এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২২
আসিফা খান
ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে সাতটা,,,নতুন দিনের সূচনার সাথে পরীক্ষার দিন এগিয়ে আসার আহ্বান।। পড়ার টেবিলে বসে আছে আলেয়া,, হাতে একটা ডেয়ারি মিল্কের প্যাকেট,,, মাঝেমধ্যেই দাঁত বসাচ্ছে চকলেটের উপর,, আর হেসে উঠছে আনমনে।। মনে পড়ছে কাল রাতের কথা।।
কাল রাতে,,,,,,
রাতের ডিনার এর পর্ব শেষ।। হাসি, ঠাট্টা, ইয়ার্কি তে কাটলো প্রায় অনেক টা সময়। অনেকদিন পর আফিয়া কে কাছে পেয়ে আলেয়া নিজের গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেছে,,,সে যেনো প্রায় ভুলেই বসেছে তার পরীক্ষার চিন্তা।। আফিয়া হাফিজ এর আপন বোন। সাংসারিক জীবনে অত্যাধিক মেতে থাকার কারণে বাপের বাড়ী এসেছে প্রায় ছয় মাস পর। আফিয়ার কোল জুড়ে আছে একটা আড়াই বছরের শিশু কন্যা,,,নাম সামিয়া।। আফিয়া আর আলেয়া মিলে বসিয়েছে তাদের গল্পের সমাহার নিয়ে, ইয়ানাকেও তারা বেশ মিস করছে এখন তিন বোন এক জায়গায় হলে বাড়ি মাথায় করে রাখত।।,,, আলেয়া যখন থেকে এসেছে হাফিজ তার সাথে একটা কথাও বলেনি। শুধু দূরে বসে চোখের তাড়না মেটাতে ব্যস্ত সে,, অনেকদিন পর এই প্রাণ খোলা মায়াবিনী কে নিজের চোখের সামনে দেখছে।।
আলেয়া ও আফিয়ার কথার মাঝে হাফসা বেগম বলে উঠলেন,,,”জানিস আলেয়া তোর আফিয়া আপি দুমাসের প্রেগনেন্ট,,,তোকে খালা ডাকার জন্য আরো একজন আসছে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন,,, এদিকে আলেয়ার চোখ ঝিকঝিক করে উঠলো বাচ্চা তার বরাবরই পছন্দ।,,, আর নবজাতক শিশুদের সে জীবন্ত পুতুল বলে দাবি করে,, কি সুন্দর ছোট ছোট হাত পা ছোট্ট নরম তুলতুলে দেহ,,, হাতে নিলেই মনে হয় পুতুলটি ব্যাথা পাবে কিংবা হাতের মাঝ থেকে হলে যাবে।। আলেয়া আফিয়ার গাল টেনে বললো,,,”সত্যি আপি,,,আমি আবার খালা হবো?”
আফিয়া ও আলেয়ার নাক টেনে বলে,,,”হ্যাঁ রে আআআলু।”
“কিন্তু আপি তুমি প্রেগনেন্ট কি ভাবে হোলে?”
অত্যাধিক কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন টা করলো আলেয়া। এই প্রশ্ন মাঝে মধ্যেই তার মাথায় বাড়ি দেয়। সে জানতো ছাদে উঠে চোখ বন্ধ করে,দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে বেবি চাইলে তাহ পাওয়া যায়,,,সেই আশায় অনেক বার ছাদে উঠে এই টেকনিক ব্যবহার করেছে সে,,কিন্তু প্রতি মুহূর্তে বিফল হয়েছে । তাই আজ এই সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলনা সে,,,সে আজ জেনেই ছাড়বে,তার কৌতূহল আজ মিটিয়েই ছাড়বে ।। অন্যদিকে আলেয়ার কথায় লজ্জার সাথে ভিমড়ি খেলো আফিয়া,,এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো কেও নেই তো,,নাহলে মারাত্মক লজ্জায় পড়তে হবে তার।। এদিকে দূরে সিঙ্গেল সোফায় বসা হাফিজ আলেয়ার কথা স্পষ্ট শুনতে পেলো,,,ছেলেটা বেসম খেয়ে কাষতে আরম্ভ করলো,,,কি খতরনাক মেয়ে!
হাফজা বেগম দৌড়ে পানি দিলেন ছেলেকে,,,মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।।,,,আলেয়া কিছু বলতে নিলে পিছন থেকে তার কাপড় ধরে টান দেয় সামিয়া,,, তুতলানো বাক্যে বলে,,
“আন্তি,,, খেববো,, ধরো আমাতে,,,”
আজও আলেয়া তার প্রশ্নে উত্তর হিনা থেকে গেলো,,,সব ভুলে আলেয়া ছুটলো সামিয়ার পিছে। দুইজনেই খিলখিলিয়ে হাসছে,,প্রাণ খোলা তাদের হাসি।।,,সামিয়ার পিছে দৌড়ানোর এক পর্যায়ে আলেয়া ধাক্কা খায় টেবিলের সাথে,,, আহ শব্দ করে পেটের বাম দিক চেপে ধরে সে। টেবিলের কোন লেগেছে পেটে।। এদিকে আলেয়ার আহাজারি কানে আসার সাথে সাথেই হাফিজ ছুটে আলেয়ার পিছনে দাড়ায়,,,সেও হাত বাড়িয়ে আলেয়ার ব্যাথারত অবস্থায় হাত রাখে,,,আর সঙ্গে সঙ্গেই কেপে ওঠে মেয়েটার পুরো শরীর। কিন্তু এদিকে হাফিজ এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই,,সে ব্যস্ত আলেয়া কে নিয়ে,,,
“বাচ্চার সাথে বাচ্চা হয়ে গিয়েছিস নাকি? একটু দেখেশুনে দৌড়াবি না কোথায় লেগেছে দেখা আমাকে!”
ভোরকে যায় আলেয়া হাফিজের রাগান্বিত কথায়,,,আলেয়া একবার আশে পাশে তাকালো। আফিয়া তার রুমে তার হাসব্যান্ড সোহান এর কল এসেছে,, হাফজা বেগম রান্নাঘরে,,আর সামিয়া সে দূরে দাড়িয়ে আলেয়া আর হাফিজ কে দেখে চলেছে মিটিমিটি চোখে।।
“কি হলো এখন স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন দেখা কোথায় লেগেছে।”
দাঁতে দাঁত পিছে বলে হাফিজ এদিকে আলেয়া লজ্জায় পড়ে যায়।,, একে তো তার পেটের উপরে হাত দিয়ে রেখেছে আবার জিজ্ঞাসা করছে কোথায় লেগেছে!,,, আলেয়া চুপচাপ সরে আসতে নিলে হাফিজ তার হাত টেনে ধরে, পাশে রুমে নিয়ে যায় বিছানায় বসিয়ে তার সামনে দাঁড়ায় ,,,ব্যাপারটা অনেকটা দ্রুত ঘটে যাওয়ায় আলেয়া বিমূর হয়ে রয়।
“আমি দেখবো নাকি দেখাবি?”
“নাহ,,,”
অত্যাধিক দ্রুততার সাথে নিজের স্কার্ট এর ওপর পরিহিত টপ চেপে ধরে আলেয়া।। হাফিজ আলেয়ার থেকে শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। হাফ ছেড়ে নিঃশ্বাস নেয় আলেয়া।। কিছু মুহূর্ত পরে রুমে প্রবেশ করে আফিয়া, আলেয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলে।
“আলু এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলি দেখা দেখি কোথায় লেগেছে।”
আলিয়া কথা বাড়ায় না,, টপ উপরে উঠিয়ে পেটের বা সাইড টা দেখায় আফিয়াকে,, যন্ত্রণা হচ্ছে জায়গাটায় কালচে হয়ে গিয়েছে , সাদা চামড়ায় এই দাগ বেমানান দেখাচ্ছে।।,,,আফিয়ার মলোম লাগিয়ে দেয় জায়গাটায়।
সামিয়া হাফিজ এর আঙ্গুল টেনে ধরে বলে,,,”মামা,, আন্তির কু হইছে।”
সামিয়া কে কোলে তুলে চুমু আঠে তার নরম গালে,,,” ব্যাথা পেয়েছে তোমার আন্টি,,, অবুঝ মেয়েটা বিঝেই না তার কষ্ঠে তোমার মামা আহত হয়।”
সামিয়া শুধুই শোনে তার মামার কথা,,তার বুঝ শক্তির বাহিরের তার মামার বলা বাক্য গুলি।। এরই মধ্যে রুম থেকে বেরিয়ে আসে আলেয়া হাফজা বেগমের কাছে গিয়ে বলে,,,”ছোটো মা আমি বাড়ি যাবো।”
“রাত হয়েছে মা, আজকে এখানেই থেকে যা।”
“পরে আজ না ছোটো মা,,,”
“আচ্ছা যা,,, এই বাবু আলেয়া কে এগিয়ে দে,,,রাত বাড়ছে মেয়েটা কে একা ছাড়বো না।”
অজ্ঞতা মায়ের কথায় এগিয়ে এলো হাফিজ কোল থেকে সামিয়াকে নামিয়ে।। আলেয়ার কাছে এসে দাঁড়ালো, শান্ত স্বরে বললো,,”কেন আমাদের বাড়ি আর ওদের ঘর কি এবার বাংলা আর ওপার বাংলা। যে দূরত্বের কারণে তাকে ছেড়ে আসতে হবে।”
কথাটা হালকা টিটকারি দিয়েই বললো হাফিজ আলেয়া তো খুব ভালো করে বুঝল কিন্তু এত রাতে সে একা যাবে কি করে? ভয় হয়। হাফিজের কথায় মা চোখ রাঙালো। বলল,,,” যা বলছি মেয়েটা ভয় পাবে।”
“চল।”
শীতের সুনসান সড়কের বুক ধরে এগিয়ে চলেছে দুই মানব মানবি।। ঠান্ডা হওয়ায় ভেসে যাচ্ছে চারিপাশ। হাফিজ তাকিয়ে আছে তার পাশে আনমনে হেঁটে চলা প্রায় সপ্ত দশি মেয়েটির পানে। হঠাৎ করেই মেয়েটার প্রতি জাগ্রত অনুভূতি তার কাম্য নয়। কি ভাবে?কখন? মেয়েটার মায়ায় নিজেকে লুটিয়ে ফেললো সে ,তার অজানা। তার বড়ো আব্বুর মেয়ে,তারা কাজিন একে অপরের,,,অবশ্য এই সব দিকে হাফিজ এর মাথা ব্যাথা নেই শুধু ভাবে তার অনুভূতি জানার পর আলেয়ার রিয়াকশন কেমন হবে আদেও কি তাকে মেনে নেবে মেয়েটা! পরক্ষনেই ভাবলো,,,মেনে না নিলে,মানিয়ে নেবে,,,সেটা ভালবেসে বা জোরপূর্বক ভাবে।
বাড়ির গেটে প্রবেশ করার আগেই টান পড়লো আলেয়ার কব্জিতে। হাফিজ এর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ডেয়রি মিল্ক এর একটা পকেট বের করে ধরে আলেয়ার চোখের সামনে,,,
“সেই দিনের জন্য আমি সরি।”
আলেয়া প্রথমে অল্প বিস্মিত হয় পরক্ষণে আবার মনে মনে হাসে। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ঠোঁট নাড়ানোর আগেই হাফিজ পকেট আরো একটা প্যাকেট বের করে আলেয়ার সামনে ধরে বলে,,,
“রাস্তায় ওই ভাবে একা ছেড়ে আসতে চাইনি কিন্তু রাগ লাগছিল প্রচুর তাই সেই অপরাধ,,,তার জন্যও দুঃখিত।”
আলেয়া এই প্যাকেট শব্দহীন ভাবে হাতে নিয়ে নেয় বলে,,,”চকলেট এর জন্য সাত খুন মাফ।”
বলেই চলে যেতে নিলে আরো একবার আলেয়ার কব্জি ধরে টানে,,, হাফিজ এবার দূরত্ব গুছিয়ে কাছাকাছি আসে ,,, চোখে চোখ রেখে আরো একটা ডেয়ারি মিল্কের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে সুস্থ হুমকি দিয়ে বলে,,,”এটা ঘুষ বা হুমকি ও বলতে পারিস,,,এরপর আর কোনো দিন যেনো তোর মুখে ওই সিয়াম এর নাম না শুনি,,,নাহলে ****”
অসম্পূর্ণ কথা রেখেই চলে গেল হাফিজ। আলেয়া হতবাক।। একবার তাকালো তার হাতে তিনটে ডিয়ারি মিল্কের প্যাকেটের দিকে ততপর আপনা আপনি ঠোঁটের কোণে দখল করলো এক শুষ্ক হাসি।
নার্সিংহোমের নিজের কেবিনে বসে আছে রিফাত। দুই হাত মুঠিবদ্ধ করে কপালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে সে,, খুব গভীরভাবে কিছু চিন্তা করে যাচ্ছে সাথে মনে পড়ছে কাল রাতের কথা। সেই প্রনয় রাত্রির কথা। সকালে উঠে ইয়ানার দিকে চোখ পরতে সে দেখে,, মেয়েটা তার বাহুতে মাথা দিয়ে গুটিসুটি মেরে তার কোলের কাছে ঘুমিয়ে আছে,, আদেও মেয়েটা জানে না কাল রাতে তার পাগলামো সাথে রিফাতের প্রণয় এর কথা। অবশ্য রিফাতের কোন অনুশোচনা বা খেদ ফিল হচ্ছে না। মনের কোনো এর কোনায় সৃষ্টি হয়েছে অদ্ভুত অনুভূতি,,,। মারাত্মক রকমের অস্থির ভাব কাজ করছে রিফাত এর মধ্যে,,,মস্তিষ্ক আঁকড়ে ধরতে চাইছে অনুশোচনা কে,,বার বার বলছে ‘ রিফাত তুই ভুল করেছিস,,অবচেতন মেয়েটার সুযোগ নিয়েছিস তুই।’ কিন্তু তার একদম উল্টো ভাবনায় নিমজ্জিত রিফাত এর মন চিৎকার করে বলছে,,’ কিছুই ভুল নয় রিফাত,,,তুই কোনো ভুল করিসনি,,,মেয়েটার তোর স্ত্রী,,,তোর সে। একান্ত তোর।’
এমনিতেই কিছুদিনের মধ্যেই ইয়ানা রিফাতের অস্তিত্বের সাথে মিশে গেছে, রিফাত বুঝে গেছে সে পারবেনা মেয়েটাকে ছাড়তে! কোনো রকম ভাবেই পারবে না! মেয়েটা রিফাত এর মাঝে খুবই সংগোপনে নিজের অস্তিত্ব বিস্তার করেছে।।
ছাদ থেকে হেলে দুলে নেমে আসছে ইয়ানা।। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখলো সে রিফাত এর রুমে। মনে করার চেষ্টা করলো কাল রাতের কথা,,,হালকা আপছা মনেও পড়লো,,,রিফাত তাকে নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়ার কথা কিন্তু তারপর,,,তারপর কি হলো? মন কে বুঝ দিয়ে বললো,,,ঘুমিয়েই পড়েছিলাম হয়তো।। মাথাটা হালকা ব্যাথা করছে তাই আর দেরি না করে সরাসরি ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল করে নিলো।।
আয়নার সামনে দাড়াতে নজর পড়ল গলায়,,,একটা দুটো লাল দাগ। ইয়ানা ভুরু কুঁচকে হাত বুলালো, হালকা ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু দাগটা আসলে কিসের তা ইয়ানার মাথায় আসছে না ।। হয়তো মশা কামড়াচ্ছে কিংবা এলার্জি,,,এটাই ভেবে ছাদে উঠলো।। মন টা বেশ ফুরফুরে,, মেজাজ ও ঠান্ডা। রিফাত এর কথা মাথায় আসতে ইয়ানা ঠোঁট কামড়ে হাসলো,, কেমন লজ্জা লজ্জা ফিল হচ্ছে তার,, অভিমানটাও অনেকটাই কমেছে।। বেশ কিছু সময় তার খরগোশ পরিবারের সাথে কাটিয়ে নিচে আসে। দাদু মানে ইব্রাহিম সাহেব এর ডাক পড়েছে।
“দাদু আমায় ডেকেছো”
পত্রিকা থেকে মুখ তুলে তাকালো ইয়ানার দিকে। হেসে বলল,,,”হ্যাঁ ডেকেছি তোমায়,,,তোমার কি আজ কলেজ আছে?”
“দাদু আজ রবিবার!”
ইব্রাহিম সাহেব ঠোঁট গোল করে,ভ্রু নাচিয়ে বলল,,,”ওহহ আমি ভুলে গেছি ,,, বয়স বাড়ছে তো,, আর যে কিছুই মনে থাকে না।”
দাদুর কথায় ইয়ানা খিল খিলিয়ে হেসে দিল ততপর দাদুর পাশে বসে,, তার বাহু জড়িয়ে,, মাথা রাখলো দাদুর কাঁধে,,,, তারপর বলল,,” কে বলেছে তোমার বয়স বাড়ছে হ্যাঁ,,, তুমি এখনো ফিট অ্যান্ড ফাইন ,,,তুমি চাইলে এখন কাউকে ফিদা করতে পারো। আর একটা বিয়েও করতে পারো।”
“আর বিয়ে! তোমার দাদি কে আমি ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করি,, আর দেখো এখন সে আমায় ফাঁকি দিয়ে চলেও গেলো আমায় একা করে।। তোমার দাদির কথাই আলাদা,,,আমায় রাজি খুশি করার কোনো সুযোগ সে হাত ছাড়া করেনি,,,”
“অনেক ভালোবাসতে দাদী কে?”
“নাহ,,,এখনও বাসি।।”
দাদুর কথায় ইয়ানা যেনো অবাক হয়। সত্তর পেরিয়ে যাওয়া এই মানুষটি তার স্ত্রীর মর্যাদা কেমন রক্ষা করে রেখেছে। ইয়ানা নিজেও দাদুকে চুপিচুপি কতবার বিকালের দিকে দাদীর কবরের কাছে বসে থাকতে দেখেছে,, হয়তো একেই বলে ভালোবাসা। একদম নিস্তব্ধ,নিরব,সর্থহীন।।
ইব্রাহিম সাহেব এবার গলা ঝেড়ে ইয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,,,”তোমার মা আর আন্টি মা আজকে মজার নাস্তা বানিয়েছে,কিন্তু এই নাস্তা আমার দাদুভাই উপভোগ করতে পারবে না কারণ সে সকাল সকাল নার্সিংহোমে দৌড় দিয়েছে।। একটা কাজ করো দিদিভাই নাস্তা প্যাক করে তুমি নার্সিংহোমে নিয়ে যাও,,,”
ইয়ানা এবার ঠিক ভেবে বসলো,,আমতা আমতা করে বলল,,,”আমি,, মানে এখন?”
” হ্যাঁ এখন,,, জানো আমি যখন না খেয়ে ব্যবসার কাজে জড়িয়ে পড়তাম তখন তোমার দাদি নিজ দায়িত্বে আমার জন্য খাবার পাঠাতো,, কখনো কখনো তো এসে নিজের হাতেই খাইয়ে দিত।”
বলেই হো হো করে হেসে উঠলো ইব্রাহিম সাহেব। ইয়ানা বেশ অস্বস্তির মাঝে পড়ে গেল,, যাবে কি যাবে না,, তা ভাবতে ভাবতে ইব্রাহিম সাহেব আবার বলে উঠলো,,”যাও দেখি তৈরি হয়ে নাও আমি তোমার মাকে বলছি নাস্তা প্যাক করে দিতে,, ঠিক আছে,,, যাও।”
ইয়ানার আর কি করা সে ভালো মেয়েদের মতো চুপচাপ দাদুর কথায় রাজি হয়ে গেল। উঠে চলে গেল রুমে, নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল একটা লং ফ্রক সাথে প্লাজো ,,,ওড়না এক কাঁধে সুন্দর করে জড়িয়ে মাথায় হিজাব বেধে নিল ,,ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক ,,চোখে গাঢ় কারো কাজল লাগিয়ে আয়নার দিকে তাকালো,,,আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে তাকে।। রিফাতের কথা ভাবতে গাল দুটো রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল।। তার চোখ ও যে চাইছে রিফাতকে একটাবার দেখতে।। সকালবেলা উঠে সারা রুম জুড়ে রিফাত কে দেখতে না পেয়ে মন টা কেমন নিরাশ হয়ে উঠেছিল তার।। মায়ের গলার আওয়াজ শুনে ইয়ানা হাতে ফোন নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
কিছু রোগীর চেকআপ শেষ করে রিফাত কিছু টেস্ট রিপোর্ট মনোযোগ সহকারে দেখছিল ঠিক এমন সময় তার কেবিনে দরজায় কেউ কড়া নাড়ে। ফাইলের দিকে তাকিয়ে রিফাত গম্ভীর আওয়াজে বলে,,” come in”
দুই পা খুবই উৎফুল্ল ভাবে রিফাতের কেবিনে প্রবেশ করে। রিফাত মাথা তুলে একবার তাকিয়ে আবারও নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়।।,,,”কিছু বলবেন ড: সাহেবা।”
কেবিনে প্রবেশ করা মানুষটি আর কেউ নয় রিফাতের নার্সিংহোমে কর্মরত এক জুনিয়ার ডক্টর। ড: সাহেবা।। মেয়েটি গুটিগুটি পায়ে রিফাতের ডেক্সের সামনে এগিয়ে আসে আর,,, লো ভয়েসে বলে,,,”yes sir I want to say something to you,,, are you busy now?”
রিফাত একই ভঙ্গিতে তে বলে,,,”হ্যাঁ ব্যাস্ত তো অবশ্যই,,,, তাও বলুন কি বলতে চান।”
সাহেবা যেনো রিফাতের এই কথার অপেক্ষায় ছিল সমস্ত কিছু ভুলে দ্রুত পায়ে রিফাত ের একদম সামনে এসে রিফাতের হাত দুটো এক ঝটকায় নিজের হাতের মাঝখানে চেপে ধরে ,,,রিফাত যেন বকা বনে গেল মেয়েটার এমন আচরনে,,, রিফাত অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল,,,নিজের হাত সরিয়ে আনতে গেলে মেয়েটা আরো শক্ত ভাজে চেপে ধরে রিফাতের হাত।। রিফাত অবাক,,কিছু বলতে নিলে মেয়েটি অত্যন্ত আবেগী এবং সূক্ষ্ম শক্ত স্বরে বলে ওঠে,,,”sir I love you,,, I love you the most sir ,,, you ar my love at first sight. I can’t explain how much I love you.”
“What rubbish Dr Sahiba ,,are you out of your mind ,,,leave me ,,,let go of my hand.”
“Sir please sir trust me,, I love you,, I do everything for you,, আমি যেইদিন আপনাকে প্রথমবার দেখি সেদিন আমি আপনার প্রেমে পড়ে গিয়েছি স্যার,,, আর কিভাবে যেন আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি ।। দিনরাত সকাল বিকেল প্রত্যেক সময় আপনার ভাবনায় হারিয়ে থাকি,,, আমায় ফিরিয়ে দেবেন না স্যার প্লিজ।”
“আপনি প্লিজ শান্ত হয়ে বসুন ,,,একটা ডক্টরের এত আবেগী হওয়া ভালো নয়,,, আপনার কপাল ভালো আমি এখন আপনার সাথে অপব্যবহার করিনি ,,,আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গার আগে আপনি চেয়ারে বসুন।”
ডক্টর সাহেবা আর কথা বাড়ায় না,, রিফাতের হাত দুটো ছেড়ে রিফাতের সামনের চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে,, মেয়েটা যেন এই মুহূর্তে নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না,, তাও এই অসম্ভব চেষ্টা।। নিজের মনের কথা এত দিন ধরে চেপে রেখেছিল সে,,কিন্তু এখন যেনো এই অনুভূতি আটকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ছে।। ,,,রিফাত এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত ভাবে বললো,,
“ডক্টর সাহেবা একটু আগেই করা আপনার বিহেভিয়ার এর জন্য আপনি ফায়ার্ড হতে পারেন,, সেটা নিশ্চয়ই আপনি জানেন।।,,”
“আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
“শাট আপ ডক্টর সাহেবা,,, এতক্ষণ ধরে আমি আপনার এই কথাবার্তা গুলো শুনে যাচ্ছি তার মানে একদমই এইটা নয় যে আমি আপনার কথাগুলো শুনে অত্যধিক খুশি হয়েছি ,,,আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি বিবাহিত। তারপরেও আপনার এই অনুভূতি অযথা,,,”
“আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছেন স্যার।। আমার ভুল কোথায়?”
“আপনাকে আমি কোনদিন নিজের কাছেই রাখিনি যে আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেব ,,, আর আপনার ভুল হল এইটা যে, আমি বিবাহিত জেনেও আমাকে ভালোবাসা।। এইবারের মতো আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম কিন্তু এরপরে এমন আচরণ যেন আপনি আর কোনদিন না করেন।।,,, জান নিজের কাজ করুন,,,”
কিন্তু ডক্টর সাহেবা উঠলো না এক আদম্য জেদ নিয়ে একই রকম ভাবে বসে থাকলো সে।। ভিতর ভিতর থেকে ফুসছে সাহেবা,,, সে কোন দিক থেকে খারাপ? ম্যাচিওর,রূপবতী সুন্দরী, কোয়ালিফাইড, এক ওয়েল এডুকেটেড মেয়ে সে। তাকে রিফাত কেনো ফিরিয়ে দিচ্ছে?,,,, সাহেবা কে বসে থাকতে থেকে রিফাত আবারও বলল,,”কি হলো আপনি এখনও যাননি কেনো? প্লিজ গো।”
এইবার সাহেবা নিজের সমস্ত বাঁধা পার করে রিফাত কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।। রিফাত ভোরকে গেলো,, চোখ বড় বড় করে সাহেবকে ছাড়াতে লাগলো,,, চোখ মুখ কুচকে গেছে রিফাত এর। এক অস্থির ভাব এসে হাজির হয়েছে রিফাতের মাঝে,, বুকের মধ্যে কেমন ধক করে উঠেছে তার ,,,সাহেবার এমন ছোঁয়া তার শরীরে কাটার মতো ফুটছে।। এদিকে রিফাত যতই সাহেবা কে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে সাহেবরা যেন ততই জকের মত রিফাতকে আঁকড়িয়ে ধরছে,,,সাহেবা এবার জেদী কন্ঠে বলল,,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২১
“আমি জানি স্যার আপনি আপনার ওয়াইফকে ভালোবাসেন না,,, আপনাদের বিয়েটা জোর করে দেওয়া হয়েছিল,,, তাহলে কেন নিজেকে এই নামমাত্র সম্পর্কে জড়িয়ে রেখেছেন স্যার ,,,আপনি তো আপনার ওয়াইফকে ভালোবাসেন না তাহলে কেন আমায় একসেপ্ট করছেন না,,,আমি কি করলে আমার ভালোবাসা স্বীকার করবেন স্যার প্লিজ টেল মি।”
রিফাতে এবার সাহেবা কে জোর করে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে ধাক্কা দিল,,,এরই মধ্যে শোনা গেলো এক শুষ্ক কণ্ঠ,,,
“Sorry to disturb you guys,,,।”
রিফাত দরজার দিকে তাকাতেই দেখল ইয়ানা মলিন চোখের তাকিয়ে আছে তাদের দিকে,,,রিফাত এর বুক ধক করে উঠল,,,,
