Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 13

Naar e Ishq part 13

Naar e Ishq part 13
তুরঙ্গনা

“কিন্তু আমার আদরের ধরণ আলাদা। আমার আদর তোর কাছে কষ্ট মনে হতে পারে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। তোর এই শরীর, তোর এই জেদ, তোর সমস্ত অহং-তেজ…সব কিছুর ওপর কেবল আমার অধিকার। বুঝেছিস?”
—“নোং’রামি বন্ধ করুন৷ আমি আপনার হাতের কোনো পুতুল নই। আমার জীবন নিয়ে খেলা বন্ধ করুন।”
—“ওহ রিয়েলি?”
এই বলে কেকে সুহিনের কোমর থেকে তার বাঁধন আলগা না করেই, হঠাৎ করে তাকে শূন্যে তুলে নিলো। আচমকা এই শারীরিক পরিবর্তনে সুহিন আর্তনাদ করে ওঠে। সে দ্রুত কেকের কাঁধে-গলায় আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলাতে চায়।

​”নামান আমাকে! কী করছেন আপনি?”,সুহিনের কণ্ঠস্বর মৃদু কম্পনে কাঁপছে।
​কেকে শান্তভাবে তাকে নিজের বুকের কাছে ধরে রাখল, যেন সে কোনো দামি পুতুল ধরে আছে। তার সম্পূর্ণ দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ সুহিনের ভীতু চোখে।
​”তোকে তোর খেলার মাঠ দেখাচ্ছি।”
বিদ্রূপাত্মক স্বরে এই বলে কেকে এবার সুহিনের মাথার পেছনে রাখা হাত, আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, তার মুখটা নিজের মুখের খুব কাছে নিয়ে এলো। সুহিন চোখ বন্ধ করার আগেই কেকে তার ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরল।
সুহিনের চোখজোড়া যেন কোটর হতে বেরিয়ে আসার উপক্রম। বিস্ময়ে সে হতভম্ব। শ্বাস নিতেও তীব্র কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কেকের জেদ-উম্মাদনা এবং তার হাতের বাঁধন এতই দৃঢ় ছিল যে, সুহিনের পক্ষে নড়াচড়া করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

​সুহিনের সমস্ত শরীর ঘৃণায় ও আতঙ্কে জমে গেল। সে তার শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে কেকের বুকে জোরে ধাক্কা মারতে চাইল, কিন্তু তাতে সামান্যতমও নড়ল না বলিষ্ঠ দেহটি। কেকে তার ওষ্ঠদ্বয় ছেড়ে দিতেই,শূন্যে উঠে যাওয়া সুহিন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“কি চান আপনি? কেনো করছেন এমনটা? আপনি তো সবসময় আমাকে মে’রে ফেলতে চাইতেন। তবে আমার সাথেই কেনো…”

ক্রন্দনরত সুহিনের কথা শেষ হবার আগেই, কেকে নির্বিকারে তার নিকটে মুখ এগিয়ে, চাপা স্বরে আওড়ায়,
“হুঁশশশ! মেরে ফেলতে হলে,তোকে এখনো বাঁচিয়ে রাখতাম না আমি।”
কেকে আলগোছে নিজের বাঁধন হালকা করতেই,সুহিন হাঁপ ছেড়ে নিচে নেমে পড়ে। তবে সে শুষ্ক ঢোক গিলে,কেকের রহস্যময় মুখটার দিকেই তাকিয়ে আছে।কেকের জবরদস্তি সুহিনের কাছে মনে হলো, তার সমস্ত অস্তিত্বকে চূর্ণ করে দেওয়ার এক পাশবিক প্রয়াস। কিন্তু তাই যদি হয়, কেকে যদি কেবল তাকে কষ্টই দিতে চায়, তবে এসবের মানে কি? আদতে এই লোক চাইছেটা কি? হুট করে কিসব চিন্তায় সুহিনের মাথা গুলিয়ে গেল।
​খানিক পরে কেকে যখন সামান্য সরে এলো, সুহিন তখন প্রায় জ্ঞান হারানোর মুখে। তার চোখ বেয়ে এখনও জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এবার আর ব্যথার জল নয়, এক নিদারুণ হতাশা ও আত্মসম্মান হারানোর যন্ত্রণায়। অথচ কেকে তখন নির্বিকারে নিজের হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁট মুছে নিয়ে আওড়ায়,

​”এবার খেলার মাঠটা মনে থাকবে তো?”
কেকের তির্যক হাসির দিকে চেয়ে, সুহিন একনাগাড়ে কিছু একটা ভাবতে থাকে। পরক্ষণেই কিছুটা সংশয় ও কন্ঠে জোর দিয়ে বলল,
“বলুন, আর কি করতে হবে আমায়?”
সুহিনের অভিব্যক্তিতে, কেকে যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে, ক্ষীণ হেসে গম্ভীর স্বরে বলল,
“বেশি না, যাস্ট একটা কাজ ঠিকমতো করতে পারলেই হবে।”
সুহিন এই পর্যায়ে স্বাভাবিক হলো। যা ভেবেছিল ঠিক তাই। এখানে ভিন্নকোনো বিষয় রয়েছে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে আবারও জিজ্ঞেস করল,

“কি কাজ?”
কেকে আনমনে পুনরায় তার কাছে এগিয়ে আসে। সুহিন এবার আর একটুও ঘাবড়ায় না। বরং একই জায়গায় দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যদিকে কেকে শিরদাঁড়া সোজা করে, তার মুখোমুখি হলো। ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি এগিয়ে, সুহিনের ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান কিঞ্চিৎ জমে থাকা তাজা র’ক্ত, আলতোভাবে মুছে দিতে দিতে বলল,
“জাভিয়ান আঙ্কেল আজ তোকে তোর বিয়ের কথা বলার জন্য ডাকবে।”
সুহিন বেশ অবাক হলো। সে বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,
“আমার বিয়ে?”

কেকে তার দিকে চেয়ে,নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ক্ষীণ হাসে। অথচ তার হাতের আঙ্গুলখানি এখনো সুহিনের ঠোঁটে বিচরণরত।
—“হুম, বিয়ে যার সাথেই হোক না কেনো। তুই অবশ্যই রাজি হবি। এবং আমার বিষয়ে কিছু বললে,এখনকার মতো ওখানেই একইভাবে বলবি—তুই কেবল আমাকে ঘৃণা করিস।”
সুহিনের বিস্ময় এখনো কাটেনি। সে কপাল কুঁচকে ভ্রুকুটি করে বলল,
“এসবের মানে কি? আবার কি করতে চাইছেন আপনি?”
হুট করেই কেকের চোয়াল শক্ত হলো। সে আচমকাই,সুহিনের ঠোঁটের কোণের ক্ষতে চাপ প্রয়োজন করতেই,সুহিন ব্যাথায় কুঁকড়ে গেল। সে রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা নিয়েই,ক্ষুব্ধ নজরে কেকে-কে দেখল। অন্যদিকে কেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে, চাপা স্বরে আওড়াল,

“যা করতে বলব তাই করবি। নয়তো এমন হাল করব, মরে গিয়ে স্বস্তি পাবি না।”
সুহিন দমে না। সে আবারও রুক্ষ গলায় বলে ওঠে,
“পাগলামির জায়গা পান না? আপনার বাড়িতে থাকি বলে আমাকে রাস্তার মেয়ে ভেবেছেন? দশ জায়গায় বিয়ে করব আমি?”
সুহিনের অভিব্যক্তিতে, কেকে ঠোঁট চেপে তির্যক হেসে বলল,
“ব্লু-বেরি, মে হু না!”
এই বলেই সে আলগোছে পিছিয়ে যেতে যেতে, ‘মে হু না’ খ্যাত শিস বাজিয়ে ওঠে। শুরুতে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি রইলেও,পরক্ষণেই চোখমুখ শক্ত করে, তীক্ষ্ণ চোয়াল বানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।

সন্ধ্যার পর সুহিন নিজেকে স্বাভাবিক করে, জাভিয়ানের সাথে দেখা করতে নিচে গেল। এই সন্ধ্যার প্রহরে চারপাশটা বেশ শুনশান মনে হলো। তবে সেসব নিয়ে নূন্যতম ভাববার প্রয়োজন মনে করল না সুহিন। মনমেজাজ তার খুব বাজে ভাবেই বিগড়ে আছে।
সুহিন সরাসরি জাভিয়ানের ঘরে না গিয়ে,শুরুতে তার স্টাডি রুমে চলে যায়। হয়তো বা এই সময় তিনি,এখানেই আছেন। যথারীতি জাভিয়ানকে সে স্টাডিরুমেই পেয়ে গেল। ভেতরে প্রবেশ করে, স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“আসব?”

জাভিয়ান যেন তার অপেক্ষাতেই সোফায় বসে ছিল। তাকে দেখামাত্রই ভেতরে এসে সোফায় বসতে বলল। সুহিনও গিয়ে চুপচাপ সোফায় বসে পড়ল। অতঃপর শুরু হলো, দুজনের অদ্ভুত এক বিষয়ে আলাপন। সুহিন ভাবতেও পারেনি যে,কেকের কথা এভাবে ফলে যাবে।
—“দেখো মা, নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর সবার জীবনেই, বিয়ে-শাদি নামক শুভক্ষণ আসা প্রয়োজন। আমি আমার জীবনের পুরো সময়, এই বাড়ি-ব্যবসা আর তোমাদের পেছনেই ব্যায় করেছি। কিন্তু এরমানে এই নয় যে, তুমিও সারাজীবন এসব দায়িত্ব আর কাজকর্মের মাঝেই পাড় করে দেবে। জানি, তুমি এখনোও বয়সে যথেষ্ট ছোট। কিন্তু তবুও আমার একটা বিশেষ ইচ্ছে আছে।”, জাভিয়ান বেশ ইতস্তত ভঙ্গিতেই কথাগুলো শেষ করে থামল। অন্যদিকে সুহিন স্তব্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

—“আমি চাচ্ছি,একটা ভালো পাত্র দেখে তোমার কাবিনটা এখনই করে ফেলতে। পরে সময় করে না হয়, ধুমধাম আয়োজন করে বিয়ের বাদবাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যাবে। আর যদি তোমার পছন্দের কেউ থেকেও থাকে,তাহলেও তুমি বলতে পারো। আমি অবশ্যই সেই ছেলের পরিবারের সাথে কথা বলব।… এখন মা, এই নিয়ে তোমার কি মতামত?”
সুহিন শুরুতে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। আশ্চর্য লাগছে তার। এইসব কি খেলা শুরু হয়েছে। সবকিছু কি করে এতো দ্রুত ঘটে যাচ্ছে? অথচ সে কিছুই করতে পারছে না।
এদিকে জাভিয়ান সুহিনকে তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করে,আবারও বলল,
“মা কোনো সমস্যা? তুমি কি কোনো কারণে বিয়েটা…ওহ হ্যাঁ,পড়াশোনা নিয়ে একদমই চিন্তা করো না। ঐ যে বললাম, এখন কেবল কাবিনটা করিয়ে রাখব।আর তুমিও যতদিন চাইবে,এই বাড়িতেই থাকতে পারবে। এবং পরবর্তী তোমার মতামতেই বাকি সিন্ধান্ত নেওয়া হবে।”
সুহিন নিজেকে তটস্থ করল। শরীরটা ঝিমঝিম করছে। কেকে তখন তার জন্য খাবার নিয়ে গেলেও,সে তা একদমই খায়নি। বলতে গেলে, সারাদিন হতেই সে না খাওয়া।

—“আমার কোনো সমস্যা নেই। আর না কোনো পছন্দের কেউ আছে।আমার জন্য আপনার যা ভালো মনে হয়, আপনি তাই করতে পারেন৷ আমার এতে আর কোনো দ্বিমত নেই।”
সুহিন এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে, জাভিয়ান হয়তো এমন কিছু মোটেও আশা করেনি। ফলে নিমিষেই তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক প্রফুল্লতা জেগে ওঠে। সে নিজের সংশয়িত বিষয়বস্তু নিয়েও নিজেকে আশ্বস্ত করে। যাক, যেমনটা ভেবেছিল এখনো তেমন কিছু হয়নি। তবুও সে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে সুহিনকে জিজ্ঞেস করল,
“আ…কেকে-কে নিয়ে তোমার কি মতামত? মানে যাই হোক,ইদানীং ওর কাজকর্ম আমার তেমন ঠিক লাগছে না। ও কি তোমার সাথে কোনো বাজে ব্যবহার কিংবা…”

জাভিয়ান কথা অসম্পূর্ণ রেখেই থামল। অন্যদিকে সুহিন ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“না,তেমন কোনো সমস্যা করেনি। তবে… অতীত কিংবা বর্তমান মিলিয়ে,আমি কেবল তাকে অপছন্দই করি।”
সুহিনের নির্বিকার অভিব্যক্তিতে, জাভিয়ান ভারী শ্বাস ফেলল। যাক, মাথা থেকে কিছুটা দুশ্চিন্তা নেমেছে। সে স্বাভাবিক হয়ে পুনরায় বলতে লাগল,
“তবে আর বেশি দেরি করতে চাই না। দুই-একদিনের মাঝেই একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করে ফেলি। ভালো পাত্র হাতের কাছেই আছে। শুধু কাবিনের জন্য ছোট্ট করে ঘরোয়া এক আয়োজন করব। বেশি সমস্যা হবার কথা নয়। আ…তুমি চাইলে,তোমার কাছের কাউকে দাওয়াত দিতে পারো। তবে চাইছি না, বিষয়টা এখনই বাহিরের মানুষের কাছে জানাজানি হোক।”

সুহিনও আর কথা না বাড়াতে চেয়ে, আনমনে বলে ফেলল,
“ভার্সিটির বন্ধের ছুটিতে অনেকেই বাড়িতে চলে গিয়েছে। তেমন কেউ নেই যে, দাওয়াতে ডাকা যেতে পারে। যেহেতু বিয়ের আনুষ্ঠানিক আয়োজন এখনই হবে না। তাই ওদের পরেও ডাকা যেতে পারে।”
—“তার মানে বলতে চাইছো,তোমার পরিচিত কেউ আসবে না?”
সুহিন মলিন হেসে বলল,
“জ্বী না।”
এবং সে এই বলেই, আরো দু-একটা প্রয়োজনীয় আলাপন শেষে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। মাথাটা শূন্য শূন্য লাগছে। আগেপাছে না ভেবে সে সরাসরি নিজের ঘরে গিয়ে, ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘড়ির কাঁটায় রাত এখন ঠিক সাড়ে বারোটা। সুহিনের ঘুম ভেঙে গেল। সে আড়মোড়া ভেঙে আলগোছে উঠে বসল। সন্ধ্যা হতে একটানা এভাবেই পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে। চোখ-মুখও খানিক ফুলে গিয়েছে। মাথার চুলগুলো সব এলোমেলো হয়ে পাখির বাসা হয়ে আছে।
সুহিন ঝাপ্সা চোখে, আশেপাশে ফিরে বিছানার কোণে ফেলে রাখা চশমাটা হাতড়িয়ে খুঁজে বের করে পড়ে নিল। মাথাটা প্রচন্ড ঝিমঝিম করছে। সে চোখমুখ খানিকটা খিঁচে দু’হাত মাথায় চেপে ধরল।
রাতের খাবারের জন্য হয়তো কেউ এসে একবার দরজায় ঠকঠকিয়েছে। আবার সে-ই হয়তো ঘুমের ঘোরে, আগুন্তকঃকে চলে যেতেও বলেছে।কিছুটা আবছা আবছা এমন কিছুই মনে পড়ছে।
সুহিন মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে,বারান্দা হতে চাঁদের আলো প্রখরভাবে ঘরের সর্বত্রে ছেয়ে আছে। মাফিন রাত হবার সাথে সাথেই জেগে উঠেছে। সে তার নিজের কাজে ব্যস্ত। মাফিনকে দেখে সুহিন ক্ষীণ হাসে। অতঃপর আচমকাই বলা নেই কওয়া নেই,এক সিন্ধান্ত নিয়ে বসে।

এই মূহুর্তে সে ছাঁদে যাবে। যদিও আসন্ন শীতের আবহে রাত্রির চারপাশ মৃদু কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু তবুও মন চাইছে,এভাবেই সরাসরি ছাঁদে যেতে। যথারীতি আর একটুও ভাববার প্রয়োজন মনে করল না সে। আনমনে বিছানা হতে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
ড্রইং রুম হালকা ডিম লাইটের আলো ব্যতীত,আশপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। নিশ্চিয় সবাই এখন যে যার ঘরে,গভীর ঘুমে আছন্ন। সে ভারী শ্বাস ফেলে সিড়ি বেয়ে ছাঁদের দিকে উঠতে লাগল। শরীর-মাথা এখনও ঝিমঝিম করছে। ফোলা-ফোলা চোখদুটো অনায়াসে বুঁজে আসছে।

তবুও সে নির্বিকারে ছাঁদে চলে গেল। শূন্য ছাঁদের আশেপাশে কোনো অস্থিত্বর ছায়া নেই। কেবল দূরে কোথাও ঝিঁঝিপোকার দল নিজস্ব ছন্দে ডাকছে। সুহিন জরাজীর্ণ নিষ্প্রাণ এক মানবের ন্যায়, ছাঁদের রেলিং এর কাছে এসে দাঁড়াল। শীতল বাতাস এসে বারবার তাকে ছুঁয়ে দিতেই, সে মৃদু শিহরণে কেঁপে উঠল।
এরিমধ্যে তার নজর পড়ল নিচের সুইমিংপুলে। যার কিনারা ধরে কেউ একজন নতুন বউয়ের মতো সেজেগুজে, লাল শাড়ি পড়ে হাঁটছে।
সুহিন একধ্যানে সেই নারী অবয়বকে দেখতে রইল। দৃষ্টিতে তার অদ্ভুত এক আবেশ ছেয়ে আছে। এরিমধ্যে আচমকা সুইমিংপুলের কিনারা দিয়ে হাঁটতে থাকা নারীটি, হুট করে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
নিমিষেই সুহিনের নিষ্প্রাণ অস্তিত্ব ধক করে উঠল। নারীটির ক্ষীণতর রহস্যময় হাসিতে,সুহিন বিস্ময়ের ঘোরে হারিয়ে যায়। সে অস্ফুটস্বরে কেবল এইটুকুই আওড়ায়,’মা’

কেকের চোখে ঘুম নেই। নিজের রুমের পেছনের বারান্দায় গিয়ে আনমনে সে দাঁড়িয়েছে। একহাতে কফির মগ ,অন্যহাতে সিগারেট। দুটোই সে নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিচ্ছে, নিস্পৃহে।
তবে হুট করেই কিছু একটা নজরে পড়তেই,তার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে যায়। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিচের দিকে ফিরে তাকায়। এতোরাতে সুহিনকে বাড়ির পেছনের দিকে আসতে দেখে,সে বেশ অবাক হলো। বাড়ির সামনের দিকটার চেয়ে, এই দিকটা বেশিই শুনশান ও অন্ধকার। কিন্তু কথা তো তা নয়, সুহিন রাতের অন্ধকারে যাচ্ছেটা কোথায়?
এরিমধ্যে সে খেয়াল করে দেখল,সুহিনের ভাবগম্ভীর্য কিছুটা অদ্ভুত। কেমন নিস্তেজ দেহে আনমনে পা ফেলে, সুইমিংপুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আশেপাশে এখন সুহিন ব্যতীত আর কেউ নেই।
কেকে এসব দেখে একমনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই, চোখ-মুখ শক্ত করে ফেলল। তীক্ষ্ণ চোয়াল দৃঢ় করে, হাত থেকে কফির মগ আর সিগারেটটা টি-টেবিলের উপর ফেলে রেখে—বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, উদ্বিগ্ন স্বরে খানিকটা জোর গলায় বলল,

“সুহিন! ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”
সুহিন কোনো প্রত্যুত্তর করল না।যেন সে আর নিজের মধ্যেই নেই। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এসব দেখে কেকের আর বুঝতে বাকি নেই,কি হতে চলেছে। সুহিনের হাবভাব ভালো নয়। এইমূহূর্তে ওকে না থামালে,কিছু একটা করে ফেলবে।

কেকে আর একমুহূর্তও দেরি না করে, তৎক্ষনাৎ রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে,এতো বড় বাড়ির পেছন দিকটায় ঘুরে যেতে যেতেই,সুহিন ততক্ষণে নিজের কাজ সেরে ফেলেছে।
সুহিন সাঁতার জানে না। ছোট বেলায় ইচ্ছে থাকলেও শিখতে পারেনি। সে অধিক পরিমাণে পানি, একত্রে দেখলেই ভয় পায়। বিষয়টা অ্যাকোয়াফোবিয়ার মতোই। তবে তা জন্মগত নয়। বরং, তার এই অদ্ভুত রোগের মূলে রয়েছে অন্ধকার অতীতের দুটো ঘটনা—সেই জেরেই জলের প্রতি তার এই অস্বাভাবিক ভীতি সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই, খুব প্রয়োজন না হলে সে কখনোই বাড়ির পেছনের সুইমিংপুলের ধারেকাছেও আসে না। আর এদিকটায় বাধ্যতামূলক কোনো কাজ না থাকায়, বাড়ির বাদবাকি গার্ডরাও অজানা এক কারণে, এখানে তেমন থাকতে চায় না। ফলে বর্তমানে পানিতে ডুবে নিঃশব্দে ছটফট করতে থাকা, সুহিনকে বাঁচানোর মতো আশেপাশে কাউকেই তেমন নজরে পড়ল না।

কিন্তু হুট করে কেকে’কে বাড়ির পেছনের দিকে এতো বিচলিত হয়ে যেতে দেখায়, কয়েকজন গার্ডের নজরে বিষয়টা ধরা পড়ল। যথারীতি তার সাথে সাথে তারাও পেছন পেছন ছুটে চলল।
এদিকে সুইমিংপুল অব্দি আসতেই কেকে সহ বাদবাকি গার্ডরাও প্রচন্ড অবাক হলো। বাড়ির এই সুবিশাল সুইমিংপুলের ঠিক মধ্যিখানে এক মানব অবয়ব ছটফট করছে। মাথার উপরিভাগের সামান্য অংশ আর হাতদুটো ছাড়া তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আর আশ্চর্যজনক ভাবে মেয়েটা কোনো চিৎকার চেঁচামেচিই করতে পারছে না। বরং মনে হচ্ছে নিচ হতে কোনো অশুভ শক্তি তাকে টেনে নিতে চাচ্ছে।

—“সুহিন!”,বিস্ময়ের স্বরে কেকে একবার তার নামটা আওড়াল। পরক্ষণেই গার্ডরা এগিয়ে আসার আগে,সে গা থেকে জ্যাকেটটা খুলে ফেলে দিয়ে সোজা সুইমিংপুলে ঝাপ দিল। অন্যদিকে গার্ডরা বুঝতে পারছে না কি করবে। অজানা এক কারণে কয়েকজনের মাঝে অদ্ভুত এক ভয়ও ঢুকেছে। পেছন থেকে একজন অবশ্য সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল, জাভিয়ানকে খবরটা দেওয়ার জন্য।
কনকনে ঠান্ডা পানিতে এই মধ্যরাতে ডুব দেওয়া যে সে কথা নয়। হাড়-হাড্ডি জমে যাওয়ার উপক্রম। অথচ কেকে-কে এখন কোনোকিছুই দমাতে পারল না। তার সকল চিন্তা-উদ্বিগ্নতা সুহিনকে ঘিরে।

একদমে সাঁতরে, সুইমিংপুলের মাঝবরাবর গিয়ে, সুহিনকে আগলে ধরতে তার খুব একটা সময় লাগল না। যথারীতি কারো মাঝে ঠাঁই পেতেই, সুহিন জোরে হাঁপ ছেড়ে কেকে-কে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরল। চশমাটা কোথায় খুলে পড়ে গিয়েছে কে জানে। আপাতত ঝাপসা চোখে না কিছু দেখতে পারল। আর না নিজের নিস্তেজ শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ স্থির হতে পারল। বরং তার আগেই সে, কেকের কাঁধে মুখ রেখে একপ্রকার ঢলে পড়ল। কিন্তু সম্পূর্ণ অচেতন হলো না।
সুহিনের এমন ভাবগতিকে নিমিষেই কেকে আরো বিচলিত হলো। সে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত সুহিনকে আঁকড়ে ধরে, সাঁতরে সুইমিংপুলের কিনারায় এলো। তাকে নিজের সাথে আগলে সহসাই মিশিয়ে নিল। অতঃপর বারবার অর্ধচেতন সুহিনের গাল চাপড়ে তাকে ডেকে হুঁশে ফেরানোর চেষ্টা করল।

​”সুহিন! সুহিন! হেই, চোখ খোল।”
​এরিমধ্যে সুহিনের মাথা ও গা গুলিয়ে উঠতেই, সে আচমকা কেকে-র বুকেই বমি করে দিল। সারাদিন কিছু না খাওয়ায়, শুধু পানি ব্যতীত আর তেমন কিছুই বের হলো না।
তবে সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে, সুহিন আচমকা এক অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। কিছুটা স্বাভাবিক হতেই ঝাপসা চোখে কেকের অবয়ব বুঝে নিয়ে, হুট করে তার গালে সজোরে চড় মেরে বসল।
​দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড কিংবা সবেমাত্র খবর পেয়ে ছুটে আসা জাভিয়ান সহ কেকেও এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় প্রচন্ড অবাক হলো। কেকে হতভম্ব হয়ে স্তম্ভিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
​অথচ সুহিন তখন নিজের সর্বোচ্চ রাগ-ক্ষোভ-আক্রোশ মিশিয়ে, ভিজে টইটম্বুর হয়ে যাওয়া কেকে-র টি-শার্টের বুকের অংশ দু’হাতে খামচে ধরে—ক্ষুব্ধ স্বরে হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,

Naar e Ishq part 12

​”কেনো বাঁচালেন? আমার সুখ আপনার সহ্য হয় না, তাই না? আম্মু নিজে আমায় নিতে এসেছিল, তবুও কেনো যেতে দিলেন না? মে’রে ফেলুন আমায়। আমাকেও আপনি চিরতরে শেষ করে দিন। ঐ দেখুন সুইমিংপুল, দেখছেন! এটাই সেই সুইমিংপুল, যেখানে আজ থেকে এগারো বছর আগে আমার মায়ের লা’শ ভেসে উঠেছিল। আর এই সুইমিংপুলেই ডুবিয়ে, আপনি নিজ হাতে আমায় মা’রতে চেয়েছিলেন। নিন, সুযোগ দিলাম। চিরতরে মুক্তি দিন আমায়। তবুও আমি আপনার নার’কীয়তা সহ্য করে বাঁচতে চাই না।”

Naar e Ishq part 14