Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১৯

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৯

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৯
মোনালিসা মেহরোজ

রাত সারে আটাটা বাজে।
দীর্ঘ তিন ঘন্টার জার্নি শেষে মির্জা পরিবার গ্রামের বাড়ি হতে নিজেদের বাড়িতে ফিরলো। আসিফ অসুস্থ থাকায় নিহাদ নিজে ড্রাইভ করে তাদের মির্জা বাড়িতে নিয়ে এসেছে৷ মিনিট দশেক হবে আসিফ ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। অসুস্থ শরীরে এতোটা পথ জার্নি করার বেশ নুইয়ে পরেছে পুরুষটির বলিষ্ঠ দেহ। হাত-পায়ে জোর-বল নেই বললেই চলে। কেমন ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে মুখের রঙ। গায়ে এখনো হালকা জ্বরের রেশ বিদ্যমান। মাথাটাও বেশ যন্ত্রণা করছে। ফাতিহা ওয়াশরুমে ফ্রেশ হচ্ছে। আসিফ মাথা ধরে বিছানায় শুয়ে রইলো। সায়না মির্জা ও আযান মির্জা নিজেদের ঘরে।
কয়েক মিনিট বাদে ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো বেশ জোড়েই। আসিফ তবুও নড়লো না। ঠাঁই মাথা চেপে রইলো যুবক। দূর হতে ফাতিহার বিষয়টা নজর এড়ালো না। রমণীর ভ্রু কুঁচকে গেলো তৎক্ষনাৎ। তরিৎ বেগে কাছে এসে উদ্বিগ্ন কন্ঠে সুধালো—–

—এমা! কি হয়েছে আপনার? এরূপ মাথা চেপে শুয়ে আছেন কেনো?
আসিফ উত্তর করলো না। নড়েচড়ে ফের মাথা গুঁজলো বালিশে। ফাতিহা চিন্তিত হয়ে পরলো। আগ বাড়িয়ে রমণী হাত রাখলো স্বামীর কপালে-গালে। জ্বর আছে তা বুঝতে পারলো। সাথে আসিফের আচরণে বুঝতে পারলো মাথা নিশ্চিত যন্ত্রণা করছে। তাহলে বলছে না কেনো? আশ্চর্য! ফাতিহা আর দাঁড়ালো না। গুটিগুটি পায়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর হতে। রাতের খাবার বাড়ির মেইড’রাই করছে, সদ্য ফিরেছে বলে সায়না মির্জা নিজে বাড়িতে পৌঁছেই মেইডদের জানিয়ে দিয়েছে সে কথা। ফাতিহাও বাঁধা দেয়নি। যদিও বাড়িতে নিহাদ আছে, আর তাকে মেইডের হাতের রান্না খাওয়াতে মোটেও ইচ্ছুক নয় ফাতিহা। অতিথি আপ্যায়নে সদা তৎপর থাকলেও আজ আর ক্লান্ত শরীরে আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যায়নি। বরং কাল থেকে নিজ হাতে রান্না করে অতিথিকে খাওয়াবে বলে ঠিক করেছে।
নিহাদের কথা মনে পরতেই মৃদু হাসে রমণী। ও বাড়ির সকলে কত ভালো! আজ নিহাদের বোনের বিয়ে হলো, সেই সুবাদে কতই না দ্বায়িত্ব ছিলো নিহাদদের বাড়ি। অথচ আজ বিপদের সময় আবার তাদের পাশে দাঁড়ালো সব ফেলে। সাহেল নিজেই ছেলেকে পাঠালেন জোর করে। আসিফ গাড়ি ড্রাইভ করতে পারবে না, এক্সট্রা ড্রাইভারও নিয়ে যায়নি সাথে। ফলে আসার সময় কি বিপদেই না পরেছিলো! আর সেই সময় ইফতিয়া-সাহেল তাদের ছেলেকে পাঠালেন। নিজেদের বাড়ি ওনারা একাই সামলে নিবেন বলে জানালেন। ফাতিহা শুধু দেখে গেছে সবটা। আসার সময় কত স্নেহ করলো! কত আদর করলো! ইফতিয়া কান্নাকাটি করে আবারো যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো। জবাবে অবশ্য ফাতিহা বলেছে যাবে। তবে কবে যাওয়া হবে তা তো জানে না!
ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে ধীর পায়ে এসে থামে রান্নাঘরের সামনে। তাকে দেখে বাড়ির একজন বয়স্ক কাজের মহিলা মৃদু হেঁসে আওড়ালেন—-

—খাবার রেডি। চাইলে আমি সার্ভ করে দিতে পারি, মা।
ফাতিহা মাথা দোলালো।
—না, এখন না চাচি-আম্মা। ওনারা বিশ্রাম নিক। আপনি বরং একটু বেড়িয়ে আসুন। আমার একটু দরকার আছে।
মহিলাটি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। ফাতিহা ভেতরে ঢুকে আসিফের জন্য পাতলা সুপ বানানোর কাজে লেগে পরলো৷ সুপ খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিবে বলেও ঠিক করলো।

—কি হয়েছে? ফাইলটা পেয়েছেন?
স্ত্রী’র আকস্মিক আগমনে খানিক চমকে পেছনে ফিরেন আযান মির্জা। সায়না মির্জা সদ্য ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে স্বামীর পানে এগিয়ে এলেন। আযান মির্জা সেদিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এখনো অবদি ফাইলটা পাননি তারা। অফিসে তার পিএ চেক করেছে, সেখানে নেই বলে আযান মির্জা সন্দেহবশত বাড়িতে ফিরে নিজের পার্সোনাল লকারেও সেই ফাইলটার খোঁজ করছেন। তবে এখনো পাচ্ছেন না। এবার সত্যি সত্যি বেশ চিন্তিত হয়ে পরেন তিনি। ফাইলটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির কয়েক বছরের সকল কাজ-কর্মের রেকড সেখানে আছে। আর এখন সেটাই মিসিং।
আযান মির্জা লকারে ফের তালা ঝুলিয়ে বিছানায় এসে বসলেন। সায়না মির্জা বুঝলেন স্বামীর মনের কথা। মুখটা কালো হয়ে গেলো তার। আলগোছে স্বামীর পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে নিরব সান্ত্বনা দিতে লাগলেন তিনি। আযান মির্জা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মৃদু গলায় আওড়ালেন—-

—আমি আর পারছি না। এবার একটা কিছু করতে হবে, সায়না।
—কিসের কথা বলছেন আপনি?
ভ্রু কুঁচকে স্বামীর পানে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন সায়না মির্জা। আযান মির্জা তপ্ত শ্বাস ফেলেন।
—এবার সবকিছু আসিফকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় চলে এসেছে। মির্জা গ্রুপের সিইও হয়ে ওকেই দ্বায়িত্ব নিতে হবে সবকিছুর। আমি আর পারবো না, এই বয়সে এসে এতো চাপ সহ্য করতে পারছি না আমি। পারছি না।
চশমা খুলে বেড-সাইড টেবিলে রেখে বালিশে মাথা এলিয়ে দিলেন আযান মির্জা। সায়না মির্জা কথা বাড়ালেন না। চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন স্বামীর ক্লান্তমাখা মুখের পানে।

সদ্য ঘরের দোরে পা রেখেই নিহাদের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজেকে খানিক গুটিয়ে নিলো ফাতিহা। ধীর পায়ে মাথা নুইয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো রমণী। আসিফ আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসে আছে, আর তার অভিমুখে বসে আছে নিহাদ। আসিফ এতোক্ষণ শুয়েই ছিলো মাথা ব্যথায়। দু’মিনিট হবে নিহাদ এসেছে তার খোঁজ নিতে। আর এখন মুখোমুখি হয়ে বসে আছে তারা। অন্যদিকে দু’ভাই কিসের আলাপে মত্ত তা বুঝতে পারলো না ফাতিহা। সুপের বাটিটা টেবিলে রেখে ঘুরে দাঁড়ালো। আসিফ বাঁকা নজরে ফাতিহার পানে তাকালো একবার। অন্যদিকে ফাতিহাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখেই চট করে উঠে দাঁড়ালো নিহাদ। হাসিমুখে আওড়ালো—-

—আচ্ছা, পরে কথা হবে। তুই বরং খাবার খেয়ে ঔষধ খা। আসি…..
—আরে ভাইজান বসুন না। কোন সমস্যা নেই।
ভদ্রতার খাতিরে ফাতিহা কথাখানা বললেও নিহাদ অবশ্য শুনলো না। মৃদু হেঁসে ঘর ছাড়লো যুবক। অন্যদিকে নিহাদ বের হতেই আসিফ ফাতিহার পানে পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। সরু চোখে চেয়ে ভাবতে লাগলো আকাশ-পাতাল। ফাতিহা অবশ্য সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দিলো না। সে আলতো হাতে টেবিল হতে সুপের বাটি তুলে আস্তে করে চেয়ারে বসে পরলো। অতঃপর আলতো হাতে চামচ দিয়ে তা নেড়ে ঠান্ডা করার পায়তারা করতে লাগলো৷
—শোন!
আসিফের আচমকা গম্ভীর কন্ঠে খানিক নড়েচড়ে উঠলো ফাতিহা। থমথমে পরিবেশ, আসিফের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফাতিহা হুট করেই নুইয়ে পরলো। অন্যদিকে তুলনায় আজ কেমন জানি লাগলো আসিফের চাহুনি। ফাতিহা হাত দিয়ে আরো ভালো করে ওড়নাটা টেনে নিলো। চোখের পলক ঝাপটালো বেশ কয়েকবার।

—জ্বী, বলুন!
আসিফ তৎক্ষনাৎ উত্তর করলো না। এদিকে আসিফের শীতল চাহুনিতে আজ প্রথমবারের ন্যায় ফাতিহার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নামলো। অজান্তেই ঘেমে উঠলো রমণী। আসিফ তার পানে তাকিয়ে আছে, ঠিক তার চোখ বরাবর। আসিফের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে ফাতিহার কায়া। ফাতিহা বুঝলো না তার উপর এরূপ অশুভ দৃষ্টি বর্ষিত করার কারণ। আসিফ কেনো ওভাবে তাকিয়ে আছে?
ফাতিহা তখনো নিজ ভাবনায় মগ্ন। আসিফ আলগোছে তার দু’হাত বুকের কাছে ভাজ করে রাখলো। কয়েক মুহূর্ত পর নিরবতার বুক চিরে তীরের ফলার ন্যায় আসিফের কন্ঠ হতে বেড়িয়ে এলো অতন্ত্য গম্ভীর, ভারিক্কি কিছু বাক্য—-
—নিহাদকে কি তুমি আগে থেকে চিনো? তার সাথে তোমার কি আগে কোনদিন দেখা হয়েছিলো বা পরিচয় হয়েছিলো? ইজ এনিথিং?

হুট করেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক প্রশ্ন হতবাক রমণী। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো স্বামীর পানে। হাতে ধরা চামচটা আপনা-আপনি গলে পরলো বাটিতে। কথা বলার ভাষা পেলো না রমণী। মানসপটে ভেসে উঠলো সেদিন প্রথম আলাপের স্মৃতি। আসিফের ছেড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নিহাদের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত আগমণ আর সর্বশেষে তাকে বাঁচিয়ে নেওয়া।
ফাতিহা চোখ বন্ধ করে নিলো। কথা বাড়ানোর শক্তি পেলো না। কন্ঠ কেমন রোধ হয়ে আসছে। সাথে আবারো স্বামীর প্রতি তীব্র অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
অন্যদিকে ফাতিহার এই অদ্ভুত নিস্তব্ধতা খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবলোকন করে চলেছে আসিফ। ফাতিহার হাত থেকে চামচ পরে যাওয়া থেকে শুরু করে তার চোখের অদ্ভুত স্থিরতায় আসিফ কেমন হাঁস-ফাঁস করে উঠলো ভেতর থেকে৷ গ্রামে যাওয়ার পর হতে ফাতিহার উপর নিহাদের মুগ্ধ দৃষ্টি, আবেশিত চাহুনি আর ফেরার পথে গাড়িতে ফাতিহার প্রতি নিহাদের অদৃশ্য দ্বায়িত্ববোধ সবটায় অবলোকন করেছে আসিফ। নিহাদের চোখে সে অদ্ভুত কিছু একটা দেখেছে ফাতিহার জন্য—যা না চাইতেও আসিফের হৃদয় তোলপাড় করে দেয়। কোথাও একটা অকারণেই জ্বলন হয়, যা সহ্য করতে পারেনা আসিফ। আর না এই সুক্ষ্ম ব্যথার সঠিক কারণ সে জানে।
ফাতিহা এখনো চুপ। সে ঠাঁই বসে আছে ওভাবেই। আর তাই এই নিশ্চুপ থাকাটা আসিফ সহ্য করতে পারলো না। ভেতরের অস্থিরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলো যুবকের। জবাবের জন্য হুট করেই বড্ড উতলা হয়ে উঠলো—-

—কি হলো! কথা বলছো না কেনো? চেনো তাকে? আগে তোমাদের মিট হয়েছিলো অ্যাম আই রাইট? কিন্তু কেনো? কিভাবে তোমরা মিট করলে বলো! রাইট নাউ!
—স্বামী হয়ে স্ত্রী’কে যেখানে সেখানে ফেলে চলে গেলে অন্যের বাতাস লাগবে এটাই স্বাভাবিক।
ফাতিহা একমিনিট থামলো। অতন্ত্য শীতল দৃষ্টি আবদ্ধ করলো স্বামীর মুখপানে। আসিফ ভ্রু কুঁচকে নিলো তার কথায়। ফাতিহা ঝাঁঝালো গলায় ফের আওড়ালো—-
—যদিও আপনার ভাই অতন্ত্য সুপুরুষ, তাই বেঁচেছিলাম বৈকি। নইলে অচেনা জায়গায় হা*য়েনার শিকার হতাম না তার কি গ্যারান্টি? আর এখন এসেছেন কৈফিয়ত চাইতে? লজ্জা লাগা উচিত আপনার! স্বামী হয়ে স্ত্রী”কে রক্ষা করার বদলে নিজের অহম দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন বাহিরের লোকেদের? বন্ধু নামক কিছু কুমন্ত্রণা দানকারী পিশাচ বানিয়ে ঘরে আগুন লাগাচ্ছেন?
কথা বলতে বলতে হুট করেই এই পর্যায়ে এসে থেমে গেলো ফাতিহা। চোখজোড়া বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টানলো রমণী।

—আপনার বন্ধুদের সরাসরি কিছু বলে অপমান করতে চাইনা আমি। এটা আমার সাথে মানায় না। আমি মাফ চাই খোদার কাছে এরূপ চরিত্র পাওয়ার আগে। বরং দোয়া করি আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুক। সঠিক পথে ফিরিয়ে আনুক আপনার বন্ধুদের।
বলতে বলতে সুপের বাটিটা ঠাস করে টেবিলের উপর রাখলো ফাতিহা। আবারো নাকের পাটা কেমন ফুলে উঠছে সেদিনের কথা মনে পরে৷ বড্ড রাগ লাগছে ভেতরে ভেতরে। শান্ত থাকতে চাইলেও হচ্ছে না যেনো। অন্যদিকে আসিফ হুট করেই স্ত্রী’র এরূপ ঝাঁঝালো গলায় দমে গেলো খানিক। সেদিনের কথা মনে করতেই চোয়াল শক্ত করে ঠাঁই বসে রইলো। ফাতিহার কথায় সে বেশ বুঝতে পেরেছে এই পরিচয়ের উৎস কোথায়। অন্যদিকে ফাতিহা থামলো না। বসা হতে উঠে আসিফের সামনে সুপের বাটিটা রাখলো একইভাবে। বেশ জোড়েই শব্দ হলো এবারো। ঠান্ডা মাথায় ফের আওড়ালো—–

—শুনুন, স্ত্রী’র কথা শুনলে কেউ ছোট্ট হয়ে যায়না। কেউ দাস হয়ে যায়না স্ত্রী’র সাথে মানিয়ে নিলে। যেই স্ত্রী নিজের সংসারের বরকত, আল্লাহর দীনকে গুরুত্ব দিয়ে স্বামীকে একবেলা মসজিদ পাঠানোর পায়তারা করে—তারা এসব স্বামীকে হাতের পুতুল বানানোর জন্য করে না। বরং এতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত মজবুত হয়। আল্লাহ খুশি হন এবং আমাদের জীবন বরকতময় করে তোলেন। আমাদের জন্ম’ই হয় আল্লাহর ইবাদতের জন্য, আর আমাদের মৃত্যুও আল্লাহর হুকুমেই হবে। আর এর মাঝখানের যেই ছোট্ট জীবন, সেটাতে যেই সম্পর্কগুলো থাকে, সেগুলোকে সম্মান করতে শিখুন। বাবা-মা’র আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিন। প্রতিটি সম্পর্ককে গুরুত্ব দিন৷ সাথে আপনার দীনকেও আগলে নিন নিজের সবটা দিয়ে। তাতে আজকে যতটা খুশি আছেন আপনি, ভবিষ্যতে আল্লাহর রহমতে তার থেকেও হাজারগুন বেশি প্রশান্তি পাবেন। সবসময় টাকা পয়সা আমাদের সুখ দেয়না, বরং আমাদের ইমান সচ্ছ থাকলে ইহকাল-পরকাল দু-জায়গায় সুখ মেলে।

ফাতিহা আসিফের সামনে বাটিটা রেখে অতন্ত্য দৃঢ় দৃষ্টিতে স্বামীর পানে একপলক তাকিয়ে ধীর কদমে ঘর ছাড়লো। অন্যদিকে আসিফ থমকে বসে রইলো। চোখের দৃষ্টি স্থির হলো ফাতিহার পদচারণের পানে৷ প্রতিটি কথা, প্রতটি বাক্য যেনো অজানা কোন ঘোরে নিয়ে গেলো তাকে। পুরোপুরি আবেশিত হয়ে পরলো যুবক। অদ্ভুতভাবে সিক্ত হতে থাকলো তার হৃদয়। গলার স্বর কাঁপছে থরথর করে, কথা বলার শক্তি পেলো না আর। সে কেবল ঘোরের মধ্যেই ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে গেলো একাধিক বার। কিন্তু কোন আওয়াজ বের হলো বা তার ওষ্ঠদ্বয় হতে।

মাঝখানে কেটেছে বেশ কয়েকটা দিন। আসিফ এখন পুরোপুরি সুস্থ। নিহাদও ফিরেছে নিজস্ব নিড়ে। সবকিছু শান্ত নদীর ন্যায় বহমান। সেদিনের বলা ফাতিহার কথাগুলো আসিফের মনে সুক্ষ্ম দাগ কাটলেও যুবক নিজের ঘোর হতে বের হতে সময় নেয়নি বেশিক্ষণ। বরং নিজেকে সঠিক প্রামাণ করতে আবারো একবার নিজের অহম দেখিয়ে ফাতিহার কথাগুলো, ফাতিহাকে অগ্রাহ্য করে চলেছে। বর্তমান তাদের মধ্যে সম্পর্কের গতি স্থিতিশীল। ফাতিহা আগ বাড়িয়ে যেই দু”একটা কথা বলে সেটায়। আসিফ অবশ্য কখনো কথা বলতে যায়না নিজ থেকে। প্রয়োজন মনে করে না বোধহয়!
সকাল সকাল আসিফ বেড়িয়েছে৷ বন্ধুদের সাথে দেখা হয়নি বেশ কয়েকদিন। কাল রাতে কথা হয়েছিলো সকলে আজ রেস্টুরেন্টে দেখা করবে। ছোট্ট-খাট্টো একটা পার্টি হবে। তার জন্যই সকাল সকাল কাউকে কিছু না জানিয়ে একেবারে তৈরি হয়ে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে আসিফ। রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থেমে নিজের গাড়ি পার্ক করে বড়বড় কদমে ভেতরে পা রাখে আসিফ। এরমধ্যে ফোনে ভাইব্রেশনের আওয়াজ কানে লাগে মৃদু। আসিফ বিরক্ত হয় বড্ড। রেস্টুরেন্টের কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতে রাখতে পকেট হতে ফোন বের করে সামনে ধরে। নজরে পরে আযান মির্জার চার’টা মিসড কল। আসিফের ভ্রু কুঁচকে যায়। সকাল সকাল চারবার ফোন করার মানে কি! আশ্চর্য!
আসিফ বিরক্ত হয়ে ফোন সাইলেন্ট করে পকেটে পুরে নেয়। অতঃপর পুনরায় পা বাড়িয়ে ভেতরে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত টেবিলে গিয়ে ধপ করে বসে পরে। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আশেপাশে তাকায়। তাকে দেখেই স্বাধীন বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসে।

—বাহ্, এসে পরেছেন? তা আপনার শরীরের কি অবস্থা? সুস্থ আছেন? ভাবির অতিরক্তি সেবা-যত্নে একদম চাঙ্গা হয়ে উঠলেন না-কি?
আসিফ বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে নজর ফেরায়।
—কি রে! কথা বলছিস না কেনো? ভাবি কেমন আদর-যত্ন করলো বল একটু।
কথাটা বলেই উচ্চস্বরে হেঁসে উঠলো আরশাদ, মৃন্ময়, ইসমাইল।স্বাধীন নিজেও হেঁসে উঠলো৷
—যার মুখ’ই দেখলাম না তার আবার আদর-যত্ন! হাহ্
—কি বললি? মুখ দেখিস নি মানে?
অন্যমন্ষ্কস হয়ে আচমকা হুট করেই কথাটা বলে এখন নিজেই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো আসিফ। কথা বলার ভাষা পেলো না যুবক। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তার সামনে উৎসুখ হয়ে তাকিয়ে থাকা বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদের সকলের চোখে তীব্র অবিশ্বাস্যের ছাপ। আসিফ শুকনো ঢোক গিললো।
—কি বলছিলি বল! ভাবির মুখ দেখিস নি মানে? এটা কেমন কথা? বউয়ের মুখ কোন জামাই দেখে না ভাই?
আসিফ মাথা নিচু কর শক্ত চোয়ালে বসে রইলো। তার স্থির দৃষ্টি আবদ্ধ হলো গ্লাসের পানে। স্বাধীন কোন কথা বললো না। অন্য বন্ধুরা না জানলেও ভেতরের খবর সে টুকটাক জানে। তাই এই বিষয়ে মুখ খুললো না যুবক।
—কি আর দেখবে? চোরের মতো লুকিয়ে থাকে ওর বউ। আর সেই বউয়ের’ই চাকরের কাজ করে আমাদের আসিফ মির্জা।

হুট করেই রেস্টুরেন্টের মূল ফটক হতে ভেসে আসে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বাক্য। আসিফ তরাক করে দৃষ্টি ঘোরায়। ছায়াকে দেখেই চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়ে আসে। সাথে যুবক এটা বেশ বুঝতে পারে ছায়া নামক মেয়েটা অতি নির্লজ্জ আর বেহায়া। নইলে সেদিনের পরেও এখনও কি করে আসিফের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কথা বলে সে? তার কি নূন্যতম লজ্জাবোধ নেই!
আসিফ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। তার বন্ধুরা সকলে ছায়ার পানে তাকিয়ে। ছায়া বাঁকা হেঁসে গটগট পায়ে এসে থামলো তাদের সামনে। অতঃপর ধপ করে বসে পরলো পাশের চেয়ারে। তার কথায় সকলে একে অপরের মুখের পানে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে নিলো৷ আরশাদ প্রশ্ন করলো—-
—কি বলছিস এসব? বউয়ের মুখ দেখেনি মানে? আর চাকর কাকে বলছিস? আসিফ কেনো কারো চাকর হতে যাবে? আশ্চর্য!
—আশ্চর্য তো বটেই। আর মুখ দেখার কথা বলছিস না? আরে ইয়ার! আসিফ তো এখনো ওর বউয়ের মুখ’ই দেখেনি।
—হোয়াট?

—ইয়েস। আর আমার মনে হয় ওই মেয়েটার পর্দা-টর্দা কিচ্ছু না ওসব। ও একটা লোভী ডাকাত মেয়ে। নইলে স্বামীর সামনে কোন স্ত্রী পর্দা করে বল! ওই মেয়েটা নিশ্চিতভাবে ডাকাতি করতে ওই বাড়িতে ঢুকেছে। ওসব মেডেল ক্লাস মেয়ে তো! টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর এমনিতেই ভেগে যাবে।
—ছায়া! ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট। আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি তোমায়। আসিফ মির্জা কিন্তু এরপর আর কোন ওয়ার্ন করবে না তোমায়। সো বি কেয়ার ফুল।
আচমকা দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার ছাড়লো আসিফ। তার এরূপ গর্জনে সকলে নিজেদের জায়গায় স্থির হয়ে বসে রইলেও ছায়া থামলো না। বরং সে ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে হাসলো। ঠোঁট কামড়ে আওড়ালো——
—লুক গাইজ। আমি বলেছিলাম না চাকর? নিজেরাই দেখে নে। আমি কিচ্ছু বলবো না আর।
—আই সেইড স্টপ ইউর ফাকিং বুলশিট, ছায়া।
—থাম আসিফ। কথা বলিস না।
—আরে শুনবে না ও। বউয়ের নামে কিছু শুনতে পারেনা আবার চাকর বললেই দোষ। সুন্দর না?
—ছায়া তোমাকে আমি…..।

আসিফ আর বসে থাকতে পারেনা। ছায়ার প্রতিটি তাচ্ছিল্যের কথা সরাসরি তার গায়ে কাঁটার ন্যায় বিঁধে। যুবক তীব্র রাগে কাঁপতে কাঁপতে আচমকা উঠে থাবা বসাতে যায় ছায়ার কন্ঠনালীতে। তবে হাতের নাগালে পাওয়ার আগেই বাকিরা তাকে টেনে ফের বসিয়ে দেয় নিজের চেয়ারে। আসিফ তখনো রাগে ফুঁসছে। তার জ্বলন্ত দৃষ্টি তখনো ছায়ার দিকে স্থির। তীব্র রাগে চোখমুখ কেমন লাল হয়ে উঠেছে যুবকের।

কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা মিনিট। আসিফ দু’হাতে মাথা ধরে বসে আছে। ছায়া তখন কফির কাপে চুমুক দিতে ব্যস্ত। অনেক্ক্ষণ যাবৎ এক দৃষ্টিতে আসিফের পানে তাকিয়ে ছিলো আরশাদ। এ পর্যায়ে মুখ খুললো যুবক—-
—আসিফ, কিছু কথা বলি রাগ না করে শান্ত হয়ে শোন।
আসিফ তবুও মাথা তুললো না। আরশাদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
—দেখ, যা বুঝলাম তাতে আমার মনে হয় তোর স্ত্রী’র সত্যি কোন সমস্যা আছে। না, আমি বলছি না যে ছায়ায় ঠিক—তবে সে একেবারে ভুল সেটাও বলছি না। আমার মনে হয় তোর সবটা খুঁতিয়ে দেখা উচিত। তোর জানা উচিত তোর স্ত্রী কেনো তোর সামনে পর্দা করে! এটা কোন ধার্মিক মেয়ের কাজ হতে পারেনা। তুই তো পরপুরুষ নোস। তাহলে?
—দোস্ত! আমার মনে হয় আরশাদ ঠিক বলছি। রাগারাগি করিস না। শান্ত হয়ে সবটা ভেবে দেখ।
স্বাধীন আসিফের মাথায় হাত রাখলো। আসিফ চোখ বুঁজে রইলো। এরমধ্যে পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্বাভাবিক করতে হুট করেই ইসমাইল বলে উঠলো—–
—আচ্ছা! চল এসব বাদ দে এখন। আর ট্টিট দে দোস্ত। অনেকদিন ধরে দেসনা। আজ সুযোগ পেয়েছি, হাতছাড়া করছি না।
ইসমাইল এর কথায় আসিফ মাথা তুলে তাকালো। বললো না কিছুই। হুট করেই তার হাত চলে গেলো নিজের পকেটে। কার্ড’টা তো বাবার কাছে, বিয়ের দিন’ই নিয়ে নিয়েছিলেন। এতোদিন যেটুকু ক্যাশ ছিলো সেটা দিয়েই চলছিলো। আর এখন ট্টিট দিতে গেলে ভালোই টাকা লাগবে। আসিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইলো। তার ভাবগতি লক্ষ করে অন্যরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো।

—হা হা হা। আরে কি দিবে ও ট্টিট? টাকা আছো ওর কাছে? আজকাল তো হাত পেতে টাকা নিতে হয়। আজ বোধহয় ওটাও নেই।
—ছায়া! যখন-তখন খোঁচা মারা কথা বলা বন্ধ কর। তোর এই বদ অভ্যাসের জন্যই আমাদের বন্ধুমহলে তোর জায়গা হারাবি। আর আজ আসিফ ট্টিট দিতে না পারলে কি হলো? খাসনি ওর টাকায়? বেশিরভাগ সময় তো ওর টাকায় ফুটানি মেরে বেড়াতি। লাখ লাখ টাকা ও আমাদের পিছনে খরচ করেছে। আর আজ এভাবে ইনসাল্ট করছিস ওকে? লজ্জা লাগে না?
ছায়া দাঁতে দাঁত চাপলো আরশাদের কথায়। চুপ করে মাথা ঘুড়িয়ে অন্যদিকে তাকালো। আসিফ সেদিকে একবার তাকিয়ে আরশাদকে হাতের ইশারায় চুপ করতে বলে পকেট হতে ফোন বের করলো। আর করেই আর এক দফা অবাক হয়ে গেলো যুবক। বাবার বারোটা মিসড কল?
আসিফ তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। ফোন করলো ওপাশে। রিসিভ হলো না। উপস্থিত সকল বন্ধু কপালে ভাজ ফেলে তার পানে তাকিয়ে। আসিফ আর থামলো না। পকেটে কয়েক হাজার টাকার নোট পরে ছিলো। আচমকা তা বের করলো পুরুষটি। অতঃপর একদম হুট করেই তা ছুঁড়ে ফেললো ছায়ার মুখের উপর। হতভম্ব ছায়া।

—এই নে। এখানে যা আছে তাতে তোর পছন্দসই এখানকার সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ ডিসগুলো অর্ডার দিস। এটা শুধুমাত্র তোর জন্য, আর কাউকে না, শুধু তোকে ট্টিট দিলাম আজ। আর আমার বন্ধুদের আমি পরে দিবো। ওকে?
এক সেকেন্ড থামলো আসিফ। ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসির রেখা টেনে ফের আওড়ালো—-

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৮

—আর হ্যাঁ, আসিফ মির্জা আসিফ মির্জাই। টাকা থাক বা না থাকুক। তার জায়গাটা সেইম থাকবে। অ্যাম আই ক্লিয়ার?
কথা শেষ করে গটগট পায়ে রেস্টুরেন্ট হতে বেড়িয়ে গেলো আসিফ। অন্যদিকে তীব্র অপমানে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো ছায়ায়। চোখমুখ লাল হয়ে উঠলো রমণীর। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয় খেয়াল করলো অনেকেই তার পানে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ছায়া চোখ বন্ধ করে নিলো৷ মৃন্ময় আসিফের যাওয়ার পানে বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে ছায়ার হাতে হাত রেখে শান্ত হতে বললো। আরশাদ কথা বাড়ালো না। বাকিরাও তাচ্ছিল্যসমেত নজর ফিরিয়ে নিলো ছায়ার মুখ হতে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here