প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২২
সাদিয়া সাদু
রাত তখন তিনটার ঘরে ,
দরজায় প্রবল কড়াঘাত পড়ছে , একটার পর একটা ধাক্কা যেনো কাঠের দরজাটা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়বে ওপাশের হানাদার বাহিনী । দরজা ধাক্কানোর বিকট শব্দে দিগন্ত ভারী চোখ দুইটা টেনে হেঁচড়ে মেলে । ধূসর চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে , বুকের উপর থেকে মেয়েকে সরিয়ে দৃঢ় পায়ে দরজার নিকট এগিয়ে যায় । ঘুমের রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি । দুইটা চোখ ডলে পরনের টাইজারটা পিছন দিক থেকে টেনে উপরে তুলে দরজা খুলে দিল ।
দরজা খোলার সাথে সাথে ওপাশ থেকে জোড়ে সরে একটা ঘুষি এগিয়ে আসে দিগন্ত নাক বরাবরা। আকস্মিক এই ঘটনায় দিগন্ত ঘুমের রেশ মূহুর্তেই উধাও হয়ে যায় । নাকমুখ ছিঁড়ে গড়গড় করে র*ক্ত বের হচ্ছে । দিগন্ত নাকমুখ চেপে ধরে এক পাশে হেলে যেতেই সামনের দাঁড়ান চারটে লোক এগিয়ে গেল জারুল আর দিয়ার দিকে ।
দিগন্ত তটস্থ করে তাদের পিছনে থেকে টেনে ধরে দরোজার বাহিরে ফেলে দেয় , এক ঝটকায় দরজায় খিল এঁটে দেয় । ততক্ষণে জারুল উঠে পড়ে । গোলগোল চোখে আশপাশের দৃশ্য দেখছে । চোখ দুইটা ছলছল করে উঠল । দিগন্ত গায়ে কালো শার্ট টা জড়িয়ে পাশ থেকে একটা ছোট নাইফ তুলে নেয় । জারুল এইটা দেখে বিছানা ছেঁড়ে উঠে দাঁড়ায় । দিগন্তকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল । _’যাবে না তুমি ‘
দিগন্ত জারি মেরে সরিয়ে দেয় জারুল এর হাতটা ।
_’সর । ‘
জারুল এইবার কেঁদেই ফেলে , কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে অস্পষ্ট স্বরে বলল ।
_’ চচলো পপালিয়ে যায় আমরা । ‘
দিগন্ত দাঁতে দাঁত চেপে ধরে হাতের নাইফটা এগিয়ে নিয়ে যায় জারুল এর গলার কাছে । রাগে হিসহিসিয়ে বলে ।
_’ আমি এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। এতো দিন ভালো সেজে ছিলাম তাই মাথায় চড়ে বসেছে। আমার মেয়ের দিকে চোখ যারা দিয়েছে তাঁদের চোখ আমি উপড়ে ফেলব । সর তুই , তোদের সেফটি সবার আগে আমার কাছে। কথা বলবি এই ছুড়ি তোর গলায় চালাব । ‘
জারুল আর কিছু বলতে পারল না । তার আগেই দিগন্ত শার্ট ছড়াতে ছড়াতে বাহিরের দিকে এগিয়ে গেল । তার সামনে দাঁড়ান চারজন ভাড়া করা গুন্ডা। দেখতে হেংলাপাতলা কুচকুচে কালো । একটার দাঁত নাই তো আরেকটা হাতের আঙ্গুল নাই , দিগন্ত এক পলক পরখ করে খুব ভালো করেই বুঝে গেলো তাড়া তার দাদির ভাড়া করাই গুন্ডা। দিগন্ত তটস্থ পায়ে এগিয়ে গেল , হাতে তাকা ছোট্ট ছু*রি টা দিয়ে একেরপর এক আঘাত করেই যাচ্ছে, তার পৃষ্ঠে নিজেও কয়েকটা এলোপাথাড়ি কাঠের বারি খেয়েছে , পিঠেই পড়ছে বেশি । জারুল ততক্ষণে দরজা পেরিয়ে উঠনে এসে দাঁড়িয়েছে । দিয়া এখনো ঘুমে ।
দিগন্ত দুইটার বুক বরাবর ছু*রি চালিয়ে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠে ।
_’ বল কে পাঠিয়েছে ? ”
কথা বললো না , ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল । দিগন্ত ফের একি জায়গায় ছু*রি চালিয়ে চেপে ধরে , একি লোকের পর পর কয়েকটা ছু*রিঘাতে একদম শান্ত হয়ে যায় দু’জন । অপর দু’জন পালাতে দৌড়ে দেয় ।
দিগন্ত ও তাঁদের পিছু নেয় । গ্ৰামের গল্লি পেরিয়ে পাকা রাস্তা থেকে এসে হাজির তিনজন। একজন রাস্তার পিলারের উপরের রড মরিচা ধরে ভেঙ্গে পড়া যাওয়া রডটা হাতে তুলে নেয় । দিগন্ত খালি হাত । ছু*রি টা আগের জায়গায় রেখে এসেছে ।
দিগন্ত এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় , সামনে ,পিছন থেকে একজন রড টা তুলে দিনান্তের চওরা পিছে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বারি বসায় । দিগন্ত একটু হেলে পড়ে । মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল , এক মূহূর্তের জন্য দিগন্ত নিরব থেকে পিছু ফিরে তাকায় , দ্বিতীয় বার বারি দেওয়ার জন্য হাত উচালে দিগন্ত পেট বরাবর লাথি মারে মূহুর্তেই হাতে থাকা রড মাটিতে পড়ে যায় । দিগন্ত সেইটা তুলে নিয়ে ইচ্ছে মতো পিটাতে শুরু করল । একের পর এক আঘাত দিয়ে যাচ্ছে তাও , রাগ যেনো কমছে না। দুইজন মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে । দিগন্ত দুইটাকে তুলে তার গাড়িতে নিয়ে রাখল ।
দিগন্তের পিঠের ব্যথায় মাথাও মৃদু ব্যথা করছে সে সব ব্যথা উপেক্ষা করে গাড়িতে উঠে বসল ।
পিছনে থেকে জারুল এর চিৎকার কানেই নিলো না যেন ।
সকাল ৭ টা বেজে ১৬ মিনিট । জহুরা খুশি মনে ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসল । তার পড়েই এসে বসল , জিসা , নাসিমা , নাসিরুদ্দিন । দীনা বেগম
রান্নাঘরে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত ।
সকলের জন্য চা বানিয়ে কাজের মেয়েকে দিয়ে ড্রয়িংরুমে পাঠিয়ে দেয় ।
ড্রয়িংরুম সবাই বসে চা খেতে খেতে গল্প করছে । জহুরা আজ যেনো একটু বেশিই খুশি । গালের হাসিটা যেনো সরচেই না , নাসিরুদ্দিন আর নাসিমা দুইজন কথা বলছে জমিজমা নিয়েই । জহুরা এইবার গম্ভীর করে ফেলে মুখটা । নাসিরুদ্দিন এর দিকে তাকিয়ে গলা জেরে বলল ।
_’ নাসির । ‘
মায়ের গলার অওয়াজ পেয়ে নাসিরুদ্দিন মায়ের দিকে তাকাল । অত্যন্ত নম্র ভদ্র ভাবে উত্তর দিল ।
_’ জি আম্মা।’
_’তোমার বাবার আদারের রাজপুত্র তুমি । তার সকল প্রোপার্টি তোমাল নামে দিয়ে গিয়েছেন। তোমার বোনটাকে ঠকিয়ে , তুমিও কি বাবা তাই করবে ? বোনটাকে ঠকাবে?”
নাসিরুদ্দিন মাথাটা নামিয়ে ফেলে , মায়ের আর বোনের দিকে এক পলক তাকায় ।নিম্ন স্বরে বলে ।
_’ কি বলেন আম্মা, আমি কেনো ঠকাব । সে আমার বড় বোন মায়ের সমান। তাকে আমি আমার সকল কিছু দিয়ে দিতে পারব আপনি এসব নিয়ে চিন্তা কইরেন না ।’
জহুরা মনে মনে হাসল ।
আজ যেনো তার খুশি দিন একটার পর একটা প্ল্যান যেনো সাকসেসফুল হচ্ছে।
সাথে নাসিমা সেই খুশি । মনেমনে ধিনতানা ধিনতানা বেজে যাচ্ছে ।
_’ আম্মা আপনি সকল কিছু ব্যবস্থা করেন আজকেই আমি নাসিমার ভাগের টা তাকে বুঝিয়ে দেব আজ । ”
নাসিমা , জহুরার আর জিসা তিনজনের খুশি দেখে কে । জহুরা তো পারছে না ছেলের গালে লম্বা করে একটা চুমু খেতে ।
তাদের উপচে পড়া খুশির মাঝেই বাহির থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ হয় ।
জিসা উঠে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যায় । কে এসেছে দেখার জন্য মাথা নাড়িয়ে। বাহিরে তাকাতেই বিস্ময়ে হতবাক সে । দিগন্ত! তাও চোখেমুখে হাতে রক্ত লেগে আছে ? একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে রক্ত ।
_’কে এসেছে ?”
নাসিমা মেয়ে দিকে এগিয়ে হাটার মাঝেই কথাটা বলে। জিসা কোনো কথা বলতে পারল না , গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে । সে মায়ের দিকে তাকিয়ে ফাঁকা ঢোঁক গিলল অমনি দিগন্ত চৌকাঠ পেরিয়ে হলরুমের প্রবেশ করে । তার প্রবেশের সাথে সাথে জহুরা , নাসিরুদ্দিন একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলের মুখে শুকনো রক্ত দেখে। অবাক হয়ে যায় নাসিরুদ্দিন , তটস্থ হয়ে এগিয়ে আসে ছেলের দিকে , উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলের বাহুতে স্পর্শ করতে গেলেই দিগন্তের কঠিন স্বর ভেসে আসে ।
_’ ছুঁবে না আমায় । ‘
_’ কি হয়েছে দিগন্ত , কার সাথে এমন মারপিট করে আসছো হে ? এতো দিন দেশের বাহিরে থেকেও ..
বাকি কথা শেষ করার আগেই। হলরুমের কাঁচের টি টেবিলটা উল্টে আঁচড়ে ফেলে দেয় । মূহূর্তেই ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে হলরুমে জুড়ে ।
ততক্ষণে দীনা রান্না ঘর ছেড়ে এগিয়ে আসে , ছেলের করুন অবস্থা দেখে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে ।
দিগন্ত চেঁচিয়ে উঠলো।
_’ তোমার মা জননী । আমাকে মারার জন্য
লোক পাঠিয়েছে । তার জন্য আজ আমার এই অবস্থা বুঝেছ ? ‘
_’ মিথ্যের কথা , আমি কেনো তোমাকে মারতে যাব দিগন্ত! তুমি আমার একমাত্র নাতি । ———–জহুরা
_’ হে সৎ নাতি, যে সম্পত্তির লোভে পড়ে আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দিতে ছেয়েছে । এমন কি এই সম্পত্তির জন্য নিজের জামাইকে ও বৃষ খাইয়ে মারতে দ্বিধা করেনি, এখন আবার আমাকেও মারছে ..
বাকি কথা বলার আগেই শক্তপোক্ত হাতের চর বসায় নাসিরুদ্দিন।
_’এই শিক্ষা পেয়েছ তুমি ? বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না । ‘
দীনা রাগে ফেটে যাচ্ছে । স্বামীর এহেম কাণ্ডে। জহুরা তো থরথর করে ঘামছে , এই ছেলে এতো কিছু জানল কি করে । এমনকি আলি আহমেদ কে মারার ঘটনা তো সে আর নাসিমা ছাড়া কাক পক্ষিও জানে না , তাহলে বললো কে ? আর সে যে সৎ দাদি সেটাই বা কে বলল ।
হাজার প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে জহুরার মাথা জুড়ে । নিজেকে শক্ত রেখে বলে উঠল ।
_’ আমি তোমাকে মারতে চেয়েছি তার প্রুফ কি ? ‘
দিগন্ত একটা বাঁকা হাসল । সে যেনো জানত এমন কিছু একটা বলবে জহুরা । তাই জুড়ে বলল ।
_’ আলিফ নিয়ে এসো তাদের। ‘
আলিফ দুইটাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে আসল । হাঁটতে পারছে না , পা ভাঙ্গা চোখ বোজা। জহুরা দুইটা গুন্ডকে দেখেই চোখ ছানাবড়া ! দিগন্ত আবারও একটু হাসল ।
_’ বল সব । ‘
_’ জহুরা আম্মা আমাদের টাকা দিয়ে দিগন্ত আর একটা ছোট্ট মেয়েকে মারতে বলেছে এর আগেও কয়েকবার আমাদের হাতে নানারকম কাজ করেছেন । আপনাদের ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের জসীমউদ্দীন আর তার ওয়াইফ সালমাকে মারার জন্য মোটা অংকের টাকা দিয়েছে আমাদের জহুরা । ”
সবাই যেনো বিস্ময়ে হতবাক, নাসিরুদ্দিন তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে সোফায়।
জুহুরার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল খানিকটা । দিগন্ত এইবার একটু এগিয়ে আসল । জহুরার কাছে দাড়াল । কণ্ঠ খাদে নামিয়ে নীরব কণ্ঠে বলে ।
প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২১
_’ আজ আপনার মুখোশ খুলার পালা। দেখেন তো চিনেন কি না ? ‘
দরজায় ইশারা করে দিগন্ত দরজার দিকে । নূরুল হুদা এগিয়ে আসছে তার সাথে , নজরুল মিয়াও রয়েছে । লোকটা ভিক্ষ করে বর্তমানে ।
জহুরার সারার শরীর কেঁপে উঠল মূহূর্তে।
