Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৬

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৬

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৬
আসিফা খান

সময় টা কোনো এক শান্ত পড়ন্ত বিকেল। মৃদু বাসাতে বেপরোয়া ভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে লম্বা কেশ। আসরের নামাজ আদায় করে ব্যালকনিতে সময় কাটাচ্ছে ইয়ানা। পাখিদের কোলাহল আজ একটু বেশিই,,, মিশি মনিবের পায়ের সাথে লেপ্টে আছে আবার মাঝে মাঝে লেজ দুলিয়ে কী জানি বলে উঠছে নিজ ভাষায়।। ইয়ানা চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে পরিবেশের শীতলতা। গত কিছুদিনের মাঝে সে দুই পদ রান্না শিখেছে রিফাত এর পছন্দের,,,মানুষটার পুরোটাই তার,,,তার ভালো মন্দের খেয়াল রাখতে হবে নিজ দায়িত্বে। পছন্দ অপছন্দের লিস্ট মুখস্ত করতে হবে।ভেবেই আলতো হাসে মেয়েটা।। ছাদে খরগোশের পরিবার বেড়েছে আবারও। দুই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে,,,সেই খুশিতে আত্মহারা ইনু।। ফটো তুলে তাহ পাঠায় রিফাত কে,,,লেখে,,,

“জানেন ভীষণ নরম ওরা,,,একদম তুলা,,,মন চায় জড়িয়ে রাখি।”
সিন হয় সেই ম্যাসেজ,,,পরবর্তী বার্তা আছে রিফাত এর তরফ থেকে,,,”আমারটাও অনেক নরম,একদম হাওয়াই মিঠাই,,, ছুঁলে নেতিয়ে পড়ে,জড়িয়ে ধরলে হাপিয়ে ওঠে। কি করি ইনু?”
অবুঝ মেয়ে বলে,,,”আল্লাহ,,, মানে আপনার ও খরগোশ আছে! আমি জানিনা কেনো?”
“জানাবো। না দেখাবো,,,একদম কাছাকাছি।”
“আচ্ছা।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সেদিন এর পর থেকে প্রায় তিনদিন রিফাত কে ফোন পায়না ইয়ানা। কল,ম্যাসেজ কোনোটাই পিক হয়না ওপাশ থেকে।। আকুল হয় চিত্ত,,,কিছু বিশ্রী ভাবনায় ঝনঝন করে মস্তিষ্ক।। উপায় না পেয়ে আহিল কে ফোন করে,,,জিজ্ঞাসা করতেই জানায় রিফাত এর তীব্র জ্বর। ইয়ানা আকাশ থেকে পড়ল,,,ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো সে। বিষাদ ছুঁয়েছে ছোট্ট মন। অভিমান ও জমলো বটে। আকুতি স্বরে জানায়,,,রিফাত এর সাথে তার কথা বলার। আহিল সেটাই করে,,,সময় অপচয় না করেই সিধা যায় রিফাত এর কাছে,,, হাতে ফোন দিয়ে চলে যায়। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে তার বোকা প্রেয়সীর নাম,,,দুটো নিশ্বাস ত্যাগ করলো গোপনে।
কানে ফোন রেখে ‘ হ্যাল্লো ‘ বলতেই শুনতে পায় ইয়ানা ফুপানো স্বর। রিফাত চোখ বুজে ফেললো,,,যে ভয় সে পাচ্ছিল সেটাই হলো,,,মনে হচ্ছে আহিল কে তার সতেরো তলা ব্যালকনি থেকে ফেলে দিতে।। চুপ চাপ শুনে গেলো ইয়ানার কান্না,,,অন্তরের কোনো এক জায়গা শীতল হলো। মেয়েটার তার জন্য কদছে! আল্লাহ এটাও যে এক পরম সুখ।।

মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছে থামার কোন লক্ষণ নেই বলে মনে হলো রিফাত এর,,তাই নিজ দায়িত্বে বলে উঠলো,,,”শান্ত হও ইনু,,আম ওকে।”
নাহ,,কাজ হলো না। এবার ধমকে উঠল রিফাত। সেকেন্ড এর জন্য কান্না থামলেও তাহ পরবর্তীতে দ্বিগুণ হলো। রিফাত কপালে আঙ্গুল ঠেকায়। কেনো সে ধমকালো মেয়েটাকে!! রিফাত বেড থেকে উঠে দাড়াল,,,এক হাত পকেটে গুঁজে হেঁটে গেলো বারান্দায়,,,মোহনীয় কন্ঠে ডেকে উঠলো,,
“ইনু।”
ইশ,,,এই ডাক কি ইয়ানা অগ্রাহ্য করতে পারে! নাহ মোটেই পারে না। ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকায় কোনো মতে,,, ধরা গলায় বলে,,,
“আপনি কেমন আছেন!?”

রিফাত কানে ফোন ধরে রাখা হাতের কনিষ্ঠা আঙুল ঠোঁটে ঠেকায়। মিচকি হাসে। যাক অসুস্থতায় বউ এর সেবা না পেলেও আফসোস নেই তার।। রিফাত ভারী প্রশ্বাস টেনে সুধায়,,,
“আলহাদুলিল্লাহ।। মিসেস ইয়ানা হোসেন হার্ট সার্জেন ডক্টর রিফাত হোসেন এর ওয়াইফ,,,তার হৃদয় এত নরম হলে তো চলবে না।”
ইয়ানা নাক টানে। ঢুক গেলে নিরস গলা ভেজাতে।। রিফাত ও মৌনতা পালন করে কিছুক্ষন।। কল্পনা করে,এই মুহুর্তে তার বোকা প্রেয়সীকে কেমন দেখাচ্ছে! নিশ্চয় ভীষণ আদুরে,,, ইশ রিফাত ওখানে নেই কেনো? এতক্ষণে তার ইনু তার বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হতো।। রিফাত শুষ্ক গলায় বলে,,,

“কাদছো!?”
“কাদবো না।”
গড়িয়ে পড়া নোনা পানি দ্রুততার সঙ্গে মুছে ফেললো ইয়ানা।। সারা মুখে হাত ঘষে। নিজেকে সাভাবিক রাখার চেষ্টা করে ইয়ানা অভিমানী কণ্ঠে বলে,,,
“একবারও বলার প্রয়োজন মনে হয়নি যে আপনি অসুস্থ!! কত ভয় পেয়েছিলাম আপনাকে ফোনে না পেয়ে,,,আমার কথা কি একবাও মনে পড়েনি। ভুলে গেলেন এত দ্রুত! সেখানে সুন্দরীদের দেখে আমি নামক কাওকে মনে না পড়ারই কথা।”

শেষের কথাটি বলার সময় গলা কেপে উঠলো ইয়ানার। চোখের কোনে আবারও জমলো অশ্রু জল।। রিফাত শান্ত চেয়ে রয় আকাশ পানে অতঃপর বাঁকা হাসলো কিছুটা,,,মেয়েটার তার প্রতি অধিকারী বাক্য শুনে দুলে উঠলো অন্তর। সে তো ইয়ানার কথা ভেবেই বলেনি,,, শুধু শুধু মেয়েটাকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।। এদিকে মেয়েটার কথায় স্পষ্ট অভিমান,,,তিনদিনের অস্থির চিত্ত যাহ আরাম পাবে একান্ত পুরুষের মোলায়েম কন্ঠে।। রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো,,,সামনের চুল পিছনে ঠেলে দিয়ে নিপুণ ভাবে আওড়ায়,,,
“ফোনের দিকে খেয়াল ছিল না,,,চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম তাই সুইচ অফ হয়ে পড়ে আছে।। ( জীভ দ্বারা অধর ভেজায় আবার বলে) তোমায় ভুলে গেলে তো আমি নিজেকেই ভুলে যাবো ইনু,,,দেহের অর্ধেকঅঙ্গ কে কি কেও ভুলে যায়!”

থৈ থৈ অনুভূতিতে জর্জরিত হয় হৃদয়। রিফাত এর সামান্য কথায় অসাধারণ ভাবে আবেগ প্রবন হৃদয়।। হুট করেই ঠোঁট দখল করে মৃদু হাসি। গাল ভরা লাজ।। আবারো শোনা যায় রিফাত এর কন্ঠ,,,
“এখানে বেশির ভাগই মেল স্টাফ।।
কেও আমার মন ছুঁয়ে দিতে পারবে না ইনু,,, তুমিই আমার শেষ অনুরাগ। হৃদয়ের রানী , আমার হৃদয়হরিণী এই অধম শুধুই আপনার।”
ইয়ানা কাপছে ঠক ঠক করে। সুখের আবেশে তলিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল ধপ করে,,,ফোন বুকের মাঝে চেপে ধরে ভ্রু কুঁচকে হেসে ফেললো নিঃশব্দে। ওপাশে রিফাত শুনতে পায় তার আদরময়ীর দ্রুত বেগে চলতে থাকা হৃদস্পন্দন।। রিফাত নিজের বুকের বা পাশে হাত রাখে,,,অনুভব করে তার ধুকপুকানি।। অপেক্ষা করে কোনো এক প্রনয় রাত্রির।।

দমকা হওয়ার চোটে চেতনা ফিরে পায় ইয়ানা।। চারি দিকে মাগরিবের আজান এর সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছে। ইয়ানা ধীর পায়ে হেঁটে রুমে প্রবেশ করে। অজু করে নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।। উকি দেয় আলেয়ার কক্ষে,,,মেয়েটা বইয়ে মুখ গুজে আছে,,,ইয়ানা আলেয়ার মাথার কাছে দাড়িয়ে বলে,,,
“আলু, ভর্তা হয়ে যাবি তুই এই ভাবে পড়তে থাকলে।। চুলের কি অবস্থা দেখেছিস এক বারও,,, আয় তেল দিয়ে ম্যাসাজ করেদি ভালো লাগবে।”
আলেয়া অসহায় ভাবে তাকালো ইয়ানার দিকে। ঠোঁট উল্টে বললো,,,”তুমি এত ভালো কেনো ইনুপি। সত্যি মাথায় ব্যাথা করছে,,,দাড়াও তেল নিয়ে আসি।”

আলেয়া উঠে তেল নিয়ে আসে। ইয়ানা বিছানায় বসে আর আলেয়া তার সামনে ফ্লোরে,,,সুন্দর করে তেল মালিশ করে দেয় ইয়ানা। আলেয়া সেইদিন জ্বর শরীরে বাড়ি ফেরে। হাফিজ তাকে কোলে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই সবাই সচেতন হয়। মিসেস আসফিয়া কেঁদে ফেলে। হাফিজ তাকে বিছানায় শুইয়ে সবাইকে আশ্বাস দেয়। আসার সময় ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে এসেছে সে,,,অত্যাধিক চিন্তার ফলে এই জ্বর। হাফিজ সেদিন রাত করে বাড়ি যায়,,,সর্বক্ষণ সে আলেয়ার মাথার কাছেই ছিল। সেদিন হাফিজ এর অস্থিরতা কেও খেয়াল না করলেও ইয়ানা করে।।
হঠাৎ চোখ যায় আলেয়ার বিছানার পাশের টেবিলে,,,লাল গোলাপ ফুলে ভরপুর ফুলদানি। ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে,,,

“আলু এত গোলাপ কোথায় পেলি?”
আলেয়া নির্দিধায় বলে,,,”আরে আজ হাপানি রোগী আমার জন্য এনেছিল,,, কোথায় রাখবো ভেবে ফুলদানি তে রেখেছি,,,ভালো লাগছে না আপি!”
“খুব ভালো লাগছে।। আচ্ছা আলু বুড়ি বিয়ে করবি না!?”
“ইশ আপি বিয়ের কথা বলো না,,,আমার কেমন শরম করে।”
“আল্লাহ্,,,আমাদের আলু আবার লজ্জাও পায় নাকি।”
আলেয়া মিচকি হাসে। ইয়ানা তার চুলের ভাঁজে আঙ্গুল ফিরিয়ে বলে,,,”কাওকে পছন্দ করিস!”
“মানে!,,,কাকে পছন্দ করবো?”

ইয়ানা বোঝে এই মেয়ে এখনও প্রেমের ধারে বারে যায়নি। ইয়ানা খুশি হয়। তার প্রেম জিনিসটা ভালো লাগে না। পবিত্র প্রেম কে অপবিত্র করে যারা আসোল প্রেমের বর্ণনা জানে না।। একের পর এক মানুষকে মনে জায়গা দেওয়ার মানে কি! একটা সঠিক মানুষ সঠিক সময়ে ঠিক হাজির হবে শুধুই করতে হবে অপেক্ষা,সবর।। কেনো জানি ইয়ানার মনে হচ্ছে হাফিজ আলেয়ার জন্য সঠিক,,,দেখেছে হাফিজ এর চোখে গাঢ় অনুভূতি।। ইয়ানা মুচকি হেসে বলে,,,
“জীবনে চলার পথে কারোর হাত ধরতে হয় আলু। তোর জীবনে যেনো প্রথমেই সঠিক মানুষের আগমন ঘটে।। আমি চাই আমার আলেয়া যেনো সর্বোচ্চ সুখের মালিক হয়।।”
আলেয়া বিস্থার হাসলো।। ইয়ানার কথার অর্থ পুরোপুরি উপলব্ধি না করতে পারলেও এটুকু বুঝেছে তার আপি তার ভালো চায়। ইয়ানা বেনির শেষে ক্লিচার লাগিয়ে তার সামনে দেয়। আলেয়ার সত্যি এখন ভালো লাগছে,,,মাথা ব্যাথা কমেছে অনেক। ইয়ানার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,,,

“থাং কু,,, ইনুপি।।”
ইয়ানা আলেয়ার নাক টেনে দিয়ে বললো,,,”আর কটা এক্সাম বাকি?”
“দুটো,,একটা কাল আরেকটা দুই দিন পর।”
“আচ্ছা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন আলু বুড়ি। আমি যাই।”
ইয়ানা রুম থেকে বেড়িয়ে আসতেই মৃদু চিৎকার কানে এল। বুক ধক করে উঠল। আওয়াজটা আসছে ইব্রাহিম সাহেব এর রুম থেকে। ইয়ানা দ্রুতবেগে হেঁটে গেলো।। প্রবেশ করতেই দেখলো ইব্রাহিম সাহেব বিছানায় শুয়ে আছে,,,আফতাব মিয়া তার হাত ডলে দিচ্ছে। ইয়াসমিন বেগম পায়ের তলা ঘোষে দিচ্ছে। মিসেস আসফিয়া কেঁদে যাচ্ছে একনাগাড়ে। ইয়ানা ঠোঁট কামড়ে ধরলো। ছ্যাত করে উঠলো চিত্ত। ছোটো কাল থেকেই দেখে আসছে এই মানুষ টাকে।। অসম্ভব সুন্দর,অত্যাধিক উত্তম ব্যাক্তিত্বের অধিকারী তিনি।। তার ফয়সালা কখনো মন্দ হয়নি। সবার জীবন গুছিয়ে দিয়েছেন একা হাতে।। দাপুটে মানুষটা আজ কতই অসহায়,,,এটাই সৃষ্টির নিয়ম। মানুষ জন্ম নেয় বড়ো হয়,জীবন কাটায় আবার একটা সময় সেই পরম দয়াময় সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যেতে হয়।।ইয়ানা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল,,,এই বিছানায় শুয়ে থাকা অসুস্থ মানুষটার ওপর আজীবন ঋণী ইয়ানা। যে ঋণ আদায় করার সামর্থ তাদের নেই।।

ইয়ানার বাবা মারা যাওয়ার পর নয় মাসের অন্তঃসত্তাকে যখন তার দাদির বাড়ির মানুষেরা ঘর ছাড়া করেছিল তখন এই মানুষটাই দাঁড়িয়ে ছিল ইয়াসমিন বেগমের মাথার কাছে।। ইয়াসমিন বেগম এবং মিসেস আসফিয়া আপন দুই বোন। ইয়াসমিন বেগম যখন আপনহারা হয়ে ছুটে আসে তার বোনের কাছে তখন আসফিয়া আগলিয়ে নেয় তার বোন কে।। স্বামী হারিয়ে নয় মাসের বিশাল পেট নিয়ে কোথায় যাবে! কি করবে! ভেবে যখন অস্থির ইয়াসমিন বেগম তখনই গম্ভীর স্বরে মুখরিত হয় পরিবেশ,,,ইব্রাহিম সাহেব বলেন,,,
“ইয়াসমিন আজ থেকে এখানেই থাকবে। আসফিয়া আর ইয়াসমিন আমার চোখে সমান। নবজাতকের সাথে কখনোই অবিচার হবে না, আমি আজ থেকে তার দাদু হওয়ার কর্তব্য পালনে নিয়োজিত হলাম।। এটাই তার শেষ ঠিকানা হবে ইনশা- আল্লাহ্।”

ইব্রাহিম সাহেবদের কথা রেখেছে ,,,হেরফের হয়নি এক সুতো পরিমানও।। ইয়ানার ভাবনার মাঝেই ডাক্তার হাজির হয়।। নানান চেকাপ এর পর জানা যায় সুগার লেভেল হাই, প্রেসার ও স্বাভাবিক নয়। ইনজেকশন দিয়ে আপাতত ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে ইব্রাহিম সাহেব কে। বেশ কিছু ওষুধও পেস্ক্রাইভ করেছেন ডক্টর।। ধিরে ধিরে রুম খালি হলো থেকে গেলেন আফতাব মিয়া আর ইয়ানা।। ইয়ানা আফতাব মিয়া কে আশ্বাস দিয়ে বললো,,,”তুমি যাও খালুবাবা আমি আছি দাদুর পাশে। একটু রেস্ট নাও নাহলে চিন্তায় তুমিও অসুস্থ হয়ে যাবে।”
সত্যি ভদ্র লোকের আরামের প্রয়োজন,,,তাই দিরুক্তি না করে মুচকি হেসে মাথা নাড়ালেন ইয়ানার মাথায় হাত রেখে বলল,,,”রিফাত এর মত আব্বু ডাকলে খুশি হব মা। একবার ডাকবি!”

“জ্বী,,খা,,,আব্বু।”
“বাহ্ ,,এই তো আমার মেয়ে,,,অসুবিধে হলে আমায় ডেকো কেমন।”
ইয়ানা মাথা নাড়ায়। চলে যান আফতাব মিয়া। ইয়ানা বসে ইব্রাহিম সাহেব কে পাশে,,,বৃদ্ধার হাত আগলিয়ে নেয় নিজের হাতের মুঠোয়। বেশ কিছু দোয়া দরুন পরে ফু দিলো দাদুর মাথায়।। সময় বয়ে গেল অনেক টা। মিট মিট করে চোখ মেলে তাকালেন ইব্রাহিম সাহেব,,পাশেই ইয়ানা কে দেখে মৃদু হাসলেন। ইয়ানা চট জলদি নড়ে চড়ে বসলো,,,অশান্ত হয়ে বললো,,,
“কেমন লাগছে দাদু?”
ইব্রাহিম সাহেব ধির কন্ঠে শুধায়,,,”আল্লাহর রহমতে ভালো লাগছে,,,আমায় একটু উঠে বসতে সাহায্য করতো ইনু,,,পিঠ ব্যাথা করছে শুয়ে থেকে।”
ইয়ানা তার চিকন আঙ্গুল যুক্ত হাতের সাহায্যে লম্ববা চওড়া ইব্রাহিম সাহেব কে বসতে সাহায্য করে। অতঃপর পাশে বসে বলে,,,

“নিজের যত্ন কেনো নাও না দাদু!,,,মেডিসিন শেষ হয়েছে দুই দিন,,,বলনি কেনো!”
“ধুর,,,আর ভালো লাগে না ওই তেত,লম্বা ওষুধ খেতে।”
“এরকম বললে তো হবে না।। বাচ্চা হয়ে যাচ্ছ তুমি একদম ”
ইব্রাহিম বিস্তার হাসলেন,,, ইয়ানার গাল টেনে বললেন,,,”তাহলে এই বাচ্চার জন্য একটা খেলার সাথী এনেদে।”
ইয়ানা থমথমে খায়। প্রথমে ভরকে গেলেও পরপর ঠিকই বুঝতে পারে ইব্রাহিম সাহেব এর কথার অর্থ। শুকনো ঢুক গিললো সংগোপনে। তত্পর হসার চেষ্টা করে কথা ঘুরানোর ছলে বলে,,,
“আমি তোমার জন্য খাবার আনি দাদু,,মেডিসিন খেতে হবে।”
ইয়ানা উঠে চলে যেতে নিলে আবারও শুনতে পায় ইব্রাহিম সাহেব এর উদাস কণ্ঠ,,,,”নাতির ঘরের সন্তান দেখার সৌভাগ্য কয়জনেরই বা হয়!?”
ইয়ানা কথাটি শুনেও চুপ চাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শব্দ হচ্ছে তার।কপাল ঘামছে। শান্তহীন চিত্ত। দাদুর এই চাওয়া,আবদার সে রিফাত কে মুখ ফুটে বলবে কি করে!!

রাতের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ। দাদুর কামরায় গিয়ে তাকে ওষুধ খাইয়ে ইয়ানা এক প্রকার আদেশ দিয়েছে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর।।এখন রাত প্রায় সাড়ে এগারো না। আজ আলেয়া আর ইয়ানা তার রুমে ঘুমিয়েছে যেখানে রিফাত এর কামরায় শিফট হওয়ার আগে তার আস্তানা ছিল।। আলেয়া বেঘোরে ঘুমাচ্ছে,,,মেয়েটা রাত জেগে পড়তে চেয়েছিল কিন্তু ঘুমের টালে চোখ খুলতেও পারছিল না। ইয়ানা অবাক হয়ে রয় আলেয়ার কীর্তি কলাপ দেখে,,কতটা পরীক্ষার ভয় হলে মানুষ চোখ টেনে পড়ে!তাই ইয়ানা এক প্রকার টেনে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল বললো সকাল সকাল ডেকে দিবে তাকে,আলেয়া ও আশ্বাস পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।।
ঘুম নেই চোখে ইয়ানার,,বারংবার দাদুর কথা মাথায় আসছে তার। সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর ইয়াসমিন বেগম ও কথায় কথায় ইয়ানা কে বাচ্চার বিষয়ে ভাবতে বলেছেন,,,”এই বার রিফাত আসলে আর দেরি করিসনা মা,,,তোদের বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর হতে যায়,,,আমাদের কি ইচ্ছে হয় না মেয়ের কোল ভরা দেখতে।” সেদিন ইয়ানা শুধুই মাথা নাড়ায়,,,কোনো রুপ উত্তর দিতে অক্ষম ছিল সে। তাদের মাঝে এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কই হয়নি সেখানে বাচ্চার বিষয়ে আলোচনা নিতান্তই অহেতুক।।

ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হেঁটে যায় ব্যালকনিতে।শান্ত,স্নিগ্ধ পরিবেশে গা ভাসাতে মন চাইছে।আকাশের সেই শুভ্র চাঁদ কারোর কাধে মাথা রেখে বিলাস করতে মন চাইছে। পাশেই ছোট্ট বিছনার উপর শুয়ে আছে মিশি,,,বিড়ালটা তার অত্যাধিক প্রিয়,,,রাস্তায় পীড়িত ভাবে ছোট্ট মিশি কে পরে থাকতে দেখেই তাকে ঘরে নিয়ে আসে ইয়ানা,,,যত্ন সহকারে বিড়াল ছানাকে সুস্থ করে তোলে নিজ হাতে।। হঠাৎ করেই হাতের মুঠো ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে,,,চমকে স্ক্রিনে তাকাতেই ঠোঁট দখল করে খোলা হাসি। আজ দুই দিন পর মানুষটার কণ্ঠ শুনবে ভেবেই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে চিত্ত। ইয়ানা রিসিভ করে কানে ধরে ফোন,,, দুষ্টু কন্ঠে বলে,,,

“কাকে চাই!”
“আমার বউ কে,,,”
রিফাত বোঝে মেয়েটা দুষ্টামি করছে তার সাথে। চোখে হাসে ছেলেটা।। বুক টান করে দাড়ায় আয়নার সামনে,,,চুলের ভাঁজে ব্রাশ চালিয়ে ধির গতিতে হেঁটে বারান্দায় দাড়ায়। তির্যক হাসি লেগে আছে অধর কোণে। ইয়ানা শিউরে ওঠে রিফাত এর কথায়,,,আমতা আমতা করে বলে,,,
“কে বউ!! আপনি কে! এত রাতে মেয়েদের ফোন করতে লজ্জা করে না!”
” আমি ডক্টর রিফাত হোসেন মিসেস ইয়ানা হোসেনের একমাত্র হাসবেন্ড আর লজ্জা আমার বরাবরই কম,,,আমার লজ্জাহীনতার বর্ণনা আমার বউ একটু হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছে।”
“এই সব আমায় বলে লাভ! আমি কি আপনার বউ?”
“তবে কি আপনি আমার শালী!”

রিফাত এর এহেন কথায় ইয়ানা লজ্জা পায়,,,তার করে দুষ্টামি তার উপরেই ভারী পড়ছে,, হেসে উঠলো ইয়ানা। হাসির ঝনঝন শব্দ কর্ণগ্রিন্থি তে আঘাত লাগতেই ফচাৎ করে উঠলো অন্তর।। ‘ কারোর হাসির শব্দেও কেও মাতাল হয়! হ্যাঁ হয়,এই যে রিফাত হচ্ছে।’ ইয়ানা হাসি থামিয়ে বলে,,,
“কী করছেন!?”
“হোটেল আসলাম একটু আগে,,ফ্রেশ হয়ে কল করলাম।। ওখানে প্রায় বারোটা,,,জেগে আছো কেনো এখনও?”
“ঘুম আসছিলো না তাই। খেয়েছেন কিছু?”
“খাবো পরে,,, আই উইল মিসড ইউ”
“মী ঠু”
ইয়ানা একদম ধির কন্ঠে বাক্যটি উচ্চারিত করলেও তাহ ঠিক শুনতে পায় রিফাত।। ইয়ানা বলে,,

“কবে আসবেন।”
“আসবো খুব দ্রুত।। কি নিয়ে আসবো ম্যাডাম”
“কিছু না,,,আপনি আসলেই হবে”
“আমি তো আসবই। বউ এর জন্য কিছু না নিয়ে গেলে যোগ্য স্বামী থেকে বহিস্কার হবো,,,তাই কিছু একটা তো লাগবেই। ”
“উম,,কি বলি আমার কাছে সব আছে।। আচ্ছা সুইজ ওয়াইন আনবেন।”
বলেই ঠোঁট টিপে হাসে ইয়ানা। রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে। বেকায়দায় পড়ে রিফাত,,,মেয়ে বলে কি? কিংকর্তব্য বীমুর হয়ে রয় কিছু সময় আবার পরক্ষনেই এক ঢুক চিপে বলে,,,
“আনলে আমার সামনে বসেই খেতে হবে।”
ইয়ানা ভরকে যায়,,,এই ছেলে তো তার কথা সত্যি নিয়ে নিলো। ইয়ানা চট পট করে বলে,,,”সত্যি বলিনি,,,মজা করলাম।”
রিফাত কিছুই বলে না,,চুপ থাকে।। অনুভব করে ইয়ানার গভীর নিঃশ্বাস। গোল ফ্রেমের চশমা কিছুটা ঠেলে দেয় খাড়া নাকের ডগা হতে। বুক টান করে প্রশ্বাস ছাড়ে,,,চোখ যায় নিচের দিকে,,,রাস্তার পাশ ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে বহু কপোত কপোতী। হাতে হাত,শরীরে শরীর ঠেকিয়ে আপন মনে গন্তব্য খুজ্জে নিজেদের।। কানে আসে ইয়ানার মৃদু স্বর,,,

“আছেন?”
রিফাত হুট করেই স্নেহ প্রবন হয়,,আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে শুধায়,,,”ভীষণ তৃষ্ণা অনুভব করছি,,তোমাকে দেখার তৃষ্ণা,,,আলতো ছুঁয়ে দেওয়ার তৃষ্ণা,,,আমি কি আবার প্রেমিক হচ্ছি ইনু!?”
ইয়ানার সর্বাঙ্গ কেপে উঠলো। মূর্ছা যাচ্ছে কণ্ঠ নালি। ইয়ানা ছলাৎ ছলাৎ বুকে হাত রেখে অনুরাগ সুরে বলে,,,” আপনি আমার প্রেমিক,,,আমার একমাত্র প্রেমিক।”
“আমি ফিরে তোমায় সম্পূর্ণ চাইবো ইয়ানা,,, দোষ করবো কি!?”
“আপনার স্ত্রি আপনার অপেক্ষায় থাকবে।”
ইশ,, কি নিদারুণ সংশয় ছাড়া উক্তি। রিফাত এর প্রশ্নের উত্তর,তার চাওয়া সবটার জবাব এক বাক্যে।। ইয়ানা ঠোঁট কামড়ে ধরলো,,লাজে আরক্ত তার মূখায়ব। রিফাত যেনো টের পায় তার অর্ধাঙ্গিনীর লজ্জা,,,হুট করেই গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,,,”খবরদার লজ্জা পাবে না মেয়ে,,,আমি ছাড়া কারোর সামনে লজ্জা পাওয়ার বারণ।”
“আমি একা।”
“একা একা ও বারণ।”
ইয়ানা মুচকি হাসে। অতঃপর কি মনে করে উদাস ছোট্ট মন। ভারক্রন্ত কন্ঠে বলে উঠলো,,,
“জানেন দাদুর শরীর আজ হুট করেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল,,,”
“কথা হয়েছে আমার দাদুর সাথে”

ইয়ানা বোঝে রিফাত এর মন ভাব। তাই চুপ হয়ে যায়। তারও যে দাদু কে নিয়ে চিন্তা হয়। হুট করেই ইয়ানার মনে পড়ে দাদুর বলা কথা। সে কিভাবে এই কথা বলবে রিফাত কে। লজ্জাও পাওয়া যাবে না। রেলিংয়ে বৃদ্ধা আঙ্গুল এর নখ দাবায় সে,,,পায়ের আঙ্গুল শক্ত করে ফ্লোরে রাখে। শরীর দুলে উঠছে তার,,,পেট মুচড়ে উঠছে। কি ভাবে বলবে ভেবে পাচ্ছে না।। ঠোঁট গোল করে বেশ কয়েকবার নিশ্বাস ত্যাগ করে,,,সামলায় নিজের উত্তেজিত চিত্ত।। গলা কেশে ধির কন্ঠে এলোমেলো ভাবে বলতে আরম্ভ করে ইয়ানা,,,
“আ- আমি,, মানে দাদু আ- আমায় বলছিলো,, যে”
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট বেবি ইয়ানা।”

ইয়ানা কথাটি শুনেও যেনো মনে হয় ভুল শুনেছে। তত্পর রিফাত একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে ইয়ানা নিশ্চিত হয় সে ঠিক শুনেছে।। কপালের ভাঁজ সমান হয় ইয়ানার। চোখে মুখে অন্ধকার নেমে আসে,,,রিফাত কি বলছে এই সব।। ভুল ভাল কথা বলার অভ্যেস নেই রিফাত এর,,,তাহলে সে এই রকম মজা করলো কেনো! ইয়ানা গলা কাপে,,, ঠোটের মাঝে হাসি টানার চেষ্টা করে বলে,,
“মজা করছেন তাই না আপনি।”
“আম নট কিডিং”

ইয়ানার চোখ ভরে উঠলো। গলার ভেতর দলা পাকিয়েছে হাজারো বাক্য। বুকের মাঝে পাথর চাপিয়ে দিয়েছে যেনো কেও,,, অক্সিজেনের ঘাটতি অনুভব করে ইয়ানা। যদি রিফাত দেখতো তার বোকা প্রেয়সীর অবস্থা সে সহস্র অজস্র বছরেও নিজের এহেন কথার বিনিময় ঘটাতো না।। অশান্ত হয় ইয়ানার মন। জোরে শ্বাস টানে মেয়েটা। স্তম্ভিত শরীর যেনো এক চুল পরিমান নরার সাহস নেই। ঠোঁট কামড়িয়ে ধরে। উরু উরু মনের যেনো কেও ডানা কেটে নিয়েছে। কোটি কোটি ক্লেশ এর মাঝে শুনতে পায় প্রিয় পুরুষটির উদ্দামতা প্রণীত কণ্ঠ,,,
“তুমি আমার জীবন বৃক্ষের শেষ অঝরা কাঠগোলাপ, যার ঘ্রাণে,মায়ায় ভরপুর আমি,,,তুমি নামক কাঠগোলাপ ঝরে পড়লে আমি মরুভূমির মাঝে মরিচিকা।।”
“রি- রিফাত”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৫

“তোমার আবদার আমার শীর্ষে কিন্তু প্রসঙ্গ যেখানে তুমি সেখানে বাস্তবতার কঠিনে আমি।
ঘুমাও ইনু,,, নির্ঘুম রাত তোমার খুব কাছে।”
ফোন কেটে যায় ও পাশ থেকে। ইয়ানার অন্তরে মিশ্রিত অনুভূতি।। মানুষটা কখনো ভালোবাসি উচ্চারণ করেনি তবে তার কথায়, কাজে ইয়ানা অনুভব করে এই নির্ভুল, নিখুঁত ,উন্মাদ ,কঠিন ভালোবাসা।। রিফাতের তিক্ত কথা যেন ইয়ানা া এমনি ভুলে গেল মনে রইলো রিফাতের কঠিন প্রণয় মিশ্রিত বাক্য,,,সিক্ত হয় আবেগে।। চোখের কোনে থেকে গেল নোনা জলের হালকা ছাপ।।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৭