Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭
সাইদা মুন

তালহা ঘোমটা টানা মেয়েটির পাশে তাহিয়াকে দেখে ব্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করে, কে এইটা। ভাইয়ের প্রশ্নে তাহিয়া ফিক করে হেসে ওঠে। অবাক ব্যাপার, ভাই যে মেহরীনকে চিনতে পারেনি। অবশ্য চিনবেই বা কিভাবে, এতক্ষণ থেকে ইয়া বড় ঘোমটা টেনে বসে আছে। তাহিয়া হেসে হেসেই বলে,

–”ভাইয়া ও মেহরীন…”
তালহা কিছুটা চমকে এগিয়ে আসে। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে মেহরীন আরও গুটিয়ে যায়।
–”তা এই অবস্থা কেনো ওর? এনি প্রবলেম?”
–”ওর বুঝি শীত লাগছে তাই এভাবে বসে আছে।”
তালহার ব্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে আসে,
–”তো সোয়েটার দে একটা বা কম্বল দিয়ে বসিয়ে রাখ। আর এখন কিসের শীত, দেখ জ্বর-টর এলো কিনা।”
ভাইয়ের কথায় তাহিয়া ফুস করে শ্বাস ছেড়ে বলে,
–”কতোবার বললাম সে শুনলই না, উল্টো বলে এভাবেই ঠিক আছে।”
মেহরীন সাথে সাথে মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
–”আমি এভাবেই থাকবো।”
তালহা এবার গলাটা গম্ভীর করে বলে,
–”কেমন উদ্ভট দেখাচ্ছে…”
–”আহ তালহা, মেয়েটা থাকতে চাইছে থাক না, সমস্যা কি।”
মায়ের কথায় তালহা আর কিছু বলে না। মেহরীনকে মনে মনে “পাগল মেয়ে” উপাধি দিয়ে রুমের উদ্দেশ্যে চলে যায়। আর এদিকে মেহরীন যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে তালহার হাত থেকে। তার কারনেই তো সে এতো বড় ঘোমটা টেনেছে। ছি ছি তার সামনে আর মুখ দেখাতে পারবে না।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বড়দের নাস্তা শেষ, এখন সব ভাইবোনেরা একসাথে বসেছে। তালহা এখনো আসেনি, হয়তো গোসলে। রিতুরা ফিসফিসিয়ে সেদিনের রাত্রি নামের মেয়েটিকে নিয়ে কথা বলছিলো, যে তালহাকে পটানোর চেষ্টা চালিয়েছিলো। মেয়েটি বেশ শেয়ানা সবার সাথেই তাহলে ভাব জমিয়ে নিয়েছে তালহার জন্য। মনে মনে ভয় হয়, তালহার নাম্বারও কি পেয়ে গেছে মেয়েটি। তার ভাবনার মাঝেই রিতু ফারাহকে বলছিলো,
–”মেয়েটা কিন্তু বেশ স্টাইলিশ ছিলো, ড্রেসিং সেন্স দেখেছিস, জোশ না?”
ফারাহ খেতে খেতে বলে,

–”সুন্দরই তবে একটু খোলামেলা ছিলো। বুকে ওড়না তো ছিলোই না। এজন্য একটু ওকওয়ার্ড লেগেছে।”
–”আরে ধুর, এগুলো ফ্যাশন। ওই ড্রেসের সাথে ওড়না নিলে তো ক্ষেত লাগতো।”
মেহরীন তাদের পাশে থাকায় সহজেই তাদের কথা শুনছে। মেয়েটির কথা তার মনে পড়ে, গায়ের সাথে টাইটফিট ছোট টপস আর জিন্স পড়েছিলো। একে নাকি আবার স্টাইলিশ বলে। হাতে দুধের গ্লাস ছিলো আনমনেই গ্লাসের দিকে তাকিয়ে নিজে নিজে বিরবিরিয়ে বলে ওঠে,

–”এটা বের করে জামা পড়লে যদি স্টাইলিশ হয়ে যায়, তাহলে এই স্টাইল থেকে ক্ষেত থাকাই হাজারগুণ ভালো।”
তবে তার বিরবির এতো আস্তে ছিলো যে উপস্থিত সবাই শুনেছে। বড় বড় চোখ কটমট করে একেকজন তাকিয়ে মেহরীনের দিকে। তালহা সবে মাত্রই চেয়ারে বসেছিলো, নজর মেহরীনের দিকেই ছিলো ঘোমটা নেই দেখে। কিন্তু গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার ব্রু কুঁচকে যায়। মেয়েটা কি আসলেই পাগল হয়ে যাচ্ছে? ভাবনার মাঝেই মেহরীনের উক্তি কানে পৌঁছায়। বেচারা সহ তাহসান মারুফও মুহুর্তেই কেশে ওঠে।
হঠাৎ তাদের কাশির শব্দ শুনে মেহরীন ঝটপট নয়নে সামনে তাকায়। দেখে, সকলের চোখ তার দিকেই। তালহারা চোখ এদিক-ওদিক করছে, বোনেদের সামনে এভাবে লজ্জায় পড়ে গেছে বেচারাগুলো। দ্রুত একেকজন নিজেদের নাস্তার প্লেট নিয়ে উঠে যার যার রুমে চলে যায়। এদিকে তাহিয়া গুতা দিয়ে মেহরীনকে ফিসফিস করে বলে,

–”বেয়াদব বেডি, দেখে শুনে কথা বলবি না। ভাইয়াদের সামনে কি বললি।”
মেহরীন আঁতকে উঠে, যেনো লজ্জায় কেঁদে দিবে এমন অবস্থা,
–”আমি তো আস্তেই বলেছিলাম, সবার কান এতো পাতলা আমি জানতাম নাকি।”
এদিকে রিতু কটমট করে বলে,
–”সবার কান পাতলা নাকি তোমার মুখ পাতলা। ক্ষেতরা তো ক্ষেত মার্কা কথাই বলবে। অসভ্য মেয়ে, কোথায় কি বলতে হয় জানে না। আদব-কায়দা শেখেনি।”
–”আহ রিতু, এভাবে বলিস না তো। ও ছোট মানুষ, হয়তো খেয়াল করেনি, বাদ দে।”
ফারাহর কথায় রিতু মুখ বন্ধ রাখে। আর এদিকে মেহরীনের খাবার আর গলা দিয়ে নামছে না। লজ্জায় কান্না চলে আসছে। একে তো কাল থেকে তালহার সামনে যেতে লজ্জায় মরছিলো, এখন আবার নতুন সিচুয়েশন তৈরি করেছে। দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। হন্তদন্ত পায়ে রুমের দিকে ছুটে যায়। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নেয়
“আজকে আর এই রুম থেকে বেরোবো না।”

দুপুর ১২টা ১৩ মিনিট,
এখন মেহরীনরা সব মিলে সামনের আমবাগানের আম চুরি করতে যাবে। সাথে লবণ-মরিচ গুঁড়া মিক্স করা আছেই। আজ মূলত চুরি করে সামনের নদীর পাড়ে বসে খাওয়াই তাদের প্ল্যান।
যেই ভাবা, সেই কাজ টার্গেটকৃত বাড়ির সামনে চলে আসে সবাই। তবে রাফা দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে বলে,
–”আপু, ভেবে বলছো তো? এই মহিলা যেই শয়তান, ধরতে পারলে পুরো গ্রাম জড়ো করবে।”
মেহরীন কোমড়ে কাপড় বেঁধে বলে,
–”এমন কত আম চুরি করেছি, এটা কোনো ব্যাপারই না। মহিলা বুঝবেও না। তোরা এখানেই দাঁড়া, একটু ধাক্কা দিস খালি, আমি দেয়াল বেয়ে উঠছি।”
বলতে বলতেই তাদের সাহায্যে নিমিষেই দেয়াল টপকে ওঠে। দেয়ালের উপর দাঁড়িয়ে পা হালকা উঁচু করে আম পারছে, একটা একটা করে নিচে তাদের পেতে রাখা ওড়নায় ফেলছে।
বড় বড় আমগুলো মনোযোগ দিয়ে পারছিলো, হঠাৎ কারো গলায় ধরফরিয়ে ওঠে। পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলায়।

–”এখানে কি হচ্ছে?”
তালহাকে দেখে একেকজনের হাওয়া ফুস। তালহা যেই মানুষ সে কখনোই তাদের এই অন্যায়ে প্রশ্রয় দিবেনা। উল্টো ইচ্ছে মতো বকা দিবে তা বেশ জানে। তাহিয়া তো ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে,
–”ভ..ভাইয়া, আম নিতে…”
তালহার চোখ সরাসরি মেহরীনের দিকে যেতেই। সাথে সাথে রাগ উঠে যায়, ধমকের স্বরে বলে,
–”এই তুমি দেয়ালে উঠেছো কোন আক্কেলে? পড়লে হাত-পা ভাঙবে, সে ভয় নেই? সেদিক কোমড় ভেঙে মজা বুঝোনি আবার হাত-পা ভাঙতে এসেছো। এক্ষুনি নেমে আসো, ফাস্ট।”
তালহার গলা শুনে মেহরীন তাড়াহুড়ো করে নামতে নেয়। তবে তার আগেই বাড়ির বুড়িটা টের পেয়ে গেছে। আসলে তালহার গলাতেই বুঝে গেছে। মহিলাটি বাড়ি থেকে লাঠি নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে চিৎকার করছে,

–”কোন মাইলেনওরিইয়ে বে আমার গাছর আম পারের? কোন ছি*নালর ফুইরে বে? উবাইস খালি, উবাইস আইরাম আমি উবাইস।”
সিলেটি ভাষায় কি বলছে, মেহরীনের মাথায় কিছুই ঢোকছে না। তবে ভীষণ রাগে গালি ছাড়া কি বা দিবে, সেটা বোঝায় যায়। এদিকে তাহিয়ারা তো মুহূর্তেই ভোঁ দৌড়। মহিলাকে লাঠি হাতে আসতে দেখে মেহরীন পড়ে গেছে ফেসাদে। পেছনে তালহা সামনে মহিলা। দেয়াল উঁচু হওয়ায় নামতে গেলে কারো সাহায্য দরকার, নয়তো পড়ে গিয়ে আঘাত লাগবেই।
বেচারি কাঁদো-কাঁদো মুখ করে অসহায় চোখে একবার সামনে তাকায়, একবার তালহার দিকে। তালহা তাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার ধমক দেয়,

–”এই স্টুপিড, দাঁড়িয়ে আছো কেন? ফাস্ট নামো, এই মহিলা এলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিবে। তোমাদের সাথে আমার মান-সম্মান নিয়েও টানাটানি করবে। ফাস্ট নামো।”
তালহার কথায় মেহরীন দ্রুত একপা একপা করে দু’পা নিচে নামায়। কিন্তু দেয়াল থেকে খাটো হওয়ায় দু’হাতে বাঁদরের মতো ঝুলে আছে দেয়ালে। বেচারি ভয়ে হাতও ছাড়ছে না, নিচে কংক্রিটের গুড়ো। লাফিয়ে নামতে গেলে পড়লে হাত-পায়ে বেশ আঘাত লাগবে নিশ্চিত। অসহায়ত্বের চরম পর্যায়ে সে, তালহার দিকে করুন চোখে তাকায়।
তালহা এই অবস্থা দেখে সিরিয়াস মুহূর্তেও হাসি চাপতে পারে না। হঠাৎ বেশ জুড়েই হেসে উঠে তবে মহিলার গলা খুব কাছে চলে আসছে। কোনোমতে হাসি চেপে দু’হাতে তার কোমর ধরে নিচে নামিয়ে দেয়। তারপর এক হাত ধরে দ্রুত অন্যদিকে দৌড় লাগায়।

তালহা টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে, আর মেহরীন স্তব্ধ হয়ে আছে। অপ্রত্যাশিত স্পর্শে শরীরে হালকা কাপুনি, লজ্জার হানা, আর হৃদস্পন্দন বেড়ে আবারও এক অসম্ভব বাজে পরিস্থিতিতে সে পড়েছে। কিন্তু এই স্পর্শ খারাপ লাগেনি, বরং এক অদ্ভুত ভালো লাগা বয়ে গেছে। কিন্তু তার সাথে তার ভারসাম্য ও নিয়ে গেছে। হাত-পায়ের সমস্ত জড়তারা যেনো ভড় করেছে। তালহা তাকে টেনে নিয়ে দ্রুত হাটছে অন্য রাস্তা ধরে বাড়ি যেতে।
এই মহিলা যদি দেখে ফেলে, আহমেদ বাড়ির কেউ তার গাছের আম চুরি করেছে, তবে আবার বড় ঝামেলা বাধবে। এমনি উৎ পেতে বসে থাকে কিভাবে ঝগড়া লাগানো যায় তাদের সাথে।
মেহরীন চুপচাপ, কোনো কথা নেই। চোখে-মুখে চঞ্চলতাও নেই। তালহা লক্ষ্য করে, মেয়েটি আসলে ততটা শান্ত নয় যতটা তার সামনে হয়ে যায়। বেশ লক্ষ্য করে তার সামনেই কেমন চুপসে যায়, থমকে যায়।
বাড়ির সামনে পৌঁছেই তালহা তার হাত ছেড়ে দেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে আসায় হাঁপাচ্ছে দুজনেই। এবার তালহা সরাসরি তাকায় মেহরীনের দিকে। ভেবেছিলো কিছুক্ষন ঝাড়বে, নইলে পা বেশি লম্বা হয়ে যাচ্ছে মেয়ে মানুষ। কিন্তু তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেয়।
হঠাৎ কর্কশ গলায় বলে উঠে,

–”দ্রুত রুমে যাও। সোজা রুমে যাবে, এদিক-ওদিক নয়। ডিরেক্ট রুমে গিয়ে ডিরেক্ট আয়নায় তাকাবে। যা বলেছি শুনেছো…? তাহসান মারুফ বা যে কেউই ডাকুক শুনবে না।”
তালহার কথায় মেহরীনের ব্রু কুঁচকে যায়। সে কি বলছে, মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। রুমে গিয়ে আবার আয়না দেখতে হবে কেনো? আজব! তালহা তখনও তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরও জুড়ে ধমক দেয়,
–”এই মেয়ে, কথা শোনো না? ২ সেকেন্ডের মধ্যে যাবে নয়তো…”
মেহরীন ভয়ে ভয়ে দ্রুত পা বাড়ায়। কথা মতো সোজা রুমে চলে আসে। মনে মনে বকতে থাকে, লোকটার মুখে একটু মিষ্টি কথা নেই নাকি? সুন্দর করে বললেও তো শুনতাম। আচ্ছা আয়নায় দেখতে বললো কেনো? মুখে কিছু লেগে আছে নাকি?

ভাবতে ভাবতেই আয়নার সামনে যায়। নিজের মুখ খুঁটিয়ে দেখে। কিছু তো লেগে নেই। তবে? ভাবতে ভাবতেই নজর পড়ে জামার দিকে। এক সাইডের কালো ফিতাটা বেড়িয়ে গেছে। মুহূর্তেই মেহরীনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তবে কি তালহা এটাই দেখেছিলো, তাই ওভাবে বলেছিলো? ধপ করে নিচে বসে পড়ে। এবার মনে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুটে পালিয়ে যাওয়ার। যেখানে এই তালহা নামক মানুষটা থাকবে না। তার সাথে শুরুই বা হলো কি। না না আর মেনে নেওয়া যাচ্ছেনা।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬

সে লজ্জার সব থেকে নিম্নতর ধাপে পড়েছে যেনো। গাল, কান, গলা লাল হয়ে উঠছে। হৃদস্পন্দন দ্রুত থেকেও দ্রুততম মনে হয় এখনই ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। হাত-পা কাঁপছে, চোখ মাটির দিকে সীমাবদ্ধ।
এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। নিজের হুশে নেই শুধু নিজের অপ্রৃতিকর মুহুর্তগুলো মাথায় আসছে। হঠাৎ কারো গলায় ধরফরিয়ে ওঠে, সাথে সাথে বাথরুমে ঢুকে যায়। সে কারো সামনে যাবেনা। যেনো কেউ তাকালেই তার লজ্জার কারণ ধরে ফেলবে। তার মুখ দেখে পড়ে ফেলবে তালহার জন্য লজ্জা পাচ্ছে। মাথায় শুধু আজেবাজে চিন্তা, উল্টোপাল্টা জিনিস ভিড় করছে।
সেদিন সবাই চা-বাগানে ঘুরতে গেলেও মেহরীনকে টেনে টুনেও নিতে পারেনি। পেট ব্যথার বাহানায় সারাদিন আর ঘর থেকে এক পাও বের করেনি।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮