মোহশৃঙ্খল পর্ব ২০
মাহা আয়মাত
সকালের স্নিগ্ধ রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে নরম তুলোর মতো আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে রুমে। সেই আলোয় হালকা ঝাপসা একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। অর্তিহা তখনো গভীর ঘুমে। হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে পিয়ানো বাজানোর একটা নরম, মিষ্টি সুর। অর্তিহা আধো ঘুমে ভ্রু কুঁচকে উঠে বসে। চোখের সামনে অস্পষ্টভাবে একটা পুরুষের অবয়ব। পিঠ দিয়ে বসে পিয়ানো বাজাচ্ছে। আলোয় তার কাঁধ আর হাতের নড়াচড়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্তিহা একটু চমকে উঠে পুরো চোখ খুলে ফেলে। ওটা তো… আদ্রিক! আদ্রিক পিয়ানো বাজাচ্ছে? কিন্তু কিভাবে!
সে তো এক বছর আগে পিয়ানো পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিল। আর পিয়ানোটাও রুম থেকে সরিয়ে ফেলেছিল। আজ আবার রুমে এলো কোথা থেকে?কয়েক সেকেন্ড মাথায় প্রশ্ন ঘুরলেও কিন্তু সব হারিয়ে গেল সেই পিয়ানোর মুগ্ধ করা সুরে। অর্তিহা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। একসময় আদ্রিকের পিয়ানোর সুর শুনলে অর্তিহা আদ্রিকের রুমে আসতো। সেই সুর তার ভীষণ পছন্দ ছিল। অর্তিহা ধীরে ধীরে ওঠে বসে। অর্তিহা উঠেছে টের পেয়ে আদ্রিক পিয়ানো বাজানো থামিয়ে দাঁড়ায়। সে এগিয়ে এসে অর্তিহার সামনে বসে। আদ্রিকের চোখে নরম, গভীর উষ্ণতার ঝিলিক। সে আলতো করে অর্তিহার গালে হাত রেখে, কপালে একটা নরম চুমু দেয়।
আদ্রিক কোমল হেসে, আদুরে স্বরে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— গুড মর্নিং, লিটলহার্ট। হ্যাপি ফার্স্ট মর্নিং অ্যাজ মাই ওয়াইফ!
আদ্রিকের আকস্মিক চুমুতে অর্তিহা হকচকিয়ে যায়।
অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে পিয়ানোর দিকে তাকিয়ে বলে,
— রুমে পিয়ানো আসলো কখন?
আদ্রিক হেসে বলে,
— সকালেই আনিয়েছি! তোর তো আমার পিয়ানোর সুর শুনতে খুব ভালো লাগে। তাই ভাবলাম বিয়ের পরের প্রথম সকালটা পিয়ানোর সুরেই ঘুম ভাঙাই।
অর্তিহা অবাক হয়ে বলে,
— আপনি তো পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন?
— হুম। তোর জন্য।
— আমার জন্য? আমি কি করেছি?
— সেদিনের পর তুই আর পিয়ানো শুনতে আসবি না, এটা জানতাম। তাই আমিও আর বাজাইনি। ঠিক করেছিলাম, যেদিন তুই আবার মুগ্ধ হয়ে শুনবি সেদিনই বাজাবো।
অর্তিহা চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কয়েক মুহূর্ত পর আদ্রিক হেসে বলে,
— দেখতে আমাকে অনেক পারবি! এখন ফ্রেশ হয়ে নে। তারপর নিচে যাবো।
অর্তিহা উঠে দাঁড়ায়। আদ্রিকও উঠে দাঁড়ায়। অর্তিহা কাভার্ডের কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় হঠাৎ আদ্রিক তার হাত ধরে ফেলে। অর্তিহা থমকে তাকায়। আদ্রিক চোখের ইশারায় সোফার দিকে দেখায়। অর্তিহা আদ্রিকের ইশারা করা জায়গায় তাকায়। সোফায় গোলাপি আর সাদা রঙের মোলায়েম মিশ্রণের গাউন রাখা। পাশে হালকা গোলাপি দোপাট্টা।
অর্তিহা আদ্রিকের প্রশ্নকর দিকে তাকিয়ে বলে,
— এটা?
আদ্রিক অর্তিহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হেসে বলে,
— বিয়ের সেকেন্ড ডের গিফট! এখন এটা পড়বি।
অর্তিহা আদ্রিকের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে বলে,
— ঠিক আছে, এখন যেতে দিন?
আদ্রিক মাথা নেড়ে হাতটা ছাড়ে। অর্তিহা গাউন টা ওয়াশরুমে চলে যায়। আদ্রিক সময় কাটানোর জন্য ফোন স্ক্রোল করতে থাকে। প্রায় দশ মিনিট পর দরজার খোলার শব্দ শোনা যায়। আদ্রিক ঘুরে তাকায়, এবং তার চোখ অর্তিহার দিকে স্থির হয়ে যায়। অর্তিহার পড়নে সাদাসিধা গাউনটাতেও অর্তিহাকে অদ্ভুতভাবে সুন্দর লাগছে। ফর্সা ত্বকের সঙ্গে গাউনের রঙ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে। ঘুম থেকে ওঠায় মুখটা কিছুটা ফুলে আছে, যা তাকে আরও আদুরে দেখাচ্ছে। বার্গান্ডি রঙের চুলগুলো অর্ধেক মুখের ওপর এসে পড়ে। আদ্রিক এক মুহূর্তে শ্বাসই নিতে পারে না। মোহিত দৃষ্টিতে সে অর্তিহার দিকে তাকিয়ে থাকে। অর্তিহা সোফা থেকে দোপট্টা তুলে নিজের গায়ে দেয়।
আদ্রিক ধীর পায়ে এগিয়ে আসে এবং অর্তিহার সামনে দাড়ায়। অর্তিহা চোখ তুলে শান্তভাবে তার দিকে তাকায়। আদ্রিক তার তর্জনী আঙুল দিয়ে অর্তিহার থুতনির ঠিক নিচে স্পর্শ করে, নেশালো চোখে তাকিয়ে বাজখাই কণ্ঠে বলে,
— এতো মোহনীয় কেন তুই, অর্তি?
অর্তিহা ভিতু চোখে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
— কি…কিসব বল…বলছেন আপনি?
অর্তিহা ভিতু চোখ আর কাঁপা কাঁপা কথা শুনে আদ্রিক হেসে ওঠে। আর তার হাসিতে অর্তিহা বোকা বনে যায়। লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আদ্রিক হাসি থামিয়ে বলে,
— চল।
— কোথ…
অর্তিহা বাকিটা বলার আগেই আদ্রিক তাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে যায়। টুলে বসিয়ে দেয়।
অর্তিহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি করছেন আপনি?
— তোকে সাজিয়ে দিবো!
এই কথা বলে আদ্রিক মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। যাতে দুজন সমান উচ্চতায় আসে।
— আপনি সাজিয়ে দিবেন?
আদ্রিক হেসে বলে,
— হ্যা! বিয়ের পরের দিন আমার বউ কি সাজ ছাড়া থাকবে নাকি? আমার বউ সেজে লাল-গোলাপি হয়ে থাকবে। যাতে দেখলেই সবাই বুঝে, আমার বউটা নতুন বউ!
— ঠিক আছে। আমি সেজে নিচ্ছি। আপনি তো মেক-আপ করতে পারেন না!
— নো আমি পারি!
অর্তিহা অবাক হয়ে বলে,
— হুম?
আদ্রিক মুচকি হেসে বলে,
— আমি ইউটিউব থেকে অনেক গুলো মেক-আপ টিউটোরিয়াল দেখে শিখেছি! বিয়ের পর তোকে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য!
আদ্রিক অর্তিহাকে সাজাতে নিবে তখনি অর্তিহা আদ্রিকের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— সত্যিই সাজাতে পারবেন তো?
— দেখ জাস্ট। আর এমনিতেও আমার সামনে থাকা মারমেইড টাকে যেভাবেই সাজিয়ে দেই না কেন তার সৌন্দর্য কমবে না!
আদ্রিক অর্তিহাকে বসিয়ে সাজাতে শুরু করে। প্রথমে ফাউন্ডেশন, কন্সিলার, পাউডার সবকিছু মুখে লাগায়। গালে ব্লাশ, চোখে উপরে আইশেডো, চোখের পাপড়িতে মাসকারা আর আইলাইনার। অর্তিহা অবাক হয়ে যায়। আদ্রিকের দেওয়া সবকিছু একদম নিখুঁত, যেন সে কোনো প্রফেশনাল মেক-আপ আর্টিস্ট। শেষে আদ্রিক ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে সাজ কমপ্লিট করে। তারপর উঠে কাভার্ডের দিকে চলে যায়। অর্তিহা আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্যিই তাকে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। কেউ হয়তো বিশ্বাসই করবে না যে এটা আদ্রিকের হাতে হয়েছে। অর্তিহা মুগ্ধ হয়ে নিজেকে দেখছে। তখন আদ্রিক আসে, হাতে জুয়েলারি বক্স।
অর্তিহা ভ্রু কুচকে বলে,
— এটা আবার কি?
— গিফট।
জুয়েলারি বক্স খুলে দেখায়, তাতে ডায়মন্ডের নেকলেস আর কানের দুল।
— এতো গিফট কেন?
আদ্রিক আবার দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে, অর্তিহার থুতনির নিচে আঙুল রেখে নরম স্বরে বলে,
— জীবনে তোর দেখা পাওয়াটা আমার জন্য বিশাল একটা গিফট! আর এই খুশিতেই সেই গিফট কেই আমি প্রতিটা দিন প্রতিটা মুহুর্ত গিফট দিতে চাই!
অর্তিহা আদ্রিকের কথায় মুগ্ধ হয় না। বরং তার মধ্যে কোনো প্রভাবই হয় না। সে আদ্রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
— জানেন? কালকে সবাই আমার ভাগ্য নিয়ে, আমার রূপ নিয়ে প্রশংসা করছিলো!
আদ্রিক হেসে বলে,
— প্রশংসাটা করাটা যৌক্তিক! আমার অর্তিজানের রূপটাই প্রশংসাযোগ্য!
অর্তিহা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
— মানুষ তো বাহিরটা দেখে প্রশংসা করবেই! মানুষ তো আর জানে না, যত সুন্দর নকশিকাঁথা, তত সেলাই তার বুকে!
আদ্রিক গভীর চোখে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,
— তোর প্রতি আমার এই সীমাহীন চাওয়াটা তোর কাছে অভিশাপ মনে হলেও, অন্য কারও কাছে এটা স্বপ্নের মতো। তোকে আমি যেভাবে চাই, তার একটুখানি পাওয়ার জন্যও কত মেয়ে পাগলের মতো ছটফট করেছে।
অর্তিহা হালকা হেসে বলে,
— ভালো হয়েছে, এখন সামান্য ছটফট করেছে! পেয়ে গেলে আরো বেশি ছটফট করতো!
আদ্রিক কয়েক সেকেন্ড অর্তিহার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই অর্তিহার ঠোঁটজোড়া নিজের ঠোঁটজোড়ার সঙ্গে মিলিয়ে দখল করে নেয়। অর্তিহার মাথার পেছনে হাত দিয়ে চেপে চুমু খেতে থাকে। অর্তিহা ছটফট করতে থাকে, নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। এক মিনিট পর আদ্রিক ঠোঁট ছাড়ে। অর্তিহা জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে।
আদ্রিক বাঁকা হেসে বলে,
— এইভাবেই তো ছটফট করতো? যেভাবে এখন তুই ছটফট করেছিস আমার আদরে!
অর্তিহা থমকে রয়ে যায়। তাকিয়ে থাকে আদ্রিকের দিকে। প্রচণ্ড রাগে ইচ্ছে করে আদ্রিককে একটা থাপ্পড় মারতে। কিন্তু সে এটা করতে পারবে না তাই রাগে গাল ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আদ্রিক হেসে অর্তিহার থুতনি ধরে নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে,
— লিপস্টিক টা খেয়ে ফেলেছি! আবার দিতে হবে ঠোঁটে!
অর্তিহা ঝাঁজালো গলায় বলে,
— প্রয়োজন নেই! উঠালেন কেন?
আদ্রিক ঠোঁটের কোনে দুষ্টু হাসি টেনে টেবিল থেকে লিপস্টিক নিতে নিতে বলল,
— আমি কি ইচ্ছে করে উঠিয়েছি? আমি জানতে চাইছিলাম, ওরাও কি এভাবেই ছটফট করবে কিনা! যেভাবে তুই করছিলি!
অর্তিহা পাল্ট কিছু বলতে নিবে, তখনি আদ্রিক তার ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে শুরু করে। ঠোঁট নড়ালে নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে অর্তিহা আর কিছু বলে না। লিপস্টিক দেওয়া শেষ হলে অর্তিহা আবারও কথা বলতে চাইতেই আদ্রিক তাকে থামিয়ে বলে,
— রাব ইয়োর লিপস টুগেদার জেন্টলি।
অর্তিহা তার কথামতো উপরে-নিচে ঠোঁট দুটো ঘষে লিপস্টিকটা ঠিক করে নিল। কিন্তু এবার আর কিছু বলে না রাগে। কারণ আদ্রিক তাকে দুবার থামিয়ে দিয়েছে, কথা বলতে দেয়নি। আদ্রিক ওঠে দাড়িয়ে পেছনে গিয়ে অর্তিহার গলায় নেকলেসটা পড়িয়ে দেয়, কানে দুলও পরিয়ে দেয়। সব পরানো শেষে আয়নায় অর্তিহার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বলে,
— এখন লাগছে নতুন বউ! এক দেখায় যে কেউ বলে দেবে তুই আমার নতুন বউ!
অর্তিহা আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হয়। সত্যিই তাকে একদম নতুন বউয়ের মতো লাগছে! অবশ্য সে তো বউই! তাকে সুন্দরও লাগছে অনেক। অবশ্যই সেটা আদ্রিকের সাজানোর জন্য। অর্তিহা চোখ ঘুরিয়ে আয়নায় আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিকের গায়ে ক্রিম রঙের টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। অর্তিহা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— এখন নিচে যাই? অনেক ক্ষিদে পেয়েছে আমার!
আদ্রিক মাথা নেড়ে অর্তিহার পাশে এসে অর্তিহার কোমরে হাত রেখে জড়িয়ে বলে,
— হ্যাঁ, চল। নিশ্চয়ই আমাদের বেবিরও খুব ক্ষিদে পেয়েছে!
অর্তিহা তার কোমরে ধরে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
— এভাবে?
— হুম।
— সবাই কি ভাববে?
আদ্রিক শান্ত স্বরে বলে,
— স্বামী তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলে কেউ কিছু ভাববে না। বরং বিয়ের পরের দিন দুজনের মাঝে দূরত্ব দেখলে ঠিকই অন্যকিছু ভাববে!
অর্তিহা চুপ করে রয়। আদ্রিক আবার বলে,
— এখন চল।
ওরা হাঁটা ধরে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে ডাইনিং রুমে এসে পৌঁছায়। সেখানে ইতিমধ্যেই সবাই উপস্থিত—
মেহজা-আরভিদ, সামির-ফারিদ, আভীর-তাহিয়া কারদার, নাজনীন-আফির কারদার, মাসরিফ-আস্মিতা তালুকদার, মিষ্টি-হানিন, মিশান-কৌশালী। মেহজা গ্লাসে পানি ঢালছিলো তখনি তার চোখে পড়ে আদ্রিক আর অর্তিহা আসছে। আদ্রিক মেহজাকে দেখে তার মুখের হাসিটা চওড়া করে বাম হাত তুলে ইশারায় হাই বলে। মেহজা তা দেখে সাথে সাথে ভেংচি কেটে বিরক্ত মুখে অন্যদিকে তাকায়।
আদ্রিক অর্তিহাকে দেখিয়ে মিশান বলে,
— ঐ তো এসেছে নতুন বর-বউ।
সবাই তাকায় ওদের দিকে। নাজনীন কারদার উঠে এসে অর্তিহাকে দেখে বলেন,
— মাশাল্লাহ! অনেক অনেক সুন্দর লাগছে দুজনকে একসাথে! আল্লাহ যেন দুজনকে একে-অপরের জন্যই বানিয়েছে!
তাহিয়া কারদার হেসে একটু অবাক হয়ে বলেন,
— কিন্তু আমি তো শাড়ি পাঠিয়েছিলাম অর্তির জন্য! তাহলে এটা কোথা থেকে এলো?
আদ্রিক শান্তভাবে বলে,
— মিমি ওটা আছে। এটা আমি দিয়েছি।
কথাটা শোনামাত্র হানিন ভ্রু কুচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
— কিন্তু বিয়ে তো আপনার সাথে হঠাৎ হয়েছে! তাহলে আপনি কখন কিনলেন এটা? নাকি আপনি জানতে…
আদ্রিক হানিনকে থামিয়ে ঠোঁটের কোণে স্বভাবগত হাসিটা টেনে বলে,
— বিয়েটা হঠাৎ হয়েছে, বাট বিয়ে তো করতাম! ড্রেসটা শপিং মলে পছন্দ হয়েছিলো, তাই বউয়ের কথা ভেবে কিনেছিলাম! ক্লিয়ার, সালি?
তারপর একটু থেমে আবার বলে,
— সাহেবা?
হানিন কিছুই বলে না। নাজনীন কারদার হেসে বলেন,
— খুব ভালো করেছো! এভাবেই ভালোবাসবে, যত্ন করবে! জানি হঠাৎ বিয়ে, মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। কিন্তু দিন শেষে আগলে রাখবে।
আদ্রিক হেসে অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— অলওয়েজ!
আভীর কারদার বলেন,
— এসো তোমরা! সবাই খাওয়া শুরু করি!
আদ্রিক অর্তিহাকে নিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসায়, তারপর নিজেও বসে পড়ে। তার বাম পাশে ফারিদ, তার পাশে সামির, মাসরিফ তালুকদার, আস্মিতা তালুকদার আর মিশান। সামনে ঠিক মুখোমুখি হানিন। হানিনের দুই পাশে মিষ্টি আর মেহজা। মেহজার ডানে আরভিদ, তারপর নাজনীন, তাহিয়া কারদার আর কৌশলী। টেবিলের দুই প্রান্তে আভীর কারদার ও আফির কারদার। আদ্রিকের নজর প্রথমে যায় মেহজার দিকে। মেহজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারপর সে চোখ সরিয়ে হানিনের দিকে তাকায়। হানিনও চোখ কিছুটা তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। আদ্রিক ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি টেনে দুজনের দৃষ্টি এড়িয়ে অর্তিহার দিকে তাকায়। অর্তিহাকে প্রশ্ন করে,
— কি খাবি?
অর্তিহা টেবিলে সাজানো নানান খাবারের দিকে তাকায়। একদিকে বাঙালি নাস্তা—পরোটা, খাসির মাংস, গরুর মাংস, কলিজা ভুনা। অন্যদিকে এব্রোগেটো, প্যান কেক, বাটার টোস্টসহ আরও অনেক কিছু।
অর্তিহা আস্তে বলে,
— প্যান কেক।
আদ্রিক প্যান কেক তুলে তাতে মধু ঢেলে ডান হাতে নাইফ আর বাম হাতে কাঁটা চামচ ধরে টুকরো করে অর্তিহার মুখের সামনে ধরে। অর্তিহা লজ্জা ও অস্বস্তিতে বলে,
— আমি খেতে পারবো! আপনার এমন করতে হবে না!
আদ্রিক হেসে বলে,
— জানি তোর হাত আছে, আর তুই নিজেই খেতে পারবি। কিন্তু আমার ইচ্ছে, আমি আমার বউকে খাইয়ে দেবো।
অর্তিহা বাধ্য হয়ে মুখে তুলে নেয়। আদ্রিক তাকে খাইয়ে যেতে থাকে।
অর্তিহাকে খাইয়ে দেওয়ার মাঝেই আদ্রিকের কানে ফারিদ একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
— তোদের দুই বেডার বউদের এভাবে খাইয়ে দেওয়া দেখে আমারও আমার ত্রিশাকে খাইয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
ফারিদের কথা শুনে আদ্রিক সামনে তাকিয়ে দেখে, আরভিদ ঠিক বাচ্চাদের মতো করে মেহজাকে খাইয়ে দিচ্ছে। ডান হাতে পরোটা ছিঁড়ে মাংস দিয়ে মুখে দিচ্ছে, বাম হাতে পানির গ্লাস ধরা। মেহজা একটু পরোটা খায়, একটু পানি খায়।
আরভিদ আবার পরোটা দিতে গেলে মেহজা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— আলু দিন না!
আরভিদ পরোটার ভিতর আলু দিয়ে ওকে খাওয়ায়। সামনে বসে থাকা মাসরিফ তালুকদার হাসলেন। মেহজাকে ছোট থেকে তিনিই খাইয়ে দিতেন। মেহজা কখনো নিজের হাতে খেতে চাইত না। তখন আস্মিতা প্রায়ই বলতেন, মেয়েকে এভাবে খাইয়ে অভ্যাস করাচ্ছেন, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কে খাওয়াবে? তিনিও চিন্তা করতেন, শ্বশুরবাড়িতে কি এমন যত্ন পাবে?
কিন্তু এখানে এসেছেন পর থেকে দেখছেন, আরভিদ ঠিক সেইভাবে, একই মায়ায় মেহজাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মাসরিফ মনে মনে ভাবলেন, মেয়েটা সত্যিই ভাগ্যবতী।
খাওয়া শেষ হলে সবাই লিভিং রুমে আড্ডা দিতে জড়ো হলো। কিন্তু মেহজা লিভিং রুমে না বসে সোজা উপরে সিঁড়ি বেয়ে উঠার জন্য পা বাড়াবে, তখনি আদ্রিক ডাক দেয়,
— ভাবি?
মেহজা থেমে ঘুরে বিরক্ত কন্ঠে বলে,
— কি?
আদ্রিক প্রশ্ন করে,
— আপনার শরীর বুঝি এখনো খারাপ?
মেহজা বিরক্ত মুখে উত্তর দেয়,
— না, ভালো হয়েছে!
আদ্রিক এবার ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে বলে,
— তাহলে বিয়েবাড়িতে মুখটা এমন বাংলার পাঁচ করে রেখেছেন কেন?
মেহজা আদ্রিকের কথায় জ্বলে ওঠে রাগে। ভেংচি মেরে বলে,
— বিয়েবাড়ি দেখে এখন কি ধেই ধেই করে নাচবো!
তখনি কৌশালী খোঁচা মেরে বলে,
— সেই কাজ ভুলেও করো না! নাহলে আঙ্কেল আবার গালি দিবে, চড় মারতে চাইবে!
মেহজা রাগে কৌশালীর দিকে এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে তর্জনী উঁচিয়ে বলে,
— নিজের মুখ সামলা দেশী সান্ডা, নয়তো আপাতত তোকেই আমি চারটা লাগাবো!
কৌশালীও রেগে পাল্টা উত্তর দিতে যাবে, তখনি আরভিদ এসে দাঁড়ায়। আরভিদের তীক্ষ্ণ চোখজোড়া নিজের উপর দেখে কৌশালী চুপ হয়ে যায়।
সামির মুচকি হেসে মনে মনে ভাবতে থাকে,
— মেয়েটা সত্যিই অন্যরকম! তেজী, ত্যাড়া, দুষ্ট, আবার আদুরেও…
আদুরে ভাবতেই আবার হেসে ফেলে। মেহজা ঘুরে চলে যেতে নিবে তখনি অর্তিহা ডাকে,
— মেহু? চলে যাচ্ছিস কেন?
মেহজা অর্তিহার দিকে তাকায় না। ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এখানে থাকার ইচ্ছে নেই!
অর্তিহা চিন্তিত কন্ঠে বলে,
— তুই কি কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছিস?
মেহজা এবার অর্তিহার দিকে তাকিয়ে কিছুটা নরম হয়ে মাথা নেড়ে বলে,
— না! তোর উপর রাগ করবো কেন? আমি তোর উপর রেগে নেই।
মিশান বলে,
— তাহলে বসো না আপু! কালকেও তুমি আমাদের সাথে বসে আড্ডা দাওনি!
আরভিদ মেহজার হাত ধরে। মেহজা তাকাতেই সে বলে,
— এত করে যখন সবাই বসতে বলছে, বস!
মেহজা রাজি হয়ে বসে যায়। অর্তিহার গলার নেকলেস দেখে মিষ্টি বলে,
— অর্তি, তোর পড়া নেকলেসটা অনেক সুন্দর! দারুণ মানিয়েছে তোকে।
হানিন উঠে অর্তিহার কাছে এসে বলে,
— নেকলেসটা মানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গলায় থাকা পেন্ডেন্টটার কারণে তেমন ভালো লাগছে না। পেন্ডেন্টটা খুলে ফেল। নেকলেসটা খালি গলায়ই ভালো লাগবে।
অর্তিহা তাকায় আদ্রিকের দিকে। এই পেন্ডেন্টটা আদ্রিকই তাকে দিয়েছিলো জোর করে বিয়ে করার দুই দিন পর, বিয়ের গিফট বলে। তখন অর্তিহা পড়বে না বললে নিজে পরিয়ে দিয়েছিলো। সাথে কড়া করে হুমকি দিয়েছিলো পেন্ডেন্ট না খুলতে। সেই ভয়েই আর কখনো খুলেনি। আদ্রিক স্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে আছে হানিনের দিকে।
হানিন অর্তিহাকে আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেই নেকলেস টা খুলার হাত বাড়িয়ে বলে,
— ঠিক আছে, আমি খুলে দিচ্ছি…
আর বলতে পারে না! আদ্রিক হাত বাড়িয়ে অর্তিহার বুকের সামনে ঠেকিয়ে থামিয়ে দেয়। হানিন তাকায়। হানিন আর আদ্রিক দুজনের চোখজোড়াই তীক্ষ্ণ হয়ে আছে। পরমুহূর্তেই আদ্রিক ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে বলে,
— এটা খুলার প্রয়োজন নেই। এটা অর্তিকে পরিয়েছি জীবনে না খুলার জন্য!
হানিন বলে,
— কিন্তু এটার কারণে নেকলেসটা তেমন মানাচ্ছে না! এখন খুলে ফেলুক, পরে আবার পরে নেবে!
আদ্রিক বলে,
— কোনো প্রয়োজন নেই! অর্তির সাজ আমার জন্যই। আর আমার কাছে ভালো লাগছে এভাবেই। অন্য কারো ভালো লাগা-না লাগায় কিছু যায় আসে না।
হানিন অপমানিত বোধ করলেও আবার প্রশ্ন করে,
— কি উপলক্ষে দিয়েছিলেন?
আদ্রিক শান্ত স্বরে বলে,
— আমার অর্তিকে গিফট দিতে কোনো কারণ আগে লাগতো না, এখন লাগে না, ভবিষ্যতেও লাগবে না।
মিষ্টি হানিনকে বলে,
— হয়েছে হানিন, ছাড় তো! এদিকে এসে বস। একটা পেন্ডেন্ট নিয়ে এতকিছু কেন করছিস?
হানিন এসে আবার আগের জায়গায় বসে। মিশান উঠে সেখান থেকে চলে যায়, আবার কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে হাতে বিয়ের ঐতিহ্যগত আয়না নিয়ে, যেটাতে বর-কনে মুখ দেখে।
মিশান বলে,
— কালকে এই নিয়মটা করাই হয়নি!
মিষ্টি ও সায় দেয় মিশানের কথায়,
— হ্যাঁ, আমিও ভাবছিলাম বিয়েটা হঠাৎ করে হওয়ায় কিছুই হয়নি তেমন!
মেহজা মুখে হাসি টেনে বলে,
— কিন্তু আদ্রিক ভাই তো আগে থেকেই বর সেজে বসেছিলেন!
আদ্রিক ভালোই বুঝতে পারে মেহজা তাকে খোঁচা মারছে। সেও পাল্টা হেসে বলে,
— হ্যাঁ, সেজে বসেছিলাম, নজরে কোনো মেয়ে পড়লে, পছন্দ হলে বিয়ে করবো বলে!
মেহজা বলে,
— আপনার নজর দেখছি খুব খারাপ, সোজা কনেকেই পছন্দ করে ফেলেছেন!
আদ্রিক অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— দোষটা কনের আমার না। তাকে কে বলেছে এতো সুন্দর হতে?
মেহজা বলে,
— কিন্তু কনে তো আপনাকে বলেনি আপনার নীল নীল চোখ দিয়ে তার ওপর কু-নজর দিতে!
আদ্রিক আগের মতোই হেসে বলে,
— যাক, কু-নজর দিয়েও তো বিয়ে করলাম! কিন্তু তোমার সাইহান ভাই তো সু-নজর দিয়েও ভেগে গেলো!
মেহজা রেগে কিছু বলতে যাবে, আরভিদ তার হাত চেপে থামিয়ে দেয়। মেহজা তাকিয়ে আবার চুপ হয়ে যায়।
মিশান বলে,
— হয়েছে, ছাড়ো তো! আমরা এখন নিয়মটা পালন করি!
মিষ্টি, সামির আর ফারিদ উঠে এসে দাঁড়ায় আদ্রিক ও অর্তিহার পাশে। মিশান একটা দোপাট্টা দুজনের মাথার ওপর ধরে আয়না তুলে ধরে ওদের সামনে। আয়নায় তাকিয়ে আদ্রিক অপলক দৃষ্টিতে অর্তিহা দেখছে। অর্তিহা লজ্জায় চোখ নিচু করে রেখেছে।
মিশান অর্তিহাকে জিজ্ঞেস করে,
— আয়নায় কি দেখছো আপু?
ধীরে ধীরে অর্তিহা মাথা তুলে আয়নায় তাকায়। দেখে আদ্রিককে, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
অর্তিহা নরম স্বরে বলে,
— উনাকেই তো দেখছি!
মিশান নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
— ছি! কী আনরোমান্টিক কথা-বার্তা!
এ কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। এরপর মিশান আদ্রিককে উদ্দেশ করে বলে,
— দেখেছো ভাইয়া তোমার কপাল! বলতে পারতো, আমার চাঁদকে দেখছি, আমার পৃথিবীকে দেখছি! কিন্তু এসব কিছু না করে বলে কিনা উনাকে দেখছি! একদম আনরোমান্টিক! লজ্জার ব্যাপার! লজ্জার ব্যাপার!
আদ্রিক হেসে সরাসরি অর্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
— সমস্যা নেই! আমি রোমান্টিক আছি তো! হয়ে যাবে!
ফারিদ এবার আদ্রিককে প্রশ্ন করে,
— আয়নায় কি দেখছিস আদ্রিক?
আদ্রিক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,
— আমার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন, আমার বেবিডলকে!
আদ্রিকের কথায় সবাই হেসে ওঠে একমাত্র মেহজা ছাড়া। মেহজা ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
— আপনার একমাত্র স্বপ্নের জীবনে আপনি দুঃস্বপ্ন!
সবাই ভ্রু কুঁচকে মেহজার দিকে তাকায়। তা দেখে মেহজা হেসে কথা ঘুরিয়ে বলে,
— বিয়েটা যেমন করে হয়েছে, সেটা তো দুঃস্বপ্নের মতোই!
মিশান হেসে বলে,
— সে যেমন করেই হোক না কেন! অর্তি আপু পেয়েছে তো বেস্ট পেয়েছে! আদ্রিক ভাইয়াকে পেয়েছে!
মেহজা মিশানের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলে,
— তুই জানিস বেস্ট পেয়েছে কিনা?
— হ্যা জানি। আদ্রিক ভাইয়া কত ভালো।
মেহজা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকায়। তার রাগ লাগছে। ইচ্ছে করছে দু চারটা থাপ্পড় মারতে মিশানকে। এসব মাঝেই মেহজার কাশি ওঠে। আরভিদ তার পিঠে হাত বুলিয়ে কাশি থামানোর চেষ্টা করে। কাশি থামলেও মেহজার পানি খেতে ইচ্ছে করে। আরভিদ সেটা বুঝে পানি আনতে উঠতেই মেহজা থামিয়ে দেয়,
— বসেন! আমি খেয়ে আসছি। আপনি বসেন।
মেহজা ডাইনিং রুমে যেতেই দেখে, তাহিয়া কারদার ও নাজনীন কারদার কথা বলছে। সে গ্লাসে পানি ঢেলে খেতে খেতে শুনে নাজনীন বলছেন,
— আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম, যদি আদ্রিক অর্তিকে না মানে। যদিও না মানার তো কোনো কারণই নেই। তবুও ভয় ছিল, যদি অন্য কারোর প্রতি পছন্দ থাকে! যতই হোক, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায় আমার ছেলে।
মেহজা গ্লাস নামিয়ে টেবিলে রেখে হেসে বলে,
— দেশ-বিদেশে ঘুরেই আপনাকে দাদি বানিয়ে দিয়েছে।
নাজনীন ও তাহিয়া দুজনই অবাক হয়ে যান। তাহিয়া জিজ্ঞেস করেন,
মোহশৃঙ্খল পর্ব ১৯ (২)
— মানে?
নাজনীনও বলেন,
— কে দাদি হয়ে গেছে?
মেহজা মুচকি হেসে বলে,
— হয়েছে না, হয়ে যাবেন! শীঘ্রই! ছেলে বিয়ে দিয়েছেন, দাদি তো হবেনই!
