এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৭
আসিফা খান
সময় নিজের সীমারেখা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। বিরহে ডুবে থাকা দুই হৃদয় আকুল হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে নিজের প্রিয়তমার। ইয়ানা আর আতিকা এই দুই বালিকা কয়েকদিনে অনেক সময় কাটিয়েছে। হাসি,মজা করে দিন পর করেছে দুই সখি রমণী,,কিন্তু তাদের মনে বয়ে চলেছে প্রিয়তমের দূরত্বের বেদনা। কিন্তু খুব শীঘ্রই এই বেদনা মিটবে আর সেখানে এসে হাজির অনুরাগের মেলা।
খুশির আমেজ বিরাজ করছে হোসেন পরিবারে।। সকাল থেকেই সবাই ব্যাস্ত রিফাত এর আসার আনন্দে নানান পদের রান্নায়। প্রায় ২১ দিন পর দেখা মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির। বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরবে আজ। বিকাল এখন চারটা। চারিদিকে ছড়িয়ে সূর্যের মিষ্টি আলো। নামাজ আদায় করে ইয়ানা বেরিয়ে আসে রুম থেকে। আজ সে নিজের হাতে গাজরের হালুয়া রাধবে প্রিয় পুরুষটির জন্য। কসরত করে শিখেছে।। ইয়ানা বিন্দু মাত্র রান্না জানেনা,,,মসলা পাতি তার সব অজানা। রান্না শেখার ইচ্ছে থাকলেও তার আন্টি মা কখনোই রান্নার ধারে বারে ঘেঁষতে দেয়নি।। গাজরের হালুয়া রিফাতের পছন্দের একটা খাবার। জানতে পেরেই ইয়ানা ভীষণ উৎসাহের সাথে এই রান্না শিখেছে।।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
হালুয়া শেষ করতে করতে মাগরিব হয়ে এলো। সুমধুর আযান শোনা গেলো চারি পাশ থেকে। ইয়ানা ঝট পট হালুয়া একটা বড়ো পাতিলে গুছিয়ে রুমে গেলো। অজু করে নামাজ শেষ করলো। মোনাজাতে সময় নিলো। চাইলো একটা সুন্দর জীবন।। অতঃপর নামাজ পাটি পাট করে আয়নার সামনে দাড়ালো। হুট করেই কেমন জানি লজ্জা ঘিরে ধরলো তাকে। রিফাত এর সামনা সামনি দাড়াবে কি করে সে! এই একুশ দিনে মানুষটার সাথে ফোন আলাপে এতই সহজ হয়ে গিয়েছিল যে,,,নির্দিধায় সমস্ত মনের কথা ব্যাক্ত করেছে ইয়ানা। কিন্তু এখন যখন মানুষটা তার সামনে আসবে, কি ভাবে চোখে চোখ মেলাবে সে!
দরজায় টোকা পড়তেই ইয়ানার চেতনা ফিরলো। মাথায় ওড়না চাপিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো আলেয়া উদাস মুখভঙ্গি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো,,,
“কি হয়েছে আলু বুড়ি?”
আলেয়া ঠোঁট ফুলিয়ে ধপ ধপ পা ফেলে রুমে প্রবেশ করতে করতে বললো,,,”দাদাভাই ফোন করেছিলো দাদু কে বললো,আজ আসতে পারবে না। কোনো ইম্পর্টেন্ট কাজ পড়ে গেছে নাকি।”
আলেয়ার কথায় ইয়ানা থমথমে খেলো। মুখের আদলের পরিবর্তন হলো তার। হঠাৎ করেই প্রচুর রাগ এসে ভিড় করলো মাথায়। কিছুক্ষণ পূর্বে যে মেয়েলি অবয়বে বিরাজ করেছিল লাজের আবরণ তাহ মুহূর্তের মধ্যেই যেন খসে পড়ল। চোয়াল শক্ত রেখে দু – চার বার শুকনো ঢোক গিলল নিরস গলায়। ইয়ানা চমৎকার একটি মেয়ে। হাসি খুশি,নরম মনের। খুবই চঞ্চল এবং সময় সাপেক্ষে শান্ত স্বভাবের মেয়ে, মেয়ে টা রাগে না বললেই চলে শেষ কবে রেগে ছিল সেটা ইয়ানার জানা নেই। কিন্তু আজ ইয়ানার রাগ হচ্ছে। প্রচুর রাগ হচ্ছে নিজের কাঙ্খিত মানুষের উপর। রাগের থেকে বেশি হচ্ছে এক সূক্ষ্ম কষ্ট।অভিমান। হয়তো এতদিনের চোখে তৃষ্ণা মিটবে বলে মনের মধ্যে যেই আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল সেই ইচ্ছে মিনিটে ধূলিস্বাদ হয়ে গেল জানো।। ইয়ানার কণ্ঠনালী কেঁপে উঠছে, নাক মুখ থেকে নিশ্বাস ফেলছে সে।।
আচ্ছা ইয়ানার মত কি রিফাতের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়নি! ইয়ানার কথা কি বিন্দুমাত্র তার মনে পড়ে না! রিফাতের কি চোখে তৃষ্ণা নেই ! নেই মনের আকুল চাওয়া!,,, রিফাত কি জানে না আগামীকাল একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন! রিফাত কি ভুলে গিয়েছে তার কথা! একবারও মনে পড়লো না তার বোকা প্রেয়সী কে! তীব্র অভিমান,অংঘটিত ক্রোধ জম্মনিল ইয়ানার ছোট্ট মনে। শরীর ঝিম ধরে যাচ্ছে। অবশ ভাব স্পষ্ট চিকন বদনে।
আলেয়া খানিক শিউরে উঠলো ইয়ানার এহেন ভাব ভঙ্গি দেখে। তার শান্ত আপিকে কেমন এলোমেলো দেখাচ্ছে। এক বার শুকনো ঢুক চিপে ধির কন্ঠে বলল,,,”দাদু তোমায় ডাকছে ইনুপী।”
ইয়ানা অধর ভিজিয়ে শুধায়,,,”যাচ্ছি,,,”
আলেয়া বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। আপি কে একা ছেড়ে দেওয়ায় সঠিক বলে মনে হলো তার।। ইয়ানা দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে গেলো। বেসিন এর সামনে দাড়িয়ে একবার নিজেকে দেখে নিলো। শুভ্র মুখাবয়ব লাল হয়ে আছে। আঁখি কোণে স্পষ্ট বারিকনা। ইয়ানা পানি ঝাপটা দিলো ,,, শুকনো চেহারা আর্দ্র হলো মুহূর্তেই।। হঠাৎ ইয়ানা ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। হাওয়ার বেগে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় মোবাইল খুঁজতে অস্থির হয়ে উঠল সে।। একটা সময় বালিশের তলা থেকে পেয়েও গেল সেই কাঙ্খিত যন্ত্র।। সম্মুখে পড়া অবাধ্য চুলগুলো উত্কণ্ঠিত ভঙ্গিতে কানের পিছে গুঁজে ফেললো।। ডায়াল লিস্ট এর প্রথম নাম্বার রিফাত এর,,, কল করলো। এক বার,দুই বার,,,,তিন বার এর কেটে যাওয়ার আগ মুহূর্তে রিসিভ হলো ফোন,,, রিফাত কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো,,,
“ব্যাস্ত ইনু। ফোন তুলছিনা মানে বোঝো একটু। ইম্পর্টেন্ট কাজ পড়ে গেছে,,,নাহলে আজ রাতেই ব্যাক করতাম।। আর এমনিতেও বড়ো হয়ে গেছো কাল নিয়ে নিশ্চই কোনো প্ল্যান নেই!”
এমনি আগামীকাল নিয়ে ইয়ানার কোন প্ল্যান ছিল না, কিন্তু চাইছিল বিশেষ দিনে বিশেষ মানুষটার সাথে সারাদিন সময় কাটাবে।। রিফাতের কিছুটা বিরক্তি সূচক ভঙ্গিতে কথা বলাটা ইয়ানার অন্তরে লাগলো। কান্না দলা পাকিয়ে কন্ঠ নালীতে আটকে গেল যেন।। ইয়ানা নাক টানলো বেশ কয়েকবার।।
ফোনের ঐপাশ নিঃশব্দ দেখে রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে।
“আচ্ছা রাখুন,,,আল্লাহ হাফিজ।
ইয়ানার কথায় স্তম্ভিত হয় রিফাত। পরক্ষণে ঠোঁট চেপে হাসে। বউ কে কাবু করা কিছুটা মুশকিল হবে বুঝে নেয়। অতঃপর অত্যাধিক শান্ত ,শিথিল কন্ঠে বলে,,,” রাগ!! আচ্ছা বলো কি করলে রাগ কমবে!?”
ইয়ানা গমগমে কন্ঠে বলল,,,” আমায় নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আপনি না বিজি! ফোন রাখুন।”
রিফাত হাঁপ ছাড়লো। সে সত্যি ব্যাস্ত,,, আহিল এদিকে তাড়া দিয়ে কিছু বলতে রিফাত ঠোঁট কামড়ে কিছু ভেবে আবেগপূর্ণ ভাবে কিছুটা ধির কন্ঠে বলে,,,”শাড়ী পড়বে ইনু,,কল্পনায় তোমায় খুব শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখতে ইচ্ছে করছে।”
এতক্ষণের অগ্নিশর্মা ইয়ানা রিফাতের এই শীতল বাক্যে যেন নেতিয়ে পড়ে। সমস্ত রাগ উবে যায় বাষ্পের মত। ঠোঁট কামড়িয়ে গোল গোল চোখ করে এদিক সেদিক তাকায়। অতঃপর কিছুটা রাগের ভঙ্গিতে বলে,,,
“করবো না,,,কিছুই করবো না।”
কথাটি বলেই ফোন কেটে দেয় ইয়ানা। এদিকে রিফাত হতভম্ভ। মেয়েটা তার মুখের উপর ফোন কাটলো! এদিক সেদিক তাকিয়ে রিফাত তর্জনি আঙ্গুল দিয়ে নিচের ঠোঁট চুলকায়। ফোন নামিয়ে পকেটে পুড়ে রাখে। খানিক বাঁকা হেসে বির বির করে বলে ওঠে,,,”রেডি ফর সারপ্রাইজ মিসেস।”
চারিপাশ নিস্তব্ধ। রাত অত্যাধিক গভীর না হলেও ঘড়িতে প্রায় সাড়ে এগারোটা। দাদুর ডাকে তখন নিচে গিয়ে সবার স্বাভাবিক আচরণ দেখে আকাশচুম্বী অবাক হয়। বিরক্তি সৃষ্টি হয়।। রাগের বসে সন্ধ্যার পর থেকে ইয়ানা রুম থেকে বেরোয়নি এক চাপা কষ্ট,অভিমানে নিজেকে দগ্ন করেছে। রাতে খায়নি,,, অবশ্য বেশ কয়েকবার আলেয়া, ইয়াসমিন বেগম এবং আসফিয়া সবাই তাকে ডেকে গেছে কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি মেয়েটার।। আজ সারা বাড়ি একটু বেশিই নিস্তব্ধ লাগছে।। বাড়ির সমস্ত সদস্যরা আজ একটু তাড়াতাড়ি নিজ নিজ রুমে ঢুকে পড়েছে।
রুম অন্ধকার হলেও ব্যালকনি থেকে আসছে পূর্ণ চাঁদের শুভ্র আলো।। আজ চাঁদ যেনো একটু বেশি উজ্জ্বল। ধরণীতে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজের স্নিগ্ধ জোছনা।। সোফায় আধশোয়া হয়ে তন্দ্রায় নিমজ্জিত ইয়ানা। পরনের শাড়ির আঁচল ফ্লোরে বিছিয়ে আছে। খোলা চুল এলোমেলো ভঙ্গিতে আস্তানা জমিয়েছে মেয়েটার কপালে,সোফার হতলে। চোখের কোনে এখনো অশ্রু জলের ছাপ স্পষ্ট। আঁখি পলক সিক্ত। হাজার রাগ অভিমানের পরেও মেয়েটা পারেনি রিফাতের আবদার ফেলতে। কল্পনায় হলেও সে রিফাতের সঙ্গ চায়। রিফাতের বাস্তবে, কল্পনায় সে শুধু নিজেকে রাখতে চায়।।তাই নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শুভ্র শাড়ি লেপ্টেছে চিকন বদনে।গভীর নিশ্বাস ফেলছে মেয়েটা।।
নরম গালে শুষ্ক হাত ের স্পর্শ পেয়ে নড়েচড়ে ওঠে ইয়ানা । ভ্রু কুছকে আবারো ঘুমের মাঝে তলিয়ে ফেলে নিজেকে।। সেই কাঙ্খিত হাতে স্পর্শ যেন ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। কেউ যেনো অত্যাধিক অনুরাগ নিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার প্রিয়সী কে। ইয়ানা ভয় সিটিয়ে যায়। ঘুম ভেঙে যায় মুহূর্তেই।। তড়াক করে চোখ খুলে উঠে বসে চিৎকার করার আগেই সামনের অবয়ব তার মুখ চেপে ধরে।। ইয়ানা পিট পিট করে সূক্ষ দৃষ্টিতে তাকাতেই তাহ বড়ো আকার ধারণ করে। এ যে রিফাত। ইয়ানা নিশ্চিত হতে হাত উঠিয়ে ছুঁয়ে দেয় রিফাত এর চাপ দাড়ি। কপালে পড়া ভাঁজ মিলিয়ে যায়। বুক থই থই করে ওঠে। এরই মাঝে রিফাতের হাত শিথিল হয়। কৌতুহল নিয়ে ইয়ানা বলে ওঠে,,
“আপনি!?”
ইয়ানা আরো অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু সমস্ত হরফ আটকে পড়ে কন্ঠনালীতে। বাকরুদ্ধ ইয়ানা,,,অবাক,হতবাক সে। কক্ষ অন্ধকার হওয়ার পরেও ইয়ানা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার অর্ধাঙ্গকে সামনে বসা অবস্থায়। আপাদমস্তক দেখে নিল সে তার স্বামী কে,,পরিহিত শুভ্র পাঞ্জাবি পায়জামা, সবসময়ের মত চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। কপালে ছড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো চুল। ফর্সা গালে খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়িতে অত্যাধিক আকর্ষণীয় লাগছে রিফাতকে। ইয়ানা বিস্মিত,পলকহীন। হৃদয় সিক্ত হল রিফাতের আগমনে।ইয়ানা শুধুই দেখে চলেছে রিফাতকে।। রিফাতের হঠাৎ আগমনে যেমন হৃদয় হয়েছে আকুল, আনন্দ অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছে চিত্ত, সামনে বসা আকর্ষণীয় পুরুষকে দেখে যেমন অন্তর কেপে উঠছে, তেমনি অন্যদিকে চাপা অভিমানে দমিয়ে রাখলো নিজের অনুভূতি।
রিফাত দেখল তার প্রেয়সীর চমক ধরানো কায়া। সাদা শাড়ি, দীর্ঘ ছড়ানো কেশ, লাল হওয়া নাকের ডগা সবই যেন রিফাতকে মুগ্ধ করলো। শুকিয়ে যাওয়া ইয়ানার অধর দুটি বেশি টানলো রিফাত কে। ইচ্ছে জাগলো সেই পাপড়ি দুটো ছুয়ে দাওয়ার। রিফাত দমালো সেই কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছে। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে রিফাত ঝট করে তুলে নিল ইয়ানাকে নিজের কোলে।। আকস্মিক কর্মে ইয়ানা আশ্চর্য হয়। সহসা কিছু বলতে নিলে রিফাত থামায়,,, সম্মোহিত কন্ঠে বলে,,,
“ডোন্ট মেক এনি সাউন্ড মিসেস।”
ইয়ানা দমে যায়। একটা বাক্য বিনিময় করে না। মোমের পুতুলের ন্যায় নিস্তব্ধ রয়। সচেতন দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো। ব্যালেন্স রাখতে গলা জড়িয়ে ধরলো রিফাত এর।। রিফাত চোখে হাসে। সমস্ত গতিবিধি লক্ষ্য করে সে তার বোকা প্রেয়সীর।। এক সময় সিড়ি বেয়ে ছাদে উঠলো তারা। ইয়ানা বিস্ফোরিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে,,,, ছাদ এর রূপ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত। চোখ ধাঁধানো সজ্জা। মৃদু আলোকবাতি,মরিচবাতি,ফুল দিয়ে সাজানো চারি পাশ। ইয়ানার মত সিম্পেল,,যেমন ইয়ানার পছন্দের।। চমকপ্রদ অনুভূতি ইয়ানার।। সুখের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। ইয়ানা ঠোঁট উপর হাত ঠেকায়,,,চনমনে হয় অন্তর। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল হাজার গুন। কাপা কাপা বদনে পিছন ফেরার আগেই শীতল ছোঁয়া পেলো উন্মুক্ত মেদহীন পেটে। থমকে গেল ইয়ানা। শিউরে উঠলো।। মুহূর্তেই কানের লতিতে প্রিয় পুরুষের অধর স্পর্শ পেয়ে চোখ বুজে ফেললো।। এই মানুষটার মধ্যে কি কোনো জাদু আছে? আছে সম্মোহনী শক্তি!? আবারো ঘাড়ের কোণে গাঢ় চুমু খেলো রিফাত। ত্বরিত কানের কাছে ফিসফিস ভঙ্গিতে বিমোহিত কন্ঠে বলে উঠলো,,,
“ইয়ানা,,, উইল ইউ বি মাইন! ফরেভার অ্যান্ড এভার!
এই রিফাত নিজেকে আত্মসমর্পণ করলো তোমার কাছে।। ভয়ংকর ভালোবাসায় আমায় যেমন ছারখার করেছো তেমনি আমাকে উন্মত্ত রূপে দেখার সৌভাগ্য ও তোমার। নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে চাই তোমায়। ভালোবাসার পরিমাপে তোমার ওজন বেশি হলেও নিজেকে তোমার সমকক্ষ করতে চাই। আমার দিনের শুরু,রাতের শেষ বেলা শুধু তোমার। ভোরের সূর্যোদয়,বিকালের চায়ের কাপে তোমায় চাই। দুঃখের সময় সুখী হতে তোমায় চাই। একাকী বিকেলে আমার পাশে তোমায় চাই। সময় বদলাবে চামড়া কুচকাবে, সেই কুঁচকানো হাতের উপরে তোমার হাত চাই।।”
রিফাত কিছুটা থামে অতঃপর লম্বা শ্বাস টানে। ইয়ানা তখনো স্তব্ধ। শুনে চলেছে রিফাত এর কথা,,,
” ইয়ান া, আমি হেরে গেছি। নিজের জেদ, কারো সিদ্ধান্তের ওপর আমি হেরে গেছি।। এইবার হেরে গিয়েও উপলব্ধি করেছি হারের মধ্যে রয়েছে জিতে যাওয়া আনন্দ, সুখ।। প্রথমবারের মতোই আমি হুট করে ভালোবাসায় পড়তে চাইনি, আর পড়িনি।। বিশ্বাস কর তোমায় একটু একটু করে ভালবেসেছি আমি। ভয় পেতাম তোমার কষ্টে।। তোমার ভরসার হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরা, সেদিন ছিল আমার প্রথম উপলব্ধি। বুঝেছিলাম আমি বাঁধা পড়েছি এক মায়াবতীর মায়ায়। আটকে পড়েছি চিরতরে।। বুঝে উঠতে পারিনি ১৬ বছর বয়সী সেই মেয়ে আমার শোক সুষে নেবে আর ভরিয়ে দেবে স্বর্গীয় সুখে।। জানি আমার প্রতি তোমার রয়েছে সীমাহীন অভিযোগ। সে অভিযোগের তলায় নিজের ভালোবাসাকে দাবিয়ে ফেলতে চাই না আমার প্রতি তোমার সমস্ত রাগ ,অভিযোগ কে ক্ষমা করো।
ইয়ানা!? ধৈর্যের পরীক্ষায় আমার নাম্বার কিন্তু বেশি। তোমার ধৈর্যের কাছে আমার ধৈর্য কম হলেও আমার ধৈর্য নিখুত। আমি চাইলেই কবে তোমার প্রতি আমার প্রণয় আছড়ে ফেলতাম,,, কিন্তু অপেক্ষা করতাম আমার প্রতি তোমার সহজ আচরণের। মনের মিলের অপেক্ষায় ছিলাম,,,হয়তো সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে।
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বিশ্বাসের, সম্মানের ,দায়িত্বের ভালোবাসার,,,একে অপরের মনের খোরাক মেটানোর পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে তারা একে অপরের পরিপূরক।। আমার মনের রানী ইয়ানা,,,এই অধমকে কে কি একটু ভালোবাসা যায়!?”
আবেগে উৎফুল্ল ইয়ানা।। গম্ভীর,জেদী, অল্পভাষী, শক্তপোক্ত ব্যক্তিত্বের মানুষের আপনার জন্য এমন আবেগ ,স্নেহ মিশ্রিত করা আত্মনিবেদন নিশ্চিত রূপে আপনার জন্য তার হৃদয়ে রয়েছে অসীম ভালোবাসা।। আচমকা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ইয়ানা। পরিকল্পিত করা এই রাত তার জন্য প্রাপ্তি।। মনে মনে সুখানুভূতিতে সিক্ত হয় ইয়ানা। রিফাত তাকে সামনে ফেরায়,,,আগলিয়ে নেয় নিজের সাথে। চোখের জল মুছে দেয় আলতো হাতে।। কপালে গভীর চুম্বন করে বলে,,,
“কান্না থামাও ইনু! আমি কিন্তু উত্তর পাইনি আমার।”
ইয়ানা নাক টানে। মাথা উঁচু করে ধরা কন্ঠে শুধায়,,,
“যায়,,,একটু না অনেক ভালোবাসা যায়। আপনি আমার প্রথম অনুরাগ,আপনি আমার শেষ ভালোবাসা।”
রিফাত হাসে। পিছনে থাকা হাত সামনে আনে। ইয়ানা ভ্রু কুঞ্চিত করে। রিফাত এর হাতে তার একটা খরগোশ ছানা। ইয়ানা ভালো ভাবে লক্ষ্য করলে দেখে তার গলায় বাঁধা এক পাথরের চকচকে আংটি।। ইয়ানা ঠোঁট আলগা করে,,,রিফাত ইয়ানার কোলে সেই ছানা ধরিয়ে দেয়। অতঃপর তার গলা থেকে আংটি মুক্ত করে ইয়ানার বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলে তাহ পরিয়ে শক্ত চুমু দেয়। ইয়ানার থুতনি ধরে মাথা উপরে তুলে আঙ্গুল দ্বারা আকাশের দিকে ইশারা করে। ইয়ানাও কৌতুক নিয়ে তাকায়,,,সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠলো আলোক ঝলকানি,,,লেখা উঠলো,,,’ love you ‘ মুহূর্তেই তাহ মিলিয়ে গেলো,,,শোনা গেলো রিফাত এর শিথিল কন্ঠ,,,,
“হ্যাপি টুয়েন্টিথ বার্থডে ইনু।”
টনক নড়ল ইয়ানার। উজ্জ্বল হাসি দিয়ে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বললো,,,” হ্যাপি থার্টিথ বার্থডে ডক্টর সাহেব।”
“হোয়াট আ কোইন্সুডেন্স,,, যাকে কিনা নিজের চোখের সামনেই হতে দেখলাম সেই নাকি আমার বউ। হাহ,,,কপাল আমার।”
“খারাপ নাকি!?”
“নাহ,,,একদমই না। লাকি আমি। কয়জনেরই বা ভাগ্য হয়! নিজের বউকে ছোট থেকে বড় হতে দেখা,,,সমস্ত অবস্থায়।”
কথাটি বলেই চোখ টিপ মারল রিফাত। ইয়ানার কান গরম হয়ে আসলো, চোখ বড় বড় করে তাকালো তার স্বামীর দিকে। ঠোঁট কাটা মানুষ, নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে সুদর্শন পুরুষটি।। পৃথিবীতে এমন কাকতালীয় ঘটনা খুব কম হয় যেখানে স্বামী স্ত্রীর জন্ম তারিখ একই দিনে।। ইয়ানা আর রিফাত সেই ক্যাপেল দের মধ্যে একজন। ছেলেটার দশ মত জন্মদিনের দিন ধরণীর বুকে আগমন ঘটে তার স্ত্রীর। রিফাত এর এখনও মনে আছে,,,যখন ইয়ানা কে সে প্রথমবার কোলে নিয়েছিল আকস্মিক ভাবেই ক্রন্দনরত ছোট্ট ইয়ানা কান্না থামিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিল রিফাত এর পানে।।
রিফাত তাকাতেই ইয়ানা ঠোঁট চেপে হাসে।। রিফাত এর হাতের মাঝে নিজের হাত গলিয়ে দেয়। রিফাত এর কাধের কিঞ্চিৎ নিচে অস্থানা পায় ইয়ানার মাথা। নজর চাঁদ পানে স্থির রেখে বলে,,,
“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।। আজকের এই সারপ্রাইজ আমার মনে গেথে গেছে একদম।।”
রিফাত ইয়ানা টেনে সামনে দাঁড় করায়। কোমর পেঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলে। মোহিত দৃষ্টি মেলে ধরে ইয়ানার আঁখিতে,,,ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি থামিয়ে বলে,,,”শুধুই ধন্যবাদে চলবে!! তিরিশ তম জন্মবার্ষিকী আমার তিন তম নয়।। স্পেশাল কিছু চাই,,,কাম অন ইনু,,,,ফোনে কি বলেছিলাম মনে আছে! নাকি মনে করিয়ে দেবো!”
ইয়ানা বোঝে সবই। সে ঠিকই টের পাচ্ছে প্রিয় পুরুষটির আকুল চাওয়া। তবুও ইয়ানা কিছুটা অবুঝ সাজবে। আজ তাকে কদনোর একটু বদলা তো নিতেই হবে। ইয়ানা ভিতরে লাজে রাঙা হলেও উপর উপর নিজেকে ঠিকই সাধারণ রেখেছে। উল্টে ইয়ানা গলা জড়িয়ে ধরে রিফাত এর। ভ্রু কুঁচকে বলে,,,”কি বলেছিলেন ফোনে! আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না ডক্টর।।”
রিফাত বোঝে ইয়ানার দুষ্টামি। মেয়েটাকে আরো কাছে টানে।মুখ নামিয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কি যেনো বলে। তড়াক করে উঠে ইয়ানা। ধক করে উঠল হৃদপিন্ড। পক্ত হাতের বাঁধন ছাড়াতে ব্যর্থ ইয়ানা। লজ্জায় মূর্ছা ধরলো ইয়ানার,,,শুকনো ঢুক চিপে একবার চারিপাশে তাকালো সে। মনে মনে ” অসভ্য” উপাধি দেয় রিফাত কে।। রিফাত এর বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো,,,
“কেক কাটবো,,,আজ না আমার বার্থডে।”
“ভুলে গেলেন মিসেস,,,আজ আমারও বার্থডে।।
গিফট তো আমারও প্রাপ্য।”
“হ্যাঁ,,,আছে তো গিফট। নিজের হাতে আপনার জন্য গাজরের হালুয়া বানিয়েছি,,,চলুন খেয়ে দেখবেন। আরও কিছু আছে তঃ কাল দেবো,,,আপাতত হালুয়া খেয়ে কাজ চালান।। চলুন,,,,”
ইয়ানা রিফাত এর হাত টেনে নিয়ে যেতে চায় কিন্তু পারে না।। রিফাত এক ঝটকায় ইয়ানা কে নিজের সান্নিধ্যে টানে। পৃষ্ঠদেশে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে। ছোটো ছোটো চোখ করে ভ্রু কুঁচকে বলে,,,
“কি কথা ইয়ানা! সমস্ত টা উপলব্ধি করতে পেরেও এড়িয়ে যাচ্ছো! নট ফের,,,”
ইয়ানার দেহশ্রী সযন্তে লেপ্টে নেয়। আকস্মিক নিজের শুষ্ক পুরু ঠোট মিশিয়ে ফেলে ইয়ানার টকটকে লাল অধরে।মুহূর্তেই চোখ খিচে বন্ধ করে ইয়ানা। খামচে ধরে রিফাত এর পেশী বহুল বহু ,কাধ।। এই নিয়ে তৃতীয়বার এর স্পর্শ পেলো ইয়ানা। কিন্তু এই বারের স্পর্শ উন্মাদ। নিস্তব্ধ রাতে প্রেয়সীর ঠোটে মাতোয়ারা রিফাত। গভীর নেশা ধরে যাচ্ছে তার।। ইয়ানা পারে না সাড়া দিতে তাই যা করার রিফাত একাই করে। ধীরে ধীরে ব্যাথা বাড়ে অধরে। এদিকে খোঁচা খোঁচা দাড়ির জন্য নরম গাল জ্বলে ওঠে। একটা সময় নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয় ইয়ানার। অস্ফুষ্ট শব্দ পেয়ে রিফাত মাথা তোলে। বেশ কয়েকবার শাস ছাড়ে,,শুকনো ঢুক গিলে তাকায় ইয়ানার পানে। মেয়েটা মাথা নিচু করে ভারিক্কি নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রিফাত ইয়ানার মুখ দুই হাতের মাঝে তুলে ধরে। মেয়েটার অধর কোণে জমাট বাঁধা রক্ত দেখে রিফাত অসহায় ভঙ্গিতে ইয়ানার দিকে তাকায় । সেথায় আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলে,,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৬
“তুমি রেসপন্স করলে এটা হতো না। একতরফা কিসে এরকম হয়। এখন চলো নিচে,,,রাতে কিছু খাওনি নাকি! এখন খাবে।”
“খাবো না আমি।”
“কিস খেয়ে পেট ভরে না মিসেস। এমনিও রাত অনেক লম্বা হবে তোমার জন্য। মাঝে রাতে দুর্বলতার অজুহাতে পার পাবে না।”
