Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৭

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৭

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৭
insia isha chowdhury

ঋতু অস্থির পায়ে নিজের ঘরে ঢুকল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করছে, মাথাটাও ভার হয়ে এসেছে। হঠাৎ প্রচণ্ড তৃষ্ণা অনুভব করতেই পাশে থাকা টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে খেয়ে নিল। ঘরের ভেতরেই তখন সূচনা ছিল। সুন্দর করে গয়নাগুলো গুছিয়ে রাখতে এসেছিল সে। কিন্তু ঋতুর এমন অস্থির চেহারা দেখে কাজ থামিয়ে অবাক চোখে তাকাল।
“কী ব্যাপার? কী হয়েছে তোর? এমন অস্থির দেখাচ্ছে কেন?”
ঋতু তখনই খেয়াল করল, সূচনা তার ঘরে রয়েছে। একটু আগেও সে এতটাই নিজের চিন্তায় ডুবে ছিল যে ঘরে সূচনা আছে, সেটুকুও টের পায়নি। টের পাবে কীভাবে? কিছুক্ষণ আগে যা শুনেছে, তাতেই তো মাথার ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। কী করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।
মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো সূচনাকে বলে দিতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল। কীভাবে বলবে? কোথা থেকে শুরু করবে?
অস্থির হাতে খোঁপা করা চুলগুলো খুলে ফেলল ঋতু। তারপর ধীরে ধীরে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তোকে একটা কথা বলতে চাই।”
সূচনা হাতে থাকা চুড়িগুলো ঠিক করতে করতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, বল। কী বলবি?”
ঋতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“একটা ঘটনা ঘটেছে।”
সূচনার ভ্রু কুঁচকে গেল। ঋতুকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। স্কুলজীবনে ঋতুর সঙ্গে মেলামেশার সময়ও মাঝে মাঝে সে দেখেছে, হঠাৎ কোন কোন কোনো কারণে ঋতু ভীষণ প্যানিক করে ফেলে। কিন্তু আজকের অস্থিরতাটা একটু অন্যরকম। নিশ্চয়ই বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে।
হাতের কাছে থাকা গয়নাগুলো এক পাশে রেখে সূচনা ঋতুর পাশে গিয়ে বসল। তারপর স্নেহভরে ঋতুর দুই গালে হাত রেখে বলল,
“কী হয়েছে? তুই এমন প্যানিক করছিস কেন? যা হয়েছে আমাকে বল। কী ঘটনা ঘটেছে?”
ঋতু ইতস্তত করে বলল,
“ওই… আমার একটা ফ্রেন্ড আছে।”
“হ্যাঁ, তোর ফ্রেন্ডের কী হয়েছে?”
“আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু সেখানে অনেক গন্ডগোল হয়ে গেছে।”
সূচনা অবাক হয়ে বলল,
“মানে? কেমন গন্ডগোল?”
ঋতু একবার গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,

“মানে… আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হয়েছে, কিন্তু যেই ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেই ছেলে আসলে আমার ফ্রেন্ডকে নয়, ওর বোনকে পছন্দ করে। কিন্তু ভুলবশত আমার ফ্রেন্ডের বোনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার বদলে ওই ছেলের সঙ্গে আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এখন পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে আমার ফ্রেন্ডও বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে।
ঋতু একটু থামল। ওর গলাটা শুকিয়ে আসছে। লালা দিয়ে গলা ভিজিয়ে আবার বলল,
“কিন্তু বিয়ের দিন সকালে সেই ছেলে আমার ফ্রেন্ডকে ফোন করে বলেছে, সবকিছু একটা ভুল বোঝাবুঝি। সে আমার ফ্রেন্ডকে নয়, বরং তার বোনকে পছন্দ করে এবং তাকেই বিয়ে করতে চায়।”
কথাগুলো শুনে সূচনার চোখ কপালে উঠল। মুহূর্তেই ওর মাথাটাও ঘুরে গেল।
“ভাই, তুই আমাকে কী শোনাচ্ছিস? তোর ভাই যখন আমাকে অঙ্ক বোঝায়, সেটাও আমার কাছে এত গন্ডগোল লাগে না, যতটা গন্ডগোল তুই এখন বলছিস!”
ঋতু বিরক্ত হয়ে বলল,
“হ্যাঁ, শোন! আসল কথাটা তো এখনও বলিইনি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বল। শুনছি।”
ঋতু এবার আরও নিচু স্বরে বলল,

“এখন ওই ছেলে আমার ফ্রেন্ডকে ফোন করে বলেছে, সে তার মাকে আগেই জানিয়েছিল যে যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে, তাকে সে পছন্দ করে না; বরং তার বোনকে পছন্দ করে। কিন্তু ওর মা কিছুতেই সেটা মেনে নিতে পারছে না। উল্টো জোর করে ছেলেকে আমার ফ্রেন্ডকেই বিয়ে করতে বলছে। তাই ওই ছেলে আমার ফ্রেন্ডকে ফোন করে বলেছে, বিয়ের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে।”
সূচনা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল,
“দাঁড়া, আমি বুঝে নিই। তোর ফ্রেন্ডের সঙ্গে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে, সে আসলে তোর ফ্রেন্ডের বোনকে পছন্দ করে। ভুল করে তোর ফ্রেন্ডের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটা নিজের মাকে বিষয়টা জানিয়েছে, কিন্তু তার মা সেটা মানতে রাজি নয়। আর এখন সেই ছেলেই তোর ফ্রেন্ডকে বলছে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে?”
“হ্যাঁ।”
“আর এখন তুই আমাকে জিজ্ঞেস করছিস, তোর ফ্রেন্ডের কী করা উচিত?”

ঋতু হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে আগ্রহ নিয়ে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঋতুর ঘরে প্রবেশ করল প্রণয়। কোনো ভূমিকা না করেই সে সূচনার এক হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“কখন থেকে তোমাকে খুঁজে চলেছি!”
সূচনা অবাক হয়ে বলল,
“আরে, আমার কথা শুনুন! আমি ঋতুর কথা শুনছি।”
প্রণয় একবার ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই সকালের খাবার খেয়েছিস?”
ঋতু কিছু বলার আগেই প্রণয় আবার সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার সূচনার সঙ্গে একটু দরকার আছে। একটু পর তোর ভাবিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
কথাটা বলেই সে সূচনাকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঋতু হতভম্ব হয়ে বসে রইল।
এখন সে কী করবে? মনে হলো, দুশ্চিন্তায় মাথাটা ফেটে যাচ্ছে। আজ তার বিয়ে। অথচ সকাল থেকে নিজের বিয়ে নিয়ে কোনো উত্তেজনা, আনন্দ কিংবা অস্বস্তি কোনোটাই ঠিকমতো অনুভব করতে পারছিল না ঋতু। কেমন একটা অদ্ভুত শূন্যতা বুকের ভেতর জমে ছিল। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছে। কেন এমন লাগছে, নিজেই বুঝতে পারছিল না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে তাই বাগানে একা একা ঘুরছিল ঋতু। চারপাশে বিয়ের আমেজ, অথচ তার ভেতরটা কেমন নিস্তব্ধ। সকালের তাজা বাতাস এবং নিজের মনকে একটু ভালো করার জন্য বাগানে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়েছে ঋতু। তারপর নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিয়ে নিয়ে
ভাবতে ভাবতেই একসময় ড্রয়িংরুমে চলে এসেছিল ঋতু। সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ই হঠাৎ ল্যান্ডলাইনের ফোন বেজে উঠল। ড্রয়িংরুমে তখন কেউ ছিল না। ঋতু এগিয়ে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল। সে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ব্যস্ত, উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল,
“হ্যালো! যেই ফোনটা ধরেছ, প্লিজ ঋতুর কাছে ফোনটা নিয়ে যাও।”
কণ্ঠস্বর শুনেই ঋতুর ভেতরটা বিরক্তিতে ভরে গেল। সোহেল। ঋতু বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
“কেন, সোহেল ভাই? আমাকে কী বলতে চাও?”
মুহূর্তের জন্য ওপাশে নীরবতা নেমে এল। সোহেল বুঝতে পারল, ফোনটা ঋতুই ধরেছে। সোহেল স্বস্তির সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নরম গলায় বলল,

“ঋতু বনু, আমার কথাটা শোন।”
সোহেলের মুখে ‘বনু’ সম্বোধন শুনে ঋতুর ভ্রু কুঁচকে গেল। কয়েক ঘণ্টা পরই তো তাদের বিয়ে। অথচ এখন তাকে বোন বলে ডাকছে! রাগে ঋতুর পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
“তোমার কি বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই?”
সোহেল তাড়াতাড়ি বলল,
“কী বলছিস? আমার কথা শোন এদিকে তো একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে।”
“মানে?”
“মানে… পুরো ব্লান্ডার হয়ে গেছে। আর আমি বুঝতে পারছি, এখানে সব দোষ আমার।”
ঋতু চুপ করে রইল। সোহেল এবার ধীরে ধীরে বলল,
“আমি আমার মাকে বলেছিলাম, আমি প্রণয়ের বোনকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু বনু, আমি তোর কথা বলিনি। আমি সুপ্তির কথা বলেছিলাম। আমি তোকে একদম বোনের নজরেই দেখি। বিশ্বাস কর। আমি সুপ্তিকে বিয়ে করতে চাই।”
ঋতুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সোহেল আবার বলতে শুরু করলো,

“আমি তোকে অনেকবার ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু তোর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়ে ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছি। আমি আমার মাকে সবকিছু জানিয়েছি। কিন্তু আমার মা এখন আমাকে ধরে-বেঁধে হলেও তোর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইছে। কারণ, তোর পরিবারের কাছে কথা দিয়েছে। আর তুইও তো এই বিয়েতে রাজি হয়েছিস।”
ঋতুর বুকের ভেতর জমে থাকা কথাটা এবার বেরিয়ে এল।
“আমি মোটেই এই বিয়েতে রাজি নই, সোহেল ভাই। বরং আমিও আমার পরিবারের কথা ভেবেই এই বিয়েতে রাজি হয়েছি। তোমাকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।”
ওপাশ থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল সোহেল। আর বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ! বনু, তাহলে তুই একটা কাজ কর।”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী কাজ করব?”

সোহেলের কণ্ঠ এবার আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল।
“তুই আপাতত তোর বিয়ে থেকে ভেগে যা।”
ঋতু কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না।
“মানে? সোহেল ভাই, তুমি কী বলতে চাইছো?”
“আমি এটাই বলতে চাইছি যে বাড়িতে যদি তুই না থাকিস, তাহলে তো তোর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে না। কিন্তু তুই যদি থাকিস, তাহলে তোকে ধরে-বেঁধে হলেও আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। আর আমি সেটা একদমই চাই না। প্লিজ বনু, প্লিজ। আমার বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। এই জন্যই তোকে অনুরোধ করছি, তুই বাড়ি থেকে চলে যা। তুই যে সবকিছু নিয়ে চিন্তা করছিস আঙ্কেল, আন্টির সম্মান, পরিবারের মানসম্মান এসব সব আমি হ্যান্ডেল করে নেব। শুধু তুই এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে চলে যা।”
ঋতু নির্বাক হয়ে ফোনের রিসিভারটা শক্ত করে ধরে রইল। সোহেল আবার বলল,
“কারণ তুই যদি না থাকিস, তাহলে আমাকে বিয়ে দেবে কার সঙ্গে? বল? প্লিজ, তুই চলে যা। তুই না থাকলে আমি আমাদের পরিস্থিতিটা সবাইকে বোঝাতে পারবো। বাকি সবকিছু আমি দেখে নেব। কোনো প্রবলেম হবে না। আর শোন তুই আমাকে সুপ্তির বাবার নাম্বারটা দে। বহুত হয়েছে মেয়েকে পটানো এবার মেয়ের বাপকে পটাতে হবে। এবং প্রণয়, তোর পরিবার সবকিছুর দায়িত্ব আমি নেব। যেহেতু সমস্যাটা আমি শুরু করেছি, শেষটাও আমাকেই করতে হবে।”

“আশ্চর্য! আমাকে এভাবে টেনে আনার কী আছে? আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনছিলাম। ধুর, আপনি তো আমাকে কথাটাই শুনতে দিলেন না!”
সূচনার কথায় অবশ্য প্রণয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“সূচনা, এসব কথা বাদ দাও। আমাকে আমার ব্ল্যাক টি-শার্টটা খুঁজে দাও তো। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
সূচনা বিরক্ত চোখে প্রণয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আলমারির দরজা খুলে ভেতরে হাতড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একেবারে সামনের দিক থেকে কালো টি-শার্টটি বের করে এনে বলল,
“দেখুন, এখানেই তো ছিল! আপনি তো ভালো করে খোঁজেনই না।”
প্রণয় নির্লিপ্তভাবে বলল,
“আমি সত্যিই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই তো তোমাকে ডাকলাম।”
সূচনা টি-শার্টটা তার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে আবার বলল,
“কিন্তু আপনার জন্য আমি যে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা জানতে পারলাম না, সেটা জানেন? আপনাকে বললে আপনি হয়তো একটা সলিউশনও দিতে পারবেন!”
প্রণয় এবারও সূচনার কথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। তাড়াহুড়ো করে সূচনার মাথায় আলতো করে একটি চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

“সব কথা শুনব। সলিউশন দেওয়ারও চেষ্টা করব। কিন্তু এখন একটু ব্যস্ত আছি।”
কথাটা বলেই প্রণয় গায়ে থাকা অলিভ রঙের টি-শার্টটি খুলে ফেলল। তারপর দ্রুত কালো টি-শার্টটি গায়ে চাপিয়ে নিল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সূচনা কয়েক মুহূর্ত সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর আর কিছু না ভেবে সেও নিচে নেমে এল।
আজ বাড়িতে ছোট্ট পরিসরে কাবিনের আয়োজন। মেহমান খুব বেশি না হলেও বাড়িতে কাজের তো আর শেষ নেই। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি সবকিছু নিয়েই নিচতলায় বেশ ব্যস্ততা চলছে। সূচনা সবার আগে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সেখানে ঢুকেই দেখল, বেশ জোরেশোরেই রান্নাবান্নার কাজ চলছে। কার কী কাজে সাহায্য করবে, কিছুক্ষণ বুঝে উঠতে পারল না সে। ঠিক তখনই রিমা বলল,
“বরের জন্য আলাদা করে মিষ্টি-মিঠাই আরো কিছু খাবার তৈরি করা হচ্ছে। তুমি বরং এখানে বসে এগুলো বানাতে সাহায্য করো।”

সূচনা আর দেরি না করে সেখানেই বসে পড়ল। হাতে হাতে কাজ করতে করতে হঠাৎ তার চোখ চলে গেল সুপ্তির দিকে। মেয়েটাকে দেখে সূচনার মনে কেমন একটা বিস্ময় জাগল। এই বিয়ে নিয়ে ঋতুর থেকেও যেন সুপ্তিই বেশি উত্তেজিত। বাড়ির প্রায় প্রতিটি কাজেই তাকে দেখা যাচ্ছে। কখনো রান্নাঘরে এসে সাহায্য করছে, কখনো মেহমানদের জন্য কিছু গুছিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো কারও কোনো প্রয়োজন আছে কি না, সেটাও খেয়াল করছে। সূচনার কাছে বিষয়টা একটু অদ্ভুত লাগলেও সে আর বেশি কিছু ভাবল না। নিজের মনকে অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে চুপচাপ কাজের মধ্যে মন দিল।

বিয়ের উদ্দেশ্যে সোহেল ও তার পরিবার ইতোমধ্যেই রওনা দিয়েছে। অথচ ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়ার পরও সামিরার মনে একটুও শান্তি নেই। ভেতরে ভেতরে তিনিও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু সোহেল এমন এক সময় এমন কিছু কথা বলেছে, যা একজন মায়ের পক্ষে মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে ঋতুর তো কোনো দোষ ছিল না। তাহলে ঋতু কেন কষ্ট পাবে? বিয়ের দিন একটি মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেলে তাকে সমাজের কত প্রশ্ন, কত অপমান আর কত কষ্ট সহ্য করতে হয় সেটা সামিরা খুব ভালো করেই জানেন। আর সেই কারণেই নিজের ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি তাকে কষ্ট দিতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পরও মায়ের মন কি আর শান্ত থাকে?
এদিকে মির্জা বাড়িতে বরপক্ষের লোকজন আসতেই চারপাশে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কনেপক্ষের সবাই তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাড়িজুড়ে উৎসবের আমেজ, অথচ সোহেলের বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। আজ সবকিছু ওর পরিকল্পনা মাফিক না হলে সব শেষ হয়ে যাবে।
অন্যদিকে কাজের ব্যস্ততা আর নিজের সাজগোজ নিয়ে সুপ্তিও এতক্ষণ ঋতুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়নি। অবশেষে কিছুটা সময় পেয়ে সে ঋতুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই থমকে গেল সুপ্তি। ঋতুর পরিবর্তে সেখানে মেরুন রঙের গোল জামা পরা সূচনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। সূচনার হাতে একটি চিরকুট। সুপ্তি কিছু বলার আগেই সূচনা কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ, আর কণ্ঠে জমাট বাঁধা রাগ নিয়ে বলল,

“ঋতু তো এই বিয়েতে রাজি ছিল না। তাহলে সুপ্তি আপু, তুমি সবাইকে কেন বলেছ যে ঋতু এই বিয়েতে রাজি?”
সূচনার কথায় সুপ্তি কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“মানে? তুমি কী বলতে চাইছ?”
সূচনা হাতে থাকা চিরকুটটি তুলে ধরে বলল,
“কী বলতে চাইছি? সেটা বোঝার জন্য এই চিরকুটটাই যথেষ্ট। ঋতু লিখে গেছে, সে এই বিয়ে করতে চায় না। আর সেই কারণেই ও বাড়ি থেকে চলে গেছে।”
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে সুপ্তির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কাঁপা হাতে সূচনার কাছ থেকে চিরকুটটি নিয়ে পড়তে শুরু করল সে।
চিরকুটে লেখা—
“আমি এই বিয়ে করতে চাই না। এই কারণেই এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি। এত চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি ঠিক সময়ে বাড়িতে ফিরে আসব।”
চিরকুটটি পড়ে সুপ্তির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সূচনার চোখে কঠিন প্রশ্ন। সুপ্তির হাত থেকে চিরকুটটি নিয়ে বলল,

“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। ঋতু যখন এই বিয়েতে রাজিই ছিল না, তাহলে তুমি সবাইকে কেন বলেছ যে ও বিয়েতে রাজি?”
সুপ্তি অসহায় কণ্ঠে বলল,
“আমি… আমি কী করে জানব যে ও বিয়ে থেকে চলে যাবে? সকাল পর্যন্ত তো সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল!”
সূচনার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়!”
কথাটা বলেই সূচনা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ করেই সকালবেলার কথা মনে পড়ে গেল তার। ঋতু তাকে একটি ঘটনা বলেছিল– তার এক বান্ধবীর কথা বলেছিল। কিছুক্ষণ ভাবতেই দু’য়ে দু’য়ে চার মিলতেই সূচনার মাথায় সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। তাহলে ঋতু যে বান্ধবীর কথা বলেছিল, সেই বান্ধবী আসলে ঋতু নিজেই! আর তার মানে… সোহেল ঋতুকে নয়, তার বোন সুপ্তিকে পছন্দ করে!
সূচনার চোখেমুখে মুহূর্তেই হতাশা নেমে এল।
“এসব কী হচ্ছে! আমি বুঝতে পারছি না, অনেক বড় একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে।”
চিরকুটটি হাতে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো সূচনা। কিন্তু সুপ্তি তড়িঘড়ি তার হাত ধরে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছ তুমি?”

সূচনার চোখে তখন বিরক্তি।
“কোথায় যাচ্ছি মানে? অলরেডি বরপক্ষ চলে এসেছে। আমি ঋতুকে ঘর থেকে নিয়ে যেতে এসেছিলাম। কিন্তু ও ব্যালকনি দিয়ে পালিয়ে গেছে। এখন বউয়ের জায়গায় তো অবশ্যই তোমাকে নিয়ে যাব না, তাই না? আমাদের বাড়ির সবাইকে তো এই কথাটা জানাতে হবে।”
কথাটা শেষ করেই সূচনা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর সুপ্তি দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গেছে। নিজের গালে নিজেই দুটো চড় মারতে ইচ্ছে করছে তার। একইসঙ্গে রাগ হচ্ছে ঋতুর ওপরও। ঋতু এমনটা না করলেও পারত! কী দরকার ছিল এভাবে চলে যাওয়ার? বিয়ের আসর বসে গেছে, বরপক্ষ এসে পৌঁছেছে। আর ঠিক এই মুহূর্তেই ঋতু কোথায় চলে গেল?
সূচনা ঋতুর ঘরে গিয়েছিল প্রায় চল্লিশ মিনিট আগে। এতটা সময় সে ওপরেই ছিল। নিচে নামার পর সবার আগে তার চোখ প্রণয়কেই খুঁজতে শুরু করল। কিছুটা দূরে তাকাতেই দেখতে পেল, সোহেল প্রণয়ের দু’কাঁধে হাত রেখে একনাগাড়ে কিছু একটা বলে চলেছে। তার মুখে অস্থিরতা স্পষ্ট। সূচনা আর দেরি করল না। প্রায় ধরফড় করতে করতে প্রণয়ের কাছে গিয়ে আস্তে করে বলল,

“আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। অনেক বড় একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
প্রণয় বিরক্ত চোখে সূচনার দিকে তাকাল। তারপর তার মুখ থেকে শুধু একটিই কথা বেরিয়ে এল,
“আর ঝামেলা হতে কী বাকি আছে? কী হয়েছে?”
সূচনা একবার সোহেলের দিকে তাকাল। তারপর প্রণয়ের দিকে ফিরে রিনরিনে কণ্ঠে বলল,
“একটু সাইডে চলুন।”
প্রণয় আর কিছু না বলে সূচনার সঙ্গে সরে গেল। লোকজনের ভিড় থেকে একটু দূরে, নিরিবিলি একটা জায়গায় দাঁড়াতেই সূচনা নিচু গলায় বলল,
“আপনি কি জানেন, ঋতু বিয়ে করবে না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে?”
সূচনা ভেবেছিল, এবার নিশ্চয়ই প্রণয় রেগে যাবে। হয়তো অবাক হয়ে কিছু একটা বলবে কিন্তু প্রণয়ের শান্ত উত্তর শুনে সূচনা থমকে গেল।
“সেটা আমি জানি।”
“কী! কী বলছেন এসব?”
সূচনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
প্রণয় এবার ঠান্ডা গলায় বলল,
“ঠিকই বলছি। আর একটু আগেই সোহেল আমার হাতে মার খেয়েছে। ঋতু বাড়িতে আসুক, ওরও একটা ব্যবস্থা করা হবে।”

সূচনা তখন বিস্ময় আর উৎকণ্ঠা দুটোই মিশিয়ে বললো,
“কি বলছেন এসব! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”
প্রণয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সোহেল সুপ্তিকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু ওই মাথামোটার জন্য ভুল করে আঙ্কেল-আন্টি ঋতুর সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। আর আমরাও এত কিছু জানতাম না, তাই ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবিনি। এখন বিয়ের দিন এসে সোহেল আমাকে বলছে, ‘বন্ধু, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। আমি তো সুপ্তিকে বিয়ে করতে চাই!
কথাটা বলতে বলতে প্রণয় কপালে হাত বুলিয়ে নিল।

“বিশ্বাস করো, ওর কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য আমার মাথাই হ্যাং হয়ে গিয়েছিল। আর ঋতু ভয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছে। মানে, একবারও কি এরা আমাকে কিছু বলতে পারলো না? সবসময় শুধু পাকনামো করে বেড়াবে, আর শেষ মুহূর্তে এসে সব ঝামেলা আমার ঘাড়ে চাপাবে! ঋতু বাড়িতে আসুক, তারপর ওকে আমি দেখাচ্ছি মজা”
সূচনা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তি ঋতুর ঘরে নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। এই মুহূর্তে চারপাশের সবকিছুই তার কাছে অসহ্যকর মনে হচ্ছে। ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন শায়লা খাতুন। খালামণিকে দেখেই সুপ্তির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। নিশ্চয়ই তিনি এখন ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। কীভাবে নিজের সাফাই দেবে, কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সুপ্তি।
শায়লা খাতুন হাতে থাকা শাড়ি বিছানার ওপর রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“এগুলো পরে তৈরি হয়ে নে।”
সুপ্তি অবাক চোখে শাড়িগুলোর দিকে তাকাল। কথাটার অর্থ ঠিক বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পর ধীর কণ্ঠে বলল, “মানে?”
আবারও শাড়িগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“আমি কেন এগুলো পরব?”

শায়লা খাতুন এবার আর কোনো ভূমিকা না করে কঠিন স্বরে বললেন,
“সুপ্তি, ঋতু তোকে কোন ভাষায় বলেছিল যে সে এই বিয়েতে রাজি, সেটা আমি জানি না। আর তুই কী বুঝে আমাকে বলেছিলি যে ঋতু বিয়েতে রাজি সেটাও আমি বুঝতে পারছি না। তোর ওই একটা কথার কারণেই আজ পরিস্থিতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস।”
সুপ্তি কাঁপা গলায় বলল,
“খালামণি, আমি বুঝতে পারিনি। ঋতু চলে যাবে…”
“আমি এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।
আমি তো তোর খালামণি। কোনোদিন কি তোর মনে হয়েছে, আমি তোকে আমার নিজের সন্তানদের চেয়ে কম ভালোবেসেছি? তুই যেদিন থেকে এই বাড়িতে এসেছিস, সেদিন থেকে কোনোদিন কি তোকে আমার সন্তানদের থেকে আলাদা করেছি?”

কথাগুলো শুনতেই সুপ্তির চোখের কোণে পানি জমে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল তার।
শায়লা খাতুন আবার বললেন,
“আর এখন আমি এসব নিয়ে কোনো কথা বাড়াতে চাই না। ঋতু বাড়িতে আসুক, তারপর সব কথা হবে।”
তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই জামিউল ইসলাম ঘরে প্রবেশ করলেন।
তিনি শায়লা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপা, আমার মেয়ের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। একান্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা।”
শায়লা খাতুন আর কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন। তারপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
জামিউল ইসলাম ধীরে ধীরে সুপ্তির দিকে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কঠিন কণ্ঠে বললেন,

“একটু পরেই তোর সোহেলের সঙ্গে বিয়ে।”
কথাটা শুনে সুপ্তির বুক কেঁপে উঠল। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি নামতে শুরু করল।
“বিয়ে কিসের বিয়ে! আমি এই বিয়ে করব না।”
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই জামিউল ইসলামের হাতের একটি সজোরে চড় এসে পড়ল সুপ্তির গালে। আঘাতের তীব্রতায় সুপ্তি টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য সুপ্তির চারপাশটা স্তব্ধ হয়ে গেল। জামিউল ইসলাম রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“আমার মেজাজ খারাপ করাবি না। তুই যা করেছিস, এরপর আমার মনে হচ্ছে তোকে গলা টিপে মেরে ফেলি!”
সুপ্তি মেঝেতে বসেই হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল।
কিন্তু জামিউল ইসলামের রাগ এত সহজে থামার নয়। তিনি রুক্ষ কন্ঠে আবার বলতে শুরু করলেন,
“সোহেল ছেলেটা ঋতুকে বিয়ে করতে চায়নি। সে তোকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তোকে সরাসরি সোহেল এই কথা বলেছে, তারপরও তুই কেন মিথ্যা কথা বলে ঋতুর সঙ্গে সোহেলের বিয়ে ঠিক করেছিলি?”
তিনি ক্ষোভে মুঠো শক্ত করে বললেন,
“আজ পুরো মির্জা বাড়ির সামনে তোর জন্য আমার মাথা নত হয়েছে। এত বছর ধরে যে সম্মানটা ধরে রেখেছি, আজ তোর কাজের জন্য সেই সম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর তুই যদি এখন সোহেলকে বিয়ে করতে অস্বীকার করিস, তাহলে,,

সুপ্তি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বাবা, আমি এসব ইচ্ছে করে করিনি…”
কথাটা সুপ্তি বলতেই জামিউল ইসলাম তাকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
“তোর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। বাইরে নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে এতক্ষণ তোকে বাঁচিয়েছি। কিন্তু এখন আমি তোকে যা বলব, তুই সেটাই করবি।”
তিনি শাড়িগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে কঠিন স্বরে বললেন,
“তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। আর কিছুক্ষণ পর তোর সঙ্গে সোহেলের বিয়ে।”
সুপ্তি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
জামিউল ইসলাম এবার আরও কঠোর কণ্ঠে শেষ কথাটি বললেন,
“আর যদি তুই এই বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করিস, তাহলে আমি তোর মাকে তালাক দেব। আর তোকে আমার মেয়ে হিসেবেও অস্বীকার করব। ত্যাজ্য কন্যা করব তোকে। তাই ভালোভাবে শুনে রাখ আজ তুই সোহেলকেই বিয়ে করবি।”

অন্যদিকে, ঋতু একনাগাড়ে হেঁটে চলেছে। ওর পরনে হালকা বেগুনি রঙের একটি সাধারণ লেহেঙ্গা। সকালে যে পোশাকটি পরেছিল, সেটিই এখনো গায়ে। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় পোশাক বদলানোর কথা তার মনেই আসেনি। তার ওপর দুর্ভাগ্য যেন পিছুটান ছাড়ছে না। যে ব্যাগটিতে করে টাকা এনেছিল, সেটিও কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে। ফলে গাড়ির ভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও তার কাছে ছিল না। শেষ পর্যন্ত ভাড়া দিতে না পারায় গাড়িচালক তাকে মাঝরাস্তাতেই নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
ঋতু ভেবেছিল, কোনোভাবে হেঁটে বান্ধবীর বাড়িতে চলে যাবে। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই বুঝতে পারল, এখান থেকে তার বান্ধবীর বাড়ি এখনো অনেকটা পথ। অসহায় হয়ে ধীর পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। হঠাৎই বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে একটি গাড়ি এসে ঋতুর একেবারে সামনে পড়ল।
ভয়ে ঋতু মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠল, “আহ্!”
সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটির ব্রেক কষে থেমে গেল। গাড়ির দরজা খুলে একজন যুবক নেমে এল। ঋতুর দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
“মরার জন্য পৃথিবীতে আর কোনো জায়গা পাননি? অন্য কোথাও গিয়ে মরুন। আমার গাড়ির সামনে এসে মরতে চাইছেন কেন?”

কণ্ঠটা কানে আসতেই ঋতুর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কণ্ঠস্বরটা অসম্ভব পরিচিত। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। পরমুহূর্তেই তার চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। কথাগুলো অন্য কেউ বলেনি বরং বলেছে জঙ্গল, ওরফে রাফি। রাফিকে দেখেই ঋতুর মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। দু’হাত কোমরে রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“ও হ্যালো! আমার এত তাড়াতাড়ি মরার কোনো শখ নেই। আর যদি কেউ মরেও, তাহলে যেন আমার শত্রুর আগে মরণ হয়। যেমন আপনার মতো কেউ!”
কথাটা শুনে রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে গাড়ির দরজাটা সজোরে বন্ধ করে ঋতুর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“এমনিতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। তার ওপর তুমি আমার সামনে এসে হাজির হয়েছ! তোমাকে দেখে এখন আমার আরও বেশি বিরক্তি লাগছে।”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
“আচ্ছা, তাই নাকি? আমাকে দেখে আপনার বিরক্তি লাগছে? তো আমি কি একবারও বলেছি যে আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে?”
রাফি বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
“অসহ্যকর একটা মেয়ে! সরে দাঁড়াও এখান থেকে। নেক্সট টাইম আমার গাড়ির সামনে এভাবে এসে দাঁড়ালে কিন্তু একদম চাপা দিয়ে দেব।”

ঋতু এক মুহূর্তও দেরি করল না। মুখ ঘুরিয়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
“আমার বয়ে গেছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে!”
কথাটা বলেই ঋতু হনহন করে হাঁটা শুরু করল।
নিলুফা খাতুন হাতের মুঠোয় কাগজটা শক্ত করে চেপে ধরে পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন। চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ, অথচ মুখে কোনো কথা নেই। তাঁর এমন নীরবতা দেখে টিনা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৬

“কী হয়েছে, ফুপি? তুমি কিছু বলছ না কেন? রাফি কোথায়?”
নিলুফা খাতুন ধীরে ধীরে মুখ তুললেন। কঠিন কণ্ঠে দৃঢ় স্বরে বললেন,
“আমার ছেলে আমার কথা শুনল না। রাফি তোকে বিয়ে করবে না। তাই… ও চলে গেছে।”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here