Home The Silent Manor The Silent Manor part 41

The Silent Manor part 41

The Silent Manor part 41
Dayna Imrose lucky

রাত আটটার দিকে আলিমনগর তাঁতশালায় উপস্থিত হয় আহির।তাঁতশালার গুদামঘরটাতে বসে আছে একটি পুরানো চেয়ারের উপর।রাফিদ তাঁদের ব্যবসা সম্পর্কে এটা-ওটা বলছে। কিভাবে আজকের তাঁতশালা স্থাপিত হয়ে শতশত মানুষের রোজকার এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সে গল্প শোনাচ্ছে।মীর ঘুরেঘুরে মিলন খু’নের স্থানটি দেখছে।আহির এর আপাতত কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মিলন। গোয়েন্দা, পুলিশের মন সন্দেহে ভরা। কোথাও তালুকদার বংশের সাথে মিলনের সম্পর্ক আছে বলে ভাবছে। ধারণা করছে।তবে নিশ্চিত নয়।

ঠিক ঘন্টা কয়েক আগে তালুকদার বংশের পতনের ঘটনা জানে বলে একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এসেছিল।নাম জানা যায়, মকবুল হোসেন।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উনি কিছু জেনেও বলতে পারেননি। লোকটির শারীরিক অবস্থা হঠাৎ খা’রাপ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিল ওনার নাতি। এরপর ওনাকে নিয়ে যায়।আহির ওনার নাতির থেকে বাড়ির ঠিকানা রেখে দেয়। মকবুল হোসেন আগে সুস্থ হোক। এরপর ওনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
আহির রাফিদ কে জিজ্ঞেস করল “মিলনের কোন শ’ত্রু আছে?এখন পর্যন্ত যাদের জিজ্ঞেস করেছি সবাই বলেছে নেই। কখনো কারো সাথে ঝগড়াঝাঁটি অবধি করতে দেখেনি। কিন্তু, উদ্দেশ্যে ছাড়া কেউ কাউকে কখনো খু’ন করতে পারে না।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাফিদ একবার মীরের দিকে তাকাল। দ্বিতীয়বার আহির এর দিকে তাকিয়ে বলল “উদ্দেশ্যে নিশ্চয়ই ছিল।তোর সাথে আমিও একমত।কিন্তু, আমার জানামতে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না,যে মিলন কে খু’ন করতে পারে।”
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে খু’নি আমাদের আশেপাশের কেউ।আর সে আমাদের উপর নজর রাখছে।”
“তোর মনে হচ্ছে,অথচ তুই নিশ্চিত না।” বলল মীর। আবার বলল “আমার মনে হচ্ছে মিলনের থেকেও বেশি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির ব্যাপারে ভাবা উচিত। তালুকদার বংশের পতনের মূল কারণ খুঁজে বের করা উচিত।”
“তুই মিলন কে তুচ্ছ ভাবে নিচ্ছিস কেন?ও যদি আজ আমাদের আপন কেউ হত,তবে কি ওঁর বিষয়টি এভাবে অবহেলা করতিস?” আহির যেন নিজেকে সহ মীরকেও প্রশ্ন করল।
মীর আহির এর দিকে এগিয়ে গেল। “আমি ওকে মোটেই তুচ্ছ ভাবছি না,কেউ অপরাধী না হলে তাঁকে বিনা দোষে কেউ খু’ন করে না। নিশ্চয়ই ও কোন না কোন কারণে অপরাধী ছিল।”

“হয়ত ও অপরাধী ছিল,নয়ত কোন অপরাধীর নিকৃ’ষ্টতম কান্ডকারখানা দেখে ফেলাতে, আসল অপরাধী প্রমাণ সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমার হাত থেকে রেহাই পাবে না।” আহির এর দৃষ্টি কঠিন।
রাফিদ বলল “এরকম একটা অপরাধ শেষমেষ আমাদের কারখানাতে ঘটল!” রাফিদ অসন্তোষ প্রকাশ করল। এরপর দু হাত কোমরে রেখে গুদামঘরটার চারপাশে তাকাল।
মীর সুফিয়ান এবং ফারদিনার বিষয়ে ভাবতে ভাবতে অচেনা সে-ই অশ্বধারী লোকটির কথা মনে পড়ল।সে বলেছে যতক্ষণ না, তাঁরা ফিরবে ততক্ষণ সে দিঘীর পাড়ে বসে থাকবে। লোকটি না খেয়ে দেয়ে বসে আছে।আজ শীত পড়ছে প্রচুর। বাইরে ইতিমধ্যে বেশ কুয়াশা জমেছে।লোকটির নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে।মীর তাঁর কথা ভেবে বলল “তোদের কি সে-ই অচেনা অশ্বধারীকে মনে আছে,উনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।উনি নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।চল,বাড়ি ফিরে যাই।”

রাফিদ ও আহির একে অপরের সাথে চাওয়াচাওয়ি করল।মীর এর রেশ টেনে আহির বলল “ফিরে যাব, তাঁর আগে গুদামঘরটির আশেপাশে দেখতে চাই।খু’নি কিছু ফেলে রেখে গেলেও যেতে পারে।কারণ,কেউ যখন কাউকে খু’ন করে তখন তাঁর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এলোমেলো হয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করতে থাকে সে কখন পালাবে।আর এমনটির কারণে খু’নি কিছু না কিছু ফেলে যায়।এই ঘরটি থেকে আমি একটা রুপোর খন্ড পেয়েছি।জানি না সেটি কিসের!”

রাফিদ বলল “অন্ধকারে কিছুই দেখা যাবে না।তোরা অপেক্ষা কর,আমি দপ্তরঘর থেকে টর্চ নিয়ে আসছি।” বলে রাফিদ দপ্তরঘর এর দিকে চলে যায়। দপ্তরঘরের ড্রয়ারে রাখা ধাতব বডির টর্চ রাখা। আমজাদ থাইল্যান্ড থেকে বেশ কয়েকটি টর্চ নিয়ে এসেছিল।রাফিদ তিনটি টর্চ হাতে তুলে নিল।ওজন প্রায়ই পাঁচশ থেকে সাতশ গ্রাম এর মত।পুরোটাই ধাতব।গতকালই টর্চ গুলো কারখানায় আনা হয়েছে।আগের থেকে কয়েকজন পাহারাদার বাড়িয়েছে। তাঁদের কখন দরকার হয় সে-ই ভেবে অতিরিক্ত রেখেছিল।

তিনজন গুদামঘরের তিনদিকে গেল।পুব, পশ্চিম, দক্ষিণ।আহির বেশ মনোযোগ সহকারে টর্চের আলোর সাহায্যে ঘাস সরিয়ে মাটি অবধি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। কিছু ঘাস এমন মনে হচ্ছে শিগগিরই কেউ এর উপর থেকে হেঁটে গেছে।অথচ এদিকে কারো আসার দরকার হয় না।আহির ধারণা করল নিশ্চয়ই কেউ এতক্ষণ তাঁদের কথা আড়ি পেতে শুনছিল। এদিকে কেউ আসে কিনা নিশ্চিত হতে, রাফিদ এর দিকে তাকিয়ে আহির সরু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল “রাফিদ, গুদামঘর এর এদিকে কেউ আসে?বা আসার সম্ভাবনা আছে?
রাফিদ চেঁচিয়ে জবাব দিল “না। ওদিকে ঘাস ব্যতীত কিছুই নেই।পেছন দিকে কে যাবে!”
আহির নিশ্চিত হল।আড়ি পেতে কেউ শুনছিল তাঁদের কথোপকথন।তিন চার ইঞ্চি পরপর ঘাস হেলে পড়া।আহির হাসল। একাকী বলল “তুমি বড় চালাক খু’নি।”

মিনিট পনেরো পর,আহির পেছন দিকটা থেকে ফিরে আসছিল।কিছু পেল না বলে মেজাজ খানিকটা বিগড়ে গেল। অন্যদিকে তালুকদার বংশের খোঁজ পেয়েও পায়নি।সেটা ভেবেও আপাতত নিজেকে ব্যর্থ মনে হল। টর্চের আলো এলোমেলো করে ফেলতে ফেলতে সামনে এগোতেই মনে হল পেছনের দিকে কিছু একটা চিকচিক করে উঠল।আহির থমকে দাঁড়াল।দু পা পেছনে ফেলল।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার করে দেখার চেষ্টা করল চিকচিক করা বস্তুটি।আহির হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল।ঘাস সরিয়ে দেখল মাটির ভেতরে কিছু একটা বিদ্ধ হয়ে আছে।সিলভার রঙের। হাত দিয়ে মাটি সরিয়ে বিদ্ধ থাকা থেকে তুলল বস্তুটি।রুপোর ছু’রি।বেশ কিছুদিন হয় মাটিতে ছু’রিটি বিদ্ধ হয়ে আছে বলে আহির ধারণা করল।সে অবাক হল, রুপোর ছু’রি দেখে। র’ক্তের হালকা প্রলেপ দেখা যাচ্ছে। শুকিয়ে গেছে র’ক্ত।ছু’রির একপিঠে ইংরেজি কিছু শব্দ লেখা। আপাতত বোঝা যাচ্ছে না। খুশি হল আহির।যে ছু’রি দিয়ে খু’ন করা হয়েছে সে ছু’রি পেয়েছে,আর কি দরকার? এবার যেন আহির এর তদন্ত আরো সহজ হয়ে গেল।খু’নি যেই হোক,সে প্রতাপশালী বলে ধারণা করল আহির।
আহির মীর এবং রাফিদ এর নিকট আসল। তাঁরা দাঁড়িয়ে আছে কারখানার সামনে। মীর আহির এর হাত থেকে ছু’রিটা নিতে চাইল।আহির বাঁধা দিয়ে বলল “হাত দিস না।ধারাল।তবে খু’নি যেই হোক তাঁর প্রচুর টাকা পয়সা আছে বলে আমি নিশ্চিত।”

রাফিদ বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলল “কিন্তু যার টাকা পয়সা আছে তাঁর সাথে মিলনের সম্পর্ক কি?”
“সেটাই আমাকে খুঁজে বের করতে হবে।আর আমি শিগগিরই শনা’ক্ত করে ফেলব খু’নিকে।”
“তুই আগে কোন কাজটি করবি?মিলন হ’ত্যার তদ’ন্ত নাকি, সুফিয়ান এবং ফারদিনার খোঁজ?” প্রশ্নটি ভ্রু কুঞ্ছিত করে করল মীর।
আহির হতাশ ভঙ্গিতে বলল “মকবুল চাঁচা আগে সুস্থ হোক, ওনাকে চাপ দিয়ে তো কিছু জানতে পারব না,লোকটি তখন আমাদের প্রশ্ন শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। বেশি বিরক্ত করা যাবে না তাঁকে।”
রাফিদ বলল “উনিই একমাত্র ব্যক্তি নয় যে, সেই তালুকদার বংশের ঘটনা বলতে পারবে,খুঁজে দেখলে এরকম আরো বৃদ্ধ, বৃদ্ধা দের খুঁজে পাব, যাঁরা আমাদের সমস্ত ঘটনা বলতে পারবে।” আহির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চিন্তিত চোখে বলল “ঠিকই বলেছিস, তাঁর অপেক্ষায় থাকলে হবে না।আমরা অন্য কাউকে খুঁজব। তবে এই রাতে আর কাউকে বিরক্ত করব না।চল বাড়ি ফিরে যাই।” বলে আহির ছু’রিটির দিকে একবার তাকাল। সাথে রাফিদ মীর ও দেখল। এরপর তিনজন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

বাড়ি ফেরার পথে গৌরীর দেখা পেল আহির। লন্ঠন হাতে চৌধুরী বাড়ি থেকে ফিরছে সে। অশ্বের লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে পড়ল আহির।মীর বলল “দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?
“তোরা সেই অশ্বধারীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা।আমি আসছি।”
মীর চাপা স্বরে হাসল।বলল “নিশ্চয়ই প্রেমের গোয়েন্দাগিরি শুরু করবি। চালিয়ে যা।”
রাফিদ বলল “মীর তুই দিঘীর পাড় থেকে অশ্বধারীকে নিয়ে যা। আমার একটা কাজ আছে,বলে সে কোথাও চলে যায়।”

মীর ভাবলেশহীন ভাবে মাথা চুলকিয়ে বলল “সবারই গুরুত্বপূর্ণ কাজ, শুধু আমিই বেকার।”
আহির অশ্ব থেকে নেমে গৌরীর পথ রোধ করে দাঁড়াল। হঠাৎ কারো আগমনে গৌরী আঁতকে উঠল। গৌরী এতক্ষণ তাঁদের খেয়াল করেনি। লন্ঠন এর আলোয় ব্রাউন রঙের দুটো ছলছল চোখ ঠিক গৌরীর দিকেই চেয়ে আছে। অন্যদিকে আহির তাকিয়ে আছে গৌরীর দিকে।গৌরী চাদরটা শক্ত করে ধরে শ্বাস ফেলল জোরে জোরে।চোখ দুটো এলোমেলো।আহির বলল “ভয় নেই। আমি অন্য হিং’স্র পুরুষদের মত নই।”
গৌরী কিছু না বলে পাশ কেটে যেতে চাইল।আহির অশ্বের লাগাম ধরে গৌরীর পাশে হাঁটতে লাগল। গৌরী হঠাৎ করে পা চালিয়ে দ্রুত যেতে চাইল।আহির ধব করে উঠে গৌরীর হাতটা ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। মুহুর্তেই আবার হাতটা ছেড়ে বলল “ক্ষমা করো মেয়ে, কিন্তু তুমি পালাচ্ছ কেন?
গৌরী কাঁপা কাঁপা গলায় বলল “পথ ছাড়ুন।”

“অদ্ভুত!আমিত তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে। তুমি আমার সামনে।আর আমাকে পথ ছাড়তে বলছো!” বলে মুগ্ধকর হাঁসি দিল আহির। গৌরী লুকিয়ে আহির এর হাঁসি দেখল। অসম্ভব সুন্দর হাঁসি। ঘোমটার আড়ালে সেও হাসল।তাঁর হাঁসি আহির দেখেনি।আহির গৌরীর সামনে গেল। গৌরী আশেপাশে তাকাল।বলল “লোকে দেখলে দুর্নাম হবে। চলে যান এখান থেকে।”
আহির বলল “দুর্নামের ভয় না থাকলে তোমার চোখে ইজ্জতের মূল্য ফুটে উঠত না। দুর্নামের অনেক কদর। কখনো কখনো সুফল নিয়ে আসে।”
“ভালো কথা জানেন।”
“ভালোবাসতেও জানি।”

“মানে? গৌরী যেন এবার গোলক ধাঁধায় পড়ল। শরীরের নড়চড় অস্থির হল। ইচ্ছে করছে এখুনি ছুটে এখান থেকে চলে যেতে।পারছে না।কি কারণে দাঁড়িয়ে আছে,নিজেও জানে না।
আহির মাথা থেকে হ্যাট খুলে বলল “দেখেছো,রাতেও মাথায় হ্যাট পড়ে রেখেছি,কতটা বোকা আমি।”
গৌরী সঠিক উত্তর পেল না। কিন্তু আহির নিজেকে নিজে বোকা বলায় হেঁসে ফেলল।আহির সে হাঁসি দেখতে পেল।টান গলায় মৃদু সুরে বলল “হায়..কি মিষ্টি হাঁসি তোমার,যেন অন্ধকার রাতে তারার ঝিলিক। এভাবে অন্য কারো সামনে হেসো না মেয়ে, নির্ঘাত সে তোমার হাঁসির সাগরে তলিয়ে যাবে।”
গৌরী বলল “হ্যাট খুললেন কেন,ওটা আপনার মাথায় থাকলে গোয়েন্দা গোয়েন্দা একটা ভাব আসে। সুন্দর দেখায়”গৌরী যেন মুখ ফসকে শেষ দুটো কথা বলে ফেলেছে।
আহির বলল “তুমি বলেছো মানে,হ্যাট মাথায় আমাকে সুন্দর দেখায়। শুধু কি হ্যাট এর জন্যই আমাকে সুন্দর দেখায়?”

গৌরী আর কিছু বলতে চাইল না। পুনরায় চলে যেতে চাইল।পা সামনে দিতেই আহির বলল “একা যেও না, এগিয়ে দিয়ে আসি, যদি আপত্তি না থাকে?”
“অনুমতি ছাড়াই তো পথ আটকালেন”
“তুমি অনেক কথা জানো।”
আহির হাঁটল গৌরীর বা পাশে।অশ্বটি তার বা পাশে ধীর পায়ে হাঁটছে।আর ডান দিকে গৌরী।আহির অশ্বটির দিকে তাকিয়ে বলল “দেখেছিস,আমি আস্ত একটা চাঁদের পাশে হাঁটছি।” অশ্বটি হ্রেষাধ্বনি তুলল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে বাড়ির সামনে পৌঁছে যায় তাঁরা। গৌরী দাঁড়িয়ে পড়ল।
আহির দ্বিধা নিয়ে বলল “চলে যাবে ?

“যেতে তো হবেই। আপনি এখন চলে যান।মা দেখে ফেলবেন।”
“নিজের বাড়ি বলে তাড়িয়ে দিচ্ছ। অন্তত একবার চা এর দাওয়াত দিতে পারতে। তুমি ভীষণ কিপটে।”
এই কথার জবাবে গৌরীর কি বলা উচিত ঠিক বুঝতে পারছে না। একবার ঘরের দিকে তাকাল। রহিমা বেগম বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছু করছে। এরপর আহির এর দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়ে বলল “চলুন।”
আহির খুশি হল।মনে মনে নিজেকে নির্লজ্জ দাবি করল।চা খাওয়াটা বাহানা মাত্র।আসল উদ্দেশ্য গৌরীর সাথে আর কিছুক্ষণ সময় কাটানো। রহিমা বেগম দেখলেন গৌরী কে। এরপর চোখ পড়ে অশ্বের দিকে।অশ্ব ছেড়ে আহির কে দেখল। হেঁটে উঠোনে নামল। আগের থেকে তাঁর শরীর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গৌরী তাঁর সন্নিকটে আসলে নিচু স্বরে বললেন “চৌধুরী বাড়ির কোন অতিথি নাকি?

“হুঁ।”
“এই রাইতে এইহানে ক্যান?আর তোর এত দেরী হইলো ক্যান আইজ?”
“আমি একা আসছি বলে, এগিয়ে দিতে এসেছে। খুবই ভালো লোক।আমি এক কাপ চা খাওয়ার দাওয়াত দেই। অপরাধ হয়েছে আমার”?
রহিমা বেগম চুপসে বললেন “না।বইতে ক’”
আহির বারান্দায় বসা।অশ্বটি উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে।আহির ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বিকার চোখে।মনে মনে বলল ‘ছেলেরা প্রেমে পড়লে বেহায়া হয়ে যায়‌।”
গৌরী চা নিয়ে আসল।আহির বলিষ্ঠ হাতটি বাড়িয়ে দিল। গৌরী চা দিল।আহির বলল “চা অনেক গরম। ঠান্ডা হোক।”

“ফুক দিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
“ফুক দিয়ে গরম খাবার ঠান্ডা করা উচিত না।এতে মুখের জীবাণু সে-ই খাবারে যুক্ত হয়।” আহির আর একটি বাহানা পেল।আরো কিছু সময় পাওয়া গেল।সে চোখ তুলে গৌরী কে দেখল। গৌরী ঘরের দিকে একবার, একবার আহির এর দিকে দেখছে।তবে তাঁর দিকে স্পষ্ট চোখে তাকাচ্ছে না।আহির বলল “চাচীর শরীর এখন ঠিক আছে?
“আজ ভাল তো,কাল খারাপ। এভাবেই দিন পাড় করছে।আজ একটু হাঁটতে পারছে।”
আহির আর কোন প্রশ্ন খুঁজে পেল না।তবে ভাবছে কি বলা যায়? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির কথা মনে পড়ল।বলল “আচ্ছা, তুমি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির নাম শুনেছো?
“শুধু নাম শুনেছি তা নয়,আমি বইটি পড়েওছি।মায়ার থেকে নিয়ে এসেছিলাম একদিন। এরপর এক রাতের মধ্যে বইটি শেষ করি।”

“বইটি কেমন ছিল? বাঁশিওয়ালা আর জমিদার কন্যার প্রেম কাহিনী?
“অসম্পুর্ন বইটি। আমি বইটির ঘোর এখনো কাটাতে পারিনি।খুব জানার আগ্রহ,কি হয়েছিল সুফিয়ান হায়দার আর জমিদার কন্যার” গৌরীর কন্ঠে আক্ষেপের সুর।আহির এর মাথায় হঠাৎ করে ফারদিনা আর সুফিয়ান এর ভাবনা চলে আসে।মনে পড়ল অশ্বধারীর কথা।ওনার সাথে আলাপ করে হয়ত আরো কিছু জানা যাবে। ভেবে আহির বসা ছেড়ে উঠল। গৌরী বলল “একি চা না খেয়ে যাচ্ছেন?”
আহির আবার বসল।চা না খেলে গৌরীর অসম্মান হবে।সে চায়ে চুমুক দিল।চা খেতে খেতে বাড়িটির আশেপাশে দেখল। পরিষ্কার ভাবে চারদিক দেখা না গেলেও কোথাও সুফিয়ান হায়দার এর মাটির সে-ই ঘর আর বাড়ির আনাচে কানাচের সাথে মিল পেল।বড্ড উদাসীন হয়ে গেল আহির।ভাবছে মনের ভুল, যেহেতু একই গ্রাম তাই এরকম বাড়ি অহরহ আছে বলে নিশ্চিত হল।

না।আহির নিশ্চিত হয়ে বসে থাকতে পারল না। চায়ের কাপটা পাশে রেখে উঠোনে নামল। সে-ই মাটির ঘর, কিছু গোলাপ গাছের চারা পুব দিকে।একটি মাত্র বাড়ি। আশেপাশে আর কোন ঘর নেই। উঠোনে অশ্ব বাঁধা।আহির এর অশ্বটি ঠিক উঠোনর এক পাশে বাঁধা।ঠিক যেমনটি সুফিয়ান এর অশ্ব বাঁধা ছিল। বর্ণনার সাথে হুবহু মিলছে।আহির চারদিকে তাকাল উদ্বিগ্ন হয়ে। তাঁর অভিব্যক্তি দেখে গৌরী বলল “কি দেখছেন?”
আহির দিঘী খুঁজছে। সুফিয়ান এর বাড়ির আশেপাশে দিঘী ছিল। জিজ্ঞেস করল “আচ্ছা গৌরী, তোমাদের বাড়ির আশেপাশে কোন দিঘী আছে?
গৌরী ভেবে জবাব দিল “হ্যাঁ,মায়ের কাছে শুনেছিলাম, পেছনের দিকে বড় একটা দিঘী ছিল। সময়ের সাথে সাথে এখন মাটি আর ঘাসে ভরে গেছে।”

আহির অকারণে উত্তেজিত হয়ে গেল। তাঁর মনে হচ্ছে এটাই সে-ই সুফিয়ান এর বাড়ি। তাঁর কাছে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু সে শতভাগ নিশ্চিত না হলেও শতভাগ এর অর্ধেক নিশ্চিত। বাকিটুকু সেদিন নিশ্চিত হবে যেদিন দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি অসম্পূর্ণ থাকার ঘটনা জানতে পারবে
আহির শান্ত হল। ফিরে গিয়ে বারান্দায় বসে। বাদবাকি চা শেষ করল।বলল “চা’টা কিন্তু দারুণ ছিল। তোমার হাতে জাদু আছে।”
“কিন্তু, হঠাৎ আপনার কি হল,আর আপনি দিঘীর ব্যাপারে কিভাবে জানলেন?
আহির সত্যটা বলল “তুমি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি পড়েছো, তোমার সুফিয়ান হায়দার এর বাড়ির বর্ণনার কথা মনে আছে?”
“হ্যাঁ।”
“ভেবে দেখেতো, তোমাদের বাড়ির সাথে কোন মিল পাও কিনা?”
গৌরী হেসে বলল “হয়ত কিছুটা মিল। কিন্তু এটা কাকতালীয়।”
আহির নিশ্চিত এটা কাকতালীয় নয়। আপাতত কথা বাড়াল না। গৌরীর থেকে বিদায় নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে উঠোনে আসল। অশ্বকে নিয়ে যেতেই পেছনে থেকে গৌরী হঠাৎ ডাকল।বলল “গোয়েন্দা বাবু!”
আহির দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে বলল “ ডাকলে বুঝি?

“না,ডাকলে দাঁড়াতেন বুঝি?
“হঠাৎ ডাকলে?
“মা ডাকছেন আপনাকে”
আহির ফেরত এলো। পুনরায় বারান্দায় বসল। রহিমা বেগম বারান্দায় আসলেন। ধীরস্থির কন্ঠে বললেন “তুমি একটু আগে সুফিয়ান হায়দার এর নাম কইলা?
“হুঁ,চাচী। অনেক আগের একটা বাস্তব ঘটনা নিয়ে বই আছে।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর। সেখানে সুফিয়ান হায়দার তাঁর জীবনের ঘটনা লিখেছিল।আমরা বইটা পড়েছি। কিন্তু বইটি অসম্পূর্ণ। গৌরী হয়ত আপনাকে এ ব্যাপারে বলেনি। আপনি বলতে পারবেন সে-ই আঠেরো শতকের রশীদ তালুকদার এর বংশের পতনের কারণ? সুফিয়ান হায়দার আর ফারদিনার শেষ পরিণতি?”

“সবাই সেই ঘটনা মুখে আনতে চায় না।আনলেই কান্নায় ভাইঙ্গা পড়ে।আমিও হুনছিলাম আমার মার থেইকা। কিন্তু মা সমস্ত ঘটনা কইতে পারে নাই।তবে এতটুকু কইতে পারি সুফিয়ান হায়দার এর লগে যা হইছে ঠিক হয় নাই।”
“কি হয়েছিল? যতটুকু জানেন বলেন” গৌরী বেশ অবাক হল। তাঁর মা এ ঘটনা জানে অথচ সে কখনো জানতেই চায়নি।

The Silent Manor part 40

“আমি সব ঘটনা কইতে পারুম না। কিন্তু একজনার সন্ধ্যান দিতে পারুম।সে সব জানে।”
“কে সে?
“আছে একজন। আগামীকাল তাঁর কাছে তোমরা চইলা যাও।আর সমস্ত ঘটনা জাইনা আও।”
আহির অবশেষে শান্তি পেল।সে এখন সুফিয়ান এবং ফারদিনার শেষ পরিণতি জানতে পারবে।আহির রহিমার কাছে ঠিকানা জানতে চাইল। রহিমা সে-ই ঠিকানা বলল।

The Silent Manor part 42

3 COMMENTS

Comments are closed.