প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৮
সাইদা মুন
–এই মিয়া! দেখে তো ভদ্রলোক মনে হয়, কিন্তু স্বভাব এমন চোরের মতো কেন?
ফারিন কথাটা বলা শেষ হতেই পাশ থেকে তাহিয়া খুশিতে বলে উঠল,
–আরে রিশাদ ভাইয়া, তুমি?
রিশাদ এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে ফারিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। পাশ থেকে তাহিয়ার কণ্ঠ শুনে মুখের কোণে আলতো এক হাসি ফুটে উঠল। তাহিয়া দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে রিশাদের সামনে দাঁড়ায়। রিশাদ তার মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে বলল,
–পিচ্চি, কেমন আছিস?
তাহিয়া কিছু বলার আগেই ফারিন কোমরে হাত রেখে রাগী স্বরে বলে উঠল,
–তাহিয়া, এই চোর তোর পরিচিত?
‘চোর’ শব্দটা রিশাদের কানে যেতেই মুখের ভাব পাল্টে গেল। স্পষ্ট অপমানবোধের ছাপ তার চোখে ভেসে উঠল। কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–হেই মিস পকরপকর, মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ। আ’ম নট চোর, আ’ম রিশাদ আহমেদ।
ফারিন মুখ বাঁকিয়ে বলে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
–নাম যাই হোক, কাজকর্ম দেখে যে কেউ বলবে চোর। বলা নেই কওয়া নেই, ছোচার মতো আমার বার্গার নিয়ে নেয়। আবার বলে মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ, হেইইই মাইন্ড ইউর হাত…!
রিশাদ এক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সামান্য এক বার্গারের জন্য এত কথার ঝড়? আগে জানলে জীবনে এমনটা করত না। একটা ছোট ভুলেই ‘চোর’, ‘ছোচা’ কত আজাইরা নাম গায়ে এসে পড়ল। রাগে কপালের রগ টনটনিয়ে উঠল, গলা একটু ভারী করে বলল,
–অভদ্র মহিলা, চুপ করো। আমি ভেবেছিলাম ওটা তাহিয়ার, তাই তুলেছিলাম। আগে জানলে এমন খন্নাস মহিলার জিনিসে চোখও দিতাম না!
তাদের কথার লড়াই ক্রমে বেড়েই যাচ্ছে দেখে তাহিয়া তড়িঘড়ি করে ফারিনের মুখ চেপে ধরে বলল,
–ভাইয়া, এসব বাদ দাও। আগে বলো, তুমি এখানে যে?
রিশাদ হাতে থাকা প্যাকেট দুটির একটি তাহিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়। তাহিয়া খুশি মনে তা নিয়ে নিল। সে জানে, এর ভেতরে আছে তার প্রিয় চকলেট, ক্যান্ডি, আরও মজা। আনন্দে চোখ জ্বলে উঠল, পরক্ষণেই সে রিশাদকে জড়িয়ে ধরল। রিশাদও স্নেহভরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, যেন সেই ছোট্টবেলার মতোই আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে।
তালহা আর তার চাচাদের পর যদি আর কেউ তাহিয়াকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, সে হলো রিশাদ। ছোটবেলা থেকেই তাদের পরিবারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তার। তালহা যেমন ভাইয়ের মতো আগলে রাখে, রিশাদও তেমনই, বরং একটু বেশি আদর দিয়ে রাখে। তালহা যখনই চকলেট বা আইসক্রিম জাতীয় খাবার খেতে মানা করে, তখনই রিশাদ গোপনে তা কিনে এনে হাসিমুখে বলে, “চল, কাউকে বলবি না।” তালহা কঠোর হলে রিশাদ শান্ত থেকেছে।
রিশাদের নিজের কোনো ভাইবোন নেই, মা-বাবার একমাত্র সন্তান সে। তাই তাহিয়ার মধ্যেই যেন নিজের ছোট বোনের সমস্ত মায়া, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ উজাড় করে দেয়। আগে তো বেশিরভাগ সময়ই তালহাদের বাড়ি থাকতো, এখন কাজের চাপে আসাও হয়না।
পাশ থেকে মেহরীন চুপচাপ সবটা দেখছিল। রিশাদের চোখে-মুখে একধরনের আন্তরিক কোমলতা, যা সে আগেও দেখেছে। প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলেছে, সেদিন তালহার সঙ্গে যে তিনজন ছিল, রিশাদও তাদের একজন। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে আর কাউকে দেখা হয়নি।
এরই মাঝে তালহা ক্যান্টিনের দরজায় পা রাখল। মেহরীনের চোখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার দিকে ঘুরে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠল, পরিপাটি মানুষটা আজ যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। টাই গলায় ঢিলে হয়ে ঝুলছে, কোটের নিচে শার্টের এক পাশ ইন করা নেই, চোখদুটো লালচে, ক্লান্ত। “লোকটা ঠিক আছে তো?” মনে মনে প্রশ্ন জাগল মেহরীনের।
এই ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ তার চোখের সামনে কেউ ব্যাগ নাড়ায়। চমকে পাশে তাকিয়ে দেখে, রিশাদ। মেহরীনের দৃষ্টি তালহার দিকে ছিল, সেটা খেয়াল করেই রিশাদ ঠোঁটে এক দুষ্টু হাসি এনে বলল,
–আরে ভাব… ইয়ে মানে আপু, কোথায় হারিয়ে গেলে? ওসব পরেও দেখা যাবে, আগে এটা ধরো, তোমার জন্য।
তার দুষ্টুমি ভরা সুরে মেহরীন কিছুটা লজ্জা পেল। এক ঝলক তাকায় তালহার দিকে, সে-ও তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তবে চোখমুখ কেমন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আবার চোখ ফেরায় রিশাদের দিকে দ্রুত কন্ঠে বলল,
–না না ভাইয়া, এসবের দরকার নেই।
তার কথায় রিশাদের কপাল কুঁচকে গেল। চোখে-মুখে একরকম গাম্ভীর্য এনে দৃঢ় স্বরে বলল,
–আলবাত দরকার আছে। বড় ভাই কিছু দিলে ছোট বোনদের বিনা বাক্যে তা নিতে হয়।
কথাটুকু শুনে মেহরীন থমকে গেল। “বড় ভাই” শব্দদুটো যেন অজান্তে হৃদয়ের কোথাও একটুখানি কাঁপন তুলল। ঠোঁটের কোণ দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল,
–বড় ভাই…
কিন্তু সে যতই নিচু স্বরে বলুক, পাশে থাকা কেউই সেই শব্দগুলো মিস করেনি। সবাই শুনেছে। রিশাদ হালকা হেসে ব্যাগটা মেহরীনের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,
–ইয়েস, আমি তোমার বড় ভাই। এতে কোনো সমস্যা আছে নাকি?
মেহরীন দ্রুত মাথা নাড়ে, ‘না’ বোঝাতে। তবে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। রিশাদ আড়চোখে তালহার দিকে তাকাল, চোখের ইশারায় কিছু জানতে চাইতেই তালহা নিঃশব্দে চোখ বুজে আবার খুলল, স্পষ্ট সম্মতি জানাল।
অনুমতি পেয়ে রিশাদ মেহরীনের মাথায় হাত রেখে আদুরে স্বরে বলল,
–সেদিন তোমার কথা শুনে আমার মা-বাবা একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিল তোমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যেতে। আমিও চেয়েছিলাম তোমাকে নিজের কাছে রাখতে। আমার মা-বাবার মেয়ের স্বপ্নটা পূরণ হতো, আর আমিও পেতাম একটা বোন। কিন্তু…
কথার মাঝেই তার চোখ ঘুরে গেল তালহার দিকে। মুখে একটা কড়া হাসি এনে বলল,
–শা*লা দিলোই না। যাই হোক, ভাইয়াকে মনে রাখবা, কোনো প্রয়োজনে ভাইয়াকে ডাকতে ভুলো না।
মেহরীনের চোখে তখন অশ্রুর ঝিলিক। মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা হঠাৎ একটু বেশি আপন হয়ে গেছে। যে মেয়ের এক দাদি ছাড়া পাশে কেউ ছিল না, আজ সে যেন একসাথে পেয়ে গেল এতজন স্নেহময় মানুষ। রিশাদের হাতের স্পর্শে বুকের ভেতরটা কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। অনুভব হচ্ছে খুব আপন কারোও ছায়াতলে আছে সে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা নিঃশব্দ পানি।
সে মাথা নেড়ে নরম গলায় বলল,
–অবশ্যই ভাইয়া।
পাশ থেকে তাহিয়া গাল ফুলিয়ে বলল,
–ওহ, তোমার ছোট বোন নেই বুঝি? আমি বুঝি ফাও, হুহ!
তাহিয়ার গাল ফুলানো মুখ দেখে রিশাদসহ সবাই মুচকি উঠল। রিশাদ হেসে তার চুল টেনে বলল,
–তুই হলি বুড়ি, আমার বড় আপা।
তাদের হাসি-ঠাট্টার মাঝেই তালহা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বলেল,
–চল, সবাই ওঠো! বাসায় যেতে হবে।
বলেই সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল বিল মেটাতে। এদিকে রাফি এগিয়ে এসে রিশাদের সঙ্গে হাত মেলাল, দু’জনের মধ্যে টুকটাক পরিচয়ও হয়ে গেল। কিন্তু এক কোণে বসে থাকা ফারিন তখনও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে রিশাদের দিকে। তার এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রিশাদ আড়চোখে বহুবারই টের পেয়েছে। অবশেষে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সে নীচু স্বরে তাহিয়ার কানে কানে প্রশ্ন করল,
–এই পেচি-মুখি মেয়েটা কে রে?
ফারিনের নামের বদলে “পেচি-মুখি” শব্দটা শুনেই তাহিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ওদিকে তাদের নিজের দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে ফারিন আরও রেগে কটমট চোখে তাকাল। বুঝে গেছে, তাকে নিয়েই মজা চলছে। রাগে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল,
–কানে কানে বদনাম করলে মুখে ঠুসা ফুটে।
রিশাদ ঠান্ডা সুরে জবাব দিল,
–বড়দের সঙ্গে ঝগড়া করলে গলায় ঠুসা ফুটে।
ফারিন ভান করা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
–এহহ! আপনি বড়? আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের বয়সি।
রিশাদ চোখ পিটপিট করে বলল,
–চোখের জায়গায় কান দিয়ে দেখলে তো নিজের বয়সিই দেখবা। ভণ্ডামি বাদ দাও, পড়ালেখায় মন দাও পিচ্চি, অপ্স, মিস ভণ্ড।
ফারিন মুখ বাঁকিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
–এক ভণ্ড আরেক ভণ্ডকেই চিনে।
বলেই ব্যাগটা কাঁধে তুলে নেয়। তারপর তাহিয়াদের বিদায় জানিয়ে রিশাদের কাছে এসে একচুল থেমে পিঞ্চ মেরে বলল,
–এতোদিন ভাবতাম, ভণ্ড আমরাই। এখন দেখি, আমাদের থেকেও বড় ভণ্ড ছিল, আমাদের আগের জেনারেশনে। ভণ্ডামি বাদ দিন, নিজের দিকে নজর দিন, দিনকে দিন বুড়ো বেডা হচ্ছেন। বাচ্চাকাচ্চা সামলানোর বয়সে ভণ্ডামি মানায় না, অ্যাঙ্কেললললল!
শেষের শব্দটায় এমন টান দিয়েছে যে, আশেপাশের সবাই মিটিমিটি হেসে উঠল। রিশাদ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে তার চলে যাওয়ার দিকে। তার মতো ইয়াং ছেলেকে কিনা শেষমেশ আঙ্কেল বলল। ছি! ভাবতেই নাকমুখ কুচকে ফেলল রিশাদ।
তাহিয়া হাসি থামিয়ে বলল,
–ভাইয়া, ওর কথায় কিছু মনে করো না। মেয়েটা একটু বেশি দুষ্টু, তবে মনটা একদম ভালো। ফাইজলামি করেই বলেছে, সিরিয়াস নিও না।
রিশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–হুম, মন ভালো, মুখ চালু…
এর মধ্যে তালহা চলে আসতেই সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রাফি তখনই বিদায় নিয়ে চলে গেছে। তালহার নাকি মাথা ব্যথা, তাই সে পেছনের সিটে বসেছে, গাড়ি চালাবে রিশাদ। সেটা দেখে তাহিয়া তড়িঘড়ি করে সামনের সিটে গিয়ে বসে পড়ল। তাকে সামনে বসতে দেখে মেহরীন তাকাতেই তাহিয়া দুষ্টু হাসিতে মেত হউঠল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে ইচ্ছে করেই মেহরীনকে তালহার পাশে ফাঁসিয়েছে।
মেহরীন রাগী চোখে একবার তাকালেও, ভেতরে ভেতরে মনটা কেমন যেন আনন্দে ভরে উঠল। ভালোবাসার মানুষের কাছাকাছি থাকতে তো সবাই চায়, আর সে তো আরও বেশি করে চায়। চোখে মুখে লুকোনো খুশির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল।
মেহরীন গাড়িতে উঠতেই যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে কেউ নাম ধরে ডাকল তাকে। কণ্ঠটা চিনে সে দাঁড়িয়ে পড়ল, বাকিরাও ঘুরে তাকায়। দেখে তাহসান ডাকছে। তাহসানকে দেখামাত্রই তালহা বিরক্তিতে ঠোঁট কামড়ে নিচু গলায় ‘চ্’ শব্দ করে উঠল।
তাহসান এগিয়ে এসে প্রথমেই রিশাদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করল, দু’একটা কথা বলেই সোজা মেহরীনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, ঠোঁটে একটুখানি হালকা হাসি।
–তোমার কাছে ইংলিশ শিটটা আছে না?
মেহরীন এক মুহূর্ত ভেবে মাথা নাড়িয়ে বলল,
–হ্যাঁ স্যার, আছে।
তাহসান ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল,
–ওটা দাও তো, কালকের টেস্টের প্রশ্ন বানাতে হবে। আমি ডকুমেন্ট করে রেখেছিলাম, হারিয়ে গেছে।
তার কণ্ঠে কোনো কড়াভাব নেই, বরং একধরনের নম্রতা। কিন্তু পাশে বসা তালহার মুখে এখনো চাপা বিরক্তির রেখা টের পাওয়া যাচ্ছে।
মেহরীন মাথা নাড়িয়ে ব্যাগ খুলে খুঁজতে লাগল বই-খাতার ভাঁজে সেই শিটটা। তাহসান মুচকি হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে, চোখে যেন এক অদৃশ্য প্রশান্তি, একরকম তৃপ্তি, যেন শুধু তাকিয়েই স্বস্তি পাচ্ছে। আর অন্যদিকে তালহার মুখ শক্ত হয়ে আছে। চোখদুটো কঠিন, চোয়াল টান টান। পূর্ণ চোখে চেয়ে আছে তাদের দুজনের দিকে, যেন ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ছে।
তালহার এমন অবস্থা দেখে রিশাদ হেসে ফেলল। লুকিং গ্লাসে নিজের চুল ঠিক করতে করতে টিটকারি মেশানো গলায় গান ধরল,
–”পড়ান যায় জ্বলিয়া রে… পড়ান যায় জ্বলিয়া রে…”
তার বেসুরো গলায় গান শুনে তাহিয়াও হেসে ওঠে। পরক্ষণেই তালহার রাগী দৃষ্টি ছুড়ে আসতেই সে চুপ করে যায়। এদিকে মেহরীন শিটটা তাহসানের হাতে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। রিশাদ সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি স্টার্ট দেয়। তালহা চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে আছে, মাথাটা যেন ভারে ঝিমঝিম করছে। মেহরীন একটু পর পর আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে।
তালহার অবস্থা দেখে রিশাদ পাশের এক রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামায়। তালহা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সে হাসিমুখে বলে,
–এক কাপ কফি খেলে মাথাটা একটু হালকা হবে তোর। আর আজ লাঞ্চ ট্রিট নাহয় আমার পক্ষ থেকে।
তাহিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসের হাসি ফুটে ওঠে,
–ইয়েস! ট্রিট মানে আমি রেডি।
সে ঝটপট নেমে পড়ে। তালহাও কিছু না বলে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
টেবিলে বসেছে তারা চারজন। এক পাশে তালহা আর রিশাদ, অন্য পাশে তাহিয়া আর মেহরীন। মেহরীনের ঠিক বিপরীতে তালহা, মুখোমুখি বসে। খাবার অর্ডার দিয়েই তালহা টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে, চোখ আধখোলা, মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। তাকে দেখে মেহরীন আর তাহিয়া দুজনেরই মন ভার হয়ে আসে। হয়তো একটু বেশিই অসুস্থ, নয়তো এমন শক্তপোক্ত মানুষ সহজে এতটা নিস্তেজ হয়ে যায় না।
মেহরীন চুপচাপ তাকিয়ে আছে তালহার দিকে। তার চোখে মিশে আছে কোমলতা, ভালোবাসা আর উদ্বেগের সুর, নীরবে পর্যবেক্ষণ করছে তালহার চুলের প্রতিটি ভাজ, তার দৃষ্টি নড়াচড়াহীন।
হঠাৎ পাশ থেকে তাহিয়া কনুই দিয়ে তাকে হালকা ধাক্কা দিল। ধ্যান ভাঙতেই মেহরীন বিরক্ত চোখে তাকায় তার দিকে। তাহিয়া চোখের ইশারায় তালহার দিকে দেখাচ্ছে বারবার, বিশেষ করে তার চুলের দিকে। কিন্তু মেহরীন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ভুরু কুঁচকে তাকাতেই তাহিয়া এগিয়ে এসে কানে কানে বলল,
–আরে বুদ্ধু! বলছি যে, ভাইয়ার চুল টেনে দে। আরাম লাগবে।
কথাটুকু শুনতেই মেহরীন চোখ বড় বড় করে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে মাথা এদিক-ওদিক করে ‘না’ বলে। তা দেখে তাহিয়া দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে, মেহরীনের বাম হাতটা তুলে ধরে তালহার মাথার ওপর রেখে দিল। সাথে সাথে গলা খাকারি দিয়ে বলল,
–ভাইয়ার মাথার চুল একটু টেনে দে তো মেহরীন, ভালো লাগবে। আমি তো এই দিক থেকে পারছি না।
তাহিয়ার এহেন কাণ্ডে মেহরীন লজ্জা আর ভয়ে মিশে একেবারে মূর্তির মতো বসে রইল। মনে হচ্ছিল, এখনই বুঝি তালহা তাকিয়ে ধমকে উঠবে। কিন্তু না, তালহা কিছুই বলল না, শুধু হালকা মাথা নেড়ে নিঃশব্দে সায় দিল।
মুহূর্তেই মেহরীনের মুখে ফুটে উঠল একরাশ সুখের হাসি। দেরি না করে সে আলতো হাতে তালহার চুল টেনে দিতে শুরু করল। তার কোমল আঙুলের ছোঁয়ায় তালহার মুখের টানটাও যেন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করে সে পরম যত্নে সেই স্পর্শটুকু উপভোগ করতে লাগল, যেন ব্যথার ভারটা মিলিয়ে যাচ্ছে মেহরীনের আঙুলের নড়ে ওঠার সঙ্গে।
সেই মুহূর্তের কোমল দৃশ্যটা, আড়াল থেকে ক্যামেরায় বন্দি করতে ভোলেনি রিশাদ। দুপুরের নরম আলো তখন টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে, চারপাশে কফির মিষ্টি গন্ধ, হাসির শব্দ, আর অনুচ্চারিত ভালোবাসার উষ্ণতা।
তালহার মাথা থেকে মেহরীনের আঙুল অনেক আগেই সরেছে। এখন সবাই খাবারে ব্যস্ত, টুকটাক গল্পে হাসির রেশ মিশে আচ্ছে। তালহাকে দেখতে বেশ সতেজ লাগছে, হয়তো মাথাব্যথা কমে গেছে। তবে গম্ভীর স্বভাবের জন্য সে মুখে কিছুই বলল না, চোখে শুধু একটুখানি অজানা প্রশান্তির ঝিলিক দিল।
সন্ধ্যা তখন ঠিক সাতটা,
দাদির ঘরের সাদা আলোয় বসে আছে মেহরীন আর তাহিয়া। দুজনেই মন দিয়ে শুনছে দাদির গল্প। দাদির গলায় যখন তারা প্রথম জানতে পারে দাদা-দাদির প্রেমের বিয়ের কথা, তখন থেকেই যেন এক কৌতূহলের রেশ লেগে গেছে তাদের চোখে মুখে। এখন সুযোগ পেলেই বলে ওঠে,
–আরও বলো না দাদি, তখনকার প্রেম কেমন ছিল?
তাদের বয়সটাই এমন, উঠতি বয়সের নরম আবেগে ভরা। অজানার প্রতি এক অদ্ভুত টান। মাঝে মাঝেই নিজেদের মধ্যে প্রশ্ন উঠে আসে, প্রেম মানে আসলে কী? মানুষ কীভাবে কাউকে ভালোবেসে এত বছর একসাথে থাকতে পারে? তাদের কি একে অপরের ওপর বিরক্তি আসে না?
এইসব প্রশ্ন আর অনুভূতি নিয়ে যেন তারা আলাদা এক জগতে বাস করে। এমন সময় তাহিয়া কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
–আচ্ছা দাদু, মানুষ ভালোবেসে যে একসাথে সারাজীবন থাকে, কখনো বিরক্ত লাগেনা তাদের?
দাদি মুচকি হেসে বললেন,
–ভালোবাসা এমন এক জিনিস রে দিদিভাই, একবার যদি কাউকে মন থেকে ভালোবেসে ফেলো, তবে তার প্রতি ভালোবাসা প্রতিদিনই একটু একটু করে গভীর হয়। তবে শুধু ভালোবাসলেই হয় না, সেটা প্রকাশও করতে জানতে হয়, যত্নে, মমতায়, আদরে, আহ্লাদে। যখন তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষ থেকে এসব না চেয়েও পাবে, তখন সেই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেবে আরও বড় এক অনুভূতি, সম্মান। সেই সম্মান থেকে আস্তে আস্তে জন্ম নেয় বিশ্বাস। যখন ভালোবাসা, সম্মান আর বিশ্বাস এই তিনটা একসাথে থাকে, তখন সম্পর্কের ভেতরে কোনো বিরক্তি বা দূরত্ব আসার জায়গাই থাকে না। উল্টো, প্রতিমুহুর্তেই মনে হয়, আরও কিছু বছর এই মানুষটার সঙ্গেই বাঁচি।
পাশ থেকে মেহরীন আগ্রহ নিয়ে বলে ওঠে,
–দাদার সঙ্গে তোমার প্রেমটা কিভাবে হয়েছিলো, দাদু?
দাদি একটু হেসে সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে যেন সময়ের পর্দা ভেদ করে চলে গেলেন সেসময়ে।
–তখনকার লোকের কথামতো আমি নাকি ছিলাম আগুন সুন্দরি।
একটু হাসলেন দাদি,
–পনেরো বছর বয়স, তখন সদ্য দশম শ্রেণিতে উঠেছি। তখনকার দিনে মেয়েদের পড়াশোনার তেমন দাম ছিল না, ঘরে বিয়ের প্রস্তাব আসত প্রায়ই। একদিন পাঠশালা থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটা মোটরসাইকেলের সামনে পড়ে যাই। হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে ছিলাম রাস্তায়, বই খাতা চারদিকে ছিটকে। তখনই মোটরসাইকেলের সুদর্শন এক যুবক গাড়ি ফেলে দৌড়ে এসে আমাকে উঠতে সাহায্য করে, বইগুলো গুছিয়ে দেয়। ওর সঙ্গে থাকা আরেকজন তো ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, এক্সিডেন্ট মামলার ভয়ে।
এ পর্যন্ত এসে দাদি হেসে ফেললেন। তাহিয়া সাথে সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
–ওই ছেলেটাই কি আমাদের দাদাভাই?
দাদি এবার মিষ্টি হেসে, খানিকটা লজ্জায় গালে হাত দিয়ে মাথা নেড়ে বললেন,
–হ্যাঁ রে, তিনিই ছিল তোদের দাদা। আমি তো প্রথম দেখাতেই হার মেনেছিলাম। উঠতি বয়স, তার ওপর সামনে যেন কল্পপুরুষের আবির্ভাব। সেদিন সে খুব অনুতপ্ত ছিল, বলেছিল লিফট দেবে। কিন্তু সে কালে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে একসাথে দেখলে লোকে কটাক্ষ করত, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বসত। সে ভয়ে মানা করি। অবশ্য আরেকটা কারণও ছিল, সে ছিল প্রভাবশালী বাপের ছেলে, তার সাথে দেখলে তো, ‘বড়লোকের ছেলে ফাঁসিয়েছে’ এসব ধরনের কত কথাই না বলত। তাই পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরেছিলাম। তারপর শুরু হলো আমাদের গল্প। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মাঝ রাস্তায় এক শিউলি গাছ ছিল, প্রতিদিন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত ও। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। দিন যেতে যেতে তার পাগলামি বাড়ল, কখনো চিঠি দিত, কখনো মেলা থেকে চুড়ি-আলতা এনে দিত। প্রথমে চিঠির উত্তর দিতাম না, কিন্তু পরে ঠিকই দিতে লাগলাম, লুকিয়ে লুকিয়ে। কিন্তু এসব তো কিছু লুকিয়ে থাকে না, একসময় জানাজানি হয়ে গেল। আমি বদনামও হই, লোকে আঙুল তোলে। বেশ কয়েকদিন মানসিক অত্যাচ্যারের শিকার হই। তার পরেই একদিন হঠাৎ সে তার বাবাকে আর কাজিকে নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে আসে। সেদিনই আমাদের বিয়ে হয়ে যায়, তারপর চলে যাই দূর শহরে। যাওয়ার আগে সে শুধু একটাই কথা বলেছিল…
দাদি একটু থেমে গেলেন, যেন অতীতের মায়াজালে আটকে গেছেন। তার মুখে প্রাপ্তির হাসি, তবে চোখে নোনাজল। এদিকে দুজনেই চোখ বড় বড় করে গল্প শুনছে, ক্ষণে ক্ষণে মুচকি হাসছে, আবার মন খারাপ করছে। সেই সময়েও যে প্রেম এতটা গভীর ছিল তা ভাবতেই তাদের অবাক লাগে।
ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাহসান মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
–বুড়ি, পুচকি দুটোকে পাকাচ্ছো বুঝি প্রেমের গল্প শুনিয়ে!
দাদি হেসে পাশে জায়গা করে বললেন,
–আরে আয় দাদুভাই, বস না।
তাহসান হাসল,
–পরে বসব দাদি, এখন কাজ আছে। আর এদের এতো তাড়াতাড়ি পাকিও না। এই তোরা যা, পড়তে বস।
তাহিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
–এখন না, ভাইয়া একটু পরেই চলে আসবে তখন তো পড়তে বসবই। তুমি যাও, একটু রেস্ট নিচ্ছি এখন।
তাহিয়ার মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে মেহরীনের দিকে তাকাল,
–মেহরীন, একটু আসো তো।
বলেই বাইরে চলে গেল তাহসান। মেহরীন বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বলল,
–এই সময় আবার কী দরকার পড়ল!
তবু উঠে গেল, যাওয়ার আগে সাবধান করে বলে গেছে দাদি যেন কিছু না বলে। দাদি হেসে মুখে আঙুল রাখলেন,
–এই যে চুপ… তুই না আসা অব্দি কিছুই বলব না।
দাদির ঘর নিচতলায়, মেহরীন নিচতলার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দুতলায় উঠতেই করিডোরে তাকিয়ে দেখে তাহসান দাঁড়িয়ে আছে। মুখে এক চিলতে হাসি। মেহরীন ভ্রু কুঁচকে বলল,
–ভাইয়া, ডেকেছিলেন যে?
তার কন্ঠে তাহসানের মুখের মুচকি হাসি যেন আরও গভীর হলো। হাতে থাকা সাদা কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–এইটা বোধহয় তোমার, শিটের ভেতর পেয়েছি।
মেহরীন কাগজটার দিকে চেয়ে কপাল কুচিয়ে হাতে নিল, কৌতুহলে পাতার ভাঁজটা খুলে নিল। ভাঁজ খুলতেই রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল তার,মুহূর্তেই মেহরীনের মুখের রঙ পাল্টে গেল। চিঠিটা সেটাই, যে চিঠি সে বাংলা ক্লাসে অভিমানী মনে তালহাকে নিয়ে লিখেছিলো। ওই দিন পিয়নের ডাকে তা শীটের মাঝেই কুঁচকে রেখেছিল তা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত তাহসানের হাতে এসে পড়ল এটা।
হুট করে বুকে একটা শিহরণ বয়ে গেল, তাহসান যদি এটা বাড়ির সবাইকে জানায়, তালহার কাছে ধরা পড়ে গেলে, হয়তো তাকে এই বাড়ি থেকেই বের করে দেওয়া হবে। ভয়ের চোঁটে কাঁপতে কাঁপতে মেহরীনের মাথায় রাতদিন এক করে ভাবনার কোলাজ বাঁধতে লাগল। প্রতিটি সম্ভাব্য ফলের ছবি যেন চোখের সামনে ঘুরে চলছে।
এই হতবুদ্ধি উৎকণ্ঠার মধ্যে তাহসান আবেগ মাখা কন্ঠে থেমে থেমে বলে উঠল,
–সরি আমার জন্য কষ্ট পেয়েছো, তবে সেদিন আমি তোমাকে উপেক্ষা করিনি মেহরীন। যাইহোক সব অভিমান বাদ আমিও তোমাকে ভালো…
বাকিটুকু বলার আগেই মেহরীন হালকা স্বরে চেচিয়ে উঠে, এক চোখে হাত দেয়। তাহসান তৎক্ষণাৎ থেমে গিয়ে তার দিকে তাকায়, মুখে চিন্তার ছায়া।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৭
–কি হয়েছে?
মেহরীন চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
–চোখে কি যেন পড়েছে।
তাহসান শুনে দ্রুত এগিয়ে আসে। আলতোভাবে তার থুতনিতে হাত রেখে অন্য হাতে চোখটা একটু মেলে ধরে ফুঁ দিতে শুরু করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে তালহার গম্ভীর, কাঠ কাঠ কণ্ঠস্বর,
–এখানে কি হচ্ছে…
