Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ১২

শিউলি ফুল পর্ব ১২

শিউলি ফুল পর্ব ১২
তাজরীন ফাতিহা

তখন ভোরের কিছু সময় অতিক্রম হয়েছে। চারদিক মেঘাচ্ছন্ন বিধায় সময়টা ঠিক ঠাওর করা যাচ্ছেনা। আষাঢ়-শ্রাবণের মাঝামাঝি। গগণ জুড়ে গুড়ুম গুড়ুম বাজ পড়ছে। মেঘে ঢাকা প্রকৃতি। চারদিক কর্দমাক্ত। উঠোনের কাদায় পা দেবে দেবে যাচ্ছে। এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে তুমুলবেগে বৃষ্টি পড়তে লাগল। দক্ষিণের কাঁঠালগাছের পাতা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে শিউলিদের ছন চাপা চালে। ছিদ্র আছে দু এক জায়গায়। হামিদ কাল পলিথিন কেটে তা বন্ধ করে দিয়েছে। কতদিন নাগাদ এই প্রতিবন্ধক টিকবে বলা যাচ্ছেনা। বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বাঁচতে খড়ের গাদার উপরে ছই চাপিয়ে দিল শিউলি। সেখান থেকে কয়েক গাছি কুটা নামিয়ে গরুর সম্মুখে দিয়ে এল। একটু আগে বালতি ভর্তি দুধ দোহন করে নিয়ে এসেছে। মেয়ে বাপের কাছে শোয়া। হামিদের শরীরটা দুদিন ধরে ভালো যাচ্ছেনা, তাই একটু দেরিতেই কাজে যেতে বলেছে শিউলি। লোকটা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। অন্যের জমি চাষাবাদ করে। প্রায় মাস দুই হয় কাজ নিয়েছে সে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খেটে আবার সন্ধ্যে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দোকানে বসে সে। সকাল সকাল এক গামলা পান্তাভাত খেয়ে জোগালি করতে যায়।

শিউলি মুরগির খোপ খুলে দুটো ডিম নিল। একমাস হয় মুরগি পালা শুরু করেছে সে। তার কাছে কিছু টাকা ছিল। ছোটভাই রাশেদকে সাইকেল কিনে দিতে চেয়েছিল সেই টাকা জমিয়ে। হামিদেরই পকেট কেটে জমিয়েছে। লোকটাকে এমন অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখে চুপচাপ হাত গুটিয়ে থাকতে মন সায় দেয়নি। মুরগির ডিম বেঁচে অন্তত দুয়েক পয়সা আয় হবে। কিস্তির লোকদের কাছ থেকে পাঁচমাসের সময় চেয়ে এনেছে। টাকা পরিশোধ করতে হবে যেকোনো মূল্যে। মুরগিগুলো বৃষ্টি বিধায় খোপ থেকে বেরোলো না। চুপচাপ বসে রইল সেখানেই। বৃষ্টি কমে গেলে এমনিতেই বের হয়ে যাবে।

পিঁয়াজ, মরিচ কুচি করে ডিম গুলিয়ে কড়াইয়ে দুটো ডিম ভেজে ফেলল। উঠোনে মাস চারেক আগে মরিচের বিচি ফেলেছিল। সেদিন খেয়াল করেছে থোকায় থোকায় মরিচ ঝুলছে। সেখান থেকে তিনটে মরিচ ছিঁড়ে এনে গামলা ভর্তি পান্তা ভাতের পাশে দিয়ে দিল। মরিচ, কাঁচামরিচ আর ডিম ভাজা। ব্যস এটুকুই হামিদ বড় আয়েশ নিয়ে খায়। ডিম ভাজা দেখে লোকটার নিশ্চয়ই চোখ চকচক করবে? প্রতিদিন তো শুধু পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ দিয়েই পেটপূর্তি করে।
হামিদা এখন বসতে পারে। যদিও কারো ধরে বসাতে হয়। ঘুম ছুটতেই মুখে আঙুল ঢুকিয়ে নানারকম শব্দ করছে সে। দিনদিন বাচ্চাটার বাম পা বেঁকে যাচ্ছে। হামিদ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মেয়ের পায়ে তেল পড়া মালিশ করে দেয়। কবিরাজ দিয়েছেন এই সরিষার তেলের শিশি। পড়া তেল মালিশ করলে নাকি পা ভালো হয়ে যাবে। হামিদ নিয়ম করে তেল মালিশ করছে তবুও কোনো পরিবর্তন হচ্ছেনা। বাচ্চাটা শুয়ে শুয়ে কতক্ষণ হাত, পা নাড়াল। এরপর গড়িয়ে এসে বাবার উদোম পিঠে মুখ লাগাল। জিহ্বা বের করে চাটতে চাইল পিঠটাকে। হামিদের ঘুম আগেই ভেঙেছে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল বিধায় শুয়ে ছিল। এক হাত গালের নিচে রেখে জানালা দিয়ে বৃষ্টি পড়া দেখছে আর কী যেন ভাবনায় মশগুল। পিঠে ভেজা অনুভূত হওয়ায় ঘুরে এপাশ ফিরল। হামিদা নানা শব্দ করতে লাগল তাকে ঘুরতে দেখেই। হামিদা জেগে গেছে দেখে উঠে বসল। মেয়ে বাপের দিকে চেয়ে। হামিদ যেন মেয়ের চোখের ভাষা বুঝল। আরমোড়া ভেঙে বলতে লাগল,

“অত আহ্লাদ করতে পারমু না, খালি হারাদিন আহ্লাদের লাইগা চাইয়া থাহস ক্যান?”
বাবার কথাগুলো যেন বুঝল চারমাসের শিশুটি। কিছুক্ষণ বাবার দিকে চেয়ে ‘আ..য়..ই’ নানা শব্দ করল। বিশেষ পাত্তা না পেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠল। হামিদ মেয়ের কান্নায় ঝুঁকে নরম নাসিকায় চুমু খেল বেশ সময় নিয়ে।
“মাগো!! এহনই আহ্লাদী হইছে। কিছু কওন যায়না। কইলেই ঠোঁট ফুলায় হালায়। তোর আম্মায় এইসব ছলচাতুরী শিখায় দিছে তাইনা? তোর মায় কয়, তুই বলে আমার মতোন হইছস। আমি আছিলাম জিদ্দি পোলা। জিদ্দি বাপের জিদ্দি মাইয়া হইবি নাকি? তাইলে তো সারছে! কইতাছি আম্মাজান, বাপের কিন্তুক রাজার ভান্ডার নাই। জিদ, আবদার কমায় কইরেন। বাপের শরীর ভালা না। দোয়া কইরা দেন এট্টু।” বলেই মেয়ের ছোট্ট হাতজোড়া মাথায় এনে রাখল।

হামিদা কি বুঝল জানা নেই। বাবার মাথায় হাত দিয়ে কয়েকবার বারি দিল। হামিদ মেয়ের পেটে নাক দাবিয়ে নাক ঘষল। শিউলিকে ডাকতেই সে ওড়নায় হাত মুছে ঘরে এল। হামিদা মাকে দেখতে পেতেই গাল ছড়িয়ে ‘ইয়া ইয়া’ করে উঠল। কী বোঝাল সেই জানে। ঐটুকু শিশুর ভাষা বোঝা তো তাদের সাধ্যে নেই, তবে জন্মদাত্রী হওয়ায় এইটুকু বুঝল মেয়ে বেজায় খুশি। হামিদ চৌকি থেকে নেমে গামছা নিয়ে কলপাড়ে গেল। মুখ ধুয়ে পাকঘরের দাওয়ায় বসেই গামলা ভর্তি ভাত পেটে চালান করল। আগে এত খেতে পারত না। জোগালি করা শুরু করার পর থেকেই প্রচুর খিদে পায়। ডিম ভাজা পেয়ে আজ একটু বেশিই ভাত খেল। শিউলি মগে পানি ঢেলে শুধাল,
“আইজকা ডিম ভুনা আর ডাইল রানলে খাইবেন?”
হামিদ মাথা নাড়িয়ে জানাল খাবে।
“পরে কিন্তুক কইতে পারবেন না, এডি আনছস ক্যান?
“কমু না। লগে মরিচ পুইড়া দিস। আইজকা তুই ভাত দিতে যাবি?”
“হ, আর কেডা আছে আপনেরে ভাত দিয়াইবো?”
“আইজকা পাশের বাড়ির ইকবালরে দিয়া পাঠায় দিস। ওয় তো ওর বাপের লাইগা খাওন লইয়া যায়ই। এই বৃষ্টি বাদলার দিনে মাইয়া লইয়া বাইর হওনের দরকার নাই। বিপদ আপদের হাত পাও নাই।”
“আইচ্ছা।” স্বামীর কথায় দ্বিরুক্তি না করে সায় জানাল।

বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। পরিষ্কার আকাশ, সূর্য উঁকি দিচ্ছিল পিটপিট করে। হুট করে গগনে মেঘেদের আনাগোনা। বৃষ্টি আসার অশনিসংকেত। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি থেকে তা ঝমঝমিয়ে নামল। বিজলি চমকে উঠল ক্ষণিক পল। বৃষ্টি ধ্বনি চারদিকে তরঙ্গিত হচ্ছে। টপটপ ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে হামিদের গায়ে। ঘামে ভেজা দেহাবরণ ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল মুহূর্তেই। কাঁপন টের পেল শরীরে। হামিদ পাত্তা দিল না, পাত্তা দেয়ার সময় তার নেই। পুরো জমিতে কয়েকবার চক্কর লাগাতে হবে। অন্যের জমি, অন্যের হালের বলদ। হামিদ সেখানে কৃষাণ শ্রমিক। লাঙল দিয়ে হালচাষ করতে করতে হামিদের দুহাতে ঘা দেখা দিয়েছে। কর্দমাক্ত নরম মাটি পেরিয়ে যখন বলদের পেছনে ছুটে চলে সেসময় আর হাঁপিয়ে ওঠার ফুসরৎ মেলে না। টাকার চিন্তা ও ঘরে পঙ্গু মেয়ের উৎকন্ঠায় পায়ের গতি বাড়ায়। শরীরের পুঞ্জীভূত শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আবারও নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলে। নিজের ঘা যুক্ত হাত কিংবা পায়ের দিকে নজর দেয়ার সময় তার নেই। শিউলি গতরাতে না বললে সে এসব খেয়ালও করতো না। তাকে প্রচুর টাকা জোগাতে হবে। ঝড়, বৃষ্টি, বাদলা এসব তাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। অমানসিক হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে এ কাজে তার দৈনিক মজুরি পঞ্চাশের ওপার হওয়া মুশকিল। জিরিয়ে নিতে গেলে সেই মজুরির পরিমাণও যদি কমে যায়!

কৃষাণ শ্রমিকরা ভিজে গেলেও আশ্রয় নিতে পারেনা। যেদিকে দুচোখ যায় কেবল ধানি জমি আর জমি। আশ্রয় নেয়ার ছাদ নেই কোথাও। তবুও কেউ কেউ বৃহৎ বৃহৎ গাছের নিচে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। হামিদ ভিজে গেছে দেখে আর যায়নি। একটু পরে মাথায় কলা পাতা চাপিয়ে শিউলিকে আসতে দেখা গেল। বোরকার নিচের অংশ ভিজে গেছে তার। কোলে হামিদা। বুকে চেপে রেখেছে মেয়েকে, কোনোভাবেই যেন বৃষ্টির ছাঁচ না লাগে। বোধহয় মাঝ পথে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বেচারি তালগোল পায়নি। কলাপাতা ছিঁড়ে মাথায় চাপিয়েছে। হামিদ লাঙল-জোয়াল রেখে এগিয়ে এল। ভিজে জবজবে অবস্থা। শিউলির কান্না পেল কাদায় মাখামাখি হওয়া কাকভেজা পুরুষটির দিকে চেয়ে। নিজেকে সামলালো সে। সে একজন পরিশ্রমী পুরুষের বউ। অল্পতেই কান্না করা তাকে মানায় না। তাকে আরও শক্ত হতে হবে। পুরুষটির ভরসার জায়গা হতে হবে। জমি থেকে উঠে আইল বেয়ে উঁচু ঢিবিতে এসে দাঁড়াল হামিদ। বৃষ্টির পানিতে কাদায় মাখামাখি পা ধুয়ে, ভেজা লুঙ্গি চিপে এগিয়ে এল। শিউলি একটা গাছের নিচে বসেছে। কলাপাতা বোধহয় বেশিই ছিঁড়ে এনেছিল। হামিদ এসে বসতেই একটা এগিয়ে দিল। এখনো বৃষ্টির তোর কমেনি।
“তোরে আইতে নিষেধ করলাম না? এই বাদলার দিনে মাইয়া লইয়া আইছস? আবার অসুখ বান্ধাবী তো। মাইয়াডার এমনেই নাজুক শরীল।”

“ধুরু আমি কি বুঝছি নাকি বৃষ্টি শুরু হইব। ইকবালরে পাইনাই। আপনে না খাইয়া বইয়া থাকবেন? তাই নিজেই বাইর হইছি। পথ ঘাটের অবস্থা সাংঘাতিক খারাপ হামিদার বাপ। পথ পাড়ি দিতে যে কষ্ট হইছে! আপনে তাত্তারি খাইয়া লন। মাইয়ার খাওনের সময় হইয়া গেছে। বাড়িত গিয়া খাওয়াইতে হইব।”
হামিদ আর কথা না বাড়িয়ে পোটলায় বাধা গামলা খুলে সেটাতেই খাওয়া শুরু করল। বড় বড় লোকমা তুলে গপাগপ খাচ্ছে। শিউলি তা চেয়ে চেয়ে দেখছে। লোকটার অন্য কোথাও হুঁশ নেই। বেশ খিদে পেয়েছে খাওয়ার ধরন দেখেই বুঝে গেল শিউলি। সে আজ বলেছিল, ডিম আর ডাল আনবে। অথচ তরকারি ভিন্ন এনেছে। কাল লিজের মাছ দিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ভুনা করে এনেছে আর মাছ দিয়ে পেঁপের ঝোল। একবার জিজ্ঞেসও করল না ভিন্ন তরকারি আনলি যে। লোকটার কোনোদিকেই বিশেষ খেয়াল থাকেনা শিউলি খেয়াল করে দেখেছে। হামিদা ঘুমিয়ে ছিল। কেঁদে উঠতেই শিউলি দোলাতে লাগল। পানি খেয়ে হামিদ চলে যেতে নির্দেশ দিল। শিউলি সেটা অগ্রাহ্য করে বলল,
“আপনে তো পুরা ভিইজ্জা গেছেন। শুকনা লুঙ্গি পাঠায় দিমু কাউরে দিয়া?”
“লাগব না। কাউরে পাবি না, পরে নিজেই লইয়া আইবি। মাইয়া লইয়া অত লম্ফঝম্ফের দরকার নাই। বৃষ্টি বাদলার দিন শুকনা লুঙ্গি পড়লেও আবার ভিজব। তার থেইকা এডাই থাহুক। তুই বাড়িত গিয়া গোসল সাইরা ঘুমা গিয়া।”
শিউলি আর কিছু বলল না। হামিদা বাবাকে দেখে বারবার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। হামিদ ধরল না। ভেজা শরীরে মেয়েকে ধরার কোনো মানে হয়না। বাবাকে কোলে নিতে না দেখে হামিদা নানা শব্দ করে কেঁদে উঠল। শিউলি কান্না থামানোর জন্য পিঠে হাত বুলিয়ে দিল, কিন্তু তবুও মেয়ের কান্না থামে না। হামিদ খেয়ে মুখ ধুয়ে মেয়ের দিকে চাইল,

“সকালে কইছি না বেশি আহ্লাদ করমু না। তোর দেহি আহ্লাদের শ্যাষ নাই। এহন কোলে নিতে পারমু না। বাড়িত গেলে নিমুনি।”
হামিদা হাত পা নাড়িয়ে বাবার ভেজা গেঞ্জি মুঠো পাকিয়ে ধরতে চাইল। হামিদ তৎক্ষণাৎ সরে গেল। বাবার উপেক্ষায় গলা উঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করতেই শিউলি অপারগ হয়ে বলল,
“দেহো কেমনে জিদ নিয়া কান্দে। বাপে ভিজা তো, চুপ থাক ছেমড়ি।”
শিউলি সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে এরমধ্যে। মেয়েকে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বলল,
“তোর বাপে তো তোরে এট্টুও ভালা পায়না, তাও এমন বাপ পাগলি হইলি ক্যামনে রে হামিদা?”
হামিদ কথাটা শুনতে পেয়েও রা করেনি। জমিতে নেমে পড়েছে।

সোবহানকে তার ফুপিদের ছেলেরা সুপারি গাছের খোল দিয়ে বানানো নৌকায় না উঠিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। তারা সবাই বড় বড়। একমাত্র সোবহানই বয়সে বেশ ছোট। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল উঠোনে সুপারির খোল দিয়ে বানানো নৌকায় একজন বসতেই অন্যজন টেনে নিয়ে যাচ্ছে পর্যায়ক্রমে। সোবহানও এসেছিল খোল দিয়ে বানানো এই নৌকায় চড়তে। তাকে খেদিয়ে দিতেই কাঁদতে কাঁদতে হালিমার কাছে এসে বিচার দিয়েছে, তাকে না উঠিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। হালিমার শরীরে আগুন ধরে গেল। তার বাচ্চাকে ধাক্কা মারে কোন সাহসে? নিজে মারলেও সোবহানের গায়ে অন্য কেউ হাত ওঠাতে পারবে না। কেউ আঁচড় দিলেও হালিমা রণমূর্তি ধারণ করে। সেকান্দার ঘরে শোয়া ছিল। বৃষ্টি ছিল বিধায় আজ দোকানে বসেনি। হালিমা ঘরে ঢুকেই চিৎকার করে উঠল,
“আমার পোলা কি ফেলনা? ওরে আপনের বইন পোলারা ধাক্কা মারে কেমনে? এর বিচার না করলে গাট্টি বোঁচকা বাইন্ধা বাপের বাড়ি উডমু কইলাম সোবহানের বাপ।”
সেকান্দার বেশ বিরক্ত হলো। ঘরে থাকলে যদি এক বিন্দু শান্তি পায় সে। সারাদিন এ বিচার নিয়ে আসে, ও বিচার নিয়ে আসে। যেন সে দায়রা জজ খুলে বসেছে। খালি সবার বিচার করে দেবে। আম্মা এসে বলবে, তোর বউ এটা করেছে বিচার কর, বোনেরা এসে বলবে তোর বউ মুখে মুখে তর্ক করে বিচার কর। হালিমা এসে বলবে, আপনার মা বোন এই সেই করেছে বিচার করেন। কি ভাই! কোনদিকে যাবে সে? ঘরে এজন্যই পুরুষরা থাকতে চায়না। এক দণ্ড শান্তি যদি পেতো!

“কী বিচার করতে কস? বড় বইনগো লগে কাইজ্জা বান্ধামু? হেরা থাহে কয়দিন?” দায়সারা জবাব।
“থাহে কয়দিন মানে? মেহমান হইয়া থাকলে তো কিছু কই না। হেরা দুইদিন পরপর আহে সংসারে অশান্তি বান্ধায়তে। আমার সংসার ছিনায় নিতে। আমার এইটুক মাসুম বাচ্ছা কি করছে যে ওরে ধাক্কা দিতে হইব?” রাগে রীতিমত চিৎকার করছে হালিমা।
সেকান্দার ছেলেকে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কিছু করছস রে সোবহান?”
“কিচ্ছু কলি নাই আব্বা। সুদু সুদু মাচ্ছে। দাক্কা মারি নাল বানায় দিছে।”
“শুধু শুধু তোরে ধাক্কা মারব ক্যান?”
হালিমা রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
“আপনে আমার এইটুক পোলার দোষ দিতাছেন? আপনের মায় আপনেরে বিয়া দিছিল ক্যান? হারাজীবন মায়ের আঁচলের মইধ্যে বইয়া থাকতেন। বউ, পোলাহানের হইয়া দুইডা কতা যে বেডা কইতে পারেনা হেই বেডা হইল কাপুরুষ।”
সেকান্দারের রাগ মাথায় চড়ে গেল। এতবড় স্পর্ধা হালিমা দেখাল কীভাবে? তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হালিমার চুলের মুঠি ধরল,

“বেশি সাহস হইয়া গেছে? কারে কাপুরুষ কস তুই? জবানে লাগাম না টানলে তোর কপালে খারাপই আছে বেয়াদবের বাচ্ছা। মুহে মুহে হারাদিন তর্ক করনের স্বভাব।”
সোবহান ভয় পেয়ে বাবার পা আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠল। বাবাকে রাগতে দেখে এক হাতে বাবার লুঙ্গি অন্য হাতে মায়ের ওড়না চেপে ধরল।
“আব্বা,,, আম্মারে নাল বানায় না। আম্মার দুষ নাই।”

শিউলি ফুল পর্ব ১১

হালিমা ছলছল চোখে চাইতেই সেকান্দার হাত আলগা করে ফেলল। রাগটা ঠিকমতো দেখাতে না পেরে তার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। এই ছলনাময়ী মা, ছেলের থেকে দূরে যেতে হবে তাকে। কিছুই বলা যায়না। এই নারী তো আছেই কয়েক কাঠি উপরে সঙ্গে আবার ছাও জুটিয়েছে। তার মাকে মারা যাবে না। একটু হালকা হাতে চুল ধরেছে তাতেই কেঁদে কেটে একসা। সেকান্দার হনহনিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
“এর পরের তে চোখ ঢাইক্কা কাইজ্জা করতে আইবি। তোর চক্ষুর লাইগা মন মতো কাইজ্জা করতে পারিনা। রাগ উঠলে না বানাইয়া থাকন যায়? কতবড় সাহস আমারে কাপুরুষ কয়!”

শিউলি ফুল পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here