বেবী নিয়ে সবার দেখছি দুশ্চিন্তা হচ্ছে!”
শোভা চোখ ঘুরিয়ে বলে,“বিয়ের পর মেয়েদের একটাই পরামর্শ শুনতে হয়।সেটা হলো বাচ্চা নিয়ে নেও।সংসার পরিপূর্ণ হবে।”
“কেউ কি তোমাকে জোর করেছে?”
“একদমই না।”
“তোমার শরীর এখনও দুর্বল।আগে নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে তারপর বাচ্চা নেওয়া যাবে।”
শোভার মুখ চুপসে গেলো।পিরোজপুর থেকে ফিরবার সময় ফরাজি বংশের কিছু শত্রু ওদেরকে আক্রমণ করে।দিলদার ফরাজির সৎভাই আছেন।তারা বরিশালেই থাকেন।নিয়েজদের অভিজাত বজায় রেখেছেন। ফরাজিদের শত্রু হলো তালুকদার পরিবারের সদস্যরা।এর বড় এক ঘটনা আছে।যার কারণে তালুকদারের লোক সুযোগ পেলেই ফরাজিদের আক্রমণ করে।তবে ওই তালুকদার পরিবারের সবাই এক না।দর্শনরা যশোরের দিকে আসার সময় হামলা হয়।হামলায় শোভা আহত হয়।ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট হয়েছিল হঠাৎ।দর্শন পাগলের মতো হয়ে যায়।শোভাকে নিয়ে চিৎকার করে ওঠে।সেই সময় ফরাজি পরিবারের দলেরা হাজির হয়।মারামারি শুরু করে সবাই।সুযোগ করে দেওয়া হয় দর্শনকে।শোভাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসে।দাদাজান নেতিয়ে পড়েছিলেন অনেক।তুহিনের কপাল ফেটেছিল।দিদারের বামহাতে দায়ের কোপ লাগে।এখনও কাটা দাগ আছে সেখানে।সবাই স্বাভাবিক হলেও ডাক্তার বলেছেন শোভাকে সচেতন থাকতে।অন্তত তিনমাসের আগে সুস্থ না হওয়ার আগে যেনো কনসিভ না করে।ব্যাপারটা দর্শন ছাড়া কেউই জানে না।
অতীত মনে পড়তেই শোভার মুখ মলিন হলো।দর্শন তা দেখে শোভাকে জড়িয়ে ধরে বলে,“তোমার মন খারাপ দেখার সাহস আমার নেই।প্লিজ মনমরা থাকবে না।আমার সবসময় প্রাণবন্ত বউটাকে দেখতে ভালোলাগে।”
শোভা কান্না কণ্ঠে বলে,“আপনি বাবা হতে চেয়েছিলেন।”
“বাবা হতে চেয়েছি ঠিকই কিন্তু তোমাকে কষ্ট দিয়ে না।আমরা বাবা মা হবো।সময় তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না।বরং আমাদের একা মুহূর্তটা ইনজয় করার সুযোগ পেলাম।বাচ্চা হবার আগ মুহূর্তে নিজেদেরকে বেশি বেশি সময় দেওয়াটা প্রয়োজন।”
“আপনি আসলেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।আল্লাহ আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছেন।আমি এরজন্য কোটি কোটি শুকরিয়া আদায় করি।”
“আমিও।”
আসরের আজান দিচ্ছে।শোভা দূরে সরে বলে,“নামাজ পড়ে নেই।”
“হুমমম।”
শোভা অজু করে নামাজ পড়তে দাঁড়ায়।দর্শন মসজিদে গেলো।মসজিদ দূরে বলে শোভা নামাজ শেষ করলেও দর্শন এখনও ফিরেনি।শোভা এই সময়টায় রান্নাঘরে গেলো। ফ্রোজেন করা মোমো আছে।সেগুলো ভাপা দিচ্ছে আর চা বানালো শোভা।দর্শন চলে আসলো কিছুক্ষণ পর।শোভা প্লেটের নাস্তা নিয়ে এসে বলে,“চলুন আপনার নতুন সারপ্রাইজ দেখবো।”
শোভার হাতের খাবার দেখে বলে,“চলো।”
বাইরে এসে শোভা অবাক।বাড়ির সামনের পুকুর এতদিন শুকনো ছিল।বৃষ্টি হলে ভিজে কাদামাটি হয়ে থাকতো।এই পুকুরে এখন পানি ভর্তি।পরিষ্কার পানি।আকাশের নীল রং পুকুরের পানিতে ভেসে আসছে।সামনে আছে অহরহ তালগাছ।সেখানে বাস করে বাবুই পাখি।বাবুই পাখিরা বাবা বেঁধে রেখেছে।দর্শন সেদিকে ইঙ্গিত করে বলে,“ওটা কি জানো?”
শোভা জানায়,“বাবুই পাখির নীড়।”
দর্শন মাথা নাড়িয়ে বলে,“শুধু নীড় না সুখী নীড়।বাবুই পাখির সুখী নীড়।বাবুই পাখির নিজে গড়া নীড়।যেখানে সে থাকতে পারে নিজের যোগ্যতায়।নিজের অধিকারে।সুখ দুঃখ আসলেও বলতে পারে তারা নিজের গড়া নীড়কে নিয়ে সুখে আছে।ঠিক আমাদের মতো।”
“আমাদের মতো?”
“আমরাও তো বাবুই পাখির সুখী নীড় গড়ছি ওয়াইফি।”
শোভা তাকালো দর্শনের দিকে।দর্শন প্রশ্নবিত্ত নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,“কি গড়ছি না?”
শোভা বলে,“হ্যাঁ আমরাও বাবুই পাখির সুখী নীড় গড়ছি।”
পুকুরের সামনে পরিষ্কার জায়গায় পাটি বিছিয়ে দেওয়া হলো।আশেপাশে ফলগাছে ভরা।গাছের পাতা নড়ছে।প্রকৃতির ঠান্ডা বাতাস।শোভা ও দর্শন মিলে উপভোগ করছে।দর্শনের কাঁধে মাথা রেখে শোভা বলে,“এত সুখ আমি পাবো কখনও কল্পনাও করিনি।”
শোভার তুলতুলে হাত নিজের মাঝে রেখে দর্শন বলে,“তুমি আমার হয়ে থাকবে।আমি তোমাকে সমস্ত সুখ খুঁজে দিবো।”
শোভা ঠোঁট প্রসারিত করে।দর্শন নিজের গিটার হাতে নিলো।শোভা একই ভঙ্গিতে আছে।দর্শন গিটার বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করে,
“ইচ্ছে যত উড়িয়ে দেবো
হঠাৎ দমকা হাওয়াতে,
দস্যু হয়ে তারা,
ভাঙবে যে পাহারা
জাগাবে তোমায় রাতে।
বলো না বলো শুনতে কি চাও?
বলো না বলো শুনতে কি পাও?
বলো না বলো আজকে আমায়।”
তুহিন ও দিজার বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু।দর্শন ও শোভাও যশোরে এসেছে।আজকে মেহেদী অনুষ্ঠান ও গায়ে হলুদ একই সাথে।কালকে বিয়ের অনুষ্ঠান।তুহিন ও তুহিনের পরিবারও যশোরে আছে।ঢাকা থেকে যাতায়াতে সময় অনেক ব্যয় হবে।বরযাত্রী এসে আবার একই দিনে যাওয়া ধকল আছে।তাই কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা হয়েছে তিনদিনের জন্য। দিজা সবুজ রংয়ের শাড়ি পরে আছে।দুইহাত জুড়ে মেহেদী দেওয়া হচ্ছে তার।ঠোঁটে হাসি লেগেই আছে।এখানে অনেক অনেক মেয়েরা আছে হাতে মেহেদী দিচ্ছে।সামনে কিছু ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে নাচ করছে মৌলি।শোভা আজ ওড়না হিজাব বেঁধেছে।মুখ ঢেকে রাখা।সবুজ রংয়ের গোল জামা পড়েছে।দর্শনের দুর সম্পর্কের আত্মীয়রা এসেছে।অধিকাংশ মানুষই আধুনিক।ঢাকায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানের।কখনও দেখেনি তাদের শোভা।ওরাও দর্শন বা দিজাকে তেমন দেখেনি।দিদারকে টুকটাক চেনে কারণ দিদার তাদের সাথে ফেসবুকে অ্যাড আছে। দর্শনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়েছে কিন্তু দর্শন একসেপ্ট করেনি।আজকে দর্শনের দাদির পরিবারের লোকেরাও এসেছে।ইয়ং কিছু ছেলে মেয়ে আছে সেখানে।দর্শনের যে বিয়ে হয়েছে এই ব্যাপারে অনেকের অজানা।সবাই এমনি জানে ফরাজি পরিবারের করুন অবস্থার কথা।এরপর কিভাবে কি ঠিক হয়। জানা নেই।দর্শন তাদেরকে আপদ বলে দাবি করে।শুধুমাত্র স্ত্রীর পরিবারের লোক বলেই সম্পর্ক রক্ষার্থে ডাক দেন এতবড় অনুষ্ঠানে।এতদিন কোনো আলাপ না থাকায় দর্শন যে এই পরিবারের যুবক এটা জানতো না দিলদার ফরাজির শালার একমাত্র আদরের নাতনি গুনগুন।এই মাত্র অনুষ্ঠানে এসে সবার সাথে হাসিমুখে ঘুরছিল।আচমকা ব্যস্ততার সাথে হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা লাগতে নেয় দর্শনের সাথে।কিন্তু ধাক্কাটা লাগলো না।এমনকি মেয়েটা পরে যেতে নিলে দর্শন ধরলোও না।বরং নিজে দূরে সরে গেলো।গুনগুন ফ্লোরে পড়ে গেলো।কোমরে ব্যাথা পেলো সাথে সাথেই।চোখ রাঙিয়ে উপরে তাকাতেই বড়সড় ক্রাশ খায়।দর্শনের উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে বলে,“হেল্প।”
দর্শন ভাব দেখিয়ে বলে, “আই ক্যান্ট।”
বলেই চলে যায়।শোভা এতক্ষণ দর্শনের দিকেই নজর রেখেছিল।দর্শনকে ভাব নিতে দেখে আড়ালে হাসলো।দর্শন যেতেই গুনগুন নিজে থেকে উঠে দাঁড়ায়। গুনগুণের ভাই রিফাত এসে জিজ্ঞাসা করে,“ঠিক আছিস?”
গুনগুন মাথা নাড়িয়ে বলে,“হুমমম।আচ্ছা ওই ছেলেটা কে?”
রিফাত ভালোভাবে দেখে বলে,“চিনি না হবে ছেলে নাহয় মেয়ে পক্ষের কেউ।”
“খোঁজ নে তো।”
“কেন,মনে ধরেছে?”
“ঠু মাচ হ্যান্ডসাম।মনে তো ধরবেই।”
“যদি ম্যারিড হয়?”
“খুঁজেই দেখ না ভাই।যদি সিঙ্গেল হয় তাহলে সুযোগ তো আছেই।”
রিফাত পরিচিত বলতে দিদারের কাছে গেলো।দর্শনকে দেখিয়ে বলে,“ও কে?”
দিদার ভাব দেখিয়ে বলে,“আমার একমাত্র রাগী,গম্ভীর ও বদমেজাজি ভাই।”
“বাব্বাহ! রাগী,গম্ভীর আবার বদমেজাজি?”
“হুমমম,ভীষণ ডেঞ্জারাস।রেগে গেলেই মারধর শুরু করে।সবথেকে বেশি রাগ কখন হয় জানো?”
“কখন?”
“কোনো মেয়ে তার আশেপাশে ঘুরলে।মেয়েদের একদম সহ্য করতে পারে না।ঘৃণা করে তাদেরকে।”
একটু ভেবে রিফাত বলে,“এটাই স্বাভাবিক।নিজের মায়ের কীর্তিকলাপ দেখেছে যে।”
“তবে ইদানীং পরিবর্তন হয়েছে।মনে হয় সংসার করা নিয়ে সিরিয়াস।”
“তাই নাকি?”
“হ্যাঁ।”
“ভাবগতি কেমন সংসার নিয়ে?”
“আগে তো বলতো মেয়েদের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট নেই।বিয়ে শব্দটাই আমার বিশ্বাসের বাইরে।এখন দেখি বৈবাহিক জীবন নিয়ে অনেক উদাহরণ দেয়।”
“বয়স বাড়ছে তো তাই হয়তো।”
দিদার কিছু বলতে নিলে ওকে ডাক দেয় দাদাজান।অনুষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলতে। দর্শনও গেলো সেদিকে।রিফাত মৃদু হেসে গুনগুনের কাছে এসে বলে,“ছেলেটার নাম দর্শন।মানে ছোটবেলার সেই ফ্যাটি অয়েলি হেয়ার ইনোসেন্ট বয়।”
গুনগুন অবাক চোখে চেয়ে বলে,“এত চেঞ্জ?”
“ছোটবেলায় বাবাকে ফলো করতো হয়তো এখন সিনেমার হিরোদের ফলো করে।”
“সিঙ্গেল?”
“আরে শুধু সিঙ্গেল না পুরাই পানসে।”
“মানে?”
“মেয়েদের সহ্যই করতে পারেনা।বিয়ে শব্দটাই বিশ্বাস করেনা।”
গুনগুন চমকিত হাসি দিয়ে বলে,“ব্যাপার না আমি বিশ্বাস অর্জন করে নিবো।”
“চেষ্টা করলে পারতেও পারিস।কারণ বয়স বাড়ছে বলে সংসার করার দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে।”
“সো সুইট।এখনই কিন্তু আম্মু আব্বুকে কিছু বলবি না।আগে ওকে নিজে আশেপাশে ঘুরাই।”
“কিভাবে?”
“তুই হেল্প করবি।”
“বিনিময়ে কি পাবো?”
“তোর যেটা দাবি।”
“ওকে, ডান।”
দিদার বিয়ের খরচের হিসাব দিতে থাকেন দাদাজানের কাছে।দাদাজান সব শুনে বলেন,“আরো কি কি লাগবে দেখো।আর হ্যাঁ লকারের চাবি সাবধানে রাখবে।বিয়ে বাড়িতে কিন্তু চুরি হয় বেশি।”
দর্শন একটা চেক বের করে সেখানে কিছু টাকা উল্লেখ করে সই করলো।অতঃপর দিদারের হাতে দিয়ে বলে,“এগুলো বিয়েতে খরচ করবি।”
দিদার নিতে গিয়ে ইতস্তত বোধ করে।দাদাজান বলেন,“টাকার দেমাগ তোমার পকেটে রাখো।আমরা এখনও মরিনি।”
দর্শন স্বাভাবিকভাবে বলে,“ভাই হিসেবে আমার দায়িত্ব আছে।”
“যখন প্রয়োজন হবে তখন দেখা যাবে এখন দায়িত্ব পালন করতে হবে না।”
“একা আব্বাজানের উপর চাপিয়ে দিবো সব?এটা তো হয়না।আমি আয় করি কাদের জন্য?”
“তোমার বউয়ের জন্য।”
“তার জন্য তো রাজপ্রাসাদ আছেই এমনকি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আছে।এগুলো আমার পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য।”
“টাকা এভাবে হেলায় খরচ করো না।বিপদে টাকাই সাহায্য করবে।”
“সে নিয়ে চিন্তা করো না।আমি যথেষ্ট কর্মঠ।”
বলেই দিদারের হাতে গুঁজে দিল চেক।দিদার না করলো না।সাহস নেই।দর্শন চলে যেতেই দীপ্ত ফরাজি আশ্বস্ত করেন,“ছেলে বড় হয়েছে যোগ্য চেয়ারম্যান হয়েছে নিজের অফিসের।কোটি কোটি টাকার মালিক।বোনের বিয়েতে এই সামান্য খরচে কিছুই হয়না।”
দাদাজান তাকালেন দীপ্ত ফরাজির দিকে।বলেন,“এই কোটি টাকা আমার নাতির জীবনে এমনি এমনি আসেনি।অনেক পরিশ্রমের পর সফল হয়ে এসেছে।জীবনে একা বেঁচে থেকে একা লড়াই করে যোগ্যতা অর্জন করেছে।ওর এই কষ্টের অর্জিত টাকা নিতে আমার বিবেকে বাঁধছে।”
“তোমার দিকটাও আমি বুঝি কিন্তু আমার ছেলেকে তার দায়িত্ব থেকে ফিরে যেতে বলতে পারিনা।এতে ওই বেশি আঘাত পাবে মনে মনে।ছেলেটা গম্ভীর হতে পারে কিন্তু ওর মধ্যে আমাদের প্রতি ভালোবাসা অফুরন্ত।”
দাদাজান আরও দ্বিমত করলেন না। সহমত পোষণ করে বলেন,“বেশ,তবে করা হোক বোনের বিয়েতে ভাইকে খরচ।”
অনুষ্ঠানের দিকে চলে আসে দর্শন।তুহিনের সাথে গল্প করতে থাকে।তুহিন এতক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে দিজার হাতের আঁকানো মেহেদী দেখছিল।এটা অবশ্য ক্যামেরাম্যানের কথামত।দর্শন এসে তুহিনের কাঁধে হাত রেখে বলে,“হোয়াইট আপ?”
“তোকে শালা বানানোর খুশিতে আত্মহারা।”
“এতটা ডেসপারেট?”
“আরে বন্ধু থেকে শালা হবি।ডেসপারেট তো হবোই।”
ক্যামেরাম্যান এখন দুই বন্ধুর ছবি তুলল।এরপর ওরা গল্প করতে শুরু করে।তুহিনের সাথে দর্শনের কথা শুনে গুনগুন এগিয়ে এসে বলে,“আপনারা দুজন ফ্রেন্ড?”
দিজা হাসিমুখে বলে,“শুধু ফ্রেন্ড না বেস্ট ফ্রেন্ড।”
“হাউ ইন্টারেস্টিং বন্ডিং।ফ্রেন্ড থেকে এখন আত্মীয়।”
দর্শনের চোখ যায় শোভার দিকে।মিতু ভাবীকে মেহেদী দিয়ে হাত ঝাড়া দিচ্ছে।দুইহাতের এপিঠ ওপিঠ সাজিয়েছে মেহেদী দিয়ে।মিতু ভাবী আবদার করেনি।শুধু বলেছিলো,“আমার বিয়েতেও এমন হাত সাজানোর ইচ্ছা ছিল কিন্তু ভালো কেউ মেহেদী দেওয়ার মানুষ ছিল না।নিজের বামহাতে নিজেই মেহেদী দিয়েছিলাম বিয়ের আগেরদিন।ডানহাতে পাতা মেহেদী বেটে এক কাকি মোটা মোটা করে ফুল একে দেয়।কত যে খারাপ লাগছিল আমার।আমার খালার মেয়ের বিয়ের দিন ওর দুইহাত ভরে মেহেদী দিয়ে দিয়েছিলাম।আমাকে কিনা সাজিয়ে দিলো না।”
মিতু ভাবির ইচ্ছাকে সাথে সাথে পূরণ করতে না পারলেও আজকে করবে শোভা।তাই জোর করে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে।মিতু ভাবী খুশি হলেও শোভার হাত খুব ব্যাথা করছে।দর্শন দেখামাত্র এগিয়ে আসতে নেয়।এদিকে মিতু ভাবীর হাতের ডিজাইন দেখে গুনগুন বলে,“ওয়াও,খুব সুন্দর হয়েছে।ইনফ্যাক্ট পার্লারের মেয়েটার থেকেও।”
দিজা উকি দিয়ে দেখে বলে,“ভাবী এত সুন্দর করে দিয়ে দিলো তোমাকে?কই আমাকে তো বলল না ভাবী ডিজাইন করতে জানে।”
শোভা এগিয়ে এসে বলে,“আমি আসলাম তো আজ সকালে।”
দর্শন সবাইকে কথা এগোতে না দিয়ে শোভার হাত ধরে নিয়ে গেলো আত্মীয়দের জন্য বরাদ্দ করা ঘরে।যেখানে এখন ফাঁকা।সবাই অবাক হলো।তুহিন আলতো ধাক্কায় দিজাকে বলে,“তোমার ভাইয়ের এখন যখন তখন প্রেম পায় নাকি?”
দিজা মুখ ভেংচি দিয়ে বলে,“ভাই তার বউকে ভালোবাসে।যখন তখন প্রেম প্রেম অনুভব আসতেই পারে।”
গুনগুন দুই পা এগিয়ে মিতু ভাবীর উদ্দেশে বলে,“মেয়েটা কে?”
মিতু ভাবী মৌলির দিকে নজর স্থির রেখেছে তাই গুনগুনের মুখশ্রী দেখেনি।সহজভাবেই বলে,“আমার ননদ।”
“মেয়েটার মুখ ঢেকে রাখা কেন?”
“আমরা পর্দা করি তাই।”
গুনগুন হেঁয়ালি করে বলে,“পর্দা করে আবার পুরুষ মানুষের সাথে ঘোরাঘুরি করে?”
মিতু ভাবীর কাছে কথাটা অসহ্যকর লাগে তাই পাশ ফিরে তাকায়।কিছু বলতে নিলে রিফাত ডাক দেয়।মিতু ভাবী আর কথা না বাড়িয়ে বিরক্ত হয়ে চলে আসে শামীমের কাছে।
ঘরে আসতেই শোভা জিজ্ঞাসা করে,“কি হলো হঠাৎ?”
“তোমার কি নিজেকে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে?”
“কি করলাম আমি?”
“এত সময় ধরে ডিজাইন করতে গেলে কেন?একজনের হাত সাজাতে গিয়ে তোমার নিজের হাতের কি দশা করেছো দেখেছো একবারও?”
“ওহ,এই ব্যাপার?এতে রেগে যাচ্ছেন কেন?এখন হাত ব্যাথা করছে একটু পর ঠিক হয়ে যাবে।”
দর্শন মলম নিয়ে শোভার হাতের আঙুলের লাল স্থানে ডলতে ডলতে বলে, “কনুইয়ে ভর দিয়ে কি হাল করেছো দেখো একবার।”
“বালিশ পাইনি তো তাই।”
“আমাকে ডাক দিতে।ব্যাবস্থা করে দিতাম।”
“সামান্য বিষয়ের জন্য বিরক্ত করব?”
শোভার গলটা আদরে ধরে দর্শন বলে,“যে কাজে আমার ওয়াইফির হাতে যে খুব ব্যাথা করছে এটা কি খুব সামান্য বলে মনে হয় তোমার?”
“আপনিও না।যাই হোক নিচে চলুন।আমিও হাতে মেহেদি দিবো।”
“ঐভাবে দুইহাত মেলে রেখে?”
“হ্যাঁ।”
“দিজার হাতের নিচে কতগুলো বালিশ রাখা দেখেছো?তাও ও বলছে কখন মেহেদী দেওয়া শেষ হবে।ওর হাত অলরেডি ব্যথা করছে আর তুমি তো টানা ঘণ্টা চার ধরে ভাবীর হাতে মেহেদি দিয়ে আবার নিজে দিবে।বুঝতে পারছো তোমার হাতের আজ কি হতে চলেছে?”
“কি আর হবে?”
“তোমার খুব কষ্ট হবে।”
“তাই বলে শখ পূরণ করব না?”
মনক্ষুন্ন হয়ে বলে শোভা।দর্শন দেখে বলে,“খুব মেহেদী দেওয়ার ইচ্ছা?”
“অনেকদিন হলো হাতে মেহেদী দেইনি।”
দর্শন ভাবনায় পড়ল।ইন্টারনেট দেখছে।অনেক খুঁজে দেখলো সহজে হাত সাজানোর উপায় হলো স্টিকার।দর্শন দ্রুত দিদারকে কল করে কয়েকটা সুন্দর ডিজাইনের মেহেদী আনতে বলে।সাথে করে অর্গানিক মেহেদী। কারণ কালার মেহেদীতে নাকি হাতের ক্ষতি হয়।এলার্জির সমস্যা থাকলে হাতে রেশ ওঠে।ইউটিউবে দেখলো মাত্র।তাই সচেতন হয়ে অর্গানিক মেহেদী অর্ডার দিলো।কিছুক্ষণ ধরে শোভা বসে আছে।বাইরে যাওয়ার জন্য মন ছটফট করছে। বিয়ে বাড়িতে আনন্দ রেখে একঘরে কেই বা থাকতে চায়।দর্শনের উদ্দেশে বলে,“আমি বাইরে যাই?”
“বিশ্রাম নেও।”
“কিছুই তো করিনি আমি।বিশ্রাম কোন দুঃখে?”
“যেটা বলেছি লক্ষ্মী মেয়ের মতো শোনো।”
“ঠিক আছে।”
দর্শনকে রাগাতে এখন আর শোভা দর্শনের বিরোধিতা করেনা।তাই তো দর্শন সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করে।কিছুক্ষণ পর দিদার মেহেদী কে স্টিকার নিয়ে আসে।দর্শনের হাতে দিয়ে বলে,“আর কিছু লাগবে?”
“আপাতত না।”
শোভার কাছে চলে আসে দর্শন।শোভা তাকালো দর্শনের মুখের দিকে।বলে,“এগুলো কি?”
“প্যাকেট তো খুলছি।নিজের চোখেই দেখো।”
“এই সময়ে কিসের প্যাকেট এগুলো?”
“তোমার সেফটির জন্য এগুলো অর্ডার করেছি।”
“ভরা মানুষের মধ্যে আপনি এগুলো অর্ডার করলেন?”
“উপায় আছে বলো?তোমার শখ হয়েছে যখন পূরণ তো করতেই হবে আমাকে।”
“শখ পূরণের আর জায়গা পেলেন না।আমি বাইরে যাচ্ছি।সবার সাথে আড্ডা দিবো।”
শোভা উঠতে নিলেই দর্শন হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে বলে,“আগে তোমার শখ পূরণ হবে তারপর সবার সাথে গিয়ে গল্প করার সুযোগ পাবে।”
শোভা জিনিসগুলোর দিকে চেয়ে বলে,“দেরি হবে আপনার অনেক।এই কাজে অনেক সময় লাগে।তাছাড়া আপনি পারবেন না।”
“একবার ট্রাই করে দেখি পারি কিনা।এতটা অকেজো আমাকে ভেবো না।কঠিন কঠিন কাজ সামলেছি আর এটা পারবো না?”
“কত সময় লাগবে আপনার?”
“এসব কাজ সময় ধরে হয়নাকি?”
“ধুর।আমার চিন্তা হচ্ছে।”
“বিশ্বাস করো আমি সুন্দরভাবে করে দেখাবো।”
“নষ্ট করবেন না তো আমার হাতটা।”
“একদমই না।”
অতঃপর শোভার হাতে স্টিকার লাগিয়ে ন্যাচারাল মেহেদী লেপে দেয়।কিছুক্ষণ পর স্টিকার উঠিয়ে দেয়। কাঁচা মেহেদির ডিজাইন হয়ে আছে।শোভা দেখে বলে,“কত সময় লাগবে শুকাতে?”
“আমি নিজেই জানি না।”
“এই মেহেদী এখন হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে!”
“দরকার হয় ঘুরবে তাও বাজে মেহেদী দিয়ে হাত নষ্ট করবে না।”
শোভা সহমত জানিয়ে চলে যেতে নিলে আবারও থেমে বলে,“আমার হাতের মেহেদির রং গাঢ় না হলে আপনার খবর আছে বলে দিলাম।”
“আমি কি মেহেদির মধ্যে ঢুকে আছি?”
“আপনি না থাকলেও আপনার ভালোবাসা পরিমাপ আছে।লোকে বলে মেহেদির রং যত বেশি গাঢ় হয় স্বামীর ভালোবাসা তত বেশি গভীর হয়।”
“ঠিক আছে দেখা যাবে।”
শোভা চলে গেলো।মিতুর কাছে এসে দাঁড়ায়।শামীমের সাথে কথা বলে অতঃপর পারুল বেগমের কাছে যায়।দর্শনও শোভাকে চোখে চোখে রাখছে।
সন্ধ্যায় হলুদের অনুষ্ঠান শুরু।সবাই যে যার মতো সাজছে।হাতে মেহেদি শুকিয়ে গেছে।হাত ধুয়ে পরিষ্কার করে গোসল সেরে এখন হলুদ শাড়িতে সাজতে ব্যাস্ত মেয়েরা।শোভা মুখ ফুলে চেয়ে আছে দর্শনের দিকে।দর্শন অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।শোভা দুইহাত দেখিয়ে বলে,“এই আপনার ভালোবাসা?”
শোভার হাতের রং সবার থেকে হালকা।শোভা দুঃখে দর্শনকে ঝারতেই থাকে।দর্শন অভিযোগ শুনলো।শোভা আবারও বলে,“আপনি আমাকে আজও ভালোবাসতে পারলেন না।”
দর্শন রেগে গিয়ে বলে,“একদম আমার ভালোবাসায় সন্দেহ রাখবে না।”
“মেহেদির রং গাঢ় হয়নি কেন?”
“মেহেদির দোষ।”
“আজ্ঞে না।এটা আপনার দোষ।আপনি আমাকে কম ভালোবাসেন তাই রং হালকা হয়েছে।”
“মন তো চাচ্ছে যে এই মেহেদী বানিয়েছে তার কানের উপর এমন জোরে থাপ্পড় মারতে যাতে সে মেহেদী ঠিকভাবে তৈরি করে।”
“দোষ ওনার না দোষ আপনার।”
“কি অদ্ভুত!এতে আমার দোষ হবে কেন?”
“বারবার বলছি তো আপনি আমাকে ভালোবাসেন না তাই।”
“আবার ভুলভাল কথা!”
শোভা কান্না করে বলে,“আপনার ভালোবাসায় ঘাটতি আছে।”
“ধুর,পাগলের সুখ মনে মনে।এতকিছু থাকতে মেহেদী দিয়ে ভালোবাসার বিচার করে।এর থেকে তো ভালো ছিল এই ভেজাল মেহেদী দিয়ে পাঁচ মিনিটে গাঢ় রং দেখিয়ে ভালোবাসা দেখিয়ে দেওয়া।”
“কতবড় প্রতারক আপনি!”
“তোমার সাথে প্রতারণা করলেই ঠিক হতো।”
বলেই দর্শন হলুদ পাঞ্জাবি নিয়ে চলে গেলো।শোভা মন খারাপ করে চলে গেলো দিজার কাছে। দিজা হলুদের সাজ সাজতে ব্যাস্ত।শোভাকে দেখে বলে,“শাড়ি পড়বে না?”
“না,তোমার ভাই গাউন কিনে দিয়েছে।”
“বাড়ির বউ শাড়ি না পড়লে ভালো লাগে?”
“কিছু করার নেই।”
“ধুর,তুমি ছাড়ো তো।আমার কথা শোনো।”
বলেই নিজের সাজ থামিয়ে শোভার জন্য হলুদ শাড়ি বের করে বলে,“এটা পড়বে এখন।”
শোভা শাড়ি দেখে বলে,“এটা কার?”
“এটা আমার উদ্দেশেই কেনা।দিদার এনেছিল।তখন তো জানতাম না মিস্টার মাহমুদ আমার জন্য হলুদের লেহেঙ্গা আনছেন।ভালই হলো বলো? তুমিও শাড়ি পেলে।”
“কিন্তু তোমার ভাই?”
“আমি বুঝিয়ে দিবো।”
“ঠিক আছে।”
শোভা শাড়ি পরে নিলো। দিজা কিছু আর্টিফিশিয়াল ফুল দিয়ে শোভাকে সাজিয়ে দেয়।শোভা তবুও হিজাব বেঁধে মুখ ঢাকে।তবে শোভার চোখের সৌন্দর্য ঢাকেনি। মোটা গাঢ় কাজল চোখজোড়া দেখে দিজা আবার হালকা করে হলুদ,গোলাপি ও সোনালী রঙের মিশ্রণে সুন্দরকরে আইশ্যাডো দিয়ে দেয়।
বাইরে আসতেই শোভাকে দেখে দর্শন আশপাশ তাকালো।দ্রুত শোভাকে নিয়ে চলে আসে ভিতরে।শোভা বিরক্ত প্রকাশ করে বলে,“আপনি শুধু আমাকে টেনে ভিতরে নিয়ে আসেন কেন?আত্ময় সজনে ভরা পরিবেশ।সবাই কি ভাববে?”
“আমার বউকে আমি টানছি ওদের বাপ দাদার বউ না।”
“ছিঃ!মুখের কি ভাষা?”
“ভাষাকে গুলি মারো আগে বলো এত সেজেছো কেন?”
নিজেকে আয়নায় না দেখেই বের হয় শোভা।তাই বুঝলো না কিছু।শাড়ি পরাকে অতিরিক্ত সাজ বলে?দর্শনের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে বলে,“আমার ননদের আবদার তাই।”
“এবার স্বামীর আবদার শোনো।”
“কি আবদার আপনার?”
“শাড়ি খুলবে।”
“কিঃ!মাথা কি একেবারেই গেছে আপনার?”
“তুমি শাড়ি পড়লে আমার মাথা একদমই ঠিক থাকে না।”
শোভা চুপচাপ চেয়ে থাকে।দর্শন আবারও বলে,“খোলো।”
“দিজা কষ্ট পাবে।”
“আই ডোন্ট কেয়ার।”
“বোনের বিয়েতে ঝামেলা..
আর কিছু বলল না শোভা।দর্শনের রক্তিম চাহনি দেখে বলে,“বাইরে যান।”
“কেন?”
“কাপড় পাল্টাবো তাই।”
“আমার সামনে কী সমস্যা?”
“আমার কেমন কেমন জানি লাগছে।”
“কেমন কেমন লাগার তো কথা না।তুমি পুরোটাই আমার।সবকিছু আমার চেনা।তাহলে এখন আবার আমার সামনে ইন্সিকিউর কেন?”
“আশ্চর্য!তাই বলে পোশাক পাল্টানো যায় নাকি কারো সামনে?”
“আমি তোমার স্বামী।”
“তো?স্বামী বলেই আপনার সম চেঞ্জ করবো?”
“করবে।”
“আপনি কিন্তু আমার সাথে বাড়াবাড়ি করছেন।”
“আর তুমি আমার অধিকারকে সমর্থন করছো না।”
শোভা তাকিয়ে আছে দর্শনের দিকে।দর্শনের মধ্যে রাগ স্পষ্ট।তাই বাধ্য হয়ে আগে হিজাব খুলে গহনা খুলে রাখে। হাত কাপছে শাড়ির আঁচলের দিকে হাত রাখার সময়।ঠিক তখনই দর্শন তাড়াহুড়ো করে বলে, “সবই তো দেখা।তবুও এত ঢং কেন?”
“চুপ করুন আর চুপচাপ দেখুন।”
শোভা নিজের মত পাল্টাতে থাকে।দর্শন চাপা হেসে শোভার লজ্জা মুখ দেখে।গাউন পরে শোভা আবারও হিজাব পরতে নিলে দর্শন বলে,“মুখ ধুয়ে আসো।”
শোভা জিজ্ঞাসা করে,“এই সাজে ভালো লাগছে না আমাকে?”
“তোমাকে না সেজেই আমার কাছে আকর্ষণীয় লাগে আর এই সাজ তো পুরাই খুন করে দেবার মতো।আমি চাইনা বাইরের পুরুষ তোমার এই চোখের প্রেমে পড়ুক।আমার হিংসা বাড়বে আর তার ক্ষতি হবে।”
শোভা একপলক দর্শনকে দেখে চলে গেলো মুখ ধুতে।শোভার ফ্রেশ মুখটা দেখে দর্শন তোয়ালে নিয়ে শোভার মুখটা আলতো করে মুছে দেয়।শোভার কপালে চুমু দিয়ে বলে,“তুমি যেমন আছো বেস্ট আছো।”
হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলো অনেক রাত করে।এখন সবাই ঘুমোবে বলে হামি তুলছে।গুনগুন সারাটা অনুষ্ঠানের মুহূর্তে দর্শনের এটেনশন পাওয়ার চেষ্টায় ছিল।কিন্তু কোনোভাবেই কাজ হচ্ছে না।মাত্র আবারও আসলো দর্শনের কাছে।দর্শন গুরুত্ব না দিয়ে শোভাকে নিয়ে বাইরে বের হয় আর পারুল বেগমের উদ্দেশে বলে,“আমি শোভাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি।শামীম ভাইদের পৌঁছে দিয়ে ফরাজি বাড়িতে যাবো।আপনারা দিদারের সাথে আসবেন।”
শামীম না করে।লজ্জা পায় তাই।কিন্তু এই রাতে বউ বাচ্চা নিয়ে শামীমকে একা ছাড়তে নারাজ দর্শন।তাই শামীমকে রাজি করিয়ে আগে আগে বের হলো শোভাকে নিয়ে।গুনগুন ভাবুক হয়ে নিজেকে নিজে বলে,“এই মেয়েটার সাথে এত কি ওর?প্রেমিকা নাকি?”
দিজার কাছে এসে গুনগুন জিজ্ঞাসা করে,“তোমার ভাইয়ের প্রেমিকা আছে?”
দিজা হামি তুলে দিদারের দিকে তাকালো।মুখ ভেংচি দিয়ে বলে,“ভুল মানুষকে ভালোবেসে পরে তওবা করেছে।এখন ওসব প্রেম ট্রেম না সোজা এরেঞ্জ ম্যারেজ করবে।”
“তাহলে ওই মেয়ের সাথে এত মেশে কেন?”
দিদারের পাশে থাকা তনয়াকে দেখে দি মনে মনে বলে,“হয়তো প্রেমে পড়েছে।যাইহোক এতকিছু এই মেয়েকে কেন বলব? নিজেরা নিজেরা বুঝবো আগে তারপর নাহয় দেখা যাবে।”
গুনগুনকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আত্মীয় তো তাই সাহায্য করছে।”
গুনগুন চলে গেলো।দিজা হামি তুলে লারুল বেগমের উদ্দেশে বলে,“আমি কিন্তু এবার এখানেই মেঝেতে ঢলে পড়বো।”
তুহিন হেসে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,“আমি আগলে নিবো।”
দিজা কান্না কান্না মুখ করে বলে,“অনেক রাত হয়েছে।ঘুমে চোখ মেলে রাখা মুশকিল।কালকে আবার সকাল সকাল উঠে সাজতে হবে।একটা প্রপার ঘুম না দিলে হয়?”
দিদার দ্রুত দিজার ঘুমের ব্যাবস্থা করে দেয়।লোকজন যারা এখনও সজাগ ওরা দিজার কাণ্ডে হাসে।সবকিছু ঠিক করে দিদার,দাদাজান,দীপ্ত ফরাজি ও পারুল বেগম চলে গেলেন।সাথে গেলো কিছু আত্মীয়।দিদার আবারও চলে আসবে যেহেতু দিজা আছে এখানে।
শুক্রবার নামাজের শেষে পুরুষের দল আসতে শুরু করে।প্রত্যেকে পাঞ্জাবি পরিহিত।দর্শন ব্যতীত।দর্শন এখানে স্যুট পরে আছে।শোভা বলে,“আজ অন্তত পাঞ্জাবি পড়তেন।”
“আগে বলোনি তো।”
“আমি কি জানতাম সবাই পাঞ্জাবি পড়বে।আপনাকে এখন সবার সামনে ভিন্ন লাগছে।”
“আমি তো ভিন্ন।”
“যাইহোক সুদর্শন পুরুষকে ভিন্ন দেখালেও সমস্যা নেই।”
“আজ প্রথম বউয়ের মুখে নিজেকে সুদর্শন বলতে শুনলাম।”
“বেশিই বলে ফেললাম নাকি?”
তুহিন এসেছে মসজিদ থেকে।কনেপক্ষের সবাই ফিতা বেঁধে দরজা আটকে রেখেছে।টাকা না দেওয়া অব্দি ছাড়বে না।শব্দ পেয়ে ছুটে গেলো দর্শন।তুহিন সবাইকে টাকা দিয়ে দিলো।গুনগুন বলে,“বউকে দেখার জন্য এত তাড়াহুড়ো জিজু?”
তুহিন ভাব নিয়ে বলে,“বিয়ে যেহেতু করছি বউকে তো দেখার তাড়াহুড়ো থাকবেই শ্যালিকা।”
সবাই হাততালি দিলো।দর্শন এগিয়ে এসে দিদারকে ডেকে দুইভাই মিলে তুহিনকে কাঁধে নিলো।তুহিনের দুই পা দুইভাইয়ের কাঁধের উপর।ঝুঁকে বলে, “আরে ইয়ার কি করছিস?”
“বরকে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছি যেনো সে আমাদের বোনকেও মাথায় করে রাখতে পারে।”
“এটা আবার কেমন নিয়ম?”
“কি জানি!দাদাজান বলল।আমি কি এসব নিয়ম জেনে রাখি?এখনও অনুষ্ঠান করে বিয়ে করিনি।যেদিন করবো সেদিন বুঝবো।”
গুনগুন খুশিতে আত্মহারা।
বিয়ের অনুষ্ঠানের শেষের দিকে।সবাই এসে এসে দিজাকে ও তুহিনকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।বর বউয়ের মাথা ভনভন করছে মিষ্টি খেয়ে।শোভার পালা এবার।শোভা এগিয়ে আসতে নিলেই দিজা বলে,“তুমি আমাকে কাবাব খাইয়ে দেও তবুও মিষ্টি না ভাবী।”
সবাই হেসে দিলো।দিদার বলে,“ভাবীর হাতে ঝালমুখ করবি?”
“মাথা ভনভন করছে আমার।গালের মধ্যে অসহ্য লাগছে।”
দর্শন দ্রুত কাবাবের প্লেট এনে দিলো।শোভা সত্যি সত্যি কাবাব খাইয়ে দেয়।গুনগুন প্রশ্ন করে,“এই মেয়েটা তোমার কেমন ভাবী?”
“আমার বেস্ট ভাবী।”
“আরে না আমি তা বোঝাচ্ছি না।আমি বলতে চাইছি তোমার ভাই তো বিয়েই করেনি।”
দিজা সাথে সাথেই বলে,“সেকি তুমি জানো না?অবশ্য জানবেই কিভাবে!ওর নাম শোভা।দর্শন ভাইয়ের বউ।”
কথাটা শুনতেই গুনগুন ভেঙে পড়ল।একরাতের ক্রাশ বয়ের বউ আছে!অথচ সে কিনা সংসার করা স্বপ্ন দেখছিল এই ছেলেকে নিয়ে।আজকের বিয়েতে সেজেছেও দর্শনের উদ্দেশে।মনক্ষুন্ন হয়ে সবার সামনে জোরেই বলে,“ও নাকি মেয়েদের সহ্য করতে পারে না তাহলে বউ আসলো কোথা থেকে?”
সবাই অবাক হয়ে চাইলো। দিজা কপাল কুঁচকে বলে,“বিয়ে করেছে তাই।”
“বিয়ে শব্দটাই নাকি ও বিশ্বাস করেনা?”
“আগে করতো না।বিয়ের পর বিশ্বাস করে।”
দর্শন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,“আমার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে না তোকে।সমস্যা কি ওই মেয়ের?আমার ব্যাপারে জানতে চায় কেন?”
“তুমি বিবাহিত?”
“তাতে আপনার কি?”
“এটা হতে পারে না।”
দাদাজান বলেন,“এ আবার কেমন কথা?আমার নাতি বিবাহিত হতে পারবে না কেন?”
“আমি তো শিওর ছিলাম উনি সিঙ্গেল।”
“আহারে মেয়েটার অবুঝ মন।”
দর্শন গর্জে বলে, “শাট আপ।”
অতঃপর গুনগুনের উদ্দেশে বলে,“ফালতু কথা বাদ দিয়ে যে জন্য এসেছেন সে কাজে সীমাবদ্ধ থাকুন।”
গুনগুন চুপসে গেলো।সে ওই সিনথিয়ার মতো মেয়ে না।আত্মসম্মান বলতে কিছু আছে তার।তাই চুপ করে এড়িয়ে গেলো ব্যাপারটা।বাবা মাকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।এখানেই আর থাকবে না।সবাই যা বুঝার বুঝলো।
বিয়ের কাজ শেষ হতেই বিদায় শুরু। দিজাকে বিদায় দেওয়ার পরই দর্শন ও শোভা রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশে।পুরো রাস্তায় শোভা মুখ গোমড়া করে থাকে।দর্শন গাড়ি চালাতে মনোযোগ দেয় আবার শোভাকে দেখে।শোভার উদ্দেশে বলে,“মন খারাপ করে লাভ নেই।”
“দুটো দিন থাকতাম নাহয় যশোরে।”
“আমার কাজের চাপ অনেক।”
“আপনি একা আসতেন ঢাকায়।”
“তোমাকে একা রেখে আমি আসব!এসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।”
“ভাবীকেও তো ভাইজান কতবার একা রেখে আসতো পরে আবার নিয়ে আসত।”
“আমি তোমার ভাই না স্বামী হই।”
“কথা সেটা না কথা হলো আপনি তো ব্যাস্ত থাকবেন।আমি একা বাড়িতে কি করবো?শুধু বোর হওয়া ছাড়া?”
“একা বাড়িতে থাকতে খুব অসুবিধা হয় তোমার?”
“অসুবিধা বলতে মন মরা লাগে।অবশ্য আপনি পাশে থাকলে ঠিক হয়ে যায়।সাথে আবার ছুটির দিনগুলোতে আপনার দ্বিগুণ যত্ন তো থাকেই।”
দর্শন আর কথা বাড়ালো না। বাড়িতে এসেই ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো।শোভাকে জানালো,“আমি কাজটা শেষ করে নেই।তুমি বাড়িতে কথা বলো।”
শোভা কথা বলা শেষ করে রান্নাঘরে যায়।বাড়ি থেকে যা এনেছিল ওগুলো গরম করে।বাইরের দিকে একবার তাকালো।বাতাস হচ্ছে চারপাশে।বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।শোভা ভাবলো শাড়ি পড়বে।দর্শনকে এখন তার খুব করে চাই।আর মুখ ফুটে বলার সাহস নেই।লজ্জায় মুখ এখনই লুকাতে ব্যাস্ত।তাই কৌশলে দর্শনকে নিজের করবে।দ্রুত ঘরে এসে লাল রংয়ের শাড়ি নিয়ে চলে গেলো।শাড়ি পরে চুল ছেড়ে দেয়।ঠোঁটে লিপস্টিক আর চোখে গাঢ় করে কাজল।দর্শনকে না জানিয়েই চলে গেলো ছাদে।ইচ্ছাকৃত।চাইছে দর্শন তাকে পাগলের মতো খুঁজতে থাকুক।খুঁজতে খুঁজতে ছাদে এসে দুজনের দেখা হোক।দর্শনের মধ্যে শোভাকে চোখজুড়ে দেখার নেশাটা দেখতে চায় শোভা। হলোও তাই।কাজ শেষে ল্যাপটপ বন্ধ করতেই ঘরজুড়ে চারপাশ তাকালো দর্শন।শোভাকে পেলো না। ছুটে আসলো রান্নাঘরে।নেই শোভা।সন্দেহের সাথে গেলো জিম ঘরে।সেখানেও নেই।অতঃপর উপরের দিকে চোখ যেতেই দেখে ছাদের দরজা খোলা।বুঝতে পারল শোভা এখানে।দ্রুত দৌড় লাগায়।ছাদে পা দিতেই চোখের সামনের দৃশ্যে চোখ স্থির দর্শনের।শোভা দুহাত মেলে আজকে আবারও বৃষ্টিবিলাস করছে।কানের কাছে কাঠগোলাপ গুঁজে রাখা।দ্রুত পা ফেলে শোভাকে জড়িয়ে ধরে দর্শন।শোভা এতক্ষণ এটারই অপেক্ষায় ছিল।দর্শন শক্তভাবে জড়িয়ে থাকলো।শোভাও দুইহাত দর্শনের পিছনে জব্দ করে রাখে।দর্শনের হৃদপিণ্ড কাপছে।শোভা অনুভব করে।দর্শন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“আমাকে জানিয়ে আসবে তো।”
“যদি জানিয়েই আসতাম আপনার এই হৃদপিণ্ডের কম্পন অনুভব করার সুযোগ পেতাম?”
“খুব শখ আমাকে আতঙ্কে রাখার?”
“আতঙ্কে রাখি বলেই আপনার ভালোবাসা বেশি বেশি করে পাই আমি।”
“দিনদিন আমার রূপ ধারণ করছো তুমি।”
“আপনার সাথে সংসার করতে করতে আপনার মত উন্মাদ হতে বাধ্য হচ্ছি।কারণ আমিও আপনার মতোই ভালোবাসার কাঙাল।”
দর্শন আর শোভা দুজনেই ভিজে একসাথে মিশে আছে।শোভা আবদার করে,“একটা আবদার করি?”
“করো।”
“এবার আমি মা হতে চাই।”
“তুমি তো সুস্থ হওনি।”
“আমি যদি মা হতে না পারি আরও বেশি অসুস্থ হবো।আপনি যতই আশ্বাস দিন না কেন দুশ্চিন্তা আমাকে ছাড়বে না।কারণ মা হতে চাওয়া আমার একমাত্র চাওয়া পাওয়া।”
দর্শন এবার শোভার কপালে চুমু দিয়ে বলে,“বেশ তোমাকে মা হতে সাহায্য করবো কিন্তু কালকের চেকআপের পর শিওর হয়ে আর কোনো সেফটি নিবো না দরকার হয়।”
“আচ্ছা।”
শোভাকে কোলে করে নিলো দর্শন।শোভা পা নাড়িয়ে বলে,“আরেকটু থাকি?”
“জ্বর আসবে।”
বলেই শোভাকে নিয়ে গেলো ঘরে।এর মধ্যেই শোভার গা গরম হয়ে আছে।দর্শন দীর্ঘশ্বাস ফেলে শোভাকে প্যারাসিটামল দেয়।শোভা বিরক্ত প্রকাশ করে বলে, “পরে খেতাম।”
“আগে খাও।”
শোভা নিলো ঔষধ।অতঃপর দর্শনকে ভেজা অবস্থায় জড়িয়ে ধরে।দর্শন যা বোঝার বুঝে নিলো।শোভার যখন নীরবে আবদার হয়েছে পূরণ তো করতেই হবে।
সকালে উঠেই শোভা নামাজ পড়ে ঘর গুছিয়ে রাখলো।দর্শন এসে মাথা থেকে টুপি খুলে বিছানায় মাথা এলিয়ে দেয়।শোভাও আসলো দর্শনের পাশে।দুজনেই শুয়ে শুয়ে জানালার বাইরে চোখ রাখে।বৃষ্টি হবার কারণে আকাশ পরিষ্কার।তালগাছের সেই বাবুই পাখির বাসা ভিজে আছে।বাবুই পাখির দেখা মিলেছে।ওরা ছোটাছুটি করছে।দর্শন মুখ ঘুরিয়ে এবার শোভার গলায় মুখ ডুবিয়ে রাখলো।শোভাও গ্রহণ করে নিলো।দর্শন বলে,“দশটার দিকে বের হবো হাসপাতালের উদ্দেশে।তারপর তোমাকে নিয়ে অফিসে যাবো।”
শোভা ভাবুক হয়ে বলে,“অফিসে কেন?”
“তোমাকে একা বাড়িতে থেকে বোর হতে হবে না।আজ থেকে আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তুমি।আমার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব তোমার।”
“আমি চাকরি করবো?”
“হুমমম,সেলারি হিসেবে পাবে ত্রিশ হাজার টাকা ও বস রূপে বরের ভালোবাসা।মঞ্জুর?”
শোভা ঠোঁট প্রসারিত করে বলে,“মঞ্জুর।”
হাসপাতালে এসে ডাক্তার দেখানো হয়।শোভার কিছু টেস্ট দেওয়া হয়।সেগুলো করে।রিপোর্ট সন্ধ্যায় পাওয়া যাবে।এখন দুজনে অফিসে যাচ্ছে।শোভা নিজেকে একবার দেখে বলে,“আমি কিন্তু বোরকা পরেই অফিস করবো।”
“সমস্যা নেই।”
“মুখ থেকে হিজাব খুলবো না।”
“তাতেও সমস্যা নেই।”
“হাত মোজা পা মোজাও থাকবে।”
“আমারই ভালো।”
“আপনার সাথে সাথেই ঘেঁষে থাকবো।”
“উফফফফ আমি তো এখনই এক্সাইটেড।”
“এবার থেকে লান্স অফিসে করলে দুজনে একসাথেই করবো।”
“তোমার তো দেখছি অনেক রুলস।চাকরি করতে আসলে বসের দেওয়া রুলস মানতে হয় বসকে রুলসের মধ্যে রাখতে নেই।”
“আমার বস যখন আমার বর রুলস তো আমার হবে।”
সারাদিন অফিসে দর্শনের সাথে শোভাও কাজ করলো।শোভা অনেকটা ভয়ে ভয়ে ছিল।তবে মনের মধ্যে সাহসও ছিল।দর্শনের সাপোর্ট পাবে এটা আস্থা রেখেই কাজ করেছে।প্রথমদিন অনেকটা ইজি হয়েছে শোভা।তবে কোনো স্টাফের সাথে কথা বলতে পারলো না।দর্শনের কড়া নিষেধ।মেয়ে স্টাফের সাথেও কথা বলতে পারবে না।বলা তো যায়না কোন কুচুটের পাল্লায় পড়ে শোভা।শোভাও তেমন গুরুত্ব দেয়নি।দর্শন যে কাজ দেয় ওগুলোই মন দিয়ে শিখছে।
এখন রিপোর্ট আসলো।দর্শনের হাতে কাগজ।মেলতেই শোভা করুন চোখে তাকালো।দর্শন ফোস করে নিশ্বাস নিতেই শোভা ছটফটানি দেখিয়ে বলে,“কি হলো?”
“অল ওকে।”
শোভা খুশিতে জড়িয়ে ধরে দর্শনকে।বলে,“তাহলে আমাকে মা হওয়ার সুখ থেকে আটকাবেন না বলুন?”
“নিজেকেই তো বাবা হবার সুখ দিতে চাই।”
“স্বার্থপর একটা।”
“বাবা হবার জন্য পুরুষ মানুষের স্বার্থপর হতেই হয়।”
দুই বছর পর,
শুক্রবারের ছুটিতে হলুদ রংয়ের শাড়ি পরে আছে শোভা।সকাল থেকেই শাড়ি পরে হামাগুড়ি দেওয়া মেয়েকে নিয়ে খেলতে ব্যস্ত।দর্শন জিম করে ফ্রেশ হয়ে এলো।নিচে নেমেই দোহাকে কোলে নিতেই দোহা একগাল হাসি দেয়।দোহা হবার দিনেই সবাই বলেছে,“একদম বাবার মতো দেখতে।মায়ের মতো ঠোঁট আর চোখ।”
দর্শনের খুশি দেখে কে!শোভা ও দোহা দুজনেই সুস্থ স্বাভাবিক।মেয়েকে পেয়ে পরিপূর্ণতা পেলো।যেদিন দোহাকে দেখতে আত্মীয় স্বজন আসে ওইদিন একজন বৃদ্ধ লোক কিছুক্ষণ দেখেই জিজ্ঞাসা করে,“বড় হয়ে মেয়েকে কি বানাবে?”
কেউ কিছু না বললেও দর্শন বলে,“ওকে ওর মায়ের মতো আদর্শ নারী বানাবো।আর চাকরির কথা যদি ওঠে ওর মনের মতো চলবে সততার সাথে।”
সবাই খুশি হয়।শোভাও হাসে।দর্শন দেখলো সিজার অবস্থায় এভাবে হিজাব দিয়ে ঢেকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে শোভার।এদিকে মুরুব্বিরা এসে এসে এসি বন্ধ করে দিচ্ছে।তাই দর্শন বলে দেয়,“আপনারা এখন চলে গেলে আমার ওয়াইফ বিশ্রাম নিতে পারে।ওর শারীরিক অবস্থা ভালো না।”
সবাই দর্শনের কথাতে সম্মতি দিলেও মুখ একটু কালো করলেন।তবুও যায় আসেনা দর্শনের। বউ সুস্থ থাকা জরুরি।আজ আদিখ্যেতা করবে কাল শোভার কিছু হলে কেই বা থাকবে?তাই এত আদিখ্যেতা দর্শন করবে না।দাদাজান ব্যাপারটা স্বাভাবিক করে সবাইকে নিয়ে ফরাজি বাড়িতে যায়।সেদিন থেকে দর্শনের কোলে শুধু দোহাকে দেখা যায়।দর্শন সবসময় দোহা দোহা করলেও নিজ হাতে শোভাকে খাইয়ে দেয়।শোভার কি কি প্রয়োজন এগুলো দেখে।তবুও শোভা মজার ছলে হিংসে সাজে।
দোহাকে কোলে নিতেই দর্শনের গালে লালা মিশিয়ে চুমু দেয় দোহা।দর্শন সাথে সাথে মেয়ের কপালের সাথে কপাল মিশিয়ে ডাইনিং রুম জুড়ে ঘুরতে থাকে।শোভা হাত ভাঁজ করে দেখছে।অতঃপর নাশতা রেডি করে।
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৭
বরাবরের মতো আজও দর্শন রান্না করতে থাকে। দোহাকে ছোট্ট ছোট্ট পুতুল দিয়ে চারপাশ সাজিয়ে দিয়ে মেঝেতে রেখেছে।দোহা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত আবার ফাঁকে ফাঁকে বাবা মাকে দেখে ফোকলা হাসে।দর্শন রান্না করে আর এর ভিতরে ভিতরে এসে শোভার ও দোহার কপালে চুমু দেয়।দর্শনের যেনো এগুলোই নেশা।এভাবেই ও ওর সংসার জীবন পার করতে চায়।বাবুই পাখির সুখী নীড় গড়তে চায়।
সমাপ্ত
