The Silent Manor part 47
Dayna Imrose lucky
আদিব বলল “তোর কাছে আমার আরো প্রশ্ন রয়ে গেছে! মজিদ মিয়ার মেয়েকে হ’ত্যা করেছি তুই কিভাবে জানলি?
সুফিয়ান ধীর স্থির কন্ঠে বলল “আজ যখন মরুভূমির পথ থেকে ফিরছিলাম, তখন উনার সাথে আমার সে-ই পথে দেখা হয়। অনেক আগে থেকেই ওনার আমার উপর সন্দেহ ছিল।আজ আমি সমস্ত সত্য উনাকে খুলে বলি। এরপর আমিও জানতে চাই- আপনার মেয়ে মা’রা গেছে দশ বছর হয়, কিন্তু কিছুদিন আগে আমাকে কেন বললেন, আপনার মেয়ে হঠাৎ করে মা’রা গেছে?
তখন উনি বললেন “আদিব,আদিব আমার মেয়েকে ধ’র্ষণ করেছে, এরপর মে’রে ফেলেছে।আর এই সত্য উনি আমাকে বারবার বলতে চেয়েও বলতে পারেনি।মেয়ের শোকে শোকে কখনো কখনো পা’গলের মত আচরণ করত।আজ আমি উনাকে শান্তনা দিলাম।আপনার মেয়ের খু’নের প্রতিশোধ নেব, তখন উনি বেশ স্বস্তি পেলেন।আর ফারদিনাকে সাবধানতার চিঠি উনিই দিয়েছেন।আর রশীদ চাচাকেও উনি চিঠি দিয়েছেন।”
সুফিয়ান থেমে গেল। ঘুরে ঝিলমিল এর দিকে তাকাল। ঝিলমিল আরাম আয়েশে বসে আছে।আর ফারদিনা মেঝেতে। সুফিয়ান আদিব কে নির্বাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল “ঝিলমিল কে তোরা এতটা সম্মান দিচ্ছিস!ও কে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ও একজন দাসী।এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু আমাদের কিছু কাজ ও সহজ করে দিয়েছে।ফারদিনার জন্য যে আমরা খাস নজরদারি রেখেছিলাম সে আর কেউ নয়। ঝিলমিল। ঝিলমিল ফারদিনার সম্পর্কে সবকিছু খুলে বলে আমাদের কাছে। এরপর ওই ইচ্ছে করে ফারদিনাকে নিয়ে তোর খোঁজ করে।আমাদের অর্ধেক কাজ ঝিলমিল সহজ করে দিয়েছে।”
সুফিয়ান এর চোখে ক্রোধের লাভা ভেসে উঠল।বলল “ফারদিনা ওকে নিজের বন্ধু ভেবেছিল। কিন্তু শেষমেশ সেই বন্ধুই ওঁর পিঠে ছু’রি মারল।”
আদিব হেসে বলল “তুইও তো ওকে ঠকিয়েছিস”
“আমি ঠকাইনি।যদি ঠকাতাম তবে ওকে ছেড়ে চলে যেতাম।পা’গলের মতন এখানে ওখানে খুঁজে বেড়াতাম না।”
পরিবেশ নীরব।এতটাই নীরব যেন এখন মেঝেতে একটা পাতা পড়লেও সে-ই শব্দ পরিষ্কার শোনা যাবে। খাঁচায় বন্দী বাঘ চুপচাপ বসে আছে।ঠিক সেভাবেই যেভাবে ফারদিনা বন্দি। তাঁর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ সুফিয়ান শুনতে পাচ্ছে। ঘুরে তাকাতেও লজ্জা পাচ্ছে তাঁর দিকে।
সুফিয়ান আদিব কে তাড়া দিল।বলল “এখন আমার প্রশ্নের উত্তর দে।”
আদিব বলল “মজিদ মিয়ার মেয়েকে ধ’র্ষণ আমি ইচ্ছে করে করিনি।পছন্দ করত আমাকে।আমি করতাম না। কিন্তু ও যেন আমার পিছু ছাড়তেই চাইল না।একি তো সামান্য কৃষকের মেয়ে ছিল। হঠাৎ আমার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চলে আসে। ওকে ইচ্ছামত ব্যবহার করার।বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওঁর সাথে রাত কাটাতাম।একদিন আর দুদিন নয়, বহুদিন। এরপর একদিন জানতে পারি ও অন্তঃসত্ত্বা।আমি ভয় পেয়ে যাই, যদি আব্বা জানতে পারে তো আমাকে ভুল বুঝবে। গ্রামে দুর্নাম ছড়াবে। সেসব ভেবে আমি ওকে মে’রে ফেলি।”
থেমে আবার বলল “ এরপর আসি ফারদিনার মাঝরাতে গোসল করার বিষয়ে।” বাক্যটি শুনে অকারণেই সুফিয়ান এর বুকের ভেতর চাপ সৃষ্টি হল। ঘুরে তাকাল ফারদিনার দিকে।ফারদিনা তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না।মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তো কাঁদছেই।ফারদিনার কান্না সুফিয়ান সহ্য করতে পারছে না।ফারদিনাকে শান্তনাও দিতে পারছে না। তাঁর কাছে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হল।
আদিব বলল “ ফারদিনার একটা রোগ আছে। “র’ক্তনাশা নীলশোক’। এই রোগটি শরীরের ভেতর একটি নীলাভ বি’ষকণা তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে র’ক্তকে দূষিত করে।র’ক্ত দিনে দিনে কালচে-নীল হয়ে যাচ।আজ থেকে দু বছর আগে,ও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল,তখন একজন বৈদ্য এসব বলেন।আমরা অনেক ভাবে চিকিৎসা করাই,কাজ হচ্ছিল না।ও সুস্থ হয়ে উঠেনি। এরপর গ্রামের সমস্ত বৈদ্যদের একসাথে ডাকি। উনারা পরামর্শ করেন।বলেন “ এই রোগটি নিরাময় করা যাবে। তারজন্য শিশুদের র’ক্ত দরকার।বি’ষকণাটি শুধু ‘শিশুদের বিশুদ্ধ র’ক্ত” পেয়েই সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়, কারণ শিশুদের র’ক্তে “জীবনী-নীলকণা’ বেশি থাকে বলে উনাদের ধারণা।এই রোগ বছরে মাত্র তিনবার আক্রমণ করে। পূর্ণিমার পরের রাতে।শিশুদের র’ক্ত সবচেয়ে “পবিত্র,দূষণমুক্ত”।
তাই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সেটাই দরকার হত।বছরে তিন পূর্ণিমার রাতের পর ওকে তিনটি শিশুর র’ক্ত দিয়ে গোসল করানো হত। ওঁর অজান্তে ওকে সেই রক্ত দিয়ে তৈরি ঔষধ খাওয়ানোও হত।র’ক্তের সাথে থাকত সাত ধরনের ফুলের নির্যাস।যাতে র’ক্তের গন্ধ না আসে। কিন্তু ফারদিনার এই রোগ আমরা কিভাবে নিরাময় করতাম সেসব ফারদিনা জানত না।ও শুধু জানত,এটা একটা ঔষধ। শেষ সময়ে ফারদিনার জন্য কোন শিশু পাচ্ছিলাম না, তখন আমরা সামসুল এর ছেলেকে ওঁর কাছ থেকে কিনে আছি।আর সবার সামনে সামসুল আর ওর বউ এমন হাবভাব করত যেন ওঁদের সত্যিই কষ্ট হচ্ছে।টাকার লোভে পড়ে গিয়েছিল ওঁরা।গ্রামের শিশুদের আমরা ফারদিনার জন্যই হ’ত্যা করতাম। আমরা কখনো ফারদিনাকে বিয়েও দিতে চাইনি।কেননা, গদাধর পন্ডিত বলেছে ওঁর যদি বিয়ে হয়, আর ওঁর গর্ভে যদি সন্তান আসে তবে আমাদের বংশ ধ্বং’স হয়ে যাবে। তবে ওকে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছা আব্বার কিছুটা হলেও ছিল। একমাত্র মেয়ে বলে আব্বা ওকে অনেক ভালোবাসেন।”
সুফিয়ান ঘৃন্য কন্ঠে বলল “তোদের শিক্ষিত মানতাম। কিন্তু তোরা যে কুসংস্কার মানিস আগে জানতাম না।ফারদিনার যদি এরকম কোন রোগ হয়েই থাকত তবে নিরাময় করার জন্য হয়ত অন্য উপায় অথবা চিকিৎসা ছিল।যারা কুসংস্কার বিশ্বাস করে, তাঁদের মত নিকৃ’ষ্ট মানুষ হয় না।তোরা যখনই মানবি,যে গদাধর পন্ডিত যা বলেছে সব সত্য হবে, বিশ্বাস কর,তখন তাই হবে।যখন তোরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপর ভরসা করবি,তখন তোদের তাঁর উপর নির্ভরশীল করে আল্লাহর রহমত থেকে তোদের বঞ্চিত করবেন।আজ আমার মুখে হয়ত এসব কথা মানাচ্ছে না।আমিও পাপ করেছি, অন্যায় করেছি, বিশ্বাস কর আজ আমি অনুতপ্ত। তবে আমি ফারদিনাকে ঠকাইনি। ওকে ভালবাসি।আমি ওকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাই।”
আদিব হেসে ফেলল।সাথে বাকি ভাইয়েরাও হাসল।আদিব বলল “ওকে নিয়ে যেতে তো দিব না।আর ওকে নেয়ার জন্য তোকে এখানে ডাকিনি।”
“তাহলে?” সুফিয়ান কিছুটা বিভ্রান্ত হল।
আদিব সহ চার ভাই একত্রিত হল।আদিব বলল “দেড়-শো গ্রামবাসীদের তোর জীবিত অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে তো তাই?ওঁদের কোথায় আটকে রেখেছি দেখবি না!”
সুফিয়ান শুধু চেয়েই রইল। কিছু বলল না। এরপর আদিব হাতের ইশারা করল। তাঁর ইশারার সাথে সাথে একটি বড় লোহার দরজা খুলে দিল অনুচররা।খোলার সাথে সাথে কোরোসিন এর গন্ধ ভেসে আসল। দরজার সামনে আর একটি কাঁটার মতো দরজা।তবে এর ভেতর দিয়ে ওপারের দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সুফিয়ান এর চোখে পড়ল সর্বপ্রথম আজমাত এর দিকে। ঘরটির ভেতরে খোলোসার মতন। শুধু গ্রাম বাসীদের মাথা দেখা যাচ্ছে। ওঁদের মধ্যে থেকে একজন মহিলা বলে উঠল “সুফিয়ান ভাই, আমার স্বামী তোমার লগেই কাম করে।উনার নাম বদরু। তুমি আমগো এইখান দিয়া মুক্ত করো।”
সুফিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।গ্রামের মানুষ গুলোকে সে-ই বন্দি করেছে।বদরুর স্ত্রী-সন্তানকেও সে বন্দি করেছে, ওঁদের না জানি কত কষ্ট হচ্ছে ওঁদের।আজ যেন সুফিয়ান অন্যদের কষ্ট গুলো উপলব্ধি করতে পারছে।অন্যদিকে নিজেকে অপরাধীও মনে হচ্ছে।বদরু, হাবলু, লাল মিয়া, সোলেমান ওঁরা যদি সত্যটা জানতে পারে, নির্ঘাত সুফিয়ান কে ভুল বুঝবে। সুফিয়ান নিশ্চিত হল সেই ব্যাপারে।
কেরোসিন এর গন্ধ ধরে সুফিয়ান আদিব কে জিজ্ঞেস করল “ কেরোসিন এর গন্ধ আসছে কোথা থেকে?
“গ্রামবাসীদের শরীর কোরোসিন দিয়ে ভিজিয়ে দেয়া হয়েছে। ভালো করে দেখ, দরজার সামনে অনুচর মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে,ও যদি একবার মশালটা ঘরের ভেতরে ফেলে দেয়, তবে সমস্ত গ্রামবাসীরা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সাথে তোর গ্রাম ধ্বং’স করে দিবে ব্রিটিশ দল। শেষ হয়ে যাবে তোর বোন।”
আদিব এসব কেন বলছে এখনো সুফিয়ান বুঝে উঠতে পারল না। বিষ্ময়কর হয়ে গেল। আক্রা’ন্ত চোখে বলল “কিন্তু তোরা ওঁদের মারবি কেন? ওঁদের শরীরে কোরোসিন দিয়ে ভিজিয়ে রেখেছিস কেন?”
আদিব সহ চারভাই স্বশব্দে হেসে উঠল। অস্বাভাবিক হাঁসি।আদিব থেমে পুনরায় চেয়ারে বসল। সুফিয়ান-কেও বসতে বলল। সুফিয়ান বসে।আদিব বলল “এবার তোর বাকি প্রশ্নের জবাব দেই। তুই প্রশ্ন করেছিলিস না,ফারদিনা আমাদের কাছে ছিল, তারপরও কেন তোকে মিথ্যা বলেছিলাম? জবাব হচ্ছে,আমরা যখন জানতে পারি তোর সাথে ফারদিনার সম্পর্ক তখন আব্বাও জেনে যায় এসব। কিন্তু আব্বা তোদের সম্পর্কে রাজি ছিল, উনি বরাবরই সাহস আর নৈতিকতা দেখতেন।তোর বেলায়ও সেইটা।
যদিও আমি যখন প্রথম তোদের কথা আব্বার কাছে বলি আব্বা রাজি হননি।পড়ে কি যেন কি ভেবে মেনে নেন। কিন্তু এর মধ্যেই তোর সমন্ধে আমরা প্রায়ই সব জেনে যাই।তুই সিলমন হায়দার এর ছেলে জেনেই বাবা চুপসে গিয়েছিল।তুই যেদিন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসিস আব্বা তখন তোর সমন্ধে জেনে গিয়েছিল সব।তাই উনি কি করবেন ভেবে পাচ্ছিল না। আমি সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম।যে, ফারদিনা আজমাত এর সাথে বিদেশে চলে গেছে।আর আব্বা সত্যটা জেনেও চুপ ছিল, কারণ উনি তোর সত্যটা জানার পর কখনোই ফারদিনাকে তোর ঘরে পাঠাত না।ফারদিনার রোগটা নিয়েও আব্বা চিন্তিত থাকত।সত্যি বলতে, আব্বা ফারদিনার রোগ নিয়েও তোর সাথে আলাপ করতে চেয়েছিল। এরপর তুই রাজি হলে ওকে তোর সাথে বিয়ে দিত।কিন্তু, সবকিছু শেষ হয়ে গেল।”
আদিব কিছু চিন্তা করে আবার বলল ” তুই যেদিন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসিস, ওদিন আমরা নিশ্চিত ছিলাম তুই সিলমন হায়দার এর ছেলে। তারপরও তোর আসল পরিচয় এবং পরিচয় লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যর গভীরে যাই আমরা।তখন পর্যন্ত ফারদিনা বন্দি ছিল না।আমাদের নির্দিশে ঝিলমিল ওকে আলাদা একটা ঘরে রেখেছিল।”
সুফিয়ান চুপচাপ বসে রইল।কোন প্রতিক্রিয়া করছে না।
থেমে আদিব আবার বলল “সবকিছু শেষ কিভাবে হয়েছে চল সে-ই প্রসঙ্গে আসি।তুই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার পরদিন আব্বা শহরে চলে যায়।একটা কাজে।আর ঠিক সেই দিন গদাধর পন্ডিত আসেন আমাদের বাড়িতে। সাথে ছিলেন একজন বৈদ্য।ফারদিনা বেশ কিছুদিন ধরেই খাওয়া দাওয়া করছিল না।ভেবেছি হয়ত ওঁর আগের রোগ ধরা দিয়েছে। কিন্তু সেদিন ফারদিনার চিকিৎসা করলে বৈদ্য জানায় ওঁর গর্ভে সন্তান।উনি জানতে চান এই সন্তান বৈধ না অবৈধ?আমরা সত্যটা তখন বলে দেই।উনি তো ছিঃ ছিঃ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিলেন। ছিল শুধু গদাধর পন্ডিত।উনি বলেছেন, ফারদিনা মহা পাপ করেছে।যে পাপের ক্ষমা নেই।ফারদিনা আর ফারদিনার সন্তান যদি বেঁচে থাকে তবে চিরদিনের জন্য শেষ হবে আমাদের জমিদারি।ধ্বং’স হয়ে যাবে আমাদের বংশ।আর উনি যা বলেন সব সত্য হয়।” আদিব থেমে যায়। সুফিয়ান এখন পর্যন্ত তাঁর প্রশ্নের সঠিক উত্তর পায়নি।
আদিব এবার একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকে বলল “উনার কাছে জানতে চাইলাম এর সমাধান কি? তারপর উনি ভেবে বলেন এই সন্তান কার? আমরা তোর কথা বললাম। তোকে একদিন গদাধর পন্ডিত দেখেছিল।তোর রাশি বলেছিল।অশ্বনি।উনার মনে পড়ে তোর কথা। এরপর উনি বলেন তোর অশ্বনি রাশি,তোর অবৈধ ফসল ফারদিনার গর্ভে।তুই যদি নিজের হাতে ফারদিনাকে হ’ত্যা করে ফেলিস তবে এই পাপ থেকে আমাদের বংশ মুক্তি পাবে।আর এইজন্য আমরা কৌশল খুজতে থাকি তোকে দিয়ে কিভাবে এই কাজ করাব?কারণ তুই ফারদিনাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিস!তাই তোর বন্দি করা গ্রাম বাসীদের আমরা বন্দি করে ফেলি।এখন তুই ফারদিনাকে মে’রে ফেল।”
কথাটা বলে আদিব থামতে না থামতেই সুফিয়ান লাত্থি মেরে আদিব কে ফেলে দেয়।আদিব চেয়ার থেকে মেঝেতে পড়ে যায়। ঝিলমিল সহ সবাই চমকে উঠল। সুফিয়ান দ্বিতীয়বার আদিবের কলার ধরে মাটি থেকে তুলে বলল “তোর কত বড় সাহস, ওকে মেরে ফেলতে বলিস, শুয়ো’রের বাঁচ্চা।” রায়ান আরিব এসে সুফিয়ান কে সরাতে চাইল। কিন্তু সুফিয়ান এর শক্তির কাছে পেরে উঠল না।সায়েম তখন চেঁচিয়ে বলল “সুফিয়ান,ওকে ছাড়া,নয় গ্রাম বাসীদের পুড়ি’য়ে ফেলব।সাথে তোর গ্রামের হাজার হাজার মানুষ, সাথে তোর বোনও শেষ হবে।”
সুফিয়ান থেমে গেল।আদিব এর কলার ছেড়ে দিল।আদিব নিজের কলার ঠিক করে চেয়ারে বসল।যেন কিছুই হয়নি। সুফিয়ান বলল “নিজের বোনের সাথে কোন ভাই এরকম করতে পারে, ছিঃ।”
“বোন যদি সংস্কারের বাইরে যায় তো সে-ই বোন রেখে লাভ কি?”
“ফারদিনার কোন দোষ নেই। দরকার হয় আমাকে শাস্তি দে। ওকে ছেড়ে দে।”
আদিব এবার বিরক্তির উদ্রেক করে বলল “যা বলছি তাড়াতাড়ি কর,দেখ একবার যদি বন্দি থাকা সমস্ত গ্রামবাসীদের মে’রে ফেলি তবে তোর লস।এতে করে ব্রিটিশ বাহিনী তোর উপর ক্ষেপে যাবে।তোর গ্রাম মানবশূন্য হবে।তোর বোন হয়ত ওঁদের হাতে ম’রেই যাবে। একজন মানুষের বিনিময়ে তুই হাজার হাজার মানুষের প্রান নিস না।”
সুফিয়ান বিশাল এক দেয়ালের মাঝে যেন আটকে পড়েছে। না সে এদিকে সরতে পারছে, না সে এই দেয়ালের চাপ থেকে বের হতে পারছে।সে নিশ্চয়ই জীবনে মহা পাপ করেছে,নয়ত আজ এরকম বিপদে পড়ত না বলে ভাবছে।যে মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাঁকে কিভাবে নিজের হাতে মে’রে ফেলবে? সুফিয়ান ভাবতে পারছে না।হাত পা কাঁপছে। পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে। মৃ’ত্যুর সামনে মানুষ যেভাবে ছটফট করে সেও,যেন আজ সেভাবে ছটফট করছে।তবে তাঁর যন্ত্রণা যেন কেউ দেখছে না।ভেতরটা শব্দে শব্দে ভেঙ্গে যাচ্ছে।প্রতিশোধ এর বিষা’ক্ত নেশা কখনোই পূণ্যের হয় না,আজ তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। অনুতপ্তের অনুতাপে জ্বলছে সুফিয়ান। চোখে জল।
আদিব সুফিয়ান এর মুখোমুখি হয়ে আবার বলল “যা বলছি দ্রুত কর,নয় গ্রামবাসীরা পু’ড়ে মর’বে।তোর গ্রাম ধ্বং’স হবে।তোর বোন শেষ হবে।তুই যদি আজ ওঁকে নিজের হাতে না মারিস তবে আমরা মে’রে ফেলব।”
সুফিয়ান গর্জনের সাথে বলল “ওকে মে’রে ফেলার কথা একদম বলবি না।” থেমে সুফিয়ান নরম গলায় বলল “দেখ ভাই, কুসংস্কার বিশ্বাস করত নেই,এসব অন্ধ বিশ্বাস। এগুলো মানলে তোরা ধ্বং’স হবি।”
রায়ান সুফিয়ান কে ধাক্কা দিয়ে বলল “তুই কিন্তু আমাদের অনেক ক্ষতি করেছিস, তারপরও কিছু বলছি না,কারণ তোর ক্ষতিও আমরা করেছিলাম। তুই কিন্তু তারচেয়ে বেশি করেছিস, আমাদের গ্রামকে মানবশূন্য করে ফেলেছিস, ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছিস।”
সুফিয়ান বলল “ওঁরা আমাকে বাধ্য করেছিল,আজ তোরাও আমাকে বাধ্য করছিস,নি’কৃষ্ট কাজ করার জন্য।আমি অন্যায় করেছি,পাপ করেছি,তোরা পাপ করেছিস,আর সে-ই পাপের খেসারত ফারদিনাকে দিতে হবে!”
“তুই পাপ করেছিস,আর এখন সে-ই পাপ থেকে আমাদের বংশকে মুক্ত তুই-ই করবি।” সায়েম বলল।
সুফিয়ান এর চোখ দুটো জলে ডুবে গেছে। কুদ্দুস কাঁদছে।সাহস করে আদিবদের বিরুদ্ধে, সুফিয়ান এর হয়ে কিছু বলতে পারছে না।আজ খুব করে কুদ্দুস রশীদ তালুকদার কে মনে করছে।সে থাকলে নিশ্চয়ই আজকের এই দিন দেখতে হত না। কখনোই না। একবার সাহস জোগাড় করছে কিছু বলবে করে, পুনরায় সে-ই সাহস যেন সমুদ্রের অতলে তলিয়ে গেল।
তাঁদের কথোপকথন শুনছিল বন্দি ঘর থেকে আজমাত। আজমাত সুফিয়ান এর উদ্দেশ্যে তির্যক কন্ঠে চেঁচিয়ে বলল “সুফিয়ান, আমাদের মে’রে ফেলুক,যা কিছু হয়ে যাক,ফারদিনাকে কিছু কর না”
সুফিয়ান বন্দি ঘরটির দিকে এগোতে চাইল। তাৎক্ষণিক মশাল হাতে অনুচর সুফিয়ান কে ভয় দেখানোয় জন্য মশালটি ঘরের ভেতরে হালকা করে ফেলে আবার তুলে নিল। সুফিয়ান যেন হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।আদিব বলল “ঘরটির দিকে এগোস না, দেখছিস না, কাঁটার দরজা আছে।তুই ফারদিনাকে মে’রে ফেল। এরপর ওঁদের মুক্ত করে দেব। গদাধর তোকে মা’রতে বারণ করেছে নয়,তোকেও মে’রে ফেলতাম।”
থেমে গেল সুফিয়ান। গ্রামের অসহায় মানুষ গুলোর নিঃশব্দের চিৎকার গুলো ভেসে আসছে তাঁর কানে। একদিকে ব্রিটিশ দল, অন্যদিকে আদিব, একদিকে তাঁর বোন।সব ছাড়িয়ে যেন আজ ফারদিনা তাঁর থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।এই সিদ্ধান্ত একান্তই নিয়তির।ফারদিনা ছটফট করছে না।
সুফিয়ান ফারদিনার সামনে গেল।আজ যেন বাতাসও থমকে শুনতে চাইছে,একজন মানুষ নিজের প্রিয়জনকে হারানোর ঠিক আগে কীভাবে ভেঙে পড়ে।
ফারদিনা তাকাল অবশেষে সুফিয়ান এর দিকে। ভাঙ্গা কন্ঠে পৃথিবীর সবটুকু ব্যথা নিয়ে বলল “আমাকে শেষ করে ফেলো। মুক্তি দাও আমাকে।”
সুফিয়ান অসহায় এর মত তাকিয়ে আছে ফারদিনার দিকে। তাঁর সামনে সে-ই মানুষটি।যাকে সে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে।কিন্তু আজ!-আজ সেই মানুষই তাঁকে বলছে,এগিয়ে যেতে, শেষ করে দিতে তাঁকে।
হঠাৎ তাঁর মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর আদেশও বোধহয় এমনই শান্তভাবে বলা হয়।
তাঁর হৃদয়ের ভেতর একটা অদ্ভুত ঝড় শুরু হলো।
ভালবাসা, অপরাধবোধ, শূন্যতা, অসম্ভব কষ্ট সবকিছু একসাথে আছড়ে পড়ল।সে অনুভব করল,সে যা করতে যাচ্ছে তা শুধু একজন মানুষকে শেষ করা নয় বরং এটা যেন নিজেরই এক অংশকে ধ্বং’স করা।বুকের মধ্যে একটা ভারী চাপা যন্ত্রণা জমে উঠল।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সুফিয়ান বসে হাঁটু ভাঁজ করে ফারদিনার সামনে। কাঁপা হাতে গাল দুটো স্পর্শ করল তাঁর।ফারদিনা তখন সমস্ত কষ্ট আবিষ্কার করে কেঁদে উঠল। সুফিয়ান এর হৃদয়টা কেঁপে উঠল।ফারদিনা অশ্রু মিশ্রিত কন্ঠে বলল “আমার খুব ইচ্ছা ছিল তোমার সাথে সংসার বাঁধার। তোমার সাথে সারাজীবন থাকার। কিন্তু দেখো, নিয়তি আর আমায় বাঁচতে দিল না। পারলাম না তোমার সাথে সংসার বাঁধতে। দীর্ঘ হল না আমার স্বপ্নরেখা।আমি বলতাম না,দেখো একদিন তোমাকে ছেড়ে আমি চলে যাব, সে-ই দিনটা সত্যিই চলে এসেছে,আর তোমাকে কেউ সারাদিন বিরক্ত করবে না।তোমার সাথে ঘুরতে যাওয়ার বায়না কেউ ধরবে না। তুমি বলতে না, আমাকে মে’রে ফেলবে। মজা করে বলতে তাই না!আর আমিও তখন বলতাম, তোমার হাতে আমি ম’রতেও রাজি। শান্তি পাব।
তোমার সাথে সংসার হল না, তোমার থেকে গোলাপ পাওয়া হল না,জনম জনম কাটানো হল না, আফসোস নেই আমার। সত্যি। তোমার হাতে ম’রতে পারব ভেবেই আনন্দ হচ্ছে।খুব আনন্দ হচ্ছে। তুমি আমাকে মে’রে ফেলো।ওই রা’ক্ষস গুলো নয়ত সব শেষ করে ফেলবে। তোমাদের গ্রামের হাজার হাজার মানুষ, ব্রিটিশ বাহিনী শেষ করে ফেলবে।পড়ে কি হবে?আলিমনগরও থাকবে না,সিন্ধুতলিও থাকবে না। আমাকে বাঁচানোর বিকল্প কোন পথ নেই।” সুফিয়ান ফারদিনাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।ফারদিনা ফিসফিসিয়ে বলল “তুমি আমাকে প্রতি’শোধের জন্য ব্যবহার করেছিলে, বিশ্বাস করো, শুনে আমি এতটুকু কষ্ট পাইনি। কারণ আমি তোমাকে এতটা ভালোবেসেছি যতটা ভালো বোধহয় কেউ বাসে না।ভালোবেসে পাপ করেছিলাম তো,তাই আজ এমন দিন দেখতে হচ্ছে। আক্ষেপ রয়ে যাবে এখানে – তোমার আর আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পেল না। তোমার বাঁশির সুর আর শোনা হল না বাঁশিওয়ালা।”
সুফিয়ান ফারদিনাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল।যেন ছেড়ে দিলেই মানুষটা হারিয়ে যাবে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তাঁর। কোনভাবে এই যন্ত্রনা দমানোর মত নয়।
আদিব বালি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল “সুফিয়ান,সময় যাচ্ছে,আজ পূর্ণিমা,আজকেই তোর ওকে শেষ করতে হবে।তুই কাজটা না পারলে বল,আমরা দেখছি বিকল্প পদ্ধতি পাই কিনা ওকে মা’রার।”
সুফিয়ান এর সামনে আর কোন পথ নেই। সমস্ত রাস্তা বন্ধ।সে ফারদিনাকে না মারলে ওঁরা মে’রে ফেলবে।এখান থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই। যতক্ষণ না সে ফারদিনাকে মে’রে ফেলবে ততক্ষণে পথ সৃষ্টি হবে না। বন্দিশালায় বন্দি থেকে সারাজীবন এর জন্য ফারদিনাকে বুকের মাঝে রেখে চিরনিদ্রায় শায়িত হবে, ব্যাপার না। কিন্তু তাঁরাও শেষ হবে, অন্যদিকে দুই গ্রাম ধ্বং’স হবে।সে চাইছে না সব একসাথে শেষ হোক। আবার ভাবছে সেও এখুনি ম’রে যাবে। একসাথে।
সুফিয়ান ইতিমধ্যে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল।ফারদিনা বলল “মে’রে ফেলো আমায়।”
সুফিয়ান ফারদিনাকে সরিয়ে সামনে নিল। তাঁর কপালে চুমু খেয়ে বলল “পাপ করেছি। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। তবে তুমি কোন পাপ করে থাকলে আল্লাহ যেন সে-ই পাপের ভাগীদার সম্পুর্ন আমাকে করেন। তুমি না হয় পরপারে ভালো থাকবে। যদি সুযোগ হয় আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, আমাকে যেন পাও।”
থেমে সুফিয়ান আবার পা’গলের মতন আচরণ করে বলল “ না!তাও সম্ভব হবে না।কারণ তোমাকে তো হালাল বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারিনি।কি কপাল দেখো,তোমাকে পরপারেও আর পাওয়া হবে না।” থেমে আবার বলল “ যে হাতে তোমাকে গোলাপ দেয়ার কথা ছিল, সে-ই হাতে আজ তোমাকে মা’রতে হবে।”
ফারদিনা কাঁদল।বলল “ওঁদের কুসংস্কার আর সংস্কার একদিন ধ্বং’স করবে। অবৈধ সম্পর্ক পাপ, তাঁর থেকেও বড় পাপ মানুষ হ’ত্যা করা। ওঁরা একদিন বুঝবে।”
সুফিয়ান পুনরায় ফারদিনাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তাঁর সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল।সে আর কিছু ভাবতে চাইল না।ফারদিনার নাকমুখ একসাথে চেপে ধরল। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস আটকে গেল।ফারদিনা বাঁচার চেষ্টাও করল না। যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসল আজ তাঁর হাতেই মৃ’ত্যু বরণ করল। সুফিয়ান এর চোখের সামনে কিছুদিন আগের স্বপ্নগুলো ভেসে উঠল।ফারদিনাকে সে নিজের হাতে হ’ত্যা করছে।ফারদিনা সাদা কাপড় পড়ে ঘুরছে। সত্যিই আজ সে-ই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তাঁর প্রতি’শোধ আজ যেন সফল হয়েছে। তবে একান্তই যেন তার একটি বেঁচে থাকার অংশ চিরবিদায় নেয়ার পর।
ফারদিনার নাকমুখ ছেড়ে দিল সুফিয়ান।ঢলে তাঁর বুকেই পড়ল। সুফিয়ান বুঝে গেল,ফারদিনা আর দুনিয়ার বুকে নেই। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে সে। সব শেষ হয়ে গেল।এক ধরনের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাঁকে আঁকড়ে ধরল।তার মনে হচ্ছে যেন পৃথিবী বদলে গেছে।কিন্তু সবাই বুঝবে না এই কঠিন ব্যথা।শুধু সে-ই জানে, এই নীরবতার মাঝে একটি মৃ’ত্যু নয়, দুটি মৃ’ত্যু ঘটেছে।
The Silent Manor part 45+46
তাঁর প্রিয় মানুষটি আর নেই।প্রিয় মানুষকে নিজের হাতে শেষ করা মানে অপরাধ নয়,এটা এমন এক অভি’শাপ যা পুরো জীবন ভেতরে ভেতরে পোড়াবে।একটি শব্দহীন চিৎকার,যার প্রতিধ্বনি সারাজীবন অনুসরণ করবে সুফিয়ান কে। সুফিয়ান ফারদিনাকে আবার জড়িয়ে ধরল।এই ছোঁয়া যেন শেষ ছোঁয়া।বড্ড উদাসীন হয়ে বলল বলল “বলেছিলাম না তুমিহীনা আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব, বিশ্বাস করো সত্যিই তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।আমিও শিগগিরই আসছি তোমার নিকট। আমি কথা যখন দিয়েছি কথা রাখব।__

Ato ta socked ai porbe bolar moto na