রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২১
রিক্তা ইসলাম মায়া
আব্রাহাম রিদ খানের সাথে মিল রেখে রিদের ছেলের নাম রেখেছে আবরার মারিদ খান। প্রথমে নামটা আবরার খান নাম রেখেছিল আরাফ খান। পরে মায়া এই নামটার সাথে মারিদ যুক্ত করেছে । মা-তে মায়া, আর রিদ নামটা মিলিয়ে মারিদ। পুরো নাম দিয়েছে আবরার মারিদ খান। মায়ার ছেলে হওয়ার পাঁচ বছর পর একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়ের নামটাও রিদের সাথে মিলিয়ে রেখেছে রিদিতা খান সুখ। সুখ নামটা অবশ্য রিদ নিজেই রেখেছে। রিদ সবসময় বলে সুখ হচ্ছে বাবার সুখ। কি মিষ্টি দেখতে মেয়েটা! ছেলে মেয়ে দুটোই রিদের মতো দেখতে হয়েছে। মারিদকে হুবহু রিদের কপি বলা যায়। নাক মুখ, বাদামি রঙের চোখ, গায়ের রঙ, চুলের কাটিং, কপাল সবকিছু রিদের মতো দেখতে। আরাফ খান, হেনা খান, সুফিয়া খান সকলেই বলে রিদ ছোটবেলায় মারিদের মতো দেখতে ছিল। মারিদ তার বাবার মতো দেখতে হয়েছে।
শুধু তাই নয়, স্বভাবও পেয়েছে বাপ-দাদীর মতো গম্ভীর, আর কম কথার মানুষ। বাচ্চা ছেলেদের স্বভাব হবে অবুঝ, দুষ্টুমি, ঘনঘন কান্নাকাটি করার স্বভাব। অথচ মারিদ তেমন নয়। ছোটবেলায় খিদে পেলে কান্নাকাটি করা ছাড়া মারিদ কাঁদতো না, সারাদিন খেলনা দিয়ে বসিয়ে রাখা যেত। অবশ্য মারিদ একা বসে খেলতো কোথায়? খান বংশের একমাত্র বাচ্চা হওয়ায় সে সারাক্ষণ সুফিয়া খান, নিহাল খান, রাদিফ, আরাফ খান, হেনা খানের কোলে কোলে থাকতো। রিদ অফিস থেকে ফিরলে ছেলের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে পারতো, তাও ঘুমানোর আগে। নয়তো মারিদের দেখা পাওয়া যেত না। মায়া মা হয়েও নিজেই ছেলেকে খাওয়া ছাড়া কোলে নিতে পারতো না। মায়ার এতে অবশ্য আপত্তি ছিল না। বরং মায়া বুঝতো এই বাড়ির মানুষ কতটা বাচ্চাদের জন্য আকাঙ্ক্ষায় ছিল এতদিন। মায়া মারিদের জন্মের পরপর দ্বিতীয় বাচ্চার জন্য প্ল্যানিং করলেও কখনো রিদের কাছে সে কথা বলে ঠাঁই পায়নি। মারিদকে জন্ম দেওয়ার সময়ই মায়ার অবস্থা কাহিল ছিল। আর এই নিয়ে রিদ নিজেই বেহুশ হয়ে গিয়েছিল মায়ার টেনশনে ওটির বাইরে। সেই নিয়ে এখনো আরাফ খান রিদের মজা নিয়ে বলে…
‘ বাচ্চা জন্ম দিল মায়া, আর বেহুশ হলি তুই। এত ছোট কলিজা নিয়ে আবার আমার সাথে বড় গলা করিস। তোর জন্য লজ্জায় আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারি না।
তখন রিদের লিপিপ্ত উত্তর আসে…
‘ তাহলে মাস্ক পরে রাইখেন দাদাভাই, আর লজ্জা লাগবে না।
‘ মাস্ক তুই পর গিয়ে। তোর মতো বউ আমাদের ছিল না? কই আমরা তো কখনো বউয়ের ডেলিভারিতে বেহুশ হইনি? আমরা ছিলাম বাঘের বাচ্চা। সামান্যতে বেহুশ-টেহুশ হই না।
‘ বউ ভালোবাসতে বাঘের বাচ্চা হতে হয় না দাদাভাই। এটা মনের ব্যাপার। ব্যক্তির মন-মস্তিষ্ক ডিস্টার্ব হলেই সে বেহুশ হয়। আফসোস তোমার মন-মস্তিষ্ক দুটোরই অভাব।
দাদা-নাতির খোঁচাখোঁচির সম্পর্ক আজও বহাল। আরাফ খান কথায় রিদের সাথে না পারলেও তিনি আজও রিদকে খোঁচান মায়ার ডেলিভারিতে বেহুশ হওয়া নিয়ে। রিদ মাঝেমধ্যে উত্তর দেয়। তবে প্রায়শই আরাফ খানকে ইগনোর করে চলে। মারিদের চার বছর পর মায়া পুনরায় রিদের মতামত না নিয়েই দ্বিতীয়বার কনসিভ করে। দু’জনের প্ল্যানিং না থাকলেও রিদ জানতো মায়া পুনরায় বেবি প্ল্যানিং করছে বিষয়টা। এতে রিদ বাধা দেয়নি, তবে নিজের সম্মতিও দেয়নি। তবে এই ব্যাপারটায় সে বিরক্ত। রিদ মায়াকে রুমে ডেকে প্রশ্ন করেছিল….
‘ তুমি আসলে কি চাচ্ছো? খোলে বল তো।
মায়া প্রথমে রিদের কথার মানে বুঝতে না পেরে বলেছিল…
‘ আমি আবার কি চাইব? কিছু চাই না তো।
‘ তাহলে আবার বেবি নেওয়ার কারণ কি?
রিদের কথার মানে বুঝতে পেরে মায়া বেশ স্বতঃস্ফুতিতে উত্তর দিয়ে বলে..
‘ বেবি নেওয়ার জন্য কারণ লাগবে কেন? সংসার করছি, আর সংসারের মূল নীভই হচ্ছে সন্তান। একটা সংসারে একাধিক বাচ্চা থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?
মায়ার বুঝদার কথায় রিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে…
‘ এসব তোমায় কে শিখিয়েছে?
‘ আমাকে কেউ কেন শিখাবে? আমি এখন সব বুঝি। আমি বড় হয়েছি না?
‘ তোমার মাথায় আসলে কি চলছে বলতো রিত? এক্সাক্টলি কয়টা বেবি চাচ্ছো?
রিদের কথায় মায়া নিজের ডান হাতের আঙুলে কিছু গণনা করে। মায়াকে গণনা করতে দেখে রিদের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যায়। তার পাগলাটে বউ কতগুলো বাচ্চার প্ল্যানিং করে রেখেছে আল্লাহ জানে। যার জন্য এখন তার বউকে আঙুলের গণনার সাহায্য নিতে হচ্ছে? মায়া হিসাব-নিকাশ করে দুই হাত উঁচিয়ে আটটা আঙুল রিদকে দেখিয়ে বলে…
‘ আমি আটটা বাচ্চা নিব মোট।
মায়ার কথায় রিদ তব্দা খেয়ে বসে। মনে হচ্ছে তার মাথা ঘুরছে। কি সাংঘাতিক প্ল্যানিং তাঁকে নিয়ে করে রেখেছে বেয়াদব বউটা! আটটা বাচ্চা? তাও রিদকে দিয়ে? রিদ বুকে চাপ অনুভব করলো। সে বউয়ের এই আট বাচ্চার আবদার পূরণ করতে করতে বৃদ্ধ হয়ে যাবে, তারপরও দেখা যাবে বৃদ্ধ বয়সে এই বেয়াদব বউয়ের জন্য তাঁকে বাবা হতে হচ্ছে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! রিদ হতভম্ব ঘোর কাটিয়ে মেজাজ দেখিয়ে বলে…
‘ স্টুপিড! এতো বাচ্চা কেউ নেই?
‘ কেউ না দিলে আমরা নিয়ে দেখিয়ে দিব। এতে কঠিন কাজ কি?
‘ এটা তোমার কাছে সহজ কাজ মনে হচ্ছে?
‘ হ্যাঁ।
রিদ এবার সত্যি রেগে যাচ্ছে। মেজাজ দিয়ে বলে…
‘ রিত এবার কিন্তু আমার সত্যি সত্যি মেজাজ খারাপ হচ্ছে। এসব কোনো ধরনের পাগলামি? আটটা বাচ্চার প্ল্যানিং কেউ করে? তুমি কি কারও সাথে কম্পিটিশনে নেমেছ? যে তোমাকে জিততেই হবে এতো গুলো বাচ্চা নিয়ে?
মায়ার সহজ সরল স্বীকারোক্তি এলো তক্ষুণি…
‘ হ্যাঁ করেছি তো।
রিদ হতবাক, বিস্মিত কণ্ঠে বলে…
‘ কার সাথে?
‘ দাদাভাইয়ের সাথে। দাদাভাই সবসময় আপনাকে খোঁচায়, অপমান করে বলে উনার চার সন্তানের রেকর্ড নাকি আপনি কখনোই ভাঙতে পারবেন না। সেজন্য আমি উনার চার সন্তানের বদলে আপনার আটটা সন্তান নিব। উনার একটা সন্তানের সাথে আপনার একটা সন্তান ফ্রি। দারুণ না ব্যাপারটা বলুন?
হতবুদ্ধি রিদ নিজের রাগ চেপে হেয়ালি করে বলে…
‘ দারুণ! অবশ্যই দারুণ ব্যাপার। আর তোমাকে এই চমৎকার বুদ্ধিটা দিয়েছে কে শুনি? এই বুদ্ধিমান মাস্টারটা কে?
‘ দাদাভাই।
‘ মানে যার সাথে তোমার কম্পিটিশন, তার থেকেই তুমি বুদ্ধি ধার নিয়েছ তাই তো?
‘ হ্যাঁ।
মায়া মাথা কাত করে সম্মতি দিতেই, রিদ রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলে…
‘ সেই! যেমন মাস্টার, তেমন তার শিষ্য। মাঝ থেকে আমি বলির পাঠা। সেই! সেই! সেই!
মায়ার দ্বিতীয়বার কনসিভ করা নিয়ে সে বছর কত আনন্দ ছিল সবার মাঝে। মারিদের তখন চার বছর চলে। সে সুফিয়া খানের আঁচল ধরে পিছু পিছু সারাক্ষণ ঘুরেফিরে চলে। মায়ার দ্বিতীয়বার ডেলিভারির সময় রিদ আর জ্ঞান হারায়নি, বরং ওটিতে ছিল মায়ার পাশে। মায়ার প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় নরমালে হলেও দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়ার সিজার করতে হয়েছিল। রিদ সেই সুযোগে মায়ার মাতৃত্বের নালী অপারেশনে কেটে দিতে বলে ডাক্তারদের পরামর্শে। অধিক বাচ্চা রিদের পছন্দ না। রিদের পাঁচটা বাচ্চা যে আদর যত্ন পাবে, সেখানে সেই সমপরিমাণ আদর যত্ন দিয়ে দুটো বাচ্চাকে বড় করবে সে। বেশি বাচ্চা কাচ্চা পরিবারের বিরক্তির কারণও হতে পারে যদি সঠিক পরিচালনা বাচ্চাদের করতে না পারে। তাই রিদের জন্য দুটো বাঁচ্চাই ঠিক আছে। মায়া জানে না রিদ মায়ার মাতৃত্বের নালী কেটে দিয়েছে সেটা। মায়া স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তা ভাবনা করে রাখে সুখের বছর তিনেক পার হলে সে তৃতীয় সন্তান নিবে। অথচ মায়ার আশা আশাতেই রয়ে গেল। মায়ার আর কখনো তৃতীয় সন্তান হলো না। তবে সুখও দেখতে বাবার মতো হয়েছে। চোখ দুটো পেয়েছে বাবার—মতো বাদামি রঙের। গঠন-আকৃতিও অনেকটাই রিদের সাথে মিলে যায়। যদি অপরিচিত কোনো মানুষও প্রথমবার রিদকে দেখার পর মারিদ ও সুখকে দেখে, তাহলে একদেখায় বলে দিবে মারিদ ও সুখ দুজনেই রিদ খানের ছেলে-মেয়ে। এটা নিয়ে অবশ্য মায়া বেশ আফসোস করে। হায়-হুতাশ করে রিদকে বলে…
‘ এতো কষ্ট করে ছেলে-মেয়ে জন্ম দিলাম আমি, অথচ দেখতে হলো দুটোই আপনার মতো। আমি কি ওদের মা না? তাহলে আমার মতো দেখতে কেন হলো না একটাও?
রিদ উত্তরে বলে…
‘ প্রেগ্ন্যাসির সময় সারাক্ষণ বসে বসে আমাকে গিলে খাবে তাহলে কি তোমার বাচ্চা আমার মতো দেখতে না হয়ে কি তোমার মতো হবে স্টুপিড?
মায়া হতাশা হাওয়ায় উড়িয়ে চট করে রিদকে বলে…
‘ আমার সন্তানরা আপনার মতো দেখতে হলে হয়েছে। আপনি তো আমার অনেক শখের পুরুষ নেতা সাহেব। আপনার মতো দেখতে আমি আরও দুটো শখের মানুষ পেয়ে আমি কঠিন ভাবে জিতে গেছি, একই চেহারার তিনটে মানুষ পেয়ে। আপনি হেরে গেছেন নেতা সাহেব।
রিদ মায়ার হাস্যজ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ার কথাটা যৌক্তিক। মায়া কাছে রিদের মতো দেখতে তিনটা চেহারা মানুষ আছে অথচ রিদের কাছে তার শখের নারীর কোনো বিকল্প চেহারা নেই। এই দিকটায় মায়া আসলেই কঠিন ভাবে জিতে গেছে।
সুখের বয়স দু’বছর। সে খুব চঞ্চল একটা বাচ্চা।
রিদ বাসায় থাকলে সুখ বাবার কোল ছাড়া কারও কোলে থাকতে চায় না। সুখ হয়েছে বাবার নেওটা মেয়ে। আর এজন্য সুখ সবাইকে খুব জ্বালাতন করে। মারিদ যেমন শান্তশিষ্ট ছেলে, বাবা-মা-দাদী কাউকে জ্বালায় না; সুখ হয়েছে তার বিপরীত। একটু কিছু হলেই কাঁদবে। মর্জি দেখাবে। সবার কোলে যেতে চায় না। অপরিচিত কারও কোলে যায় না। কেউ টেনেও কোলে নিতে পারে না। রিদ সকালে অফিসে গেলে লুকিয়ে যেতে হয়, নয়তো দেখা যায় ঘণ্টা দুয়েক এখানেই কাঁদবে— কেন রিদ ওকে ছেড়ে চলে গেল। বাবা মার পরে সুখ সুফিয়া খানকে বেশ পছন্দ করে। রিদ অফিসে গেলে সুখ সুফিয়া খানের কোলে কোলে থাকবে। হেনা খান, আরাফ খান, নিহাল খানের কোলে কোলেও থাকে। সুখকে নিয়ে কেউ হাঁটাহাঁটি করলে সে চুপ করে বসে থাকবে, আর হাসবে।
রাদিফ ঢাকায় বেশি থাকতে পারে না। নিহাল খান বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকতে চাই নাতি নাতনির সঙ্গে তার জন্য রাদিফকে চট্টগ্রামে থাকতে হয়। রাদিফ রাজনীতিতে জড়িয়েছে আজ পাঁচ বছরের অধিক সময় হয়েছে, তাই রাজনীতির মাঠ তার জন্য এখন আর কঠিন লাগে না। তবে এই রাজনীতির মাঠ যে কতটা ভয়াবহ আর নোংরা, সেটা সে অনেক আগেই বুঝেছিল। তবে রাদিফ রাজনীতির মাঠ ছাড়েনি। ভেবে রেখেছে এর পরের ইলেকশনে নিহাল খান নয়, রাদিফকে দাঁড় করাবেন নিহাল খান। সেই অনুযায়ী রাদিফ নিহাল খানের হয়ে সাধারণ জনগণের সাথে মিশে কাজ করে। এতে এলাকায় রাদিফের পরিচিতি বেড়েছে বেশ। সুফিয়া খান আজকাল শুভার সাথে রাদিফের বিয়েটা নিয়ে তাগাদা দিচ্ছেন। রাদিফও সম্মতি দিয়েছে এতে। শুভার অনার্স কমপ্লিট হয়েছে। এবার মাস্টার্স করছে মেয়েটা। দু’জনের রোজ ফোনে কথা হয়। মাঝেমধ্যে দেখা হয়, রাদিফ ঢাকা গেলে তখন দেখা হয় দু’জনের। দু’জনের মাঝে প্রেম প্রেম একটা সম্পর্ক আছে। দু’জনের বিয়ের রেজিস্ট্রি করা, সেই থেকেই বৈধ প্রেম আছে দুজনের মাঝে, তবে ঘনিষ্ঠ নয় ব্যাপারটা। রাদিফের ব্যস্ততার জন্য সুফিয়া খান দু’মাস সময় নিয়ে রাদিফ আর শুভার বিয়ের ডেট ফিক্সড করেছেন। খান বাড়িতে বিয়ের আমেজ, ব্যস্ততার শেষ নেই।
মারিদকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল মারিদের চার বছর বয়সে। মারিদের পড়াশোনার দায়িত্ব সুফিয়া খান নিজে নেন। রিদের নিজেরও ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়েছিল। সেজন্য রিদ জানে তার মা সুফিয়া খান কতটা স্ট্রিক্ট ও সিরিয়াস মানুষ পড়াশোনা নিয়ে। মারিদ সুফিয়া খানকে বেশ মান্য করে চলে, সেজন্য নির্দ্বিধায় মারিদের জন্য সুফিয়া খানই বেস্ট হবেন। তাছাড়া মায়া নিজেও পড়াশোনা করছে। এই বছর মায়ার অনার্স শেষ হয়েছে। মারিদকে জন্ম দিতে গিয়ে মায়ার এক বছর গ্যাপ গিয়েছিল পড়াশোনায়। সেই পড়াশোনা পরে কন্টিনিউ করেই সুফিয়া খানের তাগিদে। সুখ মায়ার অনার্সের তৃতীয় বর্ষে হয়। মায়া অনার্স শেষ করে এখন মাস্টার্স করবে কিনা চিন্তা করছে। পড়াশোনা করে মায়া চাকরি-বাকরি করবে না, সে সংসার করছে সেটাই করবে, তাই মায়া চাচ্ছিল পড়াশোনাটা আর কন্টিনিউ না করতে। কিন্তু সুফিয়া খানের ভয়ে মায়া না করতে পারছে না। সুফিয়া খানের এক কথা, তিনি সবসময় মায়াকে উপদেশ দিয়ে বলেন—
চাকরি-বাকরি না করলেও মায়া পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। পড়াশোনার বিকল্প কিছু দুনিয়াতে নেই। পড়াশোনা মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। শিক্ষিত মানুষের মর্যাদায় আলাদা হয়। পড়াশোনা জানা শিক্ষিত বেকারও ভালো। পড়াশোনা জানলে লাইফে যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াবার মতো চান্স থাকে। তাই সুফিয়া খান মায়াকে মাস্টার্সে ভর্তি করান। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মায়া মাস্টার্সে পড়ছে। সুফিয়া খানের কথা ফেলার মতো খান বাড়িতে এমন কেউ নেই। সুফিয়া খান যা বলেন, তাই হয়। সুফিয়া খানের কথা যৌক্তিক বলে রিদও মায়ের কথা মেনে নেয়।
মারিদের সাত বছর। সে প্লে, নার্সারি, ওয়ান শেষ করে এই বছর টু-তে উঠছে। জানুয়ারি মাস। শীতের সময়। জুঁইয়ের ছেলে রাদিল আর মারিদ একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। মারিদের রোল এক। দুই কাশপ্রিয়া নামক একটা মেয়ে, তিন রাদিল। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ— বাচ্চাদের মাঝে খুব কম্পিটিশন চলে। কাশপ্রিয়া মেয়েটা প্লে-র বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান করে নার্সারিতে উঠেছিল। মারিদ উনিশতম স্থান করেছিল। রাদিল চতুর্থ স্থান করেছিল। যেহেতু মারিদের পড়াশোনার দায়িত্বটা সুফিয়া খানের ছিল, তাই তিনি মারিদকে কোনো চাপ দেননি মারিদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে। বাচ্চাদের রেজাল্ট খারাপ হলে তাদের এই বিষয়ে চাপে দিতে নেই। এতে বাচ্চারা মানসিকভাবে চাপে পড়ে যায়। তাই সুফিয়া খান মারিদকে কোনো চাপ না দিয়ে বরং মারিদকে নিয়ে সেদিন ঘুরতে চলে যান। সুফিয়া খান মারিদকে পাশের সিটে বসিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ান ঢাকা শহরে অলিগলি ধরে। মারিদের সব পছন্দের খাবার খান, খেলাধুলা করে। রাতে মারিদকে নিয়ে বাসায় ফিরে কাউকে কিছু বলতে নিষেধ করে মারিদকে। সবাই সুফিয়া খানের কথায় চুপ থাকেন।
ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই নেয়। সুফিয়া খান সেইরাতে মারিদকে সাথে নিয়ে ঘুমানোর সময় বেশ যত্ন করে মারিদকে বুঝিয়েছেন পড়াশোনা কতটা জরুরি একটা মানুষের জন্য। মারিদ পড়াশোনা জানলেই বাবা, দাদা, কাকার মতো বড় মানুষ হতে পারবে মারিদ। নয়তো লাইফে কেউ সম্মান দিবে না মারিদকে। সে কিছুই অর্জন করতে পারবে না যদি পড়াশোনা না জানে। মারিদ দাদীর কথা শুনেছে, মাঝেমধ্যে প্রশ্নও করেছে। পরদিন সকালে রিদ মারিদকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়। মারিদ বাবার হাত ধরে জগিংয়ে বেরিয়েছিল। রিদ মারিদের ছোট ছোট পায়ের কদমের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে। রিদ মূলত জগিংয়ে নয়, ছেলেকে বুঝাতে নিয়ে এসেছে পড়াশোনা কতটা জরুরি একটা মানুষের জন্য। রাতে সুফিয়া খান, সকালে রিদ— একই কথা বুঝানোতে মারিদ সেদিন বুঝেছিল বাপ-দাদীর কথা।
তারপর থেকেই সুফিয়া খান জোরালোভাবে মারিদের পড়াশোনার পিছনে কঠোর পরিশ্রম করেন। মারিদকে সকাল-বিকাল দু’বেলা টিউশন মাস্টারের পড়ানোর পাশাপাশি সুফিয়া খান রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিয়ে বসে থাকেন মারিদের স্কুল ও প্রাইভেটের পড়া শেষ করতে। সুফিয়া খানের কঠোর পরিশ্রমে নার্সারির প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় মারিদ উনিশতম থেকে ষষ্ঠ স্থানে আসে। তারপর বার্ষিকে প্রথম স্থান হয়। স্কুলের গার্ডিয়ানদের মাঝে হৈচৈ পড়ে যায়— উনিশতম স্থানের ছেলে কিভাবে প্রথম স্থানে চলে আসে সেই নিয়ে কানাঘুষা হয়! তারপর অবশ্য সেই কথার আলোচনা বেশি দিন টেকেনি, মারিদের পড়াশোনা আর মেধাবী স্থান দেখে সবাই মুখ চুপ করে যায়। ওয়ান, টু-তে বরাবরই মারিদ প্রথম স্থান। মারিদের পড়াশোনা, আচরণের ভদ্রতার প্রশংসা স্কুলের অন্যান্য বাচ্চাদের অভিভাবক থেকে শুরু করে সকল টিচার্সরা করে। ড্রাইভারকে নিয়ে সকালে মারিদকে দশটার সময় স্কুলে রেখে যায় সুফিয়া খান। দুপুরে একটা সময়ে আবার সুফিয়া আসেন মারিদকে নিতে।
ততক্ষণ ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে মারিদের অপেক্ষায় স্কুলে বসে থাকে। আজও তাই হয়েছিল। মারিদের স্কুল ছুটি হওয়ার আধাঘণ্টা আগে ড্রাইভার হাশেম সুফিয়া খানকে নিয়ে আসে স্কুলে। এর মাঝে স্কুলের গেটের সামনে টিচার্স ও অভিভাবকদের ভিড় দেখে হাশেম দ্রুত গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঝালমুড়িওয়ালার ঝুড়িতে গাড়ি ধাক্কা মারে। এতে ঝালমুড়িওয়ালার ডালা উল্টে না পড়লেও ঝালমুড়িওয়ালার পাতিলে রাখা চুলাবোটের মশলা কিছুটা পড়ে গেছে এলোমেলো ভাবে। এতে ঝালমুড়িওয়ালা রাগে অকাট্য ভাষায় গালাগাল করছে গাড়ির মালিককে। হাশেম দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ঝালমুড়িওয়ালার কাছে মাফ চাইছে। সুফিয়া খান গাড়ির পিছনের দরজা খুলে বেরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান ঝালমুড়িওয়ালার দিকে। চোখে রোদচশমাটা খুলে গাড়ির পিছনের সিটে ঢিল মেরে ফেলে সেদিকে এগোবেন, তক্ষুণি গেটের সামনে থেকে একজন টিচার সুফিয়াকে দেখে বলেন….
‘ ঐ যে মিসেস খান এসেছেন। মারিদ খানের অভিভাবক।
সুফিয়া খানের মনোযোগ চলে যায় স্কুল গেটের দিকে। দেখা যায় গেটের টিচার, অভিভাবক সবাই সুফিয়া খানের দিকে তাকিয়ে ডাকছেন উনাকে। উনি পার্স থেকে কয়েকটা এক হাজার টাকার নোট বের করে হাশেমকে ঝালমুড়িওয়ালার ক্ষতিপূরণ দিতে বলে তিনি দ্রুত পায়ে গেটের সামনে যেতেই উপস্থিত মানুষ দু’পাশে সরে যায়। তিনি মারিদকে দেখতে পান। শান্তশিষ্ট ভদ্র মারিদ ভয়ংকর রাগে ফুসফুস করছে। এতটুকু বাচ্চা ছেলের চোখ-মুখ রাগে আর ঘেমে লাল টুকটুকে বর্ণ ধারণ করেছে। বুকের শার্টের সবগুলো বোতাম ছিঁড়ে ভিতরের সাদা গেঞ্জিটায় রঙ লেগে আছে। গলা থেকে বুক পর্যন্ত বড় করে নখ দাবিয়ে আঁচড় কাটা হয়েছে বলে রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে। সুফিয়া খান এই প্রথম মারিদের রাগ আর নাজেহাল অবস্থা দেখে তিনি ঘাবড়ে যান। দ্রুত মারিদকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরেন। মারিদের বুকে গালে হাত বুলিয়ে খানিকটা বিচলিত ভঙ্গিতে বলেন….
‘ কি হয়েছে মারিদ? তোমার এই অবস্থা কেন?
খান পরিবার সম্পর্কে এখানে উপস্থিত সকলের ধারণা আছে। এই স্কুলের মালিক কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে প্রধান শিক্ষক সকলেই খান পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। তাই কেউ সুফিয়া খানের অমর্যাদা হবে এমন কথা বা কাজ করেন না। তবে মারিদ যে ছেলেটার সাথে এতক্ষণ মারপিট করেছে, সেই বাচ্চাটার মা খ্যাঁক করে উঠে বলে….
‘ মিসেস খান, দেখেন আপনার নাতি আমার ছেলের মাথা ফাটিয়ে কি অবস্থা করেছে! এতটুকু বাচ্চা যদি এখনই মারপিট করে, বড় হলে কি করবে?
সুফিয়া খান কপাল কুঁচকে মহিলাটার দিকে তাকান। মহিলাটার হাত চেপে ধরা সাত বছরের শাফিনের দিকে তাকান। মারিদের ক্লাসমেইট ছেলেটা, রোল চার হবে। মারিদের সাথে ছেলেটার বেশ একটা বনিবনা হয় না। দু’জন একই বেঞ্চে বসতে চায় না। তবে মারিদ শান্তশিষ্ট ছেলে হওয়ায় দু’জনের মাঝে বনিবনা না হওয়ার বিষয়টা বেশ একটা বোঝা যায় না। তবে সুফিয়া খান বেশ কয়েকবার শুনেছেন শাফিন ছেলেটা মারিদকে বেঞ্চের পিছনে বসে বেঞ্চের তলা দিয়ে লাথি মারে। মারিদের শার্টে আঁকাআঁকি করে। মারিদের খাতা ছিঁড়ে দেয় মারিদের অগোচরে। সুফিয়া খান বাচ্চাদের এসব ব্যাপারগুলো জটিলভাবে দেখেন না। পড়াশোনা করতে গেলে সহপাঠীদের সঙ্গে এমন অনেক কিছুই হয়। বাচ্চাদের সব কথা ধরতে নেই, ধরলে বাচ্চারা এতে প্রশ্রয় পায় বিপথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে আজকের বিষয়টা অদেখার করার মতোও নয়। সুফিয়া খান শাফিনকে একপলক দেখে নেয়। শাফিনের কপালের একপাশ কেটে গেছে হয়তো শক্ত কিছু দিয়ে রাফিনকে আঘাত করা হয়েছে। মারিদের মতোই শাফিনেরও গায়ের শার্ট ছিঁড়া। দেখতে গেলে শাফিন মারিদের থেকে বেশি আহত হয়েছে। সুফিয়া খান মারিদকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে সবার সামনে সরাসরি প্রশ্ন করে বলেন…
‘ তুমি শাফিনকে মেরেছ কেন?
‘ শাফিন তোমাকে আর বাবাকে নিয়ে গালি দিয়েছে, তাই মেরেছি।
মারিদ রিদের মতোই হয়েছে, কখনো কোনো কিছুতে মিথ্যা বলে না। সবসময় সত্য কথা বলার চেষ্টা করে। সর্বদা সব পরিস্থিতিতে সত্য কথা বলার মতো উৎসাহ সুফিয়া খানই মারিদকে দেয়। সুফিয়া খান মারিদকে বলেন…
‘ কি গালি দিয়েছে? যে তুমি ওকে এতটা মারলে? এটা ঠিক করোনি তুমি মারিদ।
মারিদ রাগে ফুসফুস করছে। ক্ষিপ্ত হয়ে বলে…
‘ অবশ্যই ঠিক করেছি আমি দাদী। আমার পরিবারকে কেউ অসম্মান করলে আমি কখনোই চুপ থাকব না। পাল্টা আঘাত করবই। ওহ বলেছে আমাদের খান বাড়িতে নাকি কোনো পুরুষ নেই। সবাই হিজড়া পুরুষ। সুফিয়া খান বেডি সরদারনি খান বাড়ির। রিদ খান বেডি সরদারের ছেলে, গুন্ডা সরদার।
‘ এজন্য তুমি ওকে মারবে?
‘ অবশ্যই মারব। আমার সামনে আমার পরিবারকে কেউ গালি দিলে আমি একশোবার তাদেরকে মারব।
শাফিন ছোট ছেলে। সে যে এসব কথা নিজের থেকে বানিয়ে বলতে পারবে না, সেটা সুফিয়া খানসহ উপস্থিত সবাই বুঝেছেন। নিশ্চয়ই শাফিনের পরিবারের কেউ শাফিনের সামনে এসব নিয়ে আলোচনা করে, যার জন্য শাফিনের মনে মারিদের জন্য হিংসা ঢুকেছে। আর এজন্য শাফিন এসব কথা মারিদকে বলেছে প্রতিহিংসার ক্ষোভ থেকে। শাফিনের মা আসমা, তিনি বেশ বিচলিতভাবে মারিদের কথা কেটে বলেন…
‘ এই বয়সেই এই ছেলের এত তেজ! আমার ছেলেকে মেরেও এখন বড় গলায় মিথ্যা বলছে আবার! আমার ছেলে এই ছেলেকে গালি দেয়নি। এই ছেলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে এখন মিথ্যা বলছে। এই ছেলে এই বয়সেই এত কাহিনী করতে জানে, বড় হলে এই ছেলে কি করবে আল্লাহ জানে!
এতক্ষণ শান্ত থেকে সুফিয়া খান মূল পরিস্থিতি বুঝতে চাচ্ছিলেন আসলে দোষটা কার। কিন্তু আসমা বেগমের কথায় ঠাস করে সুফিয়া খান রেগে দাঁতে দাঁত পিষে বলেন…
‘ বড় হলে আমার নাতি কি করবে, সেই কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হবে মিসেস আসমা? আমার নাতি কি আপনার খায় যে আপনি এতো চিন্তা করছেন?
থমথমে মুখে আসমা কিছু বলতে গেলে প্রধান শিক্ষক আনোয়ার সাহেব এগিয়ে এসে বিষয়টা থামান। তিনি উপস্থিত আরও বাচ্চা যারা আছে, তাদের জিজ্ঞাসা করে বলেন…
‘ মারিদ-শাফিনের ঝগড়ার সময় তোমরা কে ছিলে সেখানে? কে বলতে পারবে সত্যটা?
উপস্থিত মেয়ে-ছেলে মিলিয়ে বেশ কয়েকটা বাচ্চা হাত তোলে। এর মধ্যে কাশপ্রিয়া বলে…
‘ স্যার, স্কুল ছুটির সময় আমরা বেরোনোর পথে শাফিন পিছন থেকে রাদিলকে ধাক্কা মেরে মারিদের উপর ফেলে দেয়। রাদিল পাল্টা শাফিনকে ধাক্কা দিতে চাইলে মারিদ মাঝে দু’জনকে থামাতে যায়। তখনই শাফিন বিনাকারণে মারিদকে গালি দেয়। মারিদ যেটা বলেছে, সেটাই সত্য।
কাশপ্রিয়ার কথায় বাকি বাচ্চারাও সম্মতি দেয়। আনোয়ার সাহেব শাফিনকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে জেরা করতেই শাফিন ভয়ে তার মা আসমার নাম বলে দেয়। আসমা শাফিনের সামনে প্রায়ই খান পরিবার সম্পর্কে এটা-সেটা বলে গালিগালাজ করে বাসায়। আসমা মূলত মারিদ প্রথম স্থান করা নিয়ে হিংসা থেকে এসব বলে বেড়ান বাসায়। শাফিন মায়েরটা শুনে মারিদের সাথে খারাপ আচরণ করে স্কুলে। আসমা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে থমথমে খেয়ে যায়। নিজের হয়ে ভয়ে মিথ্যা সাফাই দিতে চাইলে সুফিয়া খান থামিয়ে দিয়ে বলেন….
‘ শুনেন মিসেস আসমা, একটা কথা বলি। প্রথমত, খান বাড়ির মানুষ আপনার বাজেটের বাইরে। তাদের সাথে টেক্কা দিতে চাইলে তাদের লোড নিতে পারবেন না, ফেটে যাবেন। দ্বিতীয়ত, আপনি আমার পরিবারকে গালমন্দ করে মহান হচ্ছেন না, বরং নিজের ছোট ছেলের মস্তিষ্ক বিগড়ে দিচ্ছেন। আপনি যা শেখাচ্ছেন, আপনার ছেলে আপনার থেকে হিংসা-প্রতিহিংসাই তাই শিখছে। আমার নাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ ঠিক করুন। আমার নাতির পিছনে তার দাদী আছে, সে পথভ্রষ্ট হওয়ার নো চান্স।
সুফিয়া খান মারিদের হাত চেপে আনোয়ার সাহেবের উদ্দেশ্যে বলেন…
‘ শুনেন আনোয়ার সাহেব, আমার মনে হয় মিসেস আসমার লম্বা ব্রেক দরকার। একই জায়গায় ছেলেকে পড়াতে পড়াতে বোরিং হয়ে গেছেন। উনার জায়গাটা পরিবর্তন হওয়া দরকার। নতুন জায়গায় নতুন মানুষ দেখলে উনার মন-মাইন্ড দুটোই ফ্রেশ হয়ে যাবে। আই থিঙ্ক উনার ছেলের ট্রান্সফার লেটার দরকার। আপনার কাছে থাকলে কালই একটা দিয়ে দিয়েন উনাকে। আর নয়তো আপনার প্রতিষ্ঠাতাকে আমার নাম বলবেন, উনি নিজেই দিয়ে দিবেন আপনাকে।
খুবই সহজ-সরল ভাষায় কঠিনভাবে নিজের ক্ষমতার প্রকাশ করলেন সুফিয়া খান। সেটা উপস্থিত সকলেই বুঝেও চুপ করে গেলেন। আনোয়ার সাহেব তৎক্ষণাৎ সুফিয়াকে থামিয়ে দিলেন, বললেন প্রতিষ্ঠাতাকে বলতে হবে না, তিনি নিজেই শাফিনের ট্রান্সফার লেটার দিয়ে দিবেন কালই। মিসেস আসমা বেগম রাগে তিলমিলিয়ে উঠে বলেন…
‘ সব জায়গায় ক্ষমতা-দাপট দেখানো ভালো না, মিসেস খান।
‘ আমার আছে তাই দেখাচ্ছি। আপনার থাকলে আপনিও আমার কথা কেটে দেখান।
সামান্য বিষয় নিয়ে সুফিয়া খানও একটা বাচ্চাকে টার্মিনেট করাতেন না, কিন্তু আসমা বেগমের কাছে নতি স্বীকার নেয় না। উনি অন্যায় করেছেন জেনেও তিনি নিজেকেই সঠিক দাবি করছেন উল্টো, আর সুফিয়া খানের সমস্যাটা সেখানেই। আজকের ঘটনা বারবার রিপিট হবে যদি না আসমা বেগম নিজের ভুল সংশোধন করে চলেন। আসমা বেগম সকলের সামনে এখন মাফ চাইলে সুফিয়া খান মাফ করে দিতেন, শাফিনের চিকিৎসার দায়ভারও নিতেন। কিন্তু আসমা বেগম তা না করে উল্টো রাগ দেখাচ্ছেন সুফিয়া খানকে। সুফিয়া খান আসমা বেগমকে ইগননোর করে মারিদ ও রাদিলকে নিয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখেন ড্রাইভারের সাথে তখনো ঝালমুড়িওয়ালার ঝামেলা চলছে। ঝালমুড়িওয়ালার সাথে অনেকটাই হাতাহাতিতে চলছে হাশেমের। সুফিয়া খান এমনিতেই আসমা বেগমের বিষয়টা নিয়ে রেগে ছিলেন, এখন আবার ঝালমুড়িওয়ালার কাহিনী দেখে নিজের রাগ চেপে রাখতে পারলেন না। গাড়ির পিছনের দরজা খুলে মারিদ ও রাদিলকে বসতে বলে সুফিয়া খান সেদিকে এগোন। রাদিল গাড়ির ভিতরে ঢুকলেও মারিদ ব্যাগটা গাড়ির ভিতরে রেখে সুফিয়া খানের পিছন পিছন যায় সামনে।
ঝালমুড়িওয়ালার সামান্য মশলা পড়ায় হাশেম তাঁকে ছয় হাজার টাকা দিয়েছে, যেটা তখন সুফিয়া খান দিয়েছিলেন দিতে। কিন্তু ঝালমুড়িওয়ালা সেটা মানছে না। বলছে মশলা নাকি মুড়ি প্যাকেটে পড়েছে, কুচি করে কাটা পেঁয়াজ-কাঁচামরিচের উপর পড়েছে, তাই তার বড় লোকসান হয়েছে। মাত্র ছয় হাজার টাকায় হবে না। অথচ হাশেমসহ উপস্থিত সকলে স্পষ্ট দেখছে মুড়ির প্যাকেটের বাইরে মশলা পড়েছে, ভিতরে নয়। তাই কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু তারপরও ঝালমুড়িওয়ালা অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য গায়ে পড়ে ঝামেলা করছে। যাতা নয় তা বলে গালি দিচ্ছে বলে হাশেমের সাথে ঝালমুড়িওয়ালার হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। ঝালমুড়িওয়ালার পক্ষ নিয়ে সেখানে বসা আরও কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যারা স্কুল গেটের সামনে মুড়ি, চানাচুর, আচার, আমড়া বেচে, তারাও হাশেমের গায়ে হাত তুলছে।
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ২০
সুফিয়া খান দ্রুত ব্যাপারটা মীমাংসা করতে সেদিকে এগিয়ে যান। সবার থেকে হাশেমকে ছাড়াতে চেয়ে তিনি মাঝে ঢুকেছিলেন। এর মাঝে হালকা-পাতলা গঠনের যে লোকটা আমড়া বেচে, সে হাতাহাতির মাঝে সুফিয়া খানকে ধাক্কা মেরে গাড়ির উপর ফেলে দেয়। সুফিয়া খানের বিগড়ে যাওয়া মেজাজটা আরও বিগড়ে যায় তক্ষুনি। তিনি গাড়ির উপর থেকে উঠে তৎক্ষনাৎ থাবা বসিয়ে সেই আমড়া বিক্রেতার ঘাড় চেপে ঠাস করে গাড়ির পিছনের কাচে গ্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে রাগে রি রি করে বলেন….
‘ হারামির বাচ্চারা, আমারে আর ভালো হতে দিলি না। ভাবছিলাম হাত নষ্ট করব না, কিন্তু আমার হাত নষ্ট না করা পর্যন্ত তোদের আর শান্তি হয় না।
