Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৩

ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৩

ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৩
জান্নাত চৌধুরী

‌দিনের আলো মূর্ছা দিয়ে আঁধার নামছে‌। জহুরা বেগম সন্ধ্যাবাতি দিতে ঘরে আসতেই লক্ষ করেন রাইসা জানালার কাছে বসে বাইর পানে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে বিষন্ন লাগছে , হারিকেনের আগুন দিয়ে পুরো ঘর আলোকিত করেন। কেরোসিনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে , পাখির দল নীড়ে ফিরছে। জহুরা বেগম এসে কাঁধে হাত রাখতে চমকে উঠে রাইসা –
-আম্মা কিছু কইবা?
জহুরা বেগম মেয়ের বিষন্ন মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবারো তাকায় বাহিরের দিকে। শুনশান নীরবতা ! জহুরা বেগম কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলেন-

-আইজ বাদে কাইল পরীক্ষা বই না খুইলা ,‌ বইসা রইছোস কেন?
-“আপার কথা স্বরণ আইছে আম্মা..! আজ ১৫ টা দিন আপার দেখা নাই ,আচ্ছা আম্মা আপা কি আর বাড়ি আইবো না?”
পানসে হয়ে যায় জহুরা বেগমের মুখ ,বাড়িটা কেমন ‌ তার কাছে শূন্য লাগে ইদানিং। মাইয়া বাপের ঘর ছাইরা যাইয়া যে এক জটলা স্মৃতির রাইখা গেছে। এই স্মৃতি যে পুরো বাড়ি গ্রাস কইরা নিতেছে‌
-ও আম্মা কওনা আপা কবে আইবো?
জোহরা বেগম মলিন মুখে বলেন- ‌ নতুন বিয়া হইছে সংসার সামলাইয়া ‌ সময় কইরা আইবো একসময়। সবে মাত্র ১৫ দিন হ‌ইছে।
জোহরা বেগমের কথায় বেজায় বিরক্ত রাইসা। আম্মা যে তার আপারে পছন্দ করে না এটা তার অজানা নয়। পুরো অমাবস্যার রাতের মতো আঁধার নামে তার চেহারায়-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-আপা না আইলেই তো তোমার শান্তি লাগব আম্মা। তাইতো কইতে পারো মাত্র ১৫ দিন!
বেজায় চটে যায় জহুরা বেগম ,ঘরের ‌ মাইয়া ঘরে না আইলে নাকি তার ভালো হইবো। ইচ্ছে তো করছে এই মাইয়ারে কানের নিচে দুটো বসাইয়া দিতে। তবে তা করলেন না তিনি দাঁতে দাঁত চেপে শাসিয়ে বলেন –
-বেশি পাকনামি কথা কইবি না মাইয়া বইলা দিলাম! তোর আপা ঘরে আইয়া কি আমার তা খাইবো নাকি তার বাপের তা খাইবো?
রাইসা বিরক্ত বোলায় বলল-

‌-তাইলে আমার আপা যাওয়ার কতদিন হ‌ইলো তবুও তুমি টোন কাটলা কেন আম্মা?
-“বেশ করছি কাটছি আরো কাটমু তাতে তোর কি?”
-আমার আবার কি হইবো? আপা তোমার পেটের মাইয়া না হইলেও আমার বাপজানের রক্ত আম্মা! আর বাপজানের রক্ত আমার শিরায় উপশিরায় আছে তাই তোমার কষ্ট না লাগলেও আমার কষ্ট লাগে।
ধৈর্য্য হার মানে জহুরা বেগমের ক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে ঠাটিয়ে এক চড় ঢুকে দেয় রাইসার গালে-
-কুলাঙ্গারের ছাওয়াল! এই দিন দেখার লাইগা তোরে কষ্টের টাকায় বিদ্যা নিতে পাঠাই। তোর স্কুলের গণ্ডিতে কি বাপ মায়ের লগে তর্ক শিখায়। বিদ্যা নিয়া জ্ঞানী না হইয়া অসভ্য হইতেছ। তোর আপায় আমার মাইয়া না বইলা ওরে কম ভালোবাসি। ও আমার মাইয়া না হইলে তুইও আমার পেটের না।

-আমারে মারলা আম্মা?
কাঁদছেন জহুরা বেগম রাইসার আম্মা ডাক কানে আসতেই আরও খানিকটা শব্দ করে কাঁদেন তিনি। রাইসা দ্রুত গতিতে মাকে জাপটে ধরে বলে-
-আমার ভুল হইয়া গেছে আম্মা! আর এমন হইবো না তুমি কাইন্দো না আম্মা , দয়া কইরা কাইন্দো না।
জহুরা বেগম দুহাতে মেয়েকে জড়িয়ে নেয়। ব্যর্থ এক নারীর মতো কিছু সময় হুহু করে কান্না করে। হঠাৎ রাইসা কে ছেড়ে দু হাত মুখে সামনে ধরে বলেন

-সোনাই আমার মাইয়া , আমার বাচ্চা। আমি তার মা , তবে আমি ব্যর্থ মা। হো আমি ব্যর্থ ,আমি খারাপ ,আমি আমার ফুলরে বাচাইতে খারাপ। আমার ছোট এক পড়ি রে বাঁচাইতে আমি খারাপ। আমার বোনের আমানত রক্ষার্থে আমি খারাপ , আমি খারাপ ভীষণ খারাপ‌।
ধীরে ধীরে মাকে ছেড়ে বসে রাইসা। আম্মা কি ক‌ইলো , কোন বুবুর আমানত মানে কি? হাতের উল্টো পৃষ্ঠে সে চোখের পানি মুছে বলল
-আম্মা খানিক আগে কি কইলা তুমি ?
আহাজারি থেমে যায় জহুরার চোখ ছোট ছোট করে নেন তিনি।
-ক‌ও না আম্মা। কিসের আমানত ?বড়মা কি তোমার বুবু আসছিলো আম্মা?
ফ্যাকাসে হয়ে যায় জহুরা বেগমের মুখ! দ্রুত গতিতে মুখ চেপে ধরে রাইসার। কারো উপস্থিতি নজরে নেন তিনি। রাইসা চমকিত হয় , তার আম্মা কি কিছু নিয়ে ভীত? ভেবে চলেছে সে। জহুরা বেগম কারো উপস্থিত টের না ‌‌ পেয়ে হিসহিসিয়ে বলে-

-যা শুনছোস পানির লগে হজম করবি। এই কথা জানলে মহাপ্লাবন হইবো সাবধান.!
কথা শেষ করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে চায়। তিনি যে পালালেন ব্যাপারটা বেশ বুঝলো রাইসা। কিশোরী মনে প্রশ্ন জেগে উঠেছে
-বড়মা কি তবে আম্মার বোন লাগে ? আম্মা কথা গোপন করল কেন?
বিড়বিড় করে সে ! মনে হাজার খানিক প্রশ্নের জটলা উত্তর মিলবে কি করে?

রাতের নয়টা
বিছানায় কাঁথা গায়ে জড়িয়ে জড়োসড় হয়ে শুয়ে রয়েছে ইফরাহ। গায়ে জ্বর উঠেছে , কেমন যেন হঠাৎ করে সব হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে ম্যাচ ম্যাচ করছিল শরীরটা , কয়েক ঘণ্টা যেতেই ধুমছে জ্বর উঠে। আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে- তাই এমনটা
আরাধ্যের ফিরবার সময় হয়েছে হয়তো । যদিও এই লোকটার কোন সময় জ্ঞান ঠিক নেই ,তবুও জ্বর শরীর টেনেটুনে উঠে বসে ইফরাহ। মাথা ঝিমাচ্ছে , দুর্বল অনুভব হচ্ছে। ব্যাথাতুর শরীরে এক বালিশ টেনে আধ শোয়া হয়ে বসে। এক হাতে পায়ের ‌কাঁথা গলা অবধি টেনে কাচুমাচু হয়ে বসেছে। শীতে শরীর কাঁপছে, এর মাঝে ঘটে এক বিপত্তি হঠাৎ বিদ্যুৎ গিয়ে পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে যায়‌। গ্রামে এ নতুন নয় , তবে এবারের পরিচিতি নতুন। অন্ধকার ঘরে এখন কি করবে ভাবতে গিয়ে এক ভাঙ্গা গলা কানে আসে

-বউরানী
ইফরাহ দরজার দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে পুরো ঘর শান্ত। আবারও ভেসে আসে একই গলা
-বউরানী দরজা খুলুন
ডাকটা চিনে ফেলে ইফরাহ কুলসুমের মায়ের গলা! ধীর পায়ের বিছানা ছেড়ে এগিয়ে যায় দরজার কাছে দরজা খুলতে মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে কুলসুমের মা !
-আলো খান ল‌ইয়া যান বউরানী। এলাকার ট্রান্সমিটারে আগুন ধরছে। আইজ আর বিদ্যুৎ আইবো না ।
“-ছোট নবাব ফিরেছেন?”
কুলসুমের মা মোমবাতি ইফরাহর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
আহে নাই বউরানী এমনিতে ছোট নবাব মেলা রাই ক‌ইরা বাড়ি ফিরে। কোনো দিন তো ফিরেই না ! দোর টাইনাদিয়া শুইয়া যান বউরানী
কুলসুমের মা চলে যেতে নেয়তবে ইফরাহ থামিয়ে বলে

-ছোট নবাবের খাবারটা ঘরে দিয়া যান চাচি ,আজ আর নিচে যাব না।
কুলসুমের মা মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। মোমবাতি হাতে ঘরের মাঝে এসে দাঁড়ায় ইফরাহ। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতে থাকা মোমবাতি রাখে কাঠের ভ্যানিটির ওপর রাখে। ঘরে মৃদু আলো, মোমবাতির ভিতরের‌ সলতে জ্বলছে আশেপাশে হতে মোম গলছে। ইফরাহ দাঁড়িয়ে থেকে জ্বলন দেখে।
দমকা এক হাওয়ায় নড়ে ওঠে বেলকনির পর্দা। ঠিক তখনই ভারী কিছু পরার শব্দে চমকে ওঠে মেয়েটা। ঘাড়কাত করে উল্টো তাকাতেই এক অবয় নজরে আসে । ইফরাহ শুষ্ক ঢোক গিলে বলে –
-ক ..কে ?
অবয়টি ধীরে ধীরে আরো নিকটে আসছে। কিছুটা ভয় কেঁপে উঠে মেয়েটা ,কাঁপা গলায় আবার বলে
-কে ?

উত্তর আসে না আবারও মোম হাতে তুলে নেবে এমন সময় পেছনে হতে কেউ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেই তাকে বাঁধন ঠিক এতটাই তীব্র যেন শরীরের হাড় ভেঙে যাবার উপক্রম। ছটফট করে ইফরাহ ..!!
হাতে মোম মেঝেতে পড়ে নিভে গিয়েছে ! নিজেকে ছাড়াতে ছটফট শুরু করেতেই শীতল ঠোঁটের স্পর্শ লাগে তার পিঠের উন্মুক্ত অংশে, ঘৃণা রাগে চেঁচিয়ে ওঠে সে –
-কে আপনি ? কোন‌ সাহসে ছুইঁয়েছেন আমাকে !

ছায়াস্পর্শ পর্ব ২২

এবারেও উত্তর আসে না কোনো, ইফরাহ বেজায় বিরক্ত। মোচরামোচরি করে শক্তি খাটাতে থাকে সে। দ্বিতীয় বারের মতো অবয় নাক ঘোষে তার পিঠে। লম্বা শ্বাসে শুকে‌ নেয় শরীরের ঘ্রাণ ! ইফরাহ প্রতিরোধে করতে নিবে তাই আগেই তাকে ছেড়ে অবয় ছুটে বেড়িয়ে যায় ..!! মোমের আলো নিভেছে। অন্ধকারে গতি বিধি ঠিক জানা যায় না। এমন সময় ভেজানো দরজা খোট করে খুলে যায় ,ফোনে সাদা আলোয় আরাধ্যের মুখ নজরে আসতেই ভীত ইফরাহ ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে…!!

ছায়াস্পর্শ পর্ব ২৩ (২)