এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩১
আসিফা খান
“আপনার হাসি রংধনুর মতো। রংধনু যেমন সচর অচর দেখা মেলে না কিন্তু যখন দৃষ্টিতে বাঁধে মন কে ঠান্ডা করে দেয়।”
সুধীর কন্ঠে কথাটি উচ্চারণ করলেও তাহ রিফাত খুব সহজেই শুনে ফেললো। হয়তো নিরব পরিবেশের কারণে।। মেয়েটার এইটুকু কথাতেই প্রকাশ পায় যে, সে রিফাত কে কতটা চেয়ে ফেলেছে। রিফাত ও বোঝে সবটাই,,,এইবার সামান্য সামনের চকচকে দাতের দেখা মেলে,,,চোখের কোনে ভাঁজ পড়ে। ইয়ানা কোণা চোখে দেখে,,,রিফাত এর হাসি।। লোকটা কি তাঁর কথা শুনে ফেললো? প্রশ্নটি জগতেই লাজুক হলো সর্বাঙ্গ।।
ইয়ানা গুটি পায়ে এগিয়ে এলো রিফাত এর কাছে।। রাতের শীতল আবহাওয়ার কারণে শরীর শিউরে উঠলো মেয়েটার।। ইয়ানা কে আরো নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলতে,,রিফাত তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। চার ফুট, দশ ইঞ্চির দেহকে নিজের অধীনে চেপে ধরলো। ইয়ানার পিঠ ছোঁয়ালো রিফাত এর প্রশস্থ বুক।। ইয়ানা চুপ রইল,,,এই মুহূর্ত যেনো এখানেই থেমে যাক সেই প্রার্থনা করতে লাগলো মনে মনে।। হাতের উপর হাত, দেহের সাথে দেহ,,,ইস এজেনো সাজানো অবকাশ।।
“ইয়ানা,,,,”
“হুমম”
“ঘুমাবে না!।”
“ঘুম আসছে না তো।”
ঠোঁট উল্টে কথাটি বলে ইয়ানা। রিফাত শুধুই দেখে তার বউ এর মাসুম চেহারা।। খোলা চুল বাতাসে লতিয়ে যাচ্ছে,,,মায়াময়ী লাগছে তার বউ কে।। ইয়ানা কিছু একটা ভেবে হুট করেই বলে ওঠে,,,
“আচ্ছা তখন আপনি হঠাৎ ওই সব বললেন কেনো?”
রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে,,”কোন সব?’
“ওই যে,,,স্বামী কে খুশি রাখার মূল মন্ত্র।”
“কেনো? তোমার তো খুশি হওয়া উচিত,,,তোমার হাসবেন্ড নিজে থেকেই বললো, তাকে কি ভাবে খুশি রাখতে হবে।।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রিফাত এর এহেন কথায় ইয়ানা লাল হলো।। রিফাত কে আজ কল বড্ডো অচেনা লাগে,,,কেমন প্রনয় প্রনয় গন্ধ পায়,,, ছোঁয়ায় ছোঁয়ায় মিশে থাকে একরাশ শীতলতা।। ইয়ানা কিছুই উচ্চারিত করলো না,,,দুই জনে চুপ থাকে বেশ কিছুক্ষণ।। আচানক শোনা যায় রিফাত এর কন্ঠ,,,
“কফি খাবে ইয়ানা?”
ইয়ানা সামান্য ঘাড় বাঁকিয়ে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে বলল,,,”এখন!”
“হ্যাঁ,,,কফি খাওয়ার জন্য এটা পারফেক্ট সময়।”
“দাড়ান তাহলে আমি বানিয়ে আনছি।”
ইয়ানা নিজেকে সরিয়ে চলে যেতে নিলে রিফাত বাদসাধে,,, ইয়ানার চুলের ভাঁজে হাত চালিয়ে বলে,,,”তুমি না আমি।”
ইয়ানা বিস্মিত হয়ে বললো,,”আপনি মানে,,,আপনি কফি বানাতে পারেন!”
“টেস্ট করেই বলো,,পারি কি পারি না।। ততক্ষণ রুমে বসো,,আমি আসলে তারপর বারান্দায় আসবে।।”
হাত ধরে ইয়ানা কে নিয়ে এসে সোফায় বসিয়ে রিফাত নিজে চললো নিচে।। ইয়ানা আনমনে হেসে ফেললো। সুখের আবেশে মন মাতোয়ারা হলো।। আল্লাহ কে জানালো হাজারো শুকরিয়া।। রুমে সাজানো মোমবাতি নিভে গেছে কিন্তু তরতাজা ফুলের ঘ্রাণ এখনও বিদ্যমান।। ইয়ানা ভাবতে লাগলো এই কাজ কাদের হতে পরে? তার মাম্মা যদি এইসব করত তাহলে সে তাদের জন্য অপেক্ষা করত না,,, তাহলে কি তার আন্টি মা!! নানা উনি এরকম কিছু করতে পারেনা, আর যদিও বা করত তাহলে ইয়ানাকে দশ বার হিন্ট দিত,,লজ্জায় ফেলত।। সময় গড়ালো বেশ কিচ্ছুক্ষণ। ইয়ানার ভাবনায় ছেদ পড়ল দরজা খোলার শব্দে।।
রিফাত দুই হাতে দুই কাপ কফি নিয়ে হাজির হলো। ইয়ানার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টানলো, ততপর ইশারায় বলল বারান্দায় যেতে।। ইয়ানা ও বাধ্য মেয়ের মত রিফাতের হাত থেকে কফির কাপগুলো নিয়ে চলল বারান্দায়,, ফ্লোরে বসে কফির কাপ রাখল পাশে।। মুহূর্তের মধ্যে রিফাত উপস্থিত হলো এক পাতলা চাদর নিয়ে,,, আলগাছা জড়িয়ে দিলো ইয়ানার পিঠ থেকে সামনে পর্যন্ত।। চমকে উঠল মেয়েটা,, পিছনে তাকাতেই দেখল রিফাত তার শরীর ঘেঁষে বসেছে।।এক কাপ নিজে নিলো ও অন্য কাপ বাড়িয়ে দিল ইয়ানার দিকে।।,,,
দ্বিরুক্তি না করে ধোঁয়া ওঠা কাঁপে ২-৩ বার ফু দিয়ে সামান্য সিপ দিতেই ,,,অমায়িক স্বাদে, অতুলনীয় আস্বাদবিশিষ্ট চুমুকে চোখ বড় করে তাকালো রিফাতের দিকে।। রিফাত ও ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেসু ভঙ্গি করলে,,,ইয়ানা তড়াক করে বলে,,,
“ভীষণ টেস্টই,,,,”
“থ্যাঙ্কস,,,এটা তুরস্কের কফি।। ইন্ডিয়া আসার সময় আমার এক ফ্রেন্ড আমাকে গিফট করেছিল।। কফির স্বাদটা অতুলনীয়,,, তাই কফিটা খাওয়ার জন্য একটা সুন্দর মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকি। এই নিয়ে কফিটা আমি সাত বার পান করলাম,, আর ৭ নম্বরটা তোমার সাথে শেয়ার করলাম।।”
“অনেক ধন্যবাদ আমার সাথে শেয়ার করার জন্য সত্যিই কফিটা অত্যধিক সুস্বাদু।
রিফাত বাঁকা হাসলো,,, ধির কন্ঠে বললো,,,”আমার গিফট!”
মনের আনন্দে কফিতে চুমুক দেওয়া ঠোঁট থেমে গেলে হুট করেই।। রিফাতের কথায় ভরকালো কিছুটা,, গিফট!! কফির জন্য কাউকে গিফট দিতে হয় বুঝি!,,, ইয়ানা আনমনে বললো,,,”গিফট?”
“হ্যাঁ গিফট,,, টেস্টি কফি খাওয়ানোর বদলের টেস্টি গিফট।”
“গিফট আবার টেস্টি হয়!”
অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে কথাটি বলে উঠল ইয়ানা।।
তার মাথায় আসছে না রিফাত এর কথার মানে।। ইয়ানা অপলক তাকিয়ে রইল রিফাত পানে,,, বিস্ময় কাটানোর মত উত্তর আশা করলো রিফাত হতে।। এই বার ঘাড় ফেরালো রিফাত,,,দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটার দিকে।। গভীর কন্ঠে সুধাল,,,
“সব গিফট শুধু বস্তু হয় না ইয়ানা! কিছু কিছু গিফট এমনও হয় যা শুধুমাত্র অনুভব করা যায়,,,যাদের মূল্য হয় অমূল্য।”
ইয়ানা পূর্ণ দৃষ্টি মেললো। চোখে মুখে কৌতুক ভরপুর।। এ কেমন উপহারের কথা বলছে রিফাত?
তার কাছে কি আদৌ অমূল্য কিছু আছে! চিন্তায় পড়লো মেয়েটা,,, চনমনে হলো হৃদয়।। কি দেবে সে! ভাবতেই কোনো কিছুই মাথায় আসলো না। অসহায় বোধ করল,,,মন হলো ক্ষুন্ন।। নিরাশ হতাশ কন্ঠে মিন মিন করে বললো,,,
“আমার কাছে তো কিছুই নেই,,,”
রিফাত হয়তো ইয়ানার এমন কোনো কথার অপেক্ষায় ছিলো।। ভাবপ্রবণ হলো অন্তর।। নিজের ভিতরে বহমান বিশাল প্রণয়ের ঝর এক চিলতে ছোঁয়ায় থামানোর দায়িত্বটা ইয়ানা কে দেবে সে।। প্রমত্ত আঁটসাঁট দৃঢ় অধিকার বোধের সঙ্গে,,,আপীত কন্ঠে বলল,,,
“will you give me a kiss on the forehead?
আহা কী আবদার।। একদম স্পষ্ট ভাষায়,, কোনো রকম দ্বিধা কুণ্ঠা ছাড়াই এক চিলতে অনুরক্তি।। ইয়ানার চোখে মুখে চমকের দেখা মেলে,,,বদন মৃদু দুলে ওঠে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রয়। চিত্ত ভরে ওঠে এক রাশ লজ্জায়।। তাদের বিয়ের বয়স সাড়ে চার বছরের ও বেশি,,,কিন্তু ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি এখনও,,, যতটুকু কাছে আসাআসি হয়েছে তাকে ঘনিষ্ঠতা বলে না।। সেই যে ঠোটে ঠোঁটের স্পর্শ,,, ব্যাস এটুকুই শেষ ছিলো।। তাও সেটা নিতান্তই অবাঞ্চিত,,,স্পর্শের মাধ্যম ছিল রিফাত নিজেই।
কিন্তু আজ হঠাৎ এহেন চাওয়া ইয়ানা কে ব্যাকুল করে তুলছে।। না পারছে এগাতে আর না পারছে পিছাতে।। ঠাই বসে রইলো। আজ অন্যরকম লাগছে ইয়ানার। রিফাত এর সুগভীর চোখ অন্যকথা বলতে চাইছে যেনো! ইয়ানার দেহশ্রী থর থর করে কেঁপে উঠলো।। রিফাতের এই সামান্য আব্দারেই ইয়ানা কাতর।। লজ্জাবতী লতিকার ন্যায় মিহিয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।। পারলো না বসে থাকতে,,,নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সরে যেতে নিলেই রিফাত ওর হাত ধরলো,,, আসমানের দিকে তাকিয়ে থেকেই ইয়ানা কে আবার নিজের দিকে টেনে আনলো,,, ভনিতা ছাড়াই বললো,,,
“ডোন্ট প্যানিক,,,অপেক্ষায় রইলাম।”
ইয়ানা ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইল।। খারাপ লাগা কাজ করলো নিজের মাঝে।। রিফাত তাদের মাঝে সমস্তটা স্বাভাবিক করার জন্য এক পা দুই পা এগিয়ে আসলেও ইয়ানা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।। নিজের অজান্তেই ভারাক্রান্ত হলো মন। মণে পড়লো ইসরাত দাদিমার কথা,,,’ পুরুষ মানুষেরা জীবনে দুই নারীকেই বেশি প্রাধান্য দেয়,,এক তার জন্মদাত্রী আর দ্বিতীয় তার সন্তানের জননী।’ ভাবতেই ইয়ানার অন্তর কেঁপে উঠলো,,, শ্বাস-প্রশ্বাস দৃঢ় হল নিমিষেই।। সেকি তাহলে সত্যিই রিফাতকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে!! রিফাত কি প্রতিমুহূর্তে স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে!! যেহেতু ইয়ানা নিজেই রিফাত হতে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে তাই হয়তো রিফাত তার দিকে এগিয়ে আসতে পারছে না।। মনের মধ্যে চলল এই ধরনের অহেতুক কিছু চিন্তাধারা।। ইয়ানা কে গুম হয়ে বসে থাকতে দেখে রিফাত বললো,,,
“কি হলো,,,কি ভাবছো?”
ইয়ানা এবার মনের মাঝে সাহস যুগালো,,,বুক ভরে নিঃশ্বাস টেনে রিফাতের দিকে না তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করল,,,”আমি বলতে চাই যে,,, আমার প্রতি আপনার অধিকার আছে। আপনি যখন যেভাবে চান সেভাবে আমায় পেতে পারেন,, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।।”
কথা গুলি বলেই নতজানু হয় মেয়েটা।। ইয়ানার কথার মানে ঠিকই বুঝল রিফাত। হুট করেই হো হো করে হেসে উঠলো সে। ইয়ানা ঘাড় ঘুরিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো রিফাতের দিকে।। এই প্রথম সে রিফাতকে খোলামেলা ভাবে হাসতে দেখল,,শুনলো সেই হাঁসির গুঞ্জন। সে কি কোনো হাসির কথা বলেছে!?,,,মুহূর্তেই নিজেকে সংযত করে রিফাত। রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো গোপনে।। ইয়ানা মন মরা সুরে বলে,,,
“হাসলেন কেনো?”
“হাসবো না তো কি করব? তুমি যে কথাগুলো বললে সেটা তোমার শব্দ নয় ইয়ানা।। আমি তোমায় চিনি,,,সামান্য কিস করতে বলেছিলাম তাও কপালে,তাতেই তোমার কুকড়ে যাওয়া ভাব দেখা দিলো।। ইয়ানা আমি চাইলেই তোমায় এখন,এই মুহূর্তেই সম্পূর্ন নিজের করে নিতে পারি,,,এতে তুমি বাঁধা দিলেও বিফলে যাবে।। কিন্তু আমি চাই তুমি সময় নাও,,,স্বাভাবিক হয়ে ওঠো আমার সাথে।। কারোর কথায় নিজেকে অসস্থির মধ্যে রেখো না,,,,মনে রেখো তোমায় জুড়ে শুধুই আমি আছি।।
আগে মন ছুঁয়ে দেখো,,, শরীরিক উত্তাপ সহ্য করার আগে। স্বামী স্ত্রীর বন্ধন অটুট,,,তাহ শুধু দৈহিক চাহিদা মেটানোর জন্য না।। মনের মিলনের মাধ্যমে তৈরি হয় এই সম্পর্ক,,,একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গণ্য হয় এই বন্ধন।। ”
কান গরম হয়ে গেল ইয়ানার। রিফাত এর এক একটা কথা তাকে বোঝাতে সক্ষম,,,এই মানুষ সমস্তটা শুধুই তার।। নিজের লাজুকতা কাটিয়ে ওঠার আগেই শোনা গেলো রিফাত এর কন্ঠ,,,
“এমন অনেক কথা আছে যাহ তুমি জানো না ইয়ানা। আমার স্ত্রী হিসাবে যাহ তোমার জানার অধিকার আছে।। আমাদের মধ্যিখানে এক অজানা অধ্যায় আছে,,, যার সংযোগ তোমার স্বামীর সাথে জড়িত।। ইয়ানা,,,আজ অনেক কিছু বলতে চাই,,,তুমি কি শুনবে?”
“শুনবো,,,কিন্তু কি বলতে চান?”
“এমন কিছু যা, বলতে গিয়েও থেমে গিয়েছি বহুবার। যার কারণে অন্তহীন ক্লেশের মাঝে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি।। যাহ আমায় শান্তিতে থাকতে দেয়নি কতকাল,,,এক অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে দিনের পর দিন।। তারপর একদিন আগমন ঘটে ইয়ানার,,,এক অবাঞ্চিত সুখের,,সীমাহীন শান্তির,,, মোহনীয় স্বস্থির।। আমার মরুর বুকে বৃষ্টির মতো,,,অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মুসাফিরের কাছে একছিলতে আলোর শিখার মত তুমি আমার জীবনে এলে ইয়ানা।।”
রিফাত কিছুটা থেমে আবার বললো,,,”ইয়ানা তুমি আমার স্ত্রী,,, আমার অর্ধেক।। আমার জীবনের রহমত,,,আমার এই জায়গাটা ( বুকের বা পাশ ইশারা করে) তোমার নামে অনেক আগেই লিখে দিয়েছি।। আমার বর্তমান ভবিষ্যৎ এর সাথী তুমি।। আজ তুমি কি আমার অতীতের সাক্ষী হবে?”
“হব,,,,”
রিফাত এর কন্ঠ কেপে উঠছে।। আজ এই সময়টা সে বেছে নিয়েছে নিজের অতীত কে স্মৃতির পাতায় জায়গা দেওয়ার জন্য।। আজ লুকোচুরি নয় বরং উন্মুক্ত হবে সকল গল্প,,,রিফাত এর গল্প।। ইয়ানার মনের মধ্যে তৈরি হলো এক অজানা তরঙ্গ,,,কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে অন্তকনে। রিফাত এমন কি বলবে?তাহ ঠাওর করতে পারলনা ইয়ানা।। তবুও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলো,,,চোখে অদম্য স্পৃহা কায়েম করলো। রিফাত এর গভীর চোখে নিজের ডাগর আঁখি মেলে ধরলো।।
এদিকে রিফাত এর মধ্যে আশঙ্কার দেখা মিললো। বুক ধড়পড় করছে তার,,,দুই চারটা ঢুক গিললো নিরস গলা শীতলের লক্ষে। জীভ দ্বারা অধর ভেজালো।। উত্তেজনায় শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে।। উত্কণ্ঠা ভীড় জমাচ্ছে মস্তিষ্কে।। বিদেশ ফেরত হার্ট সার্জেন ড: রিফাত হোসেন,,, অগণিত মানুষের বুক চেরার সময়ও হাত কাপেনি কিন্তু আজ এই অবকাশে তার অন্তর কাপছে,,,।। ইয়ানার দিকে এক নজর তাকিয়ে নিলো,,,মেয়েটার ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে ,সে তৈরি রিফাত এর কথা শুনতে,,,রিফাত ও আর সময় নষ্ঠ করলো না।। ভারিক্কি শাসে মুখরিত হলো পরিবেশ ,,,দৃষ্টি রাখলো শুভ্র চাঁদ পানে। ঝাপসা হলো বর্তমান ডুব দিল অতীতে,,,,শোনা গেলো নির্মল কণ্ঠ,,
“নিজের দুনিয়াতে ব্যাস্ত থাকা ছেলে আমি। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে দিন রাত এক করে পরিশ্রমে লিপ্ত থাকতাম। ডক্টর হওয়া আমায় তীব্র চাওয়া, আকাঙ্ক্ষা বা সপ্ন যাই বলো।। ছোটবেলায় মা কে ওয়াদা করেছিলাম,,,সাদা অপ্রণ পোড়ে,গলায় এস্থেতোস্কপ ঝুলিয়ে হাজির হব তার সামনে।। কিন্তু ভাগ্যের লিখনে ওয়াদা রয়ে গেলেও অনুপ্রেরণা হারিয়ে গেল।। ভেঙ্গে পড়লাম,,কিন্তু মনোবল হারালাম না।।
মেডিকেল জীবনে পা দিলাম।। মন মস্তিষ্ক স্থির করলাম শুধুমাত্র লক্ষ্যের দিকে।। আমি আর আহিল একই কলেজে চান্স পেয়েছিলাম,,শুধুই আমাদের ডিপর্মেন্ট ভিন্ন ছিল।। আহিল নিজেকে নানান ফিল্ডে নিযুক্ত রাখলেও ,আমি ক্রিকেট আর পড়া শোনা ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। হয়তো বুঝতে চাইতাম না।। হোস্টেল রুমে আসলে রোজ তিন চারটা করে প্রেম বার্তা থাকতো আমার নামে। রাগ হতো তাদের উপর ,ভাবতাম,,,তাদের ফ্যামিলি কত আশা নিয়ে কষ্ট করে তাদের মেডিকেল পড়াচ্ছে আর তারা কি না কলেজে এসে এই বেহুদা কাজ করছে।। জেদের বশে লেটার গুলি নিয়েই ডাস্টবিন এ ফেলতাম।। আমার কর্মে অবাক হয়ে আহিল বলতো,,,
“এত কঠিন হৃদয়ের কেনো তুই রিফাত? এট লিস্ট লেটার গুলি পড়ে দেখ। কলেজ জীবনে প্রেম করার জন্য মরিয়া ছাত্র সমাজ আর তুই কি না!”
“শাট আপ আহিল। কলেজে পড়াশোনার জন্য আছি প্রেম করার জন্য নয়।। ভালো হবে তুই ও পড়া শোনায় মন দে,,,এই ফালতু টপিক নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।”
“বন্ধু একদিন তুমিই এই প্রেম জোয়ারে ভেসে যাবে,,কূলকিনারা খুজে পাবে না।”
“আর সেই একদিন কখনোই আসবে না।”
“সেটা তো সময় বলবে,,,বন্ধু।”
“এই ভাবেই চলতে লাগলো দিন,,যেতে থাকলো সময়।। দেখতে দেখতে কেটে গেল দুই বছর। পড়াশোনা, ল্যাব,লাইব্রেরী নিয়ে বেশ কাটছিল সব কিছু। ক্লাসের ফার্স্ট বয় নামে সম্বোধন করতো সবাই।। ভাললাগত,মনে হতো মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছি আমি।”
আবেগে আপ্লুত হয়ে ইয়ানা বলে ওঠে,,,,
“মা কে এখনও অনেক মিস করেন তাই না!”
“মিস আমরা তাকে করি যাদের কে আমরা ভুলে যাই।। (একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল রিফাত) থার্ড ইয়ারের ফার্ট ডে।। স্টুডেন্ট ভালো হওয়ার সুবাদে আমায় দায়িত্ব দেয়া হলো,আমি যাতে সিনিওয় হিসাবে আজ ফার্ট ইয়ার এর ক্লাসে যাই এবং কিছু বক্তব্য পেশ করি।। নিজের ক্লাস ছেড়ে ফার্স্ট ইয়ারে গিয়ে লেকচার দেওয়ার মত মন মানসিকতা ছিল না আমার,,, কিন্তু স্যার ম্যামদের অনুরোধে অজ্ঞতা উপস্থিত হলাম প্রথম বর্ষের ক্লাসে। আধা ঘণ্টা নিজের এক্সপিরিয়েন্স শেয়ার করলাম তাদের সাথে।। নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলাম,,, তাঁতের হাজারো কৌতুহল মেটানোর চেষ্টায় লিপ্ত হলাম।। কিন্তু বাঁধা সাধলো ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসার পথে।। আমার জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত,,, অনামন্ত্রিত অনুভূতির আগমনী বার্তা।। পিছন থেকে কেও আমায় অত্যন্ত নমনীয় সুরে ডাকলো,,,
“স্যার”
তেইশ বছর বয়সী রিফাত থমকে গেল এক সামান্য বাক্যে।। থেমে গেলো চলমান পা জোড়া।। কি ছিল এই কন্ঠে? বুকের মাঝে শুরু হলো হৈচৈ। অবাক হয় নিজের ওপর,,,এই রকম অনুভুতির কারণ কি!এতো বছরে কতই নারীর কণ্ঠ কানে গেছে তার,কই তখন তো এরকম ফিল হয়নি। রিফাত এর মন চাইছে পিছন ফিরে সেই কাঙ্ক্ষিত মেয়েলি আওয়াজ এর অধিকারীকে দেখতে কিন্তু অন্য দিকে এক রাশ অনুভবের জোয়ার এসে বলছে,,,আর একবার সেই মন মাতানো কণ্ঠ শুনতে।। হলোও তাই,,, দ্বিতীয় বার কর্ণ ঘাত হলো ওই একই বাক্য,,,
“স্যার”
এই বারের স্বরে ছিল আকুতি।। সহসা রিফাত ঘুরে তাকালো।। চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক কুড়ি বছর বয়সি রমনীর হৃদয় হরনী রূপ।। মায়াবী,শ্যামশ্রী অপরূপা সুন্দরী মেয়ে। যেই বিমোহতার কাছে হার মানবে হাজারো শ্বেতবর্ণ কুমারী গন।। চোখে মুখে কেমন ভীতি, অবয়বে স্পষ্ট অসহায়বধ। রিফাত নিজেকে কোনো রকম সামলে বললো,,,
“কিছু বলবে”
মেয়েটি দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলল,,,”এই কলেজে ভর্তির সময় শুনেছিলাম এখানে অত্যাধিক র্্যাগিং হয়। ভালো স্টুডেন্ট এর জন্য যেমন বিখ্যাত এই কলেজ তেমনি দূর্মান র্্যাগিং এর দরূন।।”
“আফসোস হচ্ছে কিসের ক্ষেত্রে? র্্যাগিং এর জন্য নাকি বেস্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য?”
মেয়েটি জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো,,আঙ্গুল এর সাহায্যে হিজাব ঠিক করলো,,তত্পর শান্ত কন্ঠে বলল,,,”আফসোস না ভয় পাচ্ছি। র্্যাগিং এর নামে হওয়া ভয়ঙ্কর কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত আমি।। একটা হেল্প চাই আপনার কাছে,,,শুধু র্্যাগিং এর হাত থেকে আমায় বাঁচিয়ে নিন,,,বিশ্বাস করুন আপনার এই উপকার আজীবন ভুলবো না।।”
রিফাত শুধুই দেখলো মেয়েটির আকুতি সহ মিনতি।। কণ্ঠের চঞ্চলতা।। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে আওয়াজ এলো,,”উপকারের প্রতিদান হিসেবে তোমায় চাই আমার চিত্ত হরণী।” রিফাত ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,,,”আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।। ”
এই টুকু কথাতেই মেয়েটির চোখ আনন্দে ভরে উঠলো। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো,,,”অনেক ধন্যবাদ আপনাকে,,,মনের ভিতর ঠাসা ভয় কিছুটা হলেও কমেছে।। আচ্ছা আপনার আর সময় নষ্ঠ করবো না। আশা করি আবার দেখা হবে।”
মেয়েটি চলে গেলে নিলে পদচারণ থামে রিফাত এর আওয়াজে,,,”নাম কি তোমার?”
“সালেহা নূর।”
মেয়েটি চলে গেলে নিলে পদচারণ থামে রিফাত এর আওয়াজে,,,”নাম কি তোমার?”
“সালেহা নূর।”
“তার নামের মানেই ছিল ‘ ফুল ‘। ফুল,,,যেমন দেখলেই উদাসীনতা দুর হয়,যেমন মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় সীমাহীন ভালোলাগা তেমন সেই পড়াকু,একগুঁয়ে, জেদী রিফাত এর হৃদয়ে এসে হাজিরি জানালো এক দল অনুরাগ।। যেই অনুভূতিকে এক সময় অর্থহীন লাগতো সেই অনুভূতিই আজ দখল করেছে রিফাত এর পাথর চিত্ত।। মনে পড়লো আহিল এর বলা কথা,,,তবে আমি সত্যিই প্রেম জোয়ারে ভেসে গেলাম!! প্রশ্ন করলাম নিজেকে,,,আর উত্তর হিসাবে পেলাম তীব্র গতিতে ছুটে চলা হৃদস্পন্দন।
কলেজে রেগ দেওয়া সমস্ত ছাত্র ছাত্রী দের আমি চিনতাম। স্যার ম্যাডামদের বিশেষ অ্যাটেনশনপ্রাপ্ত ছাত্র হিসাবে প্রায়ই সকলেই আমায় জানত,,তাই সেই সকল ছাত্র ছাত্রী দের একান্তে বারণ করলাম,জানালাম নূরের ভীতি সম্পর্কে।। কোনো রকম ঝামলা ছাড়াই তারা নির্দিধায় মেনে নিল আমার কথা,,, নূর কে উত্যক্ত করবে না তারা সে বিষয়ে আশ্বাস দেয়।। সময় গড়ালো আপন গতিতে,,,তার সাথে দেখা হতো প্রায় সময়।। মিষ্টি হেসে বারংবার বলতো ‘ ধন্যবাদ স্যার ‘।।
জীবনের প্রথম বার মনে হলো পৃথিবীর সকল সুর যেনো এই মেয়ের কন্ঠস্বর এর কাছে নিরর্থক।। আমি বুঝে গেলাম,আমার মাঝে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। পড়ায় মনোযোগ হারালাম,,অন্যমনস্ক থাকতাম প্রায় সময়।একটা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বক্ষদেশে,,,সেই অস্থিরতা নিবারণের জন্য ওই মেয়েকেই লাগবে,,এমন মনোভাব সৃষ্টি হলো অন্তরে।। তাকে ছাড়া বাকি জীবন কল্পনা করতেও ভয় লাগা শুরু হলো।।
একদিন করিডোর থেকে যাওয়ার সময় নূর কে দেখি লাইব্রেরীতে একা বসে থাকতে।। আশেপাশে তাকালাম,,, ছলাৎ ছলাৎ বুকে প্রবেশ করলাম।। আগবাড়িয়ে মেয়েদের সাথে কথা বলার মত কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই কি ভাবে কথা শুরু করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই প্রথম আমায় দেখে। কথাও শুরু করে প্রথমে নূর।”
“আস- সালামু- ওয়ালাইকুম স্যার”
“আমিও স্টুডেন্ট তোমার মত,,শুধু সিনিয়র।”
মনে মনে সামাল গ্রহণ করে উত্তর দেয় রিফাত।। নুর নার্ভাস হাসে। তত্পর মিষ্টি হেসে বলল,,,”আসলে আপনার নাম জানি,,,কিন্তু স্যার বলতে ভালো লাগে।।আপনার চর্চা ছড়িয়ে আছে কলেজ জুড়ে।। স্যার ম্যামরা উদাহারণ হিসাবে আপনার নাম নেয়।। বসুন প্লিজ,,,,”
রিফাত আলগোছে হাসে,,,”ধন্যবাদ”
নূর স্মিত হাসে।। রিফাত তার মুখমুখী বসে।। নূর উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,,,,”ধন্যবাদ তো আপনার প্রাপ্য স্যার।। চার মাসের বেশি হতে চললো আমার কলেজ জীবন,,, রেগের শিকার তো দুর মুখুমুখি ও হোয়নি।। আসলে আমার বাবা মায়ের আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো সন্তান নেই,,,তারা আমায় নিয়ে চিন্তায় ডুবে থাকে।। রেগিংএর বিষয় নিয়ে আমার থেকে তারা বেশি আশঙ্খায় ছিলো।”
“সেইদিন নূরের সাথে কতক্ষন কথা হয়েছে তঃ সময়ে পরিমাপ করা সহজ হলেও আমার জন্য সেই কথোপকথন ছিলো আমার অনুভূতির একধাপ এগিয়ে যাওয়া,,,অনুরাগের ছোঁয়া গায়ে মাখা।। সেদিন আমি শুধুই তাকে দেখেছি,,,তবুও চোখের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয়নি আমি।। দুই টা ক্লাস মিস দিয়েছিলাম আমার কলেজ জীবনের প্রথম বার,, আফোসস হয়নি বরং এক আলাদা আমেজ উপভোগ করেছিলাম,,,নিজেকে কেমন প্রেমিক পুরুষ মনে হচ্ছিলো,যে কিনা তার প্রেমিকার জন্য কিছুই করতে পারে।।
সময়ের সাথে গড়ে উঠতে লাগলো আমাদের স্বার্থহীন,,বেনাম এক সম্পর্ক।। যে সম্পর্কে আমরা একে অপরের বন্ধু ছিলাম না,,, কিন্তু এক অদৃশ্য অনুভব এর মাঝে এগিয়ে যেতে লাগলো আমাদের অনুবৃত্তি।। ক্লাস শেষে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলে একে অপরের সাথে গল্প করা,,, কিছু না বলেই মিনিটের পর মিনিট আড় চোখেই তাকে দেখে কাটিয়ে দেওয়া, এই সব কিছু যেনো আমার অভ্যাসে পরিণত হতে লাগলো। সব কিছু ঠিক চলছিল,,,উপলব্ধি করতে পাচ্ছিলাম আমার অনুভূতি যা ধীরে ধীরে তীব্র অনুরাগে স্থানান্তর হচ্ছিল।।”
“শূন্য আকাশের দিকে তাকালে আপনার কেমন লাগে ?”
“মনে হয় কেউ দূরে বসে আমায় দেখছে, শুনছে.”
রিফাত এর কথায় নূর মৃদু হেসে বলে,,,”আপনার তো মা নেই স্যার। মা হীনা জীবন কেমন হয়?”
“জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না নূর,,, আমার মা আমার মনে বিরাজ করে,, কখনো দুঃখ পেলে মনে হয় যে, মা কোথাও যায়নি সে আমার পাশেই আছে।। কথাটা বাচ্চা বাচ্চা মনে হলেও,,,এটাই সত্য।। আমরা মানুষেরা বড় স্বার্থপর নূর,,, আপন মানুষেরা হারিয়ে গেলেও আমরা জীবন কাটাই,, খুব ভালো করেই কাটাই।। হয়তো স্মৃতি রয়ে যায়,, এমন স্মৃতি যা আমাদের হৃদয়ে সর্বক্ষণ আঁচড় কাটে।”
নূর মাথা ঘুরিয়ে থাকায় রিফাতের দিকে, যে কিনা আগে থেকেই তার থেকে তাকিয়ে আছে।। নূর আবারও মুখ ফিরিয়ে নেয়,, কেমন লাজ ভর করছে তার মাঝে,,, রিফাত তার তীব্র ভালো লাগার মানুষ,,, তাতে কোন সন্দেহ নেই।। রিফাত তার প্রথম দেখার ভালো লাগা,,,প্রেম নয় এযে অনুরাগ।
“নূর।”
“হুমমম”
“তুমি সুন্দর এই কথাটা তুমি হয়তো এর আগে হাজারবার শুনেছ,, কিন্তু কেউ কি তোমায় এটা বলেছে,,, তুমি মায়াময়ী।।”
নূর হাস,,, ে এক উজ্জ্বল হাসি ,,,এই হাসির মাঝে লুকিয়ে আছে নিষ্পাপ কোন শিশু।।
“না বলেনি কিন্তু,, আমার মা বলে আমার নামের সাথে আমার মিল আছে।”
কথাটি বলেই নূর উঠে চলে যায় আর রিফাত তাকিয়ে রয় নূরের যাওয়ার দিকে,, মেয়েটার পদ তোলে পিষে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া ফুল হাতে তুলে নিল রিফাত,,,তত্পর বিরবিরিয়ে বলে,,,
“নূর,,,,আমার মায়াময়ী নূর।”
” কিন্তু হঠাৎ কিছু দিন নূরের দেখা মেলেনি,,, ক্যাম্পাস, হোস্টেল জুড়ে তাকে তন্নপ্রায় খুঁজেও খবর মেলেনি তার।। হোস্টেল রুমে এক নাগাড়ে পায়চারি করছিলাম আমি।। অত্যাধিক অস্থির লাগছিল নিজেকে কারণ গত তিন দিন নূরে দেখা দেয়নি ।। নিজেকে কেমন পাগল ঠেকছিল।। সমস্ত কিছু বিষাদ বর্ণন লাগছিল আমার কাছে।। বিছানা জুড়ে মোটা বই গুলো আমার কাছে নিরোর্থ মনে হচ্ছিল।। নিজেকে সামলে ওঠার জন্য বারান্দায় দাড়ালাম,,,আর মাঝেই হাজির হলো আহিল,,,,,,”
“আমায় শান্ত করার মত তোর কাছে কোনো উত্তর আছে আহিল?”
বাহিরের দিকে তাকাতেই কথাটি বলে উঠল রিফাত। তার কন্ঠে কম্পন অনুভব করলো আহিল। অবাক হয় নিজের বন্ধুর ক্লেশ পরিস্থিতি দেখে।। এক ঢুক গিললো নিরস গলা ভেজাতে।। উত্তর তার কাছে আছে কিন্তু তাহ রিফাত কে শান্ত করার মত না,,, বরং আরো অস্থির করে তোলার মত।। নূরের খবর পেয়েছে তার রুম মেট কাম বান্ধবীর কাছ থেকে।। আহিল কে চুপ করে থাকতে দেখে রিফাত লাল হয়ে ওঠা আঁখি জোড়া নিক্ষেপ করল তার পানে।। ছেলেটা এবার ঠোঁট ভেজালো,,,আমতা আমতা করে বলল,,,
“নূর হসপিটালে ভর্তি রিফাত।। গত তিন দিন আগে রাস্তায় ওকে কেও অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে,,,”
“কোন হসপিটাল?”
আহিল এর কথা শেষ হওয়ার আগেই রিফাত জিজ্ঞাসা করে।। আহিল থেমে যায়।। বাহির পানে একবার পড়ন্ত বিকেলের দিকে তাকিয়ে দেখে।।
“দেখ রিফাত আমার কথা শোন কোনো রকম পাগলামি করবি না তুই,,,”
“যা জিজ্ঞাসা করেছি তাহ বল।”
দাতে কিরমির করে কথাটি উচ্চারণ করলে,, আহিল ভরকায়।। শান্ত কন্ঠে বলে,,,,” ******** হসপিটাল। ফার্স্ট ফ্লোর, থার্ড করিডোর।”
রিফাত আর এক মুহুর্ত দাড়ালো না। এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
“মাতালের মত দিক বেদিক নির্ধারণে ব্যার্থ প্রায় হয়ে ছুটে চলেছিলাম আমি।। সেই সন্ধার আপচা আলোর মাঝে কোথাও গুম হয়ে যাচ্ছিলাম যেনো।।
শান্তি মিলবে শুধু নূর কে দেখে।। হসপিটালের সামনে এসে ধুক ধুক বুকে এগিয়ে গেলাম। কোনো দিকেই না তাকিয়ে বড়ো বড়ো পা বাড়ালাম দ্রুত গতিতে।। তার কেবিনের দরজার সামনে এসে থমকে গিয়েছিলাম,,,কাপা হাতে দরজা খুলে ভেতরে দেখতেই অন্তর কুঁকড়ে উঠলো।
হাতে সেলাইন,,, নাসা গ্রন্থিতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছিল।। সর্বদা হিজাবের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে রাখা মেয়েটা উন্মুক্ত প্রায়,,,লম্বা চুল বেড ছাড়িয়ে নিচে ঝুলছে।। সেইদিন প্রথম বার আমি নূরের মা বাবা কে দেখেছিলাম।। মেয়ের অসুস্থতায় মন মরা দুই অবয়ব।। কিন্তু তারা আমায় দেখে কোনো রকম ভাব প্রকাশ করলো না,,, বরণ করুন চোখে তাকালো আমার দিকে।।ধির পায়ে এগিয়ে গেলাম,,,পদ চরণ থামালাম নূরের পাশে গিয়ে।।”
কারোর আভাস পেয়ে নুর চোখ খুলে তাকালো।। মুহূর্তেই ঠোঁট দখল করলো মৃদু হাসির রেখা।। উচ্চারণ করলো,,,,”স্যার।”
রিফাত ঝাকিয়ে উঠলো।। নূরের কন্ঠ অসুস্থতায় ভরা তারপরেও ঠোটের কোন দখল করা হাসি, সেই এক চিলতে হাসি রিফাতকে কাঁপিয়ে তুলতে বাধ্য করল। চোখের তৃষ্ণা এখন মনে হাজির হলো। চার দিন যেনো চার যুগ ঠেকছিল রিফাত এর কাছে,,,, শত শত বছর রিফাত নূর কে দেখেই কাটিয়ে দিতে পারবে।। রিফাত কোনো রকম বললো,,,”কেমন আছো নূর?”
ঠোঁটের হাসি ফুটে উঠল এবার,,, ক্লান্ত ভাব স্পষ্ট কন্ঠে বললো,,,”আলহামদুলিল্লাহ।”
রিফাত বিস্মিত হলো তীব্র অসুস্থতার মাঝেও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কারি নুর কে দেখে।।সত্যিই মেয়েটা আলাদা,মেয়েটা অনন্য।। রিফাত এবার শান্ত থাকতে পারলো না,,,ঝুঁকে গেল কিছুটা নূরের দিকে।। মেয়ের আদুরে মুখশ্রীতে নিজের চোখ জোড়া ঘুড়িয়ে নিতে নিতে বলল,,,,”হঠাৎ,,,কি হলো এটা নূর।”
নুর উত্তর করলো না রিফাত আবারও বলল,,,” কথা বলা নূর,,, আমার মাঝের ক্লেশ কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না!”
ঠোটে লেগে থাকা হাসি মুহূর্তেই হারিয়ে গেল।। মুখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে তাকালো মেয়েটা।। নূর দেখেছে রিফাতের বিধ্বস্ত অবস্থা,, উসকো খুসকো চুল,, লাল আখি জোড়া। রিফাত কে দেখে কেউই চোখ বন্ধ করে বোলে দিতে পারবে, ছেলেটা রাতের পর রাত ঘুমাইনি।। হুট করেই নূরের ভাব মূর্তি বদলালো,, ভারী নিশ্বাস ফেলে বললো,,,,”চলে যান রিফাত।”
রিফাত চমকালো। নূর এই প্রথম তার নাম নিল,,,মনে প্রাণে ভালোলাগার চেয়ে বেশি বিষন্নতা ছড়িয়ে পড়ল।। নূরের কন্ঠ ছিল কিছুটা কঠিন।। রিফাত ও দমে যায়নি,,,সেও তেজী হয়ে উঠলো যেনো।। ভারিক্কি ভাব প্রকাশ করে বললো,,,,”নাহ,, যাবো না,,সত্যি জানতে চাই।।”
“যদি মিথ্যে বলি।”
“নূর মিথ্যে বলে না।”
“নূর সত্যিও বলতে চায়না,,,,আপনি আমায় দেখে নিয়েছেন,,,এবার চলে যান রিফাত। দয়া করে চলে যান।।”
রিফাত শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন নূরের দিকে।। নির্মল, উষসী মেয়েটার রুক্ষ আচরনে অভিশঙ্কা হলো কিছুটা।। বুকের মধ্যে বইলো দমকা বাতাস।। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নূরের মা বাবা কে সালাম দিয়ে বেরিয়ে এল কেবিন থেকে।। সে চাইলেই নিজের তীব্র জেদ দেখিয়ে নূরের কাছ থেকে কথা আদায় করতে পারতো। কিন্তু এই মুহূর্তে নূরের কথা মেনে নেওয়াটাই শ্রেয় বলে মনে করলো রিফাত।
রিফাত বেরিয়ে যেতেই নূর ডুকরে কেঁদে উঠলো।। মেয়ের কান্না দেখে মা দ্রুততার সাথে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল নূরকে।। মায়ের মন যে বোঝে সবটাই।। নুরের জোরালো কান্নায় মুখরিত হয় পরিবেশ। নুরের বাবা কেবিনের এক কোণে দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে রয়েছে নিজের একমাত্র মেয়ের দিকে ।। সে যে অসহায়, সে যে শূন্য প্রায় ,তার হাতে যে কিছুই নেই। তার মেয়ে আর কতদিন তাকে আব্বু বলে ডাকতে পারবে সেই নির্ধারিত সময় ও তার মস্তিষ্কে নেই।। পৃথিবীতে হয়তো এরকম বাবা অনেক কম আছে যার অসহায়ত্ব আকাশ ছোঁয়া,,, অনুপায়ে ভরপুর।।
“কাদে না আমার আম্মু,,, কাদে না।। শরীর খারাপ করবে তো আরো।”
“আল্লাহ আমায় খুব ভালোবাসে তাই না মা! তাই তো আমায় তাড়াতাড়ি নিজের কাছে নিতে চায়।।”
নূরের এই কথায় তার বাবা ও স্থির থাকতে পারল না ছুটে এসে মেয়ের একপাশ জড়িয়ে ধরে।। কান্নারত গলায় বলে,,,”মাফ করে দে আমায় মা,,,তোর আব্বু যে ক্ষমতাহীন, অক্ষম,অসহায়।”
“তুমি কেনো মাফ চাইছো আব্বু,,,তুমিতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।”
“ছেলে টা তোকে চায় আম্মু,,,,ছেলেটার চোখে মুখে তোর জন্য প্রগাঢ় অনুভূতির দেখা মেলে। কত দিন লুকাবি!”
“আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত।”
কথাটি বিড়বিড় করে বলে ওঠে নূর।। তার জীবনের প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি রিফাত।। কিন্তু আফসোস সেই ভালোবাসা কে আকড়ে ধরে বাঁচতে পারবে না সে।। বাঁচলেও কত দিন? সেই হিসাব ও কষা ছেড়ে দিয়েছে নূর।। শেষের দিন গুলো রিফাত কে দেখেই কাটিয়ে দিতে পারবে সে।। ভালোবাসা যন্ত্রণার হয়! হ্যাঁ হয়। নূর কে দেখেই সেই যন্ত্রণার আভাস মেলে।।
“পরাধীন ভালোবাসার স্বাধীন প্রেমিকা আমি।। দুর্বল, অসহায় মেয়েটার জীবনের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াচ্ছো তুমি রিফাত।।”
সেদিন কেবিনের দরজার ওপাশে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল তিন মানুষ,,,, নূর ,নূরের বাবা এবং মা আর হয়তো সেই পড়ন্ত বিকেল,, একদল পাখি,,শান্ত বাতাস আর কেবিনের দেওয়ালে আটকে থাকা নিষ্ঠুর সময় বহমান ঘড়িটা।
“সেদিন উত্তেজিত হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসলেও শান্ত হতে পারেনি আমার মন।। বারবার ভেসে আসছিল নূরের ক্লান্ত অসুস্থ মুখশ্রী, রুক্ষ কণ্ঠ, আর সে কেবিনে ঠান্ডা বাতাস যেনো আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে ঝেঁকে ধরেছে।। ডক্টরদের কাছ থেকে নূরের অসুস্থতার কথা জানার চেষ্টা করলেও কোন রূপ উত্তর মেলেনি।। ছটফট করে উঠলো চিত্ত। নিজের অজান্তেই ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে আমার হৃদয়।। মস্তিষ্ক বিকৃত প্রায়,,,,নূরের অসুস্থতার কারণ জানতে যেনো মরিয়া মুজনু আমি।।
পর দিন আবার নূরের সাথে দেখা করতে গেলে তারা জানায় নূরের আজ সকালেই ছুটি হয়ে গেছে। খুশি হলাম। তাদের ঠিকানা জানতে চাইলে বললো ,এটা তাদের হসপিটাল রুলস এর বাইরে।।
কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকার মত ছেলে নয় আমি, তাই খোঁজ লাগালাম।। অবশেষে মিলল নূরের বাড়ির ঠিকানা। সময় নষ্ট না করে চললাম তার বাড়ির উদ্দেশ্যে।। দোতলা বাউন্ডারি ঘেরা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালাম,,, ” চিত্তনীড়” নামে এই বাড়িটি দেখেই শিথিল হলো হৃদয়।। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলল নূরের মা আমায় দেখে তিনি অবাক হলেও ঠোঁটের কোণে টানলেন মৃত হাসির রেখা,,, যে হাসি শুধুই দেখানোর জন্য, যে হাসির পিছনে নেই কোন আনন্দ, আর নাহি আছে কোন অভিব্যক্তি।। আমি সালাম করলাম উত্তর দিলেন বিনয়ী স্বরে। কোনরকম জড়তা ছাড়াই বললাম,,
“নূরের সাথে দেখা করতে চাই আন্টি।”
ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ বিচলিত হলেন।। তত্পর কিছুটা জড়তার সাথে বললেন,,,”নূর তো বাড়িতে নেই বাবা ওর খালার বাড়ি গেছে, সুস্থ হওয়ার পরেই তার খালা তাকে নিয়ে গিয়েছে।। যতটা জানি দু একদিন পর থেকেই ও কলেজ জয়েন করবে তখন না হয় দেখা করে নিও।”
“জি ধন্যবাদ আন্টি,,,আজ আসি আল্লাহ হাফেজ।।”
“বসো এক কাপ চা তো খেয়ে যাও।”
“আজ না আন্টি কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই খাব।। তখন সম্পর্কের খাতিরে আপনি আমায় চায়ের সাথে মিষ্টিও খাওয়াতে বাধ্য হবেন।”
কথাটি বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল রিফাত,,মনের মধ্যে এক রাশ উত্তেজনা নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে,,,কল করল তার বাবা আফতাব মিয়াকে।।,,,, ছেলের ফোন পেয়েই ব্যস্ত মিটিং ছেড়ে উঠতে বাধ্য হলেন আফতাব মিয়া। ছেলে তাকে কখনোই উবজে ফোন করে না। যতক্ষণ না সে করে ছেলের সাথে তার কথা হয় না বললেই চলে।। আজ তার একমাত্র ছেলে তাকে যেচে কল করেছে। এই কল একবারই রিসিভ করা কোনো লাকিড্র হাতে লাগার মত। মিটিং রুম ছেড়ে ঝট পট ফোন রিসিভ করে কানে দিতেই ওই পাশে রিফাতে বলা কথায় ভরকে গেলেন আফতাব মিয়া কিছুটা,,,
“আব্বু আমি বিয়ে করতে চাই। মেয়ে আমার পছন্দের।”
আফতাব মিয়া, গলা কেশে উঠলেন। বিস্মিত হলেন কিছুটা।। ছেলে তার লাজুক প্রকৃতি না হলেও অত্যন্ত খোলামেলা ভাব তার মধ্যে দৃশ্যমান নয়।। এই সময়ে রিফাতের এহেন কথা আফতাব মিয়ার কাম্য ছিল না।। তিনি গলা কেশে উঠলেন,,তত্পর খুবই স্বাভাবিক সুলভ ভাবে বললেন,,,
“কবে করতে চাও? ডাক্তারি ডিগ্রি অর্জন করে নাকি ডাক্তারির শিক্ষার্থীর অবস্থায় থেকে।”
“আমার সপ্নের কাছে বিয়ে বাঁধা না বরং প্রেরণা। যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে করবো আমি,,,কখন ,কবে এটা নির্ভর করে মেয়ের হ্যাঁ নায়ের উপর।”
“তবেকি সে রাজি নয়।”
“তার রাজামন্দি থাকুক বা নারাজগী,,,বিয়ে হবেই।। আপনাকে ইনফর্ম করে রাখলাম,,,আল্লাহ হাফিজ।”
আফতাব মিয়া কিছু বলার আগেই ফোন কাটে রিফাত।। ছেলের জেদ সম্পর্কে অবগত তিনি,,,মনে মনে ভাবে রিফাত এর সাথে সামনা সামনি কথা বলবে,,,বাবা হিসেবে ছেলেকে ভুল পদক্ষেপ নেয়ার আগেই বোঝাবে,,,দরকার পড়লে মেয়েটির সাথেও পরামর্শ করবেন তিনি।।
এদিকে রিফাত ভিতর ভিতর পড়ে।। নূরের বাড়িতে প্রবেশ করার আগেই চোখ গিয়েছিল উপরের তলায় কাচের জানালায়,,,মনে হলো কেও তাকে দেখেই সরে গেল সেখান হতে। রিফাত এর তীব্র বিশ্বাস ওটা নূর ছাড়া অন্য কেউ নয়। হতেই পারে না। রিফাত তার নুর কে চিনতে ভুল করবেনা।। তত্পর নূরের মায়ের স্নায়বিক অবস্থা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে তিনি মিথ্যা বলছেন।। তবে কি নূর তাকে উপেক্ষা করছে?,,,রিফাত ও এর শেষ দেখবে।। সেই জানালার দিকে তাকিয়ে রিফাত বাইকে উঠে বসে বিড়বিড় করে বলে,,,
“আমার শান্ত রূপ দেখেছো এতদিন নূর,,,,আমার অশান্ত হওয়ার পিছনেও যে তোমার অবদান।”
নূর এর মা তার রুমে প্রবেশ করতেই দেখল তার মেয়ে এক নাগাড়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে,,, শুধু দেখছে না! গভীর দৃষ্টিতে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে।। উদাসীনতায় মোর্চা খাওয়া মেয়ের অবয়বে হৃদয় কাঁপে মায়ের।। সমস্ত কিছু থাকতেও তারা যেন নিঃস্ব,,, মা বাবা হিসাবে তাদের পরীক্ষা নিতে নেমেছে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা।। মায়ের আসার আভাস পেয়ে যেনো আরো আবেগী হয়ে উঠলো নূর। ধরা কন্ঠে বলল,,,,”মেয়েরা সুন্দর্যের ভিক্ষুক আর আমি জীবনের জীবক।।”
নূরের মা এগিয়ে আসে,,,হাঁটু গেড়ে মেয়ের সামনে বসে। চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে, সযত্নে চুমু খায় ফোলা গালে।। মায়ের আদরে পেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ওঠে নূর। শরীর দুলে,হাত কাপে তার।। ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে,,,”ও কেনো এলো মা! আমি ভিতর থেকে ছারখার হয়ে যাচ্ছি।।,,,আমি কি ভাবে ভুলে গেলাম,আমায় যে দুঃখ গ্রাস করে ফেলেছে,,,আমার জন্য সুখ শুধুই মরীচিকা।”
নূর আবারও বললো,,,,”আমার জন্য বাঁচার আশা পাপ মা।। রিফাত কেনো এলো আমার জীবনে মা? আমিতো নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম,আমার নিয়তির উপর রাজি হয়েগিয়েছিল আমি,তারপরেও রিফাত কেনো এলো! কেনো আমি বাঁচার স্বপ্ন দেখলাম মা!,,,এখন শুধু আমার মাথা ব্যথা হয় না আমার যে অন্তর অসহীন ব্যাথায় কুকড়ে ওঠে মা।”
বাঁধভাঙ্গা কান্নায় জর্জরিত হয় নূর।। মেয়ের দুঃখে মায়ের বুক ফাটে,,, আগলিয়ে নেয় নিজের বুকে নূর কে।। তার মেয়ে যে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে হাতে থাকা বালু কণার মত ফুরিয়ে যাচ্ছে।। সেদিন মা মেয়ের কান্নার সাক্ষী যেনো স্বয়ং পরিবেশ ,,তাই তো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আরম্ভ হয়।।
সেদিন যখন রিফাত নূরকে জিজ্ঞাসা করে ‘ তার কি হয়েছে ‘ তখনই যেন নূর নিজের চেতনা ফিরে পায়,,, এতদিনে নিজেকে আবেগ সাগরে ভাসিয়ে রাখা উতলা মন নিমিষেই ডুব দেয় অতল গহব্বরে।। কেউ যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়,, ভালবাসা নূরের জন্য নয়,, ভালোবাসা নূরের জন্য নয়।
“কাটতে লাগলো, দিন যেতে লাগলো রাত,, অপেক্ষা করতে থাকলাম নূরের ক্যাম্পাসে আসার।। আমার অপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হলো না ,,একদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে চোখে পড়ল নূরকে যে কিনা তার বান্ধবীর সাথে ধীরপায়ে হেঁটে আসছে আমারই দিকে।। আমার পাশ কাটিয়ে চলে গেল কিন্তু ঘুরেও তাকালো না একটা বারও। রাগে ফেটে পড়লাম আমি,,, আশেপাশে তাকালাম ছাত্র-ছাত্রীদের সমাহার কোনরুপ সিনক্রিয়েট করতে চাইলাম না তখন,,,তাই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনলাম।।
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩০
আমার জানা মতে সন্ধার পর নূর বের হয়।। তার মুখে এক বার শুনে ছিলাম রাতের আকাশ তার ভীষণ প্রিয়,তাই সেটা উপভোগ করতে সে রোজ সন্ধার পর আধা ঘণ্টা রাস্তায় হাটে।। এই কথাটা খুবই সামান্য হলেও আমার কাছে নূরের প্রতিটা কথাই অসাধারণ,,,তারপর থেকে আমি প্রায় তাকে দুর থেকে দেখতাম। উপভোগ করতাম নুরের স্নিগ্ধ শোভন চেহারা,,, অস্থির আঁখি জোড়া যা আকাশের দিকে তাকিয়ে শত নক্ষত্র দের বর্ণনায় ব্যাস্ত,,,, কেমন জানি ঈর্ষা অনুভব হতো, নূরের ওই হরিণের মতো চোখ কখনো আমার দিকে থামেনি,,, হয়তো থেমেছে কখনো!।। সেইদিনও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি,,, নুরকে দেখে নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারলাম না। মনের ভিতর চলতে থাকা অদম্য জেদ চেপে বসে মাথায়। নিজেকে পাগল ঠেকে।। নূরের উপেক্ষণীয় আচরণ আমার কাছে নিদারূণ শারীরিক যন্ত্রণা।। কোনো কিছুই না ভেবে নূরের সামনে গিয়ে দাঁড়াই।।”
